মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত'র গল্প | অর্ধবৃত্ত

রূপঙ্কর চেম্বার থেকে ফিরেছেন প্রায় মিনিট পনের হল। সোফার বোলস্টারে মাথাটা হেলিয়ে চোখ দুটি বন্ধ করে রেখেছেন। সকালে পরা হালকা নীল-রঙা শার্টের ওপরের বোতাম দুটো ফিরেই খুলে ফেলেছেন। সামনে বুবাই-এর রাখা কাচের গ্লাসে জল এমনিই পড়ে আছে। রূপঙ্কর একটু বেশি ঠান্ডা জল পছন্দ করেন বলে বুবাই পুরোটাই ঠান্ডা জল দিয়েছে, একটা টিস্যু-পেপার গ্লাসে জড়িয়ে। শনিবার বলে তার ছুটি। আর বুবাই-এর কোনোদিনই তেমন বন্ধু-বান্ধব নেই। যারা ছিল প্রায় সবাই বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। বুবাই যায়নি। ওর তেমন কোনো অ্যাম্বিশনও নেই। সোম থেকে শুক্র তো অফিস থেকে বাড়িই ফেরে রাত ন’টায়। স্নান সেরে খাবার টেবিলে আসে, সবই টেবিলে ক্যাসারোলে রাখা থাকে, সাতটা নাগাদ মধুমাসি সব গুছিয়ে রেখে চলে যায়। এত দূর অবদি সব নিয়মমাফিক চললেও খাবার টেবিলে রূপঙ্কর আর বুবাই-এর তক্কাতক্কিতে কোনোদিন রাত বারোটাও বেজে যায়। বিশেষ করে এই শনিবারের রাতগুলোয় যেদিন নিয়ম করে স্কচ পান করে দুজনে। কিন্তু আজ বুবাই ঠিক সামনের সোফায় বসেও রূপঙ্করের সাথে খুব দূরত্ব অনুভব করছে। রূপঙ্কর একবার মাথাটা তুলে বুবাই-এর দিকে অসহায় ভাবে তাকালেন। বুবাই তার শক্ত পাথরের মত মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল –

--   যাও, চেঞ্জ করে এসো, খাবার সার্ভ করব।

আজ স্কচের বোতল খোলার কোনো প্রসঙ্গই ওঠে না। রূপঙ্কর বেশ কিছুক্ষণ একটা রুটি নিয়ে নাড়াচাড়া করে বলতে গেলেন-

--  জানিস...বুবাই...

--  হ্যাঁ, আজ মধুমাসি চিকেনটা অন্যরকম করে করেছে। দই আর মেথি দিয়ে, আমিই বলে দিয়েছিলাম।

--  ও আচ্ছা আচ্ছা... ভালো হয়েছে।

--  খেয়ে তারপর বলো।

এরপর আর কোনো কথা হল না দুজনের। ফেলে ছড়িয়ে খানিক খেয়ে রূপঙ্করই আগে –উঠলাম বলে উঠে চেয়ার সরালেন। লারসন-এর একটা ট্রিলজি পড়তে শুরু করেছে বুবাই তিন-চারদিন ধরে। সুইডেন বা সমস্ত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতেই অভিভাবকেরা যদি সন্তানের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব ঠিক মত পালন না করতে পারে তাহলে নাকি সন্তানকে ছিনিয়ে নেয় দেশ, মা-বাবার কোল থেকে। এবং দেশ বা সরকার নির্ধারিত অভিভাবকত্বে থাকতে হয় অপ্রাপ্তবয়স্ক সেই সন্তানকে। আজও সেটা নিয়ে সে বিছানায়, সওয়া একটা বাজে প্রায়। বুবাই-এর মনে পড়ে ওদেশে বসবাসকারি বাঙালি এক দম্পতিরও এ’ধরনের কিছু খবর কিছুদিন আগে বেরিয়েছিল । অন্যান্য রাতে বুবাই ঘুমোনোর আগে একবার রূপঙ্করের ঘরেও যায়, ক’সেকেন্ড দাঁড়ায় বিছানার পাশে, ঘুমন্ত রূপঙ্করের মৃদু শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ শোনে, তারপর ফিরে এসে নিজের ঘরে শুয়ে পড়ে। আবার উল্টোটাও হয় প্রায়েই। রূপঙ্কর এসে হামলা করে বুবাই-এর ঘরে, এই তোর একটা সিগারেট দে তো আমায়, ঘুম আসছে না। আজ আর বুবাই-এর পাশের ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। অবশ্য পাশের ঘরের মানুষটিও অবধারিত বিনিদ্রই কাটাচ্ছেন, যদিও ঘর অন্ধকার। ভেজানো দরজা দিয়ে কোনো আলোর রেখা বুবাই-এর ঘরের সামনের বারান্দায় এসে পড়ছে না। ষোলো বছরের এই দীর্ঘ সময়ে আজই বোধহয় প্রথম রূপঙ্কর আর বুবাই-এর মধ্যে রাতের বেলা এত কম কথার আদান-প্রদান হল।

********

বুবাই দেখেছে মা ইংলিশ-বেঙ্গলি স্যারদেরকে তেমন পাত্তা দেয় না, মধুমাসির হাত দিয়ে সরবত চা পাঠায় কিন্তু ম্যাথস আর সায়েন্সের অশোক-স্যার এলে একবার এসে গল্প করবেই। বুবাই-এর পড়ার পরও অনেকক্ষণ গল্প করে, মা-এর আর কোনো বন্ধু নেই। শুধু অশোক স্যার। অফিস থেকে সোজা বুবাইকে পড়াতে আসে অশোক-স্যার, বাবার বন্ধুর ভাই। বাবার ফিরতে ফিরতে তো অনেক রাত হয়, অনেকগুলো চেম্বার আর নার্সিংহোম সেরে ফিরতে প্রায় এগারোটা বাজে। বুবাই-এর সাথে রাত্তিরে দেখাই হয় না। সকালে স্কুল যাবার আগে ব্রেকফাস্টের টেবিলে দেখা হয়। আর তখন প্রতিদিন দেখে টেবিলের মাঝখানের ফুলদানিতে গোলাপের বোকে। যত রাতই হোক মা’র ফেভারিট ফুল আনতে বাবা কোনোদিনও ভোলে না। গোলাপি, সাদা রাতপোশাকে মা’কে খুব সুন্দর দেখতে লাগলেও মা সবসময়ই মুখটা কেমন রাগী-রাগী করে রাখে আজকাল। বাবা’র সাথে ঝগড়া করলেও মা কখনও বুবাই’কে বকে না । তবে পরশু দিন অশোক-স্যার চলে যাবার পর মা বুবাই-এর পাশে বসে হঠাৎ বুবাই-এর মাথায় হাত রেখে খানিকক্ষণ বসেছিল, মুখটা কেমন কান্না-কান্না যেন। বুবাই-এর যেন ভয় করতে শুরু করে, খুব ইচ্ছে করে ছোটবেলার মত মা’কে জড়িয়ে ধরতে কিন্তু পারে না, শক্ত হয়ে বসে থাকে।

মা চলে যাবার পর বাবা সপ্তাহ দুয়েক ‘কিছুই হয়নি’ ভাব করে, নার্সিং হোম থেকে ছুটি নিয়ে, বাড়িতে অনেক কিছু করার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু কিছুই ঠিক ভাবে করে উঠতে পারছিলেন না। তারপরই কেমন যেন ভেঙে যেতে থাকেন, আর চুপচাপ। কিন্তু বুবাই হয়ে উঠেছিল যেন অনেকটা বড়। আর ছিল মধুমাসি। তবে সন্ধ্যেতে মধুমাসি চলে যাবার পর, বুবাই’ই হয়ে উঠত যেন বাড়ির কর্তা। বাবা ফিরলে, বাবাকে জল দেওয়া, চা খেতে চাইলে চা করে দেওয়া, বাবা’র বাথরুমে তোয়ালে, পাজামা, পাঞ্জাবি রেখে বাবাকে ফ্রেশ হতে পাঠানো। খাবার সার্ভ করা। সকালে অবশ্য মধুমাসি খুব তাড়াতাড়ি চলে আসে। তিনজনের কেউ কখনও মা’র কথা বলত না। বুবাই ইস্কুল যেত আসত, কারো সঙ্গেই মিশত না। খেলাধুলোও কিছু না। ম্যাথস আর সায়েন্সের জন্য নতুন একজন স্যার আসতে শুরু করেন। ক্লাস টুয়েলভের পর বুবাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরি করছে দু’বছর হল। ষোলোটা বছর এভাবে পার করে ফেলল এ’বাড়ির দুটো মানুষ আর ওই মধুমাসি।

********

পাশ ফিরতে ফিরতে বুবাই ভাবে এতদিন ধরে যে বাবাকে ও দেখে আসছে, বুঝে আসছে, সেটা কি তাহলে ভুল? আজ এত দিন পরেও মা’কে বাবা ভোলে নি? এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা, এত বড় অপমানের পরেও? বুবাই রূপঙ্করের মধ্যেই বাবা আর মা দুজনকেই পেয়েছে। রূপঙ্কর পারেননি? রূপঙ্কর পাননি তা বুবাই-এর মধ্যে। সন্ধ্যেতে বুবাই-এর কাছে কি যেন ভিক্ষা চাইছিলেন বাবা।

-- বুবাই জানিস, ...মণিকার ব্রেইনে অ্যানিওরিজম ডেভেলপ করেছে, ইমিডিয়েট সার্জারি না করলে ...

--  কি? হোয়াট দ্য হেল ইজ দ্যাট? আর তুমিই বা জানলে কি করে, বাবা?

--  আজ ও এসেছিল আমার রাসবিহারী রোডের চেম্বারে ..., কি চেহারা হয়েছে তোর মা-র!

‘তোর মা’ বলায় বুবাই আবার ঝাঁঝিয়ে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলালো, বাবা’র সাথে তো সে ঝগড়া করে না। তক্কাতক্কি যা হয় সব খেলা, রাজনীতি এসব নিয়ে। কিন্তু বুবাই-এর রাগত মুখের দিকে তাকিয়ে রূপঙ্কর আর কোনও কথা বলেন না। বুবাই আবার ঘড়ি দেখে। দুটো কুড়ি। বাবা কি ঘুমোলো? মনে মনে এবার হাসে বুবাই। একটা পুরুষ হয়ে ভাবার চেষ্টা করে। মা যেদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যায় সেদিন থেকেই বুবাই, বারো বছরের এক ছেলে প্রাণপণে চেষ্টা করেছে শুধু ‘মা’ হয়ে ওঠার। এই সংসারে মণিকা’র অভাব পূরণ করার । ভেতরে ভেতরে ছটফট করেছে, আর তখনই বাবা’র ঘরের টেবিল গোছাতে শুরু করেছে। আজ যেন সব হাস্যকর লাগছে বুবাই-এর। একজন পুরুষ তার ছেলের কাছে কখনো বাবা-মা দুটোই হয়ে উঠলেও, একটি ছেলে তার বাবা’র মনে, পারিপার্শ্বিকতায়, কিছুতেই সন্তান আর স্ত্রী দুটোই হয়ে উঠতে পারে না।



সকালে চা খাবার পরই বুবাই প্রেশার মাপার যন্ত্রটি নিয়ে এসে রূপঙ্করের ঘরে ঢুকে দেখে বাবা চুপচাপ জানলার দিকে তাকিয়ে বসে আছে।

--  বাবা... হাতটা দাও এদিকে।

--  আমি ঠিক আছি রে।

প্রেশার দেখার পর বুবাই গম্ভীর হয়ে বলে –একটু কিন্তু বেশি বাবা, ...ওপরেরটা।

--  আরে ওটুকু চিন্তার কিছু নয়। তুই কি কোথাও বেরোবি বুবাই?

--  না... আমি আবার কোথায় যাব?

বাক্সে প্রেশারের যন্ত্রটা ঢোকাতে ঢোকাতে বুবাই রূপঙ্করের দিকে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করে- তুমি?

রূপঙ্কর একটুক্ষণ চুপ থেকে বলেন – দেখি, বেরোতে পারি।

--  বাবা তুমি যেটা মনে করবে ঠিক সেটাই করো।

--  কি যে বলিস ...তোর মত ছাড়া আমি কিছু করতে পারি?

--  আমার কিছুতেই অমত নেই। তবে আমায় কিছুতে ইনভলভ কোরো না।

--  কাল তোর কথা খুব জিজ্ঞেস করছিল মণিকা।

বুবাই অবাক হয়ে বলে- বাবা, তুমি কি? এনিওয়ে চলো ব্রেকফাস্ট করবো।

*******

দুপুরের খাওয়ার পর রূপঙ্কর বেরিয়েছেন। আজ যদিও রবিবার, চেম্বার বন্ধ। বুবাই কিছু জিজ্ঞেস করেনি, রুপংকরও বলেননি। বুবাই বিছানায় হাতে সেই লারসনের বই। যদিও মনোসংযোগ বারবার ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বাবার ক’টা কথা বার বার মাথায় ঘোরা ফেরা করছে। ‘বুবাই...,অ্যানিওরিজম একরকম ব্লাড ভেসেলের টিউমারের মত, যে কোনো মুহূর্তে বার্স্ট করতে পারে’ । করুণ মুখে, উৎকন্ঠা জড়ানো ক্লান্ত গলায় বাবা বলে —ইমিডিয়েটলি সার্জারি দরকার মণিকার। আরো অনেক কথাই ষোলো বছর পর বাবা’র মুখে শুনল বুবাই যা আগে কোনোদিনও উচ্চারণ করেননি রূপঙ্কর। খাপছাড়া কত সব কথা বলে যাচ্ছিলেন।

--  আমি তো মণিকা’কে একটুও সময় দিতে পারতাম না…, ভুল করেছে…, অন্যায় করে ফেলেছে…কতই বা বয়েস তখন ওর, …কিন্তু বুবাই কাল যদি ওর ভয়ার্ত, ফ্যাকাসে মুখটা দেখতিস তুই…!

বুবাই-এর দিক থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আবার বলেন রূপঙ্কর।

--  তুইও ওপরে যতই নিস্পৃহতা দেখাস না কেন...এখনও যে তোর মা’র ওপর এত রাগ, এতটা অভিমান..., এগুলো প্রমাণ করে বুবাই, যে তুই তোর মাকে একটুও ভুলিস নি। আজও।


বুবাই ভাবে সত্যি কি সে মা’কে ভুলতে পেরেছে? মা’র বয়েস নাকি কম ছিল। আর বুবাই-এর বয়েস? বারো বছরের ছেলে ছিল বুবাই, তারপর থেকে কোনো আনন্দ ভালোলাগাকে পাত্তা দেয় নি সে। এমন কি পড়াশুনোতেও, যেটুকু না করলেই নয় । তার বেশি কোনোদিন করে নি। বড় কিছু হতেই চায়নি বুবাই, যদি বাবাকে ছেড়ে যেতে হয়, বাবার খেয়াল না রাখতে পারে এই ভয়ে। ঠিক সময় যদি অপারেশন না হয় তাহলে, ...নাহ আর ভাবতে ভালো লাগছে না বুবাই-এর। মা চলে যাবার আগের সন্ধ্যের কথা মনে পড়ল। অশোক-স্যার চলে গেছেন একটু আগে। মধুমাসিও চলে গেছে। বাবা ফেরেননি এখনও । বুবাই জ্যামিতির একটা প্রবলেম খুব মন দিয়ে সমাধান করার চেষ্টা করছে। পাশে খোলা জ্যামিতির বাক্স-কম্পাস, চাঁদা আরো সব। মা এসে পাশে বসল বুবাই-এর। একটু পর মাথায় হাতটা রাখল, মুখটা জানি কেমন, কান্না-কান্না। আজ বুবাই-এর মনে হল সেদিন যে অত মা’কে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু বুবাই শেষ পর্যন্ত করে উঠতে পারে নি, সেটা করলে কি জ্যামিতির প্রবলেমের মত কিছুতেই হতে না পারা বৃত্তটা এতদিনে সম্পূর্ণ হয়ে উঠত?


লেখক পরিচিতি
গল্পকার। আবৃত্তিকার

২টি মন্তব্য:

  1. উফফ অসাধারণ। আমি নতুন করে আবার তোমার লেখার ফ্যান হয়ে গেলাম।

    উত্তরমুছুন