সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৬

বাম ডান

লিখেছেন-- চরম উদাস

দুনিয়াতে যতদিন ধরে উপর থাকবে ততদিন নিচ থাকবে, শাসক থাকলে শোষিত থাকবে, শ্রেণী থাকলে শ্রেণীবিভাগ থাকবে, বুর্জুয়া থাকলে প্রতিবাদী থাকবে, ডান থাকলে বাম থাকবে।
এক দমে বলে যেতেন কমরেড কামরুল ভাই। কামরুল ভাই আমাদের পাড়ার বাম নেতা। তিনি জন্ম থেকেই বাম। ভাত খান বাম হাত দিয়ে, লেখেন বাম হাত দিয়ে, ব্যাডমিন্টন খেলেন বাম হাত দিয়ে, মেজাজ খারাপ হলে আমাদের থাপ্পড়ও দেন বাম হাত দিয়ে।
মাঝে মাঝে পারুল আপার বাম হাত ধরার চেষ্টা করেন নিজের বাম হাত দিয়ে। বাম হাত দিয়ে বাম হাত ধরা মোটেও সহজ কাজ নয়। সেটা হাত ধরা কম, হ্যান্ডশেক বেশী হয়। কামরুল ভাই শুধু বাথরুমের কাজকর্ম করেন ডান হাত দিয়ে। বাকি সবকিছুতে বাম। এমনকি শহরের মূল অংশ থেকে বড় রাস্তা দিয়ে আমাদের পাড়ায় ঢুকতে হলে ডানের গলিতে ঢুকতে হয়। কামরুল ভাই সেটা না করে একটু এগিয়ে গিয়ে পরের গলিতে বামে মোড় নেন। তারপর আবার বাম, তারপর আবারও বামে মোড় নিয়ে সোজা এসে পাড়ায় ঢুকেন। আড়ালে সবাই তাকে কামরুল না বলে তাই বামরুল বলে ডাকে। তিনি পাত্তা দেন না। এটাকেও পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করেন।

যেদিন আমি এসে খবর দিলাম, কামরুল ভাই পারুল আপার বিয়ে হচ্ছে। কামরুল ভাই সেদিন চে আর মাও এর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করছিলেন। আমার কথা ঠিকমতো শুনতে পেলেন না। মাছি তাড়াবার মতো ভঙ্গী করে বললেন, কথা মধ্যে কথা বলিস না তো। আমি কথার মধ্যেই আবার কথা বললাম। এবারে কামরুল ভাই শুনতেও পেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিড়বিড় করে বলল, হায় হায়। তারপর পিনপতন নিস্তব্ধতা। রনি মাঝখান থেকে ফোঁড়ন কেটে বলে, মনে হয় এটা আমেরিকার ষড়যন্ত্র। কামরুল ভাই রনির দিকে বিষ দৃষ্টিতে তাকান। তবে রনির কথা পুরা মিথ্যাও না। আমেরিকার ষড়যন্ত্র না হলেও, এটা অস্ট্রেলিয়ার ষড়যন্ত্র তো বটেই। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পাত্র দুপুরে মেয়ে দেখতে এসে রাতে বিয়ের কাজ সেরে ফেলেছে।

কামরুল ভাই কয়দিন গুম হয়ে বসে রইলেন। কয়েকবেলা ভুলে ডান হাত দিয়ে ভাত খেয়ে ফেললেন। কয়েকবার ঘুরপথে না গিয়ে সরাসরি রাইট টার্ন নিয়েই পাড়ায় ঢুকে পড়লেন। তারপর আস্তে আস্তে চাঙ্গা হয়ে আগের ফর্মে ফিরে আসলেন। মতিনকে কোন কারণ ছাড়াই বাম হাত দিয়ে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিয়ে বাজখাই গলায় বললেন, ডাক সবাইকে ক্লাবঘরে। আজকে প্রোলেতারিয়েত আর লুম্পেনপ্রোলেতারিয়েত এর পার্থক্য বুঝাই ।

অনেক বছর যোগাযোগ ছিলোনা কামরুল ভাইয়ের সাথে। প্রায় দশ বারো বছর পর নিউইয়র্কে গিয়ে কামরুল ভাইয়ের সাথে আচমকা দেখা। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে একগাদা ডলার গচ্ছা দিয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখে ফেরি থেকে নেমে হোটেলে ফেরত যাবার জন্য ট্যাক্সি খুঁজছি। ঘ্যাঁচ করে এক ইয়েলো ক্যাব ব্রেক করলো। ভেতর থেকে ড্রাইভার চিৎকার করে বলে, আরে তুই মদনা না? মদনা আমার বিশেষ্য না বিশেষণ। ছোটবেলা বুদ্ধিশুদ্ধি খানিক কম ছিল বলে পাড়ার সবাই ওই নামেই ডাকতো। কামরুল ভাইকে শেষ যখন দেখেছি আকারে আমার দিগুণ ছিল। কখনও যদি চে এর মতো সশস্ত্র বিপ্লবে নেমে পড়তে হয় সেই কারণে নিয়মিত মুগুর ভেজে দশাসই শরীর বানিয়েছিলেন। এখন দেখে মনে হল আকারে আমার অর্ধেক হয়ে হয়ে গেছে। লম্বা আগের মতো থাকলেও হাটে কুঁজো হয়ে চুলে পাক ধরেছে। চামড়ায় ভাঁজ।

কামরুল ভাই আমাকে তার ট্যাক্সিতে তুলে নেন। ঝাঁ চকচকে ম্যানহাটন আইল্যান্ড পেরিয়ে মলিন লঙ আইল্যান্ডে ঘুরাফেরা করেন আমাকে নিয়ে।
আমি একথা সেকথার পর বিব্রত গলায় বলি।
- পারুল আপার সাথে দেখা হয়েছিল।
কামরুল ভাই ঠা ঠা করে হাসে আমার কাঁচুমাচু ভঙ্গী দেখে। বলে,
- আরে ধুর মদনা, তুই মদনই রয়ে গেলি। এত বছর চলে গেল এখন কি আর ওইসব মনে আছে। বিয়ে টিয়ে করে তিন বাচ্চার বাপ আমি এখন। বাসায় চল, পরিবারের সাথে মোলাকাত করিয়ে দেই।
তারপর একটু থেমে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে,
- কেমন আছে রে পারুল?

অফিসের কাজে আমাকে বেশ ঘুরাঘুরি করতে হয়। দুই বছর আগে সিডনীতে পারুল আপার সাথে দেখা। এত বছর পরেও মনে হয় পারুল আপা আগের মতোই আছে। দেখলে বোঝা যায়না দুই যমজ ছেলে স্কুল পেরিয়ে কলেজে পড়ে। পারুল আপা আর তার জামাই দুজনেই ভালো চাকুরী করে। দম ফেলার সময় পায়না। কিন্তু দেখে বোঝা গেল, বেশ আছে পারুল আপা।
আমি চোখের পাপড়ি না কাপিয়ে মিথ্যে বলি,
- তেমন ভালো নেই কামরুল ভাই। সিডনীতে মনে হয় অড জব করে। টানাটানি। জামাইও মনে হয়না খুব ভালো কিছু করে।

কামরুল ভাই একটু বিষণ্ণ হয়। কিন্তু সেই বিষণ্ণতার আড়ালে একটা আলোর ঝিলিক আমার চোখ এড়ায় না।
আমরা স্টারবাকসে কফি খেতে খেতে গল্প করি। অনেকদিন পর কামরুল ভাইকে পেয়ে বাম ডান নিয়ে খোঁচা দেয়ার লোভ সামলাতে পারিনা। বলি,
- এই সাম্রাজ্যবাদী দেশেই পড়ে থাকবেন বাকি জীবন? আপনার চে এর দেশ তো এখান থেকে বেশী দূরে না। রওনা দেন একদিন পাতাতরি গুটিয়ে।
কামরুল ভাই এর মুখে আবার আলো খেলা করে। দুচোখে বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে কামরুল ভাই বলে,
- যাবো একদিন চলে সব ছেড়েছুড়ে। এইখানে যেই খরচ, টাকা জমে না রে। তাও আস্তে আস্তে জমাইতেছি কিছু। যাবো একদিন।

কফির বিল আমি দেয়ার চেষ্টা করা মাত্র কামরুল ভাই হৈ হৈ করে আমাকে থামান। পকেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে বিল চুকান। কামরুল ভাইয়ের হাতে ক্রেডিট কার্ড দেখে আমার ভুরু কুঁচকায়। কামরুল ভাইয়ের চোখ এড়ায় না। বিষণ্ণ গলায় বলেন,
একটা সময় ছিল যখন বিশ্বাস করতাম পুরা দুনিয়াতে দুইটা ভাগ। বাম আর ডান। পূর্ব আর পশ্চিম। শোষক আর শোষিত।এখন বুঝি ডান আছে, বাম আছে, উপর আছে, নিচ আছে। উত্তর আছে, দক্ষিণ আছে। আর সবার উপর মাঝখান আছে, যেটা ডানও না, বামও না, উত্তরও না দক্ষিণও না।

আমি কামরুল ভাইয়ের কথা না বুঝেই মাথা নাড়ি। দেশে যতদিন ছিলেন জীবনে কখনো ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলেননি কামরুল ভাই। ব্যাঙ্ক মানেই পুঁজিবাদ। পাড়ায় এইচএসবিসি ব্যাঙ্কের শাখা খোলার খবর পেয়ে কামরুল ভাই আমাদেরকে সাথে নিয়ে বিপ্লবে বেরিয়েছিলেন। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে আমরা যে যেদিক পারি দৌড় দিয়েছি। কামরুল ভাই জায়গায় দাড়িয়ে, 'পুঁজিবাদের কালো হাত ভেঙ্গে দাও, গুঁড়িয়ে দাও' বলে শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছিলেন। পুঁজিবাদের হাত না ভাঙলেও পুলিশের বাড়ি খেয়ে কামরুল ভাইয়ের বাম হাতের হাড় ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল।

বছর পাঁচেক পর অফিসের কাজে আবার নিউইয়র্ক যাওয়া হয় আমার। অফিসের কাজ শেষ করে এবারে হাতে কিছু সময় ছিল। কামরুল ভাইয়ের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করি। কামরুল ভাইকে পাইনা। দেখা হয় রনির সাথে। আগের মতোই বদমাইশ আছে। মুখের লাগাম নেই। কামরুল ভাইয়ের নাম শোনা মাত্র প্রথমে কিছু চ বর্গীয় গালি দিয়ে নিলো। তারপর বলে,
- ওরে মদনা, তুই বামরুল ভাইকে খুঁজিস কেন?
- গতবার যখন এসেছিলাম অনেকদিন পর আচমকা দেখা হল, এখন কই আছে খবর জানিস কিছু?
- বামরুল ভাইয়ের সব নাড়ি নক্ষত্র জানি। আমেরিকা প্রথম এসে আমার এখানেই তো ছিল কিছুদিন। ডিভি পাওয়া মাত্র বাক্স প্যাঁটরা কোনমতে গুছায়ে দৌড় দিছে। বাড়ি ঘর চাকরী বাকরি কোন কিছুর ঠিক নেই। ক্যামনে ক্যামনে জানি আমার ঠিকানা জোগাড় করে এয়ারপোর্ট থেকে আমার বাসায় এসে হাজির। এসে বলে, দেড়শ ডলার ভাংতি আছে তোর কাছে। জলদি দে, আগে ট্যাক্সি বিদায় করি। বোঝ অবস্থা!
- বামরুল ভাই আর ডিভি? গুল কম মার।
- গুল নারে, একেবারে একশ দশ পারসেন্ট সত্য।

আমরা সবাই মিলে একবার ডিভি লটারির ফর্ম পূরণ করছিলাম পাড়ার সাইবার ক্যাফেতে বসে। কামরুল ভাই এসে মতিনকে বাম হাতে রাম চড় বসিয়েছিল। আমাদের বাকিদের দিকে বিষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছ্যাঃ ছ্যাঃ ছ্যাঃ ছ্যাঃ করেছিল অনেকক্ষণ। সেই কামরুল ভাই আর ডিভি, ঠিক হিসেব মেলে না।
- কিন্তু বামরুল ভাই কই এখন?
- সৌদি আরব
- কি? কেন?

রনি নানা রঙ চড়িয়ে গত পাঁচ বছরের কাহিনী বলে। কামরুল ভাই গোটা দশেক ক্রেডিট কার্ড থেকে প্রায় পঞ্চাশ ষাট হাজার ডলার উঠিয়ে সৌদি চলে গেছেন। নানা ব্যাঙ্ক থেকে তাকে গরু খোঁজা হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। কামরুল ভাই একসময় রনির বাসায় ছিলেন বলে সেখানেও ব্যাঙ্ক থেকে খালি ফোন আসে তার খোঁজে। রনি বিরক্ত গলায় বলে,
- ক্রেডিট কার্ড আর ব্যাঙ্কের লোকজন কেমন জোঁক সেটা তো জানিসই। আমার জীবনটা এরা ঝালাপালা করে দিছে রে। যতই বলি বামরুল ভাইকে চিনি না ততই এরা আমাকে ফোনে চেপে ধরে জেরা করে আরও। বামরুল ভাই সব জায়গাতে আমার নাম ঠিকানা কন্টাক্ট হিসেবে দিয়ে রাখছে। বোঝ অবস্থা! ফোন আর চিঠির যন্ত্রণায় পড়ে গত বছর আমি আমার বাসার ঠিকানা, ফোন নাম্বার সব বদল করছি।
- কিন্তু এটা কিভাবে হল। কামরুল ভাই তো সারাজীবন পুঁজিবাদ
- আরে রাখ তোর পুঁজিবাদ।
রনি বিরক্ত গলায় বলে যায়,
-সংযম এক অদ্ভুত জিনিস। যে যেই বস্তুর ব্যাপারে সংযম করে সে সেই বস্তুর ব্যাপারেই কামুক হয়। ভণ্ড হুজুররা বাকি সবার থেকে নারীর জন্য অনেক বেশী কামুক হয়। বামেরা কামুক হয় টাকার জন্য। হুজুরদের আদর্শে নারী নিষিদ্ধ বস্তু। নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানো হারাম। প্যাকেটের বাইরে নারীকে দেখলেই তাই তাদের অতি দ্রুত অর্গাজম হয়ে যায়।
- আর বাম?
-বামেদের জন্য নিষিদ্ধ বস্তু হচ্ছে টাকাপয়সা। বিপ্লবে লোভ করা হারাম, ভোগ করা হারাম, পুঁজিবাদের খপ্পরে পরা হারাম। দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকার কারণেই একটু টাকাপয়সা দেখলে বামেদের অর্গাজম হয় যায়। বিপ্লবের মায়রে বাপ সেভেন আপ বলে জিভ বের করে দৌড় দেয়।
- আর তার পরিবার কই গেল? বউ, তিন বাচ্চা।
- আরে কিসের পরিবার। জলদি জলদি সিটিজেনশিপ পাওয়ার লোভে, তিন বাচ্চা সহ এক মহিলাকে পেপার ম্যারেজ টাইপ করেছিল আরকি। সেই মহিলাকেও কিছু না জানায়ে সৌদি ভেগে গেছে।

পরের বছর রনির ফোন পাই। আমি কিছু বলার আগেই চিৎকার করে বলে,
- বামরুল ভাই আর নেই রে!
আমি আঁতকে উঠি
- নেই মানে? কি বলিস এসব!
- মানে বামরুল ভাই আর বামরুল নেই রে । জামরুল হয়ে গেছে।
- মানে কি?
- শালা মনে হয় জামাতে জয়েন করেছে। আশেপাশে সন্দেহজনক লোকজন ঘুরে খালি। ব্যাটা ছয় মাস আগে সৌদি থেকে হজ্জ করে ফেরত এসেছে। সাথে এই লম্বা দাড়ি আর বোরকা পরা লেবানিজ স্ত্রী। আমি খবর পেলাম মাত্র গতকাল।
- বলিস কি!
- তুই নিউইয়র্ক এসে ঘুরে যা, তামশা দেখতে পাবি।

পরের মাসে যাবার সুযোগ হয় আমার। রনি আর আমি মিলে কামরুল ভাইয়ের বাসায় যাই। প্রায় ছয় বছর পর সৌদি থেকে আমেরিকা এসে উঠেছেন কামরুল ভাই। নতুন ঠিকানায়, প্রায় নতুন পরিচয়ে।
রনি যেতে যেতে আমাকে বলে,
- ভণ্ড বাম যদি ভণ্ড হুজুর হয় তবে কেমন ডেডলি কম্বিনেশন হবে রে?

কেমন ডেডলি কম্বিনেশন সেটা কামরুল ভাইকে দেখেই বুঝতে পারি। কামরুল ভাই কুইন্সের এক ছোটখাটো মসজিদের পেশ ইমাম। সেই সাথে পুরনো গাড়ি কেনা বেচার ব্যবসা খুলে ফেলেছেন। আবার একটা হালাল গ্রোসারি দোকানও দিয়ে বসেছেন। ফতোয়া দিয়েছেন এতদিন দেশী গ্রোসারিতে যেসব মাংস হালাল বলে বিক্রি হতো সেগুলা পুরা হালাল না। সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে জবাই করা হয়না। তিনি 'কামরুল হালাল' নামে নতুন ব্র্যান্ড শুরু করেছেন। সব গরু বা মুরগী জবেহ করার পুরা অংশ ভিডিওতে ধারণ করা হয়। মুরগীর সাথে ভিডিও ফ্রি টাইপ ব্যবস্থা। কারো মনে সন্দেহ থাকলে সেই ভিডিও দেখে প্রকৃত হালাল যাচাই করে নিতে পারে। গাড়ি আর গোস্ত দুটো বেচে কামরুল ভাই লালে লাল হয়ে যাচ্ছেন।

কামরুল ভাইয়ের চেহারা দেখে আমার চোখ কপালে উঠে আরেক দফা। পরনে সাদা আলখাল্লা, গালে দুই হাত লম্বা কুচকুচে কালো দাড়ি।
রনি ফিসফিস করে আমার কানে বলে,
- শালার দাড়ি দেখ! আমার ধারণা ছিল এই রকম দাড়ি শুধু পাকিস্তানে জন্মায়। বাংলাদেশী গালে এরাম পাইক্কা দাড়ি ক্যামনে গজাইলো?
আমি কামরুল ভাইকে জেরা করার চেষ্টা করি,
- আপনার যাবার কথা কিউবা, গেলেন সৌদি আরব। ব্যাপার কি?
কামরুল ভাই অমায়িক হাসি দিয়ে আমার হাত নিজ হাতের ভেতর তুলে নেন। রনি আমার কানে ফিসফিস করে বলে,
- হুজুর হবার পর থেকে কামরুল ভাই হাত নিয়ে বড্ড হাতাহাতি করেন!
কামরুল ভাই আমার হাত কচলাতে কচলাতে মসলিন গলায় বলেন,
- কি কিউবা, কি সৌদি আরব। যেতে তো একদিন হবে তার কাছেই।
- কার কাছে?
কামরুল ভাই আকাশের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে আবার বলেন,
- তার কাছে
রনি পাশ থেকে ফোঁড়ন কাটে,
- কার কাছে? চে?

কামরুল ভাই ইলেকট্রিক শক মতো করে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে অস্তাগফিরুল্লাহ নাউজুবিল্লাহ মিন জালেক আর বলে বিড়বিড় করেন।

নিউইয়র্ক থেকে ফেরার মাসখানেক পর একদিন ফোনে কথা হয় পারুল আপার সাথে। বলি কামরুল ভাই এর সাথে দেখা হয়েছিল। লাজুক গলায় পারুল আপা জিজ্ঞেস করেন,
- কেমন আছে রে বামরুল ভাই?
আমি আবারও মিথ্যে বলি। বলি কামরুল ভাই এর সাথে দেখা হয়েছিল কিউবাতে। ওখানের ছোট এক শহরে থাকে কামরুল ভাই। ছোটখাটো একটা গ্রুপের রীতিমতো নেতা কামরুল ভাই। আমাদের ছোটবেলার ক্লাবঘরের মতোই একটা ক্লাবে বসে মার্ক্স, মাও আর চে কে নিয়ে আলোচনা করে দারুণ জীবন কাটাচ্ছেন কামরুল ভাই।
পারুল আপা বিশ্বাস করে। বেশ খুশী হয় শুনে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
- মানুষটা অনেক বোকা রে। এত আদর্শ নিয়ে কি আর জীবন চলে। এখনও কি আগের মতোই আছে কামরুল ভাই?
আমি সম্মতি জানিয়ে বলি,
- এখনও আগের মতোই আছে। সবসময়ে আসলে এক রকমই ছিল কমরেড কামরুল ভাই।

২টি মন্তব্য: