রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

সেলিনা হোসেনের গল্প - ইজ্জত

মালেকাকে ওর স্বামী লতিফ গলা কেটে খুন করেছে৷ তারপর ওর দু’টুকরো দেহ বাকলজোড়া গ্রামের পাশের জাইলাবিলে ফেলে দেয়৷ ভুস্ করে ডুবে গিয়ে আবার ভেসে ওঠে মালেকার দেহ৷ দু’দিন পরে ওর শরীর পচতে শুরু করলে চিল-শকুন উড়ে আসে৷ কদিন পর ওর দু’ভাই এসে মালেকার পচা দেহ নৌকার সাথে বেঁধে জাইলাবিল থেকে দুর্গাপুর থানার ঘাটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে৷ কিন্তু ততোদিনে দেহ এতোই পচে গেছে যে, সেটা আর দাফন করার অবস্থা নেই৷ তখন ভাইয়েরা মালেকার পচা দেহ সোমেশ্বরী নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দেয়৷ খানিক বিষাদে দু’ভাই আক্রান্ত হয় কিছুক্ষণের জন্য৷ তারপর একরকম খুশি মনে বাড়ি ফেরে৷ শুধু পচা মাংসের ঘ্রাণ ওদের পিছু ছাড়ে না৷

মুসলমানের মেয়ে জানাজা পেলো না, কবরও পেলো না৷ বাল্য বয়সে মৌলবী সাহেবের কাছে কোরান শরীফ পড়া শিখেছিলো৷ এতোটা বয়স পর্যন্ত প্রত্যেক রোজাতেই একবার করে খতম দিয়েছে কোরান শরীফ৷ রোজাও রেখেছে৷ ঈমানেরও কোনো ফাঁক ছিলো না৷ তাহলে মালেকা এখন যাবে কোথায়? নদীর পানির শীতল স্পর্শে ওর দিব্যদৃষ্টি খুলে যায়৷ ও অনুভব করে সামনে দোযখ নেই, বেহেশত নেই-ও ওর প্রিয় সোমেশ্বরী নদীর বুকে ভাসছে৷ ওর শরীরের পচা মাংস টুপটাপ খেয়ে ফেলছে মাছেরা৷ চারদিকে ছোট বড় নানারকমের মাছ ওকে ঘিরে আছে৷ মালেকা নিজেকেই বলে, তাহলে কি পৃথিবীতেই থেকে গেলাম আমি? তাহলে আমার শরীরটা গেলো কোথায়? যেটাকে নিয়ে এতো কুত্সিত, কদর্য রটনা?

ও স্বামীর বাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়৷

তখন সন্ধ্যা৷ চুলোয় আঁচ দিয়েছে লতিফের বড়ো বউ৷ ভাত ফুটছে৷ বারান্দায় বসে হুকো টানছে লতিফ৷ ভাত হলেই গরম গরম ভাত খাবে৷ ওর সবকিছু গরম চাই৷ কোনো খাবার জুড়িয়ে গেলে ও খায় না৷ মালেকা খুন হওয়ার পর থেকে বড়ো বউ মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত৷ স্বামীর দিকে ভালো করে তাকাতে পারে না৷ তাকালেই মনে হয় লতিফের ঘাড়ের ওপর মাথা নেই৷ লতিফ মুণ্ডুহীন মানুষ৷ একদিকে ভয়, অন্যদিকে কষ্ট৷ তাই কারণে-অকারণে বড়ো বউর চোখে পানি এসে যায়৷ কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই৷ রাতদিন বুকের ভেতর গুমরে মরে যাতনা৷ মেয়েটাকে মারা হলো, অথচ পুলিশ হলো না, থানা হলো না এটাও ভাবতে পারে না৷ প্রথম কদিন তো বাড়িতে কখন পুলিশ এসে যায় এ ভয়ে অস্থির ছিলো৷ এখন সে ভয় কেটেছে৷ কিন্তু নিজের মনের ভয় কাটাবে কি করে? রাতের বেলা একা কোথাও যেতে পারে না বড়ো বউ৷

সে সন্ধ্যায় ভাত গালারা পর ফেনের গামলা নিয়ে গোয়ালের দিকে যেতেই আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে৷ পায়ের ওপর পড়ে যায় গরম ফেনের গামলা৷ ওর চিত্কারে ছুটে আসে বাড়ির লোকজন৷

কি হয়েছে? কি হয়েছে?

বড়ো বউ চেঁচাতে চেঁচাতে বলে, মালেকা! মালেকা! গলা কাটা মালেকা!

ধমক দিয়ে ওঠে লতিফ, খামোশ! চুপ করো৷

অন্যরা চেঁচায়, কোথায়? কোথায়?

ঐতো-ঐতো-ঐখানে-ঐখানে……

লতিফ লাফ দিয়ে গিয়ে চুলের মুঠি ধরে৷ ধমাধম কিল-চড় লাগায়৷ মাটিতে গড়িয়ে পড়ে বড়ো বৌ৷ জ্ঞান নেই৷

অনেক রাতে বরান্দায় বসে থাকে লতিফ৷ শুনতে পায় কেমন একটা ফিসফিস কন্ঠ, আপনের কাছে কি আমার অপরাধ ছিলো?

উহ্, মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে৷ উঠতে গিয়ে মাথাটা বারান্দার খুঁটিতে ঠোক্কর খায়, চমকে ওঠে লতিফ, সেই কথাগুলো যেন আরো স্পষ্ট হয়ে কানে বাজছে৷ তোলপাড় করছে চারদিক৷ তখন ও নিজের অজান্তেই বলে, মাইনকা তোমার দিকে হাত বাড়াইছিলো ক্যান? তুমি ভাবছিলে আমার বয়স বেশি৷ বুড়া হয়ে গেছি? না?

না, আমি তা ভাববো ক্যান? আপনের জন্য তো বয়স বেশি না, আমার জন্য বেশি৷ আপনের সাথে আমার বয়সের বত্রিশ বছরের তফাত্৷

বেটা মানুষের আবার বয়স কি?

বাতাসে হাসির হল্লা শোনা যায়৷ লতিফ দ্রুতপায়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়৷ ওর গা ছামছম করে৷ মনে হয় উঠোনে কেমন একটা ছায়া নড়ছিলো৷ ও বুকে থুতু দেয়৷ আসলে সব মনের ভুল৷ হারামজাদি বেঁচে থাকতে একটা নষ্ট মেয়ে ছিলো, মরেও নষ্টই থেকে গেলো৷


মালেকা সে-বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে৷ রাত-দুপুর৷ চারদিকে চাঁদের আলো৷ জীবনকালে এতো রাতে এমন চাঁদের আলো ও দেখেনি৷ ওহ্ কি সুন্দর এই দুনিয়া৷ ওর দীর্ঘশ্বাস ছুটে যায় চারদিকে৷ তারপর মাঠের মাঝখানের তালগাছের নিচে বসে পড়ে ও৷ কতোদিন এই গাছটির দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলো এখানে এসে দুদণ্ড দাঁড়াবে৷ দেখবে গাছটা কতো উঁচু? দেখবে আকাশ কতো বড়ো? কিন্তু বাড়ি থেকে বেরুবার জো ছিলো না৷ শোবার ঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, পুকুরঘাট-এই তো ছিলো ওর প্রতিদিনের দুনিয়া৷ এখন ওর চারদিক কেমন ফকফকে-তুলোট মেঘের মতো ছেঁড়াছেঁড়া, অনায়াসে লুকোচুরি খেলা যায়৷ ও বালিকার মতো গোল্লাছুট খেলায় মেতে উঠতে চায়৷ পারে না৷ মন খারাপ হয়ে থাকে৷

এখান থেকে খানিকটা তফাতে গাছপালার আড়ালে মাইনকার বাড়ি৷ মাইনকাকে আমি ভালোবাসতে চেয়েছিলাম৷ শুধু একটু ভালোবাসা--প্রাণে উথালপাতাল টান৷ মাইনকা মন বুঝতো না, বুঝতো শরীর৷ মাইনকা চেয়েছিলো আমার শরীর৷ আমি রাজি হইনি৷ ভালোবাসা ছাড়া আবার শরীর কি? শরীরটা কি এতোই সহজ? মালেকা তাল গাছের ছায়ায় নিজেকে দেখে৷ উঁহু, সহজ না৷ ওর কাছে ভালোবাসা ছাড়া শরীরের সম্পর্ক পাপ৷ তবু মাইনকা ওকে পছন্দ করবে কেন এটাই ছিলো ওর অপরাধ৷ এটুকুই ছিলো ওর পাপ? লতিফের সহ্য হয়নি৷ ও রটিয়েছে মালেকা চরিত্রহীন, মালেকা ভ্রষ্টা৷

পাপ কি? পুণ্য কি? ইহলোক কি? পরকাল কি?

মালেকা কিছুই বুঝতে পারেনি৷ এখনও পারছে না৷ শুধু ওর ছাবি্বশ বছর বয়সটা প্রশ্ন হয়েই থাকে৷ যে লোক চারজন স্ত্রী নিয়ে এক বাড়িতে বাস করে সে চরিত্রবান, সে ভ্রষ্ট নয়৷ এতে নাকি সম্মান বাড়ে, বংশের ইজ্জত৷ যে নারী শুধুই ভালোবাসার কাঙাল হয়--জীবনকে অন্যরকম করে সাজাতে চায়, চারজন স্ত্রীর একজন হতে চায় না, সব অপরাধ তার? সে বংশের ইজ্জত নষ্ট করে, তাই তাকে মরতে হবে৷

মালেকা তালগাছের মাথায় উঠে বসে৷ দু’চোখ ভরে নিজের গ্রামটা দেখে, আরো দূরের গাঁ এবং দেশটা দেখে৷ ভাবে, মানুষ কই? দু’চোখ ভরে মানুষ দেখতে চাই৷ মানুষ দেখতে কোথায় যাবে ও? একজন স্কুলের মাস্টার আছে৷ তাকে? যে ভাইয়ের সংসার থেকে ওকে উদ্ধার করে লতিফের সঙ্গে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো৷ না থাক মাস্টার, সে মানুষটি তো ওর ভালোই চেয়েছিলো৷ ভালো করতে পারেনি৷ কিন্তু ওর ভাইয়েরা?

ও তালগাছের উঁচু থেকে বড়োকুঠুরি গ্রামের দিকে তাকায়৷ এক সময় ঐ গ্রামে ওর বাবার কিছু জমিজমা ছিলো৷ এখন কিছু নেই৷ এখন ওর দুই ভাই ক্ষেত মজুর৷ বাবা মরে গেছে বছর পাঁচেক আগে৷ মা বছর দুই ধরে পাগল৷ ঘরে থাকে না৷ পথেঘাটে ঘোরে৷ কোথায় থাকে কি খায় ঠিক নেই৷ দিনমজুর দু’ ভাইয়ের সংসারে ভাতের হাঁড়িতে ঠনঠন৷ সেখানে মালেকা ছিলো বাড়তি ঝামেলা৷ এতোকিছুর পরও এককালে বাপের কিছু জমিজমা ছিলো সে বোধটি দুই ভাইয়ের মগজে বিঁধে আছে৷ মনে করে ওরা না হয় গরিব হয়েছে, কিন্তু বাপ-দাদার বংশের তো ইজ্জত ছিলো৷ তাই চরিত্রহীন বোনের লাশ দাফন করতে ওদের আগ্রহ ছিলো না৷ বোনের শরীর শিয়াল-শকুনে খেলে কতোটা উজ্জত বাড়ে সেটা ওরা বোঝে না; ধর্মমাফিক দাফন না হলে কতোটা ইজ্জত বাড়ে সেটাও ওরা বোঝে না৷ বোঝে মেয়েমানুষের মিথ্যে অপবাদ।

মালেকার দীর্ঘর্শ্বাস আবার বাতাসে ছড়িয়ে যায়৷
মালেকা তালগাছের মাথা থেকে নেমে আসে৷ ভোর হয়েছে৷ কিন্তু সূর্য ওঠেনি৷ ও ভাইয়ের বাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়৷ গোয়ালঘরের পাশে বড়ো ভাইয়ের বউ বাসি ফেন ফেলে গেছে৷ ওর পাগল মা, যার পরনে এক টুকরো চট--শরীর উদোম, মাথার চুল জটা পাকিয়ে আছে, সে ওখানে বসে ফেনের ভেতর থেকে ভাত খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে৷ মুরগিটা গোটা দশের বাচ্চা নিয়ে তার পাশে ঘুরঘুর করছে৷ মুরগিটা ওর মাকে ভয় পায় না৷ বরং ওর মা যখন হাত দিয়ে বাচ্চাগুলো তাড়াতে যায় তখন রুখে ওঠে৷ মুরগি রুখে উঠলে ওর মা কুকড়ি মেরে সরে যায়৷ তখন মুরগি ওর বাচ্চাগুলো নিয়ে ফেনের ভেতর পড়ে যাওয়া ভাতগুলো খেতে থাকে৷ মালেকা দেখে ওর মা কেমন অসহায়ভাবে বসে থাকে৷ ওর মা মুরগির সঙ্গেও পেরে ওঠে না৷ মালেকার বুক ভেঙে যায়৷ মা আর মুরগি; মুরগি আর মা৷ এই মায়ের ছেলেরা বংশের ইজ্জত নিয়ে মাথা ঘামায়৷ মালেকা হা হা করে হেসে উঠতে চায়৷ পারে না৷
দেখে ছোট ভাই আর তার বউ বারান্দায় বসে আছে৷ দুজনে মালেকার কথা বলছে৷ ছোট ভাইয়ের বউ রহিমা সুন্দরী৷ রূপের দেমাগ আছে৷ মালেকা এই সংসারে থাকার সময় খুব খারাপ ব্যবহার করতো৷ সহ্যই করতে পারতো না ওকে৷ আজও মুখ বাঁকিয়ে বলে, মরেছে ভালো হয়েছে৷ উচিত শাস্তি পেয়েছে৷
আবদুল জব্বার সরোষে বলে, মরেছে বেঁচে গেছি আমরা৷ কিন্তু বংশের মুখে যে চুলকালি দিয়ে মরলো এটাই জ্বালা৷ গাঁয়ে হাঁটা যায় না৷ মানুষে কতো কথা বলো৷
রাখো তোমার গাঁয়ের মানুষ৷ বাপের বাড়িতে যে কীভাবে মুখ দেখাবো আমি ভাবতে পারি না৷
তখন আচমকা উঠোনে একটা ছায়া দেখে, ও মাগো, বলে চেঁচিয়ে ওঠে রহিমা৷
কি হয়েছে? কি হয়েছে?
আব্দুল জব্বার জিজ্ঞেস করে৷
রহিমা চেঁচাতে চেঁচাতে বলে, মালেকা, মালেকা৷ গলাকাটা মালেকা৷
কি বলছো যা তা? তাই কি হয় নাকি?
ঐতো, ঐতো৷ ঐখানে, ঐখানে৷
সেই চিৎকার শুনে গোয়ালঘরের ওপাশ থেকে ছুটে আসে আব্দুল জব্বারের মা৷ উঠোনের মাঝ বরাবর কাঁচা গোবরের ওপর পা পিছলে উল্টে পড়ে যায়৷ গোঁ- গোঁ করতে করতে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে৷ গোঙানির শব্দে কাঁদতে কাঁদতে বলে, মালেকা, আমার মালেকারে৷
অল্পক্ষণে মারা যায় মুরগির চেয়ে অসহায় আব্দুল জব্বারের মা৷ অন্যান্য ঘরে থেকে বেরিয়ে আসে অনেকে৷ মায়ের মুখে পানি দেয়ার চেষ্টা করে৷ সে পানি ঠোঁটের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যায়৷
নিথর দাঁড়িয়ে থেকে এইসব দৃশ্য দেখে মালেকা৷ তারপর ওর অসহায় মা মরে গিয়ে বেঁচে গেছে বলে খুশি হয়৷ খুশিতে উড়তে উড়তে গনু মাষ্টারের বাড়িতে আসে৷ চারদিকে গাছ-গাছালি ভরা সি্নগ্ধ বাড়ি৷ ও গোয়লঘরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়৷ রাখাল ছেলে গরুগুলো বাইরে নিয়ে গেছে৷ বারান্দায় পাটি বিছিয়ে মাষ্টার ভাত খাচ্ছে৷ স্কুলে যাবে৷ আটজন ছেলেমেয়ে সঙ্গে বসেছে৷ একজন বাদে বাকিরাও স্কুলে যাবে৷ তারপর আলিমুন খালি বাড়িতে সারাদিন ঘুরে ঘুরে কাজ করবে৷ সংসারের কাজের কি শেষ আছে? আলিমুন ভারী ভালো মানুষ৷ গাঁয়ের কোনো কোনো মেয়ের মতো বলে না, 'নষ্টা বলেই তো মরেছে? নইলে শুধু শুধু কি কেউ কাউকে খুন করে?' নিজে নিজে ফোঁস করে ওঠে আলিমুন, যদি নষ্টাই হয় হোক, সেটাও ওর খুশি৷ তাই বলে খুন করতে হবে কেন? মালেকার কথা ভেবে আলিমুন কষ্ট পায়৷ স্বামীর সঙ্গে ওকে নিয়ে আলোচনা হয়৷ মাস্টার বলে, আইন তো কেউ নিজের হাতে উঠিয়ে নিতে পারে না৷ পছন্দ না হলে ছেড়ে দাও৷ ও নিজের পথ দেখবে৷ কাউকে ভালোবাসলে তার কাছে যাবে৷ তাই বলে খুন করতে হবে?
মাস্টারের গালাগাল শুনেই তো দুই ভাই লাশ আনতে গিয়েছিলো৷ নইলে খবরটা শুনে ওরা উত্তেজিত হয়নি, রাগও করেনি৷ ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে শোনে, তারপর একটা ভঙ্গি করে ভাবে, মানুষ, মানুষকে এতো সহজে খুন করে কীভাবে?
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হানিফ শেখ দাঁত খিঁচিয়ে বলে, ছাগল একটা৷ মানুষ হলি না৷ গরুই থাকলি৷
ছাগল থেকে গরু হয়ে যাওয়ায় আব্দুল জব্বার পুলকিত হয়৷ মনে করে এতে ওর ইজ্জত বেড়েছে৷
মাস্টার ওদের বলেছিলো, গরিবের ইজ্জত একটাই৷ দু'বেলা পেট পুরে পুষ্টিকর ভালো খাবার খেতে পারাটা গরিবের ইজ্জত৷ উপোস দিয়ে কচু-ঘেচু খেয়ে কি ইজ্জত হয়? গরিবের পেটই ইজ্জত৷ সে পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন৷ ইজ্জত আর কিছুতেই নাই৷ চরিত্র মেয়েমানুষের থাকতে হবে, পুরুষমানুষেরও থাকতে হবে৷
আব্দুল জব্বাররা এসব কথা বুঝতে পারে না৷ বুঝতে চায়ও না৷ তাই ওদের দল ভারী৷ মাস্টার একা৷ মাস্টারের কথা ক'জনেই বা শোনে৷ তবু মাস্টার যেখানে যাকে পায় বক্তৃতার ঢঙে এসব কথা বলেই যায়৷
তখন শিউরে ওঠে মালেকা৷ যাদের হাতে দা-কুড়াল আছে তারা তো এসব কথার জন্য খুন করে ফেলবে মাস্টারকে৷ খুন? খুন? শব্দটা তোলপাড় করে ওঠে বাড়ি জুড়ে৷ ও আলিমুনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়৷ আলিমুন যেখানে যায় ও পিছু ছাড়ে না৷ কিন্তু আলিমুন আপন মনে কাজ করে৷ ও মালেকার কোনো ছায়া দেখতে পায় না৷ চিৎকারও করে না৷ মালেকা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ফিরে সেই শান্তিময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে৷
বাজারে এসে দাঁড়ায়৷ কালু মোল্লার চায়ের দোকানের পাশে৷ দোকানে তখন জোর আড্ডা চলছে৷ আব্দুল জব্বারের মা মারা গেছে তারপর সেটা হয়ে যায় যে পাগলীটা মরেছে৷ কথার ওপর কথা গড়াতে থাকে৷ গড়াতে গড়াতে তা আবার মালেকাকেন্দ্রিক হয়ে যায়৷

ছুটিতে বাড়ি এসেছে দুর্গাপুর থানার পুলিশ মোসলেম হওলাদার৷ তার কণ্ঠই বেশি উঁচু৷ সে ইজ্জতের একজন বড়ো রক্ষক৷ বলে, আপনারা তো জানেন এক সময় দুর্গাপুর থানায় ঘটেছিলো একটা ঘটনা৷ একবার একজন লোক তার বড়ো ভাইয়ের বিধবা বৌয়ের কাটা মাথা নিয়ে থানায় চলে আসে৷ বলে, বংশের ইজ্জত রক্ষার জন্য চরিত্রহীন এই মেয়েমানুষটাকে আমি হত্যা করেছি৷ ভেবে দেখেন আপনারা কতো বড়ো ঈমানদার লোক৷
পেছন থেকে একজন বলে, ঐ লম্পট লোকের গল্প আর বলবেন না৷ ওতো বড়ো ভাইয়ের বউয়ের ইজ্জত নষ্ট করতে চেয়েছিল৷ ভাবী রাজি হয়নি বলেই তো রেগে খুন করেছে৷
মোসলেম হাওলাদার চটে উঠে বলে, পুরুষ মানুষ তো একটু আধটু করবেই৷ ইজ্জত রক্ষার দায়িত্ব.....
কথা শেষ হয় না, আর একজন লুফে নিয়ে বলে, বংশের ইজ্জতের কথা ভেবেই তো সেই লোকটি এই কাজটি করেছিলো৷ পেছন থেকে একজন বলে, সেই লোকটার বিচার হয়েছিলো৷ ফাঁসি হয়েছিলো৷
মোসলেম হাওলাদার উত্তেজিত হয়ে বলে, হবেই তো৷ আমরা যে বৃটিশ আইনে চলি৷ ইংরেজরা যে এই দেশটার কতো রকম সর্বনাশ করে গেছে তার কি শেষ আছে৷ বৃটিশ আইন তো বংশের ইজ্জত রক্ষা করার মতো অবস্থায় ওঠেনি৷
হে হে করে সাড়া দেয় অনেকে৷ মোসলেম হাওলাদারের উত্তেজনা কমে না৷ লোকে ওর কথার প্রতিবাদ করবে এটাও ভাবতে ও পারে না৷ আরো কিছু বলতে যাবে এমন সময় দোকানের সামনে একটি ছায়া দেখে চিৎকার করে ওঠে৷ বেঞ্চের ওপর বসে পড়ে টেবিলের ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে গোঁ-গোঁ করতে থাকে৷
কি হয়েছে! কি হয়েছে!
সমবেত কন্ঠ৷
মালেকা, মালেকা৷ গলাকাটা মালেকা৷
কোথায় মালেকা? কোথায়?
ঐতো, ঐতো-ঐখানে, ঐখানে৷
কেউ কেউ হি-হি করে হেসে ওঠে৷ আস্তে আস্তে দোকানের ভেতর হাসির রোল ওঠে৷ কেউ বাঁকা মন্তব্য ছোঁড়ে, পুলিশের ভূত দেখার অভ্যাস হয়েছে৷
মোসলেম হাওলাদার মানসিকভাবে অত্যন্ত বিধ্বস্ত বোধ করে৷ কারো কারো কথার জবাব দিতে পারে না৷ নিজের মনের দিকে ফিরে তাকায়৷ ও কি সত্যি বলেছে কথাটা? নাকি শুধুই মেয়েমানুষের ইজ্জতের ব্যাপারটি মেনে নেওয়া উচিত? ক্ষণিকের জন্য প্রচণ্ড দ্বিধা ওকে তাড়িত করে৷ ও পুলিশী সাহস নিয়ে সামনের প্রাঙ্গণের দিকে তাকাতে পারে না৷ যদি ঐ ছায়াটি আর একবার কেঁপে ওঠে?
মালেকার ক্রোধ হয়৷ ও ছুটে বেড়ায় সারা গাঁ৷ বাকলজোড়া গ্রাম ওর জন্মভূমি৷ প্রিয় আবাস৷ ও এখান থেকে কোথাও যাবে না৷ শুধু প্রচণ্ড তীব্রতায় অনুভব করে যদি আর একবার বেঁচে উঠতে পারতো?
ঐ ইজ্জতের পাছায় লাত্থি মারার জন্য ও আর একবার বাকলজোড়া গ্রামে ফিরে আসতে চায়৷


1 টি মন্তব্য:

  1. ইজ্জতের কতো রূপ। দুটো শক্ত পোক্ত ইজ্জত ভেসে গেলো, আরো কতো ভেসে গেলে সশরীরে দাঁড়াবার মাটি পাবে, কে জানে!

    উত্তরমুছুন