রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

মৃণাল শতপথী'র গল্প : প্লাটফর্ম


প্লাটফর্মে একটাই ছাতিম গাছ। ফুলহীন। যখন ফুল আসে মিষ্টি মাদকতায় ভরে থাকে চত্বর। তলায় সিমেন্টের বেঞ্চ পাতা। ফুলের দিনে ঝরে পড়া গুঁড়ো ফুলে ঢেকে থাকে সেটা। একটা মোহনচূড়া পাখি চুপ করে ডালে বসে জিরোচ্ছে। ঘন ছায়া ঘিরে আছে বেঞ্চটাকে। দুজন বসে আছেন। এক প্রৌঢ়,এক
প্রৌঢ়া। কাঁচাপাকা চুল,কৃষ্ণকায় মানুষটির গলা পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ হাহা হাসি। গড়ানো দুপুরে নিশ্চিন্ত প্লাটফর্ম। হাসির শব্দে কেউ কেউ ফিরে তাকায়। ছোট স্টেশন। দূরের লাইনে একটা মালগাড়ি স্থির। কখনো একটা দুটো ট্রেন নিতান্ত অনিচ্ছে নিয়ে এসে দাঁড়ায়,হাই তোলে,তারপর ঢিমে তালে ছেড়ে যায়।
শেডের নিচে বেঞ্চে লম্বা হয়ে ঘুমিয়ে আছে একজন হকার। খাকি ময়লা প্যান্ট,খালি গা,গলায় একটা গামছা জড়ানো। নাক ডাকছে ফোঁস ফোঁস করে। একটা মাছি তার মুখের কাছে বৃত্তাকারে ঘুরছে। নাকের ওপর বসার সুযোগ খুঁজছে,পারছে না। লাল শাড়ি পরা,হাতে ফোন এক মহিলা তাঁর দুরন্ত শিশু পুত্রকে সামলাচ্ছেন। সে বসে থাকতে চাইছে না,প্লাটফর্ম জুড়ে ছুটতে চাইছে।

-পাপাই,বলছি না চুপ করে বসো,এক কথা কতোবার বলতে হয়?

-বাবা কোথায় ?

-আসবে ।

-এখনো তো এল না ।

-আসবে ।

অলস গলায় মুড়ি মুড়ি ডাক । মুড়ির টিন ঝোলানো গলায়,টিন ঘিরে সারি দেওয়া খোপের ভেতর প্লাস্টিকের গ্লাসে হরেক ভাজাভুজি নিয়ে পেরিয়ে যায় । শিশুটি তাকায় মায়ের দিকে । মা চোখ বড় করেন ।

মহিলা দেখেন,খানিক তফাতে এক যুবক তার বৃদ্ধা মা’কে নিয়ে বসে আছে । অস্থির । মাঝে মাঝে উঠে দাঁড়াচ্ছে,আবার বসে পড়ছে । বৃদ্ধার ঘাড় ঝুঁকে নেতিয়ে আছে,ঝিমুচ্ছে । কিন্তু ছেলে উঠে দাঁড়ালেই শীর্ণ, লোলচর্ম, শিরা ওঠা হাত তুলে আঁকড়ে ধরছে ছেলের হাত । ছেলে বসে পড়ছে।

-কোথাও যাচ্ছি না রে বাবা,ওফ!

বুড়ি ঝিমোয় ।

-জল খেয়ে আসি ?

বুড়ি হাত ছাড়ে না ।

-আরে বাবা পেচ্ছাপটাও করতে যেতে দেবে না নাকি ?

ভাবলেশহীন বুড়ি ছেলের হাত আঁকড়ে ঝিমোয় ।



একধারে হা-ঘরেদের জটলা । গা ভর্তি ময়লা,দুর্গন্ধ,তেলচিট কাপড়,জট পড়া লাল চুল,কটা চোখ,গায়ের ফ্যাসফ্যাসে রঙ । কেউ শুয়ে আছে,কেউ থেবড়ে বসে রঙিন পাতলা প্লাস্টিকের টুকরো মুড়ে মুড়ে ফুল বানাচ্ছে । চাদরে গুচ্ছ গুচ্ছ প্লাস্টিকের ফুল ছড়ানো । বাচ্চা মেয়েটিকে সামনে বসিয়ে এক মহিলা চিরুনি দাবড়াচ্ছে লাল চুলে । নাকে রুমাল চেপে একজন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল । ফ্যাসফ্যাসে রঙ দুটি ছেলে লাইনের ধারে ঘুরে ঘুরে ডাবের খোলা কুড়িয়ে এনে স্তূপীকৃত করছে প্লাটফর্মের ওপর ।

একটা ঠ্যালা গড়গড়িয়ে যায়।

ছাতিমের মাথা থেকে রোদ নেমে আসে। স্টেশনের মাইকে অলস ঘোষণা, কোন এক ট্রেনের আসতে দেরি হবে। বেঞ্চে বসে থাকা দুটি মানুষ যেন খুশি হয়ে ওঠেন। প্রৌঢ়া বলে ওঠেন,বিভূতিদা,গান ধরো,কি গাইতে এককালে ! কৃষ্ণকায় মানুষটি ঈষৎ লজ্জা পান।...

কেউ গাইছে দূরে। শিশুপুত্র পাশে বসে জোরে জোরে পা দোলাচ্ছে। লাল শাড়ির মহিলা ফিরে তাকান ছাতিম তলার দিকে।

-পাপাই,আবার?

ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে আরেকবার কাকে করেন। পান না, রেখে দেন।

-বাবা?

-আসবে,স্থির হয়ে বসো।... একটা ইরেস্পন্সিবল, অসভ্য লোক,ফোনটাকে সুইচ অফ করে রেখে দিয়েছে!

হা-ঘরে একটি বাচ্চা মেয়ে এসে কচি হাত পাতে। পাপাই অবাক চোখে তাকে দেখতে থাকে।

-যাহ পালা।

সে মহিলার পা ধরতে যেতেই তিনি ছিটকে পা তুলে নেন।

-ইহ! চড়িয়ে দেব বলে দিলাম,চালাকি হচ্ছে,পালা!

বাচ্চাটি এবার ছুটে যায় যুবকের কাছে। কচি হাত মেলে। দাঁত কষকষিয়ে হাত তুলে যুবকটি হাঁকড়ে ওঠে,ভাগ! মেয়েটি ছুটে পালায় ছাতিম গাছের দিকে। যুবক আড়চোখে দেখে বুড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে। বেঞ্চের একপাশে নেতিয়ে আছে দুর্বল ঘাড়। ধীরে ধীরে বুড়ির হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। এপাশ ওপাশ দেখে। বুড়ির মুখের দিকে দেখে। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা। যুবকটি উঠে যায়। মুড়ির ঠোঙা হাতে আবার ফিরে আসে। এলিয়ে থাকা বুড়ির পাশে ঠোঙাটা রেখে এদিকে তাকাতেই মহিলার
সঙ্গে চোখাচোখি হয়। যুবকটি চোখ নামিয়ে ফেলে দ্রুত ফুটওভার ব্রিজের দিকে মিলিয়ে যায়।...

ছাতিম তলায় এসে হা-ঘরে মেয়েটা থমকে দাঁড়ায়। কৃষ্ণকায় মানুষটি গান ধরেছেন গলা ছেড়ে। দাঁড়িয়ে শোনে। ভিক্ষা চাইতে ভুলে যায়। প্রৌঢ়া চোখ বুজে মাথা নেড়ে যাচ্ছেন।

-ওহ,একেবারে অরিজিনাল! এতটুকু গলা নষ্ট হয়নি তোমার! বিভূতিদা,এবার মান্না দে ,দীপ ছিল,শিখা ছিল।....

পাশের একলা বেঞ্চে ঘুমিয়ে থাকা বৃদ্ধাকে দেখছেন লাল শাড়ির মহিলা। বাতাসে মুড়ির ঠোঙাটা উল্টে গেছে। ঠোঙার মুখ থেকে ফুর ফুর করে মুড়ি বেরিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে প্লাটফর্মময়। বুড়ির জীর্ণ ঘুমন্ত মুখে দখিনা বাতাস হাত বুলিয়ে যায়।...

মহিলা আবার কাকে ফোন করেন। না,পান না। কিছুতেই পাচ্ছেন না যে! কেন কেন! মহিলার কান্না পায়। উদ্ভ্রান্তের মত এদিক ওদিক চাইতে থাকেন, ছেলেকে কাছে টেনে জোর করে চেপে রাখেন।

ভারী বস্তা পিঠে নুয়ে যাওয়া একটা মানুষ পাশ দিয়ে চলে যায়। স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হয়,ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকছে।...

গান ভেসে আসছে,ঝরনা কেমনে হয় নদী,সাগর না ডাকে কভু যদি,তাই যেতে যেতে থামল সে,বয়ে চলল না...

ছাতিম তলায় ছোট মত ভিড়। তারা ঘিরে দাঁড়িয়েছে কৃষ্ণকায় মানুষটিকে। ট্রেন ধরতে আসা অনেকে গান শুনছে দাঁড়িয়ে।

ফুটওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে একটা নীল শার্ট ছুটে আসছে বাতাসের মত। সিঁড়িগুলো দুড়দাড়িয়ে নেমে,হন্তদন্ত নীল শার্ট প্রায় ছুটে এসে দাঁড়ান স্ত্রী পুত্রের সামনে। হাঁফাতে থাকেন। কিছু বলতে যান, মহিলা থামিয়ে দেন তাঁকে।

-গানটা শোন,কি ভালো গাইছে,না?

লোকটি দূরে ভিড়ের দিকে তাকান। প্রৌঢ় উদাত্ত গলায়, গভীর দরদে গেয়ে চলেছেন, যে মালায় ফুল গেছে ঝরে, রেখেছি সে ফুল বুকে করে, তাই এই ফুল রয়ে গেল, কেউ তুলল না...

খানিক দূরে পাপাই তখন লাল চুল ছেলেগুলির সঙ্গে। একেকজন লাইনের ধার থেকে ডাবের খোলা এনে তার হাতে দেয় আর সে তা ছুটে বয়ে এনে জমা করে প্লাটফর্মের স্তূপে। কুড়িয়ে রাখার আনন্দ। সেই আনন্দে ছুটে ছুটে যায় আবার।

একটু একটু স্তূপ বড় হয়...

1 টি মন্তব্য:

  1. খুব শক্তি ধরেন গল্পকার। বাংলা সাহিত্যে আবার কিছু ভালো গল্প জমা হবে।
    ধীর গভীর শান্ত হয়ে পড়তে পড়তে শিকড় শুদ্ধু বিচলিত হয়ে উঠবো।

    উত্তরমুছুন