শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

পাপড়ি রহমান-এর গল্প : কুরবার আলি ও তার মন পবনের নাও

‘বেবাক পুরানা ভাইঙ্গা-চুইরা ফেলাইয়া নয়া নয়া কত কিসিম যে উঠতাছে! উঠতাছে! উঠতাছেই। উঠতে উঠতে আসমান ঢাইক্যা ফেলাইতেছে। যহন আসমানেও ওডনের আর জায়গা থাকব না, তহন হেরা আর কেমতে উঠবো?’

এই রকম নানান প্রশ্ন মাথার ভেতর পুরে কুরবান আলি ডিউটি করে। সিকিউরিটি গার্ডের নীল-উর্দি পরে সে বসে থাকে। আন্ডার কনস্ট্রাকশন বাড়ির না-গেইট না-খোলা ময়দানের পাহারাদারি করে সে। পাহারাদারি করে না ভেরেন্ডা ভাজে? কুরবার আলি বলে সে ডিউটি করে, সিকিউরিটি কোম্পানির লোকেরাও বলে সে ডিউটি করে। যাদের বাড়িতে পাহারাদারির কাজ করে তারাও বলে। শুধু শহরবানু বলে যে, সে ভেরেন্ডা ভাজে। ভেরেন্ডা কি বা কেমন জিনিস কুরবান আলি তেমন ভাল বুঝে না। সে বরং বুঝে ভেন্নাগাছ। যে ভেন্নাগাছের সবুজ পাতার ছুঃমন্তরে সে একদা কাবু হয়ে পড়েছিল।


তখন তার আট কি নয় বছর বয়স। ওই সময়ে তার সুন্নতে খতনা সম্পন্ন হয়। আর হাজাম চলে যাওয়ার পরপরই এক ঠেকি ভেন্নাপাতা মা তুলে এনেছিল। কুরবান আলির বিছানার তলায় পাতার ঠেকি সমান করে রাখতে রাখতে মা ভাল-মন্দ বলেছিল। কুরবান আলি তখন পাতা নাকি মাথা এইসবের কিই-বা বোঝে? বিছানার তলায় কাঁচা-সবুজ-পাতা দেখে সে ভালরকম ঝামেলার ভেতর পড়েছিল। হঠাৎ করে কাঁচাপাতার রাশি কেন তার বিছানার তলায়? মাকে যে জিজ্ঞাসা করবে তেমন সাহস তার হলো না। এমনিতেই নুনু কাটার যন্ত্রণায় বেশ কাবু ছিল সে। দুই-এক ফোঁটা রক্তও গড়িয়েছিল। আর ওই রক্তে সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ ভিজে গিয়েছিল। সাদা কাপড়ে রক্তের দাগ দেখে কুরবানের আতংক বেড়েছে বই, কমে নাই। রক্তভীতি নিয়ে গুটিয়ে থাকা কুরবান ভেন্নাপাতার আওভাও জেনে কি করবে? ফের যদি রক্ত গড়িয়ে ভাসাভাসি হয়? তার এত্তটুকুন নুনুর কি দুরাবস্থা হবে ভেবেই সে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। কিন্তু ভেন্নাপাতার আওভাও মা তাকে জানিয়ে দিল। পাতার ঠেক বিছানার তলায় চালান করে দিতে দিতে মা বলল,

‘ও কুরবান, কুরবানরে, পাতাপুতাগুলান কিন্তু ফেলাইয়া দিস না-রে বাজান। ছুতমুত যদি লাইগ্যা যায় তাইলে ঘাও আর টান ধরবো না।’

ঘায়ের কথা শুনে কুরবান আলি তড়াক করে লাফিয়ে উঠেছে। চোখ-মুখে আতংক ফুটিয়ে জানতে চেয়েছে,

‘কি কও মা? কিয়ের ঘাওঘুও? ঘাও যুদি অইব তাইলে মনিডা কাটলা কেরে?’

কুরবানের কথায় মা জোরে হাসতে গিয়েও থেমে গেছে। থাউক, বেচারারে আর ডর দেখাইয়া কাম নাই। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে মা বলেছে,

‘বেশতি চামড়াডা কাইট্টা ফেলাইছে। সাবধান না হৈলে ঘাওঘুয়ে ধরতে পারে। তাই ভেন্নাপাতা আইন্যা থুইলাম। ছুতমুত যদি আইতেও চায় পাতাগুলান আটকাইয়া থুইব।’

কুরবান আলির চক্ষুতে ততক্ষণে জল এসে গেছে। হাজামবেটা এমনিতে কষ্ট দিয়া ভাগছে। ফের যুদি ভূত বা পেত্নীর ছুত লাগে তাইলে তো দফা রফা হয়ে যাবে। ফলে সে মাকে অভয় দেয়। দিতে বাধ্য হয় বলেই বলে--

‘না মা-পাতাপুতা ফেলাইয়া দিমু না। তুমি কইলে পাতাপুতায় গতর ঢাইক্যাও ঘুমাইতে পারি।’

শুনে মা হেসে ফেলেছে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছে--

‘না-রে বাপ গতর ঢাকতে হইব না। খালি পৈতানের বালিশের তলায় কয়ডা থুয়া দিয়া ঘুমাইও।’

সবুজ ভেন্নাপাতা বাদামি-রঙ ধরতে ধরতেই কুরবআন আলি সে যাত্রা সেরে উঠেছিল।

কিন্তু শহরবানুর মতলব কি? টানা ১২ ঘণ্টা ডিউটি দেয়ার পরও সে কিনা অমন বলে! পান-খাওয়া লাল ঠোঁটদুটো বেঁকিয়ে-চুরিয়ে বলে, ‘হ্যাহ-বইয়া বইয়া ভেরেন্ডা ভাজে। আর কয় আমি খাইট্টা মরি। ডিউটি করি।’

শহরবানুর মতলবের তল কুরবআন আলি খুঁজে পায় না। অথচ বিয়ের পরপর সে কতোই না নরম-সরম ছিল। বাধ্যগত ছিল। প্রথম বউ হাজেরা বেগমের চাইতেও সে বশীভূত ছিল। পীরিতি আর যৌবনে মাখোমাখো ছিল। দুই-দুইটা ছাওয়ালও পয়দা দিল। আর ইদানিং কিনা এক্কেবারে বিগড়ে গেল! অথচ তখন তো কুরবান আলির অন্য টানটাও ছিল। হাজেরা বেগমের টান। হাজেরা বেগমের গতর-গাতর তার মুখস্ত ছিল আর শহরবানুরটা ছিল ঠোঁটস্ত। এখন? এখন সে হাজেরা বেগমের হদিশই জানে না। খায়-খরচাও দেয় না। কুরবান আলি এখন সবই ছেড়েছে। তবুও সে শহরবানুর মনের তল পায় না। শহরবানুকে কিছুতেই বশে আনা যায় না। সে ক্রমাগতঃ নাগিনীর মতো বিড়া পাকায়। বিড়া পাকাতেই থাকে। কুরবান আলি হাজার চেষ্টা করেও সে বিড়া খুলতে পারে না। খুলতে গেলেই শহরবানু আরও প্যাঁচায়। প্যাঁচায় আর প্যাঁচায়। প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে কাছির মতো শক্ত হয়ে যায়। কুরবান তখন ক্ষান্ত দেয়। আত্ম-সমর্পণ করে। সে বুঝে যায়-- নাগিনী এখন আর ঝাঁকার ভেতর চুপ করে ফণা বুজিয়ে থাকবে না।

টানা ১২ ঘণ্টা ডিউটি করেও মাত্র ৬ হাজার টাকা মাস কাবারে। এত কম টাকায় সংসার কিভাবে চলে? শহরবানু দুই-এক বাড়িতে ঠিকে ঝিয়ের কাজ করে। তাতেও সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আসে না। হয়তো এইসব কারণেই শহরবানু দিন কে দিন কুরবান আলির অবোধ্য হয়ে ওঠে। তার মেজাজ-মর্জি যেন চৈত্রের শুকনা পাতা। খানিক বাদে-বাদেই ঘূর্ণি তুলতে শুরু করে। আর সেই ঘূর্ণিতে কুরবান আলির দশা কাহিল। হাওয়া আর ধুলার খপ্পরে পড়ে কুরবান আলিও যেন ঘুরানি-রোগাক্রান্ত হয়ে ওঠে। চক্কর খেতে খেতে কুরবান ফ্যাতরা ফ্যাতরা হয়ে গেলেও শহরবানুর দিলে রহম হয় না। রহম নামে না। কুরবান আলির তখন বুক ফেটে কান্দন আসে। কেন তার নিজের মাইয়ানুকের এমন বেরহম দিল! অতীব দুঃখের এই যন্ত্রণা সে কাউকেই জানাতে পারে না। কুরবান আলির দুঃখ বা সুখ দেখার ইচ্ছা শহরবানুর নাই। তা থাকবেই বা কেন? দুই ছাওযাল জন্মানোর পরও তার দেহের কোথাও টাল খায় নাই। হয়তো তার মনের কোথাও টলে যায় নাই। আঁচড় লাগে নাই। নিশি যত গভীর হয়-- শহরবানুর রঙ্গ তত উছলে ওঠে! মাংসল দুই পা দুই ধারে ছড়িয়ে দিয়ে সে পানের বাট্টা খুলে বসে। সুপারি-জর্দা আর চুনের মিশ্রণে পুরুষ্ঠ ঠোঁটদুটো লাল টুকটুকে হয়ে উঠলেও সে বসে থাকে। যেন সে খানিক পরই ইচিং বিচিং খেলবে। পা দুটো টান টান করে মেলে দিয়ে খুব মিঠে গলায় গান গাইতে থাকে--

গুন গুন গুন গান গাহিয়া নীল ভোমরা যায়, সেই গানের গানের তালে ফুলের বলে ফুলের মধু উছলায়...

শহরবানু ঘুরে-ফিরে একই পংক্তি বারংবার গাইতে থাকে। আর কুরবান আলি ফের ঘূর্ণি হাওয়া আর ধূলার খপ্পরে পড়ে। শহরবানুর নিশি রাইতের রঙ্গ দেখে সে মনে মনে বেজায় রেগে ওঠে। মাগী-- কত মধুই না জমা করে রেখেছে দেহ আর মনে। ছাওয়াল দুইটা ধাই-ধাই করে বড় হয়ে উঠছে, কিন্তু মাগীর কোথাও রসের কমতি নাই। মধুর শেষ নাই!

যেসব মধ্যনিশিতে শহরবানু গীত-গানের রঙ্গ-তামশা করে আর পান খেয়ে ঠোঁটদুটো চায়ের লিকারের মতো করে তোলে-- সেইসব নিশিতে কুরবান আলির দম ফাঁপড় করে। সে রাতভর চক্ষুর পাতা দুটো এক করতে পারে না।

‘মাগীর জোয়ানকির ল্যাজ-মাথাডা খুইজ্যা পাইলাম না! দুই গ্যান্দা বিয়াইও কি হের গতরের ভাঁপ-তাপ কমে নাইক্কা?’

কুরবান আলির মনের-কথার-খই মনের বালিতেই ফুটতে থাকে। ঘুণাক্ষরেও সে এসব শহরবানুর কাছে প্রকাশ করে না। সে জানে এইসব কথা প্রকাশ করলে শহরবানু ফের বিড়া পাকাবে। বিড়া পাকাতে-পাকাতে সাক্ষাৎ নাগিনা হয়ে উঠবে। যাকে বলে এক্কেবারে দেবী মনসার ছুরত!


০২

পুরানা বাড়িগুলো ধামাধাম ভেঙেচুরে নতুন নতুন বাড়িঘর উঠছে। নতুন নতুন দরদালানের খুবসুরত চেহারায় বদলে যাচ্ছে ঢাকাশহর। রাস্তাঘাট প্রশস্ত হচ্ছে। পুরাতন চেহারার মালিন্য কবর দিয়ে ঝকঝক করছে নতুন চেহারা। নতুন আবাসন। আর নতুন নতুন মানুষ।

তেমনই এক ঝা-চকচকে চেহারার বাড়িতে কুরবান আলি থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত মোটামুটি পাক্কা হয়ে গেল। কুরবান আলি খুশি। খুশির উপর মহাখুশি। থাকার জন্য দেড়খানা ঘর। একখানা বাথরুম। গ্যাস-বাত্তি ফ্রি। খোলা গ্যারেজটাতেও হাঁটাহাঁটি করা যাবে।

সবচাইতে বড় কথা শহরবানুকে বস্তি থেকে সরিয়ে একটু ভালোভাবে রাখা। ভদ্দরলোকদের বাড়িতে শহরবানুকে ভদ্রভাবে রাখতে পারবে ভেবে কুরবান আলি নিদারুণ উল্লষিত। দেখা যাক, এইবার হয়তো শহরবানুর বিড়া-পাকানো বন্ধ হতে পারে। নাগিনার মতো ফোঁসফোঁস থেমে যেতে পারে।

ভদ্দরলোকদের বাড়িতে থাকা-শোওয়া হলে শহরবানুর দিলে রহন নামতে পারে। হয়তো তখন সে আর বলবে না-- হ্যাহ-- ভেরেন্ডা ভাজে!

পান-খাওয়া-লালঠোঁট বাঁকিয়ে-চুরিয়ে শহরবানু কতভাবেই না বলে যে সে ভেরেন্ডা ভাজে। মনে হলেও কুরবার আলির চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে। আর তখন গোপনে শহরবানুকে ইচ্ছেমত গালাগাল করে।

‘মাগী কয় রসের কতা! ভেরেন্ডা ভাজি আমি? তাইলে তুই কি করস? ওই ভেরেন্ডা ঘানিত ফেলাইয়া তেল বাইর করস না?’

কুরবান আলির তখন ফের ভেন্নাগাছের পাতার কথা ইয়াদ আসে। বড় হয়ে সে জেনেছিল ভেন্না দিয়ে ভাল তেল হয। আর সে তেল বেজায় উপকারি!


কিন্তু ভেন্নাগাছ বা ভেন্নাতেল যত-যাই কিছু ভাবুক না কেন-- কুরবান আলির বিপদ আসে। যেন বা জ্বীন-পরীর কারসাজিতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা। ভেন্নাগাছ বা ভেন্নাতেলের ভাবনা করেও কুরবান আলি তাকে ঠেকাতে পারে না।

নতুন চাকরি-- নতুন বাসস্থান আর প্রভূত নিরাপত্তা ফেলে শহরবানু হঠাৎ লাপাত্তা হয়ে যায়। কুরবান আলি যথাসাধ্য খোঁজপাত্তা লাগিয়েও তার হদিস করতে পারে না।

এতদিনের সংসার, স্বামী-সন্তান ফেলে শহরবানু কোথায় নিরুদ্দেশ হলো? কুরবান আলি হাপুস নয়নে কাঁদে। নিজের চেহারা গতরের দিকে তাকালে তার কান্না আরও বেড়ে যায়। বয়স তো তার যাই-যাই অবস্থায়। খুব বেশি পরিশ্রম সে আর করতে পারে না। গায়ের চামড়ায় আগের সেই মসৃণতা নাই। খোঁচা-খোঁচা দাঁড়ির প্রায় সবটাই সাদা। দুই-একটা দাঁড়ি এখনো দাঁড়কাকের মতো কালো চেহারা নিয়ে তাকিয়ে থাকে।

কুরবানের এমত অবস্থা তো আচানক হয় নাই। এই বে-দশা হয়তো ধীরে ধীরেই হয়েছে। শহরবানু তবুও তার সংসারেই ছিল। কিন্তু এমন কি হলো যে সে পালিয়ে গেল!

পাক্কা সাতদিন পরে শহরবানুর সংবাদ পেল কুরবান আলি। খুন, হত্যা, জখম, অপহরণ এসব কিছুই না, শহরবানু স্বেচ্ছায় অন্য মরদের সাথে চলে গেছে। চলে গেছে ইয়াকুব মিয়ার হাত ধরে। ট্রাক ড্রাইভার ইয়াকুব মিয়া-- কুরবান আলির ঘরের পাশেই তার ঘর।

ইয়াকুব মিয়ার সাথে শহরবানুর আশনাই কখন বা কিভাবে হল? কুরবান আলি যখন ভেরেন্ডা ভাজতে ভাজতে দিন পার করেছে তখন নাকি?

শহরবানুর গীত-গানের রঙ্গ এক্ষণে স্পষ্ট হয় কুরবানের কাছে। পাশের ঘরে নাগর থাকলে কত রঙ্গই না তখন জানান দিতে ইচ্ছা করে।


০৩

বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে কত কিছুই যে সামলাতে হয়। পিতৃশোক, মাতৃশোক এমনকি সন্তান হারানোর শোকও তো মানুষ সামলে ওঠে। বাবার লাশ কবরে শুইয়ে এসে সন্তানকে খাবার খেতে হয়। সন্তানকে গোর দিয়ে এসেও তো মানুষ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করে। শহরবানুর দেয়া যন্ত্রণাও কুরবান আলি ভুলতে শুরু করল।

তবে নতুন চাকরি তার জন্য অতটা সুখপ্রদ হয় নাই। পূর্বে যে কথাবার্তা হয়েছিল তা কুরবান আলি বহাল রাখতে পারে নাই। শহরবানুকে সঙ্গে নিয়েই তার পাহারাদারির কাজে যোগ দেয়ার কথা ছিল। এক্ষণে সে চাকরি ঠিকই করেছে। কিন্তু হেট-মাথা অবস্থায়। শহরবানুকে নিয়ে সে নতুন বাড়িতে উঠতে পারে নাই। কোথায়ই বা শহরবানু? আর কোথায়ই বা ছাওয়াল ধুটো? ছাওয়ালদের শেষ অব্দি হাজেরা বেগমের এখতিয়ারেই রেখে আসতে হয়েছে।



কুকথা নাকি বাতাসের আগে আগে দৌড়ায়। ফলে শহরবানুর পরগামীর কথা কারোরই প্রায় অগোচরে নাই। কুরবান আলি ঘাড় তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারে না। বউ ভেগেছে অন্য লোকের সঙ্গে-- এহেন অবস্থায় কাজ-বাজই বা কিভাবে করে?

বউয়ের কুকর্মে তাকে মাটির সাথে মিশে থেকে কাজ সারতে হয়। মাটির সাথে মিশতে মিশতেই সে শহরবানুকে গালমন্দ করে।

‘খানকিমাগী--ভাগলি তো ভাগলি এমুন অসময়ে ভাগলি। রাজা-বাদশার চাকরির কদরডাও তুই বুঝলি না? দেড়খানা থাকনের ঘর, একখানা পাকসাকের। গ্যাস-বাত্তি ফ্রি!’

পাহারাদারির ফাঁকে-ফাঁকে শহরবানুর সঙ্গে সংসার জীবনের নানান স্মৃতি তার মনে উদিত হয়। তখন কুরবান ফের কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ডুকরে ওঠে।

‘তোর মনের চাবি কেডায় চুরি কইরা নিল রে বানু? তুই আমার গ্যান্দা দুইডার কথাও কি ভাবলি না? তুই কেন আমারে ফেলাইয়া ইয়াকুব মিয়ার লগে গেলি? ওইডা কি কুনু বেডার জাত নাহি? কালা তো কালা, আমার চাইয়াও শতগুণ কালা। কালা তোরে কেমনে বশ করিল রে!’


এর মাঝে হঠাৎ দৃশ্য বদল হয়। হয়তো কুরবানের আকুল কান্নার জন্যই। দিন-পনের ইয়াকুব মিয়ার সাথে ঘুরেফিরে শহরবানু ফিরে আসে। ফিরে এসেই কুরবানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।


শহরবানু ফিরে আসার আনন্দে কুরবান দ্বিগুণ উৎসাহে দায়োয়ানগিরি করে। মনে মনে ফের নতুন স্বপন দানা বাধে।

‘থাউক, হেয় তো ফিরা আইছে। ভদ্দরনুকগো বাড়ি-ঘরে থাকলেই হের মন বইবো। সোমসারেও হেয় শান্তি আইন্যা দিব। ভদ্দরনুকগো দেইখ্যা চলন-বলনও শিখবো।’

কিন্তু কুরবান আলির ভাবনা বাস্তবে রূপায়িত হয় না। কারণ এইবার ফ্ল্যাট মালিকরা বাগড়া দিয়ে বসে। তাদের রায়-- কুরবান একলা থাকতে চাইলে থাকতে পারবে, কিন্তু ও ই চরিত্রহীনা স্ত্রীকে নিয়ে নয়।

মালিকদের নিষেধ উপেক্ষা করার সাহস বা শক্তি কুরবান আলির নাই। ফলে শহরবানু ছাড়াই চলে কুরবানের সংসার। কুরবানের পাহারাদারি।


ঝা-চকচক নতুন বাড়িতে এর পরের দৃশ্যাবলি খুবই সাধারণ। খুবই পানসে আর বিরক্তিকর। কুরবানের সুঠাম স্বাস্থ্য ক্রমে ভেঙে পড়তে থাকে। তবুও সে দারোয়ানগিরি করে। গেইটের টুলের উপর বসে ঝিমায় আর পান খায়।

কুরবান আলির মুখে আগের সেই হাসি নাই। মনের ভেতর আর কোনো আশা-ভরসাও নাই।

নিজের বয়সের কতা ভেবে, চেহারার দিকে তাকিয়ে সে ফের বিলাপ করে কাঁদে।

‘হায়রে! আইজ আর সেই তাগদ নাই! হাজেরা বেগমরে যহন বিয়া করি তহনকার তাগদ। বাদে শহরবানুরে নিকা কইরা আনলাম। শহরবানুর বাদে আর কারুকে আনন গেল না!’

কুরবান আলির বিরক্তিকর একঘেয়ে কান্নাকাটি পাহারাদারিতে ওই ঝাঁ-চকচক নতুন বাড়িটাও কেমন একঘেঁয়ে হয়ে ওঠে। ক্রমান্বয়ে বিরক্তিকর।

ফের দৃশ্যাবলি বদলে যায়। শহরবানুকে কুরবান আলির টুলের পাশে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়। উজ্জ্বল হলুদ রঙের ফুলতোলা সারোয়ার কামিজ পরনে। চূঁড়া করে চুল বাধাতে তাকে কেমন ছুকরি ছুকরি দেখায়।

পরপর তিনদিন একই দৃশ্য দেখার পর ফ্ল্যাটের মালিকরা আপত্তি তোলে। কুরবানের কুলটা বউ এইখানে আসে কেন?

পরদিন প্রায় বিনা প্রতিবাদে কুরবান আলি ওই বাড়ি ছেড়ে চলে আসে। এবং চাকরিতে ইস্তফা দেয়।

চাকরি ছাড়ার সময় ওই ঝা-চকচক বাড়িটা তাকে পিছু ডেকেছিল কিনা জানা যায় না। তবে দেড়খানা ঘর, একখানা বাথরুম, গ্যাস-বাত্তি ফ্রি, হাজার ছয়েক টাকা খুব ফেলনাও নয়। কিন্তু ওসবের চাইতেও আধবেলা-একবেলা না-খাওয়া, শহরবানুর বিড়া-পাকিয়ে থাকা তার কাছে অধিক গ্রহনীয় মনে হয়েছিল। ইয়াকুব মিয়ার সঙ্গে নিজ স্ত্রীর দিন পনেরোর কাম-প্রেমের জীবন ওইসব সুখের কাছে তুচ্ছ!

আদতে কুরবান আলির মনের নাও ভিড়েছিল শহরবানুর ঘাটে। যে ঘাট পিচ্ছিল হলেও উত্তেজক। জল কম হলেও যাদুমাখা। কুরবান আলি হয়তো হিসাব মিলিয়ে ছিল এইভাবে--

‘হাজেরা আর শহরবানুর বাদেও তো আরও দুই-চারজন সতী-অসতীগো আমিও ছুইছি-ছানছি। আশনাই আর কামে ভিজা জবজবা হইছি। ইয়াকুব মিয়ার লগে শহরবানু দিন পনেরো গুজরাইয়া আইছে, আসুক। হে তো হেরে বাইন্দ্যা থুইতে পারে নাই। ফিরা যহন আইছে তহন সে আমারই আছিল। শরীল-গতরের নিশা হৈল কাচের বাসন। ভাইঙ্গা যায়। মনের নিশা হৈল পেতলের থালা-- ময়লা-কালি পড়ে কিন্তুক না-ভাঙ্গে। শহরবানু এইবার ফির আসল বইল্যা ফিরা আইছে।’

কুরবান আলির এই জীবনদর্শন ঢাকা শহরের শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিতদের কাছে হয়তো গ্রহণীয় মনে হয় নাই। হয়তো হাস্যকর ঠেকেছিল। অথবা সেরকম কিছু নাও হতে পারে।


তবে কুরবান আলি তার পুরানা সংসার জুড়ে নিয়েছিল। যেভাবে কেউ নতুন কোনো সংসার জুড়ে, ঠিক সেইভাবে!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন