মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৫

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প : থ্রি-নট-থ্রি

বিরক্তির একশেষ! গেরিলা-লিডার ইয়াকুবের দুপ্রান্ত ঝুলে-থাকা ঝুপো গোঁফের নিচেকার পুরু ঠোঁট গলিয়ে বেরিয়েই পড়েছিল প্রায় : ‘বুরবক কাঁহিকা, ডরপুক...!’ কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছে। পার্টির লোকদেরই-বা কী আক্কেল! লোক আর পাওয়া গেল না — হাঁদা ভিতু এই ছেলেটাকে পাঠিয়েছে ট্রেনিং নিতে। নিজের শরীর টানতেই হিমশিম — দ্যাশ স্বাধীন করবেন ইনি! দেশে থাকলে পদে-পদে বিপদ — জান খোয়াবার ভয়, ইন্ডিয়া এসে কিছুদিন অন্তত নিশ্চিন্তে জীবনযাপন — অন্ন-ধ্বংস, যুদ্ধ তো পরের চিন্তা! ট্রেনিং ক্যাম্পে চাঁদমারিতে সামান্য থ্রি-নট-থ্রি শুটিঙেই ফিট লাগার দশা। শুটিং প্র্যাকটিসের ওই ঘটনার পর ওর নামই তো হয়ে গেল থ্রি-নট-থ্রি। আসল নাম হরগোপাল দাস চাপা পড়ে গেল খেতাবি নামের তলায়। আসল নামের আগে-পিছে খেতাব ব্যবহারের প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই, কিন্তু আসল নামকে খেতাব গ্রাস করেছে — এ-ধরনের ঘটনার নজির মেলা ভার। ভাল বা মন্দ, যেকোনও কাজেই অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হলে খেতাব জোটে। খেতাব ভক্তি বা ঘৃণার প্রকাশ; গোপালের বেলায় কী? অবজ্ঞা, না-কি নিছক বিদ্রূপ?

লিকলিকে ঢ্যাঙা ঘোরকৃষ্ণবর্ণ গোপাল কথা বলে কম। যা বলে তা-ও বোঝা কঠিন; ঘড়ঘড়ে গলার আওয়াজ — তার ওপর তোতলামি তো আছেই। চোপসানো গাল-ঠেলে বেরিয়ে-আসা চোয়ালের হাড়; কুলবরইয়ের মত চোখদুটোতেই শুধু কী-এক আশ্চর্য দ্যুতি!

ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পরপর তিনবার ফেল। পড়াশোনা ওর জন্য নয় — বিষয়টি ও যেমন বোঝে, ওর বাবা শীতল দাসও ঠিক তেমনই বোঝে। কিন্তু ছেলেকে তো আর ফেলে দেওয়া যায় না; অনেক চিন্তাভাবনা করে নিজের ব্যবসায় ওকে লাগিয়ে দেয় শীতল। ব্যবসা বলতে মেশিন আর যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ। যন্ত্রপাতি খুলে সেরেসুরে জোড়া লাগানোর কাজ অল্প ক’দিনেই শিখে যায় গোপাল। দেখতে দেখতে হাত পাকে, যশ ছড়িয়ে পড়ে একজন দক্ষ মেকানিক হিসেবে। ব্যবসায় ডুবে থাকে গোপাল। বাপ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, কে বলে আমার গোপালের মাথায় গোবর! লেখাপড়াই কি সব কিছু? এতটুকুন বাচ্চা, কী-সূক্ষ্ম কাজ করে, দেখে তাক লেগে যায়! বাবার চোখে এতটুকুন হলেও বছর গড়িয়ে গেছে অনেক। কুড়িতে পা রেখেছে গোপাল।

যুদ্ধ শুরু হবার ক’দিনের মাথায় গোপালদের পরিবার নিজ-ভুঁই ছেড়ে পালিয়ে যায় অতিদূর দুর্গম এক এলাকায়। ওঠে এক আত্মীয়বাড়িতে। কিন্তু কতদিন আর কাটানো যায়, হোক তা আত্মীয়বাড়ি? শীতল দাস সিদ্ধান্ত নেয় নিজ ভিটেতেই ফিরে যাবে। পাকবাহিনীর হাতে মরলে শ্যাওড়াতলা শ্মশানেই, যেখানে চোদ্দ পুরুষের দাহ হয়েছে, চিতায় উঠবে। শীতলের ভাগ্যে তা-ই ঘটে। একদিন সাতসকালে গ্রাম ঘিরে ফেলে পাকসেনারা। বাড়ির নারীপুরুষ সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে এসএমসির ব্রাশ। গোপাল বাড়িতে ছিল না — রক্ষা পায়। উদ্ভ্রান্ত গোপাল, এখানে-ওখানে কিছুদিন ঘুরে বেড়িয়ে কী জানি কী মনে করে পাড়ি দেয় বর্ডার। ওর না-ছিল পিছুটান, না-ছিল স্পষ্ট কোনও ভবিষ্যৎ-চিন্তা। বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে থাকা। প্রতিটি প্রাণীই কেবল বেঁচে থাকা এবং প্রজননের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বেঁচে থাকে। জীবনের অন্য কোনও অর্থ খোঁজে না। গোপালের বেলায়ও অনেকটা সে-রকমই। চোখের সম্মুখে পড়ে-থাকা বাবা-মা, ঠাকুমা আর ছোট দু’বোনের স্পন্দনহীন দেহগুলো ওকে কেমন এক ঘোরের মধ্যে ঠেলে দেয়।

– ‘যুদ্ধ করবে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে?’ ওকে বলা হয়েছিল : ‘রাজি থাকলে ট্রেনিঙে যাও।’ ভাবলেশহীন চোখে ও শুধু তাকিয়ে থেকেছিল, মুখে কথা জোগায়নি।

ট্রেনিং ক্যাম্পে পৌঁছেও অবস্থার খুব একটা হেরফের দেখা যায়নি। যন্ত্রচালিতের মত ভোরবেলায় শারীরিক কসরতে যোগ দেওয়া, লাইনে দাঁড়িয়ে নাস্তা নেওয়া, মাঠে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা, সন্ধ্যায় জনযুদ্ধের ওপর আলোচনা শোনা, কোনও কোনও দিন বিনোদন অনুষ্ঠানে শরিক হওয়া।

কোনও কিছু করবার না থাকলে ক্যাম্পের এক কোণে ঢিবির মত জায়গাটায়, যেখানে ঝাঁকড়ামাথা অশ্বত্থ গাছটি অতিকায় ছাতার মত ছায়া ফেলে — তার নিচে বসে নিষ্পলক তাকিয়ে-থাকা অতিদূর পর্বতশৃঙ্গটির দিকে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সূর্যের সোনারোদ পড়ে অমল-ধবল চুড়োটি অপরূপ রশ্মি ছড়ায়।

অহমীয়া ওস্তাদ কেন জানি ওকে একটু বাড়তি খাতির করে। হতে পারে হাতিয়ার খোলা এবং জোড়াতে ওর অতি দক্ষতা। ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে অন্যদের উদ্দেশ করে চেলেঙ বলে : ‘ড্যাখো ড্যাখো গুপালনে কিটনি জলডিসে হাটিয়ার খুলটে ঔর জুড়টে হ্যায়, টুমলোগ সব ফেইল...।’ চেলেঙের জিহ্বায় ‘ত’-বর্গ আসতে চায় না।

চেলেঙের প্রশংসা গোপালের মনে যে নাড়া দেয় না তা নয়। ওস্তাদটা কী মিশুক আর অমায়িক — গোপাল ভাবে। ধীরে ধীরে ওই একজন লোকই ওর খুব কাছের হয়ে পড়ে। অবসরে চেলেঙের সঙ্গে গল্প, চেলেঙের কথাই বেশি শোনা — নিজে যেটুকু না-বললেই-নয় হিন্দি-বাংলায় মিশিয়ে বলা। গোপাল ফিরে পেতে থাকে জীবনের স্বাভাবিকতা। ট্রেনিঙের মেয়াদ বেড়ে চলে। সাধারণ ট্রেনিঙের শেষদিকে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের জটিল ব্যবহারের ওপর স্পেশাল ট্রেনিং — সিরিজ ডেটোনেশন, কর্ডেক্সের ব্যবহার। প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের ওপর সাধারণ প্রশিক্ষণ সবার সঙ্গে গোপালেরও নেওয়া হয়, কিন্তু বাদ পড়ে যায় স্পেশাল ট্রেনিং নেওয়ার সুযোগ থেকে। ব্যাপারটা আমলেই নেয় না গোপাল।

চেলেঙ আর গোপালের মধ্যকার ঘনিষ্ঠতা দেখে কারও কারও মনে বিস্ময় জন্মায়, সন্দেহও। কী হেতু থাকতে পারে এর! অপদার্থ এই ছেলেটির প্রতি ওস্তাদের এত মনোযোগ কেন! পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে কমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে দোস্তি গড়ে তোলার প্রবণতা দেখা যেত; নারী থেকে ছোকরাতেই ওদের আসক্তি ছিল বেশি। এখানকার বাহিনীতেও ও-ব্যাপার থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু গোপালের যা শরীর আর চেহারাসুরত! তাহলে?

সেদিন কী কাণ্ডটাই না হল। ক্যাম্প থেকে অনেক দূরে গহিন অরণ্যের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে ভালুকপং পাহাড়ে যেতে হল গ্রেনেড ছোড়া প্রাকটিস করতে। পাহাড়ের গা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মেঘের ভিড় ঠেলে আর্মি লরি উঠে যায় অনেক ওপরে, এক সমতল স্থানে। ওখান থেকে গ্রেনেড ছুড়ে দিতে হবে নিচে, এমনভাবে যাতে গ্রেনেডটি নিচে পড়ামাত্রই বিস্ফোরিত হয়; বিস্ফোরিত হতে সাত সেকেন্ড সময় লাগে — আর সেজন্য গ্রেনেডের লিভার রিলিজ করে দু-তিন সেকেন্ড হাতে রেখে ছুড়ে দিতে হবে। গোপাল লিভার রিলিজ করে গ্রেনেড ধরেই থাকে হাতের মুঠোয়। ভাগ্যিস চেলেঙ ওর পাশেই ছিল — এক সেকেন্ডের হেরফের হলে কী-যে হত, ভাবতেও গা শিউরে ওঠে! গোপালের হাত থেকে ছোঁ মেরে গ্রেনেডটি নিয়ে ছুড়ে দেয় চেলেঙ। মাটি ছোঁবার আগে শূন্যেই ফেটে যায় বিকট আওয়াজ তুলে। সেদিন খুব খেপে গিয়েছিল চেলেঙ : ‘লেপেচাড়, টুম টো সবকো জানসে মার ডালোগে... !’ অপরাধী গোপাল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকেছে।

ট্রেনিং শেষ, দেশে ফেরার প্রস্তুতি। ক্যাম্প ছেড়ে যেতে এত খারাপ লাগবে, আগে কখনও ভাবেনি গোপাল। কাঁটাতারের ঘের-দেওয়া বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে-ওঠা ক্যাম্পটিতে সারসার ব্যারাক, খোলা মাঠ, একদিকে ডোবা, যাতে কিলবিল করে মোষেজোঁক, পাটখেত — এখানে এসে প্রথমে ভীষণ মুষড়ে পড়েছিল গোপাল — যাবার বেলায় বুক ঠেলে কান্না আসে ওর। ভিনদেশি চেলেঙের জন্য কষ্টে গলার কাছটা টনটন্ করে। চেলেঙের চোখেও জোলো মেঘের আনাগোনা। ভিজে গলায় বলে : ‘রোও মাট গুপাল, টুম টো গেরিলা হো, আপনা ডেশকো আজাড করনা হ্যায় টুমকো... ডিলকো মজবুট রাখো...।’ পিঠ চাপড়ে তসল্লি দেয় ওকে। চেলেঙের কথাগুলো ওর মনের রুদ্ধ জানালা খুলে দেয়। আশ্চর্য, এতদিন কেটে গেল, কখনও এভাবে তো মনে হয়নি, ও-ও একজন গেরিলা। মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে ওর-ও অনেক কিছু করার আছে।

২. 

দেশে ফিরে নিরাপদ আশ্রয়ে ক’দিন বিশ্রাম না নিলেই নয়। সে-কী কম পথ হাঁটা! অস্ত্র-গোলাবারুদের বোঝা টেনে সবাই ক্লান্ত। গৈড়লা গ্রামে সহযোদ্ধা বরকতের বাড়িটাই সব থেকে নিরাপদ। ওর বড় ভাই আজমতকে কৌশল করে শান্তিকমিটির সদস্য বানানো হয়েছে — মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গোপন তথ্য দেওয়ার জন্য। বাড়িটাও বড়সড় এবং লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন। চতুর্দিকে শুধু ফসলের খেত আর খেত। জোতদার আজমতের আর্থিক সঙ্গতিও ঢের। ওর বাড়ি থেকে প্রায় তিনমাইল দূরে এক বেইলি ব্রিজ — ইন্দ্র-পুল। ব্রিজ থেকে মাইল খানেক পুব-মুখো এগোলে পটিয়া, ওখানে পাকবাহিনীর ক্যাম্প।

ভাল-ভাল খাদ্যখাবার আর ক’দিনের বিশ্রামে শরীর চাঙা হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে খবর দেয় আজমত, পাকসেনাদের একটি দল চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে পটিয়া ক্যাম্পে যাবে রিইনফোরসমেন্টের জন্য। দিনক্ষণ সব তথ্যই ও সংগ্রহ করে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। ইয়াকুব ওর স্বভাবসিদ্ধ গম্ভীর গলায় বলে : ‘ওদের পটিয়া যাওয়া ঠেকাতে হবে। শুধু ঠেকানোই নয়, ফাঁদে ফেলে খতম করতে হবে শুয়োরের বাচ্চাদের।’

– ‘প্ল্যানটা কী শুনি? আমরা সাকুল্যে একুশজন গেরিলা, এখনও বাস্তবে কোনও যুদ্ধও করিনি... দুর্ধর্ষ পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা এখনই কি ঠিক হবে?’ প্রশ্ন তোলে শওকত, যুদ্ধে যাবার আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত।

– ‘যুদ্ধ করার জন্যই তো দেশে আসা, নাকি? বাস্তবে শত্রু-নিধন করার আগে কি পাখি মেরে হাত মকসো করব?’ ইয়াকুবের পাল্টা প্রশ্ন।

– ‘না বলছিলাম কি, প্রথমে ছোটখাট অপারেশন, দালাল-নিধন, তারপর পাকসেনাদের মুখোমুখি হলেই বোধহয় ভাল হয়।’ নিজের কথার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায় শওকত।

– ‘এত সময় হাতে কই? ট্রেনিং নিতে আর প্রস্তুতির কাজেই তো কেটে গেল বেশ ক’টা মাস। দেশ থেকে ইন্ডিয়া যেতেও তো কম দেরি হয়নি। যারা প্রথম সুযোগেই সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফিরেছে — অনেক কাজ করে ফেলেছে এরই মধ্যে। সময় একটা বড় ফ্যাক্টর।’ বলে ইয়াকুব।

– ‘কিন্তু মুখোমুখি যুদ্ধ করবার মত জনবল আর উন্নত অস্ত্রশস্ত্র কি আছে আমাদের? এলএমজি, এসএলআর, থ্রি-নট-থ্রি, গ্রেনেড আর টু-ইঞ্চ মর্টার — অস্ত্র বলতে তো এই-ই। এ-দিয়ে পাকবাহিনীর মোকাবেলা করা কতখানি বাস্তবসম্মত ভেবে দেখা উচিত বলে মনে করি...। তারপর আমাদের দলের অনেকেই টিন-এজার — বয়সের একটা ব্যাপারও তো আছে।’ শওকতের স্বভাবটাই এ-রকম। নিজে যা ভাল বুঝবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হাজারও যুক্তির খুঁটি লাগিয়েই যাবে।

– ‘অস্ত্রশস্ত্র যা আছে অ্যামবুশ করার জন্য যথেষ্ট, রেইড করতে তো যাচ্ছি না। আর বয়সের ব্যাপার, আপনি কি তাহলে বলতে চান, টিন-এজারদের বয়স বাড়লে তারপর যুদ্ধ করব?’ বিদ্রূপ মেশানো হাসির রেখা ইয়াকুবের ঠোঁটে।

বিস্তর আলোচনা শেষে প্ল্যান আঁটা হয় এভাবে — পাকবাহিনীকে ইন্দ্র-পুল পার হতে দেওয়া হবে না। পুলটা ডেমোলিশ করা হবে এবং সেই সঙ্গে পুলে উঠবার আগেই অ্যামবুশে ফেলে মারা হবে ওদের। পুলের খুব কাছে নির্ভরযোগ্য এক সমর্থকের বাড়ি। ওখানে থেকেই ওদের এই অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। এক্সপ্লোশন ঘটানোর জন্য করণীয় কাজগুলো সম্পন্ন করবার পর সবাই রাস্তার ঢালে ঝোপঝাড়ের আড়ালে ওত পেতে থাকবে পাক-আর্মির অপেক্ষায়। পুলের পশ্চিম-প্রান্তে পৌঁছামাত্র বিস্ফোরণ এবং একই সঙ্গে রাস্তার পাশ থেকে চলবে এলএমজির ব্রাশ, রাইফেল, এসএলআরের গুলি এবং গ্রেনেড নিক্ষেপ! পরিকল্পনাটি সবার মনে শিহরণ জাগায়। গোপাল শুধু কথা শোনে, বলে না কিছুই।

ইয়াকুব ওকে ইঙ্গিত করে বলে: ‘আমাদের থ্রি-নট-থ্রি মশাইকে কোন দায়িত্বটা দেওয়া যায় তা নিয়েই যত চিন্তা — ও বরং বাড়িতে থেকে আমাদের জিনিসপত্তরগুলো পাহারা দিক; ঠিক আছে...?’

মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় গোপাল।

দলের মধ্য থেকে একজন ফিসফিস করে বলে: ‘তাই ভালো, থ্রি-নট-থ্রি আমাদের সাথে থাকলে কখন কী করে বসে বলা তো যায় না — বিপদে পড়তে পারি সবাই।’

রাত গভীর থাকতেই ব্রিজের পিলারে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ লাগানোর কাজ শেষ করতে হবে। পিলার তো কম নয় — কাজটা যথেষ্ট জটিল এবং কঠিন। কিন্তু যে-করেই হোক করতে হবে। অসম সাহস আর প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির জন্য লিডার ইয়াকুব প্রশিক্ষণের সময়েই সবার সমীহ কাড়তে সক্ষম হয়। পুরু গোঁফ, চৌকোনো চেহারা, অন্তর্ভেদী তীক্ষ্ণদৃষ্টি — কপালে এ-বয়সেই বলিরেখা। লম্বা-চওড়া সুঠাম দেহ। কথা বলে মেপে মেপে, প্রতিটি কথায় থাকে যুক্তির শাণিত প্রলেপ।

আজমত আবারও নিশ্চিত করে, কাল সকালেই এক প্লাটুন পাক-আর্মি নিয়ে একটি লরি পটিয়া যাবে। রাত একটু গভীর হতেই ইয়াকুবের গেরিলাদল কাজে লেগে পড়ে। নদীতে এখন পূর্ণ জোয়ার। পানি দুকূল ছুঁই ছুঁই। ভাগ্য ওদের ওপর প্রসন্ন। বেশ উঁচুতে বিস্ফোরক লাগানো যাবে। ভাটার সময় ব্রিজের দু’প্রান্তের পিলারের নিচ থেকে পানি সরে গেলে থকথকে কাঁদা মাড়িয়ে কাজ করা দারুণ কঠিন হয়ে পড়বে। খুব বেশি হলে ঘণ্টা দুয়েক থাকবে এ-জোয়ার। সাম্পানে এক্সপ্লোসিভ নিয়ে ওরা রওনা দেয় ইন্দ্র-পুলের দিকে। হেমন্তের শুরুতেই বাতাসে শীতের গন্ধ — কুয়াশাও বেড়ে। এ-সময় এত কুয়াশা হবার কথা নয়। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর কুয়াশা — দশ হাত দূরেও দৃষ্টি পৌঁছে না। এমনিতেই অবশ্য সন্ধ্যার পর বসতিবিরল এই এলাকা থাকে প্রায় জনশূন্য। খুব সন্তর্পণে বৈঠা ফেলে নদীর কালো বুক চিরে ওরা এগোতে থাকে। বৈঠায়-কাটা লোনা জলে নীলাভ আলোর রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা নাগালে পেয়ে যায় ইন্দ্র-পুল।

ক্ষিপ্র হাতে পুলের পিলারে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ লাগানোর কাজ চলতে থাকে। এক্সপ্লোসিভ লাগানো হলে কর্ডেক্স দিয়ে প্রতিটিকে সংযুক্ত করতে হবে। কর্ডেক্সের কাজ হল এক্সপ্লোসিভের যুগপৎ বিস্ফোরণ ঘটানো। কাজটা যত সহজ ভাবা হয়েছিল বাস্তবে ততটা সহজ মনে হল না। একমুহূর্তের জন্যও দম না-নিয়ে এক্সপ্লোসিভ লাগিয়েই যেতে থাকে ওরা। সম্বিত পায় যখন পটিয়া থানার পেটা-ঘণ্টি থেকে চারটা বাজার ঢং ঢং আওয়াজ ভেসে আসে। আর একদণ্ডও পুলের কাছে থাকা সমীচীন নয়। কাকপক্ষীটি টের পেলেও সবকিছু পণ্ড! ওরা পুল ছেড়ে দ্রুত ফিরে চলে অস্থায়ী আস্তানার উদ্দেশে। সবাই একত্রিত হলে জানা যাবে, কাজ কদ্দুর কী হয়েছে; যাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার কতটুকু করতে পেরেছে।

সবাই গায়ে-গা-ঘেঁষে বসে। ইয়াকুব জানতে চায় : ‘সব ঠিকঠাকভাবে হয়েছে তো?’

সানোয়ার, বয়স বিশ-বাইশের মত, কাঁচুমাচু করে বলে : ‘প্লাস্টিক শর্ট পড়ে গেছিলো লিডার। একটা পিলারে ভালোভাবে লাগাতে পারিনি।’

উদ্বিগ্ন ইয়াকুব জিজ্ঞেস করে : ‘কোনদিককার পিলার? পটিয়ার দিককার, মানে পুবদিককার না এদিককার?’

– ‘এদিককার... মনে হয় প্রোবলেম হবে না, যতটুকু লাগিয়েছি ওতেই কাজ হবে...’

– ‘রাবিশ, বারবার বোঝানোর পরও হিসাবের ভুল। তাও আবার ভাইটাল প্লেসে প্লাস্টিক লাগানো হল না ভালোভাবে। যদি এক্সপ্লোশন ঠিকভাবে না হয়, পুরো প্ল্যানটা ভেস্তে যেতে পারে। ওরা তো এদিক দিয়েই ব্রিজে উঠবে।’

– ‘ওদিকটা ডেমোলিশ হলেও তো ওরা আর পার হতে পারছে না।’ আমতা আমতা করে বলে সানোয়ার।

– ‘স্টুপিড, ওরা আর পার হতে পারছে না, হুঁহ্...।’ অস্থিরতার ছাপ ইয়াকুবের চোখেমুখে।

– ‘এখন লাগানো যায় না...?’ ক্ষীণকণ্ঠে শুধোয় গোপাল।

ঘাড় বেঁকিয়ে বিরক্তি-মাখা দৃষ্টিতে তাকায় ইয়াকুব; গোপালের কথার জবাব দেয় না।

কী আর করা! যা হবার তা হবেই। ত্রুটি সংশোধনের এখন আর কোনও সুযোগ নেই। ও-নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে পরবর্তী কাজ — অ্যামবুশ যাতে সফলভাবে করা যায় সেদিকেই নজর দিতে হবে এখন। অন্ধকার কেটে যাবার আগেই অ্যামবুশের পজিশন নিয়ে নিতে হবে।

গোপালের কিছুদিন হল ঠান্ডা লেগেছে — গা গরম। ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যেত, কিন্তু ওষুধ পাবে কোথায়? মায়াও লাগে ছেলেটার জন্য আবার বিরক্তিও আসে; আরে বাপু একটুতেই বিগড়ে যায় শরীর — যুদ্ধে আসার দরকারটা ছিল কী!

ব্রিজ থেকে শ-খানেক গজ দূরে রাস্তার পাশে পজিশন নেয় ওরা। অস্ত্রের নিশানা ব্রিজের দিকে। পুল উড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বে খোদ ইয়াকুব। হিসেব-নিকেশের ব্যাপার আছে তো। একটু এদিক-সেদিক হলে সব পণ্ড। ফিউজের দৈর্ঘ্য, তাতে অগ্নিসংযোগ সেকেন্ড গুনে করতে হবে। পাকবাহিনীর গাড়িটি ব্রিজে উঠবার ঠিক আগমুহূর্তে জলন্ত ফিউজ গিয়ে ডেটোনেটর স্পর্শ করবে — ব্যস, একসঙ্গে ফেটে পড়বে সবগুলো বিস্ফোরক।

রাস্তার দুপাশে শেয়ালকাঁটার ঘন ঝোপ। কাল বিকেলে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। ঝোপের বুনো গন্ধ আর মাটির সোঁদা ভাপ মিলেমিশে একাকার। বুকভরে শ্বাস নেয় ইয়াকুব — মায়ের শরীরের গন্ধ নেয় যেমন শিশু।

শুয়েই থাকে ওরা। দিবাকর, দিগন্ত-ললাটে অতিকায় জ্বলজ্বলে লাল-টিপ যেন, উঁকি দেয়। ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে কুয়াশা। দু-একজন করে লোক-চলাচল বাড়তে থাকে সময় গড়িয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে। রাস্তা-ধরে ছুটে যায় বাস, মালবোঝাই ট্রাক। ইয়াকুবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যানবাহনগুলোর ওপর। আজমতের কথা অনুযায়ী সকাল সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ পাক সেনাদলটির ব্রিজ পার হবার কথা। নয়টায় পটিয়াতে শান্তিকমিটির একটি মিটিঙও আছে। ওই মিটিঙে চিটাগাং থেকে-আসা এক কর্নেলের উপস্থিত থাকবার কথা।

ইয়াকুব বারবার হাতঘড়ি দেখে — সাতটা বেজে কুড়ি মিনিট। বেশ অস্বস্তি বোধ করতে থাকে ও । আজমতের কথা ঠিক তো!

ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে ইয়াকুব। ঠিক সম্মুখেই ঝোপের ওপাশে এক লোক, দেখে মনে হয় কৃষক, পেচ্ছাব করতে বসেছে। বিড়বিড় করে কী-যেন বলছে আপন মনে আর পুরুষ্টু লিঙ্গটা দু-আঙ্গুলে আলতোভাবে তুলে ধরে সরসর্ শব্দে পেচ্ছাব করেই চলেছে। পেচ্ছাবের কণা ছিটকে এসে লাগে ওর মুখে । খুব কষ্টে নিজেকে সংযত রাখে ইয়াকুব। মরার মত শুয়ে থাকে — শব্দ হলেই বিপদ। আনমনা লোকটা তলপেট খালি করে আপন মনে বিড়বিড় করতে করতেই উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা দেয়। যাক্ বাবা, বাঁচা গেল — স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ইয়াকুব। আবার ঘড়িতে চোখ বোলায়, সাড়ে সাতটা, কিন্তু কই সেই প্রত্যাশিত লরি?

আর ঠিক তক্ষুনই কানে এসে বেঁধে ভেঁপুর শব্দ। সপ্রতিভ ইয়াকুব তাকায়, হ্যাঁ একটা আর্মির গাড়িই দেখা যাচ্ছে, এখনও পোয়াটেক মাইল দূরে; খুব দ্রুত নয় আবার মন্থরও নয়, আর্মি-গাড়ি সচরাচর যে-গতিতে চলে সে-গতিতেই যানটি এগিয়ে আসছে ইন্দ্র-পুলের দিকে। ত্রস্তে পকেট থেকে লাইটার বার করে ইয়াকুব; ফিউজের প্রান্ত বামহাতে ধরে ডানহাতে লাইটার নিয়ে প্রস্তুত হয় । অন্যসব যোদ্ধাকে বলা আছে — বিস্ফোরণ ঘটামাত্র একসঙ্গে শুরু হবে সবগুলো অস্ত্রের ফায়ার — গ্রেনেড নিক্ষেপ।

আর মাত্র শ-খানেক গজ দূরে লরিটি, ইয়াকুব ফিউজের মাথায় লাইটারের হলদে শিখা ছোঁয়ায়। স্ফুলিঙ্গহীন তারাবাতিটির শরীরের আগুন ধেয়ে যায় ব্রিজ লক্ষ করে। পথের পাশে শুয়ে-থাকা গেরিলাদলকে অতিক্রম করে লরিটি পৌঁছে যায় ইন্দ্র-পুলের একেবারে কাছে। চাপা উত্তেজনায় কপালে ঘামের বিন্দু দেখা দেয় ইয়াকুবের; এক্সপ্লোশন হবে তো ঠিকমত! অকস্মাৎ কান-ফাটানো শব্দ আর চোখ-ধাঁধানো আলোর ঝলক। বিকট শব্দে ইন্দ্র-পুল ধসে পড়ে নদীগর্ভে আর ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই গেরিলাদের অস্ত্রের নলবেয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে তপ্ত সিসার দল ছুটে যেতে থাকে শত্রুর দিকে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে যেতে থাকে — গ্রেনেড ফাটতে থাকে বিকট শব্দে। দশ-বারো মিনিট; গুলির শব্দ ক্রমশ কমে আসে, থেমে যায় একসময়। রাস্তার ঢাল থেকে চোখের নিমিষে উঠে আসে গেরিলারা। খাঁকি উর্দি-মোড়া পাকসেনাদের দেহ পড়ে আছে পথের ওপর — ছড়ানো-ছিটানো। প্রাণে বেঁচে-যাওয়া ফৌজদের দেখা যায় জ্ঞানশূন্য হয়ে দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে। ইয়াকুব কোমরের কাছটাতে এলএমজি ধরে অনবরত গুলি ছোড়ে দূরে ছুটে পলায়নরত পাকিদের লক্ষ করে। পথে পড়ে-থাকা কাতরানোদের ওপর যথারীতি বেয়োনেটের ব্যবহার। অযথা গুলি খরচ করা ওদের পোষায় না।

যথেষ্ট হয়েছে, এখন যত শিগগির সম্ভব সরে পড়তে হবে — ফিরে যেতে হবে নিরাপদ স্থানে। গেরিলা যুদ্ধের মূল কৌশলই তো, মারো এবং পালাও — হিট অ্যান্ড রান। আবার সেই আজমতের বাড়ি। গৈড়লা গ্রামে পৌঁছনোর পথের দুধারে অগণিত মানুষের ঢল। সে কী উল্লাস — কী উচ্ছ্বাস; কণ্ঠে আওয়াজ: ‘জয় বাংলা!’

– ‘যাক্, অপারেশন হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেসফুল। এতটা সফল হব আমি কিন্তু ভাবতেই পারিনি।’ বলে ইয়াকুব।

– ‘আমি বলেছিলাম না লিডার, কোনও অসুবিধা হবে না। দেখলেন তো আমার কথাই ঠিক।’ খুশিতে উজ্জ্বল সানোয়ারের মুখ।

– ‘কতগুলো মরেছে? হিসেব করেছ?’ জিজ্ঞেস করে ইয়াকুব।

– ‘পথের ওপর তো দেখলাম দশ-এগারোজন। আশেপাশে আরও মরে পড়ে আছে কিনা কে জানে! ওখানকার লোকের কাছে কালই জানা যাবে মৃতের সঠিক সংখ্যা।’

– ‘ভালই অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থা হল, কী বল? শালাদের চাইনিজ রাইফেলগুলো কিন্তু ওয়ান্ডারফুল।’ বলে ইয়াকুব।

– ‘তা সব মিলিয়ে তেতাল্লিশটা অস্ত্র পাওয়া গেছে — পিস্তল-রিভলবারও আছে ছয়খানা।’ বলে মোস্তাক। অস্ত্রশস্ত্রের খেয়াল রাখার দায়িত্ব ওর ওপর।

– ‘ভাল কথা, এ-বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকাটা কিন্তু ঠিক হবে না। জানাজানি হয়ে গেছে। পাকবাহিনী প্রতিশোধ নিতে যেকোনও সময় আক্রমণ করতে পারে। এখনই — যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সটকে পড়তে হবে। জিনিসপত্র ঝটপট গুছিয়ে নেওয়া যাক। আজমত ভাই, আপনাদেরও এখান থেকে সরে পড়া উচিত।’ বলে ইয়াকুব।

– ‘কী কাণ্ড দ্যাখো, বিজয়োল্লাসে বিষয়টা নজরেই আসেনি কারও — আমাদের থ্রি-নট-থ্রিকে তো দেখছি না, ও কোথায়?’ বলে মোস্তাক।

– ‘অ্যামবুশে তো ছিল না, রয়ে গেছে বোধহয় ওই বাড়িতেই, আসছে হয়তো এদিকেই। এসে যাবে, ওর তো সবকিছুতেই গা-ছাড়া ভাব! লেপেচাড়।’ মুচকি হেসে বলে ইয়াকুব। মুড আজ ওর তুঙ্গে। ‘বিকেলের মধ্যে না এলে খোঁজ নিতে হবে। শরীরটা ভাল নেই ওর, জ্বর জ্বর লাগছে বলেছিল।’


৩.

বিকেল পার হয়ে গেল গোপালের দেখা নেই। দুশ্চিন্তা দানা বাঁধে সবারই মনে। ছেলেটা যত গবেটই হোক, কারও মনে সামান্য আঘাত লাগে এমন কিছু করেনি কখনও। ওকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকারা নীরবে হজম করেছে। উত্যক্ত করার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে কালো মুখ ওর আরও কালো হয়েছে, ঠোঁট জোড়া কেঁপেছে থিরথির্।

গোপালের খোঁজে কাউকে পাঠানো দরকার। কাকে পাঠানো যায়? আজমতই ব্যবস্থা করে; তার এক চালাকচতুর বর্গাদারকে পাঠায় ইন্দ্র-পুলের কাছে যে-বাড়িতে ওরা উঠেছিল, সেখানে।

ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে ফিরে আসে লোকটা। গোপালকে ও-বাড়িতে পাওয়া যায়নি। বাড়িঅলা বেশি কিছু বলতে পারল না; শুধু এটুকু জানাল, বাড়ি ছেড়ে সবাই যুদ্ধ করার জন্য বের হবার কিছুক্ষণ পর একটা পুঁটলিতে কী-সব পুরে গোপাল বেরিয়ে পড়ে। বাড়িঅলার কাছ থেকে ডাবগাছ বেয়ে ওঠার একগাছি দড়ি চেয়ে নেয়। ব্যস্, ওই পর্যন্তই।

কী অদ্ভুত কথা! ভোররাতে ডাবগাছে ওঠার শখ হল ওর! পুরো ব্যাপারটাই কেমন গোলমেলে ঠেকে সবার কাছে। গোপালকে আর যা-ই হোক পাগল বলে তো মনে হয়নি কখনও।

আর অপেক্ষা করা চলে না। গোপাল ফিরে এলে ওকে বলতে হবে কালবিলম্ব না করে নতুন আস্তানায় চলে যেতে। গোমদন্ডি গ্রামে সুবল নাথের বাড়ি, এখান থেকে মাইল আটেকের মত পথ। এলাকারই ছেলে গোপাল, পথ চিনে পৌঁছোতে অসুবিধা হবার কথা নয়।

ঘণ্টা তিনেক লেগে যাবে পৌঁছোতে! স্থির হয়, আজমতের ক'জন লোকও যাবে ওদের সঙ্গে; অ্যামবুশে-পাওয়া অস্ত্রশস্ত্র তো কম নয় — বয়ে নিয়ে যেতে হবে বহুদূর। কখনও ধানখেতের আল, কখনও-বা পায়ে-চলা-পথ ধরে হেঁটে চলে ওরা।

সুবলের বাড়ি পৌঁছোতে রাত আটটা বেজে যায় প্রায়। বিবিসির আটটার খবর — উৎকর্ণ সবাই, বলা যায় না আজকের অপারেশনের খবর দিলেও দিতে পারে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবরটাও শুনতে হবে।

হ্যাঁ, ইন্দ্র পুল ডোমোলিশন, যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর হাতে চোদ্দজন পাকসেনা নিহত, মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ হতাহত হয়নি, — বেশ ফলাও করে প্রচার করে বিবিসি। গর্বে ইয়াকুবের বুক ফুলে ওঠে। ঝুলে-পড়া গোঁফের দুপ্রাপ্ত জিভ দিয়ে বারবার স্পর্শ করে চলে, এটা ওর মুদ্রাদোষ। অতি টেনশন বা অতি পুলকে মুদ্রাদোষ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যায়।

রাতে ভালই ঘুম হয় সবার। সকালে আলোচনায় বসে। সুবলের বাড়িতে বেশিদিন থাকা সম্ভব নয়। জায়গার অভাব, তাছাড়া আর্থিক অবস্থাও তেমন ভাল নয় ওর। কোথায় যাওয়া যায় দীর্ঘকাল অবস্থানের জন্য, শক্ত একটা ঘাঁটি গড়ে তোলার জন্য; এটাই এখন ওদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। আলোচনায় ছেদ পড়ে। গৈড়লা গ্রাম থেকে এক যুবক এসেছে — আজমতের ভাস্তে বলে পরিচয় দেয়, কলেজের ছাত্র। সবাই উদগ্রীব, কী খবর নিয়ে এল ছেলেটা!

একগাল হেসে জানায় ছেলেটা : ‘চোদ্দজন পাকসেনা ইন্নালিল্লাহ্। এলাকায় সাড়া পড়ে গেছে; সবাই বলাবলি করছে দেশ স্বাধীন হতে আর বেশি দিন নেই।’

ছেলেটার কথা শুনে খুশিতে ডগমগিয়ে ওঠে ওরা। ইয়াকুব বলে: ‘তাই নাকি? লোকজনের মনে তাহলে আস্থা ফিরে এসেছে? পাকসেনাদের নড়াচড়া কেমন?’

– ‘নাহ, ওরা ক্যাম্পের বাইরে বেরই হয় না। লেজ-গোটানো কুত্তার মত অবস্থা ওদের।’

সবাই একসঙ্গে হো হো হেসে ওঠে।

– ‘তবে একটা বিষয় কেউ বুঝে উঠতে পারছে না, পুলের পশ্চিম দিকের পিলারের সাথে মোটা রশিতে বাঁধা একটা ক্ষতবিক্ষত লাশ ঝুলে আছে। এতটাই বিকৃত যে, কারও পক্ষে লাশটা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।’



লেখক পরিচিতি
শামসুজ্জামান হীরা
মুক্তিযোদ্ধা
গল্পকার। অনুবাদক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন