শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

অবিরত ধর্ষণ

বিপুল দাস

এক

আজ তেইশে ফেব্রুয়ারি। চয়ন ঘোষালের আজ জন্মদিন। হাফকিলো মাংস কিনবে বলে চয়ন আজ বেশ সকালে উঠেছে। হারুণের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সে প্রকৃত পাঁঠা চেনার চেষ্টা করছিল। যদিও ব্রজ সরখেল একবার তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে ছাগল এবং পাঁঠা চেনা যায়, কিন্তু ব্রজ তাকে একই সঙ্গে বলেছিল সেখানেও নাকি কসাইরা চোখে ধুলো দিতে পারে। ওদের হাতের সুক্ষ্ম কাজ দেখলে বড় বড় সার্জেনও লজ্জা পাবে। ডাক্তার তো দূরস্থান, পন্ডিতমশাইও ওদের মত লিঙ্গান্তর করতে পারবে না।


চয়ন এসে দেখল হারুণ তখন সদ্য একটা মাল নামিয়েছে। ঝোলানো গোলাপি শরীরটা জল দিয়ে ভালো করে স্নান করাচ্ছে। মানুষ হলে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে তাকে ভালো করে স্নান করানো হয়। ছাগল, খাসি, পাঁঠার বেলায় ধড়মুন্ডু আলাদা করে, চামড়া ছাড়িয়ে ঝোলানো হয়। তারপর জল দিয়ে রগড়ে রগড়ে স্নান করানো হয়। চয়ন দেখল গোলাপি বডিটার গলা, বুক এবং পায়ের পেশি তখনও তিরতির করে কাঁপছে। প্রাণহীন শরীর, তবু আক্ষেপ মরে না। যেন মায়ার মত জড়িয়ে থেকে আশ্রয়কে আবার বাঁচিয়ে তুলতে চায়। মাংস কি জানে তার মরণের কথা। মাংস কি জানে হারুণের দোকানের সামনে মাংসভুক জনতার মেটে কিংবা টেংরি-বিলাসিতার কথা। মাংস তিরতির করে কাঁপে শুধু। বোঝে না -- কলজেটা, রক্ত সাপ্লাই দেবার কল যেটা – নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে সে ফালতু হয়ে যায়। তখন মাংসখোর পাবলিক খুব হল্লা করে। হাড়মাংস আলাদা হতে থাকে হারুণের মাংসকাটা ছুরির দাপটে।

সকালবেলার নরম রোদ্দুর এসে পড়েছে গোলাপি দাবনার ওপর। জল চিকচিক করছে। চয়ন এখন নেবে না। জল একটু ঝরুক। এখন নিলে মাংসের দরে অনেকটাই জল কিনতে হবে। চয়ন অত বোকা নয়। একটু ড্রাই হোক। আজ রবিবার না হলেও সে হাফকিলো মাংস নেবে। আজ তেইশে ফেব্রুয়ারি। চয়নের আজ জন্মদিন। আজ তার বয়স পঁয়ত্রিশ পূর্ণ হল। ছত্রিশ শুরু হয়ে গেল। ছত্রিশ বছর ব্যাপারটা বেশ পিকিউলিয়ার। ঠিক যুবকও নয়, আবার মধ্যবয়সিও বলা যায় না। পেছনের টেরিংর দিকে তাকিয়ে মনে মনে চয়ন সঠিক শব্দ খুঁজছিল। হঠাৎ-ই মনে পড়ল – অনতিপ্রৌঢ়। ঠিক শব্দ খুঁজে পাওয়ার পর বেশ খুশি হল সে।

নন্দিতা আজ পায়েস রাঁধবে। চয়ন টের পাবে নন্দিতা কখন কোথায় কী করছে, তবু সেই বাটিতে পায়েস এনে তার সামনে দিলে চয়ন বিস্ময়ে আকুল হয়ে খুশিতে ফেটে পড়বে। ফুলদানিতে লালগোলাপের তোড়া দেখে নন্দিতাকে জড়িয়ে ধরবে। আর বাবুসোনা ঘুমোলে নন্দিতা তাকে যখন কোনও স্পেশাল গিফট্‌ দেবে, চয়ন টের পাবে তার এই পুরুষশরীর একটা নারীশরীর অধিকার করবে বলে ভয়ংকর ভাবে জেগে উঠছে।

কেন এসব আয়োজন করেছ বল তো। বুড়ো হতে চললাম, খুব লজ্জা করে।

চুপ, বুড়ো সাজতে খুব ভালো লাগে, না ? দাঁড়াও না, এত তাড়াহুড়ো করছ কেন। পালিয়ে যাচ্ছি নাকি। কেন করব না, তুমিই তো বলেছিলে এতে নাকি মানুষের আয়ু আরও বাড়ে। দাঁড়াও, আলোটা নিভিয়ে দিই। শার্টটা কেমন ?

দারুণ। মাংসটা ভালো ছিল না ? অরিজিনাল পাঁঠা। আজকাল তো পাওয়াই যায় না। আমাকে হারুণ ঠকাতে পারবে না। পেছনের টেংরি থেকে হাফ ... এ কী!

খারাপ লাগছে। কী করব বলো ? কে জানে এবারই ডেট এগিয়ে আসবে।

ভ্যাট, দিলে সব মুড নষ্ট করে। একটা শুভদিন ...

হারুণের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নাইন বুলেটস্‌ ক্লাবের সাইনবোর্ডের ওপর তাকিয়ে চয়ন দেখেছিল একটা শালিখ একা বসে রয়েছে। তখনই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। নিশ্চয় খারাপ কিছু ঘটবে। এ সব চয়ন মানে। জোড়া শালিখ দেখলে চিরকাল যন্ত্রচালিতের মত ডানহাত কপালে ঠেকিয়ে এসেছে। এসব ব্যাপারে চয়নের কোনও লজ্জা নেই। হাতটা একবার কপালে ঠেকালে যদি ভালো কিছু হয়, তবে ক্ষতি কীসের। পথে বেরোলে কত শনিমন্দির, কালীমন্দির, জোড়াশালিখ, মনসাতলা। চয়ন কপালে একবার হাত ছোঁয়ায়। ঘর থেকে বেরোনোর সময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গুরুদেবের ছবি প্রণাম করে। বিয়ের পর নন্দিতাকে বলে দিয়েছিল। নন্দিতাও করে। এ কথা তো মিথ্যে নয়, গুরুদেবের ছবি এখানে টাঙানোর পরের সপ্তাহেই সে তিস্তা ব্যারাজের কাজটা পেয়ে গেল। তারপর, তন্ত্রসিদ্ধ জ্যোতিষী শ্রীশ্রী মিহিরভারতীর কথা মত পোখরাজ ধারণ করার পরের মাসেই বহুদিনের ঝুলে থাকা কেস মহামান্য আদালত ডিসমিস করে দিল। আছে, কিছু একটা পাওয়ার ঠিকই কাজ করে। সব কিছু তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পৃথিবীতে কত রহস্যময় ব্যাপার রয়েছে, বিজ্ঞানের বাপের সাধ্যি নেই সে সব ব্যাখ্যা করার। টিভির একটা চ্যানেলে এ সব দ্যাখায়। অতৃপ্ত আত্মার প্রতিহিংসা, জাতিস্মর বালকের আশ্চর্য কাহিনি, পোড়োবাড়ির রহস্য। চয়ন খুব মন দিয়ে প্রোগ্রামটা দ্যাখে। আজারবাইজানে একটা গাছে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে গলগল করে রক্ত বেরোতে থাকে। আমেরিকার ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে অরিজিনাল ব্লাড। আননোন গ্রুপের। তাছাড়া বার্মুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্য তো বিজ্ঞানীরা কিছুই ধরতে পারল না। আস্ত জাহাজ, এরোপ্লেন লোকজনসুদ্ধ হাপিশ হয়ে যাচ্ছে। কেউ কোনও হদিশ করতে পারছে না। পশ্চিম তুরস্কের একটা পাহাড়চূড়ায় প্রত্যেক বছর মহরমের রাতে দুজন মহিলা বাতাসে মিশে যায়। সাহারা মরুভূমির এক জায়গায় ঠিক দুপুর বারোটার সময় অসম্ভব শীত নেমে আসে। এসব তো আর বানানো কথা নয়। টিভিতে একজন ইংরেজিতে বলছিল, কিন্তু হিন্দিতে প্রসারণ করা হচ্ছিল। এটাকে বলে ডাবিং করা। চয়ন নিজের চোখে দেখেছে, নিজের কানে শুনেছে। আরে বাবা আছে, আছে। বললেই তো আর হল না।

চয়ন মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়েছিল। একটু বাদেই তার নাক ডাকতে শুরু করলে নন্দিতা সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বিছানার পাশে একটা ছোট টুলের ওপর সুন্দর টেবিলক্লথ পেতেছিল নন্দিতা। তার ওপর ফুলদানিতে একগোছা লালগোলাপ। চয়ন যাতে কিছু বুঝতে না পারে, সেজন্য লুকিয়ে লুকিয়ে সব আয়োজন করেছে। একবাটি পায়েস তার সামনে এনে ধরলে কী খুশি হয় চয়ন। ঘুম ভাঙার পর হ্যাপি বার্থ ডে বললে চয়নের ঠোঁট নেমে আসে তার ঠোঁটের ওপর। কী ভালো লাগে তখন।

কিন্তু এখন নন্দিতার ভীষণ খারাপ লাগছিল। প্রথম প্রথম তার পিরিয়ডের দিনগুলোতে চয়ন আলাদা শুত। এখন আর অতটা মানে না। চয়নের বেশ মানামানির বাতিক আছে। তিথিনক্ষত্র, পঞ্জিকা দেখে তার সঙ্গে সহবাসের পর গ্যারান্টি দিয়ে বলেছিল – দেখো, আমাদের ছেলে হবেই। নন্দিতা মনে মনে ঠাকুরকে ডেকেছে। তার ছেলে বা মেয়ের জন্য নয়, চয়নের যেন মুখরক্ষা হয়।

চয়নের দিকে ফিরে শুল নন্দিতা। হাত বাড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। খুব খারাপ লাগছিল তার।

ঘুমিয়েছ ? মৃদু স্বরে বলল নন্দিতা। গোলাপের গন্ধ ঘরে ছড়িয়ে রয়েছে। এখন চয়নের নাক ডাকছে না। হয়তো সে মিথ্যে মিথ্যে ঘুমোচ্ছিল। চয়নকে তার দিকে একটু ঘুরিয়ে টানল নন্দিতা। আবারও ডাকল। এবার একটু জোরে। লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসল চয়ন।

শান্তিতে কি ঘুমোতেও দেবে না ? রাতদুপুরে হল্লা শুরু করেছ।

আস্তে, বাবুন ঘুমোচ্ছে। অনেক কষ্টে ঘুম পাড়িয়েছি।

হ্যাঁ, কষ্ট তো করতেই হবে। পয়সা রোজগার করতে আমার কষ্ট হয় না ? কোথায় দূরে দূরে ক্যাম্প করে থাকতে হয়। রোদবৃষ্টির মধ্যে কাজের দেখাশোনা, খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই। তোমার হাজারগুণ কষ্ট আমার মা-ঠাকুমা করেছে। তোমার না কুয়ো থেকে জল তুলতে হয়, না কয়লা ভাঙতে হয়, না উনুনে চ্যালাকাঠ ঠেলতে হয়। বাচ্চা ঘুম পাড়িয়ে অত শোনানোর কী হয়েছে।

রাগ করেছ ? আমার কী দোষ বল।

তোমার কেন দোষ হবে, সব আমার এই লাক। সকালে এক শালিখ দেখেই বুঝেছিলাম আজ আমার কপালে দুঃখ আছে। সরে শোও, বিরক্তি লাগছে। আর একটা কথা, তুমি নাকি কমলদের বাড়িতে গিয়ে বলে এসেছ শীতের রাতে নীচে শোওয়ার দরকার নেই। বিছানায় শুতে বলেছ। চিরকালের নিয়মকানুন, শাস্ত্র, আচারবিচার – এসব কি মানুষ এমনি এমনি মানে। ওদের কালাশৌচ চলছে, তুমি কেন পন্ডিতি দেখাতে গেছ। তোমার কোনও আইডিয়া নেই, জীবিত আত্মার চেয়ে মৃত আত্মা কত বেশি পাওয়ারফুল। নিয়মের একটু এদিক ওদিক হলে অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

নন্দিতা চুপ করে রইল। চয়নের মেজাজ কেন বিগড়ে গেছে, সে স্পষ্টই বুঝতে পারছিল। এখন যদি নন্দিতা চয়নের কথার পিঠে কথা বলে, যদি বলে মৃত আত্মা বলে কিছু হয় না, শাস্ত্রেই আছে আত্মা অবিনশ্বর, জলে ভেজে না, আগুনে পোড়ে না, কোনও অস্ত্র দিয়ে ভেদ করা যায় না, তবে সে মৃত হয় কী করে – চয়ন তা হলে ভয়ংকর হয়ে উঠবে।এর আগেও এ রকম হয়েছে।

একবার বাবুনের ডায়ারিয়ার সময় নন্দিতা তাকে বারে বারে নুনচিনির জল খাওয়াচ্ছিল। ঘরে কোনও ওষুধ ছিল না। অত রাতে ওষুধের দোকানও খোলা পাওয়া যাবে না। চয়ন বারোন করেছিল। বলেছিল ওর পেটে এই শরবত গিয়ে আরও ক্ষতি করবে। নন্দিতা শোনেনি। সে জানত ডিহাইড্রেশন হয়ে যেতে পারে। চয়নের বারণ না শুনে আবারও বাবুনকে নুনচিনির জল খাইয়েছিল। ডিহাইড্রেশনের কথা বলেছিল। ব্যস, শরবতের গ্লাস ছুঁড়ে ফেলেছিল চয়ন।

আর একদিন। চয়ন তার ঠিকাদার বন্ধুদের নিয়ে ছোট অফিসঘরে বসে রাতে আড্ডা মারছিল। একবার রান্নাঘরে এসে নন্দিতাকে বলে গিয়েছিল গরম গরম মাছ ভেজে প্লেটে সাজিয়ে ও ঘরে দিয়ে আসতে। নন্দিতা জানে ওখানে মদের আসর বসেছে। কোথায় অকশনে গিয়ে শস্তায় দাঁও মেরে এসেছে। বন্ধুদের নিয়ে সেলিব্রেট করছে।

প্লেটে মাছভাজা সাজিয়ে ও ঘরে যেতে নন্দিতার সংকোচ হচ্ছিল। চয়ন যখন কোনও দিন একা একা গ্লাস নিয়ে বসে, তখন অসংকোচে সামনে গিয়ে বসেছে, কথা বলেছে, প্লেট থেকে মেটেচচ্চড়ি তুলে চয়নই তার মুখে ধরেছে। একটু মদ খাবার পর চয়ন কেমন যেন আলাদা হয়ে যায়। তখন মনেই হয় না সে রেগে গেলে নন্দিতার হাত মুচড়ে ধরতে পারে, অনায়াসে অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। নন্দিতাকে যাচ্ছেতাই বলে অপমান করতে পারে। চয়নের ভালোবাসায় তার কান্না পায়। অথচ যখন অপমান করে, ব্যথা দেয় – তখন ভেতরটা কেমন পাথরের মত শক্ত, ঠান্ডা হয়ে যায়।

সেদিন চয়নের ইচ্ছে ছিল নন্দিতা নিজে এসে সবার সামনে মাছভাজার প্লেট সাজিয়ে দিয়ে যাক। হয়তো সে তার বন্ধুদের কাছে এ রকমই গল্প করেছিল। হয়তো হাসতে হাসতে বলেছিল – আরে দাঁড়া না, বউকে বলেছি। এখনই দিয়ে যাবে। নেশাতুর কিছু চোখ অপেক্ষা করে ছিল। নন্দিতা ও ঘরে যেতে চায়নি। বলেছিল – তুমি নিয়ে যাও। আমি যাব না। আমার ভালো লাগে না। কে জানে, সেদিন সে কোথা থেকে চয়নকে অস্বীকার করার সাহস পেয়েছিল।

আরে তুমি কি ওখানে বসে থাকবে নাকি ? জাস্ট প্লেটটা রেখে, একটা দুটো কথা বলে চলে আসবে। মজুমদারসাহেব তো তোমাকে দেখেই নি, বলছিল। এস্টিমেটর, বর্ধমানের লোক। তোমার বাপের বাড়ির ও দিককার। নতুন বউ-এর মত লজ্জা কোরো না। এসো, দেরি কোরো না তো।

শোনো, রাগ কোরো না। প্লিজ, আমি পারব না।

একদম ঢং করবে না। নিজের বাড়িতে, আমি রয়েছি, অত সতীলক্ষ্মীপনা দেখানোর কি হয়েছে। ওরা কি অ্যান্টিসোশ্যাল? সবাই জেনুইন ভদ্রলোক। অকশনে ... ভাবতেই পারিনি বিড নিতে পারব। একটা আনন্দের দিন, তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। আমি কিন্তু আর রান্নাঘরে আসব না। দশ মিনিটের ভেতর যেন সব ভাজা হয়ে যায়।


নন্দিতা যায়নি। নন্দিতা যেতে পারেনি। মাতালদের আসরে মাছভাজা সাজিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভেতরে যে গ্লানি, যে মলিনতা শরীরমন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, নন্দিতা সেই ম্লান ছায়া এড়াতে চেয়েছিল। প্লেটে মাছভাজা সাজিয়ে রেখে সে তার ঘরে এসে বাবুনকে নিয়ে শুয়ে পড়েছিল।

রাতে চয়ন তার হাত মুচড়ে ধরল। তার বাবা মার সম্পর্কে খারাপ কথা বললে নন্দিতার শরীরমন ক্রমশ শক্ত পাথর হয়ে উঠছিল।

তোর কোন অভাবটা রেখেছি, বল। নন্দিতার ডানহাত ঘুরিয়ে পিঠের দিকে এনেছিল চয়ন।

উঃ, লাগছে।

শালি, পুজোয় তিন তিনটে দামি শাড়ি, তোর ছোটবোনের বিয়েতে সোনা – তোর কোন ভাতার দেবে। আর আমার একটা কথা শুনতে তোর সতীপনায় লেগে গেল। মজুমদারসাহেব, সাইটের পঞ্চায়েতপ্রধান সফিকুল, সরখেলবাবু, নারান পোদ্দার – সবার সামনে যে আমার পেছন মারা গেল, একবার বুঝলি না। তোকে কি ওদের সঙ্গে শুতে বলেছি, অ্যাঁ ? অত দেমাক তোর কোথা থেকে আসে, হারামজাদি। তোর কীসের অত ফুটানি। বংশের, না টাকার গরম, না রূপের ? নাকি আমার সঙ্গে বি এস সি মারাচ্ছিস ?

নন্দিতার হাত যেখানে কাঁধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, সেখানে যন্ত্রণা হচ্ছিল। নন্দিতার মনে হচ্ছিল চয়ন জোর করে তার শাড়ি খুলে নিচ্ছে। আসরের সবাই হাসছে। মজুমদারসাহেব ইশারা করছে তার থাই-এর ওপর গিয়ে বসার জন্য। ব্যথায় নন্দিতার মুখ বেঁকে যাচ্ছিল।

টলতে টলতে চয়ন গিয়ে বাথরুমে ঢুকল। হড়হড় করে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বমি করছে – নন্দিতা টের পেল। তার নিজেরও বমি পাচ্ছিল। শাড়িসায়াব্লাউজ পরা থাকলেও মনে হচ্ছিল তার শরীরে কোনও আবরণ নেই। নিরাবরণ সে আড়াল নিয়েছে প্রচন্ড শীতের রাতে কোনও পুকুরের জলের গভীরে। হিম ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে।


দুই

থার্মোমিটারের পারদ একশ চারের ওপর চলে যাচ্ছে, বাবুনের জ্বর কমছে না। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন বাচ্চাদের জ্বর হলে অনেক সময় টেম্পারেচার খুব বেশি উঠে যায়, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বারে বারে মাথা ধুইয়ে দিতে হবে, সঙ্গে জ্বরের ওষুধ। কিন্তু নন্দিতা ভয় পাচ্ছিল। ভাবছিল ব্লাড টেস্ট করাতে হবে, আজেবাজে অসুখের কথা খুব শোনা যাচ্ছে। ডেঙ্গি, চিকনগুণিয়া, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড। নন্দিতা ঠাকুরকে ডাকছিল।

অনেক রাতে চয়ন ক্যাম্প থেকে ফিরল। তার এখন নদীর ওপর কালভার্ট তৈরির কাজ চলছে। নামেই নদী, মাগুরমারি আসলে খাল। আজ তার সাইটে ডিপার্টমেন্টের ইঞ্জিনিয়ার আসার কথা। সকালে পুজোআচ্চা, প্রণাম ইত্যাদি সেরে অনেক হিসেব কষে চৌকাঠের বাইরে পা ফেলেছে। নন্দিতা বুঝতে পারছিল চয়ন আজ টেনশনে আছে। বেরনোর সময় -- বাবুনের জ্বর এসেছে বা তাড়াতাড়ি ফেরার কথা বলেনি। চয়ন বেরিয়ে গেলেই রিকশা ডেকে ছেলেকে নিয়ে ডাক্তারখানায় গিয়েছিল।

রাতে চয়ন ফিরলে নন্দিতা দেখল চয়নের পা টালমাটাল। নন্দিতা নিজেকে প্রস্তুত করল।

বাবুনের জ্বর নামছে না। দেরি করলে কেন ?

নামবে না তো। নামবে না, আমি জানি।

মানে ? কী বলছ তুমি ?

তুমি, তোমার নজরের কথা বলছি। কী মনে কর, আমি খেয়াল করিনি ? সেদিন তোমার শরীর খারাপ ছিল, অথচ দেখলাম তুমি দিব্যি আমার জন্মদিনের পায়েস রাঁধলে। শুভকাজ করলে অশুচি শরীর নিয়ে। পৃথিবীসুদ্ধ লোককে উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছ। যার ওপর তোমার দৃষ্টি পড়বে, ব্যস, তার হয়ে গেল।

কী বলছ তুমি!

তোমার জন্য এবার বৃষ্টি কম হয়েছে, মাঠের ফসল মাঠেই শুকিয়ে গেছে। তোমার জন্য আমার একটা টেন্ডার বাতিল হয়েছে। তোর নজরে কালাহান্ডিতে খরা। তোর জন্য পেট খসে যায় ভরা পোয়াতির। তোর জন্য ইতালির গ্রামে মড়ক। তুই কেন বাঁচিয়ে তুলিস ডায়ারিয়ার পেশেন্ট। তোর জন্য শালি আমার নতুন কালভার্ট ভেঙে যায়। রতন সরেনের লড়াইবাজ মোরগ মরেছে তোর নজরে।

চয়ন টলছিল। চয়নকে আজ তার সাইটে এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার যাচ্ছেতাই বলেছে। একটা টোকা দিতেই কালভার্টে কংক্রিটের চাঙড় খসে পড়েছে। চয়ন ভুল জায়গায় সমঝোতার কথা তুলেছিল। সাহেব বড় একগুঁয়ে। বারে বারে সিমেন্টবালির প্রোপরশনের কথা বলছিল। লোকাল লোকজন বলেছে কালভার্ট প্রথম থেকে বানাতে হবে। নেশার ঘোরে চয়ন অনেক উল্টোপালটা কথা বলছিল, কিন্তু নন্দিতা পাথরের মত শক্ত শরীর, বরফের মত মন নিয়ে অন্য কথা শুনতে পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল এ সবই ডাইনিশিকারের পুরনো অজুহাত, নতুন ষড়যন্ত্র।

বিছানায় বাবুনের পাশে বসে আছে নন্দিতা। নন্দিতার পাশে চয়ন দাঁড়িয়ে আছে। নন্দিতা মুখ ঘুরিয়ে দেখল চয়নের হাতের কালো পোর্ট-ফোলিও ব্যাগ। যেন কেরোসিনের টিন। মাংসপোড়া গন্ধে ভরে উঠছে দশদিকের বাতাস। নন্দিতার গোলাপি থাই, গর্দানের মাংস কাঁপছে তিরতির করে। নন্দিতা চেষ্টা করে তার শরীরকে আরও পাথর, আরও বরফ করার। আগুন ও চপার থেকে এই শরীর ও আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তো।

লেখক পরিচিতি
বিপুল দাস

গল্পকার, উপন্যাসিক
জন্ম : ১৯৫০, থাকেন শিলিগুড়িতে।
গল্পগ্রন্থ: শঙ্খপুরীর রাজকন্যা
উপন্যাস : লালবল। সরমার সন্ততিরা। বর্ণশঙ্কর। 

৩টি মন্তব্য: