রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

তমাল রায়'এর গল্প : একটি ভালো না লাগার গল্প

আর, যাঁর সাথে তেরো বছরের এই ঘর-সংসার, বালিশ-বিছানা, আলো-অন্ধকার, তাঁকে হঠাৎই মেয়েটির আর ভালো লাগল না। অথচ, তাঁর সাথেই তো কেটেছিল তেরোটি মূল্যবান বসন্ত। বয়সে বছর পনেরো বড় হলে কী হবে, তিনি ছিলেন স্নেহশীল, যত্নবান এবং মনোযোগী। তাঁর দিন শুরু হত মেয়েটার বিছানার পাশে গরম ধূমায়িত চায়ের কাপ রাখা দিয়ে। ফ্রিজ থেকে আনাজপত্রগুলো বার করে কলের তলায় রেখে পরিষ্কার করে ধুতেন। তারপর ছুরি দিয়ে সবজিগুলো কেটে পাত্রে রাখতেন এবং আবারও ধুতেন কলের তলায়। আসলে অপরিচ্ছন্নতা ছিল মেয়েটির দু'চোখের বিষ।
তাঁর দিনের দ্বিতীয় কাজ ছিল মেয়েটির ব্রেকফাস্ট রেডি করে তার সামনে রাখা। যদিও তা কখনো মেয়েটি খেত, কখনো খেত না। কেননা ওর হাতে থাকত অত্যন্ত অল্প সময় এবং ওকে কাজে যেতে হত এই ছোট্ট টাউন থেকে ছাব্বিশ কিলোমিটার দূরের এক শহরে। ফলতঃ ওর সময় ছিল কম। অবশ্য দায়িত্ব ছিল যথেষ্ট! সে বসত একটি কেতাদুরস্ত আই.টি অফিসের ফ্রন্ট অফিসে। টেলিফোনে তাঁর সুরেলা গলার মাধ্যমে পৌঁছে যেত বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক উত্তর। ফলে তাঁর সময় ছিল অত্যন্ত কম এবং দাম ছিল অত্যন্ত বেশি। অন্ততঃ অফিস তো তাই মনে করত। দুপুরে তাপ নিয়ন্ত্রিত লাঞ্চবক্স থেকে মেয়েটি যখন তার গরম খাবার বের করে প্লেটে রাখত বোঝা যেত এটি ছিল সেই পুরুষটির দিনের তৃতীয় কাজ। যদিও তের বছর পর হঠাৎই মেয়েটির আর ওকে ভালো লাগল না। সে যাই হোক লাঞ্চ শেষ হলে পরে মেয়েটি তাঁর সহকর্মীদের সাথে অল্প কিছুক্ষণ গল্প করত। সহকর্মীরা প্রশংসা করত মেয়েটির পরিধেয় পোশাকের- যা ছিল পরিষ্কার এবং নিখুঁতভাবে আয়রন করা। অনুমেয় ছিল এটি পুরুষটির চতুর্থ কাজ। অবশ্য কাজ ছিল পুরুষটির হাজার রকমের। ঘর-দোর পরিষ্কার, বিছানার চাদর পাল্টানো, ফুলদানিতে নতুন ফুল ভরে রাখা, বাগানের গাছে গাছে জল দেয়া, বাজার করা, দোকান করা মায় রাতের খাবার তৈরি পর্যন্ত। যদিও তেরো বছর পর হঠাৎই মেয়েটির আর তাঁকে ভালো লাগল না। অথচ জানালার গ্রিল পরিষ্কার করা, পাখার ধূলো ঝাড়া, হারপিক দিয়ে কোমোড পরিষ্কার করা, টাওয়েলগুলো সাবানজলে ভিজিয়ে রাখা, আরও কত কী যে কাজ তিনি সারাদিন ধরে করতেন। অথচ তের বছর পর মেয়েটির আর তাঁকে ভালো লাগল না। 'ভালো না লাগা' অনেকটা নিম্নচাপের বৃষ্টির মতো। তোমার ভালো লাগুক আর না লাগুক সে চলতেই থাকে। পড়তেই থাকে ক্রমশঃ, চেপে বসতেই থাকে... যদিও মেয়েটির অন্তর্বাস কিংবা স্যানিটারি ন্যাপকিনও পুরুষটি কিনে আনতেন। শুধু মেয়েটির ভালো না লাগার জন্য হলুদ বাল্বের আলোর পরিবর্তে তিনি লাগিয়েছিলেন সাদা আলোর এনার্জি সেভার। ঘরের বিষণ্ণ নীল রং পাল্টে করেছিলেন সুখ-গোলাপি। পাল্টেছিলেন পর্দা, পেলমেট এমনকি বাগানের গাছগুলোকেও। সন্ধ্যের পর মেয়েটি বাড়ি ফিরলে তার কম্পিউটার টেবিলে রাখা থাকত ধোঁয়া-ওঠা স্যুপ আর কড়া করে সেঁকা পাউরুটি। আসলে মেয়েটার শরীর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে তাঁর ছিল বিশেষ নজর। জ্বালিয়ে রাখতেন অলআউট। যাতে মশারা মেয়েটির পেলব শরীরে কামড় না বসাতে পারে। এটি ছিল পুরুষটির একশো উনিশতম কাজ। যদিও তিনি জানতেন তেরো বছরের এই ঘর-সংসার, বালিশ-বিছানা, আলো-অন্ধকারের সাথে মেয়েটির আর তাঁকেও ভালো লাগবে না হঠাৎ একদিন। অনুমান করতেন মেয়েটির নরম মনে ছাপ ফেলছে তাঁর এক পুরুষ সহকর্মী। যে মেয়েটির সমবয়সি অথবা দু-এক বছরের ছোটও হতে পারে। যে ফর্শা, এক মাথা কোঁকড়া চুল। ব্যায়াম করা শরীর, মোটা ঠোঁট, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। যে কোনো ফোটো ফ্রেমে পাশাপাশি দুজনকে ভালোই মানায়। একদম ঠিকঠাক। উদ্বিগ্ন হতেন তিনি মেয়েটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে। প্রার্থনা করতেন যেন মেয়েটিকে কষ্ট পেতে না হয়। বলে রাখা ভাল পুরুষটি চাকরি করতেন না ব্যবসা, ভাত খেতেন না রুটি, ব্যাংকে ঠিক কত টাকাই বা তাঁর সঞ্চয়- এ সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। কেবল এটা জানা যায়, মেয়েটি রাতে ঘুমালে পরে তার বুক অবধি চাদর চাপা দিয়ে, এসির টোনটা কমিয়ে দিতেন। হালকা করে পাখা চালিয়ে, দরজা ভেজিয়ে তিনি তাঁর দিনের কাজ শেষ করতেন- মেয়েটির ঘুমন্ত শরীরের উদ্দেশ্যে শুভরাত্রি জানিয়ে।


রাতে ঘুমোতে যাবার আগে তিনি ব্যালকোনিতে আসতেন। আকাশের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে দেখতেন খসে পড়ছে তারা। আর আকাশে চোখ রেখেই মনে মনে সাজিয়ে নিতেন পরদিনের কাজগুলো। কেননা সকাল থেকেই তাঁর ছিল হাজার রকম কাজ। আর সকাল হলেই মেয়েটিকে চলে যেতে হত ছাব্বিশ কিলোমিটার দূরের এক শহরে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন