রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১৬

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা : মা

এ ধারণা বদ্ধমূল হয় আমার কৈশোরে। শৈশবে, সম্ভবত একটু দ্বিধান্বিত থাকতাম। অন্যদের মা’র সাথে ‘আমার মা’কে তেমন মেলাতে পারতাম না। আমার মা অন্য মায়েদের মতো আদর-আহ্লাদ করতেন না। কাছে বসিয়ে মিষ্টি মধুর কোন আলাপ করেছেন বলেও কখনো মনে পড়ে না। যদিও, আমাদের খাওয়া,ঘুম,পড়াশুনা, চলাফেরায় তাঁর কঠিন খেয়াল! তবু মনে আছে, প্রায়ই মা’র সাথে মনে মনে এ নিয়ে অভিমান করতাম। সাহসও ছিল না সামনাসামনি তা প্রকাশ করার। শুধু আমি নই, আমাদের চারবোনের সবাই আম্মা’র ভয়ে সবসময়ই ভীত-সন্তস্ত থাকতাম। ক্লাস সেভেনে পড়ি যখন, টাইফয়েডে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম একবার; তখন একরাতে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটলো।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গিয়েছে। আর আমি একটু ছটফট করছি আর একটু ঘুমাচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ টের পেলাম, আম্মা আমার কপালে চুমু খাচ্ছেন আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। প্রথমে ভাবলাম স্বপ্ন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বুঝলাম স্বপ্ন নয়, সত্য। সেই বোধহয় শুরু! এরপর চার মেয়ে নিয়ে, ‘এক হাতে জীবন-যুদ্ধ সামলাতে থাকা’ আমাদের চাকরিজীবী ‘রাগী মা’কে আর ভুল বুঝিনি। বরং গর্ব বোধ করেছি, এমন ইস্পাত-কঠিন, সাহসী এক মহিলা আমার মা; যিনি আর সব মায়ের মতোই তাঁর সন্তানকে প্রচণ্ড ভালবাসেন (ভালবাসেন ভেতরে ভেতরে, শুধু প্রকাশটা সেভাবে নেই)। আমাদের বাবা মারা যাওয়ায়, একাই যিনি আবার কঠিন হাতে বাবা’র দায়িত্বও পালন করেন!


আমি আমার মায়ের ‘ছোট মেয়ে’ বলেই কিনা জানি না, ‘মা-অন্ত প্রাণ টাইপ’ ছিলাম। মাকে ছেড়ে বাড়ির বাইরে থাকার কথা কখনো কল্পনাও করতে পারতাম না। মফস্বলের গণ্ডি ছেড়ে ঢাকায় এসে তাই প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হয়েছিলো। আমার মায়েরও নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হয়েছিলো! সব মায়েরই তো হয়। কিন্তু আমাদের আম্মা কঠিন মানুষ, তিনি এক চুলও বুঝতে দেননি তাঁর কষ্ট। বরং বুঝিয়েছিলেন, ভালো পড়াশুনার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। যাইহোক, ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। হোস্টেলে থাকা শুরু করলাম। হোস্টেলে আরও অনেক মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হলো। আসলে দুঃখগুলো মিলে গেলে বন্ধুত্বটা সহজে হয়। হোস্টেলে সবার দেখি,একই কষ্ট। আমাদের সবার মন খারাপ থাকত বাড়ির জন্য, মূলত মা’র জন্য। আমার ধারণা দৃঢ় হলো। মা কিংবা মা’র জন্য ভালোবাসা, কিংবা মা’র সাথে রক্তের যেই বন্ধন~ তা চিরন্তন। বই-পুস্তকে যেমনটা পড়ি, ঠিক তেমন।

ধীরে ধীরে বড় শহরের জীবনে অভ্যস্ত হতে থাকি। হোস্টেলে নিয়মিত মা’র চিঠি পাই। মাকে চিঠি লিখি। পড়াশুনা, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সময় কেটে যায়। ডিপার্টমেন্টে আরও অনেক নতুন বন্ধু হতে থাকে। কমার্স ফ্যাকাল্টির ছাত্রী হওয়ায় দ্রুত বন্ধুদের একটা গ্রুপও পেয়ে গেলাম। এখানে ক্লাসে প্রচুর হোম ওয়ার্ক থাকে গ্রুপ অনুসারে। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে; আমার গ্রুপের সবাই পড়াশুনায় বেশ ভাল। আর উদারমনস্কও। আমার অল্প-বিস্তর ফাঁকিবাজি ওরা পুষিয়ে দেয়। দ্রুত আমি, জনি, রিটন, রাশা, পাভেল, মঈন, তপু, ইতি বেশ ভাল বন্ধু হয়ে যাই। পড়াশুনা আর আড্ডা, আড্ডা আর পড়াশুনা; এর ফাঁকে বন্ধুদের বাসায় যাওয়া এবং মাঝেমাঝেই বন্ধুর মায়েদের সাথে ভীষণ মেতে ওঠা~ ভার্সিটির প্রথম বর্ষের প্রায় শুরু থেকেই মনে হলো,জীবন আনন্দময়য়। শুধু প্রায়ই একটু দুঃখ হতো, ইশ আমার ‘মা’ও যদি কাছে থাকত, তাহলে আনন্দের ষোল কলা পূর্ণ হতো। তবে অসুবিধা ছিল না; মা’র চিঠি তো সপ্তাহে দু’তিনটা আসতই। আর চিঠি আসতে দেরি হলে, সেদিনগুলোতে ক্যাম্পাসে বেশি করে মায়ের গল্প। তাতেও মন খারাপ না কাটলে, সোজা তপু’র বাসায়। তপু আমাদের ফার্স্ট বয় ছিল। পড়াশুনায় ছিল তুখোড়। আড্ডাবাজিতেও ছিল সে অদ্বিতীয়। তপু’র বাবা নেই; মা আর তার ছোট্ট সংসার। খালাম্মা (তপু’র মা) আমাদের সবাইকেই খুব আদর করতেন। যদিও আমার বিচ্ছু বন্ধুদের ধারণা ছিল, আমার প্রতি আদর-যত্নে খালাম্মা কিঞ্চিত পক্ষপাতিত্ব করতেন। খালাম্মা এ অনুযোগ শুনে মৃদু হাসতেন। বলতেন, ‘আহা! মেয়েটা যে ‘মা’কে ছেড়ে একা একা হল-এ থাকে!’

ক্লাসের ফাঁকে আমাদের আড্ডাগুলো জমত মূলত আইবিএ’র ক্যান্টিনে অথবা মল-চত্বরে। আমাদের সে গল্পবাজির দিনগুলোতে আড্ডার টপিক- অর্থহীন হাহাহিহি থেকে শুরু করে খুবই সিরিয়াস বিষয়কে ঘিরে পর্যন্ত চলত! তখন আমরা ভুল সুরে গান গাইতাম একসাথে, তর্ক করতাম তুমুল বেগে আর ভবিষ্যৎ এর স্বপ্ন দেখতাম একযোগে। স্বপ্নের টুকরোগুলো শুরু হতো দেশকে ঘিরে। কিভাবে কিভাবে যেন তা পৌঁছে যেত~ নিজ নিজ পরিবারে। এবং অবশেষে, অবধারিতভাবে মায়ের কাছে! আমাদের সে সব আবেগমাখা স্বপ্ন-কথা’র ফাঁকে ফাঁকে দেখতাম, মল-চত্বরের কৃষ্ণচূড়াগুলোও খুব করে দুলে উঠত, আমাদের সাথে। কি জানি, কি ভেবে! আর, আমাদের সব গল্পেই যার কিছু না কিছু কথা থাকতই সে হচ্ছে রাশা। এই ছেলেটার সব ঘটনাই আবার শেষ হতো দম-ফাটানো কোন হাসির গল্পে। খেয়াল করতাম, শুধু একটা বিষয় এলেই সে চুপচাপ অন্যমনস্ক এক ছেলে। ‘মা’, ‘আমাদের মা’য়ের কথা শুরু হলেই, সে দুম করে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করত। সে আর তখন আমাদের সাথে একাত্ম হতে চাইত না। অনেকদিন খেয়াল করেছি; কিন্তু কি বলব -সে ভেবে আর কিছু বলা হতো না।

মনে আছে, একদিন সকাল ন’টায় ছিল প্রিয় মিজান স্যারের ‘প্রিন্সিপ্যালস অফ মার্কেটিং’ এর ক্লাস, যেই ক্লাসটা আমরা কেউই সচরাচর মিস দিতে চাইতাম না। কিন্তু সেদিন সকালে, তুমুল কালবোশেখীর ঝড়ে আর বৃষ্টিতে, ক্লাসে খুব কম ছেলেমেয়ে এসেছিলো। স্যার তাই ক্লাসটা অন্য কোন দিনে নেবেন জানিয়ে, চলে গেলেন। আমাদের গ্রুপেরও কেউ আসেনি আমি আর রাশা ছাড়া। ক্লাস থেকে বের হয়ে, আমরা দুজন আইবিএ’র ক্যান্টিনে গিয়ে নাস্তা করছি আর গল্প করছি। হঠাৎ ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের করতে গিয়ে আগের দিনের ডাকে আসা আম্মা’র চিঠিটা ফ্লোরে পড়ে গেলো। আমি তাড়াতাড়িতুলতে যেতেই, রাশা জিজ্ঞেস করল-

-‘কি রে, চিঠি? প্রেম ট্রেম করছিস নাকি! তবে এমন ম্যাড়ম্যাড়া হলুদ খামের প্রেম এখন চলে না। আর চললেও, বেশিদিন টিকবে না! ’

-‘হি হি হি হি... তাই কি? কিন্তু আমার এ প্রেম তো বহুদিনের। এবং টেকসইও!’

-‘উহু, হতেই পারে না! তা, তোর এই ব্যাকডেটেড প্রেমিকের নামটা কি জানতে পারি?’

-‘অবশ্যই পারিস। আমার এই আদি এবং চিরন্তন প্রেমিকটি হচ্ছেন ‘আমার আম্মা। এই মানুষটির প্রেম কোনদিন ছুটবে না! আমি ভালো আছি জেনেও, ইনি দুশ্চিন্তায় অস্থির হন। আমার চিঠি পেতে ভাল লাগে তাই হাজার ব্যস্ততায়ও, সপ্তাহে দু’তিনটে চিঠি ইনি নিয়মিতই লেখেন। কখনো বা, এ সংখ্যা দুই-তিনকে ছাপিয়ে চার-পাঁচও হয়ে যায়। বুঝিসই তো, ‘মা’ যে!’

এ টুকু বলেই থমকে গেলাম! দেখি, প্রচণ্ড রাগ এবং বিরক্তি রাশা’র চোখে। আজ আর অন্যদিনের মতো অন্যমনস্ক নয় সে।থেমে থেমে চাপা গলায় বলল

-‘আমি বিশ্বাস করি না। মা নিয়ে এসব তোদের আদিখ্যেতা! এ সবই বানানো কথা। ‘মা’কে এত মহিমান্বিত করে দেখার কিছু নেই! আর দশটা সম্পর্কের মতো, এও জাস্ট আর একটা সম্পর্ক। কারোর ‘মা’ খারাপ, কারোর ‘মা’ ভালো~ এই তো! এর বেশি কিছু না’।

-‘আদিখ্যেতা? আশ্চর্য কথা! এত এত মানুষ এর ‘মা’ যে এমনই, তা দেখেও তুই এমন বলবি? এ আমি কখনোই মানি না। ‘মা’, ‘মা’ই! হ্যাঁ, কোন মা মানুষ হিসেবে খারাপ হতে পারেন, কিন্তু সন্তানের জন্য তিনি ভাল। সন্তানের জন্য তিনি সব করেন। সব কষ্ট স্বীকার করে নেন। সন্তানের জন্য পারেন না- এমন কোন কাজ মায়েদের অভিধানে নেই! ... নিশ্চয়ই, তুই তোর ‘মা’কে এখনো চিনতে পারিসনি!’

ও হঠাৎ কেমন করে যেন একটা নিশ্বাস নিল। তারপর বলে উঠল,

-‘বিশ্বাস কর, আমি একটুও মিথ্যা বলছি না! আমার মা, আর মায়েদের মতো নন। হয়তো যখন জন্মেছিলাম, তখন আর সব মা’র মতোই তিনি ছিলেন। কিন্তু এটা সত্যি যে তিনি এখন আর তোদের মায়েদের মতো নেই! আমার বাবা মারা যাবার পর আবার বিয়ে করে আমাকে ভুলে গেছেন। সম্ভবত এখন আমাকে তাঁর আর প্রয়োজন নেই। জানিস, আমার ‘স্টেপ ফাদার’ মানুষটা একটুও খারাপ নন; কিন্তু পৃথিবীটা যে কি জটিল তা আমি এই মানুষটাকে যত দেখি, ততই বুঝতে পারি। আমি তাঁদের সংসারে থাকি; কিন্তু আমি তাঁদের কারোরই কিছু নই। ওরা দুজন দুজনকে বেশ ভালবাসেন, কিন্তু আমার জন্য কোথাও কোন ভালবাসা নেই’।

সেদিনের সে সকালে, দুজনের কেউই আর তেমন কথা বাড়াইনি। তবে ওর কথা আমি সেভাবে বিশ্বাস করিনি। ভেবে নিয়েছিলাম, ওর বোঝায় ভুল আছে। এর পরের সপ্তাহেই রাশা’র খুব জ্বর শুনে আমি আর ইতি ওকে দেখতে গেলাম। আমাদের অন্য বন্ধুরা আগেই দেখতে গিয়েছিলো। আমরা ওদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে গেলাম। বাসায় ঢুকতেই কি দেখলাম জানি না; স্পষ্ট করে তেমন কিছুই হয়তো বলতে পারব না! কিন্তু মনে হলো রাশা ঠিকই বলেছিল। তিনটা প্রাণের এ বাড়িতে, সব কিছুই আছে। সাজানো ড্রয়িং রুম, আলো-হাওয়ায় পূর্ণ দখিনের ব্যাল্কনি, দামী আসবাব ~ কি নেই? একটা প্রাণ এর বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবই আছে; সাথে ভয়াবহ এক অবহেলাও আছে। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না; এমন এক অসীম শূন্যতাও আছে! যার মাঝে বেশিক্ষণ থাকা যায় না, মনে হয় এ বিষণ্ণতা মানুষ খুন করতে পারে! অথচ কি আশ্চর্য, পাশের ঘর থেকেই ভেসে আসছিলো, প্রাপ্ত বয়স্ক এক দম্পতি’র নিপাট-নিপুণ কিছু দাম্পত্য-কথা! এক বাসায় এমন বৈপরীত্য সত্যিই ভাবায়! আমরা বেশিক্ষণ বসতে পারিনি। মনে মনে মায়ের চিরন্তন রূপটিকে ভুলতে না চেয়ে ফিরে এসেছি।


ফেরার পথে আমি বা ইতি কেউ আর এ বিষয়ে কিছু বলিনি। কিন্তু জানি, মনে মনে দুজনই অকূল ভাবনায় ডুবে গিয়েছি। পরে ক্যাম্পাসে, রাশা’র সাথে দেখা হতেও, আমরা সবাই স্বাভাবিক হয়ে থেকেছি। কিন্তু খেয়াল করলাম, আমরা কেউই তেমন করে আর ওর সামনে ‘মা’ বিষয়ক কোন আলোচনা করি না। তার কিছুদিন পরই ছিল সেমিস্টার ফাইনাল। সবাই একটু পড়াশুনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমরা সবাই সিরিয়াস কিন্তু আমাদের মাঝে সবচাইতে ভাল ছাত্র যে তপু, সেই দেখি সারাক্ষণ অন্য কি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। মাইক্রো ইকনমিক্স পরীক্ষা দিয়ে তপুকে ধরলাম।

-‘কি রে, তুই আমাদের সাথে পরীক্ষা শেষেও বসছিস না ইদানীং! কি হয়েছে তোর? কিসের এত ব্যস্ততা!’

-‘হা হা হা... আমার ব্যস্ততা তো জানিসই। আমি কি আর তোদের মতো হাত-পা ঝাড়া হয়ে থাকতে পারি? আমাকে টিউশনি করে সংসার চালাতে হয়। আব্বা’র পেনশনের টাকা আর কতটুকু বল!’

-‘হ্যাঁ তুই অবশ্যই অনেক ব্যস্ত থাকিস। সব সময়ই। কিন্তু এখন যে তোর টিকিটিও দেখা যায় না!’

‘আরে ভাবিস না, ...এই তেমন কিছু না’ বলতে বলতে তপু ওদের রুটের ‘তরঙ্গ’ বাস না ধরে, ‘আনন্দ’ বাসে চড়ে কোথায় যেন চলে গেলো। এরপর অল্প কিছুক্ষণ মল-চত্বরে দাঁড়িয়ে সবাই রহমত মামা’র ঝুড়ি থেকে ভেল পুরি কিনে খেলাম। তারপর যে যার গন্তব্যে চলে গেলাম। আমার মনটা একটু খারাপ ছিল, পরীক্ষাও তেমন ভালো হয়নি! হলে ফিরে কি হলো; আম্মা’র জন্য খুব কষ্ট হতে লাগল। হঠাৎ মনে হলো, তপু’র আম্মার সাথে দেখা হলে একটু ভালো লাগবে। মনে হতেই রওনা দিলাম তপুর বাসার উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখি, খালাম্মা একা। খালাম্মা’রও মন খুব খারাপ। কেন মন খারাপ বুঝতে পারছি না। মন খারাপ নিয়েই আমাকে ডিম-চপ ভেজে দিলেন। উনার হাতের এই নাস্তাটা আমার খুব পছন্দ, খালাম্মা সেটা জানেন। বাসায় পরিমাণমতো ডিম থাকলেই, তাই লাল আর কমলা’র মাঝামাঝি রঙ এর অসাধারণ এই ডিম-চপ বানিয়ে খাওয়ান। তো, আমি খেতে শুরু করতে গিয়ে প্রথমে খালাম্মা’র মুখে একটা তুলে দিতে গেলাম। তিনি আচমকা ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলেন। আমার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বললেন,

-‘তুমি খাও মা। আমার তপুটা হয়তো এখনও কিছু খায়নি! একা একা কোর্টে বসে আছে। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় আসতে পর্যন্ত পারেনি! শুকনো মুখে ছেলেটা আমার মামলা’র শুনানি শুনছে। ও ফিরলে আমরা একসাথে খাবো’।

আমি তো ভীষণ অবাক!

-‘বলছেন কি খালাম্মা! তপু কেন কোর্টে থাকবে? কি হয়েছে ওর?’

খালাম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

-‘আমি যে ওর ‘মা’ নই রে, মা! এই ওর অপরাধ। ওর আসল মা এখন ওকে পেতে চান। তিনি তাই মামলা করেছেন’

আমি কিছুতেই কিছু বুঝতে পারছি না! সব কিছু কেমন নাটকের মতো মনে হলো। হতবাক হয়ে বললাম, ‘এইসব কি বলছেন খালাম্মা?’

-‘হ্যাঁ, ঠিকই বলছি নৌজুলা! তপু’র বাবা-মা’র ডিভোর্স হয়, তপু যখন খুব ছোট, তখন! তার বেশ কিছুদিন পর, তপু’র বাবা’র সাথে আমার বিয়ে হয়। তারপর থেকে এই তপুই আমার ছেলে। প্রথম প্রথম বুঝিনি, ও এভাবে মিলে-মিশে আমার সাথে একাকার হয়ে যাবে। কিন্তু জানো, সবাইকে অবাক করে দিয়ে, খুব দ্রুত তপু আমার নিজের ছেলে হয়ে গেলো। আমি, তপু, তপুর বাবা সহ, আমাদের তিনজনের সুখের সে সংসার হঠাৎ ভেঙ্গে গেলো, এই তিন বছর আগে; তপুর বাবা মারা গেলে। আমি আর তপু কেউই অবশ্য হাল ছাড়লাম না। তপু খুব ভাল রেজাল্ট করল, মাধ্যমিকে এবং উচ্চ মাধ্যমিকে। বেশ কিছু ভাল টিউশনি পেল। পেনশনের অল্প কিছু টাকা আর ঐ টিউশনি ~ সব মিলিয়ে, কোনরকমে আমাদের দিন তো চলেই যাচ্ছিলো। হঠাৎ ওর আসল মা কেইস করেছেন, আমি নাকি তপুকে জোর করে আমার কাছে রেখে দিয়েছি! আমি নাকি, পেনশনের টাকার লোভেই তা করেছি!’

হতভম্ব আমারও চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। কি বলব কিছুই বুঝতে পারছি না। খালাম্মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে রাখলাম। উনি বলে চললেন,

-‘বলো দেখি নৌজুলা, উনি এভাবে কেন মামলা দিতে গেলেন? আমাদের কাছে এসে বললেই তো পারতেন। তপুকে বোঝাতে পারতেন, তার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এইটুকু একটা ছেলেকে উনি কোর্টে কেন তুললেন?!’

আমি কিছুই বলতে পারিনি। শুধু ফিরে আসার সময়ে বলে এসেছিলাম, ‘খালাম্মা, আপনিই তপুর আসল মা! বিশ্বাস করেন, আর কেউ না!’

অনেকদিন লাগলেও, পরে সব ভালোভাবেই মিটে গিয়েছিলো। কে যে আসলেই ‘মা’ হতে পেরেছিলেন~ তা বিজ্ঞ বিচারকদেরবুঝতে অসুবিধা হয়নি। এখন তপু ভালোই আছে। ঢাকা ইউনিভারসিটির শিক্ষক হয়েছে। বউ-ছেলে, আর মাকে নিয়ে তার সুখের সংসার গুছিয়েছে। শুনেছি, আমাদের রাশারও নিজস্ব সংসার হয়েছে। সে আমাদের কাছের বন্ধু হয়েও, বরাবরই একটু দূরে-দূরে থাকত। এখনো আছে সেই দূর প্রবাসে। হয়তো সেও ভালো আছে। কিংবা আজন্ম বয়ে বেড়ানো ক্ষত বুকে নিয়ে খারাপ-ভালো ~ দুইই সে আছে। কে জানে! বাইরে থেকে দেখে, মানুষ আর কতটুকুই বা বুঝতে পারে! আমাদের আর সব বন্ধুরাও মা-বাবা, আর নিজ নিজ বর্ধিত সংসার নিয়ে ভালো আছে। আমিও হয়তো ভালোই আছি। শুধু আমার মধ্যকার ‘মা বিষয়ক’ চিরন্তন সে ভাবনাটি বদলে গেছে। এই সংসারে ‘চিরন্তন’ বলে কিছুই নেই~ সে ভাবনায় বুঁদ হয়ে, বুঝতে পারি- শুধু সন্তানকে জন্ম দিয়ে যেমন ‘মা’ হওয়া যায় না; তেমন জন্ম না দিয়েও কেউ কেউ, কারোর ‘মা’ হতে পারে। আরও বুঝি - ‘মা’ এক অদ্ভুত আশ্রয়ের নাম; আর ‘এই আশ্রয়’ যার আছে তার মতো ভাগ্যবান পৃথিবীতে কেউ নেই! কেউ নেই!


লেখক পরিচিতি
জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা
গল্পকার।
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।

1 টি মন্তব্য:

  1. ’’তুমি যেদিন থাকবে না মা/ সেদিন আমার হবে কী/
    সুখে থাকি দুঃখে থাকি/ কাহার আসবে যাবে কী/’’
    ...মায়ের মত আপন কেহ নাই।। ....শতবার গাইলে শতবারই চোখে পানি আসে। সত্যিই তাই: ‘মা’ এক অদ্ভুত আশ্রয়ের নাম; আর ‘এই আশ্রয়’ যার আছে তার মতো ভাগ্যবান পৃথিবীতে কেউ নেই! কেউ নেই! তপু আর তার এই অসম্ভব সুন্দর মায়ের জন্য রইল অনেক অনেক শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। অনেক অনেক চমৎকার চমৎকার লিখেছেন। ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন