শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

অর্ক চট্টোপাধ্যায়-এর গল্প : আলো-হারানোর দিন

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

“আতসবাজি ছায়াপথে চলে যাও।” আজ ঘুম ভাঙার মুহূর্তে কিন্নরের মাথায় এই সুডৌল বাক্য লিখে দিয়ে গেল কেউ। বিদেশে দুর্গাপুজো হলেও কালীপুজোর বালাই নেই। আতসবাজিরা ছায়াপথেই চলে গেছে। তন্দ্রা আর জাগরণের মাঝে এসে দাঁড়িয়ে সময় নিজেই হয়ত লিখে দিল এই বাক্য। এই গল্প। মাথায় মাথায়...কথায় কথায়...কোথায় কোথায়। গতকাল বাংলাদেশে আবার কয়েকজন ‘অবিশ্বাসী’ লেখক-প্রকাশককে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ঘরে ঢুকে খুন করেছে। তাদের একজনের বাবা বলেছেন, তিনি বিচার চান না, চান নিষ্পত্তি, শান্তি। আহা তা কি করে হয়? “একটু মাটির দেহে একটি শিখার গুনগুন” কে যেন তার গানে প্রদীপের এমন এক অমোঘ সংজ্ঞা দিয়েছিল? এখন কোথায় সে? তারা? “আলো হারানোর দিনে” কারা আতস জ্বালছে?

কিন্নরের আজকে বিছানা থেকে উঠতেই ইচ্ছে করছে না। ভারতে আলো জ্বলা শুরু হয়নি এখনো। সেখানে এখনো ভোররাত আর অস্ট্রেলিয়ায় সকাল। আজ ১০ই নভেম্বর। কিন্নরের মা’র জন্মদিন। দুবছর হতে চলল মা নেই। মারা যাবার পর প্রথমবার যখন মা’র জন্মদিন এলো, কিন্নর একটা নতুন হিসেব শুরু করল। ধরে নিল সেদিন মা’র এক বছর বয়স। সেই হিসেবে আজ মা দুয়ে পা দিল। নিশ্চই এতদিনে হাঁটতে শিখে গেছে। কিন্নর তার পড়ার টেবিলের দিকে তাকাল। রাতে ঐ টেবিলের আলোটা জ্বলে। আলোর নীচে মা’র একটা ছবি আছে। দিনের আলোর মধ্যে টিউবের আলো পড়ে মা’র হাস্যময় মুখ আরও চকচক করছে। গতকাল পুরোনো অ্যালবাম ঘেঁটে কিন্নর মা’র ছোটবেলায় হামাগুড়ি দেওয়ার একটা ছবি বার করে রেখেছে। ওটা পড়ার টেবিলে ফ্রেম করে রাখতে চায়।

মা’র গতবছরের জন্মদিন আর এবারের জন্মদিনের মধ্যে প্রথম ফারাক গতবার কালীপুজো পড়েনি। আর দ্বিতীয় ফারাক হল, এই এক বছরে মা’র মা অর্থাৎ কিন্নরের দিদা গত হয়েছেন এবছর ১৫ই অগাস্টে। হ্যাঁ, ১৫ই অগাস্ট, যেন স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণ। দিদাদের বাড়ি ছিল অধুনা বাংলাদেশে। ছোটবেলা থেকেই কিন্নর ধানমণ্ডির আবছায়া গল্প শুনেছে। ওপার বাংলা...অপর বাংলা...যেন কত্ত দূর! অথচ ভাবলেই দূর নয়। কথায় দূর...কোথায় দূর? তাও দিদা, কিন্নর যাকে ছোটবেলা থেকে ‘এম্মা’ নামে ডেকেছে, যেন কোন এক অজানা অভিসন্ধি নিয়ে স্বাধীনতা দিবসেই পাড়ি দিল ধানমণ্ডির দিকে। রাজধানীতে সেদিন কত্ত তোড়জোড়, তার মধ্যে মাসী এম্মাকে শেষবার শাড়ি পরাচ্ছিলো। কিন্নর এসব দেখেনি। শুধু ISDতে শুনেছে, আর উজবুক কল্পনাপথ শ্রুতিকে দৃশ্যায়িত করেছে বাধ্যতায়।

বিশ্বাসীদের সুখ আছে। তারা বলেছে “এই তো মা আর মেয়ে এবার দেখা করে নেবে অন্য কোথাও।” কিন্নরের এই এক জ্বালা। সে অবিশ্বাসী। তার স্বর্গ-নরক, স্যারিডন-জেলুসিল কিছুই নেই। তাই মা আর এম্মাকে আজ মা’র দ্বিতীয় জন্মদিনেও একসাথে দেখতে পাচ্ছে না। বেয়াড়া কল্পনাপথে কোন অন্যকোথাও নেই। যা আছে, এখানে, আর যা নেই তাও এখানেই। “আতসবাজি ছায়াপথে চলে যাও।” মা আলো পছন্দ করত আর কিন্নর অন্ধকার, মা প্রাত্যহিক আর কিন্নর দার্শনিক। ছোটবেলায় মা কালীপুজোর আগের দিন চর্কি নিয়ে আসতো মাঝে মাঝে। বাকি বাজি-বাজার হত বাবার সাথে। কিন্নরের মামা ছিল না, তাই মামার বাড়ি না বলে এম্মার বাড়ি বলত। তা সেই এম্মার বাড়িতেও কয়েকবার বাজি ফাটিয়েছে। তবে তার শব্দবাজি বিশেষ পছন্দ ছিল না, আলোই চলত। তারপর কিন্নর বড় হয়ে গেল, অন্ধকারে গা এলাতে শিখল। অন্ধকারে ভালোবাসা শাসন হয়ে উঠলো আর আতসবাজি ছায়াপথ।

কিন্নর বিছানায় শুয়ে মগজে মগজে এইসব কথা ঠকঠক লিখে রাখছিল আর ভাবছিল মৃত্যু এসে দরজায় কড়া নাড়ার দিনে মা বেশ বড় হয়ে যাবে। আজ সকাল থেকে কি একটা ভয়ঙ্কর শব্দ হচ্ছে পাড়ায়। নিশ্চই কোন না কোন মেনটেনেন্সের কাজে এসেছে লোকজন। কিন্নর ভাবতে লাগলো সে যদি আরও ২৫ বছর বাঁচে, মরার সময় মা’র বয়স হবে ২৭, প্রেম করবে, হয়ত বিয়ে বা লিভ-টুগেদারের কথাও ভাববে। বাবার সাথে না অন্য কেউ? এম্মার বয়স ততদিনে ২৬ হবে। এম্মা কি বিয়ে করা প্রেফার করবে নাকি লিভ-ইন? তারা কি মৃত্যুর পর মনে রাখবে কিন্নরকে? মৃত্যুর পর বড়জোড় দুটো প্রজন্ম; তারপর কেবল মৃত্যুই মৃতের স্মৃতি উজিয়ে রাখে। আতসবাজি ছায়াপথে চলে যায়।

জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে মাঠঘাট, রাস্তা-গাছ পেরিয়ে চোখের গল্প যেখানে শেষ হয় সেইখানে হাইওয়ের ওপারে অনেক ওপরে একটা রাস্তা এঁকে বেঁকে কোথায় যেন উঠেছে। নাহ, ওখানে কোন পাহাড় তো নেই! কিন্নর থাকে তিনতলায়। অন্তত তার সমান সমান ঐ রাস্তাটা কি করে যে অমন উঁচিয়ে উঠলো কে জানে? মাটি উথলে উঠলে কিন্নরের দুঃখ হয় । মনে হয় মাথা গুঁজে দুখজাগানিয়া গান করছে। অবশ্য কিন্নরের কখন যে দুঃখ হয় না সেটাই প্রশ্ন! তাই তো দুঃখের ভাগ চেয়ে কেউ আর আজকাল চারপাশ মাড়ায় না। সবাই প্রাত্যহিক চায়, আর কিন্নর দার্শনিক। গত দুবছর ধরে যতদিন সে এবাড়িতে আছে, মাঝে মাঝেই বিছানায় শুয়ে ঐ রহস্যজনক উঁচু রাস্তায় ক্রেন চলতে দেখেছে।

গতকাল মা’র জন্মদিনের প্রাক্কালে রহস্যের সমাধান করতে বেরিয়েছিল কিন্নর। কি আছে ওখানে যে রাস্তাটা অত উঁচু? হাঁটতে হাঁটতে হাইওয়ে পেরিয়ে বিরাট একটা আস্তাকুড় বেরল শেষে! তাই তো ক্রেন! সমাধানের পর সব রহস্যই কেমন খেলনা মনে হয়! আজকে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঐ রহস্যহীন উচ্চতা দেখে অন্যরকম লাগলো। আস্তাকুড়ের চারপাশের উঁচু দেওয়াল দেখে তার কয়েদখানার কথা মনে হয়েছিল গতকাল। পাশেই পার্ক, বিকেলে কুকুর নিয়ে বেরিয়েছিল প্রৌড়েরা। পার্কের বেঞ্চে বসে অনেকক্ষণ বিশাল দেওয়ালের দিকে তাকিয়েছিল কিন্নর। সঙ্গে একটা রকেট থাকলে উড়িয়ে দেখত দেওয়াল পেরিয়ে আস্তাকুড়ে ঢুকে যায় কিনা। ছোটবেলায় মা বেশ ভয়ে ভয়ে থাকতো রকেট না কারুর বাড়ি ঢুকে যায়। কিন্নরও কি আর বীরপুরুষ ছিল নাকি? এখন সব ভয় দুঃখ হয়ে ছায়াপথে চলে গেছে।

আজ ১০ই নভেম্বর মা’র দুবছরের জন্মদিন আর এম্মার নেহাতই তিন মাস বয়েস, এখনো হাঁটতে শেখেনি। এমতাবস্থায় বিছানায় শুয়ে কিন্নরের কেন জানি মনে হল গতকাল যে দেওয়ালের দিকে সে তাকিয়ে ছিল, সেই দেওয়ালের ওদিকে ডাম্পিং গ্রাউনডে ঢুকলে আরেকবার যেন মা আর এম্মাকে দেখতে পাবে। মৃত্যুর পর মাথা খুঁড়ে ফেললেও যে আরেকটাবার কারুর দেখা মেলে না, সেই শেষের পর আরেকবার শেষ...আরেক শেষবার। কিন্নর বুঝতে পারলো না অযৌক্তিক উদ্ভট এই চিন্তাকে বিশ্বাস বলবে না ফ্যান্টাসি? দেওয়ালের ওপারের আস্তাকুড় সে দেখেনি, তাও তো সাইনবোর্ডের লেখাটাকে বিশ্বাস করেছে। কে জানে দেওয়ালের ওপারে হয়ত একটা ধানমুণ্ডি আছে? আরও একটা। কে বলতে পারে...কথায় কথায়...কোথায়...কোথায়? তবে যাই থাকুক ওপারে, ওপারটাও এই পৃথিবীতে—নিজেকে এই বলে আশ্বস্ত করল কিন্নর।

কিন্নর অবশেষে বিছানা থেকে উঠে কেটলিতে চা বসাল। বাথরুমে গিয়েও ঐ ভয়ঙ্কর শব্দটা শুনতে পেল। পাড়ায় কি যে হচ্ছে সকাল থেকে! চা’টা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাস্তার ওপাশে একটা বাড়ি ডিমলিশ করছে ক্রেন এবং অন্যান্য যন্ত্রের দল। কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ কি পাড়া ছেড়ে চলে যাচ্ছে নাকি পুরনো মালিক-মালকিনই নতুন করে বাড়ি বানাচ্ছে? কিন্নর খালি ভাবছে ডিমলিশনের পর ধ্বংসাবশেষ ঐ আস্তাকুড়টাতেই যাবে কিনা। ভাবছে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কোপাকুপি এপার ওপার মিলিয়ে আদৌ কোনোদিন থামবে কি?


এরপর আমাদের জানা নেই কিন্নর ঘরে গিয়ে মা’র হামাগুড়ি দেওয়া ছবিটা ফ্রেম করবে কিনা। জানা নেই মা’র ছবির সামনে একটা সুগন্ধী মোমবাতি জ্বালবে কিনা। জানা নেই গুনগুন করে নিজের মনে গাইবে কিনাঃ “তুম আয়ে তো আয়া মুঝে ইয়াদ, গলি মে আজ চান্দ নিকলা, জানে কিতনে দিনো কে বাদ, গলি মে আজ চান্দ নিকলা।” রাজধানী থেকে শেষবার চলে আসার সময় ট্যাক্সির এফএমে চলছিল ছোটবেলার এই গান। সেদিন এম্মাকে মনে রাখার মত করে কাঁদতে দেখেছিল কিন্নর। তখনও আতসবাজি ছায়াপথে চলে যায়নি। তার মৃত্যুত্তর পাটিগণিতের হিসেবমত মা তখনও জন্মায়নি, এম্মাও না। আজ ১০ই নভেম্বর। এখন সবাই জন্মে গেছে আর এই মাসের ২২ তারিখ কিন্নরের জন্মদিন। যদিও এখনো তার জন্ম হয়নি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন