বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৫

শ্রাবণী দাশগুপ্ত'র গল্প : গুপ্তি

মা’দের খাটের পাশে দেওয়াল ঘেঁষে লেখার ডেস্ক, তার ওপরে সাঁটা গোল আয়না। বাবা কোন্‌ অকশন থেকে কিনেছিল। ড্রয়ারে কি আছে কে জানে, টেবিলে কৌটো, ক্রিম পাউডার চিরুনি এগুলো। একখণ্ড শরদিন্দু অম্‌নিবাস পড়ে আছে। মা নিয়ে যাবে ভেবে, শেষ অবধি ওজনের কথা ভেবে বাবনি নিতে দিলনা।

কালো, ঘন, ভারী সেগুনকাঠের ঢাউস আল্মারি ছফিট। হিরণ্যর চেয়ে চার ইঞ্চি লম্বা। মা’র বিয়ের যৌতুক, মা-ই বলেছিল। মা টুকিটাকি গল্প করত, ঘরোয়া গল্প। আল্মারির ভেতরে জন্মান্তরের রসদ আছে, হিরণ্য ছোটোবেলায় ভাবত। মা তাকে সরিয়ে ঘর বন্ধ করে আলমারি খুলত।


হিরণ্য আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল আল্মারির গায়ে। হিমহিম নয়। হাল্কা তাপ ও অদ্ভুত লিকলিকে চলিষ্ণু স্রোত ছুঁয়ে দিল হাতের আঙুল। প্রাণবন্ত লাগল হিরণ্যর, আপন আপন। গভীর করে হাত বোলাতে লাগল, আপন কেউ চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। পেটের কাছে ছোট্টো গুঁতো লাগল। ঘুরে দেখল চাবিটা ঝুলছে আল্মারির পাল্লায়। মা ঝুলিয়ে গেছে ইচ্ছে করে? পকেটের মোবাইল বেজে উঠল, ভাইব্রেশনে ছিল। ব্যাটারি খুব কমে গেছে। থতমত খেয়ে তুলে দেখল, বাবনি।

- হ্যাঁ, বল্‌।

- শোন্‌ আমরা বসে গেছি। এবার মোবাইল অফ্‌ করব। যেটা দরকারী কথা, মা নাকি নিজের আল্মারির চাবি খুঁজে পাচ্ছেনা। দেখিস তো যদি পাস। অবশ্য তোকে বলাও বেকার... এত সাবধানী মানুষ মা, কি করে যে হল! যাক, রাখছি।

- ওকে, ওকে, পেয়ে গেলে জানাব। তোরা পৌঁছে ফোন করে দিস।

- হ্যাঁ। চাবি পেলে তুলে রাখিস রে। সাবধানে থাকিস্‌।

- ডোণ্ট ওয়ারি।

চাবিগুলো একটা রিঙে আটকান। হিরণ্য হাতে নিয়ে লোফালুফি করল। সামনে সোনার কেল্লা, স্বপ্নে জাতিস্মর, হাতে চাবিকাঠি। হিরণ্য দাঁড়িয়ে থাকে, দাঁড়িয়েই থাকে। হরেক চিন্তা বোঝাই নৌকো দুলছে মাথার খুপরিতে। আলমারি বাইরে থেকে দেখতে বিরাট, গ্রাম্ভারীমতো। হাট করে খুলে যদি দেখে বিপরীত অন্দর? চাবিটা গরম হয়ে উঠছে মুঠোর মধ্যে। আলমারি হাসছে, কিরে? এই যে তোর, পাছে কিছু হয়... ভেবে কাটিয়ে দিবি আজীবন?

থাক সকালে দেখা যাবে, হিরণ্য চাবি ডেক্সের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল। আলো নিবিয়ে বেরিয়ে যাবে, খাটের পায়ায় চটি আটকে হুড়মুড়িয়ে বসে পড়ল বিছানার ওপরে। খাট হাল্কা মচমচ শব্দ করল।

সুযোগ ছাড়বি? চাবিটা বের করে খোল, দেখ...।

বাববাঃ! আদেশ উপদেশ না অনুরোধ? আরে, বড্ড মুশকিল দেখছি! জম্মে কোনোদিন তোমায় খুঁড়িনি ভাই, আজ এভাবে...

এয়ারপোর্টে গেটে ঢুকতে ঢুকতে মা, ফিরে তাকাচ্ছিল। ছোটোখাটো হাল্কা-পলকা মা হাঁটছিল না, ভেসে গেল মসৃণ মেঝের ওপর দিয়ে। বাবনির হাতের ট্রলিতে দুটো সুটকেস, একটা মা’র। নাগপুরের ফ্লাইট ধরবে। কারো কাছে উল্লেখ করতে হলে শুধু ‘ছোড়দি’ বলে হিরণ্য। বছরদুয়ের বড়ো বলে বাবনিই ডেকেছে। আজকাল তিনমিনিটের বেশি এয়ারপোর্টের সামনে দাঁড়ানোর অনুমতি নেই। ট্যাক্সি ঘুরিয়ে নিল হিরণ্য, মনে করেছিল একটু দূরে বাসস্টপে ছেড়ে দেবে। দিদি তিনদিনের কাজ শেষ করে আসানসোল ফিরে গিয়েছিল। ঘাটকাজে এসেছিল আবার। হিরণ্য আলগোছে মাকে বলেছিল,

- দিদি এই ক’দিন থেকে গেলে পারত না?

- পুন্নি সংসারের বড়োবৌ, কত দায়িত্ব-টায়িত্ব। থাকবে কি করে বল্‌?

মা আপনমনে বলে যায়। সে সংসারী ক্যাচাল বোঝেনা। দিদির বিয়ে হয়েছে বাইশ বছর বয়সে, হিরণ্যর তখন এগারো। আপাতত সে ট্যাক্সির বাইরে তাকিয়েছিল। শীত পড়েছে। পিরপির করে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে কাঁচ পুরো বন্ধ না-হওয়া জানালার ওপর দিয়ে। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে গেল গাড়িটা। সামনে অনেকগুলো আটকে আছে। সিগন্যাল বদল হওয়ামাত্র পাশ থেকে সাদা অলটো কায়দা করে ওভারটেক করল। ট্যাক্সিওয়ালা বোধহয় একটু অন্যমনে ছিল। চকিত হয়ে জাতীয় ভাষায় খিস্তি মারল। গলা খাঁকড়ানি দিয়ে একদলা কফ ফেলল জানালা পেরিয়ে। বলল,

- সামনে মেঁ বসস্ট্যাণ্ড আছে। উতর যাবেন কি?

- নাহ্‌ আগে বাড়ুন। নামার আগে বলে দেব।

চোখ বন্ধ করে মাথা হেলিয়ে বসল হিরণ্য। ফাঁকা লাগছে নাকি বুকের ভেতর? বাচ্চা ছেলেদের যেমন হয়? ট্যাক্সি থেকে নেমে বাস ধরলে টাকা বাঁচানো যেত। ইচ্ছে করছে একটু বড়োলোকি করতে। নিজস্ব গাড়ির কথা ভেবেছে। সেকেণ্ডহ্যাণ্ড গাড়ি একখানা কিনেই ফেলা যায়, কেনেনি। স্বপ্নে ভাবে লম্বা সফরে যাবে, যায়না। রাস্তা খুঁড়ে খুঁড়ে মেট্রোরেলের পথ হচ্ছে। বিশাল উঁচু আকাশঝাড়ুর কাঠামোর মাথায় ডাইনোসরের মতো ক্রেন। আকাশের আলো ম্লান হয়ে গেছে। পুরো রাস্তা মা হাঁ করে বাইরে তাকিয়ে দেখছিল। বছরখানেক পরে বাইরের আলোয় এল। হাসপাতালের সামনে জঞ্জালের পাহাড়। অফিস যাতায়াতের সময়ে এসব নজর করার সময় থাকেনা।

অলস চোখে আগায় দৃশ্যাবলী ফিল্মস্ট্রিপের মতো পেরিয়ে যাচ্ছে। চোখের পাতা ভারী, ঘুম জড়াচ্ছে। এমনিতে তার খালি ঘুম পায়। স্বপ্নের আঁকিবুকিতে মানুষের অলিখিত সমুদ্র আর ঢেউ দেখে। পরিষ্কার মনে রাখতে পারেনা। তাকে রেখে মা খুশিমনে চলে গেল বাবনির সঙ্গে? ড্রাইভার পেছনের সীট দেখল আয়না দিয়ে। হয়ত দেখে মায়া হল। বলল,

- কিধর যাওগে সা’ব?

হিরণ্য মাতালের ভঙ্গিতে আধোঘুমে হাত নাড়াল, চলুক গাড়ি। এখনও অনেকটা যেতে হবে।

দীর্ঘদিন নিমজ্জিত জাহাজের মতো দেখতে তাদের একতলা বাড়িটা, শেওলার আস্তরে আসলি রঙ উধাও। চারদিকে অনেকগুলো একতলা দোতলা হয়েছে, তেতলাও তুলেছে অনেকে। খেলার মাঠের গা-ঘেঁষে দুটো ঝকঝকে ফ্ল্যাটবাড়ি মাঠের সীমা ছোটো করে দিয়েছে। তাও মাঠটা জায়গামতো আছে। গলিতে ট্যাক্সি ঢুকতে অসুবিধে হয়না, বেরোতে একটু কষ্ট। হিরণ্য অবশ্য আগে ছেড়ে দিল ভাড়া গুণে দিয়ে। পাঁচিলঘেরা গেটের ভেতর অল্প বাগান। তালা খুলে দাঁড়িয়ে রইল। দিনান্তের মেটেসিঁদুর আলো তেরছা হয়ে বাড়িটার গায়ে লেগে আছে চোরা মনখারাপের রঙে। বাদবাকি অন্ধকার হয়ে এসেছে। কে ঝুঁকছে ছাতের ওপর থেকে? মুখ তুলে তাকাল হিরণ্য। কেউ না। বর্ষার জল গড়িয়ে সিপেজ ধরেছে কার্নিশের সামনেটায়। মাধবীলতা, মানিপ্ল্যান্ট আর দুয়েকটা কী লতা তুলে দিয়েছিল মা। জঙ্গল হয়ে আছে। বাবার অসুখের জন্যে পরিচর্‍যা হতনা। বাড়ির ভেতরে ঘুরঘুট্টি। সামনের টানা খোলা বারান্দায় ক’বছর আগে মাত্র গ্রিল বসেছে। হিরণ্য ঢোকেনা, দাঁড়িয়ে থাকে। বেশিক্ষণ এরকম দাঁড়িয়ে থাকলে কোনো প্রতিবেশী ডাক দেবে। জন্মাবধি চেনা পরিবারগুলো। লাইট জ্বলছে আশেপাশে। হিরণ্য গ্রিলের তালা খুলল, খুলল আবার বন্ধ করল। বারান্দায় বাবার আরাম-কেদারার কোল খালি। দুমাস পেরিয়ে গেল না? কাত হয়ে আছে না দুলছে? থাক, হিরণ্য বসবে ভেবেও বসল না। ঘরের কাজগুলো এখন থেকে তার, যতদিন না মা ফিরে আসে! কবে আসবে মা? ফেরার তারিখ বলে গেছে, মনে পড়লনা। সময়মতো মনে পড়েনা। বৈঠকখানার নিচু তক্তপোশের পাশে ধুলোমাখা ফ্লিপফ্লপ জুতো খুলে রাখল। মা দেখলে খুঁতখুঁত করত, সরিয়ে রাখত। হিরণ্য কম পাওয়ারের আলো জ্বালাল। বসার বেতের শ্রীহীন চেয়ারগুলো। একদা ওরাও যুবক ছিল।

সঞ্চয় প্রায় শেষ করে বাড়ি বানিয়েছিল বাবা। মোটামুটি শৌখিন ছিল, কম-সে-কম ভালো ডিজাইন দিয়েছিল। বহুকাল হয়ে গেল। উঁচু সিলিং, রীতিমতো জলছাদ করা। ঝুলের বড়োবড়ো দোলনা কোণে। মা সময় পাচ্ছিল না একেবারে। বাঁধানো একটা ছবি বেঁকে ঝুলছে। পাতি ছবিটা অসামান্য দেখাচ্ছে অল্প আলোতে! ব্রিজের নিচে পালতোলা নৌকোয় একলা মানুষ। বহতা জল সত্বেও স্থির ভাসন্ত ডিঙি – রো ইওর বোট।

সরু লম্বা জানালা, কাঠের পাল্লা। পরে গরাদ সরিয়ে গ্রিল বসানো হয়েছিল। চার বছরের বড়ো ছিল দাদা, অরণ্য। ধুস, ম্যান প্রপোজেস, গড ডিস্পোজেস কথাটা আজকাল বিশ্বাস করে ফেলে হিরণ্য। দাদার রহস্যময় হারিয়ে যাওয়া - তখন হিরণ্য ইস্কুলের শেষধাপে। বাবা প্ল্যানট্যান বরাবরের মতো জলের নিচে ডুবিয়ে ফেলেছিল।

গুমসুম লাগছে ঘরগুলো। জানালা খুলে দেবার কথা ভাবল হিরণ্য। এখন মশা ঢোকে খুব। প্রতি সন্ধ্যেবেলা মা ধুনো দিত। অফিস থেকে ফেরার পরে ধুনোর গন্ধ বাতাসের অণুতে লেগে থাকে। মা যাওয়ার আগে অনেক কিছু পইপই করে বলে দিয়েছে। যদিও সে কোনওদিন তেমন বাধ্য ছেলে নয়। স্মৃতিশক্তিও বোধহয় কম। মানসিক চাপ এলে আরো ভুলে যায়। ঠাণ্ডা ঘরটাতে মুক্তির মতো উষ্ণতা স্পর্শ করে গেল। আহা কেউ নেই, সমস্ত বাড়ি জুড়ে একার আধিপত্য! কোণা থেকে ঢ্যালঢ্যালে হাওয়াই চটিটা টেনে নিয়ে পরল। ছোট্ট হাসি ফুটল, খালিপায়ে ঘোরাফেরা করলে মা ঘ্যানরঘ্যানর করত। সর্দির ধাত বারোমেসে। একতলা বলে আরো কনকনে মেঝে। দুয়েকটা লাইট জ্বালিয়ে দিল হিরণ্য। অকারণে ফ্রিজের দরজা খুলে দেখল ভেতরটা। ঢাকা-দেওয়া বাটি অনেকগুলো। বাবনি বলেছিল,

- রেখে গেলাম হিরন, খেয়ে নিবি গরম করে।

- তুই পারিসও! এত খাই নাকি?

- পারবি, খাস। পরশু সকাল থেকে একজন রান্নার লোক আসবে, কথা বলে রেখেছে মা।

- ধুৎ, ও আমি চালিয়ে নিতাম। কদিনের ব্যাপার...

পারবি না। বেকার বেকার বলিস কেন?

- মা কবে ফিরবে রে?

- ধর্‌ আর এলই না? ওখানে রেখে দিলাম? তুই সারাদিনে ক’টা কথা বলতিস মা-বাবার সাথে? ধেড়েখোকা একটা!

বাবনি বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে বলেছিল। মা’র যাওয়াতে বাধা দেয়নি, যদিও আতান্তরে পড়বে বুঝতে পারছিল। মা’র সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিলনা, আর বাবা দূর গ্রহের মানুষ। মনভর্তি ইচ্ছে নিয়ে বিয়ে করে ওঠাও হলনা। জনাদুই প্রমিকা হয়েছিল, সে মজা করে বলত ‘ঘোরিকা’। একটাও পাকল না। রাধিকার সঙ্গে গড়াল অনেক দূর, দৈহিক কিছু হওয়ার আগে সে নিজেই সরে এল। ওদের এতদিনে বিয়ে-থা-সংসার হয়ে গেছে। ভুলোমন, আওপাতালি হয়ে থেকেছে হিরণ্য। চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই। অবশ্য সেভাবে ভাবলে হয়ত সময় পার হয়নি। নিজেকে অসতর্কতার চতুর্থ সন্তান ভেবে গুটিয়ে থেকেছে, একটু বুদ্ধি পাকার পর থেকে। যেন তারই অপরাধ!

বাড়িটা ডুবে আছে বাবার এবং আরো অনন্ত স্মৃতির থৈথৈ জলের তলায়। ভোলেভালা জলজ্যান্ত ছেলেটাও আছে। অতএব মা ফিরবেই। বিশ্বাস করতে আরাম লাগল হিরণ্যর।

ছোটো আয়তাকার ঘরটায় বাবা-মা থাকত। আলো জ্বালাল। ঢুকতে লজ্জা করত, তাই কালেভদ্রে আসত। শেষ বছরটা বাবা শয্যাশায়ী ছিল বড় খাটটায়, মা পাশের ফোল্ডিং খাটে শুত। ঠেলে জানালার কপাট খুলে দিল। কী আঁট! গুনগুনিয়ে মশার দল। ফাঁকা ঘরে কেমন অস্তিত্বের আরাম, বেশ লাগছিল। পেছনদিকে বাথরুমের গা-ঘেঁষে বিশাল অশথের ঘন পাতার গায়ে গায়ে পুরনো কথা। গজানোর সঙ্গে সঙ্গে চারাটা ফেলে দেওয়া হয়নি। বেড়ে উঠে দেওয়াল ফাটিয়ে দিয়েছে কোথাও। পাশে টিউবওয়েল। আগে ওটাই সম্বল ছিল, এখন আর চলেনা।

ফোল্ডিংখাটটা বোধহয় সিঁড়ির ঘরে তুলে দিয়ে গেছে বাবনি। মশারি-চাদর ভাঁজ করে গুটিয়ে, বিছানা ঢেকে রেখে গেছে। ধুলো জমবে, জানা কথাই। দেওয়ালে চন্দন-পরানো বাবার ফোটো। হাসি নেই। বাবা হাসত না? অদ্ভুত নিঃশব্দে সরে গেল চলমান সময় থেকে! সমীরণদার তোলা ফোটোটা বেশিদিন আগের নয়। নতুন ক্যামেরায় ক্লিক-ক্লিক করে বেড়াচ্ছিল। হিরণ্যর মনে হল, মা না ফিরলে খুব শিগগীর সব কিছুতে যাচ্ছেতাই রকমের ধুলো পড়বে। মাকড়সা জাল বুনে ফেলবে। ভেতরে গল্পেরা জমে থাকবে। ঘষটানো বিষণ্ণতা মন কাটছিল। ঢিলে ইলাস্টিক সন্ধ্যে, তারপর একবস্তা রাত, শেষ হয়ে ভোর। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের স্বপ্ন আর স্মৃতিও মরে যায়? আশ্চর্‍য ও বিস্ময়ের, সে ভাবল। চমকে উঠল, আচমকা কাঁধে ধপ করে একটা টিকটিকি। পায়ের পাশ দিয়ে সড়াৎ করে সরে গেল মোটা ছিটছিট আরও একটা।

কোঈ ডর নহীঁ হ্যায় মোটামাথা মোটকু। সব ঝুঠ হ্যায়...

দাদার গলা মরে গেছে, আওয়াজ পর্‍যন্ত মনে পড়েনা। কথাগুলো তাজা। মাঝে মাঝে অন্যমনষ্কভাবে আওড়ায় হিরণ্য।


মধ্যবিত্তের আলমারি, সমুদ্রের নিচে মরে থাকা জীবাশ্ম। জীবনের স্পন্দন ধরা পড়েনা। হিরণ্য বোকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাট করে খোলা আল্মারির সামনে। খুলল কেন? হাতে চাবি ছিল তাই? মা’র চাবি ফেলে যাওয়া ইচ্ছাকৃত? ঘাড়ের পেছনে শন্‌শন্‌ ফিসফাস, খোল্‌ না, খুলে দ্যাখ না।

দেখব কি আবার? জামাকাপড়-লেপ-চাদর থাকবে। কী দরকার?

গুছিয়ে রেখে গেছে মা। স্তরে স্তরে, থাকে থাকে। নিখুঁত, নিপুণ, যত্নশীল। কাপড়ে মোড়া ছোটোবড়ো নানান পুঁটুলি। প্রতিষেধকের টাটকা গন্ধ। কাঁচা, নোনতা, গরম ভাপ ঠুকরে যাচ্ছে হিরণ্যকে, আপন কেউ মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করলে যেমন লাগে। বিষণ্ণতা সরে যাচ্ছে। চশমা খুলে মুছে আবার কানে গুঁজল। ঘরের আলো একটু কম, তবু ঝাপসা নয়। হিরণ্য বেখেয়ালে আঙুলগুলো হারমোনিয়ামের রিড্‌ ছোঁওয়ার ভঙ্গিতে ভেতরের জিনিসগুলোয় বুলোচ্ছিল। অস্পষ্ট কারেন্ট গেল পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি। ছোটো পোঁটলা আলগামতো ছিল। টেনে নিয়ে মোড়ক খুলল, মা’র ব্লাউজ, দুএকটা অন্তর্বাস, কয়েকটা কাগজের স্লিপ। মুড়ে যেমন-তেমন করে গুঁজে দিল। ঠিক পাশ থেকে উঁকি দিচ্ছিল কি যেন। স্পর্শমাত্র আপনা থেকে খসে এল হাতে। মস্ত মোটা টিকটিকি ঠপাস করে বসল বিছানায়। হিরণ্য চমকে ঘাড় ঘোরাল। তার দিকে চোখ, হাসছে নাকি? ঘরে এত টিকটিকি? টিকটিকিরা খনার জিভ না কি খেয়ে, সত্যবাদী। যত গুলগল্প মা’র। হিরণ্য বুদ্ধু হয়ে গেঁদাবাচ্চা কোলে ধরার মতো লম্বা কাপড়ের পুঁটুলি ধরে দাঁড়িয়ে রইল মিনিটখানেক। আলমারি বন্ধ করার কথা মনে পড়ল না। পায়ে পায়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে ফের হোঁচট খাটের পায়ায়। মচমচ মচমচ,

- বস্‌ এখানে।

- আবার বসব?

- পোঁটলা খোল।

ছিটকাপড়ের ঢাকনা খুলল। ঘনবাদামী রঙ সরু, বেশ লম্বা খোলস। কিসের খাপ? তরবারীর মতো, অথচ এরকম সোজা হয়না। চামড়ার ওপর ডিজাইন এমবস করা। হিরণ্য উলটে ঝাঁকিয়ে দেখল জিনিসটা। খালি, ভেতরে নেই কিছু।

হিরণ তুই এটা দেখেছিস আগেও। মনে পড়ে? চেষ্টা কর্‌...

হিরণ্য মাথা নিচু করতেই টিকটিকি ডাকল, টিকটিক টিকটিক। হিরণ জিনিসটি দেখেছে আগে, দুতিনবার যদিও। কী নাম? কী নাম? হিরণ্য মনে করল, গ্‌ – গু – গু-প্‌তি!

মনে করতে পেরে স্বস্তি হল হিরণের। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। ভাবল, শুধু খোলটা? আসলি মাল গেল কোথায়? কেমন দেখতে ছিল? অন্য কোথাও রাখা? আলমারির পাল্লার দিকে তাকিয়ে মনে হল সামান্য দুলছে। জানালার বাইরে ঝড়ের ঈষৎ আভাস। হিরণ্যর খিদে পাচ্ছিল। জিনিসটা যেন-তেন করে কাপড়টায় মুড়ে কোণের দিকে ঠুসে দেবার চেষ্টা করল। যেভাবেই রাখুক, ছ’মাস বাদে এলেও মা ধরে ফেলবে, আলমারিতে হাত পড়েছিল। ধুপ করে অন্য তাক থেকে একটা পোঁটলা ইচ্ছে করে লাফ মারল মেঝেতে। বেশ বিরক্ত হল হিরণ্য। আঃ হচ্ছেটা কি? বেদম ঝঞ্ঝাটে পড়া গেল।

লাইট দিপদিপ করে জ্বলছে। বুড়ো টিউব। ভোল্টেজ ওঠানামা করলেও অনেকসময়ে এরকম হয়। পোঁটলাখানা আলগা আঙুলে করে তুলছিল। ডানা ঝাপটিয়ে পায়রার মতো কতগুলো কাগজ ছড়িয়ে পড়ল। একরাশ কবেকার পোস্টকার্ড, দুচারটে ফোটো, একখানা পোকা-কাটা ডায়েরি।

বোঝো ঠ্যালা! আবার কি উৎপাত?

“...চালের দাম অতিরিক্ত বাড়িয়াছে... একসের ১/- হইয়াছে।” “চাল অমিল হইতেছে...”। “চাল না পাঠাইলে না খাইয়া মরিতে হয়...”। “যত সত্বর সম্ভব দুইমন চাল পৌঁছিয়া দিবা...”। “সাবধানে আইবা... চাল বাঁচাইয়া।”

নির্দেশ, নিজেদের অবস্থা, আঞ্চলিক পরিস্থিতি। ফাউন্টেন পেনের সিপিয়া রঙ কালি। রঙ হারিয়ে যাওয়া কয়েকটা ঝাপসা পোস্টকার্ড চোখের ডগায়। সাল লেখা ঊণিশশো বেয়াল্লিশ, ঊণিশশো তেতাল্লিশ। কয়েকটা শ্রীচরণকমলেষু বড়দা, কোনটায় আশীর্বাদিকা তোমার মা। গোটাচারেক সাদাকালো অস্পষ্ট ফোটো। কাদের? অচেনা মানুষজন। হাড়-পাঁজর বের করা আধা-উলঙ্গ এক বুড়ো। শুধু শাড়ি গায়ে জড়ানো ঘোমটা-পরা আলুথালু বউকে ঘিরে তিনচারটে বাচ্চা।

“...যদি পার, তাহা হইলে বীনাপাণিকে তোমার কাছে সহিত লইয়া যাইও। এখানে বিপদের আশঙ্কা...।” আরেকটা চিঠি।

চোখ বুলোচ্ছে হিরণ্য, গ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য চিঠির মধ্যে। অধিকাংশ সম্বোধনে সতীশ এবং সতে নামটা। শ্রীসতীশচন্দ্র চক্রবর্তী নামটা হিরণ্যর জানা। বাবাদের সবার বড়ো। তাদের জ্যাঠামশাই, কখনো চোখে দেখেনি। দেশভাগের সময়ে মারা গিয়েছিলেন, এইটুকু জানত। কয়েকজন পিসি ছিল মাঝখানে, শৈশবে যথেষ্ট যাতায়াত ছিল। বাবার নাম নীতিশচন্দ্র চক্রবর্তী।

চারপাশ ঘিরে এসে বসছে কারা। ঝুঁকে পড়ছে নথিপত্রের দপ্তরের ওপরে।

- আমাগোরে দ্যাখতে দে নিইত্যার পোলা। আর আমাগো কথা মন দিয়া শুনতে অইব।

হিরণ্য একটু দ্বিধায় পড়ে হাসল। নিজের মুণ্ডিত মাথা হাতের পাতায় বুলিয়ে নিল। বলল,

- আচ্ছা, আচ্ছা, বসো, সবাই বসো। দেখো, এই ব্যাপারে আমার জ্ঞানগম্যি কিছুই নেই। কি হয়েছিল, কবে হয়েছিল ওই ইতিহাস-টিতিহাস আমার এলাকা না। কেউ গল্প করে কখনো বলেছে কিনা, মনে নেই। একাউন্টস্‌ বুঝি, সেলস-মার্কেটিংও অল্পবিস্তর বুঝি। বরং ওঘর থেকে ল্যাপটপটা এনে...

চারদিক থেকে যেন চেপে ধরল, হিরণ্যকে। ক্যালর ব্যালর জোরে জোরে। হিরণ্য এমনিতে কথা বলে কম। থতমত খেয়ে গেল।

- না না না, উইট্‌ঠা যাওন চলব না। বইসা থাক, আমরা কমু। যন্তর-মন্তর আননের নাম কইরা পালাইবা, অইব না। চিঠিগুলান পড়তে থাক, আসল ঘটনা ইসের মইধ্যে পাইবা। ক্যামনে আমাগো দিন কাটছিল...

কে আবার দয়া পরবশ হয়ে বলল,

- অগো, পোলাটা খায় নাই। খাইয়া আস, তারপর কথা কওন যাইব। যদি না খায় বিকালি, সিংহ হয় শৃগালী। যাও ধন...

- না! মায়া কইর না। দিনের পর দিন প্যাটে গামছা বাইন্দ্যা কাটছে আমাগো। হেরা কেও জানছে? বুঝুক নিইত্যার বেটা।

রাত হয়েছে বেশ, পেটের মধ্যে সাপে-বেজিতে লড়াই করে চুপও হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। খোলা জানালা দিয়ে অসংখ্য মশা ঢুকছে। কানের কাছে এত গুঁজরাচ্ছে, মানুষের স্বর চাপা পড়ে যাচ্ছে। হিরণ্য ট্রাবল্‌গামে আঠা-লাগানো ইঁদুরের মতো আটকে গেছে বিছানায়। সকলে ওর মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছে।

- হেইডা নিইত্যার ছুটো পোলা, দ্যাখতে বাপের মতই লাগতাছে।

- অ ছেমড়া, আমাগো চিন নি?

- কি যে কন! চিনব কি কইরা? দ্যাখছে নাকি? অরে তো কইয়া দেওন লাগে।

- হ্যার নিদ্রা আইতাছে। ঘুমাইতে দেওন যায়? তাইলে শুনব ক্যামনে?


সুস্বাদ চালে, সুগন্ধ ভাতের বুগবুগিতে, ধোঁয়ায়। বরিশালের বালাম চাল। কী তার সোয়াদ, কী বাস তার। গুষ্টিবর্গ ঢাকায়, ওখানেই বাসা। অনুকূলচন্দ্র সামান্য কাজ করতেন, উপার্জন বেশি নয়। সঙ্গে পুরোহিতগিরিও। বড়ো সতীশচন্দ্র কলিকাতার কালেজে পড়াশোনা করছিল। বাকি ছেলেপুলেরা ঢাকাতেই ইস্কুল-টিস্কুলে, দুটি মেয়ে বিয়ের যুগ্যি।

যুদ্ধ লেগেছিল বিদেশে, জিনিসের দাম বাড়ছিল। চালের দাম চড়তে চড়তে আগুণের শিখা। তিনবেলা ভাত খেয়ে অলস মানুষগুলো চালের অনটনে বাধ্য হয়ে ভাতের মাড় না ফেলে, হাঁড়িতে শুকিয়ে খাচ্ছিল। তাতেও পেট জুড়োয় কই? ঘরে ঘরে একই কথা। ন’দা, ধনদা, সোনাদা, ছোটদি, ফুলদি, দেখা হলেই মাথায় হাত, গালে হাত।

- কী আকাল আইছে গো। কও, বাপের জম্মে শুনছে কেও বাঙালদ্যাশের মানুষ ভাত না খাইয়া থাকব?

- সাতটাহা মন অখন দুইটাকা সেরে উটছে, শুনছ নি?

যুদ্ধ চলতাছিল। মাথার ওপর দিয়ে উইড়া যায় যুদ্ধবিমান। শহুরে লোকে খবরবার্তা রাখে, গ্রামের মানুষ বলদার মত আকাশের দিকে চাইয়া ভাবে, উড়োজাহাজগুলা যায় কই? পেটের ভিত্‌রে চাল লইয়া যায়? খাইতে দিব আমাগো?

মনিষ্যি কিরম ডাকাত হইয়া উঠতাছে। লুটতরাজ শিখল। সময় তাগরে শিখাইল। কী লোটে? চালের বস্তা। ল্যাংটা ল্যাংটা কঙ্কাল-পারা ছেমড়াছেমড়ি খাড়াইয়া থাকে রেললাইনের পাশে ঝোপঝাড় আর অন্ধকারের মইধ্যে। রেলগাড়ি থামামাত্র চিলের লাখান ঝাঁপাইয়া পড়ে। কাঠি দিয়া, উনানের শিক দিয়া চাল বাইরা লইতে থাকে।

চক্ষের সামনে ভাত দিবার লোভ দেখাইয়া মানুষটা টাইন্যা লইল যুবতী মাইডারে – ঝোপের মইধ্যে ঢুইক্যা কুকর্ম। লাজলজ্জা নাই সম্ভ্রম বিসর্জন দিছে। বুঝি না যে তা নয়!

বার্মার দখল নিছে জাপানিগুলা। বৃটিশদের দিন ভাল যাইতাছে না। জাহাজ ভইরা ভইরা মনিষ্যি পালাইয়া আইতাছে ইণ্ডিয়ায়, বেঙ্গলে। কলিকাতার অবস্থা? রাস্তায় পইড়া মরতাছে দুধের বাচ্চা, জুয়ান, বুড়া, মাইয়ামানুষ। কোনডা হিন্দু, কেডা মুসলমান ঈশ্বরে আল্লাহ্‌তেও কইতে পারত না। ডেডবডি জ্বালাইবার, গোর দেওনের জাগা নাই, শিয়াল-শকুনের মোচ্ছব চলে রাইতদিন।

চার্চিল না কে এক ব্যাডা কইছে, কোনও অভাব নাই। ইণ্ডিয়ায় ইন্দুরের মতো, পোকার মতো মানুষ জন্মায়। সব বেডায় মিলা এত এত খাইলে, আকাল হইব না ত কি অইব?

বাসার এতগুলা প্রাণী, না জানি ক্যামনে খায়, দায়! চালের উপায় না করলে বাইচ্যা থাকব কয়দিন?

সতীশচন্দ্র গোপনে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন কিনা জানা যাচ্ছেনা, যদিও ইঙ্গিত আছে। তবে অঙ্ক একেবারে সরল নয়। গুপ্তি সংগ্রহ হয়েছিল কোত্থেকে? বলার জন্যে বেঁচে নেই কেউ। গুপ্তির ভরসায় কলকাতা থেকে দেশের বাড়ি থেকে, চাল নিয়ে ঢাকায় পৌঁছে দিয়েছিল বছর বিশের এক তরুণ! সতীশচন্দ্রের একটি বাঁধানো ফোটোগ্রাফ বাড়িতেই কোথাও টাঙানো আছে, না ছিল। তারা কেউ খেয়াল করে দেখত না। হয়ত পরে খুলে নিয়ে ছাদের সিঁড়ির ঘরে নামিয়ে রাখা হয়েছে। হয়ত মাকড়সা জাল বুনে আড়াল করে দিয়েছে মুখ। তন্তুতে আর গ্রন্থিতে অসংখ্য গল্প জমে উঠেছে। অন্তত গুপ্তিটা যদি একবার দেখতে পাওয়া যেত! দাদার হাতে একবার যেন দিয়েছিল মা। ছবিটা স্পষ্ট হয়ে এল। দাদা মাথার ওপরে তুলে ঘুরিয়েছিল দুচার পাক। তারপর ছুঁচলো দিকটাকে ঠেকিয়েছিল তার পেটে,

- মোটকু, তোর ভুঁড়ি ফুট্টুস হয়ে যাক!

- আচ্ছা আচ্ছা, সারেণ্ডার...

হিরণ্য স্বভাব ভীরু। মাথার ওপরে হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মা হাসলেও শঙ্কিত মুখ ছিল। বলেছিল,

- অরিন, কি করছিস? ওরকম ওর পেটে ঢুকে গেলে রক্তারক্তি হয়ে যাবে। ভালো হবে তখন?

গুপ্তিটা কি রক্তের স্বাদ-গন্ধ পেয়েছিল কখনো?


কে আসে পেছন পেছন অশরীরী ছায়ার মতো, চাল দিবি চাল? একমুঠ দে না, ওই গাংপাড়ে বইস্যা ফুটাইয়া দুইগাল খাই। ছাওয়ালে মাই টানে, দুধই নাই। খায় কি?

ঘ্যানর ঘ্যানর করতে করতে আসতেই থাকে। স্টেশনে, খালি মাঠে, স্টিমার ঘাটে। কোলের বাচ্চা ডিহাইড্রেটেড ঝুলন্ত স্তন মুখে গুঁজে ঝুলে থাকে। সতীশচন্দ্র কীভাবে গিয়ে পৌঁছেছিলেন অনুমানও করা যায়না।

ঘাটের দিকে আগাইয়া যাইতে যাইতে মাইয়ামানুষ দুইডা পিছন পিছন আইস্যা দাঁড়াইল। সাইজ্যা আইছে, চুলে লতাপাতা গুইজ্যা, ঠোঁটের উপরে আলতা না কি মাখাইছে। শেওড়াগাছের পেত্নীর লাখান দেখাইতাছে। শুকনা বুকের কাপড় নামাইয়া, কাইৎ হইয়া কমর বাঁকাইয়া দাড়াইছে। কয়,

- ও ডাগদারবাবু গো, কথা আছে। শুনবা?

- দাড়ানোর সময় নাই বুন, আগাইয়া যাই। আর আমি কি কয়, তোমাগো ডাক্তরবাবু না।

খিলখিল করে হেসে মেয়েদুটো এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে। খ্যানখ্যানে কাঁসির মতো শোনায় ওদের হাসি আর স্বর। বলে,

- ষাইট ষাইট। তোমার বুন তোমার ঘরে থাক, আদরে থাক। আমি বীনা, ও সাদিয়া... আমি হিন্দু ও মুসলমান। আমাগো দুইজনের মইধ্যে যারে পছন্দ হয়, লইতে পার। পয়সা লাগত না, চাল দিয়া যাও।

- যাও যাও, যেতে দাও দেখিনি...

- বাবু গো পায়ে পড়তাছি...

আধান্যাংটা না খেতে পাওয়া তীর্থের কাকের মতো পালে পালে উড়ে আসে আনাচ কানাচ থেকে, দিয়া যা চাল দিয়া যা...

দয়া দেখাতে গেলেই ঘিরে ধরবে। ছিঁড়ে নেবে শখের ধুতি পাঞ্জাবি, চালের বস্তা মুহূর্তে লোপাট হয়ে যাবে চোখের ওপরে। হাঁটুর পাশে নেড়ি কুকুরের মতো ঘুরঘুর করছে উলঙ্গ বাচ্চার কঙ্কাল।

লম্বা মানুষ সতীশচন্দ্রের দুপায়ের ফাঁকে চালের বস্তা, মাথার ওপরে সরু লম্বা গুপ্তি সজোরে বনবন করে ঘুরছে,

হুই হুই... ভাগ্‌ ভাগ্‌ কাকের দল। নেংটি ইন্দুরের দল। রাস্তা ছাইড়া দে... রাস্তা ছাইড়া দে... অনেক দূরের পথ যামু...

জানালাটা পুবদিকে। কড়কড়ে রোদ্দুর এসে পড়েছে হিরণ্যর চোখে। হিরণ্য চোখ পিটপিট করে ঘরটা দেখল, বিছানাটা দেখল। এই খাটে শৈশবে কখনো শুয়েছে, স্মৃতি নেই। উগ্র নেশা কেটে যাওয়ার পরবর্তী ক্লান্তি নিয়ে বিছানায় লেপ্টে রইল, যেন দেহে আর শক্তি নেই। চোখ এদিকওদিক ঘুরিয়ে দেখল, শুকনো পাতারা বিছানার ওপরে ছড়িয়ে পড়ে আছে। রাতভর ছোটোখাটো যুদ্ধ গেল। দেওয়ালের ঘড়িতে দশটা পঞ্চাশ। খাইসে! তাহলে অফিস? মিনিটখানেক পরে মনে পড়ল, দিনটা রবিবার। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পাশ ফিরল। হাতে ঠেকল খোলসটা। মিটিমিটি হাসছে। বুকের ওপরে তুলে নিয়ে হাত বুলিয়ে পাশে রাখল। উঠে বসে ছড়ানো কাগজ পোঁটলায় বাঁধল। মোবাইলটার চার্জ জিরো হয়ে গেছে। বুড়ো মোবাইল। গা-ঝাড়া দিয়ে বিছানা ছাড়ল, টেবিলে মোবাইলে চার্জে আটকাল। পোঁটলা সাবধানে আলমারিতে ভরল, খোলসটা রাখল নিজের কাছে। মিনিটচারেকের মধ্যেই বাবনির ফোন, রাগের চোটে কথা আটকে যাচ্ছে।

- কি রে! কাল অন্তত তেষট্টিবার ফোন করেছি – আমার, মা’র, শুভেন সকলের ফোন থেকে!

- আরে, চার্জ ছিলনা। মা’র ওই চাবি খুঁজতে খুঁজতে... মাকে দে এবারে।

ভালো করে স্নান সেরে ফ্রিজের খাবার গরম করে জম্পেশ করে খেয়ে, খোলসটা সামনে নিয়ে বসল হিরণ্য। গুপ্তির বিষয়ে মা’র কাছে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করা গেল না। যেটুকু আঁচ করতে পারল, বছর পঁচিশ আগে তাদের কাছে ছিল। সেবার বাবার পোস্টিং হল যেখানে, জায়গার নাম তার মা দিদিরা বলতে পারবে। রেল-কোয়ার্টারের বাউণ্ডারি শেষ হলে কাঁচা পথ, আসল গণ্ডগ্রাম। সাপ-শেয়াল। রেলওয়ের ইস্কুলে ওরা পড়ত। দিদির সদ্য বিয়ে হয়ে কলকাতায়। মনে পড়ে, মায়ের কিরকম এক ভাই সোমমামা প্রায়ই আসা-যাওয়া করত ওদের বাড়িতে। বেশ অন্যরকম লাগত কথাবার্তা। এক সন্ধ্যেয় চোখ পর্‍যন্ত ঘোমটা-টানা মহিলাকে নিয়ে এসে হাজির। মামা কাকুতি মিনতি করছিল মা’র কাছে, ওদের থাকতে দেবার জন্যে। মামী জবুথবু হয়ে বসেছিল। মা ও বাবা দুজনেই মাথা নাড়িয়ে আপত্তি করছিল। কারণটা কি?

দাদা সেসময়ে মোটামুটি বড়ো, বাবনি ভারী পাকা। হিরণ্যকে পাত্তা দিত না, বলত মাথামোটা। সেবারে গোপণ কানাকানি শুনতে পেয়েছিল, ঘুমের ভাণ করে।

- জানিস দাদা, বাবা না, মাকে পরিষ্কার বলে দিল বিপদের সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে মোটেও রাখা যাবেনা ওদের।

- হুঁ। আমিও শুনেছি। কিন্তু বিপদ কেন সেটা বুঝলি?

- কে জানে? হবে কিছু একটা... কিন্তু ওই নতুন বৌ থুড়ি মামী না, মা’র পাশে বসে খালি কাঁদছিল, খালি কাঁদছিল...

- তাহলে আর কি বুঝলি? শোন্‌। আমাদের টাইটেল কি? চক্রবর্তী না? আমরা হলাম গিয়ে বর্ণশ্রেষ্ঠ মানে ব্রাহ্মণ।

- জানি। তাহলে কি হয় রে দাদা? ওই বৌটা ব্রাহ্মণ না? ওর টাইটেল কি?

- ব্রাহ্মণ না ছাই! বাবা মাকে বলছিল, জাতধম্মের ঠিকানা নাই...। ওরা বাঙালি না, জাত অন্য। সোমমামা লুকিয়ে বিয়ে করেছে। আমিও করব... বাঙালি না, হিন্দুস্থানী। না হলে মুসলমান... খুব গোলমাল হবে। তারপরে...

- হী হী হী... তাতে কি হয়েছে? বেশ মজা তো! যুদ্ধ-টুদ্ধ হবে, রাজাদের যেরকম হত?

দাদা বা কতটা বুঝত কে জানে? বেশ খসখস করে স্মৃতির আস্তর ছিঁড়তে পেরে নিজের কৃতিত্বে বুঁদ হয়ে গেল হিরণ্য। অঙ্কের হিসাব! একটু আধটু গরমিলে আটকাবে না। গোঁজামিল নয়, প্রব্যাবিলিটি দিয়ে কষলে আটানব্বই ভাগ মিলে যাবার কথা। বাড়িতে জায়গা না দিলেও, বাবা আস্তানা খুঁজে দিয়েছিল। বেশ ভেতরদিকে ছোটো বাড়ি নামমাত্র ভাড়ায় পেয়েছিল সোমমামা। তারা তিন ভাইবোনে বিকেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের মধ্যে চলে যেত মনে পড়ছিল। মোহ ছিল কেমন, সোমমামার বাড়ির পাশ দিয়ে চক্কর মেরে চলে আসত। দেখতে পেত, চোখ অবধি ঢাকা মামী কাজ করে চলেছে। ছবিটা তিরতির ঘুরে গেল।

আসলে যে কী ঘটেছিল, জিজ্ঞেস করলে জানা যেত মা বা বাবনির কাছে। ওসব অবান্তর ভাবছিল না হিরণ্য। কিছু কিছু মাছি এসে ভনভন করে উঠল মাথায়।

শীতসন্ধ্যায় পড়তে বসেছিল তিনভাইবোন। দোলাই গায়ে ধুতি-পরা দুজন লোক গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছিল,

- মাস্টারবাবু...।

বাবা তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে এসেছিল, পেছনে মা। লোকগুলো উত্তেজিত। বাবনি জানালা ফাঁক করে শোনার চেষ্টা করছিল। দাদার বোধহয় আসন্ন টেস্ট পরীক্ষা। খুব তেড়ে অঙ্ক করছিল বা কিছু লিখছিল খাতায়। হিরণ্য লুকিয়ে দাঁড়িয়েছিল দরজার পেছনে। ব্যস্তভাবে পায়চারি করছিল তাদের বাবা, বিড়বিড় করছিল। মাকে সম্ভবত বকাবকি করছিল। সন্তর্পনে বেরিয়ে গিয়েছিল লোকদুটোর সঙ্গে। হাতে কাপড়-মোড়া লম্বা লাঠির মতো জিনিস দেখেছিল হিরণ্য। সেই গুপ্তিখানা? গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল নিমেষে।

ফাঁকা শুনশান মাঠঘাট, জংলা। রাতে অনেক দূর থেকে আসা আওয়াজ শোনা যেত।

মাঝরাত পর্‍যন্ত তারা চারজন আলো নিভিয়ে সজাগ বসেছিল। কখন বাবা ফেরে! কুয়াশা ভোরে ফিরেছিল বাবা। দাদা আর বাবনি ঘুমিয়ে পড়েছিল ঘরে। সে ছোটো আর বোকাসোকা বলে আধঘুমন্ত মায়ের পাশে। বাবা হিসহিস করেছিল,

- অবস্থা কোনোরকমে সামলানো গেছে। দুএকদিনের মধ্যে পুলিশ আসতে পারে। ছেলেমেয়েদের বলে দিও, ওরা যেন বলে কিছু জানেনা।

হিরণ্য একটু একটু কাঁপছিল।

দুপুরে এসেছিল পুলিশ, তুমুলভাবে বাড়ি হাঁটকে দেখছিল। বাবা ছুটি নিয়েছিল সেদিন। পুলিশকর্তা দাদাকে কিসব প্রশ্ন করেছিল। যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল,

- মাস্টারজী আপকা বহুত রেসপেক্ট হ্যায় ইধর। সোচ সমঝ কে কাম কীজিয়ে অগলেবার সে। ঝঞ্ঝাট মেঁ মৎ ফঁসিয়ে।

বছরখানেকের মধ্যে বাবা আবার বদলি...।


খোলসটাকে সেরাত্তিরে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল মা? কয়লার চৌবাচ্চায়, কাঠকুটোর ঝুড়িতে? কিম্বা ভগবান জানে! ভাবতে ভাবতে হিরণ্য খুব আদর করে খোলসটার গায়ে হাত বুলোয়। কি দিয়ে তৈরি? সাপের চামড়া?

সন্ধ্যে লেগেছে। আলো জ্বেলে বাইরের ঘরে টিভি খুলে বসল হিরণ্য। চ্যানেলের পরে চ্যানেল শুধু অশান্ত উন্মত্ত স্পর্শকাতর সংবাদ। মানুষ ভয়ঙ্করভাবে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে অসহিষ্ণুতা ফুটছে, ছড়িয়ে পড়ছে উষ্ণায়ণ। সামনের দেওয়ালে চোখ আটকাল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণার্জুনের ছবির সাথে আপামর বাঙালির ভুলভাল শব্দে হলেও পাকস্থলীস্থ আশ্বাসশ্লোক – যদা যদা হী ধর্মস্য গ্লানির্ভবতিভারতঃ। কোনোদিন পুরোটা পড়ত না হিরণ্য। ধৈর্‍য ধরে জোরে জোরে দাঁত ভেঙে পড়ল। মানে বুঝল না, কিন্তু একটা জোশ এল মনে হল। গুপ্তির খোলসটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল, বাঁইবাঁই করে ঘোরাতে লাগল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন