রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

বই নিয়ে আলাপ । আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা: স্বপ্নপাঠের বৃত্তান্ত

লেখার চরিত্র,ভাষার গঠন,গল্প বলার ধরনেই ঠিক করে দেয়,আপনি লেখাটি কীভাবে পড়বেন।কিছু বই খুব দ্রুত পড়তে হয়।সেক্ষেত্রে বইটিই আপনাকে দ্রুত পড়িয়ে নেয়।আর কিছু বই আছে যেগুলি আপনি আস্তে আস্তে পড়বেন কারণ তাড়াহুড়ো করলে আপনার পাঠের ক্ষতি হবে।আপনি রসগ্রহণ করতে পারবেন না । আপনি পাঠ থেকে হারিয়ে যেতে পারেন।আপনি পাঠের সেই স্তরে পৌঁচ্ছাতে পারবেন না যে স্তরে পৌঁচ্ছালে আপনার লেখাটি হৃদয়গম হবে। খোয়াবনামা হল তেমনই একটি বাংলাভাষায় রচিত মাস্টারপিস।আপনাকে আস্তে আস্তে পড়তে হবে এবং লেখাটিকে বোঝার জন্য সময় দিতে হয়।এই লেখার প্রতিটি লাইন মনোযোগ দাবী করে, দুবার তিনবার পড়তে হয়,নাহলে আপনি বিরক্ত হবেন এবং ফরস্বরুপ আপনি বইটি না পড়ে রেখে দিতেও পারেন। এই লেখা জীবনের গভীরে গিয়ে জীবন দ্যাখে এবং দেখায়।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখিত উপন্যাস সংখ্যা দুই।চিলেকোঠার সেপাই তাঁর প্রথম উপন্যাস।প্রায় দশ বছর পর লেখেন খোয়াবনামা ।দুটি উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রেই তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট সময়কে বেছে নিয়েছেন।চিলেকোঠার সেপাই ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়কালকে ধরেছে।অথাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের সময়কাল। ঢাকা শহর পটভূমি। খোয়াবনামার সময়কাল কখন? বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বাংলা অথাৎ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও তার দুটুকরো হওয়ার সময়কাল। অকালের আকাল এখনো গত হয়নি বাংলাদেশের গতর থেকে।উপন্যাসের এখানে ওখানে আকালের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে।সেই উপমহাদেশের অস্থিরতার সময়কালে বাংলা নামের একটুকরো ভূখণ্ড তার গ্রাম তার মফস্বল কেমন ছিল? বড় শহর নয়,গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকা শ্বাস প্রশ্বাস,বাদ বিবাদ,হাগা মুতা,মুখের ভাষা,হিন্দু মুসলমান, দাঙ্গা ও দাঙ্গা পরিস্থিতির উত্তেজনা,দেশভাগ ও স্বাধীনতা কথা আসে এই আখ্যানের গভীর শরীরে।

খোয়াবনামা একটি অত্যন্ত জটিল আখ্যান। গল্প বলার সহজ পন্থার ধােরকােছও এই আখ্যান হাঁটাহাঁটি করে না। বাক্য গঠনের সময় ইলিয়াস অনেক কথা একসঙ্গে বলেন। ফলে একটি বাক্য কিছুটা বড় হয়ে যায় এবং সেইটি মাঝে মাঝে দুইতিনবার পড়ে উদ্ধার করতে করতে এগোতে হয়। গ্রামীণ মিথ,প্রাচীন গল্পকথা এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্য এই আখ্যানের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উপন্যাস শুরুই হয় সেরকম একটি মিথ দিয়ে। "পায়ের পাতা কাদায় একটুখানি গেঁথে যেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গলার রগ টানটান করে যতটা পারে উচুঁতে তাকিয়ে গাঢ় ছাই রঙের মেঘ তাড়াতে তমিজের বাপ কালো কুচকুচে হাত দুটো নাড়ছিলো,ঐ জায়গাটা ভালো করে খেয়াল করা দরকার। অনেকদিন আগে,তখন তমিজের বাপ তো তমিজের বাপ,তার বাপেরেও জন্ম হয়নি,তার দাদা বাঘাড় মাঝিরেই দুনিয়াতে আসতে ঢের দেরি,বাঘার মাঝির দাদার বাপ না-কি দাদারেই জন্ম হয়েছে কি হয়নি,হলেও বন কেটে বসত-করা-বাড়ির নতুন মাটি ফেলা ভিটায় কেবল হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে, ঐসব দিনের এক বিকালবেলা মজনু শাহের বেশুমার ফকিরের সঙ্গে মহাস্থান কেল্লায় যাবার জন্যে করতোয়ার দিকে ছোটার সময় মুনসি বরকতুল্লা শাহ গোরা সেপাইদের সর্দার টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে পড়ে গিয়েছিল ঘোড়া থেকে।" তমিজের বাপ।ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন। স্বপ্নের ভিতর অতীত। তমিজের বাপ ঘুমতে ঘুমতে হাঁটে।হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় কাৎলাহার বিল।আর এই বিলের কিৎসা শোনান লেখক। তমিজের বাপ যেন নিজেই নিজেকে শোনায় সেই কাহিনী। এই বিলকে জড়িয়ে আছে দুটি গ্রাম।এপার ওপার।গিরিরডাঙা। নিজগিরিরডাঙা।মাঝি-চাষা-কামার এইসব মানুষের বাস। হিন্দু ও মুসলমান।কাৎলাহার বিলের গায়ে পাকুড় গাছ।এই পাকুড় গাছেই বাস বহু বহু যুগ আগে গোরা সেপাইদের হাতে মৃত মুনসি বরকতুল্লা শাহ এর।যে এই বিল ও সংলগ্ন গ্রাম দুটিকে শাসন করে।অন্তত রাত্রিবেলায় তো করেই।ইলিয়াস আস্তে আস্তে আমাদের আখ্যানের ভিতর ঢুকিয়ে দেন।আর আমরাও সেই আখ্যানের সঙ্গে সংযুক্ত একটি চরিত্রে পরিণত হই।এই উপন্যাসের লাইনে লাইনে জমে আছে রহস্য।বাস্তব-অবাস্তব-পরাবাস্তব। ম্যাজিক। এই গল্প বলা আমাদের পরিচিত পরিধির মধ্যে পড়ে না। অতিসরলিকরনের যুগে এ-এক অন্য আখ্যান,ব্যতিক্রমী আখ্যান। তাই হোঁচট খেতে খেতে এগোতে হয় আমাদের।হোঁচট খেলে অসুবিধা হয়। কিন্তু আখ্যানের ভিতর এমন এক যাদু বোনা আছে,এমন এক অস্বস্তি বোনা আছে,এমন এক অস্থিরতা বোনা আছে,এমন এক ভালোবাসা বোনা আছে যে আমরা এই আখ্যানর পিছু পিছু হাঁটতে বাধ্য হই।

তমিজ,তমিজের বাপ,কুলসম(তমিজের সৎ-মা) এরা উপন্যাসের বিশিষ্ট জায়গা জুড়ে আছে। প্রধান মানুষ এরা। চেরাগ আলি(কুলসুমের দাদা),কেরামত আলি। শরাফত মন্ডল। তার দুই পুত্র,আবদুল আজিজ ও আবদুল করিম।কালাম মাঝি।ফুলজান।ফুলজানের বাপ। বৈকুণ্ঠ গিরি।এই মানুষ গুলিই আস্তে আস্তে আখ্যানকে গতিশীল করে,আখ্যানর সমস্ত দ্বীপ গুলিকে জাগিয়ে তোলে।আখ্যান এগোয়।

কী নিখুঁত ডিটেলে ইলিয়াস এক-একটি ঘটনার কথা আমাদের বলেন।ডিটেলিং যে তোন শিল্পের মহৎ গুণ। উপর থেকে দেখা নয়,জীবনের গোড়ায় গিয়ে গল্প বলা তাঁর অভ্যাস। বিলের ইজারা নিয়েছে শরাফত মন্ডল। তাহলে মাঝিরা মাছ ধরবে কোথায়? এতএব বাপ-কাকাদের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়া ছাড়া উপায় কি মাঝিদের? কিন্তু তমিজের বাপ তো যে সে মানুষ নয়। সে এখনো মাছ ধরার স্বপ্ন দ্যাখে। মাছ ধরার স্বাধীনতা নেই বলেই কি সে রাত্রিবেলায় স্বপ্নের ঘোরে বিলের কাছে চলে যায়? বিলের ধারে হাঁটাহাঁটি করে? বিলের জলে নেমে পড়ে? তমিজ কিন্তু ঐ পথ মাড়ায়নি। মাঝির ছেলে।কিন্তু তার স্বপ্ন চাষ! সবাই তাকে ছোট করে,তমিজ চাষের বোঝেটা কি? কিছুদিন সে খিয়ারে গিয়ে চাষের কাজ করে আসে। সেখানে শুরু হয়েছে তেভাগা। শরাফত মন্ডলকে ধরে তার চাষের স্বপ্ন সত্যি হয়। কয়েক পুরুষ আগেও তারা নাকি চাষিই ছিল। ইলিয়াস ফুলজানের সাথে তমিজের প্রেম অদ্ভুত নিরাসক্ত ভঙ্গিতে প্রকাশ করেন! তমিজের জমিতে দারুন ধান হয় কিন্তু জোতদারকে ভাগ দিয়ে চাষি আর কতটুকু পায়!সে আশাহত হয় কিন্তু চাষের স্বপ্ন তার মরে না।পাকিস্থান আন্দোলন ঘরে ঘরে গ্রামে গ্রামে এসে পড়ে। সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ। তমিজের বাপ একদিন মাছ ধরতে বেরিয়ে মস্ত বাঘাড় ধরে বাঙালির মরা গাঙে

কিন্তু সে যখন ভয় পেয়ে মাছটি ছেড়ে দেয় কাৎলাহার বিলে, শরাফত তাকে দ্যাখে এবং চোর বলে প্রতিপন্ন করে। শরাফত তমিজের বাপকে খড়ম দিয়ে মারে। ফল হয় উল্টো। মাঝিরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে কেরামত আলির নেতৃত্বে যে আসলে কবি ও গায়ক,যে গান বাঁধে এবং যে তেভাগার একজন পলাতক আসামি। ফুলজানের নিরুদ্দিষ্ট স্বামী। চুরি করে মাছ ধরা এবং খুনের দায়ে জেল হয় তমিজের।

ইলিয়াস এমন একজনকে উপন্যাসের কেন্দ্রে নির্মাণ করেছেন যে আসলে খুব আচেনা মানুষ নয়। অথচ তাকে ঠিক চেনাও যায় না।অথচ তাকে চেনাটা জরুরি। তমিজের বাপ কোন কিছুতে সেভাবে না থেকেও সব কিছুতেই আছে। সাধারণ মানুষের ঈশ্বর চিন্তার মতো। সে খেয়ালখুশি মতো চলে,কাউকে পরোয়া করার মানুষ সে নয়। সে দুবার খেতে বসে যায়,খাবার হজম না হলে হাগতে বসে যায় কবরখানার বাঁশঝাড়ে। রাত্রে হেঁটে হেঁটে ঘোরাঘুরি করে, স্বপ্নের মধ্যে এই হাঁটা কিংবা বিলে নেমে পড়া। কোন কিছুই যেন তমিজের বাপ সচেতন ভাবে করে না। তমিজের বাপকে এভাবে নির্মাণ করায় এক আশ্চর্য গল্পরীতির জন্ম হয়। এই গল্পের ম্যাজিক রিয়েলিজমের উৎস আসলে যেন তমিজের বাপ আর তমিজের বাপ এটা পেয়েছে কুলসুমের নিরুদ্দিষ্ট দাদা চেরাগ আলির কাছ থেকে। চেরাগ আলি ছিল ফকির। মাদারি ফকির। ভিক্ষা যার জীবনযাপন পদ্ধতি।জুটলে খায় না জুটলে খায়না। কুলসুমের স্মৃতিচারণায় তার দাদা চেরাগ আলি উঁকি দেয়। কখনো বৈকুন্ঠ গিরি, কখনো তমিজের বাপের কথায়,কখনো কেরামতের কথায় আমরা জানতে পারি মানুষটির জীবনের গল্প। যমুনার ভাঙনে বাস্তুহারা চেরাগ আলি নাতনিকে নিয়ে এখানে ওখানে ঘুরতে ঘুরতে শেষে তমিজের বাপের গ্রামে এসে থিতু হয়। তমিজের বাপের সাথে কুলসুমের বিয়ে হয়। চেরাগ আলির কাছে লোকে রাত্রে দেখা খোয়াবের মানে জানতে আসতো। সেই লোক হঠাৎ কোথায় হারিয়ে যায়।

ঠিক স্বাধীনতার দিন তমিজের মুক্তি। অবস্থা ভয়াবহ। দাঙ্গা। হিন্দু-মুসলমান বিভেদ চরমে। ইলিয়াস তো এই সময়কেই বিনির্মাণ করেছেন উপন্যাসে। আমাদের দেশে স্বাধীনতা যদিওবা আসে শান্তি আসে না। শুধু কিছু সুবিধাবাদী আখের গুছিয়ে নেয়। হিন্দু মারছে মুসলমান,মুসলমান মারছে হিন্দু। দলে দলে রিফিউজি ছোট ছোট শহর গুলিতেও আসতে বাধ্য হয়। বিলের চোরাবালিতে তমিজের বাপ মারা যায়। কুলসুম ও তমিজ পরস্পরের মধ্যে স্বামী আর বাপকে খোঁজে।ইলিয়াস লেখেন, "পেটুক বাপের আধপেটা খাওয়া গতরের তাপ নিতে তমিজ হাত রাখে কুলসুমের পিঠে, তমিজের বাপ তাপ পোয়াতে তাকে নিবিড় করে টেনে নেয় নিজের শরীরে। পায়ের দুটো ঘা থেকে তার আধপেটা গতরের গন্ধ নিতে কুলসুম হাত বোলায় তমিজের হাঁটুতে আর উঁরুতে। আর তমিজের বাপ অনেকদূর কাৎলাহার বিলের চোরাবালির ভেতর থেকে তার লম্বা হাত বাড়িয়ে কিংবা হাতটাই লম্বা করে আলগোছে টেনে নেয় তমিচের তবন আর কুলসুমের শাড়ি। গরহাজির মানুষটার গায়ের ওম পেতে আর গায়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে দুজন ঢুকে পড়ে দজনের ভিতরে।"

ইলিয়াসের লেখায় কোথাও লুকোছাপার আশ্রয় নেই। তিনি আখ্যানের প্রয়োজন জানেন,জানেন বলে নির্দয়ভাবে জীবন লেখেন। মানুষের মুখের ভাষাতে যেসব গালি-গালাজ ব্যবহৃত হয়, তিনি সেসব খুব স্পষ্ট ভাবে এনেছেন। আবরণ নেই, আপোষ নেই। এখানে চরিত্রের দরকারটাই মূলকথা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। গান অথাৎ গানের কথা সমগ্র উপন্যাস জুড়েই এসেছে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং চেরাগ আলি কিংবা কেরামত আলির গানের কথাগুলি গুরুত্বপূর্ণ,দরকারি এবং অসাধারণ।

ঘ্যাগী ফুলজানকে তমিজ বিয়ে করলে একলা কুলসুমের মধ্যে কি পাগলামো দ্যাখা যায়? কুলসুমকে পছন্দ করলেও সেই পছন্দের কথা তাকে কখনোই বলতে পারবে না কেরামত বা বৈকুন্ঠগিরি! আরো একদিন মাছ ধরা নিয়ে গন্ডগোল হয়। মাঝিদের কালাম মাঝি বিলের ইজারা নিলেও মাঝিরা এবারেও অধিকার পায়না বিলে জাল ফেলার। অথচ দেশ স্বাধীন! চাষের স্বপ্ন ফেলে এবারেও তমিজকে গাঁ-ঘর ছাড়তে হয়। এ-এক অনির্দিষ্ট জীবনের ভিতর ঢুকে পড়া। তবু তমিজের চাষের খোয়াব মরে না, সে ভাবে " এদিকে একটু চেষ্টা করলেই বর্গাজমি পাওয়া যাবে।জোতদার নিজের গাঁয়ের মানুষকে বিশ্বাস করে না,পুব থেকে,দক্ষিণ থেকে আসা চাষাদের জমি দিয়ে ভাবে,এরা গোলমাল করবে না।বর্গাদার চাষা হলে অবস্থা ফেরাতে কতদিন?" কালাম মাঝির হাত থেকে কুলসুমকে বাঁচাতে চেষ্টা করলে কুলসুম মারা যায় এবং কেরামত আলির জেল হয়। ওদিকে তমিজ কোথায় যেন হারিয়ে যায় এবং তমিজের হারিয়ে যাওয়ার জন্য আখ্যানও এক অজানা পথে যাত্রা করে।

সমস্ত উপন্যাস জুড়ে নির্মাণের অসম্ভব আন্তরিকতা আমাদের অবাক করে। একটু একটু করে গেঁথে তোলা এ-এক বিরাট অট্টালিকা যেন। তিনি যখন লেখেন, "শেষের দিকে এসে গানের আওয়াজ চলে যায় দূরে। বাড়ির সামনের খুলি পার হয়ে ডোবার কোমর পানিতে অল্প একটু বুদবুদ তুলে বুদবুদের টুপটাপ বোল নিজের শরীরে বরন করে আওয়াজটি রাস্তা ডিঙিয়ে ওই বোলের সবটাই ঝেড়ে ফেলে শিশির পড়ার ফিসফিসানি মেনে নিয়ে ঢুকে পড়ে সন্ধ্যার খোপের মধ্যে এবং কুয়াশা ঝোলানো কালচে গোলাপি আশমানকে কুচকুচে কালো করে আসমানকে তো বটেই, ওই সঙ্গে নিজেকেও একেবারে আড়াল করে দেয়।বলতে কী,চেরাগ আলি ফকিরের গানের গড়িয়ে চলাতেই গিরিরডাঙ্গায় সেদিন রাত্রি নামলো একটু আগেই।", তখন তার ভাষার মধ্যে কবিতার ফল্গু প্রবাহ ভালোরকমেই টের পাওয়া যায়।তাছাড়া প্রতিটি ঘটনা লেখবার সময় ইলিয়াস আশ্রয় নেন অত্যাশ্চর্য্য সংযমের। সংযম এই আখ্যানের অন্যতম গুণ। বর্তমান সময়ের মহাকাব্য হল উপন্যাস। এই উপন্যাস পড়লে যেমন মাটির গন্ধ আপনা থেকেই নাকে এসে লাগে সেরকম এর মহাক্যাবিক বুননও চোখ এড়ায় না। গতে বাঁধা ভাষাকে ভেঙেচুরে,গতে বাঁধা একি ভাবে গল্প বলা,সাধাসিধে ন্যারোটিভের পহেলিকাকে ধুলোয় মিশিয়ে, আঞ্চলিক শব্দের জোরদার প্রয়োগে কবিদের মতো যত্নে এই গদ্যের জন্ম হয়।

এই উপন্যাস একবার পড়েই শেষ হয়ে যায় না।স্পষ্টতই শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আখ্যানের গুণগুণানি আমাদের ভিতর টের পাওয়া যায়। প্রতিটি লাইন যত মন দিয়ে পড়া যায় ততই বোঝা যায় এই আখ্যানের ব্যাপ্তি কীভাবে আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে! বোঝা যায় ইলিয়াস এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে আখ্যানের এক প্রবাহমান নদী তৈরি করতে চেয়েছিলেন এবং সেই কাজে তিনি কতটা সফল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন