শুক্রবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৫

ঈশা দেবপাল-এর গল্প : মুজনাই নদীটি

এক

আমি একটা গল্প খুঁজছি। একটা নিটোল গল্প। যে গল্পটার গায়ে একটা ও দাগ থাকবেনা। তুরতুর করে এগবে যে গল্পটা। খানিকটা আমাদের মুজনাই নদীর মত। এই নিউ দিল্লীতে বসে মুজনাই এর কথা ভাবলেই আমার কেমন শীতল একটা অনুভূতি হয়।
আমি এই সাত তলার ওপর রুফ টেরাস হোটেল এ বসে স্কচের গ্লাস হাতে মুজনাই এর কথা ভাবছি। আর অদ্ভুত, ঠিক প্রত্যেকবার ই এমন টা হয়, আমি একটা নতুন গল্পের সূত্র ভাবতে শুরু করতে পারি। প্রায় বছর দুয়েক ধরেই ভাবনাকে বলছি, মুনের স্কুল ছুটি দেখে এবার যাব একবার কলকাতা হয়ে উত্তরবঙ্গ, মেয়েটা কে দেখাব আমার প্রিয় নদী,পাহাড়, জঙ্গল। কিন্তু আমার সময় হয় না। মেয়েটা প্রায় বছর চারেক হয়ে গেল, কাজের চাপে আমি বাড়ি যাওয়ার সময় পাইনা। ভাবনা প্রথম প্রথম অভিযোগ করত, কাঁদত। এখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে প্লেনের টিকিট করে দিই, মেয়েকে নিয়ে একা ঘুরে আসে কলকাতা থেকে। আমার সঙ্গ পাওয়ার অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছে আজকাল। আমি আমার প্রিয় নদীটার মত করে গল্পটা ভাবছি---নির্জন তীর ছাপিয়ে হাসিতে মুখ ভরিয়ে ছন্দে বয়ে যাচ্ছে সে। আমার গল্পটা ও ঠিক ঐরকম হবে। দু মিনিটে শেষ হবে। মাত্র সাতদিন পর শ্যুটিং। তার মধ্যে ই গল্প নির্মাণ, অডিশান এবং শ্যুটিং শেষ করতে হবে।

ঠিক এটাই আমাদের এড ওয়র্ল্ড এর বৈশিষ্ট্য। কোনো সময় নেই। বাড়ির জন্য সময় নেই, নিজের শখ, আহ্লাদ নেই, ছেলে মেয়ের জন্য সময় নেই, শুধু চোখের সামনে আছে একটা ডেডলাইন। সেটা পেরিয়ে গেলেই প্রচুর টাকার ক্ষতির ছবি। আজ যত টাকাই মাইনে পাইনা কেন, আমার মধ্যবিত্ত মন সেইসব টাকার অঙ্কে সবসময় ই ভীতু হয়ে থাকে। ছোটবেলায় জানতাম, হসপিটালে ই একমাত্র এমার্জেন্সি সার্ভিস থাকে। আর এই চাকরিতে এসে দেখেছি এখানে ও এমার্জেন্সি সার্ভিস থাকে। পালা করে রেডি থাকতে হয় একটা টিম কে, রাত দুটোতে ডাকলে ও দৌড়তে হয়।

আলফ্রান্সো আমাকে ভিস্যুয়াল নিয়ে অনেক লেকচার দিতে শুরু করেছিল, ওকে সাম থামিয়ে দিল। সাম আমার সঙ্গে আগে কাজ করেছে, ও জানে আমি কেমনভাবে কাজ করি, আমার অফিসে আমি এমনি ই ক্রিয়েটিভ ডিপার্টমেন্ট এর হেড নই। আকৃতি এড এজেন্সি র সমস্ত সৃষ্টিশীল কাজ আমার ওপর ছাড়া আছে। তাই আজ দুপুর থেকে আমি অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছি স্টোরি ভাবার জন্য, আর এই নিয়ে কেউ একটা কথা অব্দি বলবেনা। এই জায়গাটায় আমি আগে ও এসেছি। এটা একটা স্প্যানিশ রেস্তোঁরা। হজ খাস ভিলেজ নামক একটা কৃত্রিম গ্রাম এর ভেতর সাত তলার ওপর খোলা ছাদের এই রেস্তোঁরা টা আমার বহূ ভাবনার সাক্ষী। আমি আজ ও গল্পটা প্রায় ধরে ফেলেছি। শুধু দরকার একটা বাচ্ছা মেয়ে, যার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হবে একটা ই শব্দ—মা। এখন ও আসলে এরকম ছোট্ট গল্প খুঁজতে গেলে আমি দ্বারস্থ হই আমার ছোটবেলায় দিদিমার কাছে শোনা গল্পগুলোর ওপর। অন্য ভাষার লোকেরা জানবে কি করে দু একটা আঁচড়ে সেখানে কিভাবে বলা হয়ে গেছে এক একটা আস্ত গল্প।


দুই

দুপুরে রাহুল কে নিয়ে অফিসেই বসেছিলাম । ভেবেছিলাম ওর সঙ্গে ডিসকাশ করতে করতে স্টোরিলাইন টা ধরে নেব। ব্যাপারটা অল্প একটু শুনেই ও অদ্ভুত কমেন্ট করল---খানিকটা আমাদের কোমলের মেক আপের মত? আছে ও বটে, নেই ও বটে। গালে রং মাখে, না ওরকম ই গাল, আজ ও ধরতে পারলাম না। আমি এইটুকু শুনেই ওকে ধমকালাম, প্রতিটা বিষয়ে কি মেয়েবাজি ভাল লাগে? ছেলেটার অবশ্য লজ্জা নেই। বকুনি শুনলে ও হাহা করে হাসে। আসলে কপিরাইটার হিসেবে ওকে আমি বেশ পছন্দ করি, ইংরেজি টা যেমন ভাল জানে, তেমন ই ধার আছে হাতে। আর সেটা ও জানে বলেই সবসময় ওভার কনফিডেন্ট। হাসতে হাসতে বলে গেল,---বড্ড ওয়র্ক অ্যাডিক্ট হয়ে যাচ্ছ। এই চল্লিশে ই কেমন বুড়োটে হয়ে যাচ্ছ। আমি ওকে একটা ট্যাগ লাইন ভাবতে বললাম, এই প্রডাক্ট টার। টার উত্তরে ও কাঁচা ফাজলামি করল। সরল মুখ করে বলল—কন্ডোমের অ্যাড হবে? আমি অবাক—না, তা হবেনা। আর হলেই বা কি? ও হাসতে হাসতে বলল—না, সব প্রোডাক্ট ই তো কন্ডোম বেচছে আসলে।– মানে? –আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি ওর দিকে, আর ফ্যা ফ্যা করে হাসতে হাসতে বলে—তুমি ই দেখ। নোকিয়া ব্লছে—কানেক্টিং পিপল। মুভ বলছে-আহ সে আহতক। মিরিন্ডা বলছে—জোর কা ঝটকা, ধিরে সে লাগে। ডিউরেসেল ব্যাটারি বলছে—লং অ্যান্ড লাস্টিং। থামস আপ বলছে-টেস্ট দ থান্ডার, নাইক বলছে—জাস্ট ডু ইট। এগুলো কিসের কথা তাহলে? আমি হাসতে হাসতে অফিস ছেড়ে আসি তখন। এসব এরা পায় কোথায় কে জানে? নাকি বানায় বসে বসে?

প্রায় রাত আটটা নাগাদ গল্পটা আমি পেলাম। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ই আমার অ্যাপল ল্যাপটপ টা খুলে লিখে ফেললাম। মানুষের মস্তিষ্ক বড় চঞ্চল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে উবে যায় পুরোপুরি। স্ক্রিপট টা লেখা হয়ে গেলে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। মোবাইল টা দেখি। ভাবনার তিনটে মিসড কল, আলফানসো র একটা। ভাবনার মিসড কল নিয়ে আমি ভাবনা করিনা। ও একবারে না পেলে দুবার, তিনবার করে। জানে, আমি ব্যস্ত, তা ও। ওর প্রবলেম গুলো ও অদ্ভুত। মুনের মন খারাপ বা মুন আজ তিনবার কেশেছে বা মুনের আন্টি অকারনে মুন কে বকেছে ব্লা, ব্লা ,ব্লা। ও বাবা কাকাদের সরকারি চাকরি আর যৌথ পরিবারে বড় হয়েছে। আমার চাকরির ধরণ, এই অচেনা শহরে একা থাকা এসবগুলো মানতেই পারেনা। জানেনা, আমার একটা কাজে ফেল হয়ে যাওয়া মানে কোম্পানির ক্ষতি আর আমার সারাজীবনের কেরিয়ারের বারোটা বেজে যাওয়া। তাই আলফানসোকে ই আগে ফোন করি, অডিশানের ডেট টা ফেলতে বলি সামনের বুধবার। ও খুশি হয়। বুঝতে পারে আমি গুছিয়ে ফেলেছি আমার কাজ। আমি ফেসবুকে একটা ছ-সাত বছরের বাচ্ছা মেয়ে চেয়ে একটা স্টেটাস আপডেট করে বিল মিটিয়ে উঠে পড়ি ছাদের এই আলো-আঁধারির রেস্তোঁরা টা থেকে। তবে স্টেটাসে প্রেফারেন্স লিখে দিলাম লম্বা চুলের মেয়ে।


তিন

বাড়ি ফিরে ডিনার সেরে আগে প্রীতম কে ফোন করি, ওকে না পেয়ে রাহুল কে করি। দুজনে ওরা করল বাগে একটা রুম শেয়ার করে। দুজনেই চন্ডীগড়ের ছেলে। প্রীতমের বউ আছে, চণ্ডীগড়ে ই থাকে। ওখানে কি একটা সরকারি চাকরি করে। ছেলেমেয়ে নেই। প্রীতম আমার ই মত চল্লিশ হবে। ও ক্যামেরা করে। রাহূল ব্যাচেলার। আমাদের থেকে একটু ছোট ই হবে। বিয়ে করবে কিনা বলা মুশকিল। দুজনকে ই ফোনে না পাওয়া মানে আকন্ঠ মদ গিলে দুজনেই আউট। ভাবনা মুন কে নিয়ে শুয়ে পড়লে আমি আবার ল্যাপটপ অন করি। ফেসবুক স্টেটাসে কমেন্ট পড়েছে বেশ কয়েকটা। দেখা গেল আমার পরিচিত বহূ মানুষের ই শিশুকন্যা আছে আর সব বাবা-মা ই মেয়েকে দিয়ে অভিনয় করাতে চায়। আমার মেয়েটা বড্ড ছোট্ট, দেখতে আর ও ছোট্ট লাগে। নাহলে হয়ত আমি ও চাইতাম। তবে ভাবনা ও চাইত কি? বলা মুশকিল। ভাবনা আমার কোনও কাজে আজকাল ইন্টারেস্ট পায় না। কলকাতার বন্ধুরা হতাশা দেখিয়ে বলেছে, আগে জানলে তারা কলকাতার টিকিট করে রাখত। বিনয় মজা করে সাতমাসের জন্য অপেক্ষা করতে বলেছে। ওর বৌ এক্সপেক্টিং , তাই। আমি সবাইকে হাসি পাঠিয়ে আসতে বলি, বিনয় কে একটা চোখমারা স্মাইলি পাঠাই। এরকম রেসপন্স ই দস্তুর, তাই। নাহলে ভিতরে ভিতরে আমি চঞ্চল হয়ে আছি। আজ সোমবার। বড় ক্যামেরা আগে থেকে না বলে রাখলে বুধবার অডিশানের দিন পাওয়া মুশকিল হবে। অথচ প্রীতম এখন ও রিং ব্যাক করল না। বিরক্ত হয়ে যখন শুয়ে পড়ব ভাবছি, প্রায় রাত পৌনে একটায় প্রীতম রিং ব্যাক করল। আমাদের জগতে সবাই প্রায় রাত জাগা প্যাঁচা। তাই রাতে কোনো সময় ফোন করতেই কারোর কোনও কুন্ঠা নেই। গলা শুনেই বুঝলাম , প্রচুর মদ খেয়েছে। আমি সংক্ষেপে আমার দরকার টা বলে দিলাম। এমনিতে এই ছেলেটা ও কাজের। কিন্তু এদের কাজের কথা মাথায় রেখে ও সবসময় ফূর্তি করার দরকার হয়ে পড়ে। এই ব্যাপারটা আমার একদম ভাল লাগেনা। আমি ও মদ খাই কখন ও, কিন্তু আমার মূল নেশা কাজে। এক একটা সফল বিজ্ঞাপন নামাই, আর তাতেই আমার চরম নেশা হয়ে থাকে। যখন দিল্লীর রাস্তার বড় বড় হোর্ডিং এ আমার ডিজাইনের বিজ্ঞাপনগুলো ডানা মেলে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আমার কাছে এ পৃথিবীর যাবতীয় সুখ তুচ্ছ হয়ে যায়। তাই এদের সঙ্গে আমার মেলেনা। তবু বসিং করে ঠিক কাজ হয়না বলে আমি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে ই এদের থেকে সেরা কাজটা বার করে নিই। প্রীতম নেশা করেছে বলেই নাকি জানিনা, একটু বেশি ই কথা বলছে। আমি ওকে থামানোর জন্য ব্ললাম,--রাহূল কে ও ফোনে পেলাম না, ও ও কি তোর মত আউট?—প্রীতম হাসতে থাকে। তারপর বলে—দাদা, তুমি না চিরকাল বড্ড ভাল ছেলে ই থেকে গেলে। রাহূল এখন ঘরে ঢুকেছে। আমি কথাটা প্রথমে বুঝতে পারিনা।–ঘরে ঢুকেছে মানে?—প্রীতম হাসতে হাসতে বলে – আজ যা পেয়েছি না একটা কে, তামিল মেয়ে, দুজন কেই কাবু করে দিয়েছে। আমি থতমত খেয়ে যাই। আমি জানি এসব ওদের থাকে ই মাঝে মাঝে, কিন্তু এক্ষুণি এটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু মুখে হাসির ভাব করে বলি,--যা, এনজয় ইওর টাইম। তবে একদিন এডস হয়ে ই মরবি তোরা শালা।

দিল্লী এই মাঝরাতেও নিঃশব্দ হয়না। আমার ফ্ল্যাটটা রাস্তার ধারে। আমি বারান্দায় এসে বসি। মুনের ভোরে স্কুল। তাই ভাবনা মেয়েকে নিয়ে আগে ই শুয়ে পড়ে পাশের ঘরে। রাতের অন্ধকারে এক একটা গাড়ি রাক্ষসের মত শব্দ করে বয়ে চলেছে। আমার কেমন মুজনাই এর জন্য মনখারাপ করে ওঠে। ছোটবেলায় মনখারাপ হলেই একা বসে থাকতাম গিয়ে নদীটার ধারে। পাশের মন্দিরে ঘণ্টা বাজত। নির্জন নদী তীরে সেই শব্দ অনেক দূর অব্দি ছড়িয়ে যেত। আর নদীটার ওপারে ছিল শ্মশান। এই পার থেকে ই গা ছমছম করে উঠত ছেলেবেলায়। আমি ভাবনাদের ঘরে উঁকি দিই। মা- মেয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। মেয়েটা একদম মা ঘেঁষা পুরোপুরি। এই ঘুমের মধ্যে ও মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে আছে। আমি ভাবনার মাথায় অল্প হাত বুলিয়ে দিই। ও একটু ঘুমের মধ্যে উসখুস করে। তারপর আবার উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ে। বিয়ের পর ভাবনা খুব ভালবাসত মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া কে, মাথায় হাত রাখলেই আহ্লাদিপনা করত। আমি উঠে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ি। সকালে উঠে থেকে আবার দৌড়নো।


চার

সারাদিনে ছাব্বিশটা বাচ্ছার অডিশন নেওয়া হল। জড় হয়েছিল চৌষট্টি টা। কিন্তু যাদের অন্তত ছয় বছরের মত দেখতে লাগছিল অডিশন নেওয়া হল তাদের ই। কিন্তু আমি টোট্যালি ডিসস্যাটিসফায়েড। প্রতিটা বাচ্ছা মেয়ে ই বাড়াবাড়ি রকমের মিষ্টি। ইন্টেলিজেন্ট, স্মার্ট। সবগুলোই খুব আদর কাড়ে। বোঝাই যায় বাড়িতে খুব আদরে বড় হচ্ছে এরা। সেটা অবশ্য আর ও বোঝা গেল সেদিন বাবা-মা দের মাথাখারাপ দেখে। মেয়ে যেন ফিল্মের হিরোইন ই হয়ে গেল বুঝি। অথচ, এটা একটা এনজিও র অ্যাড,যারা ভারতীয় মেয়েদের এগিয়ে চলার কথা বলছে। সেখানে এত লাডলা বাচ্ছাদের মানাবেনা। আলফান্সো আমাকে বলেছিল, বাচ্ছা মেয়েটার মুখে যেন একটা ভারতীয়তা মানে ইনডিয়াননেস থাকে।আমার ও ঠিক তাই মনে হয়েছিল। মেয়েটার মুখে একটা সারল্য আর স্বাভাবিকতা থাকে। কনভেন্ট পড়াশোনার ছাপটা না থাকে। আলফ্রান্সর সঙ্গে অনেক জায়গাতেই মিলে যাচ্ছে আমার টিউনিং। রাতে কনর্ট প্লেসে ডিনার করতে করতে আমার ল্যাপটপে আমরা পুরো অডিশন টা আবার দেখলাম। নাহ, এটা কাজে লাগল না। আজকের পুরো পরিশ্রম জলে গেল। তবে আমি জানি, এসব চলে ই, এগুলো পার্ট অফ দ গেম। এতে হতাশ হয়ে যাবার কিচ্ছু নেই। আলফ্রানসো আমার উৎসাহ দেখে অবাক। আমি ওখানে বসেই পরপর ফোন করতে থাকলাম। বেশি করলাম অন্য বিভিন্ন কোম্পানির পিএ দের । আর তাতে সাড়া ও মিলল। আমার আগের অফিসের মার্কেটিং হেড ছিল প্রজ্ঞা। মেয়েটা সাংঘাতিক কাজের । ও পুরোটা শুনে একটা খবর দিল। ওদের মেড সার্ভেন্ট এর একটা ঐ বয়সের বাচ্ছা মেয়ে আছে। মনে হচ্ছে আমরা যেমন চাইছি তাতে এই মেয়েটা ই একদম ঠিক হবে। প্রজ্ঞা আগে ও এই মেয়েটার কয়েকটা স্টিল তুলেছিল । আমি ওকে স্টিলগুলো আমাকে মেইল করতে বলি আর মেয়েটার ডিটেলস শুনে নিই। মেয়েটা ওখলার কাছে একটা বস্তিতে থাকে। তবে সেখানে শ্যুট করতে গেলে আগে পারমিশন করানো দরকার। আজকাল কড়াকড়ি হয়েছে নানারকম। আর বিদেশি কেউ গেলে তার সব কাগজপত্র চাই পুরোপুরি।


পাঁচ

সমস্ত ক্যানভাস জুড়ে মেয়েটা। ল্যাপটপের মনিটর টা বাড়তে বাড়তে যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। আমি মনিটরে মেয়েটাকে দেখছি। প্রীতম ক্যামেরা করছে। মেয়েটার বয়স কত হবে? বছর ছয় ই হবে।ওর মা ও অবশ্য বয়সটা বলতে পারেনি। অদ্ভুত একটা শ্যামলা গায়ের রং। কোমর অব্দি নেমে এসেছে ঝামরি-ঝুমরি চুল। কালকেই ওর মাকে বলে গেছিলাম চুলে অল্প তেল দিয়ে শ্যাম্পু করাতে। ফলে ঝলমল করছে চুলটা। আর চোখদুটোর মধ্যে কি যেন একটা —যাকে আলফ্রানসো বলেছিল, ভারতীয়তা, তাই ই কি? বড় বড় চোখদুটোয় মায়া, মমতা , সারল্য মিলে মিশে আছে। ঠিক যেন একটা বাচ্ছা দেবী। যেন একেই আমরা খুঁজছিলাম এতদিন। থ্যাঙ্ক ইউ প্রজ্ঞা। বেশ স্মার্টলি দাঁড়িয়েছে শ্যুটিং স্পটে। একটা সবুজ ফ্রক পড়ানো হয়েছে ওকে। কিন্তু মনিটরে সবুজ রং টা মিশে যাচ্ছে পিছনের গাছগুলোর সঙ্গে। তাই কাট বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। চেঁচিয়ে বলে দিলাম—সাদা ফ্রকটা আনতে। আজ আমার টিম পুরো রেডি ছিল। ওদের কাছে রাখা আছে আর ও দু সেট জামা।

পুরো বস্তির ভিড়টা আমি ব্যারিকেড করে রেখেছিলাম। বাচ্ছাটার মা অবশ্য ছিলনা। রোজকার মত ই মেয়েটা কে তার চোদ্দ বছরের বড় মেয়ের হেফাজতে রেখে কাজে বেরিয়ে গেছে। মেয়েটার বাবা নাকি রাজস্থানে থাকে অন্য একটা বৌ নিয়ে, মেয়েদের খোঁজ ও নেয়না। ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে এই গল্প।

রাহূল এগিয়ে এসেছিল সাদা জামাটা নিয়ে, আর ও কে ই চেঞ্জ করতে বলি তাড়াতাড়ি। সকালের এই নরম আলোটা থাকতে থাকতে শট নিয়ে নিতে হবে আমাকে।

আর তখন ই ঘটে গেল সেই অদ্ভুত ঘটনাটা। এক একটা মোড় যেমন পথ বদলে দেয়, এ ও যেন সেরকম । দুম করে আমার দিনটা বদলে দিল। এতদিন ধরে আমার ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে ওঠা জীবনটা কে ও কি?

মেয়েটা প্রথম থেকে বেশ স্বাভাবিক ই ছিল। একদম জড়তা শূন্য। ওকে যত দেখছিলাম, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। যেন এরকম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো ওর কতদিনের অভ্যাস। অথচ, যেইমাত্র রাহূল ওর ফ্রকটা নামাতে গেল চেঞ্জ করবে বলে, কি যেন একটা হয়ে গেল চারপাশে। মেয়েটার দুচোখে আগুন ঝলসে উঠল যেন। চিৎকার করে উঠল মেয়েটা। মায়া , মমতা নয়, ওইটুকু দুচোখে যেন প্রতিবাদ গর্জে উঠল। দুম করে যেন বদলে গেল চারিদিকের আলো। ...আর আমি অবাক হয়ে দেখলাম, চারপাশের সমস্ত মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে। আমি ও বাচ্ছা মেয়েটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিৎকার করছি—না...না...।নো...নো...।রাহূল থতমত খেয়ে থেমে যায়।আমি কথা না বাড়িয়ে মেয়েটার দিদিটাকে ডাকি ভিড়ের মধ্য থেকে। বলি, ঘরের ভেতর থেকে জামাটা বদলে নিয়ে আসতে।

মেয়েটা তখন কাঁদছে। সবাই অবাক। কাঁদার মত তো হয়নি কিছু। রাহূল অপ্রস্তুত খানিকটা। আমার দিকে তাকিয়ে জীবনে প্রথমবার রাহূল কে বোকা বোকা হাসতে দেখি। আমার বুকের মধ্যে তখন মুজনাই এর ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ এর আওয়াজ। নদীটাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, বয়ে যাচ্ছে তিরতির করে। নদীটা যেন আমাকে ডাকছে। ওর আমাকে দরকার। সমস্ত পাঁক আর কাদা সরিয়ে ওকে বইতে দেব আমি।

বেশ ভালভাবে কাজ মিটে যায় সেদিন। আলফ্রান্সো কথামত বাচ্ছার মা ফিরে আসলে তার হাতে পেমেন্ট করে। বিকেলে প্যাক আপের সময় ও বাচ্চাটা ঐ সুন্দর সাদা ফ্রক টা পড়ে ঘুরে বেড়ায়। আর সবাই ডিনারে যায়, আমি বাদে। ওরা আমাকে অনেকবার বলেছিল। আমি ওদের অন্য কারণ দেখিয়েছি। কি করে বোঝাই কবে থেকে আমার বাচ্ছা মেয়েটা আমাকে ডাকছে, আমি বুঝতে পারছিলামনা শুধু। আমার সমস্ত ব্যস্ততা দেখে সরে গেছে আমার পাশ থেকে, শুধু মনে মনে ডেকে চলেছে কবে থেকে, বিরক্ত করেনি একটু ও। কে জানে আজকের বেবি দুর্গা টার বাবা কোনোদিন ফিরে আসবে কিনা ওর মেয়ের কাছে, ওর বৌ এর কাছে, আমাকে কিন্তু ফিরতেই হবে খুব তাড়াতাড়ি...আমি গাড়িতে স্টার্ট দিই...।



লেখক পরিচিতি
ঈশা দেবপাল
জন্ম : কোলকাতা।
বর্তমানে দিল্লীবাসী।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন