সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

শাশ্বত নিপ্পন'এর গল্প | নো ম্যান্স ল্যান্ড

পরিমল দত্তকে এখানে ‘দত্তবাবু’ বলেই সকলে চেনে। নির্বিবাদী সদালাপী পরিমল দত্ত এখানে কারো কাকা, কারো দাদা, কারোবা দাদু। তাছাড়া দত্তবাবু আছেনও সব কাজে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতায় অবসর গ্রহণের পর তার এখন অখণ্ড অবসর। মেয়ের বিয়ে হয়েছে শিলিগুড়ি, ছেলে কোম্পানির বড় চাকরি নিয়ে কলকাতায়; আর কল্যাণীতে পরিমল বাবুর বুড়ো-বুড়ির সংসার বেশ নির্বিঘ্ন ছিমছাম।
রিটায়ারমেন্টের পর যে টাকা পেয়েছেন তা এখন ব্যাংকে গচ্ছিত। গিন্নী আছেন ঘরে লক্ষ্মী পুজো আর তেরো পার্বণ নিয়ে। অন্যদিকে পরিমল বাবু আছেন সমাজ সংসার নিয়ে। দূর্গাপুজো, সরস্বতী পুজো, নাম সংকীর্তন, বিয়ে, পৈতে, সৎকার-- সব কাজেই দত্তবাবু আছেন অবিচ্ছেদ্য। দীর্ঘদিনের বাস তার এই কল্যাণী’র বিদ্যাসাগর কলোনিতে। সেই ছেষট্টি সালে বাংলাদেশের খুলনা থেকে বাবার হাত ধরে এখানে আসা। বাবা হরিপদ দত্ত আসতে রাজি হননি কিছুতেই। কিন্তু কোনো এক অমাবশ্যায় তার বৃদ্ধ দাদু আর কাকাদের লাঠি পেটা করে চোখের সামনে হালের গরু দু’টোকে খুলে নিয়ে গেল পাশের পাড়ার বশির, ওমর আলী আর আমীররা; তখন আহত বুড়ো বাবা, হরিপদের হাত ধরে অশ্রুসজল হয়ে বলেছিল, ‘বাবা, আমার বংশের প্রদীপ তোর হাতে তুলে দিলাম, তুই পালা! তুই বাঁচ আর আমার বংশ রক্ষা কর।’

হরিপদ দত্তের তক্ষুণি মনে হয়েছিল, সবকিছু ফেলে পালিয়ে গিয়ে কি কেউ বাঁচে? কিন্তু সে অবস্থায় কিছুই বলতে পারেননি তিনি। শুধু অসহায় চোখে দেখেছেন আক্রান্ত নিরীহ মানুষের আতঙ্ক। তারপর চোখের জল আর বানের জলে ভাসতে ভাসতে সীমান্ত পার হয়ে এই দেশে। নামহীন গোত্রহীন হয়ে ভেসে বেড়ানো আর বাঁচার সংগ্রাম। কখনো দূর আত্মীয়ের বাড়ি ক’দিন, কখনো রাস্তায়, কখনোবা গাছতলায়। তখন পরিমলের বয়স কম। দাদুর পাঠানো সামান্য টাকায় চলল তাদের উদ্বাস্তু জীবন। বাঁচার তাগিদে আর সময়ের প্রয়োজনে একসময় তারা কিছুটা সামলে নেয়। ‘উদ্বাস্তু’ থেকে তারা পরিণত হয় ‘রিফিউজি পরিবারে’। পরিমল যখন বিদ্যাসাগর স্কুলে ভর্তি হন, তখন ভালো বন্ধু হয়নি তার কেউ। সবাই পরিমলের নামে না ডেকে, ডাকত ‘রিফিউজি’ বলে। সৌমেন ঘোষ নামে একজন ছিল তার ক্লাসে, সে সবসময়ই বলত, ‘অ্যাই, তোর গায়ে কেমন জানি ‘নেড়ে’ ‘নেড়ে’ গন্ধ।’ হাসত সবাই। খেলত না ওর সাথে। সে এক বিচিত্র সংগ্রাম। নিজেকে মানুষ প্রমাণ করার প্রাণান্ত সংগ্রাম।

তারপর একদিন স্কুল-কলেজ শেষ হয়। সংসার আর চাকরি স্থায়ী হয়। অন্যদিকে খুলনায় উজাড় হয় ফেলে আসা ঘর-দোর, দাদু, দিদিমা, কাকারা। কেউ মরে, কেউ বাঁচে। কেউ আবার থেকেও যায় পোড়া মাটি কামড়ে। এখানে বাবা গত হন। গত হন মা। পরিমল গলা ছেড়ে কাঁদতে পারেননি কখনো। কাউকে জড়িয়ে ধরতে পারেননি অসহায় লতাপাতার মতো। একমনে তিনি শুধু তার গায়ের গন্ধ তাড়াতে চেষ্টা করে গেছেন। আজ দত্তবাবু লুঙ্গি ছেড়ে ধূতি; রূপসা নদী ছেড়ে গঙ্গায় স্বপ্নের নৌকা দুধ সাদা পাল তুলে বেয়ে চলে। মহরমের ঢোলের তাল, চৈত্র সংক্রান্তির গাজনের ডাকের ছন্দের কাছে পরাজিত হয়েছে বেশ কিছুকাল আগেই। তাই দত্তবাবু শের-ই-বাংলা, মওলানা ভাসানী ত্যাগ করে সি.পি.এম কংগ্রেস আই-এর রাজনৈতিক মতাদর্শে মাথা মুড়িয়ে একেবারে পুরোদস্তুর কল্যাণীবাসী। এখানকার ‘জাগরণী’ ক্লাবে আর পাঁচু গোপালের চায়ের স্টলে তার নিত্য আনাগোনা। আজো এই রুটিন ওয়ার্কের ব্যতিক্রম হয়নি। চায়ের দোকানের নিশ্চল কুমিরের পিঠের মতো চিৎ হয়ে পড়ে থাকা কালো বেঞ্চে বসে দত্তবাবু উঁচু গলায় বলে ওঠেন, ‘অ্যাই পাঁচু, এক প্লেট ঘুগনি আর চিনি বেশি দিয়ে একটা চা দাও।’ নেশা বলতে দত্তবাবুর এই একটা। চা। সকালে বিকেলে চা তার চাই-ই চাই। দ্রুত হাতে টেবিল পরিষ্কার করতে করতে পাঁচু গোপাল গলা চড়িয়ে বলে, ‘কাকা শুনেছো তো, ওদেশের অবস্থা তো ভালো না।’

হঠাৎ এই প্রশ্নে দত্তবাবু একটু ঘাবড়ে যান। দ্রুত ভাবতে থাকেন, ‘ওদেশ’ নামে কোন দেশ! ইউরোপের কিছু দেশসহ আমেরিকা রাশিয়ায় কিছু উত্তেজনা চলছে বটে, কিন্তু সেই উত্তেজনা কি কল্যাণীর স্টেশন রোডের গোলপাতা ঘেরা চায়ের দোকানের পাঁচু গোপাল রায়কে ভাবিত করবে? দত্তবাবু ভারতে থাকেন। তারপর বলেন, ‘কোন দেশ?’

‘কেন, বাংলাদেশ। তোমাদের বাংলাদেশ। ওখানে নাকি রাজা ভোট নিয়ে তুমুল চলছে।’

মুহূর্তে শব্দটা পরিমল দত্তবাবুর মগজের কোথাও আটকে গিয়ে তীব্র প্রতিধ্বনি তুলতে থাকে-- ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ...’

পাঁচুর কথাটা শোনার সাথে সাথে দত্তবাবুর পায়ের তলার মাটি কাঁপতে থাকে-- যেন ভূমিকম্পন। ঘোরলাগা চোখে দত্তবাবু দ্যাখে-- কুয়াশা ঢাকা সকালের রূপসা, লঞ্চের ভেঁপু, মাঠভর্তি সরষে ফুল, নিকানো তুলসিতলা, মহরমের লাঠি খেলার ঢোলের বাদ্য, অমাবশ্যার রাত, রক্তাক্ত দাদু। দত্তবাবুর মনে হয়, গায়ে তার সেই গন্ধটা আছে এখনো, যেটা ছেলেবেলায় সৌমেন পেয়েছিল। আর সে কারণে তাকে এক বেঞ্চে বসতে নিতে চায়নি কোনোদিন।

এক চামচ ছোলার ঘুগনি মুখে তুলে স্বাদ পান না দত্তবাবু। কিছু না দেখার দৃষ্টি নিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকে ব্যস্ত স্টেশনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়ির দিকে। এর মাঝেই কখন যে পোস্ট অফিসের কেরানি তারাপদ বিশ্বাস এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেননি দত্তবাবু। তারাপদ বিশ্বাস আন্তরিক গলায় বলেন, ‘এই যে, দত্তদা, আপনাকেই খুঁজছি সেই সকাল থেকে। আপনার একটি চিঠি আছে।’

আজকাল চিঠির প্রচলন নেই বললেই চলে। তবুও কর্মকর্তা আর কর্মচারিরা অফিস আগলে পড়ে থাকে। পরিচিত লোকের চিঠি পেলে নিজেরাই পৌঁছে দেয়। পোস্টম্যানের তোয়াক্কা করে না।

উৎসুক গলায় পরিমল দত্ত বলেন, ‘তাই না কি?’

“হ্যাঁ, ওদেশ, মানে আপনাদের বাংলাদেশ থেকে কোন ‘এক মুসলমান লিখেছে’।”

‘আপনি কি লেখা দেখেই লেখকের ধর্ম বলতে পারেন, দাদা? তাছাড়া ওখানে হিন্দুরাও তো আছেন।’

‘না না, খামের গায়ে প্রেরকের নাম লেখা রয়েছে তো।’ এর মাঝেই পাঁচু আরো এক প্লেট ঘুগনি আর এক কাপ চা দিয়ে যায়। তারাপদ বিশ্বাস শব্দ করে চা চুমুক দেন। পরিমল দত্তের উদাসিনতা কাটে না। দোয়েল পাখির ছবি অঙ্কিত হলুদ খামটা হাতে নিতে নিতে পরিমল দত্ত, তারাপদ বিশ্বাসকে দুম করে একটা প্রশ্ন করে বসেন। ক্লান্ত স্থির মালগাড়ির দিকে চেয়ে বলেন, ‘আচ্ছা দাদা, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এর জন্য অনুমতির প্রয়োজন আছে কি?’

‘না মানে, বলছিলাম যে, এই ধরুন-- ইতালি থেকে কোনো চিঠি বা পার্সেল আসলে, সোনিয়া গান্ধীকে কি কেউ বলেন যে, সোনিয়া জি, আপনার দেশ ইতালি থেকে এক খ্রিস্টান একটা চিঠি বা পার্সেল পাঠিয়েছেন?’

তারাপদ বিশ্বাসকে কোনোরকম সুযোগ না দিয়ে, দত্তবাবু উঠে পড়েন। পা বাড়ান সামনের দিকে।

নানা চিন্তা মুহূর্তে তার মাথায় এসে ভিড় করে। সন্ধ্যার আলো আঁধারে তার চোখে আবার আবছা হয়ে ভেসে ওঠে-- রূপসা নদীর নৌকা বাইচ, মহরমের মেলা, যাত্রাগানের কর্ণেটের শিহরণ জাগানো সুর, নবান্নের পায়েস...। ঠিক তখন বিকট চিৎকার করে কল্যাণী স্টেশনে ৬০ আপ লোকাল ট্রেনটি প্রবেশ করে। ট্রেনের বিকট হুইসেলে দত্তবাবুর মাথাটা শূন্য হয়ে যায়। তিনি সন্ধ্যার আলো আঁধারে সুতোকাটা ঘুড়ির মতো এলোপাতাড়ি উড়তে থাকেন। তারপর গোত্তা খেয়ে মুখ ডুবিয়ে পড়ে যান শান্ত রূপসার বুকে।



দুই

পরিমল বাবু শিয়ালদা স্টেশনের চার নম্বর গেটে যখন দাঁড়ান তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। অপেক্ষা বিরক্তিকর। উদ্দেশ্যহীনভাবে তিনি চারপাশটা দেখতে থাকেন। সারি সারি অ্যাম্বাসেডর, ফলের দোকান, ফুলের দোকান, বখাটে, রিকশাওয়ালা, যাত্রী-অযাত্রী গিজগিজ করছে চারপাশে। ট্রেনের ঘোষণা হয়েছে। এখনি স্টেশনে ঢুকবে ভাগিরথী এক্সপেস, যা দুপুরের পর কলকাতা থেকে ছেড়েছে। আলফাজ মিঞার এই ট্রেনেই আসার কথা। চিঠি পাওয়ার পর দত্তবাবুর দু’রাত ঘুম হয়নি। আলফাজের চেহারাটা মনে করতে দত্তবাবুকে মোটেও কষ্ট করতে হয়নি। আলফাজ পাশের পাড়াতেই থাকত। ভীষণ ডানপিটে ছিল। লটকন, আমড়া, কামরাঙ্গা গাছে আলফাজই উঠত। বর্ষার মৌসুমে রূপসা পাড়ি দিতে চাইত সাঁতরে।

সেই আলফাজ আসছে এতকাল পর। এক সপ্তাহ থাকবে এদেশে। কলকাতা হয়ে দেশে ফেরার মুখে কল্যাণী এসে পরিমলের সাথে দেখা করতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। আনন্দ আর উত্তেজনায় দু’রাত ঘুমাতে পারেননি দত্তবাবু। হঠাৎ দত্তবাবুর মনে হয়, তার ছেলেবেলার বন্ধু, রূপসা নদীপাড়ের বারোহাটি গ্রামের আলফাজ কোনোদিন পরিমলের গায়ে ‘হিন্দু’ ‘হিন্দু’ গন্ধ পায়নি...। অকারণেই দত্তবাবু উদাস হয়ে যান। স্টেশনে সন্ধ্যার আলো জ্বলে ওঠে। ছিন্নমূল কিছু বেশ্যা শেয়ালের চকচকে দৃষ্টি দিয়ে দত্তবাবুকে লক্ষ করে, কিন্তু পাত্তা দেয় না। দত্তবাবুও ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে উদ্দেশ্যহীন। এরমধ্যে সময় চলে যায় খানিকটা। হঠাৎ একটা আওয়াজ তার কানে ধাক্কা দেয়, ‘আচ্ছা ভাই, বিদ্যাসাগর কলোনিটা কোনদিকে হবে?’

হাজারো শব্দের মধ্যে ‘ভাই’ শব্দটি দত্তবাবুকে হঠাৎ নড়িয়ে দেয়। কণ্ঠস্বরটি আবার ডেকে ওঠে, ‘ও ভাই ...?’

কোনো উত্তর আসে না। উত্তর আসবেও না। এখানে ‘ভাই’ শুনলে সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে, যেন ‘এলিয়েন’ দেখছে। দত্তবাবু মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ায়। তার চোখ আটকে যায়, মাঝারি সাইজের দাড়িওয়ালা পাঞ্জাবি পরিহিত শক্ত সোমত্ত একটা লোক, আলফাজ হোসেন। ‘এই যে এইদিকে’-- বলে পরিমল সামান্য এগুতেই, লোকটি হাতের ব্যাগটি মাটিতে ফেলে দৌড়ে এসে দত্তবাবুকে জড়িয়ে ধরে। চিৎকার করে ওঠে, ‘এই পরিমল, হালারপো, তুই কনতে কনে আইসি বদলাইছিস!’

পরিমল বাবুর মনে হয়, এমন উষ্ণ আলিঙ্গন বহু বছর পর পেলেন। আলফাজের গা থেকে আতরের গন্ধ ছাপিয়ে দত্তবাবু পাচ্ছেন-- লটকন, কামরাঙ্গা আর আমড়ার টক টক গন্ধ। এই আলিঙ্গনের মধ্যে দত্তবাবু দ্রুত ভাবতে থাকেন-- আলফাজ কি তার গা থেকে কোনো বেধর্মীর গন্ধ পাচ্ছে; যেটা সৌমেন ঘোষ পেয়েছিল, আজ থেকে অনেক বছর আগে?

এরপর ওরা রিকশায় চড়ে। কল্যাণী শহর দেখে বিস্মিত হয়ে হাসতে হাসতে আলফাজ এসে পৌঁছাল বিদ্যাসাগর কলোনির পরিমল দত্তের বাড়িতে। আলফাজ বলল, ‘এগের দ্যাশে উন্নতি কত; আর আমাগেরে! আসলে দ্যাশপ্রেমটাই আসল।’

দত্তবাবু জিজ্ঞেস করেন, ‘আচ্ছা, আমাদের রূপসায় এখনো নৌকা বাইচ হয়? মনে আছে কি ধুমধাম করে বাইচ হতো?’

‘তা মনে নেই! ওতা কি ভুলা যায়। তয় এখন আর হয় না।’

‘কেন?’

‘আরে, রাজনীতি। বুজলি, রাজনীতিতে সব কিছু খাইয়া নিছে...’

দত্তবাবুর মনে হয়, রাজনীতিই সবকিছু গড়ে আবার রাজনীতিই সব কিছু নিঃশেষ করে দেয়। নিঃশেষ করে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, হালের গরু। অমাবশ্যায় নিরীহ মানুষকে জীবন নিয়ে হতে হয় উদ্বাস্তু। দত্তবাবু মুখ ফসকে বলেন, ‘আচ্ছা, বাজারপাড়ার বশীর, ওমর, আমীররা এখন কোথায়?’

উৎসুক হয়ে আলফাজ জিজ্ঞেস করে, ‘কি’? তারপরই বলে, ‘শোন, আমি ফুচকা খাইছি; আর কফি হাউজও দেখছি-- আহা, “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই...’

আলফাজের হেঁড়ে গলার বেসুরো গানের মাঝে পরিমলের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর হারিয়ে যায়; যা এতদিন দত্তবাবুর মনের গহীনে আটকে ছিল। আর সেও পড়ে থাকে অন্ধকারের রহস্যে ঘেরা অজানা তিমিরে। এবার আলফাজ প্রশ্ন করে, ‘হ্যা রে, তোগে দ্যাশে লোডশেডিং কিরাম?’

আলফাজের মুখে ‘তোগো দ্যাশ’ শব্দটি আবার দত্তবাবুর মাথায় কোথাও আটকে গিয়ে প্রতিধ্বনি তুলতে থাকে। দত্তবাবু অবাক চোখে তার পাশে বসা বন্ধুটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। কিন্তু আলো আঁধারের এই ক্ষণে তার মুখটা বড় আবছা দেখায়।

তারপরের সময়গুলো কেটে যায় দ্রুত। আলফাজ খুব সহজেই দত্তবাবুর স্ত্রী সাবিত্রী বালাকে ভাবি বলে সম্বোধন করে, ব্যাগ থেকে লালপেড়ে বাহারি এক ঢাকাইয়া তাঁতের শাড়ির উপহার দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে, ‘ভাবি পানি দ্যান, অজু করা লাগবি, নামাজের ওয়াক্ত হলো।’

আলফাজ নামাজ পড়ে সাবিত্রীর পুজো ঘরের পাশে। রাতে মসুর ডাল, মাছের ঝোল আর ভাত খেতে খেতে আলফাজ উদার কণ্ঠে হাসে। পরে বলে, ‘আমার ছোট মিয়াডা ভারি সোন্দোর রবীন্দ্রসংগীত গাতি পারে। আমার ইচ্ছে ও শান্তিনিকেতনে পড়–ক।’ আলফাজ তার বাড়ির কথা, পরিবারের কথা দেশের কথা বলে ওদের দু’জনকে মুগ্ধ করে রাখে। দ্রুত সময় গড়িয়ে রাত হয়। আজ রাত গভীরও হয় যেন একটু দ্রুত।

সকালে লুচি তরকারি খেয়ে বাজারের ঝোলা নিয়ে দু’বন্ধু বেড়িয়ে পড়ে। কল্যাণীতে তেমন কিছু সেই অর্থে দেখার স্থান বা জিনিস নেই; তাই ওরা দু’জনে বাজারে যাওয়ার জন্য মনস্থ করে। পথে অনেকেই বিস্মিত হয় এই দাড়িওয়ালা মানুষটিকে দেখে; যদিও এখানে মাঝে মাঝেই পাঞ্জাবী ও শিখ দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া এখানে দাড়িওয়ালা মানুষ যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়; তবুও অতিউৎসাহী কেউ কেউ বলেই বসে, “কি দাদা, এটা কি আপনার দেশের লোক?” “মুসলমান”? দত্ত বাবুর অস্বস্তি বাড়ে, কিন্তু আলফাজ নির্বিকার। সে মন্দির দেখে; পুজোর থালা বহনকারী হিন্দু বৌগুলোকে দেখে অকারণেই মুগ্ধ হয়। বাজারে মাছ বিক্রেতা উঁচু গলায় তাকে ডাকে, ‘বাবু আসেন, এ আপনাদের দেশের চিংড়ি।’ একজন বলে, ‘আজকে মাছ-ই নেন, গোশত তো ও দেশে রোজ খান...’ পাঁচু গোপালের দোকানে একজন বলে, ‘দাদা, ওদেশে কি জঙ্গিরা খুব শক্তিশালী।’ আলফাজ সকলের সাথে হেসেই কথা বলে। তার গলায় অভিমানের লেশ থাকে না বিন্দুমাত্র।

দত্তবাবু বুঝতে পারেন, আলফাজ চলে যাওয়ার পর তাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। এমনকি এবার দূর্গাপুজোর কমিটির সহ-সভাপতির পদটিও হুমকির মুখে পড়তে পারে। একপর্যায়ে তিনি লজ্জিত স্বরে বলেন, ‘তুমি বন্ধু কিছু মনে করো না প্লিজ।’

‘আরে না না, এ দ্যাশের লোকের পিরানশক্তি দেখে আমি অবাক হচ্ছি রে। আমাগের দ্যাশের মানুষগুলান কিমুন ধারা বদলাই যাচ্ছে দিন দিন...’

দত্তবাবু কথাগুলো শুনে যায় ঠিকই, কিন্তু এদেশের মানুষগুলোকেও খুব আন্তরিক ও মানবিক বলে ভাবতে কষ্ট হয়।

তার মনে পড়ে-- সেই দিনের সেই বাঁচার সংগ্রামে, রেশন কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র জোগাড় করা অথবা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে এই হিন্দু দরদি মানুষগুলো কোনোরূপ সাহায্য করেনি। ঘুষ নিয়েছে নির্লজ্জের মতো। তারপরও একটা ভেসে আসা উদ্বাস্তু থেকে রিফিউজিতে পরিণত হওয়া পরিবারের মুখ বুজে মেনে নিতেই হয় সবকিছু। শুধু একখ- মাটির জন্য, একটুকু পরিচিতির জন্য, একটা দেশ পাওয়ার আশায়।

গল্পের এক পর্যায়ে আলফাজ বলে, ‘মহান আল্লাহপাকের দুনিয়ায় কেউই অসহায় না। আল্লাহর এই দুনিয়ায় এই দ্যাশটা না থাকলি, আমাগো বারোহাটি, বটতলা, বারুরী গিরামের জানের ভয়ে পলাইয়া যাওয়া হিন্দুগুলান, কনে গিয়া বাঁচত!’ মুহূর্তে পরিমল দত্তের চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে যায় জোছনাপ্লাবিত রহস্যময় রূপসা, দিগন্তজোড়া সরষে ক্ষেত, অমাবশ্যার রাত, রশির, ওমরদের রক্ত চোখ, রক্তের গন্ধ, বাবা হরিপদ দত্তের বিপন্ন দৃষ্টি, বাঁচার জন্য একখ- মাটির আকাঙ্ক্ষায়-- যাকে তারা দেশ বলবে। এভাবেই কেটে যায় আলফাজ মিঞার বাকি দিনগুলো। আনন্দ আর ছেলে মানুষীতে দুই মধ্যবয়স্ক মানুষ বারবার ফিরে যায় তাদের কৈশোরে। যেখানে কোনো বিধিবদ্ধ সীমানা থাকে না, যেখানে সবাই রাজা। ধর্ম অথবা রাজনীতির নিয়ম, হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ টানতে ব্যর্থ হয়। আলফাজের চলে যাওয়ার আগের দিনে বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ বেড়িয়ে আসে তারা। ফেরার পথে মুর্শিদাবাদের এক গ্রামের মসজিদে নামাজ আদায়ও করে আলফাজ মিঞা। অজু সারতে সারতে আলফাজ বলে, ‘বন্ধু, তুমি তো দেখি এখনো হরিনাম ধরো নাই; ঘটনা কি? তো তুমি ইখানে বসো, আমি নামাজটা সারি ফ্যালাই। হাতের কাছে মজিদ পালাম তো। অবশ্য সফরের সময় অনেক কিছু মাফ আছে...’

পরিমল দত্ত বসে থাকেন। আলফাজের নামাজ শেষ হয়। একসময় ওদের ভ্রমণও শেষ হয়। বাড়ি ফিরে আসে দু’জন। রাতে দত্তবাবুর স্ত্রী আলফাজ মিঞার ব্যাগ গুছাতে সাহায্য করেন হাসি মুখে। পরদিন সকালে প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে পরিমলও তার সাথে বেরিয়ে যান বন্ধুকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য। বাড়ি থেকে কল্যাণী স্টেশন। ট্রেনে তুলে দিয়ে বাইরে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন দত্তবাবু। একসময় গাড়ির দরজার ভিড় ঠেলে গাড়িতে উঠেও পড়েন। আলফাজের কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন, ‘উঠেই পড়লাম। তোকে বর্ডার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’

‘আলহামদুলিল্লহা’-- বলে আলফাজ আবার হা হা করে হসে ওঠে। তার এই দিলখোলা হাসিতে যাত্রীরা কিছুটা বিরক্ত হয়। বর্ডারে পৌঁছুতে খুব বেশি সময় লাগে না। ইমিগ্রেশনের কাজ মিটে যায় দ্রুত। তারপর চেকিং শেষে ওরা এসে দাঁড়ায় একেবারে সীমানায়। এখান থেকে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়। তারপর বাংলাদেশি বি.জি.বি-এর চেকিং। সব কাজ শেষ করে আলফাজ পা বাড়ায়। মৌখিক অনুমতি নিয়ে পরিমলও তার সঙ্গী হন।

আলফাজ বলে, ‘কনে যাচ্ছিস?’

‘যাই তোর সাথে কিছুটা পথ।’

বেশ কিছুটা পথ তারা হেঁটে চলে নির্বাক। তারপর আলফাজ মিঞা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমি আবার আসবানে, আল্লাহ যদি বাঁচায়। এ দ্যাশের মানুষগুলা বড়ই ভালা। এরা আমার বন্ধুরে থাকতি দেছে। একডা পরিচয় দেছে, একডা দ্যাশ দেছে-- আমি কি এগেরে না ভালোবাসি থাকতি পারি! আমি আবার আসবানে। অহন তুই যা পরিমল, আর আসা লাগবিনে। আল্লাহ হাফেজ...’



আলফাজ মিঞা লম্বা পা পেলে এগিয়ে যায় বাংলাদেশের দিকে। পরিমলের মনে হয় বুকের মাঝটা অতি দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মনে হয়, সেই সে দিনের মতো রূপসা নদীটা আবার দূরে সরে যাচ্ছে। পরিমলের চোখটা হঠাৎ জ্বালা করে ওঠে। চওড়া ফ্রেমের চশমা সরিয়ে রুমাল দিয়ে পরিমল দত্ত তার ভেজা চোখ মোছেন। মুছতেই থাকেন। তার ‘মুসলমান বন্ধু’ আলফাজ ক্রমেই হারিয়ে যেতে থাকে দৃষ্টির বাইরে। একজন স্থানীয় ভ্যানওয়ালা হঠাৎই চিৎকার করে বলে, ‘দাদা, ওদিকে গেলে পাসপোর্ট দেখিয়ে যাও; না গেলে ফিরে যাও। তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছো ওটা নো ম্যানস্ ল্যান্ড।’

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন