বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

ইশরাত তানিয়া'র গল্প : বীজপুরুষ

গোলাপপাশ থেকে টুপটাপ গোলাপ জলের ফোঁটা পড়ে ঘুমের ওপর। আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম। মিতসুর ভাসে বাতাসে। সদ্য ফোটা গোলাপের সুগন্ধ পায় সে ঘুমের ঘোরে। নাক, কান বেয়ে মস্তিষ্কে যোগান দেয়া সুরগন্ধে আয়েশার শরীর ভারী এবং অবশ হয়ে যায়। ফজরের আজান শুনেও সে একলা ওঠার সাহস, শক্তি কোনোটাই পায় না। কোনো রকমে ঘুমন্ত স্বামীর হাত টেনে নিয়ে বুকের ওপর ধরে শুয়ে থাকে। মরা মানুষ খোয়াবে দেখার তা’বীর সে জানে। মৃত্যু পরবর্তী জগৎ সত্য জগৎ। তাই মৃত ব্যক্তি খোয়াবে যা বলে সেটা সত্য বলে গন্য করা হবে। এমন খোয়াব বাক্সবন্দী করে রাখতে হয়। পাঁচ কান করা ঠিক না।

ইদানীং মাটির ঘরের সাথে লাগোয়া উঠোনের কোণে মহানিম গাছের ছায়ায় বসে কারিগর। অত্যন্ত মনযোগী দৃষ্টিতে বাক্সের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা সে ভাবে। হাত থেকে হাতুড়ি-বাটাল নামিয়ে এবার ডান হাতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বুড়ো আঙুল দিয়ে মধ্যমা আর তর্জনীর ওপর কয়েকবার স্পর্শ করে। আঙুলগুলো অসাড় হয়ে যাবার আগেই বাক্সের কাজ শেষ করতে হবে। বিরামহীন কাজ করে যেতে হবে তবেই তৈরি হবে শয়তানের আছর মুক্ত মন্ত্রপূত বাক্স। এই বাক্সের মাধ্যমে মুশকিলের আসান হবে। দুনিয়ার সব মুশকিলের সমাধান পাওয়া যাবে এই বাক্স থেকে। রোগ-ব্যধি, অকাল মৃত্যু, খরা-বন্যা, আকাল-ফসলহানি, চোর-ডাকাতের উপদ্রব, তা সে যেমন দুর্যোগ আর দুর্বিপাকই হোক না কেনো সব মুশকিল আসান করবে এই বাক্স।      
প্রায় ঠিক একই সময়ে ঘরে শুয়ে বাক্সটার কথা ভাবে নিলুফার। জ্বর জ্বর গায়ে কিছুই ভালো লাগে না তার। শুধু বাক্সের কথা ভাবতে ভালো লাগে। এত সুন্দর বাক্স! কী সুন্দর নকশাদার ফুল-পাতা-পাখি, রাজা-উজির, হাতি-ঘোড়া, মেলা আর পার্বণের ছবি ঐ বাক্স জুড়ে! সারা দিনে হাজার কাজের মাঝে সে ঠিক সময় করে বাক্সটা দেখে আসে। না দেখা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। ওর চোখের সামনে ধীরে ধীরে পূর্ণ অবয়ব পায় একটি জাদুর বাক্স।  এর চেয়ে রোমাঞ্চকর আর কিছু নাই। প্রায়ই হাত দিয়ে এই বাক্স ধরে দেখার ইচ্ছা হয় তার। সারাদিন নিলুফারের গায়ে গায়ে জ্বর- এখন জ্বরের তাপ বাড়ছে। রোজ বিকেলে গা ধোয়া ওর অভ্যাস। হাঁসের জন্য মাটির সানকিতে ভাতের মাড়ের সাথে ধানের খুদ গুলে ঘরের দাওয়ায় রাখে সে। তারপর পুকুরের ঘাটলা থেকে গা ধুয়ে আসে। কানের লতিতে এক বিন্দু জল দুলতে থাকে। ঘরের দরজায় শিকল দেয়া। তার মানে বাপ এখনো ঘরে ফিরে নাই।            
এবার বলা যাক বাক্সের কথা। কাঠের ওপর ফুল-পাতা-কলকার নকশা করে কারিগর বাক্স বানায় একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। সরল মনে বাক্সের বাইরের চারদিকের অংশে একের পর এক চৌকোণা আর ত্রিভুজাকৃতির জটিল নকশা ফুটায় সে। জ্যামিতিক নকশা ছাড়াও চৈত্র-সংক্রান্তির মেলা, চন্দ্র-সূর্য, ময়ূরপঙ্খী নৌকা, ফসলের ক্ষেত, ছেলের হাতে নাটাই-ঘুড়ি এবং আরও নানান রকম বৈচিত্র্যময় সূক্ষ্ম চিত্র সে তৈরি করে কাঠ খোদাই করে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়গুলো সম্পর্কহীন মনে হলেও সারা বাক্স জুড়ে নকশার কারুকার্য আর শিল্পের সুষমায় সব কিছু আশ্চর্য রকম সুবিন্যস্ত। বাক্সটা খুব বেশি বড় নয়, অনেকটা গয়নার বাক্সের মতো। কোনো হুড়কো নেই এতে।            
দূর থেকে কারগরের হাতে ধরা বাক্সটা দেখছে নিলুফারের বাপ মালেক। আজকে সকাল থেকেই তার শরীরটা ভাল ঠেকছিল না বলে হাল নিয়ে জমিতে চাষ করতে যায়নি। শরীরের চেয়ে তার মন বেশি খারাপ। প্রায় এক মাস হলো নিলুফার বাপের বাড়িতে পড়ে আছে। নিলুফারের বিয়ে তিন বছর গড়িয়ে চার এ পড়ল। সন্তান হয় না বলে তার প্রতি স্বামীর আর কোনো দায়িত্ব নেই। হাতের বিড়িটায় শেষ সুখটান দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় মালেক মিয়া। তারপর এগিয়ে যায় ছুতারের কাছে, বলে, ‘কি কও, ছুতার! এই বাক্স পিচাশ সিদ্ধ হইব? সবাই এই কতা কইতাসে,’ এক গাল  থুথু ফেলে সে, ‘কি রাখবা এর ভিত্‌রে? তুমি কিয়ারে বাক্স বানাও?’
কারিগর হাসে। কিছু বলে না। মাথা নিচু করে একমনে কাজ করে যায় সে ঠুক, ঠুক, ঠুক। ‘কতার জবাব দাও না ক্যারে?’ কারিগর নিরুত্তর। বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা করে না নিলুফারের বাপ, বলে, ‘মুকে কতা আইয়ে না? তোমার লগে কতা কইয়া জুইত পাই না।’
মাথা নিচু করে চলে যায় মালেক তারপর উঠান পেরিয়ে রাস্তায় উঠে যায়। বিকেল হয়ে আসে। গাঁও গেরামের সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে। চারণভূমিতে অলস জাবর কাটে গরুর পাল। ফেরার পথে গরু আর বাছুর নিয়ে ঘরে যাবে সে।
 
এজমালি বৈঠকঘরের উঠান ঘিরে নিলুফারের বাপ চাচার ঘর। উঠানের এপারে মালেকের বড় টিনের ঘর। মাটির ভিত। কাঠের চৌকোণ পাতে বেতের বেড়া দিয়ে ঘরটি দুই ভাগ করা। নিলুফারের নিজের অংশ সব সময় গোছানো থাকে। খাট, আলনা আর একটা আলমারি। আলমারির এক পাল্লায় আয়না বসানো। ঘরের খুঁটিতে নিলুফারের মায়ের সূচিশিল্পে কাবা শরীফের শোভা। ধান ওঠার মৌসুমে নিলুফারের ঘর এত পরিপাটি থাকে না। মেঘলা দিনে ঘরের মেঝেতে ধান বিছানো থাকে। পায়ে পায়ে সারা ঘরে এমনকি খাটের ওপরও ধান ছড়ায়। ধানের কাজ শেষ হয়েছে তাই নিলুফারের ঘর এখন ছিমছাম গোছালো।        
দুটি জানালা আছে তার খাটের পাশে। খাটে শুয়ে জানালা দিয়ে আকাশ দেখে নিলুফার। জানালার কাঠের পাল্লা মেললেই গুমোটভাঙা ভেজা বাতাস, কখনো রোদসোহাগী বাতাস ঘরে ঢুকে। কোনো দিন সজনে গাছের চিরি চিরি হলুদ সবুজ পাতার ফাঁকে ডানা ঝাপটায় টুনটুনি। সেই চঞ্চলতা কখনো ঢুকে পড়ে নিলুফারের মধ্যে। সেই দিনগুলোতে অকারণেই পাঁচ বছরের মনার মাথায় হাত বুলায় নিলুফার। এলোমেলো করে দেয় চুল। পুতুলের বাক্স নামিয়ে চুমকি বসানো শাড়িটা জড়ায় নাসিমার ময়লা হয়ে যাওয়া পুতুলের গায়ে।  
তার ভাসুরের ছোট মেয়ে মুক্তা। নাসিমার বয়সী হবে। এক গা ধুলোবালি নিয়ে যখন তার গলা জড়িয়ে ধরে বলত- ‘মোয়া দেও’- মায়া লাগত নিলুফারের। মোয়ার কৌটা খুলতেই গুড়ের মিষ্টি গন্ধ চারপাশের বাতাসে গন্ধ ছড়াত।  নিলুফারের মস্তিস্ক এ গন্ধে সংবেদনশীল ছিল না। টিনের কৌটার মুখ লাগাতে লাগাতে তার মনে হতো এর চেয়ে তেঁতুলের গন্ধ ভালো- কবে যে ওর খুব তেঁতুল খেতে ইচ্ছে করবে।
স্বামী আমিনুলের কথা মনে পড়ে নিলুফারের। আমিনুলকে আবার বিয়ে দিবে তার বাবা। স্বামীর বীর্যের উর্বরতা নিয়ে নিলুফার কোনো দিন হীনচিন্তা করেনি। নিলুফারের সিদ্ধভূমিতে না হোক তবু অন্য কোথাও সার্থক হোক আমিনুলের পৌরুষ। দূরে থেকেও স্বামীর মঙ্গল কামনা করে নিলুফার।      
সেই অনাগত দিনের আশার তেঁতুলে স্বামী পরিত্যক্ত নিলুফারের দীর্ঘশ্বাস মিশে যায়। এমন বন্ধ্যা আকামের জীবন নিয়ে নিলুফার কী করবে ভেবে পায় না। একটা ছেলে-মেয়ে সে বিয়োতে পারল না আজ পর্যন্ত। ঘুঘু ডাকা নিঃসঙ্গ দুপুরগুলোতে বালিশ বুকে ধরে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় একেক সময়। শূন্যদৃষ্টি গরম নোনা  পানিতে পূর্ণতা পায়। মুখে বালিশ চেপে কান্নার শ্বাসরোধ করে। কান্নাগুলোও নিস্ফলা।  
ধান গোলায় উঠে যাওয়ার পর নিলুফারের হাতে এখন অঢেল সময়। পিঠা বানানোর জন্য সকালেই আতপ চালের গুড়ি বের করে রেখেছে সে। দুটো পিঠা হাতে নিয়ে কারিগরের বাক্সটা দেখে আসা যাবে।
প্রায় সারাক্ষণই কাঠের বাক্সটার কথা ভাবে নিলুফার। এতে তার কাজের কোনো অসুবিধা হয় না। এক মনে অভ্যস্ত হাতে সে কাজ করে যায় সারাদিন। শুধু জ্বরের সময় নিলুফারের কিছু ভালো লাগে না। যেমন এখন জ্বর গায়ে ঘোর ঘোর লাগছে তার। হঠাৎ শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে। মাথাটা যেন একটু টলে ওঠে। একটানে পরনের শাড়ি খুলে ফেলে সে তারপর আলতো করে হাত বোলায় মোমের মতো ফর্সা পেটে। কারিগরের বাক্স কে তার সন্তান মনে হয়। কোনোদিনও-না-পাওয়া সন্তান বাৎসল্যে সে ফোঁপাতে  শুরু করে।

মালেক গোয়ালে গরু রেখে ঘরে আসে। নিলুফার উঠে দরজার খিল খুলে দেয়। তারপর বাপের দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয়। নিলুফারের দিকে মালেক তাকিয়ে বলে- ‘তোর আবার জ্বর উডল?’ নিলুফার বাপের পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। মলিন সাদা স্পঞ্জের একটায় নীল ফিতা আরেকটায় লাল ফিতা। স্যান্ডেলের চারদিকে কাদা ভরা।
সে চোখ তুলে হেসে বলে- ‘পিডা বানায়াম, ত্যালের পিডা।’
-আর পিডা বানাবি কোম্বালা? জ্বরের মইদ্দ্যে চুলার পারে যাওনের দরকার নাই।
-কিছু অইব না।
-দিকদারি করবি না, নিলু। আমি একবারে মাগরিব আর এশার নামায পইড়া আমু।
এক মেয়ে নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকে মালেক। প্রয়োজন ছাড়া তাদের মধ্যে তেমন কথা হয় না। মা-মরা মেয়েটাকে কোনো কালেই সে বোঝে নাই। মা আর মেয়ে ছিল সই। দুজনের খুনসুটি খুব ভালো লাগত তার। পুতুল খেলার নেশা ছিল নিলুফারের। মা মেয়ের মাথায় তেল দিয়ে চুল বাঁধে আর মেয়ে অতি যত্নে পুতুলকে শাড়ি পরায়- মালেকের চোখের সামনে এই দৃশ্যটি সময়ে অসময়ে ভেসে ওঠে। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে এক বছরের মাথায় মা দুই দিন জ্বরে ভুগে মারা গেল। সেই থেকে মেয়ের গায়ে সামান্য জ্বর আসলেও বাপের মনে কু ডাক ডাকে।    
-পান খাইবা?
-অহন মজ্জিদে জামু। গিয়া ওজু করন লাগব। পান খায়াম কেমনে?
-পান খাইয়া অজু করবা।
মসজিদে যাওয়ার জন্য পরিষ্কার পিরান পরে মালেক। খাটে বসে তালপাখার ডাঁটি দিয়ে পিঠ চুলকায় কিন্তু বেকায়দা জায়গার ঠিক মতো নাগাল পায় না। আজকে বিকালে কারিগরের সাথে খোলামেলা কথা বলা উচিৎ ছিল। সময় মতো সে কোনো কথা বলতে পারে না। সঠিক সময় পার হওয়ার বহু পরে তার মনে হয় কিভাবে বলতে পারলে কথা কার্যকর হতে পারত।  নিলুফারের মা তাকে ঝামেলার ব্যাপারে আগে থেকেই বলে কয়ে দিত। তখন কোনো মতে কাজ সারা যেত। এখন প্রায়ই আতান্তরে পড়ে মালেক।
বাক্সের বুদ্ধি তার মাথায় দেয় ছোট ভাইয়ের বউ আয়েশা।
কয়েকদিন আগে দুপুরে ভাত খেয়ে দাওয়ায় বসে বিড়ি ফুঁকছিল মালেক। উঠানে গত তিন চারদিন ধরে মাড়াই করা ধান শুকায়। ছোট ভাই খালেক পিঁড়ি টেনে তার পাশে বসে। দুই ভাই মুখে মুখে ধানের হিসাব করে।
এবার বিঘা প্রতি পাওয়া গেল বিশ মন ধান। মাঠ থেকে ব্যাপারীরা ধান কিনলো তিনশ টাকা দরে। জমির পত্তন থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই এর খরচ বাদ দিলে এইবার গড়ে লাভ হবে। এই সব গিরস্তির কথা চলে কিছুক্ষণ। নিলুফার আর আর আয়েশা উঠানের এক পাশে কুলায় ধান ঝাড়ে। দুই ভাইয়ের কথার মাঝখানে কুলার ওপর আঙুলের টক টক শব্দ বাড়ি খায়। কুলা থেকে ধান ঢালার সময় ঝর ঝর শব্দ হয়।        
ভাইয়ের সাথে কথা শেষ করে খালেক খালি গায়ে ডান কাঁধের ওপর গামছা ফেলে এক হাতে সাবান আর আরেক হাতে হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি তুলে ঘাটলার দিকে যায়। হঠাৎ মাথায় ঘোমটা টেনে নিলুফারের বাপের সামনে দাঁড়িয়ে আয়েশা সঙ্কোচে বলে, ‘ভাইসাব, নিলুর ডাক্তার-কবিরাজ এইবার ছাড়ান দেন। আমি খোয়াবে ভাবিরে দেকছি। ভাবি কইছে কারিগরের বাক্সের ফজিলতে এইবার কাম অইব।’  
আচমকা মালেক ধরতে পারে না কী প্রসঙ্গে বাক্সের কথা উঠল। তার মাথায় ঘুরছিল বীজধানের চিন্তা। জমিতেই ভালো বীজধান ফলাবে নাকি বীজ কিনে নিবে এই বিষয়ে সে ভাবছিল। বেশ কতক্ষণ পর সে ছোট ভাইয়ের বউয়ের কথা ধরতে পারে। বাক্সটা পেলে নিলুফারের অলক্ষণের দোষ কেটে যাবে এই কথাই নিলুফারের চাচি বোঝাতে চেয়েছিল।  
মাগরিবের আজান দেয়। মালেক পিঠ চুলকানো শেষ করে তালপাখা নামিয়ে রাখে। আর ভাবে মরণেও নিলুফারের মায়ের চিন্তার শেষ নাই, কী তাজ্জব, কবরের ভিতর থেকেও ঠিকই সে খবর পাঠায়! নিলুফারের মায়ের ওপর অগাধ আস্থা তার। দুঃখ একটাই নিলুফারের মা কথাটা খোয়াবে তাকে না বলে আয়েশাকে বলল।    
মালেকের কাছে কারিগরকে বিশেষ সুবিধার মনে হয় না। ব্যাটা মুখে রা কাড়ে না। কালকে আবারো যাবে সে। বাক্স প্রায় তৈয়ার। এই বাক্স কেউ নিয়ে গেলে তার মেয়ের সুখের আর আশা নাই। মনে মনে কিছু একটা মতলব আঁটতে চায় সে কিন্তু তার চোখের সামনে কারিগরের ভাবলেশহীন মুখভঙ্গি ভাসতে থাকে।
পানের বাটা খুলে পান সাজায় নিলুফার। যেন পুতুল সাজায় সে। মমতা নিয়ে চুন মাখায় পান পাতায়। সুপারি দেয়। আজকাল বাপে পানের সাথে জর্দা খায় না। নিলুফারই বলে বলে জর্দার নেশা ছাড়িয়েছে। লবঙ্গের নাকফুল পরিয়ে পান খিলির সাজ শেষ করল নিলুফার। বাপের হাতে পান তুলে দিল।

নিলুফারের বাপ আর চাচা- এই দুই ঘরের মানুষ একই রসি ঘর ব্যবহার করে। সন্ধ্যায় আয়েশা চাচি টমেটোর টক রান্না করছে সরিষা দিয়ে। টকের পাতিলে তেলে ভাজা রসুন ঢেলে দেয় আয়েশা। রসুনবাগারের গন্ধ ভরা বাতাস চারদিকে।      
-জ্বর কেমন? নিলুফারের দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়েশা।
- এহন নাই। এইডা চোরা জ্বর। খালি আয় আর যায়।
নিলুফার পানি দিয়ে চালের গুড়ি গোলায়। খেজুরের গুড় ঢালে। হাতে দিয়ে গুড় মিশায়। ঘন সাদা তরলের ভেতর নিলুফারের কব্জি অবধি ডুবে যায়। ছন্দোবদ্ধ মৃদু ঘূর্ণি ওঠে প্লাস্টিকের বাটিতে। নিলুফারের তামার চুড়ি প্লাস্টিকের বাটির সাথে ঘষা খেয়ে ভোঁতা শব্দ তোলে। নিলুফার গুনগুন করে গান গায়।
মাটির চুলার মুখে খড় আর পাটখড়ি ঢুকিয়ে আগুনের জ্বাল বাড়ায় আয়েশা। পট পট শব্দ আসে চুলা থেকে।
-আগো বেডি, হাইঞ্জা বালা এত গীত গাইস না।
-কিয়ারে? গীত গাওন গুনা?
-হ। আবার খারাপ বাতাস লাগে। তর তাবিজ কই?
-খুইল্লালছি। তাবিজের আর কী কাম আছে?
নিজের অজান্তেই আয়েশার হতাশ নিঃশ্বাস বের হবার পথ পেয়ে যায়। এতদিন তাবিজ-কবজ দেখে অভ্যস্ত চোখে হঠাৎ নিলুফারকে কাইতন-তাবিজহীন দেখে আয়েশার বিসদৃশ ঠেকে। মুখ ফসকে এই প্রশ্ন করে সে মেয়েটাকে কষ্ট দিল   অজান্তে।
- তোর বাপেরে কইছিলাম, কারিগরের বাক্সের খবর নিতে। কারিগরের বাইত গেছিলনি?
-আমারে কিছু কয় নাই। হাত থামিয়ে চাচির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকায় নিলুফার। তারপর চোখ নামিয়ে আবার কাই গোলাতে থাকে, বলে- ‘বাক্সের মইদ্দ্যে কি আছে, চাচিআম্মা?’
-কইতারি না। মানু কয় পিচাশ আছে। চুলার মুখ থেকে খড় সরিয়ে জ্বাল কমায় আয়েশা। টক প্রায় হয়ে এসেছে।
নিলুফার বলে- ‘পিচাশের বড় বড় চোক বাতির লাহান জ্বলে। মুক দিয়া ধুমা বাইরায়। এমন তাজা যাইন আর কইতে নাই। বাতাসে ল্যাঞ্জা বাড়ি খায় সপাসপ।’  
- আর মাতিস না। চুপ যা। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়ে বুকে ফুঁ দেয় আয়েশা। নিলুফারের মাথায়ও ফুঁ দিয়ে দেয় কিন্তু স্বপ্নের কথা নিলুফারের কাছে ভাঙে না।
গত শুক্রবার সকালে ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে সে স্বপ্ন দেখেছিল। পাহাড়ের ওপর সাদা পোশাকে গা ঢেকে কে যেন মিহি গলায় তাকে নাম ধরে ডাকে। ওমা! ভাবি তার সামনে দাঁড়ানো। কী তার রূপালি ঝলমল রূপ! ফিসফিস করে তাকে বলে কারিগরের বাক্সের ভিতর সন্তানের বীজ আছে। নিলুফার সেই কুদরতি বাক্স পেলে সন্তানবতী হবে। তারপর ভাবি ধীরে ধীরে বাতাসে মিশে যায়। চোখ খুলে সে দেখে- সামনে মশারির টান টান প্রান্ত বাতাসে দুলছে। গোলাপ জলের ছিটা পড়ে তার চোখের ওপর। গা ছম ছম করে তার গোলাপের খুশবুতে।
ভাবির সাথে কাটানো কিছু বিগত কলহ আর মিলনের স্মৃতি মনে করে নিলুফারের চাচির চোখ সামান্য ভিজে যায়। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সে। উন্মুক্ত ডান কাঁধের নিচে ঘাম ভেজা আর্দ্র স্তনের আভাস। বিগত যৌবন ছায়া ফেলেছে সেখানে। নিলুফার গুড়ির কাইয়ে পানি ঢালে। বাম হাতের চেটোতে এক ফোঁটা তরল নিয়ে জিভে ছোঁয়ায়। স্বাদ ঠিক আছে।   আয়েশার আঁচল কাঁধ ঢেকে ফেলে।
-কাই বেশি ঢিলা করিস না। নরম গলায় বলে আয়েশা, ‘সামাইন্য এট্টু লবন দে। স্বাদ অইব।’
স্বপ্ন দেখার পর একটা মুরগি সদকা দেয় আয়েশা। মসজিদে মানত করে, বাক্স পেলে পাঁচ টাকার শিরনী দিবে। ভাইসাব কে না বলে কথাটা তার স্বামীকে বললে এতদিনে নিশ্চয়ই একটা গতি হতো। নিলুফারের বাপে এখনো পর্যন্ত করিগরের কানে কথাটা নির্ঘাত তুলে নাই। ভাসুরের ওপর বিরক্ত হয় আয়েশা। ভালোয় ভালোয় বাক্স পেলে হয়। বাক্সসহ নিলুফার কে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে পারলে সে নিশ্চিন্ত হতে পারে। ভাবির আত্মাও শান্তি পায়।
গরম তেল ফুটতে থাকে। নিলুফার নারিকেলের খোলে করে তরল কাই ঢালে তেলের মধ্যে। ছ্যাঁত ছ্যাঁত করে পিঠা ফুলে ওঠে।
-চাচিআম্মা দেহেন কী সুন্দর পিডা ফুলছে।
-ওই, মুক দোষ লাগব। পিডা বানানের কালে মুক বন্দ রাকবি।
-আমারে টক বায়গুনের চুয়া দিও। আইজ্জা চুয়া দিয়া ভাত খায়াম।  কড়াই এর তপ্ত তেল থেকে পিঠা ছেঁকে তুলে নিলুফার। আলোগোছে বাসনে রেখে আবার তেলে মাপ মত কাই দেয়। ফুল তোলা চিনা মাটির বাসন তেলের পিঠায় ভরে যায়।
উনুনের আগুন প্রতিফলিত হয়ে লালচে দেখাচ্ছে নিলুফারের মুখটুকু। আগুনের তাপে নাকের ওপর স্বেদবিন্দু জমে উঠেছে। টিকালো নাক আর ঠোঁটের অপরূপ ভঙ্গিমার দিকে তাকিয়ে থাকে নিলুফারের চাচিআম্মা।

গাঢ় সন্ধ্যা ঈষৎ ঠাণ্ডা ছড়ায়। ছাপা শাড়ির আঁচলে ঘোমটা টানে নিলুফার। ঠাণ্ডা হাওয়ায় নাকের ঘাম শুকিয়ে গেছে। আরাম লাগে তার। টোল পড়া টিনের বাটিতে পিঠা নিয়ে পয়মন্ত বাক্সের কথা চিন্তা করতে করতে নিলুফার হাঁটে। বাক্সের গুণে কুলক্ষণ কাটিয়ে হয়তো সে মা হতে পারবে। কেন যে চেতনে-অবচেতনে তার এ কথাটি মনে হয় নিলুফার জানে না। মাটির রাস্তা থাকা আলু ক্ষেতে নেমে যায় সে। আলপথ ধরে কোণাকোণি হাঁটতে থাকে। সন্ধ্যার আকাশ দেখে তার পরাণ জুড়ায়। বাতাস ছুটছে। আলুথালু বাতাসে ঘোমটা পড়ে যায়। নিলুফার পবন কন্যা। ওর বাতাস লাগার ভয় নাই। গুনগুন করে গান গায় নিলুফার। এখানে কেউ তাকে গাইতে বাধা দেয় না।        
আমার বন্ধু বিনে নিশি নিঘুম, ওলো সই
ঘর জ্বালানি, পর ভুলানি বন্ধু আমার কই-
সোনার নাও পিতলের বৈঠা দিব বন্ধুয়ারে
ওগো পাষাণে সঁপিয়া মোর প্রাণ যায় রে।
এই গীত নিলুফারের নিজস্ব। সে নিজের সুরে নিজের কথা বসায়। নিচু স্বরে গান ধরে। ঘুরে ফিরে কয়েকটি সুরে সে গান গায়। শুধু বাণী বদলে যায়। এই গানের লিখিত রূপ নাই। বাতাসে ভাসে গানের স্বরলিপি। শুধু নিলুফার দেখতে পায়। তার আছে গুনগুনানি। নিরিবিলিতেও গলা খুলে গাইতে পারে না নিলুফার। চাপা অস্বস্তিতে নিলুফারের সুরেলা মসৃণ গলার স্বর মৃদুতর হয়ে যায়। হঠাৎ নিজের মুখ চেপে ধরে নিলুফার। অজায়গা-কুজায়গায় গীত গাওয়া ঠিক না। এত সাহস ভালো না। ওর সুরের টান বদজিনের বুকে লাগতে কতক্ষণ?  
গন্তব্যে পৌঁছে পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় নিলুফার তারপর বিড়ালের মতো লঘু পায়ে কারিগরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কারিগর হাতের কাজ থামিয়ে নিলুফারের দিকে একবার তাকায়। মুখ নিচু করে শিরিষ কাগজ দিয়ে বাক্সের উপরের ভাগ ঘষতে থাকে। কারুকাজ মিহিন করে। কারিগরের পিছনে ছনের ভাঙা ঘর। মাটির ভিত। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরটা ভালো দেখা যায় না। সেখানে পড়ে আছে ইঁদুরে কাটা বহুদিনের না লেপা মেঝে। কিছু মাটির হাঁড়িকুড়ি, পানির কলস আর নড়বড়ে চকি।
-দিনডা উপাস কাডাইছো? পিডা খাও। নতুন চাইলের পিডা।
কারিগর হাত বাড়িয়ে পিঠা নেয়। বাদামি রঙের কাগজে পিঠা মুড়ে রাখে। উঠানের পাশে পড়ে থাকা সুপারি গাছের শুকনো ভাঙা ডাল টেনে এনে বসে নিলুফার। গালে হাত দিয়ে নিলুফার বাক্সের দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখতে দেখতে সম্মোহিত হয়ে যায়। দিন দুনিয়ার হুঁশ থাকে না তার। কী দেখনদার বাক্স! জিনের আসর বিস্মৃত হয়ে গীত ধরে বাক্সের রূপমুগ্ধ নিলুফার-  
মোতির মালা দিলা না, দিলা পুঁতির মালা
বাক্সের মধ্যে ভইরা রাখি আমার যত জ্বালা।।
কারিগর আর তাকায় না নিলুফারের দিকে। চিত্রপটে আঁকা ছবি হয়ে দুজন বসে থাকে। নিলুফারের উঠতে ইচ্ছা করে না। তার বুকের গহীন থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। সে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ বাতাসে মিশে কারিগরের কান পর্যন্ত পৌঁছায় কিন্তু তার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। পিঠার খালি বাটি হাতে নিয়ে নিলুফার উঠে দাঁড়ায়।
‘আমি যাই,’ সে করিগর কে বলে, ‘বাক্স ছাড়া দুইন্নাইত তোমার আর কিছু  নাই।’
কারিগর কিছু বলে না। নিলুফার চলে যায়। হারিকেনের আগুন কমিয়ে নিভু নিভু করে দেয় সে।  

রাতে ঘুম আসে না নিলুফারের। ঘরের দাওয়ায় বসে বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে সে আকাশ দেখে। দূর থেকে রাতের প্রহর ঘোষণা করে শিয়ালের ডাক। মাঝ রাতে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে। বাতাসের ঝাপটায় কেঁপে উঠে নিলুফার। রাতে দাওয়ায় বসে বাক্স নয় বাক্সের কারিগরের কথা ভাবে সে।
মনে মনে হাসে নিলুফার। আজব কারিগর! কারিগরের নাওয়া-খাওয়ার বালাই নেই। দুই মুঠ মুড়ি খেয়েও দিন পার করে দেয়। সারাদিন ঠুক, ঠুক, ঠুক। মাঝে মধ্যে কাজ থামায়। হাতের আঙ্গুলের দিকে অথবা বাক্সের দিকে চোখের পলক না ফেলে চেয়ে থাকে। একদিনও সে চোখ তুলে নিলুফারের দিকে তাকায় নাই। শ্যামল-সুন্দর, লম্বা-চওড়া-সাদামাটা কারিগরের বড় বড় চোখ দুইটা বড় টানে নিলুফারকে। সে চোখের ভাষা নিলুফার পড়তে পারে না। পড়ার আগেই তার ধন্ধ লাগে। ‘হায়রে পুরুষ!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিলুফার।
মন্ত্রপূত-মুশকিল আসান বাক্স নিলুফারের চাই। কে বেশি প্রিয় তার, বাক্স না বাক্সের কারিগর, সে বুঝতে পারে না। একটা প্যাঁচার ডাকে অলক্ষুণে অনুভূতি হয় নিলুফারের। ঠাণ্ডা বাতাসে তার দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি লাগে, নিজের কানে এই শব্দ শুনতে পায় সে।                
চোখে আচানক ঝিলিক লাগে নিলুফারের। রোশনি বরাবর তাকায় সে। মানুষের অবয়বের মতো লাগে তবু ঠিকঠাক ঠাহর করা যায় না। সে ছায়া সরে গেলে সরসর শব্দ ওঠে- আলোও সরে যায়। কলেমা পড়ে বুকে থুক দেয় নিলুফার। তার আর ভয় লাগে না। আলোর বিন্দু ধরে সে কিছুটা এগিয়ে যায়। করিগর। কোনো ভুল নাই। কারিগরের হাত থেকেই এমন কোমল আলোর আভা ছড়াবে। আলোর পেছন পেছন যায় নিলুফার।
এঁদো ডোবার স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। সেখানে বুনোমশার আখড়া। মিহি কুয়াশার আবরণে মাঠ ঢাকা। শনশন বাতাস শব্দ তোলে সেগুন, পাকুড়, বট আর জারুলের পাতায়। কুদরতি বাক্স হাতে নিয়ে খুব ভালো লাগে নিলুফারের। রাতের অন্ধকারেও তসবীর মত জ্বলছে বাক্সটি। নিলুফার বুঝতে পারে না কেন বাক্সটা থেকে এমন আলো বের হয়।  কারিগরের জাদুবিদ্যা হতে পারে, এভাবেই সে ব্যাপারটা ভাবে।      
বাক্স পেয়ে বিস্মিত নিলুফার কারিগর কে জিজ্ঞেস করে, ‘আমারে দিলা?’
বাক্সের ওপর হাত দিয়ে খোদাই করা নকশা স্পর্শ করে সে, তার কাছে নকশা গুলোকে অপূর্ব  জীবন্ত মনে হয়। নিলুফার বাক্সটা খুলে। ‘তুমি আমারে খালি বাক্স দিলা!’ কটাক্ষ করে নিলুফার, ‘পুরুষ মানুষ!’
থেমে থেমে ঝিঁঝিঁ পোকার তীক্ষ্ণ ডাক শোনা যায়। একটুও ভয় লাগে না নিলুফারের। মনে পড়ে না তেঁতুল গাছের ব্রহ্মদৈত্য কিংবা বট-পাকুড়ের রক্তচোষা, হাড়খেকো শাঁকচুন্নির কথা।        
‘এই বাক্সে আমি হীরামতি, না, না, দুইডা জোনাকি রাইখাম,’ নিঃশব্দে হাসে নিলুফার।
ছুতার হাসে না। একটা পাকুড় গাছের ডালে হাত রেখে নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে থাকে নিলুফারের দিকে। নারিকেল গাছের লম্বা পাতা চুইয়ে চাঁদের আলো টুপটুপ করে ঝরে পড়ে দু’জনের মাথার ওপর। ওরা দুজন কুয়াশাবৃত হয়, দাঁড়িয়ে থাকে বৃক্ষের পাহারায়। কারিগরের দিকে তাকিয়ে চোখে বেগুনী রঙের ধাঁধাঁ লাগে নিলুফারের। দুহাতের আঙুল অবশ হয়ে আসে তার। হাত দুটো মুঠো করার শক্তি পায় না। গরম বাতাসের হলকা লাগে তার মুখে।  ঘোর প্রলয় ঘনায়।
এমন অন্ধকার। দুই চোখে কিছু দেখে না নিলুফার। জোয়ারের ঢেউ বিপুল বেগে আছড়ায়। একবার ডুবে, আরেকবার ভাসে সে। দম বন্ধ হয়ে যায়। দেখে মন পবনের নাও। নিলুফার সর্ব শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে নাওয়ের বৈঠা। রূপালি জল আর লতা গুল্মে পিছলে যায় হাত। ঘূর্ণিপাকের নাগরদোলায় ঘুরতে ঘুরতে জল ছেড়ে আকাশে যায় সে। মেঘে তারায় শূন্য মনে সে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরপাক খেয়ে পার হয় নগর-বন্দর, জঙ্গল-পাহাড়-সাগর। তারপর অনুকূল বাতাসে ঝরা পালকের মতো ভাসতে ভাসতে অচিন দুনিয়ার মাটিতে নামে। নরম ঘাসে মুখ গুঁজে নিঃশ্বাস নেয়।            
চোখ খুলে নিলুফার দেখে ছোট একটি মেয়ে কেঁদে কেঁদে পাথরের দিকে যায়। খালের ওপারে পাথরের জমিতে কাঁচা মরিচ আর টক বায়গুনের চারা ঘুমিয়ে আছে। চাঁদের আলোয় আশপাশ ফ্যাকাসে। মরিচ, টক বায়গু্‌ন এমনকি খালের ওপরের উঁচু ব্রিজটাও। মেয়েটাকে হাতছানি দিয়ে নিলুফার ডাকে- ‘এইরো আয়’। ছোট মেয়ে নিলুফারের দিকে তাকায় তারপর চলে যায়। চমকে ওঠে নিলুফার। মেয়েটি যে তার খুব চেনা, অবিকল তারই প্রতিরূপ। জোছনার মায়ায় বহুদিন আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পুনঃদৃশ্যায়ন দেখে নিলুফার।          
এই সামান্য দৃশ্যটি দেখে সে দূর অতীতে হারায়। মেয়েটি কেন কাঁদে তা সে জানে। একমাত্র পুতুল খোয়া গেছে। গ্রামসুদ্ধ খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত ছোট নিলু সারা রাত ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে উঠবে পুতুলটার জন্য। সব জানে নিলুফার। ব্যাকুল হয়ে সে নিজেকেই ডাকল, ‘নিলু, নিলু!’ ছোট্ট নিলু ঘরের দিকে যায় না।  
কাতর গলায় নিলুফার বলতে চায়, ‘তুই কই যাস, নিলু’ কিন্তু শব্দহীন হয়ে তাকিয়ে দেখে ডানা মেলে নিলু পরি হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠে যায় পরি। উড়ে যায় চাঁদের দেশে।    
নিলুফার কাঁদতে থাকে। তীব্র অভিমানে-দুঃখে তার পাঁজর চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তার ডান পাশে কাঠের বাক্স পড়ে আছে। নিলুফার হাত বাড়িয়ে খালি বাক্স কুড়িয়ে নেয়। সারা জীবনের অপ্রাপ্তি যেন এইমাত্র তাকে অন্তঃসার শূন্য একটি খালি বাক্সের পরমার্থ উপলব্ধি করায়। হাওয়ায় ভাসে বাক্সের কারিগরের নিঃশ্বাসের শব্দ কিন্তু কারিগর কে নিলুফার কোথাও দেখতে পায় না। কারিগরও চাঁদের দেশে গেল।    
ফের ক্লান্ত হয় তার চেতনা। সারা শরীর ভারী হয়ে আসে। এই প্রথম নিলুফারের গা গুলিয়ে ওঠে। মুক্ত স্তন জোড়া  স্ফীত হয়ে ভরে ওঠে দুধের স্রোতে। নিলুফারের মনে হয় তার ভেতর ভ্রুনসঞ্চার হয়েছে। সে সমাচ্ছন্ন হয়ে যায় অজাতকের স্নেহস্পর্শে। ঝাপসা চোখে নিলুফার তাকায়। বহুদূরে ধোঁয়াটে নীল অন্ধকারে।




..........................................
লেখক পরিচিতি
ইশরাত তানিয়ার জন্ম ৬ নভেম্বর, ১৯৮০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। বর্তমানে পিএইচডি করছেন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। কবি। গল্পকার। মানবিক সম্পর্ক, নৈরাশ্য, স্বপ্ন, প্রকৃতি, প্রেম, অতীন্দ্রিয়তা বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি এবং ভাবনা কেন্দ্র করে তাঁর সাহিত্যকর্ম আবর্তিত হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন