রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

মার্সিডিজ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

মূল: ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও

অনুবাদ: শামসুজ্জামান হীরা

আপনি যদি কখনও ইলমোরোগ যান, ইলমোরোগে বার এবং রেস্তরাঁয় যেতে ভুলবেন না: ওখানে আপনার স্কুলজীবনের কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে, পুরনো দিনের অনেক স্মৃতি আপনার মনে উঁকি দিতে পারে এবং হারিয়ে-যাওয়া পুরনো বন্ধু ও পরিচিতজনদের খবরাখবর পেতে পারেন। ক’মাইল দূরের একসময়কার ‘শুধুমাত্র ইউরোপীয়দের জন্য’ সোনিয়া ক্লাবের লনের মাঠে গলফ্ ও টেনিস খেলার পর বিশেষকরে শনি ও রবিবার সন্ধ্যায় চিরি শহরের বড়লোকেরা ওই জায়গায় আসেন।
কিন্তু এক বা দুই লিটার টাসকার বা পিলসনারের বোতলের জন্য তাঁরা ইলমোরোগের আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় নিম্ন শ্রেণির অংশে যান। খেয়াল করুন, রেস্তরাঁ হিসাবে ওটা তেমন একটা কিছু নয়; ওখানে চিকেন-ইন-বাস্কেট এবং মদে রান্নাকরা স্টেক জাতীয় খাদ্য খেতে যাবেন না; ওটা প্রসিদ্ধ হল কাঠ-কয়লায় সেঁকা খাসির মাংসের রোস্ট এবং সুসজ্জিতা বার-পরিচারিকাদের জন্য। এবং খোশগল্পের জন্য তো বটেই। ইউ [U] আকারের লাল গদির সোফায় বসুন, যা আপনি সারা কেনিয়ার সব পাবলিক বার-এ দেখতে পাবেন। আপনি কথা বলুন অথবা শুনুন। আচার-আচরণে নিরপেক্ষতার বালাই নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি ভান করছেন: কোনও গোপনীয়তা নেই, অবশ্য যদি না আপনি আলাদা কোনও কামরা ভাড়া করেন।

সেখানে শনিবার এক সন্ধ্যায় দীর্ঘ এক মজাদার গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুনেছিলাম। কখনও মার্সিডিজ বেঞ্জ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পর্কে শুনেছেন? গল্প বর্ণনাকারী, আমাদের কালো স্যুট-পরা ভ্রাতাদের মধ্যে থেকে একজন সাধারণের মতামত যা সবেমাত্র প্রকাশ পেয়েছিল, বলছিলেন দলের উদ্দেশে, বোধ হয় তাঁর অভ্যাগতদের উদ্দেশে, কিন্তু সকলেই শুনতে পায় এতটাই উঁচু স্বরে। সম্ভবত তিনি কিছুটা মাতাল হয়ে পড়েছিলেন; কিন্তু মাঝে মাঝে তাঁর স্বর গম্ভীর ও কিঞ্চিৎ আবেগমথিত শোনাচ্ছিল। আমি ফেনিল বিয়ারে চুমুক দিলাম, আপনি যদি জানতে চান, বলব, আমি একজন শহুরে মানুষ, আমি কান পাতলাম এবং সহসাই কিছু ছড়ানো-ছিটানো সূত্র সংগ্রহ করতে সক্ষম হলাম; তিনি এমন একজন সম্পর্কে বলছিলেন যে একসময় অথবা সাম্প্রতিককালে শুঁড়িখানায় কাজ করত:

...বেশি নয়... বেশি নয় আমি অবশ্যই স্বীকার করব, তিনি বলছিলেন। বিষয়টার সত্যতা, ভদ্রমহোদয়গণ, এমন যে, আমি নিজেই তাকে ভুলে গেছি। আমি এমন কি তার সম্পর্কে আপনাদের কিছু বলতে যেতাম না যদি... হ্যাঁ... যদি সেই হাস্যকর ঘটনায় আকস্মিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে তার নাম প্রকাশ না পেত —, কিন্তু, ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা এ-ব্যাপারে নিশ্চয়ই পড়ে থাকবেন... পড়েননি? তাই?... যাহোক ঘটনাটা ওখানে ঠিকই ঘটেছিল এবং ওটা ইলমোরোগে সত্যি আমাদেরকে ঝাঁকুনি দিয়েছিল। ওটা এমনকি জাতীয় দৈনিকের ক’ইঞ্চি-কলাম জুড়ে স্থান পেয়েছিল। এবং সেটা এমন, আপনারা জানেন, বিশেষভাবে দৃষ্টিআকর্ষণযোগ্য অনেকগুলো বড় কেলেঙ্কারির মধ্যে একটা। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এটাকে বাস্তবে একে অন্যের সঙ্গে মুষ্টিযুদ্ধ ও মল্লযুদ্ধের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিলেন... প্রার্থীরা ভাড়া-করা গুণ্ডাদের হাতে মার খেয়েছিলেন... অন্যেরা রহস্যজনক কারণে মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং মুক্তি পেয়েছিলেন পরের দিন আবার সেই একই ধরনের রহস্যজনক কারণে। একটি রেকর্ড-বৎসর, ভদ্রলোকবৃন্দ, সেটা ছিল এক রেকর্ড-বৎসর। মনোযোগ আকর্ষণ করার যোগ্য এতসব ঘটনা থাকা সত্ত্বেও, কেন কেউ প্রত্যন্ত এক শহরের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে একটি অজ্ঞাতনামা লাশ, এ-ধরনের নেহাত তুচ্ছ গল্পের প্রতি আগ্রহী হতে পারে? এবং তথাপিও এক নম্বর ঘটনা... না, ভদ্রলোকবৃন্দ, আমি এটাকে তত্ত্ব হিসাবে দাঁড় করাতে চাই না... যদিও এটা সত্য কিন্তু তার মৃত্যু বা শেষকৃত্য কখনওই এতটা উত্তাপ ছড়াত না যদি না তা নির্বাচনের বছরে ঘটত।

এখন, আমাকে ভাবতে দিন, বিবেচনা করতে দিন বরং: ওখানে পার্লামেন্টের সেই আসনটি ছিল, যেখান থেকে অত্যন্ত সম্মানীত জন জো জেমস... আপনি কি বিশ্বাস করবেন, তিনি জন কারাঞ্জা হিসাবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর আফ্রিকান নামটি প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই ত্যাগ করেন, মান, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা তাঁর কাছে এটা দাবি করছিল, বুঝলেন... যাহোক, তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসতে চাইছিলেন। সেখানে দলের শাখা পর্যায়ের নেতৃত্বও ছিল, চেয়ারম্যান... দাঁড়ান, তাঁর নাম ছিল রুওরো, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সেই শাখার নেতা হিসাবে বহাল ছিলেন — কোনও সভা নেই, নেই কোনও নির্বাচন, সবকিছু নিজেই চালাতেন — জনগণ তাঁকে শুধু চেয়ারম্যান বলেই ডাকত... তিনিও চাইছিলেন একটি নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ম্যান্ডেট। আঞ্চলিক পরিষদগুলোতে এবং অন্যান্য ছোট পরিষদগুলোতে শূন্যতা ছিল, এতটাই যে উল্লেখ করা কঠিন। কিন্তু পূর্বতন পদাধিকারীরাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যাপক সমর্থন নিয়ে সেসব পদে ফিরে আসতে চাইছিলেন। কেন, আপনি যখন এটা চিন্তা করছেন, কেন যাঁরা ছ’বছর বা তারচেয়েও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছিলেন তাঁরা কাজ থেকে বাদ যাবেন? বিশেষজ্ঞ... অভিজ্ঞ... এসব কিছু এবং আরও কিছু। এবং কেন বেকারত্ব বাড়াবেন? দুর্ভাগ্যবশত সেখানে অনেক ভুঁইফোড় ব্যক্তি ছিলেন যাঁদের ভিন্ন মত ছিল এবং চাইতেন দায়িত্বে হাত লাগাতে। গতিশীলতা... তাজা রক্ত... এসব কিছু এবং আরও কিছু। স্বাভাবিকভাবে, ভদ্রমহোদয়েরা, আমি নিশ্চিত আপনাদের এলাকাতেও এটা সত্য, যাঁরা মনে করতেন ইলমোরোগের মাননীয় এমপি অপেক্ষা তাঁরা অতি নিখুঁতভাবে এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। দেখেছেন, আমি কি বোঝাতে চাইছি? আরও টাসকার বিয়ার, ভদ্রমহোদয়গণ? এই সিস্টার... সিস্টার... যত্তসব বারমেইড!... baada ya kazi jiburudishe na Tusker [সারাদিন কাজের পর আনন্দের জন্য টাসকার – সোয়াহিলি ভাষা।]

হ্যাঁ, প্রথম দফার জনমত-যাচাইমূলক প্রচারাভিযানের ফলাফলের ভিত্তিতে এলাকাটি ক্ষমতাসীন সদস্য এবং অপর তিনজন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র... আপনারা জানেন আজকাল যেমন আপনারা দেখে থাকেন... লুমুম্বা-ছুঁচলো ছাগলে দাড়িঅলা... রোদ-বৃষ্টিতে রং-জ্বলা আমেরিকান শার্ট ও জিনস্... তারা কেবল বিদেশি কাপড়চোপড়ই পরে থাকে... বিদেশি ফ্যাশন... বিদেশি ধ্যান-ধারণা... ডি বুনসেনের আমলে আমাদের সময়ের ম্যাকেরেরের [উগান্ডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম] কথা ভাবতে পারেন? মিহি উলের স্যুট, মাড় দেওয়া সাদা শার্ট, ম্যাচ করা টাই... যা এখন আমি বলি যথাযথ পোশাক... যাহোক, আমাদের ছাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী নিজেকে একজন বুদ্ধিজীবী শ্রমিক হিসাবে দাবি করে এবং সে-কারণে মনে করে, সকল শ্রমিকের আকাঙ্ক্ষা সে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম। সেখানে আরও একজন পদপ্রত্যাশী ছিলেন, যিনি ব্যবসায়ী। এটা একটা মজার ব্যাপার। ইলমোরোগের শপিং-সেন্টারে বিশাল আকারের সেলফ্-সার্ভিস সুপার মার্কেট নির্মাণের জন্য তিনি ঋণ গ্রহণ করেছিলেন। কানাঘুষা চলছিল যে, ওই ঋণের কিছু অংশ তাঁর প্রচারাভিযানে ব্যয়ের জন্য তিনি সরিয়ে রেখেছিলেন। তিনি তাঁর শ্রোতাদের শোনাতেন, মানুষের জন্ম হয় টাকা বানানোর জন্য: যদি তিনি পার্লামেন্টে যেতে পারেন, তিনি এটা নিশ্চিত করবেন যে, প্রত্যেকেরই গণতান্ত্রিক সুযোগ রয়েছে টাকার পাহাড় গড়বার। তিনি নিজে উদাহরণ সৃষ্টি করবেন: একজন নেতাকে তো অবশ্যই নেতৃত্ব দিতে হবে। এলাকাতে একজন সরকারি প্রধানও ছিলেন, বা বলা যায় প্রাক্তন প্রধান, যিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, পার্লামেন্টে তিনি একজন অতি ভালো প্রধান তৈরি করবেন। ঘাম এবং ত্যাগ, তিনি বলে থাকতেন, তাঁর মূল আদর্শ। সেই আদর্শের উদাহরণ স্থাপন করবার জন্য, জনগণের সেবা করবার জন্য তিনি সিভিল সার্ভিসের প্রতিশ্রুতিশীল চাকরি থেকেই শুধু পদত্যাগ করেননি, নির্বাচনী প্রচারণার খরচ নির্বাহের জন্য তাঁর পাঁচটি উন্নত জাতের গাভীর মধ্যে তিনটি বিক্রি করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী অবশ্য আপত্তি করেছিলেন, কিন্তু... সিস্টার আমি আরও খানিকটা বিয়ার চেয়েছিলাম... আমাদের প্রত্যেকের কিছু দুর্বলতা আছে, অ্যাহ্?

প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী ভোট ভাগাভাগি করার অভিযোগে অপর দুজনের বিরুদ্ধে জনসমক্ষে নিন্দা করছিলেন। তাঁরা যদি আন্তরিক হতেন তাহলে কি একজনের পক্ষে অপর দুজন প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সম্মানজনক কাজটা করতে পারতেন না? যাহোক, ক্ষমতাসীন সদস্যের নিন্দার ক্ষেত্রে কিন্তু তিনজনই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন: এলাকার জন্য তিনি কী করেছেন? তিনি শুধু নিজেকে এবং নিজ আত্মীয়দের ধনী বানিয়েছেন। তাঁরা তাঁর ব্যবসায়িক সুবিধার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করতেন, এলাকায় তাঁর অগুনতি ভবন, এমনকি নির্বাচনী এলাকার ছোট্ট পেট্রল-পাম্পেও তাঁর শেয়ার। ব্যবসায়ী প্রার্থীটির জিজ্ঞাসা, ভুলে-যাওয়া কোন উৎস থেকে হঠাৎ করে তিনি এমন সম্পদ লাভ করলেন, এক হাজার একরের একটি কৃষি-খামার? কেন তিনি অন্যদেরকে সাধারণ জলাধারে হাত ডুবানোর গণতান্ত্রিক সুযোগ দেননি? ছাত্রটি জানতে চাইল: তিনি শ্রমিকদের জন্য কী করেছেন? প্রাক্তন প্রধান তাঁকে এই বলে অভিযোগ করলেন যে, তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকা কখনও সফর করেননি। নির্বাচন তাঁর জন্য যেন কোনও নগরে যাওয়ার একমুখি টিকেট। তাঁরা সমস্বরে বললেন: রেকর্ড বলুক, রেকর্ড নিজেই বলুক। যথেষ্ট হাস্যকর, ভদ্রমহোদয়বৃন্দ, ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ঠিক একই শব্দ ব্যবহার করে জবাব দিচ্ছিলেন, — হ্যাঁ রেকর্ড বলুক — কিন্তু তিনি তাঁদের উদ্দেশ করে বিরাট সব অর্জনের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন। প্রথমে তিনি দেখালেন, সরকার কি কি করেছে... সড়ক... হাসপাতাল... ফ্যাক্টরি... পর্যটকদের হোটেল এবং রিসোর্ট... হিলটন, ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং আরও কতকিছু। যারা বলে যে, ‘ওয়ানানচি’র [সাধারণ জনগণ] জন্য সরকার কিছু করেনি তারা গলাবাজি এবং সস্তা রাজনীতির কুচর্চা করে। তিনি মন্ত্রী ছিলেন না, সেহেতু সরকারেও ছিলেন না এই অভিযোগের জবাবে তিনি কেবল অট্টহাস্য করতেন এবং সেইসব অজ্ঞতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতেন। কোত্থেকে সরকার তার শক্তি এবং ক্ষমতা অর্জন করে? কাদের মধ্য থেকে মন্ত্রীসভার সদস্য নির্বাচিত হয়? তিনি তা তৈরি করেছিলেন, এই অভিযোগের জবাবে তিনি অন্যদের ঈর্ষায় ক্রোধান্বিত হওয়া ও জন্মগত অলসতাকে দায়ী করতেন... টেবিলের ওপর একটি জাতীয় কেক রাখা... কিছু লোক এতই অলস ও মোটা যে, আঙুল দিয়ে এক টুকরো কেক তুলে নিতেও অপারগ... অপেক্ষা করে থাকে, কেউ তাদের মুখে তা তুলে দেবে এমনকি তাদের জন্য চিবিয়ে দেবে সেজন্য। প্রাক্তন প্রধানকে লক্ষ করে তিনি বলতেন: এই হবু এমপি কি নন অভিজ্ঞতাহীন একজন... তিনি কি জানেন না যে একজন এমপির কাজ হল পার্লামেন্টে যোগ দেওয়া এবং ভালো আইন প্রণয়ন করা যা চোরদের ফাঁসি দেবে, ভবঘুরে এবং বেশ্যাদের গ্রামে পুনরায় ফেরত পাঠাবে? ঘরে বসে চাঙ্গ’আ [Chang’aa, কেনিয়ার একধরনের কড়া মদ] খেয়ে এবং ষোলগুটি [draughts] খেলে আইন বানানো যায় না। ছাত্রটির জন্য তাঁর ছিল শুধুমাত্র ঘৃণাসূচক অট্টহাসি: বুদ্ধিজীবী শ্রমিক... সে বুদ্ধিজীবী বলতে বোঝায় তাদের, যাদের একটি বৈশিষ্ট্য হল অন্য লোকের গাড়ি ও সম্পদে ঢিল ছোড়া! ভদ্রলোকগণ... প্রচার অভিযানে কিছুই ছিল না, কোনও ইস্যু, কোনও আইডিয়া... কেবলমাত্র অঙ্গীকার। জনগণ ত্যক্তবিরক্ত হল। তারা জানত না কাকে বাছাই করবে, যদিও ব্যবসায়ীটির যুক্তিহীন কথাগুলো তাদের নাড়া দিল। আপনি, আপনার বোতল এখনও খালি... আপনি কি পরিবর্তনের জন্য আরও কড়া কিছু চান? ভ্যাট 69? না?... ওহ্... কি বললেন, চাঙ্গ’আ? হা! হা! হা! ... শক্তির জন্য চাঙ্গ’আ... দ্রুত-আমাকে-মারো [Kill-me-Quick]... না, ওটা কখনও এখানকার স্টকে থাকে না... সিস্টার...এইযে সিস্টার... আরেক প্রস্থ... একই মাল।

আপনি চাঙ্গ’আর কথা বললেন তো। আসলেই এটা ছিল চাঙ্গ’আ, আপনি বলতে পারেন, যা প্রচার-অভিযানকে রক্ষা করেছিল। এটাকে এভাবে দেখুন। ইলমোরোগ বার এবং রেস্তরাঁর নিরাপত্তাপ্রহরী ওয়াহিনিয়া যদি মদে বিষক্রিয়াজনিত কারণে হঠাৎ করে মারা না যেত, আমাদের গ্রাম, আমাদের শহর কখনই কোনও দৈনিক পত্রিকায় স্থান পেত না। মৃত ওয়াহিনিয়া নির্বাচনের সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা সেই সময়ে যখন বরং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কমে-আসা জনসভা যাতে বক্তারা চিৎকার করছিলেন ছাত্রটির ‘আমরা শ্রমিক’ এ-জাতীয় কথার বিপরীতে। অন্যেরা চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলেন। তারাও শ্রমিক ছিলেন। সবাই, ক্ষমতাসীন ব্যক্তিটি বললেন, অলস, শারীরিকভাবে পঙ্গু, বেশ্যা এবং ছাত্র ছাড়া সবাই শ্রমিক। শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন উঠে দাঁড়াল। ইতিমধ্যে জনগণ প্রার্থীদের প্রতি তাদের আদি-সমীহ এবং কৌতূহল ও শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছিল। যাহোক, ওই লোকটি উঠে দাঁড়াল। সে একজন পাঁড় মাতাল — এবং সেদিন সে নিশ্চয়ই একটা কী দুটো গাড়ি ভেঙে থাকবে। গরিব শ্রমিকদের সম্পর্কে কে ভাবে, সে জিজ্ঞেস করল, অন্য বক্তাদের প্রত্যেকের বক্তৃতার ভঙ্গি নকল করে। এখন গরিবরা মারা যায় এবং এমনকি কবর দেওয়ার মত একটা গর্তও তাদের কপালে জোটে না, ভালো কফিনে দাফন করার কথা বাদই দিলাম। জনতা প্রশংসায় হেসে উঠল। আশঙ্কাটা যে ওই লোকটার নিজ সম্পর্কেই তা তারা ভালোই বুঝতে পারছিল। অস্থিচর্মসার লোকটা কবরের কিনারায় এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সে তার বক্তব্যে দৃঢ় থাকল এবং ওয়াহিনিয়ার ঘটনাটা উল্লেখ করল। তার কথায় ছিল বিদ্যুতের ন্যায় কার্যকারিতা। সেই রাতে প্রতিজন প্রার্থী গোপনে একা একা মৃতের স্ত্রীর কাছে গেলেন এবং ওয়াহিনিয়ার শেষকৃত্য আয়োজনের প্রস্তাব দিলেন।

এখন আমি জানি না এটা আপনাদের এলাকায় সত্য কিনা, কিন্তু আমাদের গ্রামে দাফন একটি সামাজিক আচারে পরিণত হয়েছে, আমাদের ককটেল পার্টির এক ভিন্ন রূপ যেন। আমি বোঝাচ্ছি, স্বাধীনতার পর থেকে। ১৯৫২’র আগে, আপনারা জানেন জরুরি অবস্থার আগে মৃতদেহ সরিয়ে নেওয়া হত বিমূঢ় নীরবতা এবং অশ্রুসজলতার মধ্যে। জনগণ, দেখুন, মৃত্যু দ্বারা ভীত ছিল। কিন্তু তারা এটার মুখোমুখি হল যেহেতু তারা জীবনকে ভালোবাসত। তারা জিজ্ঞাসা করত: মৃত্যু কী? এজন্য যে তারা জানতে চাইত জীবন কী! তারা জীবিতদের সান্ত্বনা ও সহমর্মিতা জানাতে আসত এবং সাহায্য করতে আসত দাফন-কর্মে। একটি গর্ত। ধর্মীয় নীরবতায় লোকেরা পালাক্রমে খনন করত। তারপর নগ্ন দেহটি কবরে নামানো হত। প্রথমে ওটার ওপর কিঞ্চিৎ মাটি ছিটিয়ে দেওয়া হত। মৃতদেহ, পৃথিবী, মাটি: কী তফাত ছিল? তারপর এল জরুরি অবস্থা। চতুর্দিকে মারণাস্ত্র। পিতা, মাতা, সন্তান, গবাদিপশু, গাধা — সব মারা হল, মৃতদেহগুলো খোলা জায়গায় রাখা হল শকুন এবং হায়েনাদের জন্য। অথবা গণকবর। মৃত্যু সম্পর্কে মানুষ নির্বিকার হয়ে উঠল: তারা সত্যি জীবনের প্রতি হয়ে পড়ল উদাসীন। তুমি আজ: আমি আগামীকাল। কাঁদছ কেন প্রভু আমার? মৃতের জন্য শোক প্রকাশ করছ কেন? শুধুমাত্র একটাই কান্না ছিল: লড়াইয়ে বিজয়ের জন্য। অন্যকিছুতে ছিল নীরবতা। ভদ্রজনেরা, আপনারা কী ভাবছেন? আমরা এক যুগে কি পারব মৃত্যুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা অর্জন করতে, যেখানে জীবনের চেয়ে টাকাকড়ি বেশি গুরুত্বপূর্ণ? আজ কী অবশিষ্ট আছে? প্রদর্শন-ব্যবসা। মর্যাদা। এমনকি দরিদ্রলোকেরাও ঋণ করে হলেও একজন আত্মীয়র মৃত্যুসংবাদ রেডিওতে প্রচারের এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিজ্ঞাপন পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করে। এবং ফালতু গল্পগুজব, ভদ্রলোকেরা, বাজে বকবকানি। কতজন দাফনে অংশ নিয়েছিল? কত টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল? কফিনটা কেমন ছিল? গর্তটা কি সিমেন্ট করা হয়েছিল? প্লাস্টিকের ফুল: প্লাস্টিকের অশ্রু। এবং এক বছর পর, প্রতিবছর মৃতকে উদ্দেশ করে বিজ্ঞাপন।
ভালোবাসাপূর্ণ স্মৃতিতর্পণ। এক বৎসর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে কিন্তু আমাদিগের নিকট বোধ হইতেছে
ইহা যেন অদ্যকার কথা, তুমি আকস্মিকভাবে তোমার অন্তিম-ইচ্ছা প্রিয়জনদিগকে অবগত না করাইয়াই পরলোকে মহাপ্রস্থান করিলে। প্রিয়বর, সর্বদাই তুমি ছিলে পথপ্রদর্শক একটি নক্ষত্রের ন্যায়, যে নক্ষত্রটি

চিরকাল উজ্জ্বলতা বিকিরণ করিতেই থাকিবে, ... ... ... ইত্যাদি ইত্যাদি।

দেখুন, আমাদের লোক সঠিক ছিল। দরিদ্র হিসাবে মৃত্যুবরণ করা একটি অপমানকর ব্যাপার: এমনকি গির্জাও গরিবের দেহকে মর্যাদা দেয় না, যদিও যাজক দ্রুত মৃত্যুশয্যায় গিয়ে পৌঁছবেন হতভাগাকে ত্বরিত স্বর্গগামী যানে চালান করতে এবং খ্রিস্টের জন্য আরও একজন শিকার হিসাবে তাকে দাবি করতে। সুতরাং, আপনি দেখছেন ওয়াহিনিয়ার মৃত্যু, একজন দরিদ্র শ্রমিকের মৃত্যুতে কী এমন এসে যায়!

আমি জানি না এটা কতটুকু সত্য, কিন্তু শোনা যায় প্রতি প্রার্থী তার স্ত্রীকে টাকা দিতে চেয়েছিলেন যদি সে শেষকৃত্যের সকল ব্যবস্থাপনা এবং শোকভাষণ প্রদান একান্তভাবে তাঁদের হাতে ছেড়ে দেয়... বলুন, সে এই অধিকারকে নিলামে চড়াবে? সম্ভবত... সম্ভবত। কিন্তু ওগুলো কেবলই গুজব ছিল। সত্যি যা আমি জেনেছিলাম, হ্যাঁ, তা সবার-জানা সত্য, স্ত্রী এবং তার স্বামীর দেহ হঠাৎ করে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। আপনি বলছেন, চুরি হয়েছিল? এক অর্থে, হ্যাঁ। গুজব ছিল যে, জে.জে.জে.’র [জে.জে.জে. বলতে জন জো জেমস্ নামের সংক্ষেপ বোঝানো হচ্ছে] হাত ছিল এতে। অন্যেরা এই কাজের নিন্দা জানাতে জনসভা ডেকেছিলেন। কীভাবে একজন একটি মৃতদেহ চুরি করতে পারেন? কী করে একজন নেতা মৃতের এবং জনগণের ভাবাবেগের প্রতি এতটাই কম সমীহ দেখানোর ধৃষ্টতা দেখাতে পারেন? জনতার ভিড় প্রতারিত বোধ করেছিল একটা দাফন-নাটকের দ্বারা। তারা চিৎকার করেছিল: দেহ হাজির কর: দেহ হাজির কর! জনসভা এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ ও দাঙ্গামুখি হয়ে উঠেছিল যে পুলিশ তলব করতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও উত্তেজনা শান্ত করা গেল না। দেহ, দেহ; তারা চিৎকার করছিল। জে.জে.জে. যিনি সাধারণত শান্ত স্বভাবের মানুষ, একবার কী দু’বার তাঁর মুখমণ্ডল মুছলেন। এটা সেই ছাত্রটি, যে সেদিনকার ঘটনা সামাল দিল। সে কেবলমাত্র অদৃশ্য হওয়ার ব্যাপারটি নয় বরং দরিদ্র ব্যক্তিটির পুরো দাফনের সঙ্গে জড়িত ঘটনাবলি তদন্ত করার জন্য একটি তদন্ত-কমিটি গঠন করার পরামর্শ দিল। সব প্রতিযোগীই সেই কমিটির সদস্য হলেন, হ্যাঁ, ক’জন নিরপেক্ষ ব্যক্তিও থাকলেন। কমিটির সভায় কে সভাপতিত্ব করবেন এ নিয়ে সমস্যা দেখা দিল। ভারটা পড়ল দলের আঞ্চলিক শাখার চেয়ারম্যানের ওপর। তারপর থেকে সব প্রার্থী তাঁকে খুশি করার জন্য চেষ্টা চালাতে লাগলেন। গুজব আরও যেন বেশি বিস্তার লাভ করল। সমর্থকদের দলগুলো কমিটিকে অনুসরণ করতে লাগল এবং গ্রামগুলোতে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এবং এখন আশ্চর্যেরও আশ্চর্য। যেমনভাবে হঠাৎ করে সে নিখোঁজ হয়েছিল তেমনভাবেই ওয়াহিনিয়ার স্ত্রী আবির্ভূত হল এবং কোথায় যে সে ছিল তা প্রকাশ করল না। উপরন্তু মৃতদেহটির স্থান হল নগরের শবাগারে। এটা আরও বেশি গুজবের সূত্রপাত করল। কোনও বিয়ারের আসর জমত না এ-সংক্রান্ত গল্প ছাড়া। তদন্ত-কমিটির সুচিন্তিত মতামতের মৌখিক বুলেটিন প্রতিদিন প্রকাশ পেত এবং প্রতিটি শুঁড়িখানার আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হত। চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জনগণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া-ব্যবস্থাপনার যাবতীয় খুঁটিনাটি সম্পর্কে অবগত হত। রাতারাতি, ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল যে, ওয়াহিনিয়া, বলতে গেলে মৃত্যু থেকে জেগে উঠেছিল যেন নির্বাচনের সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয়ে পরিণত হওয়ার জন্য। জনগণ কানাঘুষা করতে লাগল, এই ওয়াহিনিয়াটি কে? তার জীবনের বিস্তারিত উদ্ঘাটিত হতে লাগল: অসংখ্য লোক তার সঙ্গে পরিচয়ের কথা জানাল এবং তাকে নিয়ে মজার মজার গল্প ফাঁদতে লাগল। মৃত, সে হয়ে উঠেছিল জীবন থেকে বড়। মৃত, সে হয়ে উঠল সকলের বন্ধু।

আমি? হ্যাঁ, ভদ্রলোকবৃন্দ, আমিও। আমি তিনটি ভিন্ন উপলক্ষে তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম। যখন সে ছিল একজন মুটে, তারপর একজন বাসের কন্ডাক্টর এবং সবশেষে একজন নিরাপত্তাপ্রহরী। এবং আমি এটা বলতে পারি যে: আশাবাদী থেকে একজন হতাশ মদ্যপে ওয়াহিনিয়ার পরিণতি ছিল আমাদের সময়ের উপাখ্যান। কিন্তু ব্যাপার কী, ভদ্রলোকবৃন্দ? আপনারা পান করছেন না যে? সিস্টার, এই সিস্টার... এই ভদ্রমহোদয়দের দিকে নজর দিন... হ্যাঁ, না তেমন কিছু নয়... মানে, এনাদের এ-প্রস্থ শেষ হওয়ার পরপরই... হ্যাঁ, ভদ্রমহোদয়েরা... জীবন হল মদ্যপান... আনন্দ-উল্লাস... — কোনও তত্ত্ববাক্য বলার ওয়াদা আমি দেইনি... কোনও ধর্মোপদেশ, যদিও আমি এটা আবার বলব: ওয়াহিনিয়ার দ্রুত কবরমুখি হওয়ার কাহিনি আমাদের সমস্যা-সংকুল সময়েরই কাহিনি!

ছোট হলঘরটিতে দীর্ঘ বিরতি নামল। আমি বিয়ারে চুমুক দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অর্ধেক পথে থেমে গিয়ে টেবিলের ওপর গ্লাসটা ফের রেখে দিলাম। আমি একা নই। সবারই গ্লাসের অর্ধেক বাসি বিয়ার স্পর্শহীনভাবে পড়ে রইল। সবাই নিশ্চয়ই গল্প শুনছিলেন। এক গ্লাস বিয়ার হাতে বর্ণনাকারী গভীর চিন্তামগ্নভাবে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, এবং সেই বশীভূতকরা পরিবেশে তাঁর খোলামেলা অভিমত কম আক্রমণাত্মক বলে মনে হচ্ছিল। তিনি নিচে গ্লাসটি রাখলেন এবং তাঁর কণ্ঠস্বর, যখন তা কানে এল, মনে হল শ্রোতাদের মনোযোগী নীরবতা দ্বারা প্রভাবিত:

আমি তাকে যথেষ্ট ভালোভাবে চিনলাম ১৯৬০-এর দিকে, তিনি শুরু করলেন। সেই বছরগুলো, আপনারা যদি স্মরণ করতে পারেন, যখন স্বপ্নগুলো ছিল বাগানের সৌরভ মেশানো বাতাসের মত, যা আমাদের গ্রামগুলির ভেতর দিয়ে ভেসে যেত। বছরগুলো, ভদ্রলোকগণ, যখন ‘উহুরু’র [মুক্তি, সোয়াহিলি ভাষা] কানাঘুষো জনগণের হৃদয়কে আগামীতে কী ঘটতে যাচ্ছে এই ভীতি মিশ্রিত আনন্দে স্পন্দিত করত: যদি কিছু —? কিন্ত না — কোনও অঘটনই সম্ভবত সেই দিনটির আগমন ঠেকাতে পারত না, সিংহদ্বারের খুলে যাওয়া। কল্পনা করুন: কত রক্ত ঝরানোর পর আমাদের সন্তানদের কালো-ক্ষমতার মুখপাত্র নির্বাচন করার ব্যবস্থা আনতে হয়েছিল...কত রক্ত...!

সে-ও, আপনারা ধারণা করতে পারেন, স্বপ্ন দেখত। ভবিষ্যৎ নিয়ে সুন্দর স্বপ্ন। আমি কল্পনা করি যে, যখন চিনির বস্তার ভারে সে কুঁজো, ভুট্টার বস্তা, ‘মাগাদি’ [কেনিয়ার লবণাক্ত হ্রদের নাম] লবণের বস্তা এবং সোডার বস্তার নিচে সে তার নিজের ভুবনে ডুবে থাকত। সবুজ মটরশুটি আর বরবটি ফুলের বাগান। উৎফুল্ল ছেলেপিলেরা মধুলোভী মৌমাছি আর প্রজাপতির পেছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ভ্রমণ করবার জন্য একটি বিশ্ব, জয় করবার জন্য একটা বিশ্ব। আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা, প্রভু, আগামীকাল পর্যন্ত। সে উঁচু-লম্বা এবং কিছুটা দুর্বলমত ছিল, কিন্তু স্বচ্ছ কালো চোখের দৃষ্টি ছিল প্রখর, যা আশা নিয়ে জ্বলজ্বল করত। এবং আপনি কল্পনা করতে পারেন, সে-সময় চিনির বস্তা তার পিঠে হালকা ঠেকত, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নতুন বলে বলিয়ান হত, সে ছিল গল্পের সেই দৈত্যের মত যে পর্বতকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে পারত অথবা কটুশ্বাস ছেড়ে গাছগুলোকে আকাশের দিকে ছুড়ে দিতে পারত। বৃক্ষ, শেকড়, শাখাপ্রশাখা সবকিছু যেন আকাশের উচ্চতায় উড়ত, উচ্চতায়, বৃক্ষ নয় যেন বাতাসে উড়িয়ে নেওয়া পালক। উড়ে যায় পাখি, উঠানের ছোট্ট পাখিটি এবং আবার ফিরে আসে বালিতে জড়ো করতে বাজরা শস্যকণা। সে বোঝাটা নামিয়ে রাখত অজানা গন্তব্যে পাখির উড়ে যাওয়া দেখবে বলে এবং নিঃসন্দেহে তার স্বপ্নও উড়ে যেত বর্তমান আকাশের সীমানা পেরিয়ে। তার আত্মার চোখ ঝাপসা থেকে ঝাপসাতর দিগন্তরেখা যা আগামীর জ্ঞানকে আড়াল করে রেখেছে, তা দেখত। কিন্তু দোকানের কোথাও থেকে তার ভারতীয় মালিকের চিৎকার তাকে ফিরিয়ে আনত বাস্তব দুনিয়ায়। ঝটপট বোঝাটা তোল, আলসে ছেলে কোথাকার। শুধু টাকা চাস, কাজ নয়। তুই কি মনে করিস টাকা ধুলো থেকে আসে, নাকি আকাশ থেকে পড়ে। ‘কুমানিয়োকো’ [মা তুলে সোয়াহিলি ভাষায় অশ্লীল গালি]। সন্দেহ নেই, ওয়াহিনিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ত। সে তো ‘শুক্লা অ্যান্ড শুক্লা’ দোকানের নিছক এক কুলি, সেই বোঝাটির মত একটি বস্তু যার দিকে সে ঝুঁকে ছিল।

‘শুক্লা অ্যান্ড শুক্লা’ : ওখানেই তার সঙ্গে সচরাচর দেখা হত। আমি তখন সিরিয়ানা আবাসিক স্কুলের ছাত্র। সে সময়ে এটা ছিল মিশনারি কার্যক্রমের একটা অংশ, আমি বোঝাতে চাইছি স্কুলটির নিয়মকানুন এবং অসংখ্য বিধিনিষেধের বিষয়টি। যেমন, শনিবার বিকেল ছাড়া আমাদেরকে কখনও স্কুল-প্রাঙ্গণের বাইরে যেতে দেওয়া হত না, তাও আবার তিন মাইল ব্যাসার্ধের বাইরে নয়। চূড়া শহর, যেখানে ছিল ডজন খানেক ভারতীয় দোকান ও একটি পোস্ট-অফিস, শারীরিক ও আর্থিক উভয়দিক বিবেচনা করে ওটাই ছিল নির্ধারিত সীমার মধ্যে আমাদের যাওয়ার মত একমাত্র স্থান। দশ সেন্ট, পঞ্চাশ সেন্ট অথবা এক শিলিং নিয়ে আমরা ওখানে যেতাম, ভাবখানা এমন যে, আমরা কোনও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। সারি সারি দোকানের মধ্য দিয়ে অলস ভঙ্গিতে হাঁটা... তারপর একটা ফান্টা সোডা বা শুক্লা অ্যান্ড শুক্লা থেকে কিছু মাধভানি গামি-ক্যান্ডি... এবং শেষ হত আমাদের দিন। হ্যাঁ, হাতখরচ বাবদ পুরো মেয়াদের জন্য আমি কখনও দুই শিলিংয়ের চেয়ে বেশি পেতাম না। শনিবারের বাইরে যাওয়াটা ফান্টা, মাদাজি বা মাধভানি সহযোগে পালিত হবে এ আশা না করেই প্রায়শ আমি চূড়া’য় যেতাম। একটুখানি মিঠাই, কোমলপানীয় এই ছিল তখন আমার জগত। আপনারা হাসুন। কিন্তু আপনারা কি জানেন, নির্বিচার প্রদর্শনবাদী, যারা ওই জগতে দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত এবং ইঙ্গিতে বোঝাত যে ঘরে তারা আরও বিত্তশালী, তাদের প্রতি আমি কেমন ঈর্ষান্বিত ছিলাম? দোকানে পৌঁছোবামাত্র শত্রু-মিত্র এড়িয়ে চলতে হত আমাকে। আমি মিথ্যা বলতাম এবং বুঝতাম যে ওরা জানত আমি মিথ্যা বলছি, যখন আমি ভান করতাম এমনভাবে যে, সামনে আমার জরুরি কাজ আছে। তথাপিও, আপনারা কি অনুমান করতে পারেন, সত্য জানাজানি হলে কী অবস্থা হতে পারত আমার সে ভয় সম্পর্কে?

ওয়াহিনিয়া নিশ্চয়ই আমাকে দেখেছিল। মনে নেই কীভাবে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং কে প্রথম কথা বলেছিল। যদিও আমার মনে আছে তার পুরনো জীর্ণ পোশাক ও ম্লান হাসি দেখে আমার প্রাথমিক অপ্রস্তুত হওয়ার কথা। মনে হয়েছিল, সে হয়ত আমাকে তার পর্যায়ে টেনে নিচে নামাবে। অন্য ছেলেরা আমার সম্পর্কে কী ভাববে? কত দ্রুত স্কুল মানুষকে আলাদা করে ফেলে! আমার স্কুল ইউনিফরম ভালো রাখার জন্য ঘরে আমি ওর মত জীর্ণ কাপড়ই পরতাম, এবং পেটে খিদে নিয়ে বিছানায় যেতাম। কথাবার্তা থেকে অচিরেই জানলাম যে, আমরা একই অবস্থা থেকে উঠে-আসা। আমরা উভয়েই ইলমোরোগ থেকে এসেছি। আমরা উভয়েই পিতৃহীন: আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন চাঙ্গ’আ বিষক্রিয়ায়: ওর বাবা জঙ্গলে যুদ্ধরত অবস্থায়। আমরা তাই বেড়ে উঠেছিলাম মায়ের আশ্রয়ে, যাকে দৈনিক এক কৌটা আটা বা সামান্য পয়সার বিনিময়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হত। আমরা একই ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতাম: কারিঙ্গস্ ইন্ডিপেনডেন্ট [Karing’s Independent]। কিন্তু আমারটা যখন ঔপনিবেশিক জেলা-শিক্ষা-বোর্ডের অধীনে এল, ওরটা বন্ধ হয়ে গেল এবং বৃটিশরা স্কুল-ভবন আগুনে পুড়িয়ে দিল। আফ্রিকানদের দ্বারা পরিচালিত স্কুলগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী হিসাবে সন্দেহ করা হত। অতঃপর অন্ধ নিয়তি ওয়াহিনিয়া ও আমাকে ভিন্ন পথে স্থাপন করল। তবুও ওর সঙ্গে জড়িত আমার অতীত স্মৃতি থেকে অনুমান করতাম, আমি ওর থেকে সামান্য ভালো অবস্থায় ছিলাম। আমার মনের গভীরে এই আশঙ্কা কাজ করত যে, সে আমার স্কুলে যাওয়া পণ্ড করতে পারে। কিন্তু মাঝে মাঝে সে আমার হাতে কুড়ি বা পঞ্চাশ সেন্ট গুঁজে দিত। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ ছিলাম এবং এটা আমার প্রাথমিক বিরক্তিকে প্রশমিত করেছিল। সুতরাং, আমি তার কষ্টার্জিত অর্থের গ্রহীতা যা আমাকে অবমাননাকর মিথ্যাচার ও ভান করা থেকে উদ্ধার করল এবং অন্যান্য ছাত্রের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড় করালো, তার স্বপ্নের গ্রহীতাও হলাম, — উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ‘তুমি খুব সৌভাগ্যবান’, ওয়াহিনিয়া সবসময় এভাবে কথা শুরু করত, তার চোখ উজ্জ্বল হত। সে তখন আমাকে বলত, কত ভালোবাসত সে তার স্কুলকে এবং বিভিন্ন শ্রেণিতে সে কোন স্থান দখল করত। ‘কিয়ায়ি [Kiai] থেকে স্ট্যান্ডার্ড-৪ পর্যন্ত আমি কখনও তৃতীয় স্থানের নিচে থাকতাম না, বিশেষ করে ইংরেজি... আহ্, কেউ আমাকে ওটাতে ডিঙাতে পারত না... এবং ইতিহাসে... তোমার হয়ত সেই আফ্রিকান রাজাদের কথা মনে আছে যা আমরা পড়েছিলাম? কী নাম ছিল তাদের... চাকা, এবং মোশুয়েশুয়ে... এবং তারা পাথর, বল্লম ও খালিহাতে কীভাবে বৃটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিল...এবং ওয়াইয়াকি, লাইবন, ম্ওয়াঙ্গা, নান্দি সংগ্রাম বৃটিশদের বিরুদ্ধে...’ সে উত্তেজিত হয়ে পড়ত। সে আফ্রিকার প্রথমদিককার বীরদের নাম একের পর এক অনর্গল বলে যেত। কিন্তু আমার জন্য, যে এখন সিরিয়ানায় শিক্ষিত, তার কাছে এগুলো কোনও ইতিহাস নয়। আমি তাকে সত্য ও প্রকৃত ইতিহাস বলতে চাইতাম: কেল্ট, অ্যাংলো-সাক্সন, ড্রেইস এবং ভাইকিং, উইলিয়াম দ্য কনকারার, ড্রেইক, হকিংস্, উইলবারফোর্স, নেলসন, নেপোলিয়ন এবং ইতিহাসের এইসব প্রকৃত বীর। তখন আমি ভাবতাম, সে মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের ইতিহাস বুঝবে না, তার ওপর, সিরিয়ানা সুবিদিত ছিল সেরা এবং কঠিন শিক্ষার জন্য। সে কখনও আমাকে তার কথার মধ্যে ঢুকতে দিত না। বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে চোখ ফেলে তার বীরদের নিয়ে সে তখন আবার ফিরে আসত। ‘তারা কি সিরিয়ানাতে তোমাকে ওই ধরনের ইতিহাস শেখায়? বুঝতে কষ্ট হতে পারে শুধুমাত্র এজন্য... আমি সব যুদ্ধের স্কেচ আঁকতাম... শিক্ষক ওগুলো পছন্দ করতেন... তিনি আমাকে ব্ল্যাকবোর্ডের দায়িত্ব নিতে বলতেন... জানো, ডাস্টার, চক এবং ‘T’ আকারের বিরাট রুলার। তুমি তা জানো?’ সে সিরিয়ানা প্রসঙ্গে আমাকে প্রশ্ন করত: কী বিষয়, কী ধরনের শিক্ষা... ‘ইউরোপীয়, অ্যাঁ? তারা কি মারে তোমাকে? নাকি সুরে ইংরেজি বলা শ্বেতাঙ্গদের অধীনে লেখাপড়া করা কি কঠিন নয়?’ কথা বলার সময় সে আমার জ্যাকেট ও সবুজ টাইয়ের দিকে তাকাত: সে প্রায়ই ল্যাটিনে লেখা স্কুলের নীতিবাক্যের ব্যাজ স্পর্শ করত, এবং অনুভব করতাম সে আমার মধ্যে দিয়ে সিরিয়ানাকে উপভোগ করত। খুব শিগগিরই সে কী হবে তার প্রতীক ছিলাম আমি, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গদের দেশ ত্যাগের গুজব শোনার পর।

এবং, এটা সেরকম, ভদ্রলোকগণ, যেভাবে আমি ওয়াহিনিয়াকে স্মরণ করতে চাইতাম: একটি ছেলে যে কখনও উচ্চশিক্ষা নেওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করতে পারত না। তার চোখ প্রায়শই লাভ করত দূরবর্তী দৃষ্টি, যদিও অস্বচ্ছ, এবং সে অধৈর্য ছিল তার বর্তমান শুক্লা-পরিবেশ এবং সময়ের ধীর গতি নিয়ে। ‘এই কাজ... এখন কিছুসময়ের জন্য...আরও কিছুদিন... আরও সামান্য কিছু টাকাকড়ি... আহ্ আবার স্কুল... তুমি কি মনে কর আমি এটা করতে পারব? আমাদের শিক্ষক... একজন ভালো মানুষ ছিলেন... আমাদেরকে গান গাইতে বলতেন... আমার গলা ভালোই ছিল... একদিন শুনতে পাবে...। তিনি আমাদেরকে বলতেন: ছেলেরা, শ্বেতাঙ্গদের বানানো জিনিসের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ো না: পিন, অস্ত্র, বোমা, উড়োজাহাজ... যা একজন করতে পারে, অন্যজনও পারে... যা এক জাতি করতে পারে অন্যরাও পারে, এবং আরও... একদিন... থাক, ওসব কথা!’ সে যখন তার শিক্ষক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলত, তার চোখ আরও ঝাপসা হয়ে উঠত এবং ক’সেকেন্ডের জন্য সে কিছু বলতে পারত না। এবং তখন যেন নিজ ভাগ্যকে উপেক্ষা করে সে তার শিক্ষকের আপ্তবাক্য পুনরোল্লেখ করত: একজন মানুষ যা পারে অন্যজনও তা পারে। সংবাদপত্র, হ্যাঁ ছাপার অক্ষর তাকে খুব আকৃষ্ট করত। সে সবসময় তার পকেটে ‘দি স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকার পুরনো সংখ্যা বয়ে বেড়াত, এবং খুব কষ্টসহকারে উচ্চারণ করে পড়ে যেত এক চাকরির খবর থেকে অন্যটার। ‘তুমি কী মনে কর, একদিন আমি এটা পড়তে সক্ষম হব? আমি চাই চোখ বন্ধ করে এটা পড়ার অবস্থায় যেতে। নাকি-সুরে এটা পড়া, অ্যাঁ? তুমি এখন আমাকে শব্দগুলোর ওপর হোঁচট খেতে দেখছ। কিন্তু একদিন আমি সহজভাবে পড়ব... পানি খাওয়ার মত সহজভাবে। আচ্ছা এই শব্দটার অর্থ আমাকে বল তো, de...de...deadlo…ck...deadlock, একটা তালা কিভাবে মরতে পারে?’ আমি অবশ্যই স্বীকার করব যে, আমার মধ্যে তেমন কোনও ভাবান্তর আনত না তার সেই উৎসাহ এবং বন্ধনহীন বিশ্বাস, বিশেষ করে ওই দিনগুলো নিয়ে যখন পকেট ছিল ফাঁকা এবং আকাশে কখনও কখনও দেখা যেত বন্দুকের ধোঁয়া।

ভদ্রমহোদয়েরা, আপনারা কিন্তু আপনাদের মদ স্পর্শ করছেন না। মদ খাওয়া ছাড়া আমাদের আর আছেটাই বা কী? মদ্যপান মানুষের ভয়, আতঙ্ক এবং স্মৃতিকে ফিকে করে দেয়... তারপরও আমি ভুলতে পারি না তাকে, শেষবার যখন চূড়ায় দেখেছিলাম সেই স্মৃতি। এরকমই শনিবারের বিকেল। সে রেলক্রসিংয়ের কাছে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি এতে বিব্রত বোধ করেছিলাম এবং আমি সাদামাটা ব্যবহার ও নিরুত্তাপ কথাবার্তা বলেছিলাম। সে উত্তেজিত ছিল। সে আমার পাশ ধরে হাঁটতে লাগল, স্বাভাবিক শুভেচ্ছা বিনিময় করল তারপর পকেট থেকে কিছু একটা টেনে বের করল। দি স্ট্যান্ডার্র্ড-এর একটা পুরনো সংস্করণ। ‘এটা দেখ... এটা দেখ’ একটা পৃষ্ঠা খুলে সে বলল...‘এটা পড়...এটা পড়’, পুরো জিনিসটা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে সে বলল। কিন্তু তবুও সে আমার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে ওটা পড়তে চেষ্টা করছিল, যখন আমরা শুক্লা অ্যান্ড শুক্লা স্টোরের দিকে যাচ্ছিলাম।



আপনি কি বিদেশ যাওয়ার ছাত্র-পরিবহন-বিমান মিস করেছেন?

দেশে বসে বিদেশের শিক্ষা গ্রহণ করুন।

উচ্চশিক্ষার সুবর্ণ সুযোগ।

আকর্ষণীয় পেশার সুযোগ।

সবকিছু যোগাযোগের মাধ্যমে।

আবেদন করুন:

কুইক রেজাল্টস্ কলেজ,

ব্রিস্টল,

ইংল্যান্ড।

পুনশ্চ: আমরা প্রাইমারি থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত সব সেবা দিয়ে থাকি।


এটা আমেরিকা ও ইউরোপে বিমান-পরিবহনের সেই দিনগুলো, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে থাকবে। ওয়াহিনিয়া আমার চার পাশে আনন্দে নাচছিল। সে আমার দিকে অনেক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে থাকল। বিন্তু আমি করেসপোন্ডেন্স স্কুল সম্পর্কে কিছু জানতাম না। ওকে আমার অজ্ঞতা দেখাতে যদিও সাহস হচ্ছিল না; যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষালাভ সম্পর্কে আমি বাজে মন্তব্য করেছিলাম। কিন্তু সে আমার হতাশাব্যঞ্জক উত্তরে মোটেই আগ্রহী ছিল না। তার উচ্চশিক্ষালাভের স্বপ্ন অচিরেই বাস্তবায়িত হবে। ‘আমি এটার ব্যবস্থা করতে পারি...আমি এটার ব্যবস্থা করব... উহুরু আসছে, দেখ,... উহুরু... অনেক চাকরি, ভালো চাকরি... অনেক টাকা... এমনকি ‘শুক্লা অ্যান্ড শুক্লা’র একটা অংশের মালিক বনে যাওয়া... কারণ এই ভারতীয়রা চলে যাওয়ার পথে, তুমি জান... টাকাকড়ি... কিন্তু আমি যা চাই তাহল: আমি অবশ্যই একদিন দি স্ট্যান্ডার্ড নাকি সুরে পড়তে পারব...।’ আমি তাকে শুক্লা অ্যান্ড শুক্লা’র কাছে দাঁড়িয়ে চোখ সরু করে গভীর মনোযোগের সঙ্গে দি স্ট্যান্ডার্ড পাঠরত অবস্থায় ছেড়ে এসেছিলাম, তার চোখ সম্ভবত একটা কিছুতে উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছিল যা পরিচালিত ছিল ভবিষ্যৎ মর্যাদার দিকে। কোনওকিছুই, মনে হয়েছিল কখনও তার বিশ্বাস, তার আকাঙ্ক্ষা তার স্বপ্ন এগুলোকে ভাঙতে পারবে না, এবং তা এমন এক দেশে যাকে এখনও অস্ত্রবাজি, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প এবং বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছিল।

আমি পড়াশোনায় ফিরে গেলাম এবং আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। আমাদের সহপাঠীদের বেশির-ভাগই পরীক্ষায় ভালো করল এবং ম্যাকেরেরেতে সুযোগ পেল, যা তখন ছিল পূর্ব আফ্রিকার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ... না — পুরোপুরি ঠিক নয়... দার এস সালাম’য়েও ছিল, তবে তা সবেমাত্র শুরু হয়েছিল। কোনও ফি নেই। নেই কোনও নিয়ম বা বিধিনিষেধ। আমরা মিহি গ্যাবার্ডিন পরতাম, ধূমপান করতাম এবং নাচতাম। আমাদের এমন কি হাতখরচের টাকাও ছিল। আমাদের দেশগুলোতে উহুরু এসেছিল। আমরা গান গাইতাম, নাচতাম এবং আনন্দাশ্রু ফেলতাম। আগামীকাল। চা-চা-চা। উহুরু। চা-চা-চা। আমরা স্রোতের মত কাম্পালার রাস্তায় নেমে আসতাম। আমরা একে অন্যের হাত ধরে জোরে চিল্লাতাম: উহুরু। চা-চা-চা। এটা এক ধরনের যৌথ পাগলামি ছিল, আমার মনে পড়ে, এবং সেইসব মেয়ে যাদের কটিতে আমরা কটি ঠেকিয়েছিলাম, তারা এর অর্থ বুঝেছিল এবং নিজেদেরকে সত্যি সঁপে দিয়েছিল। আমাদের প্রত্যেকের জন্য একই ঘটনা ছিল। আমি নিশ্চিত, আমাদের কেউই সে রাতে কী ঘটেছিল তার মর্মবাণী বুঝতে পারেনি।

এটা আমরা পরবর্তী বছরগুলোতে জেনেছিলাম এবং সম্ভবত ওয়াহিনিয়াই সঠিক ছিল। এবং কীসব বছর, হা ঈশ্বর! বিস্ময়কর সব বিষয় আমরা শুনলাম ও দেখলাম: তাদের অধিকাংশই, যারা ম্যাকেরেরে থেকে সফলভাবে বেরিয়ে এসেছিল, তাদেরকে জেলা-কর্মকর্তা, শ্রম-কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বিদেশ-বিষয়ক-কর্মকর্তা, এসব চাকরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল — সব ইউরোপীয় চাকরি। উহুরু। চা-চা-চা। অন্যরা তখন ছিল শেল, ক্যালটেক্স, এসসো [Esso] এবং অন্য তেল-কোম্পানিগুলোর বোর্ডে। আমরা ক্বচিৎ আমাদের সুযোগ আসার অপেক্ষা করতে পারতাম। উহুরু। চা-চা-চা। কেউ কেউ এসেছিল বিলম্বে অনুষ্ঠিত তাদের ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তারা এসেছিল কালো স্যুট পরে, ব্যক্তিগত গাড়ি আর উঁচু হিলের জুতো-পরা লাল ঠোঁটের নারী নিয়ে। তারা তাদের চাকরি, তাদের গাড়ি, তাদের কর্মচারী সম্পর্কে কথাবার্তা বলছিল, মেহগনি কাঠের আসবাবে সুসজ্জিত অফিস এবং ইউরোপীয় ও এশীয় সেক্রেটারি সম্পর্কেও। সুতরাং, এগুলো সত্য ছিল, গুজব নয় এবং অবিশ্বাস্য গল্পও নয়। আমরা তখন অপেক্ষমাণ সারির পরবর্তী ব্যক্তি ছিলাম।

আমরা তখন মিঠাই, ফান্টা এবং জিন্জার-এইল [এক ধরনের আদার স্বাদযুক্ত কোমল পানীয়] এগুলোর স্বপ্ন দেখতাম না। গাড়ি ছিল আমাদের তখনকার স্বপ্ন। আমরা গাড়ির নামগুলোর মধ্যে তুলনা করতাম: ভিডব্লিউ [VW: Volks Wagen], ডিকেডব্লিউ [DKW: Dampf-Kraft-Wagen], ফোর্ড প্রিফেক্ট, পিজোঁ [Peugeot], ফ্লাইং-এ [Flying-A]। মার্সিডিজ বেঞ্জ তখনও আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। যাহোক, এটা খুব বিস্ময়কর মনে হচ্ছিল যে, শিগগিরই আমরা ইউরোপীয় ম্যানশনে বসবাস করব, খাওয়াদাওয়া করতে পারব ইউরোপীয় হোটেলে, ছুটির দিনগুলো কাটাব সমুদ্রসৈকতের ইউরোপীয় রিসোর্টে এবং গলফ্ খেলব। এবং চোখের সমুখে এতসব উন্নতি দেখে আমি কীভাবে ওয়াহিনিয়ার কথা স্মরণ করতে পারতাম? আমার শিক্ষা-সমাপ্তির শেষ প্রান্তে ছুটির দিনে এক শনিবারে বাসে চেপে নগরীর দিকে যাচ্ছিলাম, এমন এক জগতের স্বপ্নে বিভোর ছিলাম, যা খুব শিগগিরই হবে একান্ত আমার। অর্থনীতি ও বাণিজ্যে ডিগ্রিপ্রাপ্ত আমার জন্য যেকোনও প্রতিষ্ঠানে ভালো চাকরি জুটিয়ে নেওয়া কোনও ব্যাপারই ছিল না। বাড়ি...গাড়ি... শেয়ার... নির্দিষ্ট এলাকায় জমি, এসবকিছু আমার মনে পাক খাচ্ছিল, যখন আমি লক্ষ করলাম, বাসটি শুধু একা ছিল না, এটা এলাহি-ভরসা নং-১ [Believe In God No.1] নামের অন্য একটা বাসের সঙ্গে বেপরোয়া গতিতে পাল্লা দিচ্ছিল। আমরা যেভাবে বলতাম, আমি দুহাতে পেট চেপে ধরেছিলাম। দুটো বাস তখন এমনভাবে পাশাপাশি ছুটছিল যে, আগত অন্য বাসগুলো পথের পাশে আচমকা থেমে যেতে বাধ্য হচ্ছিল। মনে হল, আমার ভবিষ্যৎ মৃত্যুমুখি বেপরোয়া এই গতির দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। গাড়ির কন্ডাক্টররা বাসের গায়ে বেদম চাপড় দিচ্ছিল এবং তাদের ড্রাইভারকে আরও জোরে চালানোর আবেদন জানাচ্ছিল — বাসটাকে কি যক্ষায় ধরেছে? একইসঙ্গে কন্ডাক্টররা চিৎকার করছিল, অভিশাপ বর্ষণ করছিল তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের কন্ডাক্টারদেরকে উদ্দেশ করে। তারা বাসের ছাদে রেলিঙে ঘেরা মালপত্র বহনের জায়গায় উঠছিল এবং তারপর বাসের পাশ দিয়ে নিচে ঝুলে পড়ছিল, বানরের মত। তারা মৃত্যুকে নিয়ে খেলা করছিল, মজা করছিল, মৃত্যুকূপের খেলোয়াড়ের [একটা বিরাট আকারের কাঁচের সিলিন্ডারমত কূপের খাড়া দেওয়ালে মোটরসাইকেল চালিয়ে ওপরে-নিচে ওঠানামার ভয়ঙ্কর খেলা।] মত, আমি একসময় এক সফরকারী ভারতীয় সার্কাস-দলে এটা দেখেছিলাম। আপনারা বাসে অতি আতঙ্ককর উত্তেজনা পরখ করতে পারতেন। একপর্যায়ে আতঙ্কের আতিশয্যে এক নারী আর্তনাদ করে উঠল এবং মনে হল এটা যেন কন্ডাক্টরদেরকে ও ড্রাইভারকে একরকম উৎসাহ জোগাল। হঠাৎ করেই এলাহি-ভরসা নং-১ বাসটি সক্ষম হল আমাদের বাসটাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে, এখন আপনারা দেখতে পারেন আমাদের বাসের কন্ডাক্টরদের আশাহত চাউনি, সেইসঙ্গে যাত্রীদের চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ। তারপর আমি যখন সাহস করে তাকালাম, দেখলাম বাসের কন্ডাক্টরদের মধ্যে একজনকে, যে আর কেউ নয়, ওয়াহিনিয়া।

যেন চরম অবিশ্বাস নিয়ে এদিক-ওদিক মাথা নেড়ে সে বাসের ভেতর এল। তাকে এখন যেন আরও দুর্বল দেখাচ্ছিল কিন্তু সারা মুখে গভীর বলিরেখাসহ তার চেহারায় এসেছিল পরিপক্বতার ছাপ। আমি নিজের অজান্তেই সংস্পর্শ এড়াতে আমার আসনে আরও সরে বসলাম। কিন্তু সে নিশ্চয়ই আমাকে দেখে থাকবে, কারণ হঠাৎ করেই তার চোখজোড়া দপ করে জ্বলে উঠল, বাসের সবাই শুনতে পায় এমনভাবে আমার নাম ধরে চেঁচিয়ে ধেয়ে এল আমার দিকে। ‘বন্ধু...বন্ধু আমার’ সে বলে উঠল আমার পাশে বসে তার হাত দিয়ে আমার হাত আঁকড়ে ধরে, আমার কাঁধে জোরে থাপ্পড় মেরে। আগের চেয়ে সে অনেক কম সংযত ছিল এবং কথাবার্তা নিচুস্বরে বলার পরিবর্তে এমনভাবে বলছিল যা অন্যদের শব্দকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। ‘এখনও ম্যাকেরেরেতে? তুমি ভাগ্যবান, অ্যা! কিন্তু চূড়াতে আমাদের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ কর? সেই ভারতীয়রা... তারা যায়নি... আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে... কিন্তু এটা ভালো যে আমাদের লোকেরাও উন্নতি করছে... যেমন এই বাসগুলোর মালিক... এই তো কিছুদিন আগে সে ছিল মাতাতু [ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের মিনিবাস জাতীয় গাড়ি] ড্রাইভার... এখন তাকে দেখ, দশ বাসের বহর...! একদিন সে ১০০,০০০ শিলিং গুনতে পারবে। খারাপ না, কি বলো? তুমি তাড়াতাড়ি লেখাপড়া শেষ কর। তোমার মত শিক্ষিত লোকেরা সহজেই ঋণ পাবে। একটা ব্যবসা শুরু করবে... এই বাস-মালিকের মত... তুমি তাকে চেন? এই এলাকার এমপি... জন জো জেমস্, বা জে.জে.জে... সত্য কথা বলতে কী আমি ব্যবসা করতে চাই... কিছু টাকাকড়ি... একটা পুরনো পিজোঁ কিনব... মাতাতু দিয়ে শুরু করব... আমি তোমাকে বলছি, দ্রুত টাকা বানানোর পথ হল পরিবহন ব্যবসা, অন্য কোনও ব্যবসা এটাকে টেক্কা দিতে পারে না... অবশ্য বাড়ি কেনা এবং ভাড়া দেওয়ার কথা আলাদা... ওস্তাদ, আরও তেল লাগবে,’ এবং হঠাৎ, আমি অবশ্যই স্বস্তির সঙ্গে বলব যে, সে উঠে দাঁড়াল এবং জনশূন্য স্থান ধরে দ্রুত ছুটে গেল। সে অন্য এক বাসের দিকে নজর রাখছিল। যাত্রীর জন্য প্রতিযোগিতা আবার সর্বত্র শুরু হবে।

আমি কিছুটা দুঃখিত হলাম। ঘরে বসে বিদেশের উচ্চশিক্ষা লাভ করবার দুর্নিবার আশা লালন করত যে ছেলেটি কী এমন ঘটল তার জীবনে? আমি দ্রুতই এই আকস্মিক ঝাঁকুনিকে নাকচ করে দিলাম আমার নিজের স্বপ্নের দ্বারা এবং চেষ্টা করলাম আত্মার সেই মধুরতম অবস্থাকে পুনরায় উপলব্ধি করতে যা সুস্বাদু খাদ্য খাওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ভয়াবহ সেই মারণ-গতি আমার উদ্দীপনাকে ভোঁতা করে দিল।

‘কী বলেন? আমার প্রাণবায়ুর সুস্থতা কামনায় আরও এক গ্লাস? স্বাগত মধুর মদিরা... মধুর আলাপচারিতা... কিন্তু ব্যাপার কী ভদ্রমহোদয়গণ? পান করুন... আমি বলি, ভালো সুরা এক-অর্থে জীবনের শোণিত।

গ্রাজুয়েশনের এক সপ্তাহ পর আপনারা আমাদের দেখে থাকবেন। আমরা মদ খেয়েছি হাস্যকরভাবে। স্বর্গের ফটক তখন উন্মুক্ত, কারণ আমার কাছে ছিল তার চাবি... চাবি... দুনিয়াতে প্রবেশের সিসেম খুলে যাও! জানবেন, এটা অতটা কুসুমাস্তির্ণ ছিল না, যা কাজ শুরু করবার সময় মনে হয়েছিল। আমি এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম যার সবগুলো ভালো পদই শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা পূর্ণ ছিল... বিশেষজ্ঞ, জানেন... একজন প্রশিক্ষণের কাজে এতটাই সময় ধরে লেগে থাকত যা তার ধৈর্যের ওপর চাপ ফেলত... বিশেষ করে স্বাধীনতার চার বছর পর। এটা কি এখনও তেমনই? এক-হিসাবে হ্যাঁ... বিশেষজ্ঞ যারা সত্যিকার অর্থে আপনার অধীনে, বেতন পায় আপনার চেয়ে বেশি... এবং আসল সিদ্ধান্তগুলো ওরাই নেয়... তথাপিও আমি বলতে পারি না যে আমি হতাশ... । যদি আপনি কঠোর পরিশ্রম করেন আপনি অন্য কোথাও সুযোগ পেতে পারেন... সরকারি ও ব্যাংক-ঋণসহ...। সেদিন নিজের জন্য আমি ছোট একটা শামবা [শস্যক্ষেত্র] পেয়েছিলাম... এক হাজার একর... কয়েকশ’ গাভী... এবং একজন ইউরোপীয় ম্যানেজারসহ...। ‘বাগান’টা ভালোই চলছে। এবং সেজন্যই আমার হাতে কটা সেন্ট জুটছে মদ খাওয়ার জন্য... কখনও-সখনও... আমাদের পছন্দের বার সবসময় এটাই ছিল... এটা আমাকে পুনর্মিলন উৎসবের আমেজ এনে দেয়... এবং এখানে দেখতে পাই, আপনারা জানেন, পরিচিত দেশি লোকজন...। সব থেকে বড় কথা মানুষের থাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা... এবং সময়-সময় তারা সুন্দরী লাস্যময়ী বারপরিচারিকা নিয়োগ দেয়...। মানুষকে বাঁচতে হবে... তাইনা? একজন এখানে ছিল... বিশাল নিতম্ব... তাকে তারা মার্সিডিজ বলে ডাকত... আমারও পছন্দ ছিল বড়তেই... যাহোক একদিন ভীষণভাবে আমি তাকে চাইছিলাম। আমি নিরাপত্তাপ্রহরীর দিকে চোখ টিপে ইশারা দিলাম। নিচু হয়ে বিলের ওপরপিঠে একটা চিরকুট লিখলাম: আজ রাতে সে [পরিচারিকা] কি ফ্রি থাকবে? তারপর মাথা তুললাম। আমার সামনেই নিরাপত্তাপ্রহরী দাঁড়িয়েছিল। কোফিয়াসহ [কানাহীন গোল টুপি] গায়ে চাপানো তার বড়সড় কাবুতি [জ্যাকেট ধরনের পরিধেয়] এবং হাতে দৃঢ়ভাবে ধরা বোকোরা-ক্লাব [ঔপনিবেশিক আমলে কেনিয়ার সাধারণ জনগণের ওপর গণ্ডারের চামড়ায় তৈরি যে চাবুক বৃটিশরা ব্যবহার করত]। আমার মনে হল, সে নতুন কেউ একজন। তারপর চোখাচোখি হল। আরে! এ-যে ওয়াহিনিয়া।

সে ক’মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করল। সাময়িক সিদ্ধান্তহীনতা। হাত বাড়িয়ে আমি ডেকে উঠলাম, ‘ওয়াহিনিয়া?’ সে আমার হাতে হাত মেলাল এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জবাব দিল, ‘জি, স্যার,’ কিন্তু আমি লক্ষ করলাম তার ঠোঁটের প্রান্তে বিদ্রূপের হাসি। ‘তুমি কি আমাকে চিনছো না?’ ‘জি, চিনেছি,’ কিন্তু কন্ঠস্বর বা ব্যবহারে তার কোনও প্রতিফলন দেখা গেল না। সে বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি কিছু চাইছিলেন?’ আমি আতঙ্কিত হলাম। আমি তখন বিব্রত বোধ করলাম। ‘আমার পক্ষ থেকে পান করবে?’ ‘আমি আপনার বিল পাঠিয়ে দেব। কিছু মনে করবেন না, খদ্দেররা যতক্ষণ থাকেন, আমাদের মদ খাওয়া নিষেধ, তাই আমি পরে খাবো।’ সে তার কর্মস্থলে চলে গেল। তার হাতে চিরকুটটা দেওয়ার সাহস আমার হয়ে উঠছিল না। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ঝড়ের গতিতে মার্সিডিজ 22oS হাঁকিয়ে আমি বাড়ি ফিরে গেলাম। লোকটার জন্য আমি কী করতে পারতাম? তার স্বপ্নগুলোর কী হয়েছিল? ... সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং তার চোখে কণাপরিমাণ উজ্জ্বলতাও আর ছিল না। এবং তারপরও, পরবর্তী ছুটির দিনে আমি আবার সেখানে ছুটে গেলাম। সেই পরিচারিকা। তার সমগ্র শরীরের রসালো বস্তুগুলো যেন চিৎকার করে জানান দিচ্ছিল: আমাকে উপভোগ করুন, আমাকে উপভোগ করুন। কিন্তু আমি কাকে ওর কাছে পাঠাতে পারি? আমি আবার নিরাপত্তাপ্রহরীকে ডেকে পাঠালাম। যুক্তি দিলাম; ওই ধরনের ছোটখাট সেবাগুলো দেওয়ার জন্যই তো তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদের জন্য সে বার্তা নিচ্ছিল, নয় কি? আমি তাকে চিরকুটটা দিলাম এবং স্থূলাঙ্গিনী সেই পরিচারিকার দিকে ইঙ্গিত করলাম। সে হাসল, তার চোখে কোনও দ্যুতি নেই, সে হাসল, তার চাকরির সেই যান্ত্রিকভাবে রপ্ত-করা বোধ থেকে ও তার যা প্রয়োজন তা থেকে। সে এক বার্তা নিয়ে ফেরত এল: ‘হ্যাঁ: রুম নম্বর ১৪। নগদ।’ আমি তার হাতে ২০ শিলিং দিলাম, আর হ্যাঁ, এটা আমি কীভাবে তাকে দিতে পেরেছিলাম... বকশিশ... ২ শিলিং বকশিশ... যা সে গ্রহণ করেছিল একই রকম যান্ত্রিক কায়দায়। ওয়াহিনিয়া! নারী-পুরুষের গোপন বিষয়ের বাহকের পর্যায়ে নেমে এসেছে!

মাঝে মাঝে সে মাতাল অবস্থায় কাজে আসত, এবং আপনারা এটা বলতে পারতেন তার চোখের জ্বর-জ্বর চাউনি দেখে। সে কথা বলত, এমনকি গর্ব করত তার আওতায় থাকা রমণীদের নিয়ে, কী পরিমাণ মদ সে গিলতে পারত তা নিয়ে। তারপর সে দাসসুলভ আনুগত্য মেশানো গলায় ক’টা পয়সা চাইত একটা সিগারেট কেনার জন্য। শিগগিরই আমি জানতে পারি কী করে সে বাসের কন্ডাক্টরের চাকরি হারিয়েছিল। যাত্রীর জন্য যখন বেপরোয়া গতিতে প্রতিযোগিতা করেছিল, তার বাসের সঙ্গে অন্য আরেক বাসের সংঘর্ষ হয়েছিল। ড্রাইভারসহ যাত্রী নিহত হয়েছিল বেশ ক’জন। সে-ও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর তার কোনও চাকরি ছিল না। জে.জে.জে. তাকে এমনকি সামান্য সাহায্যও করতেন না... বিষয়টা নিয়ে ওয়াহিনিয়া এমনভাবে কথা বলত যেন সে প্রচণ্ড মানসিক বিকারগ্রস্ত। এবং তবু যখন সে একফোঁটাও খেত না, শান্ত থাকত, নিজেকে গুটিয়ে রাখত তার কোফিয়া ও কাবুতির ভেতর। কিন্তু সপ্তাহ এবং মাস পেরিয়ে গেল, শান্ত সময়গুলো হয়ে পড়ল বিরল থেকে বিরলতর। সে বারে একজন অতিপরিচিত ব্যক্তিতে পরিণত হল। সময় সময় সে বেতনের পুরোটাই আগাম নিয়ে মদ খেয়ে উড়িয়ে দিত, এবং মাসের শেষের দিকে এক গ্লাস খেতে অথবা পঞ্চাশ সেন্টের জন্য হাত পাততো কারও কাছে। সে এরই মধ্যে গেলা শুরু করেছিল ‘কিরুরু’ [ক্ষতিকর মদ] ও চাঙ্গ’আ। সেই মুহূর্তগুলোতে সে আচ্ছন্ন হয়ে থাকত স্বপ্ন এবং অসম্ভব পরিকল্পনা নিয়ে। ‘দুশ্চিন্তা করো না, আমি মার্সিডিজ বেঞ্জে মারা যাব... হেসো না... আমি সঞ্চয় করব, ব্যবসায় নামব এবং তারপর একটা কিনব, আমি কাজ ছেড়ে দেব। আমি বাঁচব এবং মরব লর্ড ডিলাম্যায়ারের মত।’ মহল্লার লোকেরা তার নতুন নাম রেখেছিল, ‘ওয়াহিনিয়া বেঞ্জি’। আমি প্রায়শই আশ্চর্য হতাম, সে কি কখনও চূড়ার দিনগুলো স্মরণ করত!

এক শনিবার রাতে সে এল এবং আমার পাশে বসল। তার সাহসিকতা আমাকে বিস্মিত করল, কেননা সে ছিল নরম স্বভাবের। আমি তাকে মদ সাধলাম। সে খেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করল। তার গলার স্বর ছিল নিচু এবং চাপা, কিন্তু কিঞ্চিৎ পুরনো দীপ্তি ছিল তার চোখে।

‘তুমি আমাকে এখন ধ্বস্ত দেখছ, কিন্তু আমি প্রায়ই নিজেকে জিজ্ঞেস করি, এটা কি ভিন্নতর কিছু হতে পারত? একটা সম্ভাবনা — শিক্ষা, তোমার মত। চূড়ায় আমাদের সেই দিনগুলো তুমি কি স্মরণ কর? অ্যাহ্, বহুদিন আগে... অন্য জগত... সেই করেসপোন্ডেন্স স্কুল, তুমি কি এগুলো মনে কর? হ্যাঁ, আমি কখনও টাকা পাইনি। পরবর্তীকালে এটা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায় স্ত্রী ও এক সন্তানের বোঝা কাঁধে এসে চাপায়। দেখ, এটা একটা স্বস্তিকর ব্যাপার ছিল। আহ্, কিন্তু কিছু টাকা... আরও কিছুটা শিক্ষা... আমাদের শিক্ষক... তাঁকে তোমার মনে আছে? তাঁর সম্পর্কে আমি তোমাকে প্রায়ই বলতাম। আমাদেরকে উদাহরণ হিসাবে কী বলতেন? একজন যা করতে পারে অন্যজন তা পারে: এক জাতি যা পারে অন্যরাও তা পারে... তুমি কি মনে কর এটা সত্য? তোমার শিক্ষা আছে: তুমি ম্যাকেরেরেতে শিক্ষা পাওয়া: তুমি এমনকি ইংল্যান্ড যেতে পার কোইন্যাঞ্জের ছেলের মত ডিগ্রি আনতে। আমাকে বল: এটা কি প্রকৃতই সত্য? আমাদের মত সাধারণ লোক যারা একশব্দ ইংরেজি বলতে পারে না, তাদের জন্য সত্য? এভাবে এটাকে দেখ, আমি কঠিন কাজ করতে ভয় পাই না, ভয় পাই না ঘাম ঝরাতে। তিনি আমাদের সবসময় বলতেন: উহুরুর পর আমাদেরকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে: ইউরোপীয়রা আজ যেখানে, তা তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফল: এবং যা একজন মানুষ করতে পারে, অন্যজনও পারে। তিনি ভালো মানুষ ছিলেন, সবসময় আমাদেরকে মহান আফ্রিকানদের সম্পর্কে বলতেন। তারপর একদিন... একদিন... দেখ, আমরা সবাই স্কুলে ছিলাম... তখন কিছু শ্বেতাঙ্গ এল, জনিরা [Johnnies, স্কটল্যান্ডবাসী] এবং তাঁকে আমাদের ক্লাশরুম থেকে বাইরে নিয়ে গেল। আমরা ভয়ে মাটির দেওয়ালের ওপর উঠলাম। কয়েক গজ দূরে নিয়ে গিয়ে ওরা তাঁকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল এবং গুলি করে হত্যা করল।

ওয়াহিনিয়ার মদ্যপান এমন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সে চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছিল। আমি তাকে কখনও তেমন ধ্বংস দশায় দেখিনি, কারণ প্রোগ্রেস ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল-এর দায়িত্ব পালনের জন্য আমাকে দেশের বাইরে যেতে হয়েছিল। কিন্তু এখনও আমি যেমন বলছি, আমি আমার চারপাশে তার উপস্থিতি অনুভব করি, তার গর্ব, তার স্বপ্ন, তার মদ্যপান, আর হ্যাঁ, সেই সর্বশেষ সাক্ষাতের ঘটনা।

বর্ণনাকারী এক কী দুই গ্লাস একের পর এক দ্রুত গিলে নিলেন। আমি তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলাম। এটা এমনটাই মনে হচ্ছিল যে, আমরা প্রত্যেকেই যেন একটা নোংরা দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম এবং সবাই চাইলাম ওটার স্মৃতি ভুলে যেতে। কিছুক্ষণ পর বর্ণনাকারী অতিমাত্রায় নির্লিপ্ততা ও হেঁয়ালিপনা দিয়ে বিষণ্ন পরিবেশটাকে হালকা করবার চেষ্টা করলেন: ‘দেখুন ভাগ্যের কী পরিহাস, ভদ্রজনেরা, মৃত ওয়াহিনিয়া এখন হয়ে উঠেছে একটা বিশিষ্ট কিছু, এমনকি তার সাবেক নিয়োগকর্তা জে.জে.জে এখন মরিয়া তার জন্য,’ কিন্তু তিনি কাউকে বিভ্রান্ত করতে পারলেন না। তিনি তাঁর বিনোদনের স্বাভাবিক হালকা মেজাজকে আর যেন ফিরিয়ে আনতে পারছিলেন না। সেখানে, স্বভাবতই, আমাদের পেছনে ছিল চূড়া-পর্ব। ওয়াহিনিয়া, যার সঙ্গে কখনও আমার সাক্ষাৎ হয়নি, কিন্তু যাকে আমার খুব চেনা মনে হল, আমাদের মদ্যপানের শান্তিকে তাড়া করে ফিরছিল। কেউ কেউ বললেন, ‘এটা করুণার বিষয় যে, সে কখনও মার্সিডিজ বেঞ্জ পায়নি — অন্তত চড়বার সুযোগও।’

আপনাদের ধারণা ভুল, বর্ণনাকারী বললেন। একদিক দিয়ে সে সেটাও পেয়েছিল। আপনারা মাথা নাড়ছেন, ভদ্রমহোদয়গণ? আমাদেরকে মদ দিন সিস্টার, আরেক প্রস্থ।

সব ধন্যবাদ প্রার্থীদের নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে। যদিও তাঁরা সবাই দাফনকর্মের ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত কমিটির সদস্য ছিলেন, তাঁরা একটা যৌথ উদ্যোগে একমত ছিলেন না। প্রত্যেকেই, দেখুন, চাইছিলেন যেন তাঁর দেওয়া পরিকল্পনাটি গ্রহণ করা হয়। প্রত্যেকেই চাইছিলেন, কোনওকিছুর দানকারী হিসাবে একমাত্র তাঁর নাম উল্লেখ করা হোক। দু’একটি মারমুখি অধিবেশনের পর, কমিটি একটি নীতিমালার ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

আইটেম নং-১। অর্থ। এটা সিদ্ধান্ত হল যে, প্রত্যেকের দেওয়া অর্থের পরিমাণ শেষকৃত্যের দিন প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হবে।

আইটেম নং-২। পরিবহন। শবাগার থেকে মৃতদেহ পরিবহনের জন্য জে.জে.জে. তাঁর গাড়ি দিতে চাইলেন, যেটাকে তিনি তাঁর স্ত্রীর কেনাকাটার ঝুড়ি বলে আখ্যা দিতেন, একটা একদম নতুন হালকা নীল রঙের কোর্টিনা জিটি, কিন্তু অন্যেরা আপত্তি জানালেন। সুতরাং, সিদ্ধান্ত হল যে, চারজনই সমপরিমাণ অর্থ দেবেন একটা নিরপেক্ষ গাড়ি ভাড়া করার জন্য — পিজোঁ ফ্যামিলি স্যালুন।

আইটেম নং-৩। কবর। চারজনই, আবার, কবর খনন ও সিমেন্ট করার খরচ সমভাবে বহন করবেন।

আইটেম নং-৪। কফিন এবং ক্রস। এ বিষয়ে তাঁরা একমত হতে পারছিলেন না যৌথ অংশগ্রহণে। প্রত্যেকেই চাইছিলেন কফিন ও ক্রসের একক দাতা হতে। লক্ষ করুন, তাঁরা কিন্তু কেউই বিশ্বাসী হিসাবে পরিচিত ছিলেন না। একটা সমঝোতা হল শেষতক: তাঁরা একটা নিরপেক্ষ কফিন যা মৃতদেহকে শবাগার থেকে গির্জা এবং গির্জা থেকে কবরস্থান পর্যন্ত বহন করবে তার জন্য প্রত্যেকেই সমপরিমাণ টাকা দেবেন। কিন্তু প্রত্যেকেই তাঁদের নিজেদের কফিন ও ক্রস আনতে পারবেন এবং জনতা সেগুলোর মধ্যে থেকে সেরাটা বেছে নেবে। দেখুন কী চমৎকার অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র!

আইটেম নং-৫। শেষকৃত্য-ভাষণ। নিজেদের আনা কফিন ও ক্রস প্রদর্শনের পর প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত থাকবে পাঁচ মিনিটের ভাষণ।

আইটেম নং-৬। দিবস। এটা নিয়েও চলেছিল মতদ্বৈততা, কিন্তু অবশেষে যে-কোনও একটা রবিবারকেই উপযুক্ত দিবস বিবেচনা করা হল।

সেটা ছিল একটা সপ্তাহের মত সপ্তাহ, ভদ্রজনেরা। প্রতিরাত প্রতিটি বার পূর্ণ থাকত লোকে, যারা আসত জল্পনা ও গুজব সংগ্রহ করতে। কেনাকাটার দিনগুলোতে লোক উপচে পড়েছিল। বাসে অন্য কোনও আলাপ ছিল না, কন্ডাক্টরদের ছিল প্যাসেঞ্জারদেরকে ওয়াহিনিয়া-গাঁথা শুনিয়ে আনন্দ দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। প্রার্থীদের ভালো-মন্দ: কোনও প্রসঙ্গই তখন আলোচনায় স্থান পেত না। তখন শুধুই ওয়াহিনিয়া আর শেষকৃত্যানুষ্ঠান।

বিশেষ দিনের রবিবারে, বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী, প্রোটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক, মুসলমান এবং দু-একজন সম্প্রতি রাধা-কৃষ্ণানে ধর্মান্তরিত ইলমোরোগের প্রেসবিটেরিয়ান গির্জা-চত্বরে জমায়েত হল। ইলমোরোগে প্রথমবারের মত সকল বার, এমনকি যেগুলো নিষিদ্ধ চাঙ্গ’আ বিক্রির জন্য কুখ্যাত ছিল একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সেই এক রবিবার সকালে ইলমোরোগ যেন ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছিল। কাছের এবং দূরের গ্রামগুলো থেকে এসেছিল বাড়তি লোকের দল। কিছু এসেছিল অনেক দূর থেকে বাস বা লরি ভাড়া করে। এমনকি পুরোহিত রেভারেন্ড ব্ওয়ানা সলোমন, যিনি সাধারণত চার্চে নিষ্ক্রিয় সদস্যদের শব, যদি না তাঁরা খুব ধনী ও স্বনামখ্যাত হত, গ্রহণ করতেন না, এবার সকাল সকাল এসে হাজির হলেন রজত-স্বর্ণের ফিতায় জড়ানো কৃষ্ণবর্ণের জমকালো পরিচ্ছদে আচ্ছাদিত হয়ে। একটি সত্যিকার স্মরণীয় শেষকৃত্য, বিশেষ করে যখন অপূর্ব কম্পিত কণ্ঠে রেভারেন্ড সলোমন উচ্চারণ করছিলেন: ‘আশীর্বাদপুষ্ট সেইসব বিনীত ও দরিদ্রজন, কেননা তাহারা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হইবে: আশীর্বাদপুষ্ট যাহারা শোক প্রকাশ করে, কেননা তাহারা স্বস্তি লাভ করিবে।’ শেষকৃত্যের ধর্মীয় আচারের পর আমরা পায়ে হেঁটে, কারে, লরিতে, বাসে করে কবরস্থানের দিকে রওনা হলাম, যেখানে আমরা আরও বেশি লোককে দেখলাম বসে থাকতে। সৌভাগ্যক্রমে জেলা-কর্মকর্তার চিন্তাশীল কৃপায় এমনভাবে লাউডস্পিকারগুলো বসানো হয়েছিল যে, যারা অতিদূর প্রান্তে ছিল তারাও যেন বক্তৃতা এবং শেষকৃত্য-ভাষণ স্পষ্ট শুনতে পায়। প্রার্থনার পর আবার রেভারেন্ড সলোমন তাঁর অপূর্ব কম্পিত কণ্ঠে অনেকের হৃদয় দখল করে নিলেন। প্রতিজন প্রার্থী যে-পরিমাণ অর্থ দান করেছিলেন তা ঘোষণা করা হল।

ব্যবসায়ী দিয়েছিলেন সাতশ’ পঞ্চাশ শিলিং। খামারমালিক দিয়েছিলেন দুশ’ পঞ্চাশ। জে.জে.জে. দিয়েছিলেন এক হাজার। ওহ্, একথা শোনামাত্র ব্যবসায়ীটি মাইক্রোফোনের দিকে ছুটে গেলেন আরও তিনশ’ অতিরিক্ত দেওয়ার ঘোষণা দিতে। ব্যবসায়ীর অতিরিক্ত উপহার দেওয়ার ঘোষণা জনতার মধ্যে সপ্রশংস গুঞ্জনধ্বনির সৃষ্টি করল। সবশেষে ছাত্রটি। সে দিল মোটে কুড়ি শিলিং।

আমরা যেজন্য শ্বাসরোধ করে অপেক্ষা করছিলাম তাহল, কফিন এবং ক্রস উপহার। কে কাজটা শুরু করবেন, এ-নিয়ে কিছুটা বিবাদ দেখা দিল। প্রত্যেকেই তাঁদের নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। কী আর করা, শেষপর্যন্ত লটারির আশ্রয়। ছাত্র, খামারমালিক, ব্যবসায়ী এবং জে.জে.জে. এভাবে ঠিক হল ক্রম।

ছাত্রটি বারবার তার লুমুম্বা ছাগলে-দাড়ি ধরে টানছিল। সে ঐশ্বর্য এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিরুদ্ধে বাক্যবাণ বর্ষণ করে চলেছিল। সে শ্রমিকদের নিয়ে কথা বলছিল। সরলতা এবং কঠোর শ্রম, এটাই হওয়া উচিত আমাদের জাতীয় আদর্শ। এবং সেই আদর্শ রক্ষা করতে সে একটি সাধারণ কাঠের কফিন ও ক্রসের ব্যবস্থা করেছে। উপরোন্তু যিশু তো ছিলেন নেহাত একজন কাঠ-মিস্ত্রি। বক্তব্য-শেষে যখন ছাত্রটি নেমে আসছিল তখন কিছুলোক উল্লাস প্রকাশ করেছিল।

তারপর এলেন খামারমালিক। তিনিও সরলতা এবং কঠোর শ্রমে বিশ্বাসী। তিনি মাটিতে বিশ্বাসী ছিলেন। একজন সরকারি প্রধান হিসাবে তিনি সবসময়ই ওয়ানানচিকে উৎসাহ দিতেন তাদের কৃষিকাজের দেশপ্রেমিক উদ্যমে। তাঁরটাও ছিল নিতান্ত একটা কাঠের বস্তু, কিন্তু সামান্য ভিন্নতাসহ। তিনি ইতিমধ্যেই কাজে লাগিয়েছিলেন একজন জনপ্রিয় চিত্রশিল্পীকে দুধে পূর্ণ ওলান ও বোঁটাসমেত একটি সবুজ গাই আঁকার জন্য, যিনি এঁকেছিলেন আমাদের বারের ম্যুরাল বা মৎস্যকন্যা। ভিড়ের মধ্যে থেকে মজার অট্টহাসি উঠল।

ব্যবসায়ীটি আমাদের জন্য কী আনছেন? তিনি তাঁর কালো স্যুট পরে, ঠেলে বেরিয়ে-আসা উদর নিয়ে এবং তীব্র প্রত্যাশাসহ অনুষ্ঠানে উঠে দাঁড়ালেন। জনগণের এটা নিয়ে মাথাব্যথা হওয়ার কিছু নেই যে, কিছু লোকের এমন ভালো কিছু কখনও ছিল না। যা দরকার ছিল তাহল পৃথিবীর সব ওয়াহিনিয়ার গণতান্ত্রিক সুযোগ। কিছু সম্পদ গড়ে তোলার সুযোগ, যেন মৃত্যুর পর তাদের বিধবা ও অনাথরা মাথা গোঁজার সুন্দর ঠাঁই পায়। তিনি তাঁর সমর্থকদের আহ্বান করলেন। তারা কফিন উন্মোচন করল। এটা সত্যি ছিল বিশদ একটি ব্যাপার। এটা তৈরি করা হয়েছিল বহুতল-বিশিষ্ট কাঁচের জানালাসহ হিলটন হোটেলের আদলে। নাটকের নতুন মোড়ে ভিড়ের মধ্য থেকে প্রশংসা এবং সন্তোষের উচ্ছ্বসিত শিস ভেসে আসছিল। তাঁর অনুসারীরা কফিনের কাপড় খুলে ফেলল। ধবধবে শাদা কাপড় যা আবার আনন্দসূচক শিসের মাধ্যমে বাহবা লাভ করল। ব্যবসায়ীটি তখন এমন এক খেলোয়াড়সুলভ ভঙ্গি নিয়ে নেমে এলেন যিনি দীর্ঘদিনের একটা রেকর্ড ভেঙেছেন এবং নতুন একটা গড়েছেন যার সমকক্ষতা সম্ভবত কখনও অর্জন করা যাবে না।

এখন সবাই জে.জে.জে’র জন্য অপেক্ষা করছিল। পার্লামেন্টের ছ’বছর তাঁকে একজন ঝানু অভিনেতায় পরিণত করেছিল। তিনি সময় নিলেন। কাগজপত্রে ঠাসা তাঁর চামড়ার ব্রিফকেসটা সঙ্গে ছিল: তিনি তাঁর গজদন্তে তৈরি ছড়ি এবং ফ্লাইহুইস্ক [চামর জাতীয় বস্তু। কেনিয়াতে সম্মান ও প্রতিপত্তির প্রতীক হিসাবে গণ্য করা হয়।] তুলে নিলেন। তাঁর ভুঁড়ি যদিও বড় কিন্তু দেহের উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি তাঁর দীর্ঘ মেয়াদকাল এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বললেন। আগেকারদিনে জনগণ খতনা না-করা কোনও ছেলেকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পাঠাত না, প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে আড়চোখে খানিক তাকিয়ে তিনি বললেন। তিনি সবসময়ই দরিদ্রদের জন্য লড়াই করেছেন। কিন্তু এমন একটা বেদনাবিধুর অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে তিনি শ্রোতাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চান না। তিনি মৃত্যুর মধ্যে রাজনীতি আনতে চান না। তিনি যা চান তা শুধুমাত্র মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নয়, মৃতের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনও। এখন, ওয়াহিনিয়ার মৃত্যুর আগে তিনি প্রায়ই শুনেছেন... কিন্তু, অপেক্ষা করুন! এটা তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে বিশেষ ইঙ্গিত ছিল। কফিনটি উজ্জ্বল লাল রঙের কাপড়ে মোড়ানো ছিল। ধীরে ধীরে তারা ওটা উন্মোচন করল। ভিড়ের মধ্যেকার লোকজন অন্যদের পিঠে উঠে ওই জিনিসটি একনজর দেখবার চেষ্টা করছিল। হঠাৎই ভিড়ের লোকদের মধ্যে সহজাত কেমন এক হাঁফিয়ে ওঠার ভাব জন্ম নিল, শেষপর্যন্ত যখন তারা দেখল কফিন ওপরে তোলা হয়েছে। এটা মোটেই কোনও কফিন ছিল না, ছিল সত্যিকার নতুন মডেলের ঝকঝকে মার্সিডিজ বেঞ্জ; দরোজা, গ্লাস এবং মেরুন রঙের পর্দা ও ব্লাইন্ডসহ।

তিনি চাইছিলেন প্রকাশিত হবার প্রতিক্রিয়া পূর্ণতা লাভ করুক। শুধুমাত্র মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা, তিনি বলে চললেন যেন তেমন কিছুই ঘটেনি। মারা যাওয়ার আগে ভ্রাতা ওয়াহিনিয়া একটি বেঞ্জে মৃত্যুবরণ করবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি প্রত্যাশিত প্রশংসার জবাব দিতে তুলে ধরেছিলেন ফ্লাইহুইস্ক, এবং চোখে ধরে রেখেছিলেন সাদা রুমাল।

কিন্তু কোনও প্রশংসাধ্বনি শোনা গেল না, এমনকি তাঁর সমর্থনে কোনও গুঞ্জনধ্বনিও। খারাপ কিছু একটা ঘটেছে, আমরা প্রত্যেকেই তা অনুমান করলাম। এটা যেন ছিল সযত্ন কৌশলে গড়া এক কৌতুকের মত, যা আচমকা মাঠে মারা গেল। অথবা হয়ত আমরা সবাই ছিলাম প্রকাশ্য ময়দানে একটা অশোভন ঘটনার সাক্ষি হতে। জনগণ উঠে দাঁড়াল এবং হেঁটে চলে যেতে লাগল, যেন বা তারা এই অশোভনতার অংশ হতে চায় না। জে.জে.জে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীগণ এবং তাঁদের ভাড়া করা কিছু সমর্থক কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছিলেন, নিঃসন্দেহে এই বিস্ময় নিয়ে যে, এরই মধ্যে কী এমন খারাপ ঘটেছিল! হঠাৎ জে.জে.জে. তাঁর গাড়িতে ফিরে গেলেন এবং তা চালিয়ে চলে গেলেন। অন্যরাও দ্রুতই স্থান ত্যাগ করলেন।

ওয়াহিনিয়াকে তার আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা অতি সাধারণ কফিনে করে কবর দিল, যা অবশ্য রেভারেন্ড সলোমন কর্তৃক আশীর্বাদকৃত ছিল।

নির্বাচন সম্পর্কে, মানে তার ফলাফল আমি বোঝাতে চাইছি, সে সম্পর্কে খুব কমই বলার আছে। আপনারা জানেন যে, জে.জে.জে. এখনও পার্লামেন্টের সদস্য। নির্বাচনে কারচুপির স্বাভাবিক একটা রটনা ছিল,... ইত্যাদি, ইত্যাদি। ছাত্রটি পেয়েছিল একশ’ ভোট এবং ফিরে গিয়েছিল তার বিদ্যালয়ে। আমি বিশ্বাস করি, সে বাণিজ্যে ডিগ্রি নিয়ে পাশ করেছিল, এবং আমার মত একটি ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দিয়েছিল। সে ঋণ পেয়েছিল, অ-নাগরিক ভারতীয়দের কাছ থেকে বাড়ি কিনে নিয়েছিল এবং সে এখন নগরীর একজন বড় ভূসম্পত্তির মালিক। ইউরোপীয় মালিকানাধীন একটি এস্টেট এজেন্সি তার বাড়িগুলোর দেখভাল করে।

ব্যবসায়ীটি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ঋণের টাকায় গভীর এক গর্ত খুঁড়েছিলেন। তাঁর দোকান ও তিন একরের প্লট নিলামে উঠেছিল। জে.জে.জে. তা কিনে নিয়েছিলেন এবং পরপরই আবার তা ভালো লাভে বেচে দিয়েছিলেন। খামার-মালিক প্রধানটিও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর উন্নত জাতের গাভীগুলো — সব ফ্রিসিয়ান — একজন এমপি হওয়ার প্রত্যাশায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন। জে.জে.জে. এ-ব্যাপারে নজর রেখেছিলেন, তিনি যেন আর কখনও আঞ্চলিক প্রধানের চাকরি ফেরত না পান ।

আপনারা মাকুয়েনি চাঙ্গ’আ শুঁড়িখানায় যান, যেখানে ওয়াহিনিয়া তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে মদ খেতো, এখন আপনারা ওখানে দুজন নিঃস্ব লোককে দেখতে পাবেন, এখন একে অপরের পরম বন্ধু, কারও জন্য অপেক্ষারত, যে তাঁদের এক বা দুই ক্যান কেএমকে [KMK, Kill-me-Quick] কিনে দেবে। দাম মাত্র পঞ্চাশ, তাঁরা আপনাদের বলবেন।

জে.জে.জে এখনও মার্সিডিজ বেঞ্জ চড়েন — এখন 66oS

ঠিক আমারটার মত এবং আমার দিকে তাকান, হ্যাঁ, সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে! এখন থেকে চার বছর... কে জানে, বলা যায় না কিছুই।

ভদ্রমহোদয়গণ, যাওয়ার আগে আরেক প্রস্থ চলুক, কি বলেন?




টীকা:
তৃতীয় বন্ধনীর ভেতরকার ব্যাখ্যাগুলো অনুবাদকের।




ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও : সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

কেনিয়ার কিয়াম্বু জেলার লিমুরু শহরের কাছে কামিরিথুতে ৫ জানুয়ারি, ১৯৩৮ সালে ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও-র জন্ম। ঔপনিবেশিক আমলে ব্যাপটাইজ করে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল জেমস্ ন্গুগি।

তিনি উগান্ডার ম্যাকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে ইংরেজিতে বিএ পাশ করেন। সেই সময়েই, অর্থাৎ ছাত্রাবস্থায়, ১৯৬২-তে তাঁর লেখা The Black Hermit নামের নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ১৯৬৪ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস Weep Not, Child, প্রকাশিত হয়। এটি লেখেন ইংল্যান্ডের লিডস্ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে। এটা কোনও পূর্ব আফ্রিকান লেখকের ইংরেজিতে লেখা প্রথম উপন্যাস। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস The River Between, রচিত হয় ১৯৬৫-তে। ১৯৬৭ সালে রচিত হয় তাঁর সাড়া জাগানো উপন্যাস A Grain of Wheat। এই উপন্যাসে ফ্যানোনিস্ট মার্কসিজমের প্রতি তাঁর ঝোঁক লক্ষ করা যায়। তিনি ইংরেজি, খ্রিস্টধর্ম এবং তাঁর নাম জেমস্ ন্গুগিকে ঔপনিবেশিক ক্ষতচিহ্ন আখ্যা দিয়ে তা ত্যাগ করেন এবং ফিরে যান ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও নামে; লেখালেখির কাজও করতে থাকেন তাঁর মাতৃভাষা গিকুয়ু এবং সোয়াহিলিতে।

ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও ১৯৭৬ সালে তাঁর নিজ এলাকায় `কামিরিথু কমিউনিটি এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার ‘ স্থাপনে সহায়তা করেন। এটি অন্য কার্যক্রমের পাশাপাশি এলাকাতে আফ্রিকান নাট্য-আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে ব্যাপৃত থাকত। ১৯৭৭-এ তাঁর অসেন্সরকৃত নাটক I Will Marry When I Want কেনিয়ার তদানীন্তন ভাইস-প্রেসিডেন্ট দানিয়েল আরাপ মোইকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে এবং থিয়োঙ্গ’ওকে গ্রেপ্তার করা হয়। জেলখানায় অবস্থানকালে তিনি টয়লেট-পেপারের ওপর গিকুয়ু ভাষায় প্রথম আধুনিক নাটক Caitaani mũtharaba-Inĩ [Devil on the Cross] রচনা করেন। বৎসরাধিক কাল জেল খেটে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু তাঁকে আর নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদে পুনর্বহাল করা হয় না। সেই সময়কার স্বেচ্ছাচারী সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ করায় তাঁকে বলপ্রয়োগে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

তাঁর পরবর্তী কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, দুটো ছোটগল্প সংকলন A Meeting in the Dark [১৯৭৪], Secret Lives, and Other Stories [১৯৭৬]; Detained [জেলখানার ডায়েরি – ১৯৮১], Decolonising the Mind: The Politics of Language in African Literature [নিবন্ধগ্রন্থ – ১৯৮৬], Matigari [উপন্যাস – ১৯৮৭], Wizard of the Crow [উপন্যাস – ২০০৬], Something Torn and New: An African Renaissance [নিবন্ধগ্রন্থ – ২০০৯], আত্মজীবনীমূলক দুটো গ্রন্থ, Dreams in a Time of War: a Childhood Memoir [২০১০] এবং In the House of the Interpreter: A Memoir [২০১২]।
ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও তার প্রতিটি রচনায় ফুটিয়ে তুলেছেন পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার সমাজ-জীবনের বিভিন্ন দিক, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন ঔপনিবেশিক শক্তির দানবীয় রূপ। আবার স্বজাতির হীনম্মন্যতা, লাম্পট্য, স্বাধীনতা-উত্তর লুটপাটের চিত্র তুলে ধরতেও পিছপা হননি। আফ্রিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভয়াবহ দুর্দশার চিত্র তাঁর মত এমন নিখুঁতভাবে আর কে-ই বা ফোটাতে পেরেছেন? পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব তাঁর লেখায় বড় স্থান দখল করে থাকে। মানব-মনের বিচিত্র ও জটিল দিক ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর যে মুন্সিয়ানা তা পাঠককে সম্মোহিত করে নিয়ে যায় অন্য এক জগতে।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার একজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে বারবার ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও-র নাম আলোচনার শীর্ষে উঠে আসে।

ন্গুগি ওয়া থিয়োঙ্গ’ও বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, আরভিন-এ ‘ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্য’র একজন সম্মানীত অধ্যাপক [Distinguished Professor]|

‘মার্সিডিজ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ তাঁর অতি বিখ্যাত গল্প `A MERCEDES FUNERAL’-এর অনুবাদ। অনুবাদের ক্ষেত্রে মূলানুগ থাকবার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে।






অনুবাদক পরিচিতি
শামসুজ্জামান হীরা

মুক্তিযোদ্ধা
গল্পকার। অনুবাদক

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন