বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

মৌসুমী কাদেরের গল্প : তেলাপোকা



সোমবার, বাক্সটায় গাদা গাদা কাগজ ভর্তি। পে’লেসে’র কুপন, ওয়ালমার্ট, লব-লজের ফ্লাইয়ার, আইকার বিজ্ঞাপনসহ এক কেজি ওজনদার বই।

মঙ্গলবার ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট আর ক্রেডিট কার্ডের বিল।
বুধবার বাড়ী ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ, স্টুটেন্ট লোনের কাগজপত্র।
বৃহষ্পতিবার ম্যাথিও কেলওয়ের ছবি সহ ভোটাভুটির বিশেষ বিজ্ঞাপন।
শুক্রবার ডিভোর্স নোটিস।
শনি রবি দুদিন ছুটি, তাই চিঠি নেই।



চিঠি নিয়ে মেয়েটির কোন আগ্রহ নেই। পত্রিকা নিয়েও নয়। লোকজন একভাগ সত্য লেখে, বাকি সবটাই বানোয়াটে বোঝাই। উৎপল কি সত্য মিথ্যা তোয়াক্কা করেছিলেন? ওবামার খবরে যা কিছু দেখা যায় তাই বা কতটুকু সত্য? প্রেসিডেন্ট মরে গেলে কিইবা আসে যায়? কিন্তু একটা মিলিয়ন ডলারের চেক নিশ্চয়ই বদলে দিত পারে ওর জীবন। তাই প্রতিদিন প্রবল আগ্রহ নিয়ে চিঠির বাক্সটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় সে। সন্দেহও হয়, কোথাও কোন বিষ নেইতো! মনের মধ্যে কালচিটে চিন্তার ঢাকনাটি খুলে ফেলে সে। খবরের কাগজে চোখে পড়ে; প্রেসিডেন্ট ওবামা একটা বিষ মাখানো চিঠি পেয়েছেন। চিঠি পর্যন্ত কেমন করে বিষ গড়িয়ে গেল সেইটি নিয়ে হোয়াইট হাউজসহ গোয়েন্দা দফতরগুলো শনাক্তের অভিযান চালিয়েছে। এগুলো পোকা না মানুষ মারার বিষ সেইটিই তদন্তের বিষয়।

মেয়েটি অপেক্ষা করছিল; যদি একটা বড়সড় অংকের চেক এসে যায় এবং সেটা আর ফেরত না দিতে হয়! সরকারী চেক খেতে স্পঞ্জ রসগোল্লার মতন। হালকা নরম চাইল্ড কেয়ার বেনিফিট অথবা চমচম ইন্স্যুরন্স চেক। সহজে পিপড়া বা তেলাপোকা ধরে ফেলে। ছেলে্র আঠারো পূর্ণ হোল আর সব বন্ধ। কি কুক্ষনেই যে আঠারো হোল! কিইবা হতে পারতো যদি সেই প্রত্যাশিত মিলিয়ন ডলারের চেকটা এসেই যেত? অথবা সিক্স ফরটি নাইন লটো লটারীর উইনিং চেক? ট্যাক্স ফাঁকি দেবার সম্ভাবনা এড়ানো যেত কি?

ধরা যাক যদি চেকটা এসেই যেত; বিচ্ছিন্ন হয়ে একটা দ্বীপে চলে যাওয়া্র কল্পনা করতে পারতো মেয়েটা। ফোন নাম্বার বদলে ফেলে অপরিচিত এবং গোপন থাকা যেত। চর পড়ে গেলে নাটকীয় হতে থাকে আদানপ্রদানের ভাষা। শব্দেরা রংধনুতে খেলতে পারেনা, ক্রমাগত বিষখোর হতে থাকে তারা।

জীবন বদলানো যায়না।
ওরা পাখি হয়ে উড়ে উড়ে হারিয়ে যায়।




ধরুন, আপনি ঠিক ‘আপনি’ না।
ধুলোভরা ঝুলে উড়া কবি;
গাছ, লতাপাতা, সবুজ কবিতার ফুল; অথবা সাদা টিকটিকি।
বারো তলার পাইপ বেয়ে আসা স্বাধীন ও মুক্ত কীট।

উঠা বা নামায় ক্লান্তি নেই, এমনকি হোয়াইট হাউজের আপনাকে ‘ফিনিশ’ করবার পরিকল্পনা নেই। খাটের তলায় অনায়াসে ধুনফুন করে ঘুড়ে বেড়াচ্ছেন। কার সাথে সমন্ধ করছেন, কি করছেন না করছেন, জানছেনা কেউ, সবটাই আপনার অভিরুচি। যত যাই কিছু করুন, মেয়েটি যে টর্চলাইট অথবা চশমা ছাড়াই ঠিকঠাক দেখে ফেলছে এবং কিচ্ছু বলছেনা এতে কিছুটা অবাক আপনি। মনে মনে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, আবার সতর্কও হচ্ছেন, কিন্তু ছেড়ে যাচ্ছেননা। খূঁজে বেড়াচ্ছেন সবজী ঘ্রাণ অথবা আধঁপোড়া মেধাবী চুল। গ্রাস করে খেয়ে ফেলবেন, নতুবা ভাই বোন ডেকে নিয়ে এসে হাট বসাবেন, এটাই আপনার চারিত্রিক বৈধতা।

আপনি কি দেখছেন মেয়েটি বিছানার চাদর পেচিয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বসে আছে? তীব্র বিষাদে ভাবছে; বিষ খাওয়া কি এর চেয়ে সহজ? আত্মহত্যার কোন দায়বদ্ধতা নেই; কে খাবে, কে পড়বে, কার বুক ভেঙ্গে যাবে কি যায় আসে? আপনি বলছেন;

- এই মেয়ে, মরার আগে তারকভস্কির ‘স্টকার’ টা আরেকবার দেখে নিলে হোতনা! তুমি ওকে ভালোবাস।

- আপনি বললেই আমি দেখবো কেন? দিপা মেহতার নতুন সিনেমা ‘বিবা বয়েজ’ দেখেছেন? শুনলাম এক্কেবারে ফালতু। এর আগে ‘ফায়ার’ নিয়ে চরম যন্ত্রনা হয়েছিল। শাবান আজমী আর নন্দিতার চরম রোমান্টিক দৃশ্যে স্বামী তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, মূল আকর্ষন কি! লেসবিয়ানিজম!

- হতেই পারে। সব মানুষের চিন্তা একই সমান্তে প্রবাহিত হবে এমনতো কোন কথা নেই।

- তা নেই। বেঁচে থাকার জন্য নৈর্ব্যক্তিক কারনই কেবল থাকতে হবে এমনওতো কোন কথা নেই।

- বেশীর ভাগ ‘স্ত্রী-লোক’ই ধরাবাধা বৃত্তের বাইরে বেমানান’- ইহা একটি পুরুষ কথন।আত্মহত্যা একটি সরল সমিকরণ। এমন কিছু কি করা দরকার ছিল যেন দাগ মুছে না যায়! জলরঙ, সিরামিক, কম্পোজিশন, ন্যারেশন, এবস্ট্রাক্ট!!

- যত যাই কিছু করুন না কেন, এই আত্মহত্যার ব্যাখ্যা করা হবে, ‘মানসিক বিকার’! মৃত্যুর অকৃত্রিম ব্যাখ্যা কি?

- মানুষ সহজে মরেনা। ‘অ-সুখ’ ওদের মেরে ফেলে।

- দূর্ঘটনাও কি তাহলে এক ধরনের অসুখ?

- অবশ্যই! মুখোশ পড়া মানুষ দিনকে রাত করে, রাতকে দিন। এরা সবাই পৃথক, কারো ডানা আছে, কারো মুখে লাল মাংস, কারো বা চোখে মদ।

- ঈশ্বর......, আমি বিশ্বাস করতে চাই তুমি আছো। ঐযে আলমাস ভাইয়ের বেহালা, শুনতে পাচ্ছো? শোন, শোন, বাজে, ঐখানে বাজে। ক্যান্সারের সাথে খেলতে খেলতে আলমাস ভাই বাজে।

- তোমার পুরন হারমোনিয়ামটা বাজেনা? ওটাকে বাড়ী থেকে বের করে দাওনা কেন তবে?

- দেখুন, আর যাই করুন, দয়া করে ওই হারমোনিয়ামে বসবেন না

- কেন? ওতে কি বিষ লাগিয়ে রেখেছো?

- নাহ! ওতে কেউ হাত দিলে আঙুলগুলোয় টন টন ব্যাথা করে। উন্মাদ শব্দে বাজতে থাকে ওরা। অনুভূতিগুলো গড়িয়ে পড়ে, সেঁটে যায় ভেতরে। বন্ধ দরজা আর খোলা যায়না। ভোর হয়ে এলো কি? এখনকি আত্মহত্যার সঠিক সময়? - যে মানুষটির মৃত্যু কামনা কোরছ, সেতো ইশ্বরের মতন ‘ভ্যানিশড প্রোডাক্ট’। মৃত্যু বা মৃত্যুহীনতায় কিছু যায় আসেনা।
- ইহা ভ্যানিশড হইয়াও হয়না। স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার চলতে থাকে। হাটে, চলে, গান গায়। আর সুযোগ পেলেই পোকার সাথে কথা বলে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, চেনে! কি চেনেনা! পারবে পারবে করে সে আরে কিছু পারেনা। চৌরাস্তার মোড়ে অচেনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।



চিঠি আসে, চিঠি যায়;
মৃত্যুর ঠিকানা আছে কি নেই ভুলে যায় মেয়েটা
স্বর্গের ভেতরও কলহ
অনাকাংখিত শিশুদের ফেলে দেয়া চাপ
পরিবার দিতে না পারার অক্ষমতা
তবু..................
যতক্ষন পরষ্পরকে শোনা যায়, ছোঁয়া যায়-পাশে থাকে তারা।
এবং শেষকালে ধুলোর শরীর ধুলোতেই মিলে যায়।



১০/১০/২০১৫

1 টি মন্তব্য:

  1. গল্পটি কঠিন, তেলাপোকার সাথে কথোপকথন আত্মহত্যার বিষয়টিকে এক নতুন আঙ্গিক দিয়েছে। এই ধরণের অভিগমন বাংলা গল্পে অভিনব। শেষ পর্যন্ত এক ধরণের হতাশ্বাস অবশ্যম্ভাবিতায় মনটা বিষন্ন হয়ে থাকে; লেখককে অভিনন্দন।

    উত্তরমুছুন