বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

মোস্তাক আহমাদ দীন-এর প্রবন্ধ-- ঔপন্যাসিক ওয়ালীউল্লাহ্ ও তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা

সমগ্র উপন্যাসকৃতি নিয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্'র অবস্থান যেখানেই থাকুক, এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে লালসালুর ঔপন্যাসিক হিসেবেই তাঁর গড় খ্যাতি। বইটি পাঠ্যতালিকাভুক্ত ছিল বলে যারা পড়তে বাধ্য হয়েছেন বা পুরস্কৃত হয়েছে বলে কিংবা খ্যাতি ছড়িয়েছিল বলে যারা পড়ে দেখেছেন, সেই সকল সাধারণ পাঠকের পক্ষে এমন ধারণায় পৌঁছাটাই স্বাভাবিক-তাদের প্রতি বলবারও কিছু নেই আমাদের-কিন্তু এর বাইরেও কিছু পাঠক/সমালোচকও যখন তাঁর অন্য উপন্যাসগুলো বিচার করার ক্ষেত্রে বারবার লালসালুকেই মানদণ্ড হিসেবে দাঁড় করান, তখন আমাদের ধারণা, তাঁকে একপ্রকার অস্বীকারই করা হয়।
অথচ তাঁর প্রত্যেকটি উপন্যাসই তো এক-একটি পৃথক শিল্পকর্ম, তাদের অভিমুখও অভিন্ন নয়, তাই আলোচনার ক্ষেত্রে পরিপ্রেক্ষিত-বিবেচনার সঙ্গে-সঙ্গে লেখকের জীবন-অভিপ্রায় ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রটিকে যেখানে আবিষ্কার করা জরুরি ছিল, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি নজির বাদ দিলে, ওয়ালীউল্লাহ্'র ক্ষেত্রে এখনো তা করা হয়নি। এর কারণ, অন্তত আলোচকদের আলোচনায় এ-টুকু স্পষ্ট যে, দীর্ঘ দিনব্যাপী তাঁর প্রবাসযাপন-ফরাসি নারীকে বিয়ে করার প্রসঙ্গও তুলেছেন একজন আলোচক-এবং সেই সব সূত্র ধরে লালসালু-পরবতী উপন্যাসে বিশেষ সময়-যুগ-তত্ত্ব প্রভৃতির প্রভাব খুঁজে বের করার প্রাণান্তকর অনুসন্ধান! এ-কথা থেকে কেউ যেন এমনটি মনে না করেন যে আমরা প্রমাণ করতে চাইছি তাঁর উপন্যাসের সঙ্গে বিদেশি লেখকের ভাব ও তত্ত্বের কোনো যোগ নেই-একটা সময় পরে একাধিক আলোচক, বিশেষত শিবনারায়ণ রায় ও সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তো দেখিয়েছেন যে, তত্ত্বের মর্ম গ্রহণ করেও একজন লেখক কীভাবে কালোত্তরণের দ্ষ্টৃান্ত স্থাপন করতে পারেন-আমরা বলতে চাইছি, লালসালু উপন্যাসটি তাঁর দেখা-অভিজ্ঞতার তাড়নাজাত সফল উদাহরণ, কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ্'র উচ্চাকাঙ্ক্ষার নজির লালসালু-পরবর্তী উপন্যাসগুলোতেই প্রতিফলিত। তাঁর প্রথম উপন্যাস লালসালু এবং তৎপরবর্তী চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদোর উচ্চাকাঙ্ক্ষী চিন্তাই এই লেখার বিষয়বস্তু। উল্লেখ্য যে, এই লেখার অভিব্যক্তির সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনায় ইংরেজি ভাষায় লিখিত তাঁর অন্য উপন্যাস দুটিকে এ-আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।


দুই
ওয়ালীউল্লাহ্'র লালসালু উপন্যাসের অসংখ্য আলোচক উপন্যাসটি নিয়ে এত-এত আলোচনা করেছেন যে, এখনকার আলোচক সেগুলো না পড়ে আলোচনা করতে গেলে তাতে পূর্ববর্তী আলোচকের পুনরাবৃত্তি করাই স্বাভাবিক। এইসব আলোচনায় সফলতার দিকটিই বেশি আলোচিত, দু-একজন সমালোচক কিছু অসঙ্গতি নিয়েও আলোচনা করেছেন অবশ্য, কিন্তু এদের কেউই এখন পর্যন্ত এ-প্রশ্নটি তোলেননি যে তাঁর মানসগঠনের সঙ্গে এ-উপন্যাসের পাঠবস্তু কতটা যুক্ত এবং তার পাঠবস্তুতে কোনোপ্রকার অভিজ্ঞানজনিত দৈন্য ঘটেছে কি না। প্রশ্নটি কারও লেখায় প্রাসঙ্গিক হলে হয়তো তাঁর অন্য উপন্যাসগুলোর প্রতি আরেকটু বিশেষ নজর পড়ত আমাদের, আর সেটি তাঁর জীবদ্দশায় ঘটলে, অল্পসময়ের মধ্যেই তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার ডালপালা আরও বিস্তারিত হতে পারত। কিন্তু তা যে হয়নি, সেটি আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে-জীবদ্দশায় লালসালু বাদে মাত্র দুটি উপন্যাস প্রকাশিত হলো তাঁর। প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের পর যে-লেখক বহুভাবে সমাদৃত, মাত্র ক-টি উপন্যাস লেখার মধ্য দিয়ে সেই লেখকের ঔপন্যাসিকজীবন শেষ হওয়ার কারণ-আমাদের মতে-আলোচকেরা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উভয়ভাবেই তাঁর অন্য উপন্যাসে লালসালুর ছায়াই খুঁজেছেন; খুঁজে ব্যর্থ হয়ে, এর জন্য তাঁর প্রবাসজীবনকে দায়ী করেছেন, লেখায় অন্য লেখকের/অন্য যুগের প্রভাব বের করার চেষ্টা করেছেন। অথচ তাঁর যে-জীবনযাপন তাতে এই ব্যক্তিই যে একদিন লালসালুর মতো একটি উপন্যাস লিখে উঠবেন, তা-ই ছিল অস্বাভাবিক।

ওয়ালীউল্লাহ্'র জন্ম ও বেড়ে-ওঠা বাংলা সাহিত্যের আর-দশজন লেখকের মতো নয়-তিনি তাঁর বাবা মা দুই তরফ থেকেই পারিবারিক শিক্ষা ও রুচির উত্তরাধিকার নিয়ে বড় হয়েছেন যা তাঁর লেখকমানস-গঠনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ছোটোবেলা থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী, মাতৃহারা, নিঃসঙ্গ, সংবেদনশীল ওয়ালীউল্লাহ্ যে-পেশা ও বন্ধুবৃত্তে জড়িয়েছিলেন এবং যা পড়েছেন যা নিয়ে আলোচনা করেছেন তাতে তাঁর পক্ষে চাঁদের অমাবস্যা, কাঁদো নদী কাঁদো এবং দি আগলি এশিয়ান-এর মতো উপন্যাস লেখা যতটা সহজ ছিল, লালসালু লেখা ছিল ততোটাই কঠিন। কথাটির সত্যতা খুঁজে পাব তাঁর মামাতো ভাই জামাল নজরুল ইসলামের স্মৃতিকথায়ও :

ওয়ালীউল্লাহ্ কর্মরত ছিলেন উচ্চপদে। কাজেই সমাজের উচ্চশ্রেণীর জনগণের জীবন-যাপন, তাদের সুখ-দুঃখ, আচার-আচরণকে কেন্দ্র করে সাহিত্যরচনায় মনোনিবেশ করাই ছিল স্বাভাবিক। তিনি যদি তাই করতেন তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি এর পরিবর্তে তার সাহিত্যকর্মে গুরুত্ব দিলেন সমাজের নিম্নবিত্তের অবহেলিত মানুষের জীবনকে। স্বল্পবিত্ত বা হতদরিদ্র মানুষের বঞ্চনার নেপথ্যের রহস্য উন্মোচনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন।

এরপরও ওয়ালীউল্লাহ্ গ্রামসমাজের ধর্ম-বাস্তবতা নিয়ে লালসালু লিখেছেন, লিখে খ্যাতিও পেয়েছেন, তাঁর আকাঙ্ক্ষাও অনেকটা এতে পূর্ণ হয়েছে-সমালোচকদের বিচারেও এ-কথাটি অস্পষ্ট নয়। কিন্তু ওয়ালীউল্লাহ্ যে-মাপের প্রতিভা এবং উপন্যাস-রচনার ব্যাপারে তাঁর যে-প্রস্তুতি, লালসালু উপন্যাসটি কি সে-উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছিল? কথাটি বিষয়ের গুণ-নির্গুণ নিয়ে শুধু নয়, এ-বিচার সার্বিক-চেতনাগত। শুধু বিষয়ব্যাপারের কথা ধরলে, চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাস দুটির বিষয়ও তো সেই সমাজ, উপন্যাসে যার প্রতিফলন ঘটানোর কথা তিনি একাধিকবার তাঁর লেখায় ব্যক্ত করেছেন। কাজি আফসারউদ্দিনকে-লিখিত একটি চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন : ‘ I want to write মুসলমান সমাজ নিয়ে- আমার সমগ্র মনের ইচ্ছে সেদিক পানে। এও একরকম passion থেকে সৃষ্ট। মুসলমান সমাজ সম্বন্ধে আমরা কেউ হয়ত অজ্ঞ নই; কিন্তু অধঃপতনের এই যে একটা চূড়ান্ত অবস্থা-এই অবস্থা নিয়ে লিখে আমার লেখা কলঙ্কিত(?) করতে চাই।' তাঁর স্ত্রী অ্যান-মারি ওয়ালীউল্লাহ্ও এমনটি জানিয়েছিলেন যে, ওয়ালীউল্লাহ্ আধুনিক চিন্তায় প্রভাবিত হলেও তাঁর লক্ষ্য ছিল পূর্ববঙ্গের গ্রামের মানুষদের নিয়ে লেখা, নিজের দেশপরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তিনি সেই কাজটিই করে গেছেন আজীবন। অ্যান-মারির এক প্রশ্নের উত্তরে তাঁকে যে-জবাবি চিঠিটি লিখেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্ এখানে তার উল্লেখ করলে সে-বিষয়ে তাঁর ধারণাটি স্পষ্ট হবে :

আমার বইপত্র আর লেখালেখির ব্যাপারে তুমি খুব প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন তুলেছ, তা হলো, আমি যে গ্রাম আর তার মানুষজন নিয়ে লিখি গোর্কি ওদের যতটা কাছ থেকে জানতেন, অতটা জানাশোনা কি তাদের নিয়ে আমার আছে। জানি না তুমি এটা মনে করো কি না যে ওদের নিয়ে লিখতে গেলে ওদের মধ্যে আমাকে বসবাস করতে হবে। আমার পক্ষে সেটা করা সম্ভব নয়। গ্রামের লোকদের নিয়ে লিখতে গেলে আমাকে কেন গ্রামের মানুষ হতেই হবে? এটা অত্যাবশ্যকীয় নয়। অন্যদিকে, গ্রামের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো কী শুধু সেটাই আমি জানি না, সেই সঙ্গে তাদের গঠন, তাদের ইতিহাস, এবং ভবিষ্যৎ বিষয়ে আমি ওয়াকিবহাল। আমি তাদের গোটা জীবন বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে পারি, আর সেটা পারি আমি গ্রামের মানুষ নই আর গ্রামে বসবাস করি না বলে। ওদের মধ্যে বসবাস করলেও গুটিকয়েক গ্রামবাসীর জীবনের আক্ষরিক এবং ফটোগ্রাফিক বিবরণ তুলে ধরা আমার লক্ষ্য হতো না। বরং আমি যাদের চিনতাম, তারা যে এক বৃহৎ সামাজিক অর্থনৈতিক বুনোটের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ সেটা বোঝানোই আমার লক্ষ্য। (আমার কথা বুঝতে পারছ?)...আমি যখন ধর্মীয় কুসংস্কার, মোল্লাদের হাতে গরীব মানুষের শোষণকে আক্রমণ করি, তখন আমি গোটা ব্যবস্থাটাকেই আক্রমণ করি।

ওয়ালীউল্লাহ্'র কথাগুলি কতটা গ্রহণযোগ্য তা বিবেচনার পাশাপাশি এ-ব্যাপারটিও আলোচনাযোগ্য যে, তাঁর স্ত্রী অ্যান-মারির মনে এই প্রশ্ন জাগবার কারণটা কী? এমনিতে জামাল নজরুল ইসলামের লেখায় তো এটুকুও জানা গেছে যে সময়-সুযোগে তিনি গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদের ‘দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করতেন’, এ-তথ্য তো অ্যান-মারিরও অজানা থাকবার কথা নয়; তাহলে? হয়তো লেখাবস্তুর সঙ্গে-অন্তত লালসালুর ক্ষেত্রে- ওয়ালীউল্লাহ্'র অন্তরঙ্গতার দৈন্যই অনুভব করেছিলেন অ্যান-মারি, কারণ এ-বইটি সম্পর্কে তাঁর একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে রশীদ করীমের লেখায়ও। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ফ্রান্সের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন রশীদ করীম। আলাপের একপর্যায়ে রশীদ করীমকে জিজ্ঞেস করলেন ওয়ালীউল্লাহ্ : ‘আমার লালসালু কেমন লেগেছে তোমার?’ জবাবে রশীদ করীম বললেন, ‘প্রথম পৃষ্ঠা বিশেক অপ্রয়োজনীয়’, এ-সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন অ্যান-মারি ওয়ালীউল্লাহ্, রশীদ করীম লিখেছেন, ‘যদ্দুর মনে পড়ছে, তিনি আমার মত সমর্থন করেছিলেন।' -এই কথোপকথন থেকেই বোঝা যায় ওয়ালীউল্লাহ্'র লেখাপত্র-বিষয়ে তাঁর স্ত্রী সদাউৎসাহী থাকলেও তিনি ছিলেন স-তর্ক ও স-চেতন। আর রশীদ করীমও যখন লালসালুকে ওয়ালীউল্লাহ্'র শ্রেষ্ঠ কাজ বলে অভিহিত করেছেন, তখনো কিন্তু কাঁদো নদী কাঁদো বের হয়নি, প্রকাশিত হয়েছে কিছু গল্প আর উপন্যাস চাঁদের অমাবস্যা। এ-ছাড়াও লালসালু-সম্পর্কে আরেকটি লেখায় রশীদ করীম লিখেছিলেন, অন্যরা যে-কারণে এই উপন্যাসটিকে মহিমান্বিত করেন তাঁর আগ্রহ সে-জায়গায় নয়, অর্থাৎ ভণ্ড পির মজিদ ধর্মান্ধতাকে অবলম্বন করে যে গ্রামের মানুষদের তারাবাজি দেখিয়ে ‘টেরিয়ে’ দেয়, ঔপন্যাসিকের কৃতিত্ব সেটি নয়, কারণ গ্রামের মানুষ-রশীদ করীমের মতে-এতটা সরল নয় যে বছরের পর বছর তাদেরকে বোকা বানিয়ে রাখা যাবে। এ-কথার পক্ষে উপন্যাস থেকে লেখক-বর্ণিত হাসুনির মার বুড়ো বাপের মনের কথাটি তুলে ধরেন : ‘একটা বিষয়ে গোলমাল নেই তার মনে। অন্তরের শক্তিতে মজিদ ব্যাপারটা জানতে পেরেছে সে কথা সে বিশ্বাস করে না।’ উল্লেখ করেছেন খালেক ব্যাপারীর নিঃসন্তান বউটির কথাও, বলেছেন তাদের কথাও যারা মজিদের অলৌকিকত্বে বিশ্বাসী নয়-তিনি বলেন, ‘মজিদ পীরে তাদের বিশ্বাস অটল থাকলে তারা দলে দলে আওয়ালপুরের নবাগত পীর সাহেবের দরবারে শরিক হওয়ার জন্য মিছিল করে বেরিয়ে পড়ত না’। বরং তিনি মনে করেন, ‘উপন্যাসটির আসল বাহাদুরি অন্য জায়গায়। স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্কের রহস্য-উন্মীলনে। এবং সেখানে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর সূক্ষ্ম হাতের মিহি কাজ দেখিয়ে দিয়েছেন।’ তাঁর এই মতের পক্ষে পুকুরে গোসল করে উঠে সিক্ত-বসনে-দাঁড়ানো রহীমার চুল-ঝাড়ার দৃশ্য আর খড়ের আগুনের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত বেগুনি রঙের শাড়ি-পরা হাসুনির মার খোলা গলা-কাঁধ-বাহুর নগ্নতার প্রতি মজিদের তাকিয়ে-থাকার বর্ণনা তুলে ধরেন। অবশ্য এই সব বর্ণনায় অবদমিত কামনাবাসনার সপক্ষ দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের পাশাপাশি সচেতনভাবে নিজের চিন্তাও আরোপিত করেছেন রশীদ করীম, কারণ, হয়তো তাঁর মনে হয়েছে এই বিষয়গুলোকে ওয়ালীউল্লাহ্ গৌণ করে দেখেছেন বলেই এই দিকে আর এগোননি। যেহেতু আমরা জানি, লালসালুর মুখ্য বিষয় ধর্মান্ধতা- ধর্মকে অবলম্বন করে মিথ্যাকে সত্যের রূপে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টার ধারাবাহিক বিবরণ রয়েছে এর পাতায়-পাতায় ।

যে-মিথ্যা/ধর্মান্ধতা-কে পুঁজি করে মজিদ ক্ষমতাশালী, তার প্রতি অনেকের যে-অবিশ্বাস, সেই বিষয়টিকে মুখ্য করেও তো উপন্যাস হতে পারে, কিন্তু অবিশ্বাসীর সংখ্যা যদি অধিক হয় তাহলে চরিত্রের ক্ষমতার প্রশ্নে উপন্যাসের অন্তর্কাঠামোগত ঐক্য নষ্ট হয়-দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। এমন দুর্বলতা আরও রয়েছে এতে, লালসালু যে-ধরনের উপন্যাস, সে-বিচারে এগুলোকে বড় অসঙ্গতিই বলা চলে।

আমরা দেখেছি মজিদের ক্ষমতার উৎস হলো মাজার-বোঝা যায়, পির থাকুন আর নাই থাকুন সে মাজারে বিশ্বাসী, মাজারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এ-ক্ষেত্রে পূর্ব-অভিজ্ঞতা যা বলে, আমাদের লোকগান যেগুলো এখন গ্রামসমাজের মানুষের অতি আদরের ধন, আরাধ্যও বটে, সেগুলোর রচয়িতা, গ্রাহক ও লালনকারীদের অনেকেই মাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই যুক্ততার ইতিহাস খুব প্রাচীন না হলেও আজকালকার নয়, অনেকদিন ধরেই চলে আসছে-দেখা যায় এরা নানা কারণে বহুজায়গায় অবস্থান করলেও এই সকল মাজারই এদের মিলনস্থল; এদের মত-পথ-তরিকা ভিন্ন, তবু এই বিশেষ জায়গাটি কোনো-না-কোনো ভাবে অলিখিত ঐকসূত্রে বেঁধে রাখে তাঁদের। এদের অনেকেই মাজারকে কেন্দ্র/উপলক্ষ্য করে ভক্তিমূলক ও অধ্যাত্মধর্মী গান রচনা করে ও গায়, এবং এরাই আবার তাদের জীবনজীবিকার সূত্রে সমাজের অসঙ্গতি-জোরজুলমি নিয়ে গান বাঁধে। কিন্তু লালসালুর মজিদকে আমরা দেখছি এ-অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম-সে এই সব গানকে সহ্যই করতে পারে না : ‘কাতারে কাতারে সারবন্দী হয়ে দ্বিতীয়ার চাঁদের মত কাস্তে নিয়ে মজুররা যখন ধান কাটে আর বুক ফাটিয়ে গীত গায় তখনো মজিদ দূরে দাঁড়িয়ে দেখে আর ভাবে। কিসের এত গান, এত আনন্দ?’ উক্তিটিতে গানের প্রতি মজিদের বিরাগ স্পষ্ট, তার মনে হয়, ‘ঝালরওয়ালা সালু কাপড়ে আবৃত মাজারটিকে তাদের হাসি আর গীত অবজ্ঞা করে যেন।

এছাড়াও ওয়ালীউল্লাহ্ আরও যে-সকল কার্যকারণ মিলিয়ে লালসালুর ঘটনাপরম্পরা তৈরি করেছেন, সাধারণ চোখে দেখলে তা একধরনের বাস্তবই মনে হয়, যাকে বলে বানানো বাস্তব, যার মূল ভিত্তি নিরেট/বাস্তব জীবনে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অন্তত এমন বাস্তবতায়-তৈরি মজিদের মতো পির আমাদের সমাজে খুঁজে পেতে লবেজান হতে হবে যে-কিনা কৃষকদের ভয় দেখিয়ে দোয়া-কলমা মুখস্থ করায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য তাদেরকে তৈরি করে, মসজিদ বানায় আবার মাজারকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার সাম্রাজ্যও প্রতিষ্ঠা করে। দোয়া-কলমা, নামাজ-রোজা পালনে কৃষকদেরকে বাধ্য করতে দেখে মজিদকে শরিয়তের একজন পাক্কা পাবন্দ মাওলানার মতোই মনে হয়, অথচ শরিয়তপন্থী মাওলানারা মাজারকে সাধারণত ‘কবর’ বলেই অভ্যস্ত, তার প্রতি তাদের কোনো ভয়-খওফও প্রবল নয়, তারা কবর জিয়ারত করেন, আর কবর-পূজাকে র্শিক জ্ঞান করেন, কিন্তু মজিদ সেরকম নয়। তাহলে কি মজিদ ফকিরি পন্থায় বিশ্বাসী? তাও মনে হয় না-কারণ, এ-পন্থায় পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ জরুরি নয়, তাদের নামাজও আলাদা, তবে এ-পন্থার অনুসারীরা মাজারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, গানও তাদের প্রিয়, কারও-কারও একান্ত অবলম্বনও বটে। মজিদ চরিত্রটি এর কোনোটিই নয়, তাই একথা না বলে উপায় নেই যে, তাকে কেন্দ্র করে যে-কৃত্রিম বাস্তবতাই তৈরি হোক না কেন সেটি পুরো ভিত্তিশূন্য না হলেও, সামঞ্জস্যশূন্য। মজিদের মতো মাজারকেন্দ্রী পির আমাদের সমাজে অসংখ্য, কিন্ত মজিদের যে-বিশ্বাস, তার মতো অবিকল পির এখানে পাওয়া দুরূহ। কথাটিকে অভি/অনু-যোগ হিসেবে ধরে নিয়ে কেউ যদি এর জবাব দিতে গিয়ে বলেন যে পুরো চরিত্রটিই যেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি মিথ্যে ভিত্তির ওপর-যেখানে মোদাচ্ছের পিরেরই কোনো অস্তিত্ব নেই-সেখানে এই অভিযোগ তোলা কেন? তাহলে এর জবাবে বলতেই হবে যে, ঔপন্যাসিকের জগৎ সেটি নির্মিত জগৎ হলেও তার বাস্তবতার মধ্যেও জ্ঞানগত সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। এ-ছাড়া ওয়ালীউল্লাহ্ তো তার দেখা-চরিত্রকেই বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। এ-বিষয়ে ওয়ালীউল্লাহ্'র সঙ্গে সৈয়দ আলী আহসানের একটি আলাপও সেই স্বাক্ষ্য দেয় : ওয়ালীউল্লাহ্'র প্রথম গল্পগ্রন্থ নয়নচারা আদৃত হওয়ার পর সৈয়দ আলী আহসান তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনি উপন্যাস লিখেন না কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘একটি উপন্যাসের বিষয় নিয়ে অনেক দিন ধরে ভাবছি। একজন গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ-যার সংসার আছে, ছেলেমেয়ে আছে, সে ব্যবসা হিসেবে বেছে নিল কবর-পূজা। এ লোকটি কি রকম আচরণ করে তা আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। চট্টগামে আমাদের গ্রামের বাড়ীর কাছে এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। একজন লোক হঠাৎ উঁচু একটি মাটির ঢিবির উপর চুনকাম করে তার উপর লালসালু বিছিয়ে পথচারীদের কাছ থেকে পয়সা নিতে লাগল। সরল বিশ্বাসী পথচারীরা চিরন্তন বিশ্বাসের ভারে এতই অভিভূত যে তারা নানাবিধ কামনায় সেখানে পয়সা দিতে লাগল'। এই ভাবনার ফলই লালসালু, তাঁর দেখা এই ‘একজন লোক’ই হলো মজিদ, কিন্তু এই চরিত্রকে পিরের মূর্তিতে দাঁড় করাতে গিয়ে তাকে কেন্দ্র করে যে-সকল ধর্মীয় ঘটনা-অনুষঙ্গ হাজির করা হয়েছে সেগুলোর কারণেই মজিদ চরিত্রটি জটিল ও গোলমেলে চরিত্রে পরিণত হয়েছে। এর কারণ, আমাদের মতে, ইসলামের মত-পথ বিষয়ে ঔপন্যাসিকের স্বচ্ছ ধারণার অভাব-মজিদকে কেন্দ্র করে যে-সকল ধর্মীয় বিধিবিধানের উল্লেখ করেছেন ওয়ালীউল্লাহ্, তার বেশির ভাগই কাণ্ডজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে রচিত। যদিও সৈয়দ আলী আহসানকে তিনি বলেছিলেন, ‘ইসলাম এটাকে সমর্থন করে না জানি তবু এ ব্যবসা ক্রমান্বয়ে প্রসারের পথে। এরকম একজন ব্যবসায়ীর চাতুর্যকে আমি আবিষ্কার করতে চাই, মিথ্যাচারকে আবিষ্কার করতে চাই, আবার মমতার মধ্যেও তাকে পেতে চাই। এটা কি করে সম্ভব হবে জানি না কিন্তু আমি চেষ্টা করছি।’-এই চেষ্টা করতে গিয়ে শৈশব-কৈশোরের দু-আনা অভিজ্ঞতার সঙ্গে পড়ে-পাওয়া চোদ্দ আনা মিলিয়ে মজিদের যে-জগৎ তৈরি করেছেন ওয়ালীউল্লাহ্, তা হয়ে উঠেছে এক আরোপিত জটিল জগৎ। এতকিছুর পরও, বিষয়গত অসামঞ্জস্য সত্ত্বেও, মুসলমান সমাজের প্রেক্ষাপটে এমন কিছু অগ্রসর চিন্তা ও কল্যাণমূলক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে লালসালুতে, সে-ক্ষেত্রে পথিকৃতের মর্যাদা ওয়ালীউল্লাহ্'র প্রাপ্য। বিশেষ করে সেই সময়ে, যখন সবেমাত্র দেশভাগ-এর মতো ভুল সিদ্বান্তে ‘বিষাদবৃক্ষ’-এর বীজ রোপিত হওয়ার কারণে অসংখ্য মানুষের জীবনে দুর্দশা নেমে এসেছে তখন এই বইয়ের বিষয় যেন সেই ভবিষ্যতেরই ইশারা দিচ্ছে যেখানে নানা রূপে অসংখ্য মজিদের আবির্ভাব ঘটবে এবং এর সঙ্গে-সঙ্গে নষ্ট হয়ে যাবে মানুষের সম্প্রদায়নিরপেক্ষ স্বাভাবিক সম্পর্ক-লোকায়তের মেলা-পরব, উৎসবাদি গান ও মানুষের ভেদমোচনে ক্রিয়াশীল নানা লোকাচার। যার প্রমাণ তো আমরা পরে পেয়েছিই বাস্তবে হাতে-কলমে, বইপত্রে, তাই যত সময় গেছে আরও প্রাসঙ্গিক হয়েছে লালসালুর ধর্মান্ধতার নানা চিত্র ও অনুষঙ্গ।

তবে এ-উপন্যাসের মাধ্যমে ওয়ালীউল্লাহ্ ধর্মব্যবসায়ীর চাতুর্য ও মিথ্যাচার আবিষ্কার ও উন্মোচন করতে পারলেও-নিজের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী-মজিদের প্রতি পাঠকের মমতা জাগাতে সক্ষম হননি। উপন্যাসে মজিদকে মাঝে-মধ্যে নামাজ ও অন্যান্য আচার পালন করতে দেখা যায়, আচারপালনে অন্যকে হুকুম করতেও দেখা যায়-যে-লোক একটি মিথ্যা তথ্য/তত্ত্বকে পুঁজি করে, ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের নানা প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গকে স্বার্থোদ্ধারের কাজে ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারিত করছে তার ক্ষেত্রে এই আচারনিষ্ঠা স্ববিরোধিতারই উদাহরণ; আমাদের ধারণা, এর মাধ্যমে পাঠককে মজিদের প্রতি ‘মমতা’ময় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্, কিন্তু উপন্যাসে ভণ্ডামি আর মিথ্যাজগতের বাস্তবতা এতটাই তীব্র হয়েছে যে, এর অন্যস্বরটি আচ্ছন্ন হয়ে গেছে এবং পরবর্তী সময়ের মাজার-ব্যবসার প্রকটতার কারণে স্বরপ্রকাশের সদর্থ ও দ্বান্দ্বিক সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে গেছে। এমনিতে কোনো উপন্যাসে দ্বান্দ্বিক ও বহুস্বরগত সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করতে চাইলে তার প্রধান সহায় হয়ে উঠতে পারে তার মনোজাগতিক বাস্তবতা, বাইরের বাস্তবতা নয়। কিন্তু লালসালু বাইরের বাস্তবতার উপন্যাস, অর্থাৎ তার আঙ্গিকটাই এমন যে, যা লক্ষযোগ্য যা নিয়ত প্রত্যক্ষ, তাকে অবলম্বন করেই এর কাহিনি বিস্তারিত হয়েছে-শওকত আলী লিখেছেন-‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রত্যক্ষ, স্থূল, এবং আবয়বিক বাস্তবতার দাবি অস্বীকার করবেন কোন যুক্তিতে? ক্ষুধা লাঞ্ছনা ও দাসত্বের ভারে প্রত্যক্ষত যে-জীবন পিষ্ট এবং ন্যুব্জ, সেই জীবনের আবয়বিক চেহারাটিকে কি পাশ কাটানো যায়? অবশ্যই যায় না। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পাশ কাটাননি-অন্তত তাঁর প্রথম উপন্যাসে তো নয়ই।’...‘একটি চরিত্র যেভাবে তার জগৎ দেখে, লেখকও সেইভাবেই দেখেন এবং দেখিয়ে একটি জীবন সত্যের দিকে ইঙ্গিত করতে চান।' লালসালু উপন্যাসের ক্ষেত্রে তাঁর কথা একদম অক্ষরে-অক্ষরে ঠিক আর এই ধরনের উপন্যাসের বেলায় তার বাস্তবতার চাপে (জীবন-)সত্যের ইঙ্গিতও নির্দিষ্ট হতে বাধ্য এবং দূরে রয়ে যায় বহুস্বর ও বহুঅর্থ-এর সম্ভাবনা। মিখাইল বাখতিন তাঁর ঞযব ঢ়ৎড়নষবসং ড়ভ উড়ংঃড়বাংশু’ং ঢ়ড়বঃরপং গ্রন্থে দস্তয়েভস্কির উপন্যাসের চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে লিখেছিলেন তাঁর সব প্রধান চরিত্রের ভাবনার উৎস হলো অস্বার্থপরতা, তাদের ব্যক্তিত্বের গভীরতম কেন্দ্র এই প্রবণতার বশবর্তী; তাই খুনী ও লুঠেরা রাসকলনিকভ, বেশ্যা সোনিয়া, নিজের পিতার হন্তারক ইভান-এরা কেউই স্বার্থপর নয়, আর এই সূত্রেই এরা পৃথক পৃথক স্বর-বহুস্বর । উপন্যাসে এ-কথার সপক্ষ উদাহরণ তৈরি হতে পারে মনোজগতের বাস্তবতার ভিত্তিতে, অন্য বাস্তবতায় নয়, আর, তা হলে, সদর্থ নঞর্থ যে-কোনো চরিত্রই পেতে পারে স্বতন্ত্র ‘মমতা’ ও মর্যাদা। লালসালু উপন্যাসের মজিদ যে পাঠকের মমতা পায় না, তা ওই মনোজাগতিক বাস্তবতার অভাবে। কিন্তু সৈয়দ আলী আহসানকে করা উক্তিতে ওয়ালীউল্লাহ্'র যে-মনোভাব প্রকাশ পায় তাতে বোঝা যায় লালসালুর মজিদকে কার্যকারণ-এর কাছে নিরূপায়রূপে হাজির করাই ছিল তার উদ্দেশ্য, কিন্তু উপন্যাসটি যতই সফলতা পাক না কেন তাঁর এ-উদ্দেশ্য সফল হয়নি। তারপরও একথা বলা যায় লালসালু-পরবর্তী উপন্যাসগুলো যে-রীতি ও আবহে রচিত, সেখানে মজিদের মতো চরিত্রও ঠিকই মমতা আদায় করে নিত। কারণ, ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর উপন্যাসে যে- বহুস্বরিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চান তার জন্য পরবর্তী উপন্যাসগুলোর বিষয় ও রীতি দুটোই ছিল উপযুক্ত। শেষের উপন্যাসগুলোর জগৎ ‘প্রত্যক্ষ, স্থূল, আবয়বিক বাস্তবতা’ এবং ‘ক্ষুধা লাঞ্ছনা ও দাসত্বের’ জগৎ নয়, এ-জগৎ মনস্তত্ত্বের জগৎ, কাব্যময় ভাষায় তৈরি আলো-আঁধারির জগৎ যার ভিত তৈরিতে কাজ করেছে দর্শনসূক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসা। সেজন্য লালসালুর পির মজিদ যেখানে নির্মমতার দায় বহন করছে, সেখানে চাঁদের অমাবস্যার দরবেশ কাদের একটি খুন করা সত্ত্বেও পাঠকের চোখে দোষী সাব্যস্ত হয় ঠিক, তবু তাকে ঘৃণ্য-চরিত্ররূপে যাতে না ভাবা হয় সেরকম সমান্তরিত বর্ণনাও সেখানে কম নয়। এই ভাবে চরিত্রগুলোকে নানা কার্যকারণ-সূত্রে বেঁধে আপেক্ষিকতার মর্মে দাঁড় করিয়ে-দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাসে, তাঁর আকাঙ্ক্ষার প্রাণভোমরাও সেখানে-লালসালুর গৎ-বাঁধা ছকে এই চিন্তার প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব না-হলেও, চাঁদের অমাবস্যায় তাই হয়েছে, আর সেই আকাঙ্ক্ষা রীতিমতো উচ্চাকাঙ্ক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে যে-উপন্যাসে তার নাম কাঁদো নদী কাঁদো।

চাঁদের অমাবস্যার কাদেরও এক (মিথ্যে) ‘দরবেশ’, তাকে দরবেশ হিসেবে কেউ মানে কি না সেটি বড় কথা নয়, তবু তার দাদা তার চারিত্রিক অদ্ভুতত্ব ও দুর্বোধ্যতার কারণে- হয়তো তার দুষ্কর্ম ঢেকে রাখবার জন্য (অবশ্য সে-বিষয়ে কোনো সবিস্তার বর্ণনা উপন্যাসে নেই)-তাকে সেই রূপে পরিচিত করতে আগ্রহী। চাঁদের অমাবস্যার যুবক শিক্ষক আরেফ এক জ্যোৎস্নাপ্লাবিত শীতের রাতে কাদেরকে দেখে আপন খেয়ালে তাকে অনুসরন করতে শুরু করে এবং একসময় হারিয়েও ফেলে, পরে বাঁশবনের মধ্য থেকে চাপা ভারী কণ্ঠে কথা-বলার আওয়াজ শোনে, কিছুক্ষণ পর আলো-আঁধারে এক যুবতী নারীর অর্ধউলঙ্গ মৃতদেহ দেখতে পায়, আরও পরে, তার সামনে কাদেরকে দেখে এবং বুঝতে বাকি থাকে না মৃত যুবতীর হত্যার কারণ কে। ‘হত্যার কারণ’ কথাটি স্পষ্ট ও জোরের সঙ্গেই বলতে হচ্ছে-‘হত্যার কারণ’, শুরুতে ‘হত্যাকারী’ শব্দটির উল্লেখ থাকলেও চিন্তাগত ক্ষেত্রে ‘হত্যাকারী’ ভাবা হয় না তাকে-কেননা স্কুলশিক্ষক আরেফের মনে এই দুই-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব শুরুতে অস্পষ্ট থাকে বলেই উপন্যাসের পৃষ্ঠা বাড়তে থাকে। একটি যুবক একটি যুবতীকে হত্যা করেছে, এর মধ্যে অন্য কোনো চিন্তার যোগ/জট না থাকলে সেই ঘটনার দ্রষ্টা আরেফ তার জীবনজীবিকার তোয়াক্কা না করে প্রথমেই থানায় গিয়ে হাজির হতো, কিন্তু ঘটনাটি সেরকম নয়, আর সেরকম নয় বলেই এর লেখক আরেফের আত্মগত ভাবনার ‘সুযোগ গ্রহণ করে’, এর মধ্য দিয়ে বহুস্বরের অস্তিত্ব বা ব্যক্তিসাপেক্ষ (পৃথক-পৃথক) স্বর ও সত্যের সন্ধান চলতে থাকে-বলার দরকার পড়ে না যে লেখকের আকাঙ্ক্ষার জায়গাটিও সেখানে। আরেফ কেন বারবার প্রত্যক্ষ বাস্তবের মাধ্যমে হত্যাকারীকে চিহ্নিত-করার সহজ পথে না-গিয়ে তার কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছে, এর কারণ হিসেবে জীবিকার প্রসঙ্গটি এনেছেন একজন আলোচক : ‘সে চেষ্টা করে হত্যাদৃশ্যটি ভুলে যেতে। সে ভাবে, নিহত নারীটিকে সে চেনে না। ঘটনাটিকে নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দিতে চায়। সে জানে, হত্যাকাণ্ডটির কথা প্রকাশ করলে কাদেরের শাস্তি অনিবার্য। আর তাতে আরেফও হারাবে বড়বাড়ির নিশ্চিত আশ্রয়’। -কথাটি অঠিক নয়, তবু একথাও ঠিক যে, এ-প্রসঙ্গটি বাধা হিসেবে যেমন উল্লিখিত, তেমনি উপন্যাসের অন্যত্র তা এসেছে সত্যপ্রকাশের অনিবার্যতাকে তীব্র করে তোলার জন্য। লেখকের বয়ানটি উল্লেখ করলে তা আরও স্পষ্ট হবে :

যুবক শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেউ কোন অভিযোগ না আনলেও কথাটি প্রকাশ করার পর তাকে বড়বাড়ীর আশ্রয় এবং ইস্কুলের শিক্ষকতার চাকুরীটি ছাড়তে হবে, তারপর এখানে থাকতে তার বিবেকে বাধবে। তখন সে কোথায় যাবে? কোথায়ই-বা এমন লাভজনক চাকুরী বা দাদাসাহেবের মত এমন স্নেহ-দয়াশীল অভিভাবক পাবে?

তবু কথাটা প্রকাশ না করে উপায় নাই। উপায় থাকলে সে বলতো না। বাঁশঝাড়ে একটি নারী অর্থহীনভাবে জীবন দিয়েছে। তার বিশ্বাস, মানুষের জীবন এত মূল্যহীন নয়। না, সত্যই তার উপায় নাই।

যুবক শিক্ষকের শীর্ণ মুখ শুষ্ক কাঠের মত নীরস-কঠিন মনে হয়। সে-মুখ কখনো যেন হাসবে না কাঁদবে না।

বাঁশঝাড়ে একটি নারীর মৃত্যুর ঘটনাকে কাদের একটি ‘দুর্ঘটনা’ বলে উল্লেখ করে আরেফকে নিরস্ত করতে চেয়েছিল, যদি আশ্রয়হারানোর পরিণতি তাঁর কাছে বড় হতো, তাহলে এই ‘সুযোগ’-এ সে আনুষঙ্গিক যুক্তি সাজিয়ে ঘটনা থেকে বেরিয়ে যেতে পারত-চুপ মেরে ঘটনা থেকে পালাতে পারত। ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর ফরাসি প্রকাশককে লিখিত একটি চিঠিতে চাঁদের অমাবস্যা-বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছিলেন : ‘আমি যেটা বলতে চাই তা হলো, সেই অশুভ কর্মটি বা সেই অপকর্মের হোতা, কেউই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সবচেয়ে জরুরি হলো এরকম একটি অপকর্মের বাইরের মানুষটির আচরণ। এটি এমন এক সমস্যা যা ভয়ঙ্কর মাত্রা পাচ্ছে। যুবক শিক্ষকটি এই অপরাধের কাছ থেকে পালায় না, সে পালায় তার আবশ্যিক সিদ্ধান্তগ্রহণ সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্ব থেকে।' এই কারণে সে ঘটনার আরও গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছে-সে কাদেরকে বলে : ‘একটা দুর্ঘটনার কথাই আপনি শুধু বলেছেন। আর কিছু বলেন নাই।’ এর উত্তরে কাদের জানায় যে, সে জানে না তার আর কী বলবার আছে, তখন আরেফকে আবার বলতে হয় ‘বললাম তো! মেয়েলোকটির জন্যে আপনার মায়ামহব্বত ছিলো সে-কথা একবারও বলেন নাই।’ বাক্যের ধরনে এ-বার্তাটি স্পষ্ট যে, সে ধরেই নিয়েছে মেয়েটিকে কাদের ভালোবাসে, কিন্তু পরে, কাদেরের ভাবান্তরে, ঘৃণা ও বিস্ময়ভরা কণ্ঠ শুনে আরেফ বোঝে ‘কাদেরের পক্ষে দরিদ্র মাঝীর বউয়ের প্রতি ভাবাবেগ বোধ করা সম্ভব নয়’। এতে খুবই মর্মাহত হয় আরেফ-এ-প্রসঙ্গে লেখকের বর্ণনা :

না কাদের যে প্রেমিক নয় সে-কথাই তার দুঃখের কারণ নয়। আসল কারণ এই যে, একটি যুবতী নারী নিতান্ত অর্থহীনভাবেই প্রাণ হারিয়েছে। তার মৃত্যুতে কাদেরের মনে একটু দুঃখবেদনা জাগে নাই। শূন্য হৃদয়ে দুঃখ-বেদনা জাগে না। কাদেরের হৃদয়ের শূন্যতার জন্যেই যুবতী নারীর মৃত্যুটা একটি নির্মম হত্যা ছাড়া আর কিছু নয়।

লেখকের বর্ণনায় এ-কথা স্পষ্ট, যুবতী নারীর মৃত্যু অর্থহীন হয়ে উঠেছে তার জন্য কাদেরের মনে দুঃখবেদনা জাগেনি বলে-এই কারণে এই মৃত্যু একটি নির্মম হত্যা, আর, তা থেকে এই সিদ্ধান্তে সহজেই পৌঁছোনো যায় যে, তার দ্বারা মৃত্যু সংঘটিত হলেও কাদের যদি নারীটির প্রতি প্রেমময় হতো তাহলে হত্যাটি নির্মম হতো না, তখন হয়তো হত্যার দৃশ্যমান যে কারণ/কাদের, তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রসঙ্গটি উপন্যাসে আরও বিস্তারিত হতো।

এই চিন্তা সাধারণ চিন্তা নয়, বিশেষ চিন্তা-দর্শনগত চিন্তা। এই চিন্তা যে আরেফ করে তাকে সাধারণের পক্ষে ‘পাগল’ ঠাহরানোই স্বাভাবিক, কাদেরও তো তা-ই করেছে, কিন্তু এই চিন্তা যাকে কেন্দ্র করে তার মধ্যে আরেকটি স্বতস্ত্র স্বর আবিষ্কার করতে চেয়েছে সে, খুঁজে পেতে চেয়েছে আরেকটি সত্যের সম্ভাবনা যেখানে মৃত্যুর চেয়েও প্রেম বড়, মমতা বড়। কিন্তু শেষপর্যন্ত কী হলো? মিলান কুন্ডেরা তাঁর বক্তৃতায় টলস্টয়ের আন্না কারেনিনা বিষয়ে উল্লেখ করেছিলেন ‘লিখতে লিখতে ব্যক্তিগত নৈতিক বিশ্বাসের বদলে অন্য এক কণ্ঠস্বর শ্রবণ করেছিলেন তিনি। তিনি শ্রবণ করেছিলেন, বলতে ইচ্ছে করছে, উপন্যাসেরই প্রজ্ঞাবাণী। সকল প্রকৃত ঔপন্যাসিকই সেই অতিব্যক্তিক প্রজ্ঞাবাণী শুনে থাকেন, মহৎ উপন্যাসমাত্রেই সবসময়েই কেন তাদের স্রষ্টার চেয়েও মহত্তর যা থেকে সেই ব্যাখ্যাই পাওয়া যায়। সৃষ্টির চাইতেও বিজ্ঞতর যে ঔপন্যাসিক, অন্যতর কর্মেই নিজেকে নিজেকে নিয়োজিত করুন তিনি বরং।' কিন্তু এই অন্য কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে আন্না কারেনিনার প্রাথমিক খসড়ার অনেক কিছু বর্জন করেন টলস্টয়। ওয়ালীউল্লাহ্ যা করলেন-অন্য স্বরকে অস্তিত্বহীন করে দিয়ে আরেফকে আদালতের দিকে ঠেলে দিলেন; এবার চন্দ্রগ্রস্ত আরেফ দিবালোকে ফিরে আসে, চাঁদের অমাবস্যার কারণে ঘটনার মধ্যে আগে সে যে-জটিলতা দেখেছে এখন আর তা দেখে না :

কয়েক মাস আগে বিবাহিত এবং ভদ্রবংশীয় সে-নিষ্কর্মা মানুষটি তাদের গ্রামেরই একটি দরিদ্র মাঝীর সন্তানহীনা যুবতী স্ত্রীর সঙ্গে কোন প্রকারে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে।...অবস্থা অনুকূল হলেই কাদের যুবতী নারীর সঙ্গে গোপনে দেখা-সাক্ষাৎ করে।...ধর্মনীতিবিরুদ্ধ অবৈধ মিলনের কারণ কি? যুবতী নারী আজ মৃতা। তার মনে কি ছিলো তা আজ জানা সম্ভব নয়। তবে তার সঙ্গে কাদেরের সম্পর্কের কারণ নিঃসন্দেহে বলা যায়। সে-কারণ ইন্দ্রিয়পরায়ণতা।

বোঝা যায়, কাদের সম্পর্কে ‘অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন’, ‘ধর্মনীতিবিরুদ্ধ অবৈধ মিলন’ এবং ‘ইন্দ্রিয়পরায়ণতা’র অভিযোগ ওঠার কারণ সে নিষ্প্রেম, তার হৃদয় শূন্য-এর পক্ষে অনেক যুক্তি হাজির করা সম্ভব, কিন্তু প্রেম নেই বলে যে উৎকটতা ও উগ্রতার সঙ্গে ‘অবৈধ’ ‘ধর্মনীতিবিরুদ্ধ’ ‘ইন্দ্রিয়পরায়ণতা’ ইত্যাদি শব্দগুলো উচ্চারিত হয়েছে তা এই দর্শনগর্ভ উপন্যাসের জন্যে বেমানান। শিবনারায়ণ রায় চাঁদের অমাবস্যার শৈলীকে সূক্ষ্ম আর তাঁর চরিত্রকে প্রমিতাক্ষরিত বলে অভিহিত করলেও, পরিমিতির দিক থেকে উপন্যাসের বারোতম পরিচ্ছেদকে এ-উপন্যাসের দুর্বলতম পরিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য করতে হয়-আরেফকে আদালতের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য উপন্যাসে পূর্ববর্ণিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং শাস্ত্রীসুলভ চিন্তার আরোপ এ-পরিচ্ছেদকে আরেফের ক্ষোভ-প্রশমনের ক্ষেত্ররূপে পরিচিত করেছে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এ-উপন্যাস সম্পর্কে ওয়ালীউল্লাহ্'র সঙ্গে রশীদ করীমের যে-আলাপ হয়েছিল এখানে তার উল্লেখ করা যেতে পারে :

‘চাঁদের উপন্যাস’ পড়েছো?

‘হ্যাঁ।’

‘কেমন লেগেছে?’

‘গা ছমছম করানো এক উপন্যাস’ বললাম আমি। সেই সঙ্গে আমার আপত্তির কথা জায়গাগুলোও বললাম।

‘এর মধ্যে কিছুই কি তোমার পছন্দ হয় নি?’

‘হ্যাঁ, অনেক কিছু ভালো লেগেছে। বইটি যখন পড়ি, মনে হয় আপনি যেন হাত ধরে মানুষের মনে অন্ধকার অলিগলিতে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। খুব ভয়ঙ্করভাবে হাত চেপে ধরে আছেন। একটুও আলগা করছেন না।’

এগারোতম পরিচ্ছেদ পর্যন্ত রশীদ করীমের কথাটি ঠিক, কিন্তু বারোতম পরিচ্ছেদে এসে সেই হাতটি ছেড়ে দেন ওয়ালীউল্লাহ্ এবং চাঁদের অমাবস্যাও কেটে যায়। অ্যান-মারি যে বলেছিলেন প্রাণসংশয়ের আশঙ্কা সত্ত্বেও নিজের কাছে বিশ্বস্ত, সাক্ষী হওয়ার দায়িত্বপালনকারী একজন সদাশয় সৎমানুষের কাজের খোঁজ পাওয়া যায় আরেফের চরিত্রে, তার পরিচয় উপন্যাসের এই অংশেই-যেটি নীতিগত ক্ষেত্রে বিয়োগান্তিক বটে, কিন্তু দর্শন ও উপন্যাসগত বিচারে নীতিতাড়িত ও ক্লান্তিকর। তবু সার্বিক বিচারে শিবনারায়ণ যে এই উপন্যাসে ‘সব মহৎ রচনার মতো...একটি সার্বকালিক ও সার্বজনিক গূঢ়ার্থ’ খুঁজে পেয়েছেন তা মেনে না নিলে এই মহৎ ঔপন্যাসিকের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ করা হয়। শিবনারায়ণের কথাটি চাঁদের উপন্যাস-এর ক্ষেত্রে করা হলেও, সার্বকালিক ও সার্বজনিক গূঢ়ার্থ-এর যথার্থ সমন্বয় ঘটেছে কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসে এবং এ-ক্ষেত্রে একথাটিও যোগ করতে চাই যে, এই উপন্যাসটিই হলো তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিণত রূপ।

চাঁদের অমাবস্যা প্রকাশের চার বছর পর ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় ওয়ালীউল্লাহ্'র তৃতীয় উপন্যাস কাঁদো নদী কাঁদো, তার দুই দশক পরে লিয়াকত আলী তাঁর 'ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাস : পাশ্চাত্য প্রভাব' প্রবন্ধে লিখেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর উপন্যাসের বিষয় ও আঙ্গিক উভয় কারণে মুষ্ঠিমেয় সমালোচকদের মধ্যে আলোচিত, এর মধ্যে চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসের আলোচনায় নিন্দার দিকটাই ভারী-তাঁর মতে, সৈয়দ আবুল মকসুদের ‘গড়পড়তা প্রশংসা’ আর চাঁদের অমাবস্যার ক্ষেত্রে শিবনারায়ণ রায়ের সদর্থক আলোচনা ছাড়া অধিকাংশ আলোচকই তাঁর রচনারীতি ও সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে আচ্ছন্ন, দুর্বোধ্য ও বিজাতীয় বলে উল্লেখ করেছেন; কেউ বলেছেন ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসে ভাষা ও চরিত্র-চিত্রণের কৌশলগত চমৎকারিত্বেরই প্রাধান্য এবং এদেশের পরিবেশ ও আবহাওয়ার অনুপস্থিতিও সেখানে প্রকট, কেউ কেউ পেয়েছেন রহস্যোপন্যাসের স্বাদ, যে-কারণে উপন্যাস দুটির শিল্পমূল্য হয়েছে উপেক্ষিত। এর পর তিনি আবু রুশদের নিম্নোক্ত মন্তব্যটি উদ্ধৃত করেছেন :

তিনি দেশে বহুদিন ছিলেন না বলে বিদেশী নিসর্গ দেশজ আবহাওয়ার সঙ্গে তাঁর অনেক রচনার অনেক জায়গায় মিলে গিয়ে লেখকের সূক্ষ্ম বৈপরিত্ব সৃষ্টির প্রয়াসকে পুরোপুরি সফল হতে দেয়নি। তাঁর ভাষাকে মন্থর করে তুলেছে। তাঁর প্রতীক সমর্পিত মানসকে কাফকা ও ক্যামুর প্রভাবে বড় বেশি জড়িয়ে তাঁর শৈল্পিক স্বাস্থ্য ও স্বাতন্ত্র্য লক্ষ্যযোগ্যভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।

উদ্ধৃত মন্তব্যে বিদেশী প্রভাবের কথাটি স্পষ্ট-এই প্রভাবের কারণে শৈল্পিক স্বাস্থ্য ও স্বাতন্ত্র্য বিঘ্নিত হওয়ার কথা স্পষ্ট করে লিখেছেন আবু রুশদ। অন্যত্র, হাসান আজিজুল হকও উল্লেখ করেছিলেন বিদেশী প্রভাবের কথা :

আমার মনে হয় না যে ‘চাঁদের অমাবস্যা’র অনুসন্ধানগুলি আমাদের দেশ ও সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে অবধারিতভাবে প্রাসঙ্গিক। তখনই স্পষ্ট হয় ওয়ালীউল্লাহ্'র উপর কামুর নাছোড় প্রভাব। নাছোড় এজন্যে যে পরের উপন্যাস ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ আমাদের পক্ষে আরো দূর এবং ‘দি প্লেগ’-এর সঙ্গে এর গভীর সাদৃশ্য প্রায় সন্দেহাতীত। এই উপন্যাস দুটি লিখে ওয়ালীউল্লাহ্ নিঃসন্দেহে আমাদের কথাসাহিত্যের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি করেছেন, ভাষায় এসেছেন অকল্পনীয় ধার, তাঁর নিরাসক্তি প্রায় ঈশ্বরের মতোই অর্থাৎ শূন্যতার জয়গান। কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি আর বাংলাদেশ ও বাঙালির ঔপন্যাসিক থাকেন না। মনোভাবেই নয় শুধু, উপন্যাসের স্থূল শরীরেও প্রবিষ্ট হয়ে ঘটায় বিদেশী উপস্থিতি।

হাসান অবশ্য সরাসরি সে-কথা বলেননি, তবু ভাষা-বিষয়ে সপ্রশংস উল্লেখ সত্ত্বেও তাঁর বাক্যের লক্ষ্যও তাই। তবে তিনি যে উল্লেখ করেছেন ‘শেষপর্যন্ত তিনি আর বাংলাদেশ ও বাঙালির ঔপন্যাসিক থাকেন না’, তা বলার অনেক কারণ ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাসে আছে, বিশেষত যে-সমাজবাস্তবকে অন্তরঙ্গ ও শিল্পময় করে তোলার জন্য হাসান আজিজুল হক আজ আমাদের শ্রদ্ধেয়, ওয়ালীউল্লাহ্'র লালসালু-পরবর্তী লেখায় সে-‘সমাজবাস্তব’-এর পরিচয় প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু কথা অন্য জায়গায়-এই বাস্তবতার অভাবে ওয়ালীউল্লাহ্'র লেখকসত্তা ক্ষুণ্ণ হয় কি না, বা ‘অবধারিতভাবে’ তিনি বাংলাদেশি বা বাঙালি ওপন্যাসিক হতে চেয়েছিলেন কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন। চাঁদের অমাবস্যা প্রকাশিত হওয়ার পরই তো ফ্রান্সে ওয়ালীউল্লাহ্'র সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন রশীদ করীম এবং কথায়-কথায় বলেছিলেন, ‘বইটি পড়ে কিছুটা কাফকা আর কিছুটা কামুর কথা মনে আসে’, এ-কথার পিঠে কোনো কথা না বলে, একটু হেসে অন্যকথায় চলে গিয়েছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্। আন্দাজ করতে পারি, এমন মন্তব্য আরও অনেকেই করে থাকবেন, তিনি নিজেও এই বিষয়ে অ-চেতন, এমন মনে করারও কোনো কারণ নেই, কেননা এই সময়েই তো লিখছিলেন তাঁর তৃতীয় উপন্যাস কাঁদো নদী কাঁদো, এবং সেটি পড়েও যে পাঠকেরা এমন কথা বলবে তাও হয়তো তিনি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন; কিন্তু তারপরও তিনি তাঁর কাজে ছিলেন অবিচল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এমনিতে পাঠক-প্রতিক্রিয়ার প্রতি আর-দশজন লেখকের মতো তিনিও ছিলেন কৌতূহলী, রশীদ করীমের সঙ্গে আলোচনা তো তারই পরিচয়বহ, কিন্তু এরপরও একজন মহৎ লেখকের যে-স্থৈর্য্য ও ঔদাসীন্য থাকা দরকার তা শতভাগই ছিল তাঁর, না হলে সেদিনের সাক্ষাৎকারে রশীদ করীমের এত-এত নঞর্থক মন্তব্যে অন্তত একবার হলেও অস্থির বা নিজের কাজের পক্ষে ঊনলেখকসুলভ পাল্টা যুক্তি খাড়া করতেন ওয়ালীউল্লাহ্, কিন্তু তিনি তা না করে অনুজ লেখককে অবাধে কথা বলতে দিয়েছিলেন-দেখা গেল কাঁদো নদী কাঁদোর টাইপ-করা কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে রশীদ করীম বললেন, ‘যা পড়লাম তা খুব একটা ভালো লাগলো না’ বললেন, ‘ভাষা ঝাঁকি খেতে খেতে এগোয়, ঠিক যেন কাদায় আটকে পড়া কোনো গাড়ির ঘুরন্ত চাকা, হঠাৎ হঠাৎ সামনে ছুটে। ভাষার গতি মোটেও মসৃণ নয়। আর এ ভাষা খামোকাই ভারাক্রান্ত। ন্যারেটিভেও কিছুটা অগোছালো ভাব রয়েছে।’ যে-কোনো লেখা ভালো না-লাগার প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার সকল পাঠকেরই থাকে, রশীদ করীমেরও আছে, কিন্তু একটি উপন্যাসের পূর্ণ-অভিব্যক্তি উপলব্ধি করার আগেই তার কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ে ভাষা ‘খামোকাই ভারাক্রান্ত’, ‘ন্যারেটিভেও কিছুটা অগোছালো ভাব’ ইত্যাদি বলার অধিকার অবশ্যই তাঁর ছিল না, কিন্তু তিনি তাই করেছিলেন, ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর জবাবে স্বাভাবিকভাবে উপন্যাসগত অভিপ্রায়ের কথা বলতে পারতেন, তুলতে পারতেন চেতনাপ্রবাহ-রীতির কথাও যা তাঁর ঔপন্যাসিক-অভিপ্রায়েরই অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু (রশীদ করীমের কথায়) ‘ওয়ালীউল্লাহ্‌ কোনো মন্তব্য করলেন না।’ হয়তো, ধারণা করি, কুন্ডেরা-বণিত ঈশ্বরের হাসি শুনেছিলেন ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা ওয়ালীউল্লাহ্ও, কারণ, তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার আড়ালে রয়েছে যে-আত্মবিশ্বাস তাতেই তাঁর সেই ভবিষ্যৎ দেখতে পারছিলেন-যেখানে বাঙালি পাঠককে ঝাঁকি খেতে-খেতে তাঁর উপন্যাসকে বুঝতে হচ্ছে। এ-কথার পক্ষে শওকত আলীর ওয়ালীউল্লাহ্-বিবেচনা আমাদের প্রাসঙ্গিক হতে পারে-২০০৩ সালে প্রকাশিত শওকত আলীর প্রবন্ধ বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন :

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্'র প্রথম বই বের হয় ১৯৪৮-এ, কলকাতা থেকে। কিন্তু তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস বা নাটক নিয়ে তেমন আলোচনা হতে দেখা যায়নি। ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে তাঁর চাঁদের অমাবস্যা এবং তারপরে কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাস দু’খানি প্রকাশিত হলে আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ি। মাটি আর মানুষের উপাদান নিয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুনতর আঙ্গিক প্রয়োগ করে আমাদের উপন্যাস সাহিত্যকে যে আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে তা আমরা সবাই বুঝতাম না। বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়েছে এবং সে কারণে আমাদের লেখালেখিও করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তাই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাস নিয়ে লেখা প্রবন্ধটি এ বইয়ের অনেকখানি জায়গা দখল করে রেখেছে।

শওকত আলীর এই উপলব্ধি একজন একাপাঠকের উপলব্ধি নয়, ওয়ালীউল্লাহ্ জানা-অজানা অসংখ্য পাঠকের মনের কথাটি এই কয়েকটি বাক্যে ফুটে উঠেছে। তাঁর চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাস ও কিছু গল্পের ভাষা-বিষয়ের যে-যুগলরূপ, তার গড়নটাই এমন যে, তাঁর লেখা পড়ামাত্র পাঠককে-তিনি তাঁর লেখা পছন্দ করুন আর নাই করুন-বিহ্বল আর অভিভূত হয়ে পড়তে হয়, পরে সেই অভিভূতি থেকে বের হয়ে পাঠককে তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করতে হয়, সিদ্ধান্তে যেতে হয়, সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হয়, কারণ পড়া শেষ হয় না, বা আপাত শেষ হয়ে গেলেও, মনের মধ্যে পাঠের ক্রিয়া চলতে থাকে নিরন্তর-সত্য কথা বলতে গেলে, লেখকের আকাঙ্ক্ষা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রটিও সেখানে। এ-প্রসঙ্গে কারও কারও মনে পড়ে যেতে পারে ফ্রানজ কাফকার লেখা সম্পর্কে আলবেয়ার কামুর সেই মন্তব্যটি যেখানে তিনি বলেছিলেন, কাফকার সমগ্র শিল্প এমনভাবে গঠিত যে, তা পাঠককে বারবার পড়তে বাধ্য করে : ‘তাঁর সমাপ্তি বা সমাপ্তিতে তাঁর অনুপস্থিতি’র ব্যাখ্যা দিতে বলা হলে স্পষ্ট ভাষায় সেই ব্যাখ্যা প্রকাশ পায় না, তবু যুক্তিযুক্ত মনে হয়; গল্পে এমন কিছু থাকে যার জন্য পুনর্পাঠ করতে হয় এবং একাধিক অর্থের সম্ভাবনা দেখা দেয়। শওকত আলীর ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাস’ শীর্ষক সবিস্তার প্রবন্ধটিও এরকম একাধিক/বারবার পাঠ-প্রতিক্রিয়ার ফল। তাঁর প্রবন্ধে ওয়ালীউল্লাহ্'র তিনটি উপন্যাসের মধ্যে লালসালুর খুব কম দৃশ্যই আছে যেখানে তিনি চোখ ফেলেননি; একই কাজ করতে চেয়েছেন বাকি দুটি উপন্যাসের ক্ষেত্রেও, কিন্তু এগুলোর বহুস্বরিক গুণের কারণেই আরও বহু কিছু অনালোচিত রয়ে যায় এবং সেটাই স্বাভাবিক। এই বই দুটির যে-দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন শওকত আলী, তার মাধ্যমে তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যা ওয়ালীউল্লাহ্'র জন্য সম্মানজনক কি না সহজে বোঝা যায় না-তিনি লিখেছেন, উনিশ শতক থেকে রবীন্দ্র-পরবর্তী সাহিত্যের ধারার সঙ্গে ওয়ালীউল্লাহ্‌-কে মেলানো সম্ভব নয়, বাংলা সাহিত্যে তিনি একক, তাঁর পথে তিনি একাকী এবং এ-প্রশ্ন তোলা অনুচিত জ্ঞান করেও উল্লেখ করেছেন, ‘আদৌ কি তিনি বাংলা সাহিত্যের পরিমণ্ডলের লেখক?' অবশ্য এই লেখায় তিনি যে-ভাবে ওয়ালীউল্লাহ্'র বই দুটি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এর অনেক সদ্গুণ-বিশেষত চাঁদের অমাবস্যার-খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন তাতে উক্ত মন্তব্যকে সদর্থক বিবেচনা করাই সঙ্গত। এরপরও দুটি উপন্যাসের আলোচনা শেষে তিনি পাঠকদের তরফ থেকে কিছু প্রশ্ন তুলতেও ভোলেননি। চাঁদের অমাবস্যার আলোচনা শেষে যুবক শিক্ষক আরেফের সত্তা-আবিষ্কারের প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ব্যক্তির এই আবিষ্কার সর্বজনীন নয়-আরেফ একজন না হয়ে দু-জনও হতে পারে, আর তা যদি হয়, তো, বিচ্ছ্ন্নি ব্যক্তির মনোলোকে নিমজ্জিত হওয়ার মধ্যে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করার ইঙ্গিত থাকে কি না; আর কাঁদো নদী কাঁদো নিয়ে আলোচনার শেষের দিকে লিখেছিলেন, ‘ওয়ালীউল্লাহ কোনো জীবনের শিল্পী? প্রত্যক্ষ জীবনের, না পরোক্ষ জীবনের, মৃত্যুমুখী জীবনের, না জীবনমুখী জীবনের? কারণ জীবনশিল্পী উপন্যাস-লেখকের শিল্পরচনার চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এ প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই’-এই প্রশ্ন জাগবার কারণ ভাঙা, দোমড়ানো-মুচড়ানো, আচ্ছন্ন, ভীত ও আক্রান্ত মানুষই হলো ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাসের চরিত্র, এদেরকে কখনোই সম্পূর্ণ মানুষরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায় না। কিন্তু এই সব প্রশ্ন-অনুযোগ-অভিযোগ যাই বলি না কেন, তা কি ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাসের দুর্বল কোনো দিক? ওয়ালীউল্লাহ্ কি এই সব বিষয়ে সচেতন ছিলেন না? এ-সূত্রে আবার সেই কথায় চলে যাওয়া যেতে পারে যে ওয়ালীউল্লাহ্ ‘অবধারিতভাবে’ এবং আক্ষরিক অর্থে, বাংলাদেশি বা বাঙালি ঔপন্যাসিক হতে চেয়েছিলেন কি না, আবার ফিরে আসা যেতে পারে সেই প্রসঙ্গেও, তিনি ‘জীবনমুখী জীবনের’ শিল্পী হতে চেয়েছিলেন কি না-এই সব। এ-বিষয়ে স্বাক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে তাঁর স্ত্রী অ্যান-মারি ওয়ালীউল্লাহ্ :

সফোক্লিসের মতো প্রাচীন গ্রিক লেখকই হোক আর ফরাসি ভলতের বা বাঙালি হিন্দু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই হোক, বিশ্বনাগরিক হিসেবে পৃথিবীর সব সাহিত্যকে ও নিজের সাহিত্য বলে গণ্য করত। তাদের চিন্তা, তাদের পদ্ধতি বা তাদের কাছ থেকে যা কিছু সে আদায় করতে পেরেছে, তার সবই সে নিজের সংস্কৃতি ও মানুষ-পূর্ববাংলার মুসলমান কৃষকদের ওপর প্রয়োগ করত।...পশ্চিমা আর অপশ্চিমা সাহিত্যের মধ্যে ও কোনো তফাৎ করত না। জাপানিই হোক আর ইতালীয়ই হোক, হোক তা প্রাচীন বা আধুনিক, বিশ্বের সব সাহিত্যকে ও মানুষের অভিন্ন উত্তরাধিকার বলে গণ্য করত।

অ্যান-মারির মন্তব্যে এ-কথাটি স্পষ্ট যে ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর সাহিত্য-রচনার ক্ষেত্রে বিদেশি সাহিত্যের তত্ত্ব ও সদ্গুণের মর্ম গ্রহণে ঠিক কী মনোভাব পোষণ করতেন, সেই সঙ্গে এই আন্দাজও করা যায় একই বিষয়ে রশীদ করীমের মন্তব্যের বিরোধিতা তিনি কেন করেননি। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে যে-কথাটি মনে না রাখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয় তা হলো : যে-অন্তর্দৃষ্টির আলোকে তিনি বিদেশি সাহিত্যের মর্ম গ্রহণ করেছিলেন তার সঙ্গে গভীরভাবে মিশেছিল স্বদেশকেন্দ্রী দূরদৃষ্টির প্রজ্ঞা ও প্রতিভা। তাঁর সৃষ্টিকর্মে এই অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল দীর্ঘদিনব্যাপী বিদেশে থেকে ‘দেশ’কে আরও গভীরভাবে আরও তাৎপর্যের সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন বলে। এ-ছাড়া কোনো জায়গা নিয়ে কিছু লিখতে গেলে সেই জায়গা থেকে দূরত্বে থাকাটাকে জরুরি মনে করতেন তিনি-আমাদের প্রচল্-বার্তায়-অভ্যস্ত কানে উক্তিটি যে-রকমই শোনাক, ফ্রান্সকে নিয়ে কেন লিখছেন না এ-প্রশ্নের জবাবে এমন কথাটিই বলেছিলেন ওয়ালীউল্লাহ্। এই দূরত্ব ভৌগোলিক দূরত্ব, মনের দূরত্ব নয়, তিনি যেখানেই থাকুন বা যা-ই গ্রহণ করুন না কেন, তাঁর মনে সবসময় জীবন্ত গ্রাম-সমাজ-প্রকৃতি নদীনালা সুপারি-নারকেল গাছ ধানক্ষেতের অক্ষয় ছবি, ফলে তিনি যে-রূপেই লিখুন না কেন তাঁর লেখা সেই স্মৃতি-অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে-যাওয়ার কথা নয়, যায়ওনি। এই সব বলার অর্থ এই নয় যে দেশ-বিদেশের এমন যুগল রূপ আলাদা-আলাদাভাবে কোনো দেশ বা অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করবে, বরং এই দুই-এর মধ্যকার ভেদ মোচন করে সর্বদেশের ও সর্বকালের সাহিত্য হয়ে-ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধারণ করেছিল ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাস এবং সফলও হয়েছিল। বিশ্বসাহিত্যের একনিষ্ঠ ও সতর্ক পাঠক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কাঁদো নদী কাঁদো পড়ে চিরকালীন রূপ আবিষ্কার করে লিখেছিলেন :

ভবিষ্যতের পাঠক ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ পড়বেন, যেমন এসময়ের পাঠকেরা পড়েছেন এবং পড়ে চমৎকৃত হচ্ছেন এর আধুনিকতার জন্য। একথা সত্য যে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের অভাব নেই, কিন্তু প্রকৃত আধুনিক উপন্যাস হাতের আঙুল গুণে বলা যাবে। ওয়ালীউল্লার আধুনিকতা কী? সে কি শুধু অতি আধুনিক একটি পদ্ধতির ব্যবহার, তার মাধ্যমে একটি আধুনিক-জীবন-দর্শন উপহার? আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং চরিত্রচিত্রণ? ওয়ালীউল্লাহ্'র আধুনিকতায় এসব থাকলেও এদের বাইরে গিয়ে একটি ব্যক্তি ও একটি সময়কে চিরতরে সমসাময়িক করে রেখেছে তাঁর শিল্প।

তিনি আরও লিখেছেন এতে বিবৃত হয়েছে আদিম পৌরাণিকতার উপাদান, উপন্যাসের মুহাম্মদ মুস্তফা ও তবারক ভূইঞা যে-পৃথিবীতে বাস করে সেখানে ভালভাবে সভ্যতার আলো পড়েনি, শেষবিচারে কুমুরডাঙ্গা কোনো শহর নয়, সেটি ‘মানুষের প্রবৃত্তির একটি অন্ধকার লীলাক্ষেত্র’। এ-প্রসঙ্গে নিয়ে এসেছেন কাফকার দি ক্যাসল-এর দুর্গ-সংলগ্ন শহরটির প্রসঙ্গ যাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের গল্প তৈরি হয় এবং একসময় তা ‘পাঠকের অজান্তে তার অন্ধকার বোধ অনুভূতিগুলোকেই রূপায়িত করে, স্থান হয়ে দাঁড়ায় মানুষের গভীর ও অন্তর্গত জীবনের প্রতীক’; এরপরও তিনি ওয়ালীউল্লাহ্'র নিজস্ব ‘দেশ’-বোধ এবং আধুনিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী দূরদৃষ্টি লক্ষ করেছেন বলেই তাঁর সম্পর্কে লিখতে পেরেছেন উপস্থাপনার জাদুস্পর্শে কুমুরডাঙ্গার মানুষজনকে সর্বজনীন করে তুলেছেন ওয়ালীউল্লাহ্।

ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর উপন্যাসে যে-বাস্তবকে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন তার জন্য চেতনাপ্রবাহ-রীতি ও অস্তিত্ববাদের আবহ গ্রহণ করা অনিবার্য ছিল কি না সে-প্রশ্ন আলাদা, কিন্তু এখানে তা যে-রূপে গৃহীত সেটি নানা তাৎপর্যে হয়ে উঠেছে প্রাসঙ্গিক ও ব্যঞ্জনাময়। চেতনাপ্রবাহ-রীতির যুক্ততার বিষয়টি মনে আসে উপন্যাসের উত্তম পুরুষের কথক আর তবারক ভূইঞার গল্প বর্ণনার সূত্রে, কারণ তাদের মাধ্যমেই উপন্যাসের বিষয় ও চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের পরিচয়। উপন্যাসের জট খোলা বা তাকে জটিল-করে-তোলা-দুটোর দায়িত্ব উত্তম পুরুষের কথকের উপরে থাকলেও হতো, কিন্তু এখানে তবারক ভূইঞাও গল্পের আরেক কথক; উত্তম পুরুষের কথক তবারক ভূইঞার কাছ থেকে কারও/মুহাম্মদ মুস্তফা-বিষয়ে কথা শোনার অপেক্ষা করে; আবার কথকের মনে এই সন্দেহও জাগে যে, তবারক ভূইঞা ঠিক তবারক ভুইঞাই কি না-সব মিলিয়ে পাঠককে ধাঁধায় ফেলে যে-আকাঙ্ক্ষিত বাস্তবকে রূপ দিতে চেয়েছিলেন লেখক, তার জন্য যে-রীতি দরকারি হয়ে পড়েছিল, নিজের মাটির উপর দাঁড়িয়ে ওয়ালীউল্লাহ্'র গ্রহিষ্ণু মন সেই রীতিটিই গ্রহণ করেছিল। আধুনিক বাংলা কবিতায় জীবনানন্দের কাব্যচেষ্টা ও নজিরবিহীন সাফল্যের ইতিহাস আজ সকল মনোযোগী পাঠকেরই জানা, কিন্তু এ-কথাও তো কারও অজানা নয় যে তাঁর কবিতার রীতিটি তিনি কোথা থেকে গ্রহণ করেছিলেন-শুধু রীতিই বা বলছি কেন, তাঁর কবিতার ওপর পাশ্চাত্য-কবিদের বিষয়ানুষঙ্গের প্রভাব নিয়েও তো একসময় পাতার পর পাতা লিখিত হয়েছে। জীবনানন্দ আজ বাঙালির একান্ত গর্বের ধন, নানা তর্ক-বিতর্কের পর এতদিনে তাঁর মৌলিকত্বও প্রশ্নাতীত; কিন্তু ক্ষেত্র আলাদা হলেও, ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাস-চেষ্টা কি তাঁর চেয়ে ভিন্নতর কিছু? আধুনিক বাংলা কবিতার তিরিশের পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে ও বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তো সাক্ষাৎপরিচয় ছিলই তাঁর, স্টেট্সম্যান সম্পাদনার সূত্রে জীবনানন্দের সঙ্গেও পত্রযোগাযোগ ঘটেছিল-এই সূত্রে, পাশ্চাত্য রীতি গ্রহণ করা সত্ত্বেও, বাংলা কবিতা যখন পাঠক ও সমালোকদের কাছ থেকে তার প্রাপ্য সমর্থন আদায় করে নিচ্ছিল, তখন, যাটের দশকে পৌঁছে, উপন্যাসের ক্ষেত্রে, সেই দৃষ্টান্ত থেকে প্রেরণা তো নিতেই পারেন ওয়ালীউল্লাহ্; কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো, আধুনিক বাংলা কবিতার আলোচনায় আমরা যে-বিশ্ববোধের পরিচয় দিয়েছি, আধুনিক উপন্যাসের আলোচনায় তার সিকি ভাগও দিতে পারিনি। সেটুকু দিতে পারলে ওয়ালীউল্লাহ্'র উপন্যাসের আরও বহু সদ্গুণ আমাদের নজরে পড়ত। আর তা হলে-এবং কাঁদো নদী কাঁদো লেখার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু না ঘটলে-বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে আরও প্রভাবশীল কোনো বাঁক/ধারা সৃষ্টি করে যেতে পারতেন ওয়ালীউল্লাহ্। এরপরও যতটা হয়েছে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজে ধর্মের যে-নাছোড় প্রভাব এবং তাঁকে কেন্দ্র করে শোষণ ও দুষ্কর্মের পথ যে তৈরি হয়, বহুস্বরের নিরিখে তার বিশ্লেষণে যে-দুঃসাহস দেখিয়েছেন ওয়ালীউল্লাহ্ সেটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।

ওয়ালীউল্লাহ্'র আলোচকেরা তাঁর সাহিত্য বিবেচনার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতের ওপর গুরুত্ব প্রদানের কারণও সেখানে। ওয়ালীউল্লাহ্'র স্ত্রী অ্যান-মারিও বেড়ে ওঠার সূত্রে, ধর্মীয়ভাবে না হলেও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাঁকে বাঙালি হিন্দুর বিপরীতে 'বাঙালি মুসলমান' বলতেন-বিশেষত ভাষা ও বিষয়/বিষয়ানুষঙ্গ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি যে স্বাতন্ত্র্য দেখিয়েছেন তার নেপথ্যে কাজ করেছে তাঁর ওই বিশেষ পরিচয়টি। এমনিতে প্রচলিত ধর্মকর্মে আস্থা ছিল না তাঁর, কিন্তু যে-সমাজে বড় হয়েছেন তাদের নানাবিধ দুরবস্থা তাঁকে পীড়িত করেছিল বলেই সাহিত্যের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি সেই সমাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন :

আমরা মুসলমান। হয়তো-বা মাত্র কয়েক ঘর আমরা শহরে বাস করি এবং আমাদের বাড়ি শহরে। তাছাড়া আমরা যে-বিরাট সমাজসভ্যতার জঞ্জাল, সে-সমাজের পক্ষে অতি আধুনিকতম সাহিত্যের তেমন প্রয়োজন রয়েচে কী? এবং সে সাহিত্য যদি ব্যর্থ হয় তবে সে ব্যর্থতা হবে সেই রকম-ভারতীয় প্রাচীন শিল্পকলা ছেড়ে কিছুরও মধ্যস্থতা না নিয়ে একলাফে সুররিয়ালিজম শুরু করার যে-ব্যর্থতা।

কাজি আফসারউদ্দিন আহমদকে লিখিত ওয়ালীউল্লাহ্'র এ-মন্তব্যে বিষয়নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একদম স্পষ্ট। অ্যান-মারিও জানিয়েছিলেন ধর্মের লেবাসে সমাজে যে-প্রতারণা চলে, যে-কোনো ধর্মের ক্ষেত্রেই, তার প্রতিবাদ করেছেন ওয়ালীউল্লাহ্, তবে যে-ধর্ম সম্পর্কে তিনি বেশি পরিচিত, যেটিকে তিনি তার দেশের মানুষের দারিদ্র্য ও পশ্চাদ্পদতার জন্য দায়ী মনে করতেন তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আরও বেশি প্রতিবাদী-অ্যান-মারির মতে-ওয়ালীউল্লাহ্ ঠিক ধর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন না, ছিলেন গ্রামের মোল্লাদের হাতে ক্ষমতার অস্ত্র হিসেবে ধর্মের ব্যবহার বা মানুষের স্বাধীনতার পথের বাধা যে-কোনো কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে। এ-কথা থেকে আমাদের সহজেই মনে পড়বে লালসালু ও চাঁদের অমাবস্যার কথা, কিন্তু কাঁদো নদী কাঁদোর বিষয় ও পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন-এ-উপন্যাসটি তাঁর বহুস্বরিক গুণের কারণে লেখকের আকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য নানা রূপে, নানা স্বরে উপস্থাপিত হয়।

উপন্যাসে এখানে এমন চরিত্রও রয়েছে, যে খুন করা সত্ত্বেও মসজিদে গিয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে পারে সে নির্দোষ আর সে-খবরটি গ্রামে পৌঁছার পর যে-প্রতিক্রিয়া হয় তাতে ধর্ম-প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ওই অঞ্চলের মানুষদের মনোভাব বোঝা যায় :

খবরটি বাড়ীর সবাইকে স্তম্ভিত করে। বস্তুত কিছু সময়ের জন্যে সকলে কেমন বাকশূন্য হয়ে পড়ে। তাদের মনে হয়, মসজিদঘরে কথাটি বলে ধূর্ত কালুমিঞা আমাদের সঙ্গে বড়ই শয়তানি করেছে, যেন যাকে আমরা প্রায় ধরে ফেলেছিলাম সে হাত থেকে ফস্কে গিয়ে একটি দুর্গের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গটি সাধারণ দুর্গও নয়, সেটি আকায়িদ-ঈমানে তৈরী দুর্গ।

এই দুর্গ কঠিন দুর্গ, এই ধর্মদুর্গে আশ্রয় নিলেই যে সবাই তার কথা বিশ্বাস করবে তা ঠিক নয়, সাধারণত ভীত মানুষের মুখে এমন স্বর তো এমনি-এমননি চলে আসতে পারে যে ‘মসজিদে কেউ মিথ্যা কথা বলে না’, আবার এমন স্বরও রয়েছে উপন্যাসে-‘যে-মানুষ খোদার বান্দাকে খুন করতে ভয় পায় না সে-মানুষ খোদার ঘরে মিথ্যা বলতে ভয় পাবে কেন?’ অন্যত্র, কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের সম্বন্ধে একজন দারোগার স্বরে কথকের উক্তি : ‘সে যদি কুমুরডাঙ্গার নিন্দা করে থাকে তার কারণ সে-শহরের ধর্মাভাব, যে-ধর্মাভাব শুধু জনসাধারণের মধ্যে নয়, শহরের নেতৃস্থানীয় শিক্ষিত এলেমদার লোকেদের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। বাইরে তারা ধার্মিক কিন্তু সে-ধার্মিকতা একটি মুখোশ মাত্র।’ দারোগার মতে, কুমুরডাঙ্গার লোকেরা হিংসুটে, নিচুমনা, নিজের নাক কেটে পরের ক্ষতি করে, আর সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থাটা খারাপ হওয়ার কারণ তাদের অধার্মিকতা। এবার দারোগা সম্পর্কে কথকের বর্ণনা : ‘এরপর খাকি রঙের পুলিশি পোষাকের আড়াল থেকে দারোগার ধর্মপ্রাণ উঁকি মারতে সময় লাগেনি এবং এ-সময় তার গোঁফ-কামানো মাথা-মুড়ানো কিন্তু দীর্ঘ দাড়ি শোভিত মুখাবয়বটিও মুহাম্মদ মুস্তফা প্রথম লক্ষ্য করে’-এই দারোগার প্রতি, উপন্যাসে যা দেখতে পাই, মুহাম্মদ মুস্তফার মনে শ্রদ্ধার ভাব জেগেছিল, কিন্তু কথকের বলার ধরনে কোনও শ্রদ্ধা নেই, আছে নিরুপায় করুণা। মুহাম্মদ মুস্তফার মনে শ্রদ্ধা জাগাটাই স্বাভাবিক, কারণ সে ধার্মিক কি না জানি না কিন্তু সে ধর্মভাবে আক্রান্ত এবং ভীরু : তার ভাবনা থেকেই বেরিয়ে এসেছিল ‘মসজিদে কেউ মিথ্যা কথা বলে না’, সেটি সেই ভীরুতার জন্যই। এতকিছুর পরও মুহাম্মদ মুস্তফা চরিত্রটি নানা কারণে আমাদেরকে কৌতূহলী করে তোলে : তার বিয়ের সংবাদ জেনে খোদেজা যখন আত্মহত্যা করে তখন চাঁদের অমাবস্যার স্কুলশিক্ষক আরেফের মতো-যদিও বিপরীতভাবে-ভাবতে চেষ্টা করে যে, এর জন্য সে দায়ী নয়; কিন্তু একসময় সেও আত্মহত্যা করে। কিন্তু কেন? এর কারণ কি ভীরুতা? আরেফ যেমন ঘটনা থেকে পালাতে পারত, সেও তো পালাতে পারত, তবু তারা কেউই পালায়নি। আরেফ আদালতে হাজির হয়েছিল, সেখানে জয় হয়েছিল নীতির, কিন্তু মুহাম্মদ মুস্তফার বিষয়টি তো সেরকম নয় শুধু? আলবেয়ার কামু ‘ঈশ্বরহীন, যুক্তিহীন, ন্যায়হীন, অর্থহীন অস্তিত্বের থেকে পরিত্রাণের উপায়' হিসেবে আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু মুহাম্মদ মুস্তফার ক্ষেত্রে কী হয়েছিল-খোদেজার আত্মহত্যার জন্য অপরাধবোধ তো আছেই, সে-প্রসঙ্গ বিস্তারিত রয়েছে উপন্যাসে, এ-ছাড়াও আত্মহত্যার পেছনে পিতার মৃত্যুপরবর্তী তার মানসিক অবস্থাও কাজ করেছে। তার পিতার মৃত্যুর পর সে শুনেছিল ‘বদলোকের নছিবে অপঘাতে মৃত্যুই বরাদ্দ থাকে’, সে জানতে পারে তার বাবা ছিল ‘অতিশয় দুর্বৃত্ত’, অনেক মানুষকে ধ্বংসের পথে বসিয়েছিল, নিরপরাধ শিশুদের দণ্ডিত করেছিল, এরপরও ‘নির্দয়ভাবে দেয়া বৃত্তান্তসমৃদ্ধ বিবরণে, কখনো তীব্র ঘৃণাভরা কণ্ঠে নিক্ষিপ্ত অভিযোগে, কখনো আবার স্পষ্টতই পরস্পরবিরোধী বিবৃতিতে-এ-সবে মিলে মুহাম্মদ মুস্তফার মনে ক্রমশ যে-মানুষের চিত্র স্পষ্টাকার রূপ ধারণ কবে সে-মানুষকে সে যে চিনতে পারে তা নয়, তবু তাকে প্রত্যাখ্যান করতেও সাহস হয় না তার। কখনো কখনো তার মনে হয়, সে যেন এমন একটি মানুষের কথা শুনছে, জীবনে যার কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না।’ মনে হয় সে যেন তার বাবার অপরাধ লঘু করতে চাইছে, কিন্তু আসলে তা নয়, সে ভাবে-‘একটি বিশেষ স্তর পেরিয়ে যাবার পর মানুষের পাপ-দুষ্কর্ম আইনের দাঁড়িপাল্লায় হয়তো ওজন করা যায় কিন্তু অন্তরের দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা যায় না।’ বোঝা যায়, জগতের বাস্তবতাই যেন মেনে নিচ্ছে মুহাম্মদ মুস্তফা; কিন্তু এই সব ভেবে কি নির্ভার হতে পারে সে? দেখা যায় মানসিক যন্ত্রণায় আস্তে আস্তে অসামাজিক হতে থাকে সে-নিয়মিতভাবে সামাজিক ‘মাজহাবী জমাতে-বৈঠকে’ হাজির হয়, এ-সামাজিকতার উদ্দেশ্যও হলো সমাজের কৌতূহল এড়ানো; ধীরে ধীরে সে নিজেকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে যে সামনে থাকলেও অনেকে বলে উঠত ‘কোথায় গেলো মুহাম্মদ মুস্তফা ?’ এ যেন নিজেকে একদম অস্তিত্বহীন করে-ফেলা-এই অবস্থায় কথক তবারকের ভাষ্য : ‘জীবন সম্বন্ধে কী একটা নিদারুণ ভীতিই তাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো’। কিন্তু এ-ভাষ্য মেনে-নেওয়া মুশকিল-কথকের ভাষ্য তো লেখকের কোনো-না-কোনো স্বরেরও ভাষ্য, সে-হিসেবে এমন মনে করার কারণ আছে যে, চরিত্রসম্বন্ধে তাঁর সিদ্ধান্তবাক্যকে-ছাপিয়ে অপরাপর সত্তার সংস্পর্শে এসে তাঁরই চরিত্র অন্য বেদনায় পৌঁছে গেছে-এই বেদনা অর্থকীর্তিসচ্ছলতা-হীন আরও এক ‘বিপন্ন বিস্ময়’-এর বেদনা, এই বেদনা আরেফের আদালতমুখী সাহসের(?) বিপরীত ভীতিজাত মৃত্যুমুখী বেদনা নয়; তাহলে ‘বিপন্ন বিস্ময়’ আর তার বেদনাটাই বা কী? কামু যে বলেছিলেন মানুষ এক অনিবার্য সত্যের শিকার, একবার মেনে নেওয়ার পর আর তা থেকে মুক্ত হতে পারে না, মুহাম্মদ মুস্তফাও কি সেরকম কোনো-খেদমত উল্লাহ কি খোদেজার সঙ্গে-অলিখিত ও বিমূর্ত বন্ধন/প্রেম/সত্য-এর শিকার, বিপরীত যুক্তি থাকা সত্ত্বেও যা সে মেনে নিতে বাধ্য? হয়তো,-কারণ, এমন অবস্থায় পৌঁছলেই একজন নিরাশ ও সচেতন মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আর ভাবে না-আত্মহত্যা করে বসে। হয়তোবা এই সব কিছুই নয়-উপন্যাসের চরিত্র ও তার পাঠক সম্পর্কে ঔপন্যাসিকের আরও কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়তো রয়ে গেছে কোথাও যা এই লেখায় অনাবিষ্কৃত : যেমন নবি মুহাম্মদ ও তাঁর স্ত্রী খাদিজার নামে উপন্যাসের দুটি চরিত্রের নাম কেন? কারবালার সেই সকিনার নামে আরেকটি চরিত্রের নাম কেন যে-কিনা নদীর কান্না শোনে; আর নদীটাই বা কেন কাঁদে? কথক বলে, নদী কাঁদে কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের জন্য, বিশেষত মুহাম্মদ মুস্তফার জন্যে, তাহলে লেখকের/কথকের কেন মনে হয় ‘নিষ্ফল ক্রোধ’-এ কাঁদছে নদী? কেনইবা লেখককে বলতে হচ্ছে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’, এর সঙ্গে পৌরাণিক চরিত্রগুলোর নানা সম্পর্ক আবিষ্কার করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু তার কোনো সন্ধানই তো করা গেল না এই উপন্যাসে-এই সব কারণেই উপন্যাসের কাছে ঔপন্যাসিকের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে বারবার ফিরে-যাওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই আমাদের।

..........................................

লেখক পরিচিতি
মোস্তাক আহমাদ দীনের জন্ম ১৯৭৪ সালের ১১ ডিসেম্বর, সুনামগঞ্জ জেলার ইসহাকপুর গ্রামে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন। পিএইচডি করেছেন ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, অধ্যাপক তপধীর ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে। নব্বই দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি। ২০০১ সালে বের হয়েছে প্রথম কাব্য 'কথা ও হাড়ের বেদনা'। ২০০৫-এ কাব্য- 'জল ও ত্রিকালদর্শী', ২০০৯-এ 'জল ও শ্রীমতি', ২০১২-এ 'ভিখিরিও রাজস্থানে যায়'। এই কাব্যের জন্যে পেয়েছেন ২০১২ সালের 'এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার'। 'কবিতাযাপন' নামে তাঁর একটি বিশিষ্ট গদ্যের বইও প্রকাশিত হয়েছে, ২০১১-য়। লোকজীবন ও লোকসাহিত্যের প্রতি তাঁর টান বিশিষ্ট মাত্রা পেয়েছে। তাঁর সম্পাদনায় বেশ কয়েকজন লোক-কবির পাণ্ডুলিপি বই হয়ে বেরিয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মকদ্দস আলম উদাসী'র 'পরার জমিন', 'আবদুল গফ্‌ফার দত্তচৌধুরী : তাঁর স্মৃতি তাঁর গান, ১৯৯৯। পেশায় শিক্ষক। সিলেট কমার্স কলেজের উপধ্যক্ষ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন