বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

তমাল রায়-এর গল্প : অমল আলোয়

ও বলেছিল ওর নিজের কথা। কিভাবে বৃষ্টি আসে, আসে নাও। একটা পাখীর সাথে ওর সখ্যতা হয়েছিল এ দীর্ঘকালীন অ-সুখ সফরে। তার এ শুয়ে থাকা ছিল অনেকটা সেনা উর্দির মত। জীবন আসলে এক সতত যুদ্ধ ক্ষেত্র। সদাসর্বদা প্রস্তুত থাকতে হয়। কখন বিরোধীশক্তির মত ‘আক্রমণ’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়বে… অতএব প্রস্তুত থাক। আক্রমণ কি বলেই আসে?
গেরিলা আক্রমণেও তো কত জীবন ক্ষত বিক্ষত। তার এই অ-সুখ যাপন ছিল এক দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার মতই। মা বলতেন সেই কোন সকাল বেলায় - ‘বাবু এত রুগ্ন থাকলে হবে। চিরকাল কি মা থাকবে সাথে?’ সে জানত অথবা জানত না। আর সত্যি বল - জেনেই কি তুমি খুব কিছু করতে পার। প্রেম প্রীতি মাৎসর্য অথবা মৃত্যু বলে কয়ে কে আসে? হাডুডু খেলা শুরু হয়েছে। চুউউউ কিত কিত কিত... ওর কক্ষপথে ঢুকে পড়েছে শত্রুপক্ষের লোক, কী তার দম, থামছেই না, একে একে একে ছুঁয়ে দিচ্ছে পল্টু, তনিমা, আর অনীশকে, ওরা হাত বাড়িয়েছে পালানোর আগে। ধরেওছে পা জাপটে, কিন্তু কী অদম্য তার শক্তি! পালিয়ে যাবে স্থির করেছে যাবেই, গেলও। পারলোই না আটকাতে। এখন আর পড়ে রয়েছে ওরা দু’জন। হ্যাঁ, পড়ে রয়েছে ঘাড়ের ওপর থেকে মাথা আর লেফট রিস্টের পর হাতের মুঠো। সেটাই কেবল খোলে আর বন্ধ হয়। আর পাখি সেও তো আহত নয়। তাই আসে। রোজ সকালে। কাঁচের জানলায় টোকা মারে। মুখের ওপর তখন আলো এসে পড়েছে। সে চোখ খুলেই দেখতে পায় বন্ধুকে। এ বিশ্বের সবথেকে বৃহৎ ও বুদ্ধিমানও তো পারে সব থেকে ক্ষুদ্রর বন্ধু হতে যদি সে চায়। ইচ্ছেটাই আসল। যেমন এটা এক ‘ইচ্ছে সকাল’। আর অমল চাক না চাক এ সকালে তার মন উড়ছে ওই বন্ধু পাখির সাথে…

সময়টা ’৪৮ এর কোনো এক সকাল সে চলেছে বুয়েনেস এইরস এর বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়তে। পড়তে তো ইচ্ছে করেই কিন্তু ইচ্ছে করে পাখির মত ঘুরতেও। কত কিছু জানার আছে, বোঝার আছে। এই ডাক্তারি পড়েও সমাজের দেশের উপকার করা যায়। কিন্তু ওই যে প্রান্তিক মানুষ গুলো তাদের হাসিকান্না এগুলো যে টানে। বাপ সোশালিস্ট। বাড়িতে বই পত্তরের অভাব কই। যা পড়ে মনে হয় এ তো আমার কথাই। আর বেরিয়ে পড়, বই আর ভ্রমণ মানুষের মনের বৃহত্তর প্রকাশের হাইওয়ে। সে বেরিয়ে পড়ল। একটা মোটর সাইকেল আর সামান্য বড় এক বন্ধুকে নিয়ে। নাম আলবার্তো গ্রানাডো।


সেটা ছিল শীত পেরিয়ে বসন্তের আগমনের সময় আর সে কেন জানি না উদ্বেল হয়ে উঠেছিল অযাচিত আনন্দে, এমনটা হয় হয়ত বা। পাখি ডাকে, সে শুনতে পায় পাখির ডাক। কিন্তু বেরোবে কেমন করে সে যে চিররুগ্ন। স্কুলে তাকে ডাকা হত জিরাফ বলে। গলা লম্বা অনেকটা। কন্ঠার হাড়টা টিয়া পাখির ঠোটের মত এগিয়ে থাকে। মাথা ভর্তি তেল জব জবে। সাইড করা সিঁথি। বড় বড় চোখ দিয়ে দুনিয়াকে বড় আশ্চর্য চোখে সে দেখে। আর দেখেই চলে। কানে স্যার দের বলা কথা গুলো আসে। কিন্তু মাথায় ঢোকে কই। সে কেমন এক আচ্ছন্নতায়। বৃষ্টির সাথে পরিচয় সে সময়েই। তখনো আগুন ছিল অনেক আকাশে বাতাসে, দৃশ্যপট জুড়ে জ্বলছে পুড়ছে কৃষ্ণচূড়ার দল। সে এক সময় যাতে অক্ষরে অক্ষরে নীরবতা নয় বিস্ফোরণ লেগে থাকতো। আর সে জানতো ভালোবাসার রঙ লাল, গভীর লাল। হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠ জুড়ে বয়ে বেড়ানো রক্তের চেয়েও অধিকতর লাল। বৃষ্টি কেবল তাকে ডিসকার্ড করেনি। হ্যাঁ বন্ধু ভেবেছিল। আর রঙ-আবীর-ফাগখেলা-দোল। কত আর বয়স, এ বয়সে হাডুডু খেলতো দাদাই। বাবারা দল বেঁধে যেত উত্তম কুমারের সিনেমা দেখতে। আর অমল? ধবল প্রাণে লেগেছে মন্দ্র মধুর... তবু সে বাতাসে কোথা থেকে উড়ে এসেছিলো কাল বোশেখির উন্মত্ততা। - ভালো বাসার রঙ লাল বিপ্লবের রঙ লাল, জানো বৃষ্টি? বৃষ্টি কিছু বলেনি। চুপ ছিল। পা এর বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল। আর অমল বলছিল প্লেটোর বলা উদ্ধৃতি। ‘You can discover more about a person in an hour of play than in a year of conversation’ খেলবে আমার সাথে বৃষ্টি? বৃষ্টি মুখ না তুলে জিজ্ঞেস করেছিল – ‘কী?’ হেসে উত্তর করেছিল অমল- ধর তোমার হাতে একটা বলের মত গোটা পৃথিবী দিলাম, কী করবে তাকে নিয়ে?

বুঝি না তোমার কথা। ফিরতে হবে। বলে চলে গেছিল বৃষ্টি। অমল চলে যাওয়ার ছায়া দেখছিল। যেমন দেখতে হয়।
প্রায় চার হাজার কিমি পথ পাড়ি দিয়েছিল ওরা। মাঝে মোটর বাইক খারাপ হল, তাতে কী। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। ঘোরা কিন্তু বন্ধ হয়নি। এই ভ্রমণ ছিল গোটা আর্জেন্টিনা জুড়েই। ফিরে এসে লিখে ফেলেছিল একটা গোটা ডায়েরি। কিভাবে শুধু  অর্থের অভাবে শিশুরা মরে যাচ্ছে, কী প্রবল দারিদ্র এক শ্রেণীর। আর এক শ্রেণীর হাতে প্রভূত অর্থ। কেন এত বৈষম্য? প্রশ্নটা ঘুরছিল ফিরছিলো মাথায়। আবার বেরিয়ে পড়ল এবার গোটা দক্ষিণ আমেরিকাই। সীমানা নির্বিশেষে এ গোটা তল্লাটের মানুষের সুখ আর দুঃখগুলো একই। আনন্দ আর অত্যাচারিত হবার কষ্টগুলোও এক । ভাবছিলো । বাতাসে বসন্তের অভিঘাত। কোকিল ডাকে, সেও তো এক চির নতুনের আহবান। কী করবে এবার?

এ সেই সময় যখন অমলও বেরিয়ে পড়ল তবে দূরে কোথাও নয়। অ-সুখ সরণিতে। এমন হয় জানো। আর বাইরে জানলার বাইরে ফ্রিজশটে একটা হলুদ রোদ্দুর তেরছা হয়ে ওকে ডাকছে। ও তো অমল তাই বাইরে দইওলা আসে ওকে পাঁচমুড়োর খবর দেয়। সেই নদীটা, তাতে কিভাবে সব্বাই নাইতে নামে, আসলে শরীর শরীরই জানো। সে বন্দি থাকুক। মনটা উড়ছে। উড়ছে। উড়তেই থাকছে।

এরপর কত কী ঘটে। গ্রীস্ম আসছে। পূর্বাভাস কালবোশেখীর। হঠাৎ দামাল হাওয়া এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে সব। আর সে দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে গুয়াতেমালায়। সামন্তবাদী বুর্জোয়া শক্তির চূড়ান্ত শোষণ দেখতে পাচ্ছে। ফিরে আসছে মেক্সিকোয়, দুই ভাই এর সাথে দেখা গোপনে। রাউল আর ফিদেল। পচা দেশটা তার পচামো দেখাতে চেপে ধরছে কিউবার টূঁটি। চুপ থাকা যায়? সেটা গ্রীষ্মকাল। শরীর গরম মাথা গরম তবু মাথা ঠান্ডা রেখেই সে যোগ দিল ২৬ জুলাই আন্দোলনে। বানালো নিজেদের দল। আর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাম্যবাদ আনতে হবে। ধনের এত বৈষম্য ঘুঁচুক। আর পেরেও গেল। আসলে We are twice armed if we fight with faith.- প্লেটো।

অমল ও সে কথাই বিশ্বাস করে। এই যে উঠে দাঁড়ালো। অনেকটা যুদ্ধের পর ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে এই লড়াই, বিশ্বাসটুকু নিয়ে সে লড়ে গেছে। কারণ লড়তেই হত। মা অসুস্থ প্রবল। বাবা চাকরি খুইয়েছেন। এখন নিজেকে প্রতিষ্ঠার লড়াই। পারে কই? সুনীল এর প্রতীদ্বন্দীর সিদ্ধার্থ হতে কার আর ভালো লাগে। বেচু বাবু হয়ে নিজের প্রতিবাদী সত্ত্বার মৃত্যু ডাকলো। নীচ দিয়ে রাম নাম সত্য হায় বলতে বলতে মরা চলে গেল। এ কি আসলে সিদ্ধার্থরই মৃতদেহ? কিন্তু অমল তো তখন আগুনে হাত সেঁকছে। বিপ্লব আনতে গিয়ে যারা কুকুরের মত মরে গেল সেই সাতের দশকে তারা ঐক্যবদ্ধ ছিল না কোনো ভাবেই। অমল কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। কলমকে শক্তিশালী কর। করল। -‘কিন্তু এ তো ইসতেহার হয়ে যাচ্ছে অমল’ বলেছিলেন সত্য দা। ‘সাহিত্য কি ইসতেহার হবে তবে?’ এত কিছু জানে না অমল। জানে মনের ভাব প্রকাশ করতে হবে। এটা জীবনের গ্রীষ্মকাল। আর এ সময়কে ব্যবহার করতে হবে সঠিক ভাবে। তাই সে নায়কের অরিন্দমের মতই বলতে পারত, -সময়টা বদলে গেছে, ও অভিনয় এখন কি আর চলে। ও সাহিত্য আর চলে না। ভুল কি ঠিক, সময় নির্ধারণ করে দেবে। আর ধর্মীয় মৌলবাদ যেভাবে মাথাচাড়া দিচ্ছে তাতে এখন প্রধান কাজ মানুষকে মুক্তচিন্তার সমর্থক করে তোলা। যুক্তিবাদ এর পক্ষে লড়াই তো কম কঠিন কাজ নয়। চারপাশে এত ভক্তিরসের প্রাবল্য। তবু লড়ছিল। আর যা হয় সেই পাখিটাকে ভুলেই গেছে অমল। যে ওকে এনে দিতো বাইরের সুবাতাস। অমল এখন রাতের আকাশ দেখছে। মাথার ওপর ভেসে চলেছে রিফিউজি মেঘেদের দল। ওরা দল বেঁধেই চলেছে। যেমন যায় সর্বহারা মানুষ। কিছু অভিজাত ও আছে যারা একটু দূরত্বে, নিজেদের অবস্থান থেকে আভিজাত্য ছড়াচ্ছে। মা বলতেন –‘আকাশ দেখ। মন বড় হয়’। ও দেখছে বড় ছোট জানে না, মাথার ভেতর সমান্তরালে এক চিন্তার প্রবাহ। কিছু করতে হবে, হবেই। এ সময় এক টুকরো মেঘ এলো মনীষা হয়ে। আর হেসে বললো – ‘অমল হাত ধরবে? তুমি কি খুব একা?’ মনীষাকে দেখেছিল অমল, সুবর্ণ স্যারের বাড়িতে। সমবয়সী। অমলের মধ্যে দ্বন্দ এসেছে। নাহলে দ্বন্দমূলক বস্তুবাদ কিভাবে মাথায় ঢুকবে? দু’জনেই পাশাপাশি দুটো মেঘ হয়ে এগিয়ে গেল আকাশ পথে। কানে আসছে গান- ‘আহবান  শোনো আহবান, আসে মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে’... এ দৃশ্যে চাঁদ আছে তবে কাস্তের মত ক্রমশ ধারালো। আর ছায়ারা ঘুরপাক খায়। তুমি এগোলে, ছায়া যে পিছু নেবেই। কাফকা তো এমন কথাই বলতেন।

কিউবায় সরকার বদলালো। তাকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া হল। পায়ের তলায় সর্ষে, চোখে দুনিয়া বদলের স্বপ্ন। সে কি আর মন্ত্রীত্বে বাঁধা পড়ার লোক। কাজ বাকি কত। তবে সাহিত্য থেকে সে বিচ্যূত হয়নি। মার্ক্স পড়ছে, নেহরু, লেনিন,  কাফকা, কামু, ফকনার, সাঁর্ত্র যেমন আছেন তেমন আছেন রবার্ট ফ্রস্ট, এইচ জি ওয়েলস, নিৎসেও। লিখে রাখছে নিজের ডায়রিতে। নিজেও লিখছে কিছু অল্পসল্প। যা কবিতাই। মাথায় যার অনন্য আইডিয়াজ সে তো আর থেমে থাকেনা। চললো কঙ্গো। যোগাযোগ হল অনেকের সাথেই। দল বানানো হল। কিন্তু এবার পারলো না। আক্ষেপ থেকে বলে উঠলেন- ‘বিপ্লব কোনো গাছ থেকে পড়া আপেল নয়। তাকে পাড়তে হয়। আর যাদের সে যোগ্যতা আছে, তারাই পারে’।

অমল যতবার উঠে দাঁড়িয়েছে শয়তান তাকে আবার পেড়ে ফেলেছে। এবারও তাই। আর আবার পড়ল সে। এবার পড়া দুটো হাঁটু নিয়ে। কারা যেন হকির স্টিক দিয়ে...হাঁটু দু’টো... ফল মনীষার চলে যাওয়া। যে যাবে সে যাবেই তাকে কি আর আটকানো যায়? অসুখ সরণিতে সে আবার। এক বাঁও মেলে না, দুই বাঁও মেলে না। পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল। কিন্তু পাখি কই, সেই পাখিটা? অমল কে যে গুড মর্নিং জানাতো, কই? মাঝে গঙ্গায় কত জল বয়ে গেছে। ভুলে গেছে অমল। আর লুম্পেন এই রাজত্বে অপরাধ ও অপরাধী নিয়ে বাড়তি সতর্ক সে। আর সে চেষ্টায় উঠে দাঁড়ানোর, পারছে না পড়ে যাচ্ছে, আর কানে আসছে নবীন স্যরের কথা – যেখানে পড়ে যাবে সেখান থেকেই উঠে দাঁড়াতে হয়। সে পারবে অথবা পারবে না কিন্তু কারো সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানো যায় হয়ত সে তো ক্লাইম্বাররা করে। ও তো তা নয়। প্যারাসাইট এই সমাজে সে কিছু করতে চায়। মা নেই। বাবা যাবো যাবো। বোনটা কার সাথে ভেগে গেছে। জীবন আপাতত পদ্মপাতায় এক ফোঁটা জল হয়ে পড়বো পড়বো করছে আর মিত্রা এসে ধরা দিল। এরপর সে এক ফাস্ট মুভিং ফিল্ম রোল। ছবি দ্রুত দৌড়চ্ছে । পাঁচমুড়োর কথা আর মনে নেই, সে তো পূর্বাশ্রম। মনে রাখতেও নেই। ওরা পত্রিকা বার করছে। শহরের বস্তিগুলোয় স্কুল খুলেছে। বিপ্লব আনতে গেলে প্রান্তিক মানুষের মধ্যেই যে শুরু করতে হয়। শরৎ আসছে। উৎসবের সময়। এ সময়ে কত কী ঘটে। আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘ। কাশ ফুল। ওরা বিয়ে করে ফেললো।

কঙ্গো থেকে ফিরে সে এখন বলিভিয়ার জঙ্গলে। ঘোরে ফেরে আর নতুন বন্ধু পাতায়। পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে থাকা। কবিতা লেখা, পড়া আর আসন্ন বিপ্লবের আলোচনায় মশগুল হয়ে থাকা। সময়কে হাতের মধ্যে নিতে হবে। নইলে কী করে হবে। শেষ রাতে ট্রেন চলে গেলে যেভাবে ধরা দেয় আঁধার তার নিজস্বতা নিয়ে সেভাবেই ওরাও, কিন্তু আলো আসে যে। কিভাবে? কে কারা? কেন? ধরা পড়ে গেল। আর লক্ষ্য করেছেন পাঠক প্রতিটি বিপ্লবই এভাবেই স্বার্থসর্বস্ব মানুষের দাঁত নখের সীমানায় পড়ে অস্তমিত হয়।

অমলে অ-সুখে ভারী মিল। মিত্রা ছেড়ে গেছে। যেতে হতই হয়ত বা। তৈলচিত্রে আপাতত মাকড়সার জাল। সে দানা বাঁধছে, বিস্তার করছে। এবার অমল মৃত্যুশয্যায়। মা এসে ডেকে যাচ্ছেন- ‘আয়’। বাবা মৃদু হাসি সম্ভাষণে। পাখি আছে কিন্তু এতো সমুদ্র সৈকত। নুন আর নুন। দেওয়ালে নুন, মাটিতে ফেনা আছে পড়ে, আছে ভাঙা ঝিনুক। ডানা ভাঙা পাখির কঙ্কাল। ছেঁড়া হাওয়াই চটি। বালিতে পায়ের ছাপ। কেউ ছিল আজ নেই। বাড়ি নয় ঘর বাঁধার শখ ছিল। কিন্তু বুল্টনের গুলিটা ঠিক সি২ আর সি৩ এর মাঝখানে। বেরিয়েছে। কিন্তু পঙ্গু। হ্যাঁ, পড়ে রয়েছে ঘাড়ের ওপর থেকে মাথা আর লেফট রিস্টের পর হাতের মুঠো। সে দু’টোই কেবল খোলে আর বন্ধ হয়। আর পাখি সেও তো আহত তাই আসে না আর কোনো  সকালে। কাঁচের জানলায় টোকা মারে না কেউ। মুখের ওপর তখন আলো এসে পড়েছে তবে এ মৃত্যুর। ‘হ্যান্ডস আপ’। উহুঁ হাত ওঠে না। মৃত্যুও আদতে বুর্জোয়া শক্তির এক প্রতিনিধিই। যদিও মায়ের মত আঁধার আছে তার। আসে হাত ধরে, ছোলা খাওয়ায়। পড়ে থাকে পেচ্ছাব পায়খানা মেখে। পরে থাকে বালির ঘর। সমুদ্র তটে সুনামী চলে গেলে যেমন যতটা।

ওরা ওকে ধরে নিয়ে এসেছিল ঘরের বাইরে। বলেছিল – বল বাকি সাথীরা কোথায়? সে ভয় পায়নি। বলেছে – বলবো না। কী করবে মারবে? মারো  Many will call me an adventurer - and that I am, only one of a different sort: one of those who risks his skin to prove his platitudes.হ্যাঁ ও অ্যাডভেঞ্চারার। কিন্তু শুধু নিজের জন্য নয় তো। পরার্থে বাঁচার কথা তো বিবেকানন্দও বলেছেন। সেও। তাহলে? ওরা আবার জিজ্ঞেস করে,-‘বলবে’? ও হাসে, রাগে প্রবল চীৎকারে জানায়- I know you are here to kill me. Shoot, coward, you are only going to kill a man
এরপর মৃত্যুর কিছু আগে সে ডেকে পাঠিয়েছিল জুলিয়াকে। জুলিয়া একজন নিতান্তই সাধারণ স্কুল মাস্টারনি। তাকাতে পারছিল না তার দিকে চোখ তুলে, তার দৃষ্টি তখনো উজ্জ্বল, শান্ত, যদিও জানে একটু পর তার কী পরিণতি হতে চলেছে। সে তবু বলে চলেছিল জুলিয়াকে স্কুল গুলির কথা। শিক্ষাব্যবস্থার অক্ষমতার কথা। আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। শিশুরাই তো ভবিষ্যৎ আগামী দুনিয়ার।  দেহ নিয়ে উড়ে গেল হেলিকপ্টার। অন্যত্র। আর রয়ে গেল এপিটাফ- "Wherever death may surprise us, let it be welcome, provided that this our battle cry may have reached some receptive ear and another hand may be extended to wield our weapons."

অমল নেই। পড়ে আছে তার লেখা কবিতার খাতা। আজ পাখি এসেছিল সকালে। তখনো প্রাণ ছিল কিছু। রোদ কিছু নরম। শীত আসছে। হেমন্ত অরণ্যে তখন পাতা ঝরা শুরু হয়েছে। কোথা থেকে যেন খবর পেয়ে এসেছিল বোধ হয় সেই দইওয়ালা। পাঁচমুড়োর খবর দিতে হবে তো। ফিল্ম তখন রোল ব্যাক করছে আস্তে আস্তে। মিত্রা আবার বিয়ে করেছে। সফল গৃহিনী। মনীষা কোথায় কে জানে। খবর পেয়ে বৃষ্টিও এসেছিল। মা বলতেন সেই কোন সকাল বেলায় - ‘বাবু এত রুগ্ন থাকলে হবে। চিরকাল কি মা থাকবে সাথে?’ সে জানত অথবা জানত না। আর সত্যি বল - জেনেই কি তুমি খুব কিছু করতে পার। প্রেম প্রীতি মাৎসর্য অথবা মৃত্যু বলে কয়ে কে আসে?
আর আজ কি অদ্ভুত অমলের ফেলে রাখা কবিতার মাঝে এসে বসেছে সেই পাখি, বিপ্লবের শব্দ ঠোঁটে নিয়ে সে উড়ে গেল খানিক দক্ষিণে, কিছু এলোমেলো, ওড়ার পর উত্তর হয়ে সে রওয়ানা দিলো পূব দিকে। আলো আছে।  আলো থাকে। অমল তখন হাডুডু খেলতে নেমেছে অন্য কোনো কোর্টে, একে একে সবাইকে স্পর্শ করে সে ফিরে আসছে নিজের কোর্টে... চুউউউউউউউউউউউ

এ সোলজার ডাইজ,বাট নেভার কুইটস।

‘ The revolution is not an apple that falls when it is ripe. You have to make it fall.’- চে

অমল চাক না চাক এ সকালে তার মন উড়ছে ওই বন্ধু পাখির সাথে…


.............................
লেখক পরিচিতি
তমাল রায়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বরানগরে, ১৯৭০ সালে জন্ম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। গল্পকার। সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সম্পাদনায় বের হচ্ছে সাহিত্যের ছোটকাগজ 'ঐহিক'। প্রকাশিত গল্পের বই দু'টি-
নিঝুমপুরের না-রূপকথা (২০০৯),
তিতিরের নৌকো যাত্রা (২০১৩)।

1 টি মন্তব্য:

  1. বেশ ভালো, কাব্যিক। আশার আশ্বাস। সুন্দর।
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন