রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

আফ্রিকান ছোটগল্প : লিগ্যাল এলিয়েন

রুতানগাই ক্রিস্টাল বুতুনগি

অনুবাদ: মনোজিৎকুমার দাস

(লেখক পরিচিতি: রুতানগাই ক্রিস্টাল বুতুনগি বর্তমান প্রজন্মের আফ্রিকান লেখিকা।আফ্রিকান উগান্ডিয়ান লেখিকা রুতানগাই ক্রিস্টাল বুতুনগি এর লেখাপড়া ইউনির্ভাসিটি অফ স্টার্লি, স্কটল্যান্ডে। তিনি বুক লাভার হিসাবে বিশেষ ভাবে খ্যাত। তিনি তিনি কমনওয়েলথ স্কলারসিপ লাভ করেন। তিনি আফ্রিকান রাইটারস ট্রাস্ট এবং ব্রিটিশ কাউন্সিল , উগান্ডা ইত্যাদি সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। রুতানগাই ক্রিস্টাল বুতুনগি এর ইংরেজি ভাষায় লেখা ‘লিগ্যাল এলিয়েন’ গল্পের ভাষান্তর করা হল।)


আমার গোত্রের মানুষ হওয়ায় রিসিপশনিস্ট কনসাল্টেশন ফি নিতে চাইবে না এটা আমি মনে করি না। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির কথা ভাবলাম। এখানে স্মল টাউন নামে একটা ক্লিনিক আছে। আমি একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তারের রিসিপশনিস্টের কাছে যাচ্ছি চিকিৎসা সুবিধা লাভের জন্য সেখানে যাচ্ছিলাম । নির্ধারিত ফরমের জন্য আমি দিনটা অফিসে অফিসে দৌড়াদৌড়ি কাটিয়েছি। চেক আপের জন্য আমাকে একজন ডাক্তার কাছে যেতে হবে। চেক আপের পর মেডিক্যাল ফরমটা অ্যাপ্রুভ করে সিল দিয়ে নিতে হবে। মেডিক্যাল চেক আপের জন্য কনসাল্টেশন ফি জমা দিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা । রিসিপশনিস্ট ফরমে আমার নামের প্রতি তাকিয়ে বলল,“ ওহ, তুমি আমাদের গ্রাম থেকে এসেছ! কেন তুমি এতক্ষণে তোমার উপাধি বলনি। তোমাকে যতটা পারি খাতির করতাম।” তারপর রিসিপশনিস্ট মেয়েটি আমাদের ভাষায় আলাপ করতে থাকল। “ যদি তুমি আমাকে বলতে তুমি কোথা থেকে এসেছ, তবে এত বেশি কনসাল্টেশন ফি তোমার কাছ থেকে চাইতাম না।

প্রকৃতপক্ষে, আজ ভালই আয় হয়েছে , আগে বললে কাজ হতো। একটু অপেক্ষা করো রোগীটা বের হয়ে এলে তুমি তোমার চেক আপের জন্য ভেতরে যাবে। ”সে এ কথাটা ইংরেজিতে বলল। পরে সে আবার আমাদের ভাষায় কথা বলতে থাকল।

.আমি তাকে জানাতে সাহস করলাম না যে সে যা বলছে তার একটা শব্দও আমি বুঝছি না I আমি তার কাছে প্রকাশ করলাম না যে ১৯৯৩ সালে আমি শিশু অবস্থা থেকেই আমি আমার মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত হই।

বাবা আমাকে ক্লাসরুমে রেখে আসার পর শিক্ষক আমাকে ক্লাসরুমে এলে আমি আমার কান্না থামাতাম। ক্লাসরুমটা ছিল খুব বড়সড়! এক শতেরও বেশি ছেলেমেয়ে ক্লাসে ছিল। সবার বসার মত ক্লাসে বেঞ্চ ছিল না। দেওয়াল গুলো অপরিষ্কার। ক্লাসে কোন কাপবোর্ড নেই, শিক্ষকদের ডেক্স নেই। সামনের দিকে একটামাত্র যেনতেন প্রকারের ব্লাকবোর্ড, ওখানকার সব কিছুই পুরনো। ক্লাসরুমের পেছনে ব্যাগ গাদি করে রাখা। মেঝেতে কার্পেট নেই। আমি লোকটা দিকে তাকিয়ে অনুমান করলাম তিনিই আমাদের ক্লাস টিচার। বাবা আমাকে রেখে আসার সময় বাবা তাকে মি. মুহাঙ্গাজাইমা বলে সম্বোধন করে বললেন,“ আপনাদের ফ্রিজ কোথায়?”

বাবার কথা শুনে ছেলেমেয়েরা হাসাহাসি করতে শুরু করল। আমি আমার কান্না শুরু করলাম। মি. মুহাঙ্গাজাইমা মাথা নিচু করে শান্ত কন্ঠে বললেন,“ এটা একটা ক্লাসরুম। আমরা ক্লাসরুমে ফ্রিজ রাখি না। আমাদের স্কুলের ক্যান্টিনে শুধুমাত্র একটা ফ্রিজ আছে।

আর সেটা আছে কিচেনে। “ তাহলে বিরতির সময়ের জন্য স্ন্যাক্স আমি কোথায় রাখব?” “ ক্লাসরুমের পেছনের দেওয়ালের হুকে ওইগুলো রাখ।” তিনি আমাকে ক্লাসের পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে একটা হুক থেকে একটা ব্যাগ টান দিয়ে মেঝেতে টেনে ফেলে দিয়ে আমার ব্যাগটা সেখানে রাখলেন। নতুন পরিবেশের সম্বন্ধে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।

অস্ট্রেলিয়াতে আমার গ্রেড ২ ক্লাসে পড়াকালে আমাদের ক্লাসে বত্রিশ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। আর সেটা ছিল পুরো স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্লাস। বিরতির সময়ে স্ন্যাস্ক খাবার জন্য প্রতি ক্লাসে একটা করে ফ্রিজ ছিল, আর সেগুলো প্রয়োজনে গরম করে নেওয়ার জন্য একটা করে মাইক্রেওভেন ছিল। আমার অস্ট্রেলিয়ান ক্লাসের মেঝেয় কার্পেট বিছানো ছিল। লেখালেখি করার জন্য টেবিলের পর টেবিল সাজানো ছিল। এ্যালজেবরা শেখার জন্য লাল ও নীল বিল্ডিং ব্লক ছিল টেবিলে সাজানো থাকতো। ছবি আঁকার জন্য একটা পেন্টিং কর্ণার একটা ইমাজিনারি কর্ণার, আর বিকালের দিকে একটু ঘুমিয়ে নেবার জন্য একটা স্লিপিং কর্ণার ছিল। আর আমরা এখানে আমাদের ইচ্ছে মত জামা কাপড় পরতে পারতাম। আমাদের আগের স্কুলটা এটার মত ছিল না, ওখানে আমি আমার মোজা পরতাম , যা টানলে হাঁটু পর্যন্ত আসতো।ওখানে সবুজ আর সাদায় মিশানো চেকের পোশাক পড়তাম।

মি. মুহাঙ্গাজাইমা আমাকে ক্লাসরুমের পেছনের দিকে একটা বেঞ্চে বসালেন। ওই বেঞ্চটাতে পাঁচটা ছাত্রী বসে ছিল।

“এ হচ্ছে ডেইজী, ও খুব ভাল মেয়ে।” তিনি বললেন ঠোঁট চিকন একটা মেয়ের পাশে আমাকে বসিয়ে তিনি আরো বললেন,“ ও তোমার বন্ধু হবে।” তিনি তার মনের হাসি চেপে ওখান থেকে চলে গেলেন। আমি ওখানে বসলাম।

সম্ভবত পরের বারে আমি এমন জায়গায় যাব যেখানে লোকদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে পারব। প্রথমদিন আমি স্কুলে গিয়ে এমনটাই ভেবে ছিলাম। তারপরের গল্প ডেইজিকে নিয়ে, এক সময় অন্য বেঞ্চ থেকে হাসি ঠাট্টা শুরু হল। মেয়েটি তার বইয়ের দিকে তাকিয়ে বোর্ডে মি. মুহাঙ্গাজাইমা এর লেখা অংক তুলে কসতে লাগল। আমি কখনোই পনেরো সঙ্গে বার যোগ করতে পারি না বিল্ডিং ব্লক ব্যবহার না করে।

প্রত্যেক বারে আমি ডেইজির কাছ থেকে জানার জন্য জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করি। সে একটু একটু করে আমার থেকে দূরে থাকছিল। সে যেন আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইছিল না ।আমি বুঝতে পারলাম আমাকে একটা বাধার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল।

আমি আমার কথা থামিয়ে রিসিপশনিস্ট এর দিকে তাকালাম। আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সে তার ডেক্সের সামনের ডান দিকে ওয়েটিং এরিয়াতে বসতে দিল।

এটা ২০১১ সাল। আমি এখনো অনুভব করি প্রতিবন্ধকতা ছিল । সে আমাকে কি বলছে? আঠারো বছর আগের কথা আমি এখনো অনুভব করি আমার ক্লাসমেট মেয়েরা আমার থেকে দূরে ছিল। এই বাধার কারণে আমি নির্দিষ্ট সোশাল সার্কেলসকে ভাঙতে পারি না। আমি লোকজনের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা নিজেদের সংঙ্কুচিত করে বলল,“ হ্যালো”, ডেইজী আমার থেকে দূরে টেনে নিয়েছিল এবং আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল কারণ তারা আমাকে বুঝতে পেরেছিল না কিংবা আমি লোকজনদের দূরে ছিলাম কারণ আমিও লজ্জিত ছিলাম নিজেকে প্রকাশ করতে কারণ আমি তাদেরকে বুঝতে পারিনি।

এখন রিসিপশনিস্ট থেকে নিজেকে লুকিয়ে থাকতে আমি ইচ্ছা করলাম । যদি সে আমার সঙ্গে আলাপ করতে চায় তবে আমি কি আমাদের ভাষায় কথা বলতে পারব? এখনো সে কি আমাকে গ্রামবাসী কিংবা সে কি আমাকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আমাকে কনসাল্টেশন ফি ফেরত দিতে চাচ্ছে? আমি অনেক অনেক বাধাকে প্রতিরোধ করেছি, শিক্ষালাভের বাধা,লিঙ্গ বৈষম্য, কিন্তু ভাষার বাধা ছাড়া কোনটাই আমাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। কেউই উপলব্ধি করতে পারে না একজন মহিলা তার অধিকারের জন্য লড়াই করে, কিন্তু কম মানুষই হৃদয়ঙ্গম করতে পারে কেমন করে একজন তাদের নিজের ভাষা শিখতে ব্যর্থ হতে পারে।

সে সময় অনেক রোগী ভেতরে গেল। তখন রিসিপশনিস্ট তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাদের কাছ থেকে বেশি পরিমাণে কনসাল্টেশন ফি আদায় করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। একজন রোগী কেনিয়ান ভাষার টানে বলছে। প্রত্যেকেই বুঝতে পারে কেন মহিলাটি উগান্ডার ভাষায় কথা বলতে পারে না।

শিক্ষিকা ছিলেন রোগা পাতলা ও লম্বা। তিনি ক্লাসের সামনে এসে বললেন,“ সুপ্রভাত” “ সুপ্রভাত মিস নাকানওয়গি!” ক্লাসের প্রত্যেকেই তাকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশে উঠে দাঁড়াল। “ ভাল আছ তো সবাই। বস তোমরা। নতুন মেয়েটি কোথায়?” প্রত্যেকেই পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। “ ওহ! তোমার চুল এখনো কেটে দেয়নি? এত লম্বা চুল নিয়ে তোমাকে ক্লাসে আসবার জন্য হেডমাস্টার অনুমতি দিয়েছেন?”আমি এতক্ষণ যে লক্ষ করিনি কোন মেয়ের মাথায়ই চুল নেই। শিক্ষিকা ক্লাসের সামনে বসা একটা ছেলেকে তার সিট থেকে তুলে আমাতে তার সিটে বসতে বললেন। সামনের বেঞ্চে এসে, আমি অনুভব করলাম, আমার পেছনে বসা ছেলে মেয়েরা আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লেশনের মাঝামাঝি, আমি নিজেকে নির্বোধ বলে অনুভব করতে শুরু করলাম , কারণ আমি কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিলাম। শিক্ষিকা পৃথিবীর প্রথম মানুষ ‘মুন্তু’ এবং ‘সেরা’ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছিলেন এবং তারপর গিপির ও লাবোঙ সম্বন্ধে কিছু গল্প বললেন। তারপর তিনি পৃথিবীর আকার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। পরিশেষে, আমি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য হাত তুললাম। আমি সঠিক ভাবে প্রশ্নটার উত্তর জানতাম। “ হ্যাঁ নতুন মেয়েটি, দাঁড়িয়ে আমাদের কাছে উত্তর দাও। “ পৃথিবীটা গোলাকার।” আমি উচ্চকন্ঠে বলে উঠলাম। ক্লাসের সবাই আমার উত্তর শুনে হট্টহাসি করে উঠল।

আমার নতুন ক্লাসমেটরা আমার উচ্চারিত উত্তর বুঝতে না পারা পর্যন্ত শিক্ষকা আমাকে বললেন, “ পুনরায় বল!” আমি পুনরায় উত্তর না দিয়ে হতাশ হয়ে বসে পড়লাম। এতে সবাই আমাকে ঠাট্টা করতে লাগল। বিরতির পর আমি স্বস্তিবোধ করলাম। আমার ইচ্ছে হল ক্লাস থেকে স্কুলের অন্য কোথায় গিয়ে লুকাই। খেতে যাওয়ার আগে আমি ক্লাসের বারান্দায় বসে শিক্ষকদেরকে ধন্যবাদ জানাতে গেলাম। তাদেরকে ধন্যবাদ জানানোর পর শিক্ষকদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিল। শিক্ষকদের মাঝ থেকে একজন বললেন,“ ওহ, মেয়েটা দেশের বাইরে থেকে এসেছে , তাই এখনো এত ভদ্র আচরণ।“ আপনি কি বলতে চাচ্ছেন এখানকার লোকজনের আচারণ খারাপ?” মি. মুহাঙ্গাজাইমাকের কথা শুনে আমার মনে হল তিনি দয়ালু ও অমায়িক। তিনি বললেন“ অন্যান্য ছেলেমেয়েদের দেমাকই আলাদা, কিন্তু এই মেয়েটিকে দেখেছেন সে আমাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছে।”

আমি বসার জন্য একটা জায়গা খুঁজছিলাম। সব ছেলেমেয়েরা আমাকে তাচ্ছিল্য করে আসছিল বলে আমার ইচ্ছে ছিল মি. মুহাঙ্গাজাইমাকের সঙ্গে থাকার, স্কুলটি ছিল খুবই বড়। স্কুলের মেইন গেটের চারপাশ ঘুরিয়ে রাস্তাটি চলে গেছে। রাস্তার বা’দিকে লোয়ার প্রাইমারী সেকশন। স্কুলের বাকি অংশটা রাস্তার ডান দিকে। এর মাঝে স্কুল কিচেন, প্রশাসনিক ভবন, মেইন হল এবং স্টাফ রুম। প্রত্যেক ক্লাসে পাঁচ সেকশন: এন.পিএস. কে এবং ইউ, যা নেওয়া হয়েছে এন – একাসেরো , পি- প্রাইমারী , এস- স্কুল কে- কামপালা , ইউ- উগান্ড।

বাবা এবং আমি সেদিন সকালে হেডমাস্টারের মুখোমুখি হলে হেডমাস্টার জিজ্ঞেস করেছিলে হলুদ, নীল, লাল, সবুজ এবং সাদার মধ্যে আমি কোন রঙটা পছন্দ করি। “ সবুজ “, আমি বলেছিলাম, কারণ অস্ট্রেলিয়ার স্কুলেও আমি ছিলাম সবুজ হাউসে। সুতরাং তিনি আমার জন্য স্কুলে সবুজ হাউস এর পি,৩ কে বরাদ্দ করলেন । সুন্দরভাবে স্কুলটি ডিজাইন করেছিলেন , কারণ ক্লাসগুলো পাঁচটাসেকশনে পাঁচটা করে ক্লাসরুম তৈরি করা হয়েছে।

মায়ের প্যাকেট করে দেওয়া ব্রেড ও কেক খেতে শুরু করলাম। তরপর আর একটা ছেলের সঙ্গে ডেইজী আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,“ ওয়াম্মা , তুমি কি এডাই মারফির সঙ্গে কথা বলেছিলে?”

“ এডাই মরফি কে?” আমি জবাবে বললাম।

“ আমেরিকা থেকে ফিরে এসে সে যেন অভিনয় করে যাচ্ছে।” “ আমি এডাই মারফিকে চিনি না। আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি, আমেরিকা থেকে নয়।” ডেইজির সঙ্গের ছেলেটি বলল,“ তোমার বাবা তো একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান! তোমাকে এখানে নিয়ে আসবার সময় তোমার বাবাকে দেখেছি, এমনকি তাকে আমেরিকানদের মতো কথা বলতেও শুনেছি।”

“ না, আমার বাবা উগান্ডান, কিন্তু আমরা অস্ট্রেলিয়াতে থাকতাম।”

“ আমিও তো তোমাকে সেটাই বলেছিলাম। ”

ডেইজী এ কথাটা বলে ছেলেটির সঙ্গে মিলে যুক্তি দেখাতে শুরু করল। তারপর সময় গড়িয়ে যেতে থাকল।

ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষিকা ছিলেন রাগী স্বভাবের। তিনি আমার বেঞ্চের সামনে । তিনি আমার হোমওয়ার্ক চাইলে আমি তা দিতে পারলাম না, ওইটা ছিল আতা উগান্ডা স্কুলের প্রথম দিন; আসলে আমার কোন হোমওয়ার্ক দেওয়া ছিল। শিক্ষিকা যে ভাবে ক্লাসের ছেলেমেয়েদের হোমওয়ার্কের জন্য হেনস্তা করছিলেন তাতে আমি চাইলাম না তার মুখোমুখি হতে , কিন্তু তার থেকে দূরে থাকা আমার সম্ভব হল না, আমার মনের মধ্যে ভয় দানা বেঁধে উঠল আমার বেঞ্চের চারজনের হোমওয়ার্ক্ চাওয়ার আমার পালা এলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস বললেন,“ তোমার হোমওয়ার্ক কোথায়?”

আমি জানতে চাইলাম,“ আমার—”

“ ননসেন্স ! তোমার হোমওয়ার্ক ? আমি তার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে তিনি আমার গালে একটা চড় মেরে বললেন,“ তুমি শুনতে পাওনি তোমাদের বেঞ্চের সবাইকে হোমওয়ার্কের খাতা খুলতে বলছি-”

ক্লাসের সবাই এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠল যে আমি তাদের ক্লাসের নবাগত । আজই প্রথম ক্লাসে এসেছে। তাদের কথা শুনে, “ ওহ , দু:খিত।” বলে তিনি পরের জনের দিকে গেলেন। আমি সুপারম্যান হওয়ার চেষ্টা করার জন্য একটা কাপবোর্ডের উপর থেকে লাফ মেরে হাঁটু ভেঙে গেছে বলে মরার ভান করলে মায়ের হাতে থাপ্পর খাওয়া ছাড়া আর কখনো এমন থাপ্পর খাইনি।

শিক্ষিকা একই সময়ে ভয়ঙ্কর, রাগী এবং খোসমেজাজী , ফলে তিনি আমাকে থাপ্পর মেরে ভয় পেয়ে গেলেন। আমার মনে প্রশ্ন জাগল কেন একজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রহার করবে?

অস্ট্রেলিয়াতে একজন শিক্ষক একবার একটা শিশুকে আঘাত করায় সেই শিক্ষক গ্রেফতার হয়েছিলেন। সেখানে শিশুদের মারধর করা নিষিদ্ধ, এমন কি মা বাবারাও। পিতামাতা তাদের ছেলেমেয়েদের মারধর করতে পারে অস্ট্রেলিয়াতে ভাবাই যায় না। একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি অস্ট্রেলিয়ার বাড়িতে থাকাকালে কখনো বাড়ির বাইরের অকর্মণ্য লোকেদেরকে পুলিশের মারধরের শব্দ শুনিনি।

রিসিপশনিস্ট অন্যান্য রোগীদের কাজ শেষ করে আমার দিকে নজর দিল। মহিলাটির হাবভাব লক্ষ করার পর আমি বুঝতে পারলাম তিনি চলমান দাঙ্গা সম্বন্ধে কিছু বলতে চাচ্ছে। মুয়াম্মার গাদ্দাফি মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের প্রেসিডেন্টের মনেও চিন্তা দেখা দেয়। এ কারণে প্রত্যেক সোমবারে তারা ‘ ওয়াক টু ওয়ার্ক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বৈঠক করতে লাগে। বিরোধী দলগুলোর সদস্য ও পার্লামেন্টিরিয়ানরা তাদের অফিসে নিয়মত যেতে লাগলেন। শহরের অকর্মন্য লোক ও শ্রমিকরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জয়ধ্বনি দিত কিংবা জনতার সঙ্গে যোগ দিত। প্রত্যেক সোমবারে পুলিশ ও আর্মি টহল দিয়ে টিয়ার গ্যাস ছুড়তো এবং জনতার উপর গোলাপী রঙের জল স্প্রে করতো। সে সময় দোকারদাররা কয়েক ঘন্টার জন্য চুরিচামারির ভয়ে দোকান বন্ধ রাখে যে পর্যন্ত না বিক্ষোভকারীরা গ্রেফতার হয়, তারপর জামিনও পেয়ে যায়।‘ ওয়াক টু ওয়ার্ক ‘ ক্যাম্পেন ব্যবসায় ক্ষতি করায় ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ করে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা ধর্মঘটের ডাক দেয় কারণ লেকচাররা ক্যাম্পেনে যোগ দিয়ে তাদের পড়ানো থেকে বিরত থাকে। এ অবস্থা মাসের পর মাস চলতে থাকে। মেডিক্যাল ওয়ার্কার, টিচার এবং আইনজীবীরাও ধর্মঘটে যায়।

আমি বাড়িতে একটা রুটিন মেপে নিরাপদে থাকতে অভ্যস্ত হলাম। কিন্তু এই সপ্তাহেই পেপারগুলো পাঠানোর তারিখ। সূর্য ওঠার পূর্ব মুহূর্তে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় বের হওয়ার আগে আমি একখানা একটি ট্যাক্সি নিলাম। আমি সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে জ্ঞানীর মতো কাজ করেছিলাম, কারণ ওই সময় শহরে গন্ডগোল ছিল না। বিকেলের দিকে আমি সাহস করে শহরের অফিসগুলোতে গেলাম, তখন সেখানে বিশৃঙ্খলা চলছিল। কমার্শিয়াল বিল্ডিংগুলোর টয়লেটে লোকজনে ভরা , আমিও সেখানে লুকিয়ে আমার চোখদুটো থেকে টিয়ার গ্যাস ধোয়ার জন্য একটা ট্যাপ খুলে চোখে পানির ছিটা দিলাম । প্রত্যেকেই অফিসগুলোয় ছিল, কারণ তারা টিয়ার গ্যাসে আচ্ছন্ন রাস্তায় বের হতে সাহস করেনি।

আমার মেডিক্যাল ফরম ছাড়াও আমার সব কিছুতে সইসাবুদ করাতে হবে। আমাদের ফ্যমিলি ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি পার্কে যাওয়ার কোন উপায় দেখছিনা। সন্ধ্যা না নামার আগে তারা দাঙ্গাহাঙ্গমা থামিয়ে ফিরবে না। তাই আমি প্রথমে টাউন ক্লিনিকে অপেক্ষা করাই নিরাপদ মনে করেই ওখানে প্রবেশ করি। আমি এখন রিসিপশনিস্ট এর বকবক করা মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, আমাদের সত্য মিথ্য কথোপথনে বিঘ্ন ঘটল একদল লোক নার্সিং করার জন্য একটা রক্তাক্ত শিশুকে নিয়ে রিসিপশনে হাজির হল। আমি বুঝতে পারলাম না শিশুটির কপাল থেকে না চোখ থেকে ব্লিডিং হচ্ছে। শিশুটির নাক থেকে বের হওয়া শ্লেষা রক্তের সঙ্গে মিশে শিশুটির মুখের বা’দিকটা একাকার হয়ে গেছে। শিশুটির মা কান্নাকাটি করছে। আহত ছোট্ট মেয়েটির চেয়ে তার মাকে বেশি ভীত দেখাচ্ছিল। সে মেয়ে এ অবস্থার জন্য ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদচ্ছিল। বালিকাটির বয়স বছর আটকে হবে। তাকে তাড়াতাড়ি করে এমার্জেন্সি রুমে নিয়ে গেল। আমি ভাবলাম ভীতিকর দৃশ্যেও রিসিপশনিস্ট শেষ পর্যন্ত নীরব ছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। আসলে তিনি আহত মেয়েটির বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আমি ভাবলাম , তিনি হয়তো মহিলা ও মেয়েদের কান্না থামাতে বলছিলেন। আমি সেদিন আমার ইংরেজির ক্লাসটাতে সময় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নীরবে কেঁদেছিলাম।

আমিনের যে গল্পগুলো আমি শুনেছিলাম সে সম্বন্ধে আমার ভাবার সুযোগ করে দিলেন । প্রেসিডেন্ট আমিন আর প্রেসিডেন্ট নেই এ কারণে আমাদের উগান্ডাতে ফিরে এলাম বাবা বলেছিলেন। এইচ.ই. মুসেভেনি শান্তি ফিরিয়ে আনলেন তাই আমাদেরকে নির্বাসনে আর থাকতে হল না। যদি আমিনের এমনটা ঘটতো, তবে আমি আমার দেশে ও নতুন স্কুলে আসার অভিজ্ঞতা লাভ করতাম না। আমার বড় বোনেরা সিডনিতে আরো কয়েক বছর থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা বললেন,“ মৃত্যু যখন আসবে তখন তা নিজের দেশেও আসতে পারে বাইরে থাকলেও আসতে পারে।” তিনি গত দু’বছর অর্থকড়ি উগান্ডায় পাঠিয়েছিলেন আমাদের জন্য একটা বাড়ি তৈরির উদ্দেশে। অস্ট্রেলিয়াতে থাকাকালে বাবা টিচারস’ট্রেনিং কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন, মেকারেরে ইউনিভার্সিটি বাবার একটা বড় চাকুরির অফার দিলে তা তিনি ফিরিয়ে দেন।

আমি ভেবেছিলাম উগান্ডাতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।, বাবাও এমনটাই ভাবছিলেন।কিন্তু পরিবর্তে , ইলিশ টিচার আমাকে থাপ্পর মারলেন। আমি মন:স্থির করলাম আমি আর কখনোই স্কুলে ফিরে আসব না। কিন্তু শিক্ষিকা তার ক্লাস শেষ করে যাওয়া মাত্র আমাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আমাকে ঘিরে বসে সরি বলে আমাকে মিষ্টি খেতে দিয়ে আমাকে বলল কীভাবে তারা সবাই মারধরের শিকার হয়েছে।। হঠাৎ করেই আমি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। ছেলেমেয়েরা আমার সঙ্গে কোন কথাই বলতে সাহস করল না। সেই থেকে আমার দেশ উগান্ডাতে আমার কাজ শুরু। প্রথম দিকে উগান্ডা ছিল ভয়ঙ্কর যখন আমরা এখানে তিন সপ্তাহ আগে পৌঁছানোর আগ থেকে উগান্ডার স্কুল ডে শুরু হয়। আমাদের গলিতে দু’দিন বিদ্যুত ছিল না। তারপর বিদ্যুত এলেও প্রত্যেক রাতেই বিদ্যুত থাকত না। আমাদের উগান্ডাতে দুটো টিভি সেন্টার ছিল: ইউটিভি এবং সিটিভি। ওই দুটো টিভি স্টেশনের মধ্যে মাত্র পাঁচটা কার্টু্ন; পিঙউ, সুপারবুক, কিস্সিফার ,ডাক টেলস এবং ডিডি। তবে ডিডি কার্টুন ছিল ক্লাউনের কৌতুকে ভরা।

অস্ট্রেলিয়াতে, বছরে এক কিংবা দু’বার গিয়েছিল।পাওয়ার না থাকার তারিখ কমপক্ষে ছয় মাস আগে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল। সেখানে টিভির দুটো চ্যানেলে রাত দিন সারা ক্ষণ কার্টুন চলতো। আর উগান্ডার টিভিতে শুধুমাত্র ছুটির দিনগুলোর সন্ধ্যায় কার্টুন দেখানো হয়। এ কারণে আমি আমার উইকএন্ড কাটাতাম এবং প্রতিবেশিদের সঙ্গে শিখতাম কীভাবে কেওয়েপেনা(ডজবল) খেলতে হয় এবং ডুল ( মার্বেল ছোড়া)

তারপর থেকে বছরের পর বছর ধরে অনেক কিছু শিখেছিI কীভাবে বয়স্কদেরকে হাঁটু গেড়ে সম্মান জানাতে হয় তা আমি শিখেছি। আমি শিখেছি কীভাবে কলার খোসা ছড়াতে হয়। আর শিখেছিলাম যে সময় বিদ্যুত ছিল না সে সময় আমি কয়লা কিংবা কাঠের কয়লা দিয়ে জামা কাপড় ইস্ত্রি করা। আমার স্কুল ইউনিফরমের নিচে তিনটা সর্ট, তাতে শিক্ষকদের বেত্রাঘাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আমি উগান্ডার ওয়াইনো মার্কেটে দামাদামি করে জিনিস পত্র কিনতে হয়। কেমন ভাবে কেওয়েপেনা(ডজবল) কিনতে হয় তাও জানলাম।

আমার কথায় এখন আর অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণ নেই। আমার বন্ধুবান্ধবরা আমাকে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। তারা অট্রেলিয়ান ও আমেরিকান উচ্চারণের পার্থক্য জানত। তারা জানত বিদেশে প্রত্যেক উগান্ডান টয়লেট এবং হাসপাতালের বেডপ্যান পরিষ্কার করে না। তারা জানত না যে বিদেশ থেকে আসা প্রত্যেক শিশু কিছু নষ্ট করে না। গাছেও চড়ে না। প্রকৃত পক্ষে, বুলাআয়া থেকে আসা শিশুরা তাদের সৌখিন খেলনা নিয়ে খেলতে ভালবাসে। তারা জানত যে কারো সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলা বিফলে যায় তাদের ক্ষেত্রে যারা বিদেশী উচ্চারণে জীবনের প্রথম নয় বছর ইংরেজিতে কথোপকথন করে।

প্রকৃত পক্ষে আমরা উগান্ডাতে ফিরে আসার পর অসংখ্যআত্মীয় স্বজন আমাদের বিখ্যাত বাড়িতে কয়েক বছর অবস্থান করে। আমি সম্ভবত লুগান্ডা ভাষায় এখন সামান্য বলতে পারি।আমরা লুগান্ডা ভাষায় বলি এই কারণেই যে লুগান্ডা আমাদের মাতৃভাষা। বাবার নতুন চাকুরী রাজধানী শহর বুগান্ডল্যান্ডতে। দেশের প্রত্যেকটা ট্রাইব যখন এখানে বাস করার সময় লুগান্ডান ভাষা শিখে নেয়। এ। তাদের প্রত্যেকেই কিন্তু তাদের নিজের ভাষাও জানত।.আমার মতো অল্প কয়েকজন কিন্তু আমাদের গ্রামগুলোতে বছরে দু’এক বার গিয়েছি। আর আমাদের মতো মানুষই কথাবার্তা বলতে সংকটে আছি। প্রত্যেক সময়ই কেউ না কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,“ তুমি তোমার নিজের ভাষা বলতে পার না!” কিন্তু আজ , আমি নিজের মাতৃভাষায় কথা বলছি। আমি এখন আমাদের মাতৃভাষায় রিসিপশনিস্ট এর বকবানি শুনছি।ব্যয় বহুল কনসাল্টেশন ফি ছাড়াই আমি ডক্টরের রুমে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে স্বস্তিবোধ করে অল্প হাসলাম। তারপর ডাক্তার আমার মেডিক্যাল ফরম পূরণ করে তাতে সিল মোহর দিলেন । এখন আমাকে আমার মেডিক্যাল ফরম এবং অন্যান্য পেপার অ্যামবেসিতে জমা দিলাম। কয়েক দিন পরে তারা আমাকে ডাকল এবং আমাকে অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার ডিগ্রি নেওয়ার জন্য ভিসা দিল।


অনুবাদক পরিচিত
মনোজিৎকুমার দাস
অনুবাদক। গল্পকার। মাগুরা, বাংলাদেশ। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন