মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৫

শিপা সুলতানা'র গল্প : বাড়ি

আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে ( উত্তরে ) যে পাকা সড়ক গিয়েছে, আপনি তার নাম জানেন? আমরা অবশ্য সড়ক বলিনা, পথ বলি, কেউ কেউ রাস্তা। রোডও বলি কেউ। পথ শুধু আমাদের বাড়ি ছুঁয়ে যাবে কেন, পুরান বাড়ি (আচ্ছা আপনি বলুন কোন বাড়িটা পুরান না?), মাঝর বাড়ি, লন্ডনি বাড়ি, পুষ্প ভিলা, চৌধরী বাড়ি, ছবি নিকেতন- সকল বাড়ির নাম তো আর ঠোঁটে নিয়ে বসে নেই। সবার বাড়ি না হোক জমিন, টিলা, নার্সারী, আর মুদি দোকানের বাজু ছুঁয়েতো গেছেই, যাবে কেন, আসতেও তো পারে। না হলে পুবে, পুববাড়ির পেটের উপর দিয়ে ওদিকে কোথায় গেল?

তাহলে এর একটা সমাধান হয়ে যাক, পথের আসা যাওয়া। নিমরা বিলাই ধাঁচের সমাধান, আর জানেনই তো মফস্বলীরা কি দারুণ কাব্যিক হয়! সব কিছুতে 'এর একটা সমাধান' লাগে, তারা আগে সালাম দেয় এবং আলেকও নেয় কৃতজ্ঞ হয়ে! তো আমাদের বাড়ি-ছোঁয়া সড়ক বহু বাড়ি না-বাড়ি ঘেঁষে, দেখে, যেখানে পৌঁছবে বা দম নেবে বা হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে, তার আগে তো তাকে বয়ে যেতে হবে। তাহলে খালেদ্চ্চার নার্সারির কথা বলি? একটু থামেন, মনে কিছু না নিলে মতুচ্চার বিলের কথা বলে নেই একটু? বুঝেন না মফস্বলী মায়া! কোনো কিছু ফেলা যায় না, বিশ্বাস করুন পুরুষ বুকের অনুচ্চ গোল দুটি টিলা দু'পাশে, দূর্বা ঘাসে ঢাকা মধ্যখান ক্রমশ নিন্মগামী হয়ে এক প্রস্ত বিল। বলছেন বিল এত ছোটো হয়? তবু এটাই বিল, আপনার আপত্তি থাকতে পারে, আমি বদলাব না। মতুচ্চার বিলে রোজ ভোরে এক জোড়া পদ্ম ফুটে। আমাদের সাত গাঁয়ে এমন সৌন্দর্য বিরল! বাড়িয়েও বলতে পারি, সাত গাঁ তো আর ঘেঁটে দেখিনি, তাও ভাল বলিনি যে চৌদ্দপুরুষে দেখিনি! কেউ তো আর দল বেঁধে পদ্ম দেখে না, দেখে দেখে যায় আমাদের পথ। দেখে দেখে পূবদিকেও যায়। তবেতো পূবেও আমাদের পথ! চৌধরীবাড়ি, ছবি নিকেতন যাই ছুঁয়ে যাক, যা-ই বলছি কেনো? যাবেই তো! ফিশারি দেখে দেখে, ফিশারির কোণে কোণে শিমুল গাছ না দেখে কেউ যেতে পারে? ফিশারির কোণে শিমুল গাছ? ভাবুন অবস্থা, কী কাব্য!


আপনার কথাই বলছি? নাকি আপনি তা বলবেন ই না মোটে? তবু ভাবুন ফিশারির কোণে শিমুল অথবা শিমুলের কোণে ফিশারি! ফিশারিতে টিলার ছায়া, টিলাতো জলে ছায়া ঢেলেই খালাস, লাল লাল শিমুলের ফুল ফেরারীর মত ভাসতে দেখলে কার পরানে সয়, কুলে বেকুলে ঠুক্কর খায় গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল, আহা! ঝুঁকে পড়া গাছটি যেন সজিদা দিচ্ছে জলে! আবার দিঘি থেকে দুবাহু বাড়িয়ে কমলা সুন্দরীও জড়িয়ে ধরছেন ভেবে নিন, বললেন না ফেরারী ফুলগুলির কী সমাধান? পাথর, না পাথর নয়, পাথরের বিবাদ আছে জলের সনে, মাটির ঢেলা নিন, ঢেউ তুলে তুলে এপারের ফুল ওপারে মানে আপনার ঘাটে নিয়ে যান, মানে আমার বাড়ির চাঁদের মতো। বুঝলেন না? আমার বাড়ির-ই চাঁদ! আমি যদি, শুধু আমি যদি শুয়ে শুয়ে গরাদের ফাঁক দিয়ে বেলজিয়াম গাছের পাতার ফাঁকে নিরিবিলি একেলা একটা চাঁদ দেখি, এদিক-তো আর আপনার বাড়ি না, তাহলে তো এটা আমার বাড়ির-ই চাঁদ! অথবা রুমানাদের গরু ঘরের পিছে, নান্টুদ্দার বৌয়ের লাউ মাচার উপরে, অথবা রায়নের মা বুড়ি ছয়হাতি ঘরের দুইহাতি দাওয়ায় শুয়ে সতের হাতি উঠানের ওপারে সাতাশ হাতি নিম গাছের ডালে কানপাশা হয়ে লটকে থাকা যে চাঁদ দেখে, বুড়ি চোখ বুজলে তা বুঝি আপনার বাড়ি উঠে যাবে?


তো, আমাদের বাড়ি ছুঁয়ে পথ যেখানে যাবে, মানে যেতে যেহেতু হবেই, আসতেও তো হবে, ভুলে যাচ্ছেন যে বড়ো? তো, শুধু পুরান বাড়ি, ভিলা, নার্সারি, নিকেতন দেখে, ছুঁয়ে গেলে তো হবে না, স্থানে স্থানে যে এক টেঙ্গী টিলা দাঁড়িয়ে আছে, তাও তো ঘেঁষে যেতে হবে, তো টিলার এক টেঙ হলে কী হবে, তার আবার নাব্তলা আছে না? ছোটো ছোটো জলের ধারা টিলা থেকে নেমে জড়ো হয়ে ছড়া বানিয়েছে। তা দেখে বিদ্রুপ করে বলবেন না যে ব্যাঙের মাথায় বৃষ্টি! শিশির ফোঁটা ব্যাঙের মাথায় পড়ল আর আপনার কথায় বৃষ্টি হয়ে গেল না! আচ্ছা বলুন তো লেবু পাতায় বৃষ্টি পিছলে কই পড়লো? কচুপাতায়! হ্যাঁ, কচুপাতায়। পারলে ধরে রাখুক এবার, তাহলে এবার বলা যায় বৃষ্টি এলো পাতায় পাতায়! তো, টিলা পেরুলে শোভাদের ফুলবাড়ি। বিশ্বাস করুন চাঁদা তুলে নাম দেইনি, মজির দাদা, কানা ফকির, জমির মেয়াসাব, লীলা বুয়াই( ঝি গিরি করলেও আমরা কিন্তু লীলা ঝি বলে ডাকি না তাকে, আগেই বলেছি মফস্বলী মায়া) হোসেনের মা ধাই, আজমল ড্রাইভার(রিক্সা চালালেও সে আমাদের ড্রাইভার) কেউ কিন্তু গোল বৈঠক করে শোভাদের বাড়ির নাম করণ করিনি। অতবড় বুগেনবেলিয়ার ঝাড় যাদের বাড়ি, সে বাড়ি ফুলবাড়ি না হয়েই যায় না। কিন্তু শোভা যে (অফ টপিক) বড় আহ্লাদ করে নাকেতে ঘাসফুল পরে বড়, বলেন তো বাড়ির নাম বদলে দেব? তেঁতুলপাতায় যে রোদ ধরে না জানেন? তো, আমার বাড়ির উত্তর ছুঁয়ে, মাঝর বাড়ি, চৌধরী বাড়ি, মতুচ্চার বিল দেখেও পথ যেদিকে যাবে যাক, তো একটু পূবে যাই? অবশ্য যাবার আগে যে হাজার বছরের খালি ঢিবি, বললামই না হয় হাজার হাজার, হবে নিশ্চয় আটশ, পাঁচশ, তিনশ... আরে বাবা একশ বছরও বলতে দেবেন না? আমি যে শুনলাম বাবার মুখে অথবা বাবাই বললেন আমাকে, তার বাবা তাকে, তার বাবাকে তার পিতামহ, প্রপিতামহ... আচ্ছা আচ্ছা আর হুড়মুড় করে টেনে আনছি না, আর চাইলেই কী পারি! কাকে কী বলতে হয় তাও কী জানি, প্র প্র প্র করে কত আর লেজ বাঁধবো! তো বলছিলাম হাজার বছরের, ওই আবার! ধুর! বললাম না বাবার মুখে শুনেছি? কেউ নাকি কোনদিন, মানে বাবা, বাবার বাবা, তার বাবা, তার বাবার বাবা, কেউ নাকি ওই ঢিবিতে, মানে আমাদের পথ পূবে গেলে যাকে দৃষ্টি দান করে যেতে হয়, কোনোদিন একটা ঘাস কিংবা লতিকা কিংবা খড়ের টুকরোও পড়ে থাকতে দেখেনি, বুঝেন নি? প্রতি পুননির মধ্যরাতে যে পিরফকিরের মিটিং বসে গো ওই ঢিবিতে, সে জায়গা সাফসুতর থাকতে হবে না? তা আর বলছি কী! বলছেন যে নিজ চোখে দেখেছি কিনা? মিটিং? পিরফকিরদের? ও এই কথা কী বলার দরকার আছে যে পিরদের মধ্যে একজন কিন্তু সাধু পুরুষ ছিলেন, হিন্দু সাধু! বলছেন কিভাবে জানলাম? ওই যে বললাম বাবা বলছেন! বাবার বাবাও, সব-ই যদি নিজ চক্ষে দেখতে হবে তবে আর দাদা পরদাদা কেনো? ওই আবার! কোন দায়ে গতদের সাক্ষী টেনে আনছি যদি নিজ চক্ষে দেখতে সব! বলছেন না যে কিছু? আচ্ছা বাদ দেন, তো, রাস্তা যে বড়ো হিন্দু বাড়ির পেট ফুঁড়ে গেলো, গেলো আর কি, ওই একই হল, বাড়ি ঘেঁষে যেতে হলে বা অশুদ্দার বউ যদি বাবুল ভাইসাবের বৌয়ের মাচা থেকে লাউ ডগা আনতে যায়, অথবা খলিল ভাইসাবের মা যদি মচকে যাওয়া হাতে ফুঁ দেয়াতে যায় দিগেশদার বৌয়ের কাছে, যাবেটা কোথা দিয়ে? ঠিক ধরেছেন, পথ দিয়েই তো। তবে কি পথ পেট চিরে... আচ্ছা আচ্ছা, পেট বেয়েই গেলো না? গিয়ে যে হেলে গেল বামে, থামুন থামুন, হা হা করে উঠবেন না, হেলে গেল না হেলানো হল বেমক্ষা প্রশ্ন করে বসবেন না, তার আমি জানি কী! এ তো আর নতিপত্র, দলিল দস্তাবেজ না যে শমনজারি করে দেবেন! তো, বলছেন নাম টা কী? উত্তর না দক্ষিন, পূর্ব না পশ্চিম, ঈশান না নৈঋত? না না থামছি, ধরেন বাম টা বাম ই, এর কোনো প্রমান লাগবে? বাম টা গেল চৈতন্যের বাড়ি, আরে চৈতন্যের বাড়িই। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। কোনো অসুবিদা? ওই যে হাজার হাজার লোক নারায়ে তাকবির বলে দেবীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল? বিদ্যা বিদ্যা ক্বিরা কাটছি, বলে বসবেন না যে বাবরি মসজিদ ভাঙার লেজ ধরে এখানে মন্দির ভাঙা হল সেই ঘটনা বলতে বসেছি কিনা! আরে ধুর, এই দেখেন আমার বেদম হাসি উঠেছে, প্লিজ থামেন থামেন, হাসতে হাসতে যে আমার পেট ফেটে যাবে, বলছেন যাবে না? সে আপনার দয়া গো দয়া! কিন্তু হাসি যে থামছে না? ওখানে মসজিদ ভাঙা হলে এখানে মন্দির ভাঙা হবে এমন কৌতুক শুনেও আমার হাসি উঠবে না এমন বেরসিক ভাবছেন নাকি? হু হু ওই কৌতুক শুনেন নি, আমার গাই হবে, সেই গিয়ে দুধ দিবে দিবাস্বপ্ন দেখছি, আপনি এসে খড়ম বাড়ি দিলেন আমার মাথায়, ধুরো বুঝলেন না? আমার গাই যে আপনার ক্ষেতে মুখ দেবে? তার কি হবে?তাই আগে বাগেই খড়মবাড়ি! রাগ করছেন বুঝি? হাসুন হাসুন, কৌতুকই তো! হা হা, পূজা মণ্ডপ দেখেছেন? মন্দিরের চাতাল? আর বলছি কি চক্ষে দেখেছি, চক্ষে, না না বাবার না, দাদার না, পর দাদার না, নিজ চক্ষে দেখেছি গো। কি বনেদী বাড়ি, বলছেন বাবরি মসজিদ বনেদী ছিল না? ছিল তো অবশ্যই! অত যে ক্ষেপেছেন বলুন খেয়েছেন কোনদিন দেবীর প্রসাদ? ভাঙা ফাটলে লুকোচুরি? খেলেছেন লুকোচুরি? বলেন বলেন? ওখানের মসজিদ বলুন, মন্দির বলুন, হেরেম খানা, বাইজীখানা বলুন, নাট মন্দির, শিব মন্দির, আমার কী? বলুন আমার কী? দিত শিব মন্দিরে বাতাসা নিমকি? দিত সোনার তাজ বাবরি মসজিদে গেলে? হ্যাঁ হ্যাঁ সোনার তাজ! তা আর বলছি কী! চাতালে প্রতিমার বস্ত্রহরণ, বাটিলুট, ঘটিলুট, হার চুরি, গনেশের ফাটা মাথা দেখলাম না? নিজ চক্ষেই দেখলাম, বলি কিছু বলছেন না যে হঠাৎ? ঘুমুলেন? ঘুমুলেন নাকি? শুনছেন না যে বড়ো! আচ্ছা আচ্ছা তো, কী যেন বলছিলাম? হ্যাঁ বামের কথা, পথের বাম, ডানে হেললে তো দিঘিতে পড়ে যেতো! মানে, কি যে করেন, না হয় ডুবাকেই দিঘি বললাম, ওই আপনি যেমন জাফলং থেকে ঝিনুকমালা কিনে এনে বলেন না কক্সবাজার থেকে আনলাম, বলেন নি? কী বলেন? বলেননি একবারও? মনিপুরি শাল কিনে কাশ্মীরি বলেননি? কী আর বলব! আচ্ছা বলেননি বলছেন? অ! আচ্ছা! পায়ের নিচে কী খুঁজেন? পায়ের নিচে! আচ্ছাহ! ডানে হেললে দিঘিতে সরি ডুবাতেই পড়ত তাই ঘাড় সোজা পথ গেলো কৈলাসে! কৈলাশ টিলায়! বুঝেনই তো কৈ মানে কোথায়, আর লাশ মানে ডেডবডি, তো, কোথায় লাশ বা লাশ গেলো কৈ? এই যে মাঝখান থেকে ফোঁড়ন দেবেন কার লাশ, কেনো লাশ! লাশটা যাবে কোথায়, বলছি বলছি, চা চলবে? এতক্ষণ পর বলছি? দার্জিলিং আছে, না না পাক্কা অরিজিন! জাফলং বনাম কক্সবাজার, মনিপুর বনাম কাশ্মির না, পাক্কা দার্জিলিং। কী বলছেন এসব? লাক্কাতুরা ঢাকা গিয়ে দার্জিলিং হয়ে গেছে? আস্তে, আস্তে বলুন, কী যে করেন না! আপনার আবার কফি ছাড়া চলে না? জোরে বলব? আ প না র ক ফি ছা ড়া চ লে না? আচ্ছা আচ্ছা হবে, এক ডিব্বা রাখিতো, অনেকের আবার কফি ছাড়া চলে না কী না। ধন্যবাদ। তো, টিলার উপর এই যে নাট মন্দির না শিব মন্দির, মন্দির একটা হবেই, তাথে পুজারীও এক দু'জন থাকতে হবে না? তো শাহজালালের ছোটো ভাগ্নে দিলেন শিবের লিঙ্গে লাত্থি, লিঙ্গ যাবে কোথায়? পাহাড় থেকে গড়াতে গড়াতে সমতলে, তৈরি হল শিব ছড়া, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়ছে শিবছড়া। ধুরো খালি ফোঁড়ন কাটেন, দেখিনি বলছেন? নিজচক্ষে? লিঙ্গ না ছড়া? লাত্থি? এই যে বুকে ঘুষি মেরে বলছি ছড়া দেখেছি, ছড়া, কী হীরে চকচকে পানি! ওই বললেই হলো! বর্ণনা দিতে হীরে দেখতে হয় নাকি আবার? নাকি জন্মে কোনদিন হীরে দেখেছি! তো, শিবলিঙ্গ গেলো, পুজারী বেটা পুড়ে মরল, ভাগ্না রাজা বন গিয়া! আকাশ ছুঁই ছুঁই পাহাড়ে তার রাজত্ব! উফ কী যে করেন, বললাম ই না হয় বাড়িয়ে, না হলে জুৎ পাব না তো, আচ্ছা ধন্যবাদ, বলছেন এবার বলতে পারি? আপনার সাগর হৃদয়। হ্যাঁ রাজাকেও তো মরতে হবে, লাশটা গেলো কৈ? গহীন পাহাড়ে, গভীর বনে লাশটা কই গেল? গায়েব হল, গায়েব। হ্যাঁ তা আর বলছি কী! কী যা তা প্রশ্ন করেন? পির দরবেশ না? আপনার আমার মত আম পাবলিক? সাক্ষী? বলি এত যে সাক্ষী সাক্ষী করেন, সাক্ষী টা দেবে কে? আপনি? আমার দাদা? পরদাদা? পর পর করেতো আমি সাড়ে সাতশ বছর পিছাতে পারবো না। তার চে শুনুন পথের কথা...


পূবে যে গেছিলাম আশুদ্দার বাড়ি, আরে আমি না, আমাদের পথ, তার কান ছুঁয়ে ছুঁয়ে যে স্কুলঘর, তার পিছেই যে পড় পড় বাড়ি, তা কল্পনাদের, আমরা গোপনে গোপনে বলি ভেনাসের বাড়ি। শুনুন বলি, দেবী ভেনাস বাড়ির উপর দিয়ে যাবার কালে... ধুত্তুরি! এমন ভাবে তাকালেন যে মনে হল আপনার কান ধরে হ্যাঁচকা দিয়েছি, কেনো কেনো? লোকান্তরিত দেব দেবী বুঝি এই প্রথম কারো বাড়ির মাথার উপর দিয়ে গেলো? আরে শুনুন শুনুন, দেবী ভেনাস! ভোর ভোর থাকতে গা পাড়ি দিচ্ছিলেন, আর চান করবি তো কর এই বেলা, কল্পনার মা যে সাত মাসের পোয়াতি! আর দেখো, লাগবি তো লাগ ভেনাসের নজর ভরা উদরে! তিন মাস পর খোদ ভেনাস এলো আমাদের পোড়া গায়ে! যারা জানে বলে কালা রাজার কইন্যা কাঞ্চনমালা গো! আর শুনেন কল্পনার বাবা যদি শৈশবেই মরে গিয়ে চিতায় উঠে, আমাদের ভেনাসের দেখভাল করতে হবে না কাকা নীলকান্ত'র? অ বেচারা আলু টা মূল টা বেঁচে বল আমাদের কল্পনাকে আগলে রাখতে পারে? তাহলে কি বলবেন আমাদের গাঁয়ে ভেনাস আর নাই? বারে! বেশ যে লাফিয়ে উঠলেন! আমাদের গাঁয়ে নাই তো ঘুমটা টেনে বুঝি আপনার গাঁয়ে গিয়ে উঠেছে? জ্বী না। কী বলব, গায়ে নাই থানায় নাই জেলায় নাই, দেশে ও নাই গো! আমাদের দেশ সেই থেকে ভেনাস শূন্য গো! হাহ! কল্পনার বাড়ি ছুঁয়ে যাবার কালে পারেন তো এক ফোঁটা জল ফেলুন চোখ নিংড়ে! এক মিনিট, আচ্ছা আচ্ছা আসুন তো, আসুন প্লিজ! ধুরো, নাই তো কি ভাবছেন মরে গিয়ে চিতায় উঠেছে? আরে নাহ! না হয় কেউ শীষ দিয়েছে, স্কুলে যেতে ফুল গুঁজেছে হাতে, না হয় বইয়ের ভাঁজে ক'খানা চিঠি! তাই বলে বর্ডার পাড়ি? ছিঃ, নতুন তো আর শুনেন নি, জিগ্যেস করুন পাশের বাড়ির হাসনার বাপ কে, হাসনার বাপ ভিটা ছেড়েছে? কোন বর্ডার পাড়ি দেবে সে? বুঝলেন, সব ই! হাহ! বিদ্যা বলছি, আরেকটু আসেন, সূর্যস্নান দেখবেন না? হাঁটুজলে সূর্যের স্নান! খানিক এগুলে এরাল বিল, রোজ বিকেলে বিলের উপর নাইতে আসে যে সূর্য! বলছেন সমুদ্র ছাড়া সূর্যের গা ডুবে না? কিতাবী বিদ্যা তুলে রাখুন, আসুন অস্তগামী সূর্যের স্নান দেখে বাড়ি ফিরি, না হয় হাঁটু ডোবা জল, না হয় টিলা ঘেরা বিলকেই সমুদ্র ভাবছি আমি কিন্তু সেই টিলাই তো সাক্ষী, আপনার আবার সাক্ষী ছাড়া চলে না কিনা! আপনি তো বাগড়া দিতে উস্তাদ! আমাদের গাঁয়ে সমুদ্র নাই তো কোথাও থেকে তুলে আনব নাকি? শুনি আপনার গাঁয়ে আছে? তাহলে থামুন! চলুন বাড়ি ফিরি, ফিরতে ফিরতে এক গপ বলি, এই গপ না শুনলে ষোলো আনাই মিছা! আমি চাক্ষুষ? বলছেন এই কথা? ছাড়েন, সব ঘটনার চাক্ষুষ হতে হয় না! আমি চাক্ষুষ হলে আপনার-ই বা শোনার কী দায় ছিলো, গল্পের চাক্ষুষ হতে হয় না, বাবা বললেন বলেই তো আপনাকে শোনাতে পারছি, বাবা চাক্ষুষ কিনা দাদা জানেন! তার চেয়ে পথে নামি। শুনুন পথ যে বড় আশুদ্দার বাড়ি ঘেঁষে, কল্পনার বাড়ির নাক ছুঁয়ে এরাল বিলে গেল, যাবার কালে ঘাড় বাঁকা করে যে আধখানি টিলায় উঁকি দিলো, আর দেবেই বা না কেনো? মা হারামজাদিটা কন্যাকে দু ভাগ করে এক ভাগ নিয়ে উড়াল দিবার আগে যদি বাকি আধখানা ওই টিলায় ফেলে যায়, টিলার নাম আধখানি টিলা হবে না? আরেকটু জোরে বলব বলছেন? মানুষে আর পরীর মেয়েতে ভাব হয়েছিলো গো, পরীর বেটি জাত খোয়ালে ও মানুষের পুত স্বভাব বদলাতে পারেনি, ভাত বাড়তে দেরি কেনো বলে বৌয়ের চুল ধরে যেই হ্যাঁচকা টান মেরেছে, পরীর বেটির মেজাজ গেছে খিঁচে, কন্যাকে ধরে দুভাগ করে জামাইর ভাগের খান জামাইর দিকে ছুঁড়ে মারে, বাকি খানা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে উড়ে যায় পরীস্থানে, মায়ের মন, গেলে কি হবে, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে, বাড়ির মাথায় কেঁদে কেঁদে বেড়ায়... আরেক কাপ কফি দেই? থাক বলছেন? ওই যে বুড়া দেখছেন? ভাবেই কালা, মতলবের কথা ঠিকই শুনে, একটা ঘটনা বলি? কাউকে বলতে যাবেন না আবার, শত হলেও গায়ের বদনাম! বুড়ার ছেলে বউ তার ছেলে কে ছেড়ে গেল সেবার! সে এই না'মরদের ভাত খাবে না। পরের বছর ফের বিয়ে করল ছেলে, ও-মা, বছর ঘুরতেই ছানাপোনা! কীভাবে কী! আচ্ছা এটা বাঁশির সুর না? তা কি করে হয়! এই গাঁয়ে যে আর বাঁশির সুর ভাসার কথা না! ধুরো কে আবার ফরমান জারি করে নিষেধ করবে! বলছেন আপনিও বাঁশির সুর শুনেছেন? আহারে এই গাঁয়ে ফের বাঁশি এলো! আহারে বাঁশি! সত্যি বলতে কি বুকের ভেতরটা একেলা এক মাঠ হয়ে গেলো হঠাৎ! আপনিও মন খারাপ করলেন? আচ্ছা জলন্ত চুলায় যদি ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ি উল্টে দিয়ে পিঁড়ি চাপা দেয়া যায়, তাতে নাকি বংশীবাদক দম আটকে মারা যায়? জানেন বলছেন? মেয়েটির দাদি ভাতের হাঁড়ি উল্টে দিয়েছিলো গো! রাত করে বাড়ি ফিরছিল সোহাগ, তায় অমাবস্যার রাত, সেই বাঁশি ই তার অভয়! কী বাঁশির গলা! মেয়েটির বাড়ির নিচে দু দম দাঁড়িয়েছিল, তাতেই কিনা মেয়েটির দাদি ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ি চুলায় ফেলে পিঁড়ি চাপা দিল, দম বন্ধ সোহাগের কী যন্ত্রণা! কী বিস্ময় তার নিথর মুখে! আজ অমাবস্যা বলছেন? আপনি আসুন!


আমি বাড়ি বাড়ি ভাতের হাঁড়ি পাহারায় যাব...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন