বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৬

পেরুর গল্প : বৃষ্টির নীচে নিঃসঙ্গতা

মূল গল :  গিয়ের্‌মো আর্‌বে
অনুবাদক : সুপ্রিয় বসাক


আগে বৃষ্টি হত। এখন আর একদন হয় না, অবশ্য আগে হত। ক্ষণিকের বৃষ্টি, তবে ফোঁটাগুলো বড়ো বড়ো। ‘এল নিনিয়ো’-র কান্না। এটা বাদ দিলে লারকো সবসময় একই রকম থাকত, রাতের দিকটা কেমন যেন শুক্কুরবার শুক্কুরবার ভাব, বাতাসে একই সঙ্গে গুমোট আর উৎসবের আমেজ।

-Du yu spik inglich?—ভিড়ে ভর্তি রাস্তায় আকস্মিক প্রশ্নটা উড়ে এল।


...(লোকটা কে রে?)

--তুমি কি বিদেশি?

--কেন?

--না, আসলে আমি এতক্ষণ আমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ছিলাম। অবশ্য ওকে বয়ফ্রেন্ড বলাটা ঠিক হবে কিনা জানি না, বাস্তবে দুজনে অনেকদিন ধরেই একসঙ্গে ঘুরছি। ওকে আগে বয়ফ্রেন্ড বলতাম, কিন্তু এখন আর এভাবে ঠিক দেখি না। যদি সব ঠিকঠাক চলে তাহলে তো ভালোই, না হলেও আমার কিছু এসে যাবে না। আর এখন বাড়ি ফেরার জন্য বাসভাড়া আমার কাছে নেই।

--কিন্তু...ঠিক আছে, এই নাও। তবে, জানতে ইচ্ছে করছে আমি বিদেশি হলাম কী না হলাম তাতে কী এসে যায়?

--ধন্যবাদ...না, মানে আসল ব্যাপারটা এই যে আমি আজকাল ইংরাজি শিখছি। তাই কারুর সঙ্গে ইংরাজিতে কথাবলা অভ্যেস করাটা খুব দরকার। তুমি কি ঐ দিকে যাচ্ছ নাকি? যদি তোমার অসুবিধে না হয় তাহলে হেঁটে যাওয়া যেতে পারে। চাও তো দুজনে একসঙ্গে হেঁটে যাই। তুমি কোথা থেকে আসছি?

--আমি একজন চালাকো।
--চালাকো?

--হ্যাঁ, আমি কাইয়ায়োর লোক।

--তাহলে তুমি এখানে কী করছ?

--এখানে, এই মিরাফ্লোরসে? আমি এখানেই তো থাকি, একটা হাউজিং কমপ্লেক্সে। --কিন্তু... এইমাত্র যে বললে তুমি একজন চালাকো।

--না, আসলে ব্যাপারটা হল এই যে আমার জন্ম কাইয়ায়োতে, কিন্তু এখন এখানেই থাকি।

--আমার বয়ফ্রেন্ডও তো তাই, জানি না আমার ক্ষেত্রেই কেন এমনটা ঘটে। লোকের কাছে টাকা চাইতে আমার খুব লজ্জা করে। আমি নিজেও জানি না কেন ওর কাছে টাকা চাইলাম না। আমি কেন এরকম কেন? আসলে আমার ক্ষেত্রেই সবসময় এমনটা ঘটে। আসলে আজকাল আমাকে নিউরোলজিস্টের কাছে যেতে হয়...আচ্ছা, তোমাকে যে এসব কথা বলছি, তোমার খারাপ লাগছে?

-কেন?

--তোমাকে যা বলছি তা শুনতে তোমার হয়তো অস্বস্তি হচ্ছে, এই যে আমি নিউরোলজিস্টের কাছে যাই।

--সত্যি কথাটা হল আমি বুঝতে পারছি না তুমি আমাকে কেন এসব বলছ।

--এতো শুধু কথা বলার জন্য, সবসময় কথা বলে যাওয়াটা আমার খুব প্রয়োজন, কারুর সঙ্গে কথা বলতেই হবে।

--আর, আমার কথাবার্তা চালাতে কোনো অসুবিধে হয় না, শুধু কয়েকটা ব্লক হাঁটতে পারলেই হল। তা একা চুপচাপ হাঁটলাম কী কারও সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাতে কী আসে...

--আমার নাম সোলেদাদ, মানে নিঃসঙ্গতা।

--আর আমার গিয়েরমো।

--তুমি কোথায় যাচ্ছ?

--(বিরতি) এই তো এখানেই গিফট কিনতে।

--কী

--গিফট। উপহার কিনতে, উপহার।

--ওই তো সামনে আমার বাস দাঁড়িয়ে। আমার সঙ্গে যাবে?

(বিরতি)

--রাস্তায় কী গাড়ি!

(বিরতি)

--তাড়াতাড়ি পার হও।

--ঐ দেখ’...ওখানে মিরাফ্লোরেসের মেয়র দাঁড়িয়ে আছে।

--কোথায়?

--ঐ তো ওখানে, দেখতে পাচ্ছ না?

--হুম্‌ম্‌ম্‌..ঐতো ওখানে।

--ভালো, আমার বয়ফ্রেন্ড, যে একজন মার্‌রোকি, আসলে আমার অনেক বিদেশি বয়ফ্রেন্ড ছিল, পেরুভীয়ও ছিল, তবে বেশিরভাগ বিদেশিই। একজন তো ছিল ইয়াংকি, আর খুউব ভালো। তবে ও এখন যুক্তরাষ্ট্রে আছে। ও আমাকে বারবার বলে সেখানে চলে যেতে, চলে গেলে আমরা বিয়ে করব...

--তাহলে সেখানে যাচ্ছ না কেন?

--আসলে আমার শেষ বয়ফ্রেন্ডের মত, যে একজন মার্‌রোকি, সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়। যেমন একবার এক পেরুভীয় আমাকে এই বলে ছেড়ে গেছিল যে ও চলে যাচ্ছে যাতে একদিন আমারই মত না হয়ে যেতে হয় সেজন্য। যাই হোক, আমি বিয়ে করতে চাই, তাই বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে নিই, কিন্তু সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আর আমার ভাইপো-ভাইঝিরা আমাকে ঘিরে চেঁচাতে থাকে “পিসি আমার একলা হয়ে গেছে”, এমনটাইতো প্রতিবার হয়। যেমন, উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আজ, আমার একটা ইংরাজি বই কেনার কথা ছিল। আমি ইংরাজি পড়ছি, তাই মা আমাকে কোর্সটার জন্য দরকার এমন একটা কেনার টাকা দিয়েছিল। তাই আমি গেছিলাম এই গিলানদির বইয়ের দোকানটাতে, এই কাছেই। চেনো নাকি?

--না, কোনটার কথা বলছ?

--গিনালদি, যেটা পারদোর ভেতর দিয়ে খুব একটা দূরে নয়। আমার সঙ্গে একটু থাকো না, চলো, গিয়ে ঐ বেঞ্চটাকে একতু বসি।

--কিন্তু ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে যে।

--এই দু’এক মিনিট বসব, অবশ্য তাতেও একটু ভিজে যাব।

--না, মনে হচ্ছে বৃষ্টিটা যেন ধরে এসেছে।

--প্রথমে গেছিলাম গিলানদিতে, তারপরে কাছেই তাসোরেলোতে, জায়গাটা এখনও পুরনো পেরুর ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। কিন্তু কোনো জায়গাতেই আমার কথা কেউ শুনল না। জানো, এমনটা না সবজায়গাতেই হয়, হয়তো আমি যে নিউরোলজিস্টের কাছে যাই সেইজন্যই। বইটা ভেতরে র‍্যাকে রাখা ছিল, আর তাসোরেলোতে বাইরের শো কেসটাতেও, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। আমি দোকানে ঢুকলাম, ওরা বইটা নামিয়ে আমাকে দিল, তারপর বিল লিখতে যাবে এমন সময় হাত থেকে সেটা কেড়ে নিয়ে বলল বইটা নাকি ওদের কাছে নেই। আমি তখন বললাম ঐতো ওইখানে বইটা, ঐখান থেকে নামিয়েই তো আমার হাতে দিয়েছিল। এসব কিছুই আমার নিউরোলজিস্টকে জানাতে হবে। কিন্তু ওকে বলাটা ঠিক হবে কিনা জানি না, লোকটা আমার কথা বুঝতে পারে কিনা জানি না। আমি মা-কেও সব জানাই, কারণ মা—কে সব কথা বলতে হয়। কিন্তু জানো, মা না তোমার মতো নয়, মা আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নানা প্রশ্ন করে। তবে ওরা আমাকে বিল দেয়নি। সেটা লিখতে যাবে এমন সময় বইটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে জানাল ওদের কাছে বইটা নেই। দেখেছ ব্যাপারটা? আমার সঙ্গে সবসময় এমনটাই হয়। তখন আমি ওদের বললাম ঐতো ঐখানে আছে বইটা, আমি দেখেছি। উত্তরে আমাকে বলল, হ্যাঁ, কিন্তু সেটা নাকি শুধু টিচারদের জন্য, আর তাই সেটা আমাকে বিক্কিরি করা যাবে না। এমন নয় যে আমার কাছে টাকা নেই বলে ওরা সেটা দিতে চায় নি। কারণ আমার কাছে তো টাকা আছে। মা যে টাকাটা দিয়েছিল সেটাতো এখনও আমার কাছে আছে...

--কিন্তু...

--ওদের টাকাটা দেখিয়েওছিলাম...

--কিন্তু

--কিন্তু কেউ আমার কথা শুনলই না। একজন তো টেবিলের উপর ঘুসি মারতে শুরু করে দিল...

--কিন্তু তোমার কাছে যদি টাকা থেকেই থাকে তাহলে...?

--কারণ এমনটা না আমার সঙ্গে সারাক্ষণই হয়। লোকে আমার সঙ্গে একটুক্ষণ থাকার পরেই টেবিলে চাপড় মারতে শুরু করে, অথবা ঘুসি, হ্যাঁ দেখো না, ঘুসি। সে সবে পরিচয় হয়েছে এমন লোকজন হতে পারে, আবার বয়ফ্রেন্ডও হতে পারে। না সে ইয়াংকিটা নয়, কিন্তু ধর, আমার এখন যে বয়ফ্রেন্ড আছে সে অথবা শেষ যে পেরুভীয় ছিল সে। আমরা তখন একটা ট্যাক্সিতে, হঠাৎ ও ঘুসি চালাতে শুরু করে দিল, বইয়ের দোকানেও একই ঘটনা ঘটেছিল...

--সোলেদাদ।

--হ্যাঁ, বল, কী হয়েছে?

--তোমার কি খেয়াল আছে যে গত পনেরো মিনিট ধরে তুমি আমাকে বইয়ের দোকানে বই কেনার গল্প শোনাচ্ছ...

(ঘড়ির দিকে তাকাল)। --হ্যাঁ, আমি না শুধু বকেই যাই। এই জন্যেই তো নিউরোলজিস্টের কাছে যেতে হয়। ও বলে যে এটা চলে যাবে...

--কী চলে যাবে?

--এই এত কথা আর বলতে হবে না।

--কী, সেই দোকানে...হুম্‌ম্‌ম্‌...কী চলে যাবে?

--এই এটা। নিউরোলজিস্ট আমাকে বলে যে এই এত কথা বলার অভ্যেসটা ছাড়তে হবে, এটা একদিন চলে যাবে, একমাত্র এই কাজটাই আমাকে করতে হবে। যাই হোক, জানি না লোকটা একজন সাইকোলজিস্ট কিনা, কিন্তু আমি ওকে কী করে সব কথা বলব ভেবে পাই না, আমার সঙ্গে যা যা হয় সব কথা ওকে কী করে বলি...

--তোমার নিউরোলজিস্টের নাম কী?

--কে জানে, আলফ্রেদো না কী যেন একটা।

--কতদিন হল নিউরোলজিস্টের কাছে যাচ্ছ?

--এই তো, সবে কিছুদিন হল, কয়েকবার মাত্র গিয়েছিলাম। আমাকে কী সব ট্যাবলেট দেয়। তবে ওকে সব কথা বলা উচিত হবে কিনা বুঝতে পারছি না, যেমন বইয়ের ঘটনাটার কথা, অথবা আমার বয়ফ্রেন্ডরা আমার সঙ্গে যেমন ব্যবহার করে সে কথা। বল না, হঠাৎ করে কাউকে কিছু বলা যায়? মারও সঙ্গে যাওয়া উচিত, ও বলে যে মারও নাকি আমার সঙ্গে যাওয়া উচিত। কিন্তু এতে খরচ বাড়ে না, বল? মা গেলে ওতো তারও ফি চেয়ে বসবে, তাই না...

--কিন্তু সোলে, আমার একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে, আমার সঙ্গে ইংরাজিতে কথা বলছ? তোমার কাছে জানতে চাইছি কারণ...

--কারণ আমি যেহেতু ইংরাজী শিখছি তাই অনুশীলনের দরকার...।

--একথাটা জিগ্যেস করছি তার কারণ কয়েক সপ্তাহ আগে আমি লারকের ভেতর দিয়ে হাঁটছি এমন সময় একজন আমার সঙ্গে এসে আলাপ করেছিল, আমাকে এরকম নানা প্রশ্নও করেছিল...

--একটা মেয়ে?

--হ্যাঁ, মেয়েটা হল...

--তাহলে আমিও হতে পারি...হতেই হবে আমি, কারণ লোকের সঙ্গে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে। এতে ইংরাজিতে কথা বলার অভ্যেসটাও থাকে, এভাবেই তো ঐ মার্‌রোকির সঙ্গে আলাপ, সেই ইয়াংকিটার সঙ্গেও, ঐ যে ছেলেটা এখন আমেরিকায় থাকে না, আর আমাকে বিয়ে করতে চায়। তাছাড়া কোনো পেরুভীয়তো আমার দিকে তাকায়ই না। না, না, তুমি তো ব্যতিক্রম, তবে বেশিরভাগই। তাছাড়া যখন সাহায্যের দরকার হবে, যেমন আজ বয়ফ্রেন্ড ছেড়ে চলে যাবার পরে আমার হয়েছিল, কোনো পেরুভীয় তো তোমাকে সাহায্য করবেই না। কিন্তু একজন বিদেশি সহজেই করবে আর অনেক সময় তোমাকে নিয়ে যেতেও চাইবে, জানি না কোথায়, হয়তো কোনো কাফেতে অথবা বেড়াতে। ওরা তো এখানে নতুন, তাই না? ওরা তোমাকে বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ওরাও আমাকে ছেড়ে চলে যায়, এই কথাটাও আমি নিউরোলজিস্টকে বলতে চাই। ওরা কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে গল্প করে, তারপর চলে যায়। অবশ্য অনেক সময় নানা সমস্যাও দেখা দেয়, যেমন একবার একজন আমাকে ডিসকোথেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু আমাদের কিছুতেই ঢুকতে দিল না, তারপরে ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমার বয়ফ্রেন্ডরাও করে, কিন্তু আমি তো বিয়ে করতে চাই। কিন্তু ওরাও শেষ পর্যন্ত আমাকে ছেড়ে চলে যায়। পরে ওদেরকে দেখতে পাই, অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্য মেয়েদের সঙ্গে ওরা ভালো ব্যবহার করে, কিন্তু আমার সঙ্গে করে না। এমন নয় যে ওরা সুন্দরী বলে এমনটা করে। আমি অবশ্যি কোনোদিনই সুন্দরী হতে পারব না।কিন্তু ঐ মেয়েগুলোতো আসলে দো-আঁশলা। এমনকী বোনগুলোও আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, ওদের বাড়িতে গেলে সোফায় বসতে দেয় না, হইহই করে তেড়ে আসে। তবে ইয়াংকিগুলো আমার সঙ্গে এতটা খারাপ ব্যবহার করে না। তাই তো ওদের সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করি। টাকার জন্য নয় কিন্তু। কারণ আমার একটা বিরাট বাড়ি আছে, ভিসতা আলেগ্রে-তে, সেখানে আমি মা-র সঙ্গে থাকি। শুধু একটা কথা বলা, আমি আর কিছু চাই না। যেমন একটু আগেই ছিলাম আমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে, অবশ্য ও আসলে আমার বয়ফ্রেন্ড নয়। ও আমাকে এও বলল যে সকালে নাকি অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিল। মম্‌ম্‌, অবশ্য এতে আমার কিছু যায় আসে না। যদি ওর সঙ্গে আবার দেখা হয় ভালো, না হলেও ক্ষতি নেই। যেমন বলা যায়, আজ যখন ওর সঙ্গে রাস্তায় ঘুরতে বেরিয়েছিলাম তখন আমাকে পেপের রস খাওয়াতে চাইলেও আমি কিন্তু খাই নি। ও আর সাধাসাধি করল না, আর তাই আমারও রস খাওয়া হল না। আসলে আমি যে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাই তার কারণ এই নয় যে ওরা আমাকে টাকা অথবা জিনিসপত্র কিনে দেবে। আচ্ছা, তুমি আগে কোনোদিন ভিসতা আলেগ্রে-তো থাকো নি?

--তা সে অনেকদিন আগে, আমার বয়েস তখন চোদ্দ হবে।

--তাই, তোমাকে দেখে চেনা চেনা লাগে...

--মনে হয় না, সেতো অনেক বছর আগের ঘটনা, আমার বয়স তখন কত আর, বারো-চোদ্দো হবে।

--...

--...

--যাই হোক, ব্যাপারটা হল এই যে ভিসতা আলেগ্রে-তে আমার একটা বাড়ি আছে, আমার খুব ভালো লাগবে যদি তুমি সেখানে যাও..যদি তুমি দেখ যে আমার বাড়িটা কত বড়ো। এটা অবশ্য সত্যি যে আমার বেশি টাকাকড়ি নেই, শুধু মা যা হাতে দেয় সেটুকুই। এজন্যই তো ইংরাজি পড়ছি, হাতে অন্য কিছু করার মতো কাজ নেই বলে তা নয় কিন্তু। আমি যখনই কোনো কাজ খুঁজতে যাই তখন ভিতরে ঢুকে নিজের পরিচয়টা দিই, তবে অনেক সময় আমাকে ঢুকতেই দেয় না, সেই একই গার্ডগুলো আমাকে দরজায় আটকে জিজ্ঞেস করে “ তুমি আবার এসেছ কাজ খুঁজতে?” ওরা আমাকে বিরক্ত করে, নোংরা কথা বলে, হাসাহাসি করে। কিন্তু আমি একটা কাজ চাই, বিয়ে করতে চাই, আমি বিয়ে করতে চাই, কিভাবে ওরা আমাকে বিরক্ত করে, কিছু বিক্কিরি করতে চায় না, যেমন সেই বইটা। কিন্তু কী করে বলব ভেবে পাই না...

--সোলে...

--আর দেখ, এখন কেমন হঠাৎ তোমাকে সব কিছু বলতে পারছি, সেই নিউরোলজিস্ট...

--সোলেদাদ...

--সান বোরখা-তে থাকে, সেই নতুন নিউরোলজিস্ট, চেনো নাকি খুদাস তাদেয়ো-কে?

--না, সোলে দেখ, এবার আমাকে যেতে হবে। চল, তোমাকে বাস স্টপ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসি। আর তুমি কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না, সবকিছু দেখবে ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা, তুমি আমাকে তোমার টেলিফোন নম্বরটা দাও তো...

--৮৩৮-৩৮৫৯, তুমি আমাকে সত্যি ফোন করবে?

--হ্যাঁ, তোমাকে সত্যিই ফোন করব। তিন সত্যি করছি। তবে দশ দিন পরে। তার আগে ফোন করা সম্ভব হবে না কারণ আমাকে বাইরে যেতে হচ্ছে...

--তুমি বাইরে যাচ্ছ? কোথায়?

--ভেনেজুয়েলা, কাজে যাচ্ছি।

--তাহলে আমাকে ভেনেজুয়েলা থেকে ফোন কর না কেন?

--ভেনেজুয়েলা থেকে ফোন করতে পারব না। প্রথমত, অনেক দূরে তাই ফোন করা খুব খরচের, আর তাছাড়া অফিসের কাজে যাচ্ছি। তুমি চিন্তা কোরো না, আমি ফিরে এসেই ফোন করব।

--আমার মিরাফ্লোরেসে খুব ইচ্ছে করছে। সেখানে কত কাজ, কত লোকজন।

--সোলদাদ, আমি তোমাকে ফোন করব, দশদন পরে, ততদিন আমার কথা মনে থাকবে?

--হ্যাঁ, গিয়েরমো, থাকবে।

--মম্‌ম্‌, আমার কিন্তু তোমার কথায় খুব একটা ভরসা হচ্ছে না।

-- হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঐ দেখ আমার বাস... শোনো, হর্ন দিচ্ছে, ছেড়ে যাবে এক্ষুণি...

--না, না, শুধু হেডলাইটটা জ্বালছে। তাছাড়া দেখ, আরেকটাও এসে গেছে।

--তাহলে আবার দেখা হবে।

--হ্যাঁ, আবার দেখা হবে।

--আমাকে ফোন কোরো কিন্তু।



লেখক  পরিচিতি : 
গিয়ের্‌মো আর্‌বে
পেরুর বর্তমান প্রজন্মের সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ছোটো গল্পের প্রতি তার ভিন্ন ট্রিটমেন্ট তাকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। এই গল্পটি সম্পর্কে তার মন্তব্য : ‘সোলেদাদকে দু’সপ্তাহ পরে ফোন করেছিলাম। ফোন করেছিলাম কারণ ওকে আমি কথা দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম ও উদ্বিগ্ন হয়ে আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করবে। তাই যোগাযোগ করলাম। ও আমাকে চিনতেই পারে নি। আমি অবশ্য এতে অবাক হইনি।’ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন