রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

সাইফুল ইসলাম তুষারার গল্প | খুন

আজ সকালে রতন শীল খুন হয়েছে। রতন শীলের বিধবা মা ঘরের দাওয়ায় বসে বিলাপ করছে আর গাল দিচ্ছে!
মাগী টা আমার ছেলেটারে মাইরা ফালাইলো!
বাতার খাগি, বেশ্যা মাগী ......
ওরে আমার রতন বাপ ধন!

রতন শীলের ছোট উঠান লোকে লোকারণ্য। কিছু মেয়ে বউ এসে রতনের মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কেও আবার মুখ টিপে টিপে গাল মন্দ করছে। হারু শীলের মেয়ে কাজুরি উঠানের তুলসী মণ্ডপের কাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
মুখ বাঁকা করে বলে উঠলো , থামো খুড়ি , হইছে! মাগিটারে নিয়া তো আর কম আদিখ্যেতা কর নায়! তা বলি রতনের লগে থাকবে ক্যান ঐ রকম পিত্তিমার মতন মুখ! আমি আগেই বুঝছিলাম মাগী থাকনের না! মাঝ খান দিয়া জীবনডা গেল রতইনার! 

রতনশীলের লাশ একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে উঠানে রাখা হয়েছে। এখনো উঠানে রক্তের দাগ ছড়িয়ে আছে।
হারু শীল বলল , কি গো তপেন , রক্ত গুলা ধুইয়া ফেলাইলে ক্যামন হয়?
তপেন রতন শীলের ভাগ্নে , মামার মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে এসেছে। সে নির্বিকার , সে জানে যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি! আর যে করেছে সেও এরকম কাজ করার মানুষ নয়, তবুও কেন এমন হল?
তপেন স্থানীয় একটা ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে মাস্টারি করে।
তপেন বলল , পুলিশ আইসা যা করার করবে! খুন হয়েছে , ফৌজদারি কেস! আমাগো হাত লাগানো উচিত হইবে না!
সেন পাড়ার মতি সেন হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকে বলল , খবর পাইয়া চইলা আইলাম ! কি বজ্জাত মাগি রে ভগবান!
হারামজাদী কই? ওরে বাইন্দা রাখে নায়?
কাজুরি রান্না ঘরের দাওয়ার দিকে ইশারা করে বলল , জ্যাঠা রান্ধন ঘরে বইয়া আছে! কি তেজ গো জ্যাঠা , একটু কানলো না পর্যন্ত!
মতি সেন বলল , তার বাপের বাড়ি খবর দেয়া হইছে?
তপেন বলল , মামীর তো তিন কুলে কেও নাই! এক মামু ছিল শুনছি গেল বছর কলিকাতা চইলা গেছে!
মতি সেন মোড়ল গোছের মানুষ। হাতের লাঠি খানা দিয়া লাশের উপর কাপড় খানা সরিয়ে বলল , ইস! একেবারে জবাই কইরা ফেলছে!

খড়ে ছাওয়া ছোট রান্না ঘরের মেঝে তে বসে আছে নয়ন তারা। চুল গুলি এলোমেলো। হাতে রক্তের দাগ, পায়ের কাছে পড়ে আছে একখানা রক্ত মাখা রাম দা! অনতি দূরে পড়ে আছে এক খানা বাঁশের লাঠি। রান্না ঘরের চুলায় মুড়ির পাতিলে পুড়ে পুড়ে লাল হয়ে গেছে এক রাশ বালি। কিছু মুরগী এসে ধামা থেকে সদ্য ভাজা মুড়ি ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে, নয়ন তারা নির্বিকার হয়ে বসে আছে। 

নয়ন তারা রতন শীলের বউ। তিন বছর হল তাদের বিয়ে হয়েছে। এখনো কোন সন্তান আসে নি। রতন যখন রেগে যেত , তখনি সে নয়ন তারা কে বাজা মাগি বলে গাল দিত!
শীল পাড়ার একমাত্র রতন শীলই মুড়ি ভেজে বাজারে বিক্রি করতো। তাতেই সংসার চলতো আর মাঝে মাঝে পাঠালি গুড় বানিয়ে বিক্রি করে কিছু উপুরি টাকা পেত!!

নয়নতারা বিশোর্ধ যুবতী , নিখাদ সুন্দর না হলেও আট সাট গড়ন যে কাও কে পাগল করে দিতে পারে!
রতনের সাথে তার ভালোবাসার অন্ত ছিল না! তাদের ভালোবাসার মাখামাখি দেখে পাড়া পড়শিরা বেশ পুড়ে মরতো। কিন্তু এমন যে হবে সে কথা কেও কখনো কল্পনাও করে নি!
নয়নতারা রতন কে খুন করেছে। রাম দা দিয়ে খুন। তারই বা কি দোষ, রাগ কি শুধু পুরুষ মানুষের একার সম্পদ! মেয়েদের বুঝি রাগ থাকতে নেই! 

সে তো রান্না ঘরে বসে মুড়ি ভাজছিল। পিছন থেকে রতন এসে বাঁশ দিয়ে পেটানো শুরু করেছিল, তার শরীর বুঝি শরীর না! তার উপরে তপেন কি নিয়ে কি সব বাজে কথা রতন বলছিল , শুনলে গা ঘিন ঘিন করে! তপেন তার প্রতি দুর্বল , সে কথা নয়ন তারা আগেই জানতো , তপেন যখন শ্রী কৃষ্ণের কথা আর রাঁধার কথা বলতো , যখন বলতো তারা সম্পর্কে মামী ভাগ্নে ছিল তখনি নয়নতারা বুঝতে পারতো তপেন এর মনের মধ্যে কিছু চলছে! কিন্তু কই সে তো কোন দিন এসব মাথায়ও আনে নি! সে তো রতন কে নিয়েই সুখে ছিল! তবুও কেন কাজুরির কান পরামিশে রতন তাকে মারতে এল! তার বুঝি জেদ নেই! রাগ নাই! তার শরীর বুঝি মাটির নয়! তার খুনটাই সবাই দেখলো , তার অন্তর কেও বুঝলো না!

পুলিশ এসে উঠানের চার দিকটা ঘুরে দেখলো। একজন রতনের লাশ টা পলিথিনে পেঁচিয়ে নিল!
পুলিশের কর্তা জিগ্যেস করলো , আসামি কই?
কাজুরি দেখিয়ে দিল! 

নয়নতারার কাছে গিয়ে এক পুলিশ তাকে হাত কড়া পড়িয়ে দিচ্ছিল!
নয়ন তারা বলল , বাবু একটু সময় দেবেন!
নয়ন তারা ঘাটে নেমে মুখ খানা ধুয়ে নিল!
পুকুরের পানি হাত দিয়ে নাড়াতেই সে দেখতে পেল রতন নয়ন তারা কে আড় কোলে নিয়ে সাঁতার শিখাচ্ছে! আর সে খিল খিল করে হাসছে!

পুলিশ বলে উঠলো , তাড়া তাড়ি !
নয়নতারা ঘাট থেকে উঠে পুকুর পাড়ের গাছ থেকে একটা রক্ত জবা ছিড়ে মাথায় গুজলো!
কাজুরি মুখ বাঁকা করে বলল , ইস! ঢং কত!!
একটা ভ্যানে করে লাশ আর এক ভ্যানে করে নয়ন তারা কে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে!
পিছে পিছে ছুটছে গাঁয়ের মানুষ! 

নয়ন তারা চুপটি করে নব বধূটির মত ভ্যানে বসে আছে!
হারু শীল মতি সেন কে জিগ্যেস করলো , বাবু , সাজা ক্যামন হইবে?
মতি সেন বলল , ক্যামন আবার কি! ফাঁসি ফাঁসি! 

তপেন কিছুতেই নিজেকে মানাতে পারলো না! সে জানে তার মামি অনাথা! তার পক্ষে দাঁড়াবার মত কেও নেই!
তপেন মনস্থির করে ছুটে গেল। সে নয়ন তারা কে যে করে হোক ছাড়িয়ে আনবে! এর পর তাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবে যেখানে কেও জানবে না, নয়ন তারা তার মামি!

নদীর ঘাটে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। নৌকায় করে ওপার গেলেই সদর থানা! ঘাটে নৌকাও নেই! সদরে সেই শেষ রাতে ট্রেন আসলে নদীতে ফেরি নৌকা চলা শুরু করবে যাত্রী নিয়ে। 

পুলিশের বড় কর্তা , হুকুম দিলেন এখানেই হ্যাজাক জ্বালিয়ে অপেক্ষা করতে!
নয়ন তারা কে হাত কড়া পড়িয়ে বসিয়ে রাখা হল। পাশে পলিথিনে প্যাঁচানো লাশ!
আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে , নদীতে জোয়ারের শব্দ শোনা যাচ্ছে!
পুলিশের বড় কর্তা তার দুই সাগরেদ কে নিয়ে তাস খেলছেন!
সারা দিনের ক্লান্তি ভর করে নয়ন তারার দু চোখ লেগে এল, সে দেখতে পেল রতন তার পাশে এসে বসেছে, বলছে , বউ, জবা ফুলটায় তোরে মানাইছে!
রতন হাউমাউ করে কেঁদে বলল , সে নয়ন তারা কে ছাড়া একা কি ভাবে থাকবে?
নয়ন তারা ঘুম থেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো , সে ধীর পায়ে নদীর পাড়ে গেল। নদীতে জোয়ারের জলে চাঁদের আলো খেলা করছে। 

নয়ন তারা চোখ বন্ধ করে সেই জোয়ারের জলে ঝাঁপ দিল!
পানির উথাল পাতাল শব্দে পুলিশ ছুটে এল!
একটা ঘূর্ণি জোয়ার এসে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল!
অনতি দূরে ভাসছে একটা রক্ত জবা ফুল।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন