রবিবার, ২৯ মে, ২০১৬

বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গল্প : ক্ষুধিত পাষাণ

লোকটি বাঙালি কি গুজরাটি বোঝা শক্ত। যদি গুজরাটি হয় তো নিশ্চয় বহুদিন কলকাতায় থেকে বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি প্রায় নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছে; যদি বাঙালি হয় তো বহুদিন গুজরাটে থেকে ভাটিয়া-গুজরাটিদের সুতীক্ষ্ণ ব্যবসা-বুদ্ধিতে পরিপক্ক। এর মধ্যেও, কেমন একটা মৌলিক উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় পাওয়া গেল, তাতে আমার নিজের অনুমানটা বাঙালিত্বেরই দিকে। 

সেবার নিখিল ভারত সাহিত্য সম্মেলন হল আমেদাবাদে। নিমন্ত্রিত হলাম, ভাবলাম একটু আগে সম্মেলন সেরে পশ্চিমাঞ্চলটা যতটা সম্ভব দেখেশুনে বাড়ি ফেরা যাবে। দুটো দিন হাতে রেখে, তিনদিন আগে ভোরে গিয়ে স্টেশনে নামলাম।


একেবারে নূতন পরিবেশ, তাই দূর ভ্রমণে অনভ্যস্ত, হালকা বেডিং আর সুটকেসটা নামিয়ে পায়ের কাছে রেখে অনভিজ্ঞ দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক চাইছি, দেখি, হাত দশেক তফাতে ভিড়ের মধ্যে একজোড়া চোখ যেন আমার মুখের ওপর আটকে রয়েছে; দৃষ্টিতে আগ্রহের ভাব সুস্পষ্ট। ডাকব কিনা ভাবছি, লোকটি আপনিই ভিড় ঠেলে উপস্থিত হল; প্রশ্ন করল, সম্মেলনের ডেলিগেট ?

বললাম, হ্যাঁ, দুদিন আগে এসে পড়লাম। ক্যাম্প নিশ্চয় এখনও খোলেনি, দুদিনের জন্যে একটা ভালো হোটেল... নতুন জায়গা, পূর্বে কখনও আসিনি.'

‘বুঝেছি। হোটেল, গাইড, যেমনটি খুঁজছেন। আমেদাবাদ আবার নতুন-পুরনোয় মেশানো জায়গা তো। আসুন।

বুকে পড়ে দুহাতে বেডিং আর সুটকেস তুলে নিল। প্রতিবাদে কান না দিয়ে বলল, ঠিক আছে, এর জন্যে আবার কুলি ? ফুঃ!

অন্তত স্যুটকেসটা. . .

আপনি আসুন তো।


ভিড় একটু পাতলা হয়েছে। এগুলাম। তীর্থের পাণ্ডা না হোক, দেখলাম জাতটা ওই, কোনও হোটেলের এজেন্ট হতে পারে, কথা বলছে না। আমি পেছন-পেছন চললাম। বাইরে এসে—একটা ট্যাক্সি যেন ঠিক করাই ছিল, বেডিং সুটকেস তুলে দিয়ে বলল, বসুন, স্যার।’

নিজে উঠে ড্রাইভারের পাশে বসে পড়ে গন্তব্য সম্বন্ধে গুজরাটি ভাষায় কী নির্দেশ দিল, তার মধ্যে সাহিবাগ, জলদি কথা দুটাে বুঝলাম। ট্যাক্সি ছেড়ে দিল।

বেশ খানিক ঘুরেফিরে প্রায় আধ ঘণ্টা পরে গেট দেওয়া কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে একটা বাড়ির গাড়ি-বারান্দায় দাঁড়াল। দোতলা। মোটামুটি বেশ বড় বাড়ি। গাড়ির শব্দে একজন উর্দিপরা আরদালি-গোছের লোক দাঁড়িয়েই ছিল। লোকটির নির্দেশে বেডিং সুটকেস নামিয়ে নিল। তারপর ভাড়া চুকিয়ে আমরা বারান্দায় উঠে পড়ে এগুলে আমাদের পেছনে পেছনে আসতে লাগল।

ডানদিকে একটা হলঘরের মতো বড় ঘর। তার শেষে পুরনো ধরনের চওড়া কাঠের সিঁড়ি উঠে, ছোট-বড় কয়েকটা ঘর পেরিয়ে আমরা ডানদিকে একটা বড় ঘরে পৌঁছুলাম। দু’পাশে দুটি ছোট ঘর, সামনে খানিকটা বারান্দা। ঘর তিনটি নূতন চুনকাম করা, দরজা-জানলায় নূতন পেন্ট। ঢুকতেই একটা তাজা গন্ধ নাকে লাগল। ওদিকটায় আবদ্ধ ঘরের একটা ভ্যাপসা গন্ধ, বিশেষ করে, নীচের তলায়। পরিবর্তনটুকু ভালই লাগল।

ঘরটি আধুনিক প্রথায় বেশ ভাল করে সাজানো, বাহারে পিতলের ভাসে একটি বড়-বড় গোলাপ ফুলের তোড়া পর্যন্ত। পাশের ঘর দুটোর একটা স্নানাগার, একটা ল্যাভেটারি।

লোকটির সব যেন দ্রুতলয়ে। ক্ষিপ্রগতিতে আমায় সব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে, তালি দিয়ে হাত ঝেড়ে বলল, “আমি এবার একবার ওদিকটা দেখে আসি—আপনার ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ। কাকে পাব, কী রকম টেস্ট জানা তো ছিল না।... আসি।”

দু’পা গিয়েই ঘুরে বলল, দেখুন ভুল! ভেজিটেরিয়ান, কি নন-ভেজিটেরিয়ান?

বললাম, না, মাছ-মাংস চলে।"

‘গুড।... আসি স্যার।. হ্যাঁ, ওই কলিং বেলের সুইচ। টিপলেই লোক এসে যাবে।. চলি।”

আবার বারান্দা থেকেই ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, “আপনি ততক্ষণ স্নানটান সব সেরে রেডি হয়ে নিন। এসে সব কথা হবে।'

চলে গেলে, দরজার সামনে কুশন চেয়ারটা টেনে নিয়ে চুপ করে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। স্টেশন থেকে, এক রকম বলতে গেলে, মুখ বন্ধ করেই আসতে হল, নিশ্চয় পাছে কিছু জিজ্ঞেস করি বলেই নিজে ড্রাইভারের পাশে বসে এল। আর, এই হোটেল বাড়ি? যেন শ্মশানপুরী। কার হাতে পড়া গেল!

মাথাটা ঝিমঝিম করছে। গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে ধীরেসুস্থে একেবারে স্নান পর্যন্ত সেরে নিলাম। বেশ ভাল ব্যবস্থাই। ঠাণ্ডা-গরম জল, দামি সাবান, তেল। ভাল করে স্নান করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা আঁচড়ে নিয়ে কলিং বেলের সুইচ টিপতে যাব, দেখি একটা সুদৃশ্য ট্রে-তে করে চা আর ব্রেকফাস্ট নিয়ে বেয়ারাটা হাজির। টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে স্নানাগারের কুঁজো থেকে এক গ্লাস জল এনে সব সাজিয়ে রেখে দিয়ে ওদের ভাষাতেই একটা সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করল। তার মধ্যে পেগ (Peg) কথাটা বুঝতে পেরে আমি হাত নেড়ে নহি বলায়, সেলাম করে বেরিয়ে গেল।

আয়োজনটা বেশ ভালই। পটে করে সুগন্ধী চা, দুটাে টোস্ট, একটি অমলেট, দুটাে ঢাকাই পরোটা, একটা করে তবক-দেওয়া এ-দেশি মেঠাই, দুটাে আমাদের এদিকের রাজভোগ, একটা কাচের ডিসে খানিকটা জেলি আর একফালি আমের এ-দেশি আচার। একটা প্লেটে আঙুর, আপেল, কলা।

অতটা খাওয়া যায় না। তবু, বেশ সুস্থ বোধ হচ্ছে, যতটা পারলাম সুবিচার করে, বাথরুম থেকে মুখ হাত ধুয়ে এসে সুইচটা টিপে দিলাম। বেয়ারা এসে ওগুলো সরিয়ে নিয়ে যেতে এলে বললাম, সাহেবকো সেলাম দেও।'

আমেদাবাদ শীতের জায়গা নয়। তবু, ডিসেম্বর মাস, বেশ একটা আমেজ আছেই, গেঞ্জির ওপর এই ঘরেরই নরম মোটা তোয়ালেটা জড়িয়ে খোলা বারান্দায় দাঁড়াতে আবার আগেকার চিন্তাটা ঘিরে ধরল।. এদিকে সব এক রকম ঠিক, কিন্তু কার পাল্লায় পড়ে কোথায় এসে উঠলাম?

বাড়িটা একটা বড় চত্বরের মাঝখানে। সামনে একটু দূরে সবরমতী নদী। বোধহয় আরও গা-ঘেষে ছিল, বাড়ির জমি সংলগ্ন ভাঙাচোরা একটা ঘাটের নিশানা থেকে যেমন বোঝা যায়, এখন বেশ খানিকটা সরে গেছে। পল্লিটা যেন শহরের একটু বাইরেই দূরে দূরে কিছু নূতন বাড়ি উঠছে। তবে, এ বাড়িটা একাই আছে দাঁড়িয়ে। আর, পরিত্যক্ত বলেই মনে হয়। গেট থেকে ঢুকে মোটর থেকে যতটুকু দেখা গেল, তাতে মনে হল পুরনো আমলের ইট আর পাথর দিয়ে তৈরি কোনও আমির-ওমরাহের বাড়ি হতে পারে। আমেদাবাদের ইতিহাস তো সেই রকম।

নদীর দিকেই ফিরে দাড়িয়ে আছি। তন্ময় হয়ে। মনটা এক একবার অতীতে ছড়িয়ে পড়ে আবার রহস্যময় বর্তমানে গুটিয়ে আসছে, হঠাৎ থমকে উঠতে হল, ‘ব্রেকফাস্ট সারা হল স্যার?' ঘুরে দেখি লোকটি পেছনে দাঁড়িয়ে। বলল, কিরকম হল স্যার। 
কলকাতার গ্রেট ইস্টার্ন তো নয়, তবু— বললাম, বেশ ভালই। গ্রেট ইস্টার্ন না হোক, তবু একটা হোটেলই তো হবে? তাই বলে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু...'

বলছি স্যার।... চেয়ার দুটো বাইরেই টেনে আনি।'

কিছু বলবার আগেই, চেয়ার দুটোকে দু হাতে ঝুলিয়ে বাইরে সামনাসামনি বসিয়ে দিল।

বলতে ভুলে গেছি, বেশ শক্তসমর্থ, ত্রিশ বত্রিশের মতো বয়েস। তখন হিটলারি রীতিতে প্রজাপতি গোঁফ রেওয়াজ চলছে; নাকের নীচে সেইভাবে ছাটা গোঁফ। এক ইঞ্চি পরিমাণ।

দুজনে মুখোমুখি হয়ে বসে বলল, গ্রেট ইস্টার্ন নয় ঠিকই। কিন্তু একদিন গ্রেট ইস্টার্নের মতন তাবড় তাবড় হোটেলকে আমার হোটেলের সামনে মাথা নোয়াতে হবে। এই বলে দিলাম স্যার। বড় বড় চোখ চকচক করে উঠল। বলল, আমার প্ল্যান তো ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট ক্যাপচার করা!'

কিরকম?”

‘রবীন্দ্রনাথের ক্ষুধিত পাষাণ' পড়া আছে স্যার?

একবার নয়, বহুবার, কিন্তু...'

এই আপনার সেই ক্ষুধিত পাষাণ।স

সে কি!’ একরকম শিউরে উঠেই বললাম আমি। তারপর চারিদিক থেকে যেন নুতন করে দৃষ্টি বুলিয়ে এনে কী বলব ভাবছি, ও বলল, “আজ্ঞে হ্যা। এর প্রতিটি পাথর, প্রতিটি ইট ক্ষুধিত পাষাণ, কবি যেমন বলেছেন, আপনার তো পড়াই স্যার।"

কিছুক্ষণ কথাই সরল না আমার। সকাল থেকেই যে রহস্যের মধ্যে দিয়ে আসা, তাতে আচমকা ওর এই কথাটা আরও যেন বিভ্রান্ত করে দিয়েছে। তারপর সামনে, ওপরে, পাশে চোখ ঘোরাতে সম্বিত ফিরে এল, বললাম, কিন্তু, তার অভিজ্ঞতা হায়দ্রাবাদের বরচে। দূরে আরবিল পাহাড় থাকবে—সুণ্ডার জায়গায় না হয় সবরমতী রইল.'

একটু হাসল। বলল, “বরীচে আপ্রালি, তুলোর মাসুল—ওসবই কবির কল্পনা স্যার, কাহিনিটি সাজাবার জন্যে ওগুলো করে। আপনি পড়াশোনা করা লোক, এটা তো জানেন যে, বিলেত যাওয়ার আগে আমেদাবাদের জজ মেজদা সত্যেন ঠাকুরের বাসায় থাকতে ক্ষুধিত পাষাণ কাহিনিটি তার মাথায় আসে?”

‘বেশ, তারপর? প্রশ্ন করলাম। মনটা একটু গুছিয়েও আসছে।
“নিছক মিথ্যে কাহিনি নয় স্যার। তিনি ভুক্তভোগী, তার নিজের অভিজ্ঞতা আর এই বাড়িতেই।


নিজের অভিজ্ঞতা এই বাড়িতে বসে? আবার আমায় চমকে উঠে মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হল।


“আজ্ঞে হ্যা স্যার। আর, হায়দ্রাবাদের বরীচে তুলোর মাসুল আদায়ীর বেনামীতে কাহিনিটা লেখবার একটা বড় রকম উদ্দেশ্যও ছিল... এই অধীনের আফিসের..."

"সেটা আবার কি ?”

“বাড়িটা হয়তো আগে গবর্নমেন্টেরই ছিল। যখন সত্যেন ঠাকুর জজ, কিছুদিন পরেই কিন্তু একজন ভাটিয়া ব্যবসাদার এটা কিনে নেয়। অত্যন্ত মামলাবাজ জাত ওরা স্যার। কে একজন বাঙালিবাবু ভূতুড়ে গল্প ছেড়ে তার বাড়ি নষ্ট করছে—অ্যাটর্নিকে ফোন করে বলে দিত—দাও একটা মামলা ঠুকে। এটাও তো জানেন। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শুধু কবি ছিলেন না—বিষয়বুদ্ধিও টনটনে ছিল...”

এবার বিস্মিত হওয়ার বদলে একটু হাসিই সুড়সুড়িয়ে উঠছিল ভেতরে ভেতরে, বাঁধা দিয়ে বললাম, ‘মেনে নিলাম। কিন্তু তাতেও তো প্রমাণ হয় না যে, নিছক কবি-কল্পনা নয়, তার একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল, এবং এই বাড়িতেই।'

“তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, স্যার, সেসব ঘটনা আজও হচ্ছে—এই বাড়িতেই আর ঠিক যেমনটি তিনি লিখে গেছেন!"

‘সেকি! আজও হয়ে যাচ্ছে সেই সব! ওর দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম। তারপর দৃষ্টি আবার আপনা হতেই ঘুরে এলে বললাম, তিনি নিজেই লিখেছেন, সে আড়াইশো বছর আগেকার কথা, তার পরেও এতদিন কেটে গেছে!.'

অভিজ্ঞ ব্যক্তি যেমন করে মূঢ় অনভিজ্ঞ কথা শোনে সেইরকম একটু হাসি নিয়ে শুনছিল, বলল, “আমরা দুকলম ইংরিজি পড়ে লায়েক হয়ে উঠেছি, আমাদের মুনি ঋষিদের কথা হেসে উড়িয়ে দিই, কিন্তু ইয়োরোপ আমেরিকা—মানে, মডার্ন সায়েন্সও কি বলছে না যে-ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে ইথারে তার ইমপ্রেশন থেকে যাচ্ছে আর যত উৎকট ঘটনা ইমপ্রোনেজ তত বেশি, তত স্থায়ী!"

‘বেশ, বলুন। খানিকটা স্বীকার করে নেওয়ার ভাবেই বললাম। প্রশ্ন করলাম, যায় এখনও দেখতে পাওয়া ?”

“শুনতে পাওয়াও যায় স্যার। দিনের বেলা ততটা নয়, তবে এখনও ওই ভাঙা ঘাটে নূপুর পরা পায়ের আওয়াজ কখনও কখনও শুনেছে লোকে। দিনের বেলা ততটা নয়, তবে সন্ধ্যার পর থেকে জেগে ওঠে সারা মহলটা জুড়ে, এখানে ওখানে চাপা হাসি, সেতারের একটু বাজার—উঠতে না উঠতেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আর রাত্রি যত এগুতে থাকে, কবি যেমন বলে গেছেন হুবহু একেবারে ঠিক সেইরকম—“সেই আরব তরুণী, সেই কাফ্রী, খোঁজা, সেই পাগলা মেহের আলির তফাত যাও তফাত যাও—সব ঝুট বলে—বাড়ির চারিদিকে পাক দিয়ে বেড়াচ্ছে।'...আমি এবার ওদিকটা দেখিগে স্যার, এখনও একলাই। আপনি ততক্ষণ একটু রেস্ট নিন। লাঞ্চ সকাল সকাল এসে যাবে।"




উঠে গেল। আমিও খানিকটা চুপ করে বসে থেকে আস্তে আস্তে উঠে বারান্দার রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাড়ালাম। অস্বীকার করব না, বেশ কিছুটা অভিভূত হয়ে পড়েছি, এবং অনুভব করছি, সে-ভাবটা যেন ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে আমাকে। রাত্রে ভাল ঘুম হয়নি, দিনটা দুপুরের দিকে এগুলে, এখানটা একটু গরমই। আমি উঠে বারান্দায় একটু পায়চারি করছি, হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া উঠে খানিকটা বালি উঠিয়ে সবরমতীতেই মিলিয়ে যাচ্ছে, আমার দৃষ্টিটা আপনা হতেই ভাঙা ঘাটের ওপর গিয়ে পড়ল। নিজের কাছেই লজ্জিত হয়ে আমি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম এবার।

ক্লান্ত দেহ মন, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, একটা টিনটিন রিনরিন শব্দে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখি বেয়ারা এসে শ্বেতপাথরের টেবিলের ওপর খাবার গুছিয়ে দিচ্ছে; প্লেট, বাটি-কাটা চামচের ঠোকাঠুকির শব্দ। বহু বিচিত্র পদের প্রচুর আয়োজন। বসে গেলাম।

বেশ ঝরঝরে বোধ হচ্ছে। একটা ছোট রিভলভিং বইয়ের র‍্যাক রয়েছে ঘরের একদিকে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখি কয়েকটা বাংলা ইংরাজি বইয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের একখণ্ড রয়েছে। একটু আগ্রহভরেই পাতা ওলটাতে ওলটাতে দেখি ক্ষুধিত পাষাণ গল্পটাও রয়েছে তার মধ্যে। বের করে নিলাম বইটা। গুরুভোজনের পর একটা আলস্যভাব এসেছে, বইটা হাতে করে শুয়ে পড়লাম। আগ্রহভরে প্রায় সমস্তটাই শেষ করে এনেছি, তারপর কখন ঘুম এসে গেছে বুঝতে পারিনি, উঠলাম যখন বিকাল গড়িয়ে গেছে। আকাশে সূর্যাস্তের শেষ রশ্মির আলো।

বুকটা হঠাৎ ছাৎ করে উঠল। তখনই মনে পড়ে গেল, এমন কিছু নয়; ভেবেছিলাম বাড়িটার একবার সমস্তটা দেখে নিলে হয়। সন্ধ্যা হয়ে গেলে হবে না

এই সময় বেয়ারা চা নিয়ে এল। খেয়ে নিয়ে উঠে পড়লাম। দেখলাম আমার এদিকটাই ফিটফাট, তারপরই সদ্য খানিক ঝাড়ামোছা হলেও, পাশ থেকেই অগোছাল, অপরিচ্ছন্ন। বিশেষ করে পুরানো আমলের প্রাসাদ, জানালা, ঘুলঘুলির এমন ব্যবস্থা যে আলো বড়ই কম। দু-একটা ঘর পেরুতেই আকাশের আলো যেন ফুরিয়ে গেল। এই সময় একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, উপরো উপরি দুটােই বলতে পারি—একটা খুব মিহি বেহালার ছড়ের টানের মতো আওয়াজ। কোথা থেকে উঠল, ঠিক করবার জন্যে কান খাড়া করে, আর নেই! ধোকাই নিশ্চয়। এগুতে হলঘরটায় এসে পড়লাম। বড় বলেই একটু আলো আছে। আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো, তবে সবই পুরানো এবং ঝাড়ামোছাও নয়। আমি পেরিয়ে ওদিকে যাব, একটা মানুষপ্রমাণ আরশি দেয়ালে টাঙানো বা গাথা রয়েছে, মনে হল, আমার ছায়ার সঙ্গে আমার পাশেই যেন আর একজন কার ছায়া পড়েছে। আমি তাড়াতাড়ি ছেড়া কার্পেটের ওপর দিয়ে দুটো ঘর পেরিয়ে ওদিকের বারান্দায় চলে গিয়ে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ালাম। বুকটা ধকধক করছে।

সূর্য অস্ত যাচ্ছে; আলো স্বচ্ছ, বাতাস। দৃষ্টিভ্রমই মনটা সুস্থির হয়ে আসতে তার কারণটাও বোঝা গেল। এই রকম পরিত্যক্ত বাড়িতে, দেখাশোনার অভাবে পুরনো আয়নার পেছনকার পারা নষ্ট হয়ে এখানে ওখানে যে ছোপ ধরে যায়, তাতে দাগগুলো একত্র হয়ে কিছু একটা আকার নিয়ে এইরকম বিভ্রান্তি ঘটায়। এও তাই।

এও তাই নিশ্চয়'—বলে ভ্রান্তিটা একরকম অপসারিত করলেও কিন্তু আর একবার হলঘরে ঢুকে সুনিশ্চিত হওয়ার উৎসাহ হল না। দুটো কামরা ঘুরে অন্য দিক দিয়ে আমার আশ্রয়ের দিকে এগুলাম। যাওয়ার সময় উলটো দিকে আবার একটু বেহালার ছড়ের টান, এবার তার সঙ্গে যেন চাপা ঘুঙুরের আওয়াজ। পা চালিয়ে উপস্থিত হয়ে দেখি, লোকটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বললে, “আপনি রাত্রে কী খান জিজ্ঞেস করতে এসেছিলাম। আপনি নেই দেখে, কলিংবেল টিপে বেয়ারাকে দেখতে বলেছিলাম। আর সন্ধে হয়ে এল, বেরুবেন। হ্যাঁ, কী মেনু বলুন তো—পোলাও, কি লুচি, কি...'

'ওসব কিছু নয়। খানচারেক রুটি, একটু ছোলার ডাল, একটু দেশি তরকারি, আর'

‘বুঝেছি, আর বলতে হবে না। ওই কম্বিনেশন। অস্ফুট একটা কথা—উইথ ইওর লীভ (with your leave) কিছু কানে গেছে কি? প্রায় এই সময় থেকেই আরম্ভ হয় কিনা…'


' কই, কিছু না তো?' আমি চাপা দিয়ে দিলাম। কলিংবেল-নূপুরে বিভ্রাস্তির কথাটা কি ভেবে আর বললাম না।

বললে, “গুড। কিছু না হলেই ভালো; দুদিনের গেস্ট আমরা। আচ্ছা আসি। ডিনারের ব্যবস্থা করি।

উঠে আবার ঘুরে বলল, “ভেবেছিলাম পাশে একটা লোক বসিয়ে রাখি। তা হলে যেমন বলছেন, দরকার হবে না?"

বললাম, ‘পাগল? লোক রাখবেন কেন নাহক ?"

চলে গেলে বারান্দাতেই একটু পায়চারি করলাম। নদী থেকে বেশ একটা ঝিরঝিরে হাওয়া উঠে আসছে; একটু গা শিরশির করে, অথচ বেশ মিষ্টি, মন থেকে এতক্ষণের গ্লানি যেন মুছে দিল। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এল। আর একটু বাইরে থেকে আমি ভেতরে এসে বাতিটা জেলে দিলাম। বেশ কড়া বাল্ব দিয়েছে, ভেতর বাহির আলোয় আলো হয়ে উঠল।


কিন্তু কী করা যায় একা একা? খালি মাথাতেই তো যত উপদ্রব। নজর পড়ে গেল আবার বইয়ের র‍্যাকটার ওপর। গল্পগুচ্ছের পাশেই নীল জ্যাকেট মোড়া ‘টেনিসন’। মনটা লাফিয়ে উঠল, টেনিসন আমার প্রিয় কবি। তখন ক্ষুধিত পাষাণ-এর ঘোর একটু ছেড়ে গিয়েছিল। প্রথমে মনে হল, আগে ওটুকু শেষ করে নিই। তারপর মাথায় একটা আইডিয়া এল—হয়তো ক্ষুধিত পাষাণ পড়ার জন্যে অনুরূপ পরিবেশের জন্যেই আমার বিভ্রান্তিটুকু ঘটে গেল। বরং টেনিসন দিয়ে চাপা দিয়ে দিই।

একটু হাসিও পেল; আর যাই হোক, লোকটির বেশ জ্ঞান আছে মানুষের মনস্তত্ব সম্বন্ধে। যা সব ঘটছে বলল, সেগুলোকে আরও ফুটিয়ে ঘোরালো করবার জন্যে আলতোভাবে গল্পগুচ্ছ সাজিয়ে রাখা। আবার তার পাশেই টেনিসন’। ‘জীবন স্মৃতিতে কবিগুরু লিখেছেন—বিলাত যাওয়ার আগে সতেরো বৎসর বয়সে যদিও টেনিসন বোঝবার ক্ষমতা ছিল না, তবু মেজদাদার বাসায় নির্জনে তার ওই ছিল সম্বল, কী করে একটা সূক্ষ্ম অব্যক্ত আনন্দ পেতেন।

চমৎকার একটি আবহাওয়া সৃষ্টি করেছে দু’জনকে একত্র করে। সোফায় হেলান দিয়ে, পিঠে কুশন দিয়ে আমি আরাম করে বসলাম।

সূচি দেখে পছন্দমতো কবিতা বের করে নিয়ে পড়তে আরম্ভ করে দিলাম। প্রায় আধাআধি এসে তন্ময় হয়ে গেছি। হঠাৎ একটা চমক লাগার সঙ্গে দৃষ্টি বই থেকে উঠে গেল। কী যেন একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে হঠাৎ স্তন্ধ পুরটাতে। নূপুরের সিঞ্জিনী তুলে হলঘরের কাঠের সিড়ি ভেঙে দ্রুতপদে নেমে যাওয়ার শব্দ। কয়েক জোড়া চরণ থেকেই সঙ্গে সঙ্গে চাপা কণ্ঠস্বর। কয়েকটা দ্রুত সেকেন্ড—হাসি কি, আতঙ্ক, কি নিত্যদিনের সাধারণ জীবনের একটা কিছু, বোঝবার আগেই গেল থেমে। কাঠ হয়ে বসে রইলাম। কলিং বেলের বিভ্রান্তি টেনে আনবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কেন জানি না, তাতে কোনও স্বস্তি পেলাম না।

প্রায় ঘণ্টাখানেক আর কিছু নয়। আমার মনটাও বইয়ে বসে এসেছে, আবার সেই কাণ্ড। এবার থেকে থেকে হয়েই চলল। সবরমতীর হাওয়াটাও একটু সতেজ হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে যেন ক্ষুধিত পাষাণের ঘটনাগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠা বায়ুর সঙ্গে মিশে প্রেতলোকের একটা অভিনব খেলায় মেতে উঠেছে।

কান পেতে শুনতে গেলেই যায় থেমে। আমি আবার টেনিসনে মন বসাবার চেষ্টা করলাম।

বৃথা। মনে হচ্ছে, সুপ্তির বিস্মৃতি ছাড়া কোনও উপায় নেই। উঠে কলিংবেলের সুইচটা টিপে দিলাম। বেয়ারা উপস্থিত হলে প্রশ্ন করলাম, খানা তৈয়ারি হ্যায়?

মাথা দোলাতে বললাম, 'হাজির করো।

এবার লোকটিও সঙ্গে এসে একটা চেয়ারে বসল। একটু এদিক-ওদিক গল্পও জুড়ে দিল। সংক্ষিপ্ত আহার; শেষ হয়ে গেলে একটু হাত কচলে বিনয়ের সঙ্গে বলল, “উইথ ইওর লীভ স্যার', ..ইয়ে— সেরকম কিছু দেখা, কি কানে শোনা." ‘

'কই কিছু না তো'! আমি উঠে পড়ে বললাম।

“তা হলে স্যার, এসবের আর একটা যে থিয়োরি আছে—কেউ পায়, কেউ পায় না—মন ঠিক এক পর্দায় বাধা না থাকলে। তা হলে কোনও লোক বসিয়ে রাখবার দরকার হবে না?"

'কিছু না।’ তাচ্ছিল্যভাবে কথাটা বলে আমি আঁচাতে চলে গেলাম বাথরুমে।

বেরিয়ে দেখি লোকটি চলে গেছে। বারান্দায় বেরিয়ে খানিকটা তাজা বাতাস বুকে পুরে নিয়ে ভেতরে চলে এলাম। নীল অল্প শক্তির বেডরুম ল্যাম্পটা জ্বেলে কড়া আলোটা নিবিয়ে দিয়ে পায়ের কাছে মোটা নরম সুজনিটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। বেশ ঘুম হয়েছিল। যতক্ষণ তন্দ্রার ঘোর, ততক্ষণ সেই বেহালার ছড়ের সূক্ষ্ম টান ঘুমপাড়ানি সুরেরই কাজ করে থাকবে। তারপর, কতক্ষণ পরে জ্ঞান নেই একেবারে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম, খাটটা হঠাৎ খটখটিয়ে নড়ে উঠেছে। দুটো ভুল হয়ে গিয়েছিল মনের চাঞ্চল্যে—শোবার সময় দেওয়াল ঘড়িটা দেখা হয়নি, আর, ঘরের দরজাটাও বন্ধ করা হয়নি। উঠেই সেদিকে নজর যেতে মনে হল কে একজন দ্রুতগতিতে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মেয়েছেলেই, চুনরি-ঘাঘরার প্রান্তটা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল।

গা যেন অসাড় হয়ে আসছে। আরও দুটাে ভুল হয়ে গেছে—প্রথম তো এই পরিবেশে নুতন করে ক্ষুধিত পাষাণ পড়ে, আর একটা একটু বেশিই—বারান্দায় একজন লোক বসিয়ে রাখতে মানা করা। সুজনি সরিয়ে উঠে কলিংবেলটা বাজাতে ছড়ের টানটা দমকা হাওয়ায় দোল খেয়ে একেবারে ঘাড়ে এসে পড়ল, আরও দ্বিগুণ হয়ে। আর তন্দ্রার সেই ঘুমপাড়ানি নয়, যেন কার অভিমানে ভরা ক্রন্দন— ''বাঁচাও, আমায় উদ্ধার করো এই অন্তহীন বন্দিদশা থেকে!" কোথা থেকে কী হয়ে গেল, একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল আমার মনে–শান্ত, সংকল্পে দৃঢ়। আগেকার সব গ্লানি নেমে গিয়ে অনুভব করছি, মাথাটাও পরিষ্কার হয়ে এসেছে।... যাব। কাপুরুষের মতো গুটিয়ে বসে না থেকে, অশরীর আহ্বান হলেও সেই অশরীরীর সম্মুখীন হতে হবে। যদি, লোকটি যেমন বলল, আর কিছু না হয়, মাত্র ইথারের কল্পনাই হয় তা হলে ইথারের দেহ থেকে এই দুরপনেয় অভিশাপ মুছে ফেলতে হবে। বিজ্ঞান এগুচ্ছে, অনুসন্ধান করলে একটা প্রতিকার পাওয়া যাবেই।

তুলার মাসুল আদায়ী ভদ্রলোকের মতো আমার অভিসারের প্রস্তুতি নয়। যেমন ছিলাম, খাট থেকে নেমে পড়ে এগুলাম। কোনও দূতী নয়, ছড়ের টান অনুসন্ধান করে। কোথা থেকে উঠছে জানি না, তবে অবিরত সামনে থেকে আমায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পথ দেখিয়ে। বহু দিনের কথা, বহু বৎসরই হয়ে গেল, শুক্লপক্ষ কি কৃষ্ণপক্ষ ছিল মনে নেই, তবে আকাশে পূর্ণচন্দ্র থাকলে ঘরের ভেতরে যেমন একটা আলোর আভা ছড়িয়ে থাকে সেই রকম অস্পষ্ট আলোতে এগিয়ে চলেছি আমি। চোখও আসছে সয়ে। অনেকক্ষণ এ-ঘর, এ-গলি সে-গলি ঘুরে এক সময় একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। বহু পঠনে পরিচিত সেই ঘর। একটা ঘননীল রেশমের পর্দা ঝুলছে! আমার ধমনীতে সব রক্ত যেন স্তিমিত হয়ে গেল! কতক্ষণ সংকল্প-সংশয়ের মধ্যে দাঁড়িয়েছিলাম জানি না, এক সময় মনের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে খুব সস্তপণে পর্দার একটুখানি সরিয়ে ভেতরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। অবিকল ক্ষুধিত পাষাণের’ সেই দৃশ্য—সেই মুক্ত কৃপাণ কোলে রেখে কাফ্রী খোজা, ওদিকে তক্তের ওপর সুসজ্জিতা আরব তরুণী। মনের চাঞ্চল্যে অস্পষ্ট আলোকে তার উর্ধভাগ দেখা গেল না, তবে তক্তের ওপর লম্বিত স্ফীত জাফরান রঙের পায়জামার নীচে দুটি শুভ্র চরণ বেশ সুস্পষ্ট। পাশে কাচের আধারে আপেল-আঙুরগুচ্ছ আর সুরাপাত্রও স্পষ্টই।

চকিতে সেটুকু চোখে পড়ল। পরক্ষণে কম্পিত হস্তে পর্দাটা আর একটু সরাতে গিয়ে ওপরের বালাগুলোর ছিক করে একটু শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাফ্রী খোজা চমকে জেগে উঠতে কৃপাণটা কোল থেকে পড়ে গেল ঝনাৎ করে। আমি সঙ্গে সঙ্গে পর্দা ছেড়ে পেছনে হটতে গিয়ে চিৎকার করে উঠলাম—কে আমায় পিছন থেকে জাপটে ধরেছে। ঘুরে দেখি, বেয়ারাটা। বলল, ডরো মৎসাহেব। সব ঝুট হ্যায়! বিলকুল ঝুট।’

হাত ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে এল আমার ঘরে।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেষ রাত্রে একবার ঘুমটা ভেঙে যেতে শুনলাম—কে যেন ওই কথা বলে বাড়ির চারিদিকে চক্কর দিয়ে ফিরছে, সব ঝুট হ্যায়—তফাৎ যাও—তফাৎ যাও। বেয়ারা নয়, তার গলাটা নরম। এ যেন চেচাতে চেচাতে রুক্ষ, কর্কশ হয়ে গেছে।

এর পর যখন উঠলাম, দিন অনেকখানি এগিয়ে গেছে, দেওয়াল ঘড়িতে আটটা। দীর্ঘ নিদ্রায় বেশ সুস্থ সহজ বোধ করছি। রাত্রের সব অভিজ্ঞতা বড় অদ্ভুত মনে হচ্ছে, হাস্যকরই নিছক একটা দুঃস্বপ্নই নয়তো। সব সেরেসুরে প্রস্তুত করে নিলাম নিজেকে।




আমার রাতের রহস্য মিটে গিয়ে আগের দিনের রহস্য নিয়ে পড়লাম। এবার আরও জটিল এবং মর্মন্তুদ অন্তত ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্যে তো বটেই।

প্রস্তুত হয়ে নিয়ে সুইচ টিপতে বেয়ারা এসে দাঁড়াল। লোকটা হিন্দি গুজরাটি মিশিয়ে কথা বলে, বিনীতভাবে জানাল, বার দুই এসেছিল, ঘুমুচ্ছি দেখে ফিরে গেছে। বললাম, ঠিক হ্যায়। ব্রেকফাস্ট। আওর সাহেবকা সেলাম দেও।'

আধাআধি খাওয়া হয়েছে। লোকটি এসে উপস্থিত হল। টেবিলের পাশে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বলল, বেয়ারা নিশ্চয় বলেছে, আর লুকোনো যায় না। হয়েছিল একটু একটা স্বপ্ন দেখে। একটু লঘুভাবে হাসলাম আমি। বললাম, যা এক আষাঢ়ে গল্প হাঁকিয়েছিলেন! তারপর সহজ কণণ্ঠেই বললাম, হ্যা, যা বলছিলাম—আমার বিলটা নিয়ে আসুন। “আজই যাবেন স্যার ?” হ্যা। ক্যাম্প খুলে দিয়ে থাকবে। না থাকে ওঁরা করবেন কোনও ব্যবস্থা। কিছু আলোচনা করার আছে সেশন শুরু হওয়ার আগে। দেরি হবে আপনার? ভদ্র তাগাদ হিসাবেই শেষেরটুকু জুড়ে দিলাম। “যাঃ, একদিনের মামলা, দেরি কিসের?” উঠে গেল। আমি আহার শেষ করে হাতমুখ ধুয়ে শোফায় বসেছি। বিলটা নিয়ে এসে পাশে বসল। একটা কুশন চেয়ার টেনে নিয়ে তার ওপর রেখে দিয়ে বলল, “এই স্যার, তাড়াতাড়িতে হয়তো কোনও আইটেম ছেড়ে গেল. তা থাকগে।” চোখ বুলুতে গিয়ে চক্ষুস্থির। ইংরাজিতে লেখা, বাংলায় তর্জমা করে দিচ্ছি—

১। সুসজ্জিত কক্ষ লাইট সমেত—একদিন ২৫
২। প্রাতরাশ– ১৫
৩। মধ্যাহ্নভোজন- ২০
৪। অপরাহ্ন চা— ১০
৫। প্রেতলোক কর্তৃক চিত্তবিনোদন— ৯০০
--------------

মোট ৯৭০

অবাক হয়ে গেছি। শেষ দুটো আইটেম থেকে চোখ তুলতে পারছিনা। একটু দেখে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, 'বেশ।. কিন্তু এই আইটেম তো বোঝা গেল না। Spirit world entertainment?

“ওই যে স্যার, যেটাকে আজকাল ইথারে ইমপ্রেশন বলে উড়িয়ে দিতে চাইছে। যার জন্যে আপনার স্বপ্ন, আর বেয়ারার আপনাকে ধরে সামলে নিয়ে আসা।"

‘বুঝেছি। ওই হল আপনার চিত্তবিনোদন ? কিন্তু তাতে এত খরচ কেন? প্রেতলোকে তাদের না আছে বাপের শ্রাদ্ধ, না আছে মেয়ের বিয়ে। বিরক্তিটা চাপবার চেষ্টা করেও ব্যঙ্গের মধ্যে একটু বেরিয়েই গেল।

ঘাড়টা নামিয়ে নিয়ে চুপ করে বসে রইল। কী ভাবছে যেন একটু লজ্জিত। আমিও আর কিছু না বলে চুপ করেই আছি, এক সময় মুখটা তুলে কুষ্ঠিতভাবে বলল, “তা হলে একটু ভেঙে বলি স্যার। যদি আশা দেন। ট্রেড সিক্রেট (Trade secret) কিন্তু না।"

“কিসের আশা, বলো।’

“গোড়াতেই বলেছি ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট ক্যাপচার করবার জন্যে একটা কম্পানি ফ্লোট (float) করতে চাই। রবীন্দ্রনাথের নাম তো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। যদি গোটাকতক শেয়ার নিয়ে উৎসাহ দেন।"

- কিন্তু ট্রেড সিক্রেটের স্বরূপটা না জানতে পারলে কী করে হবে? “

এক্ষুনি জানতে পাবেন স্যার।"

উৎসাহভরে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। একটু পরেই একটা ফুলস্কাপ সাইজের বাঁধানো খাতা এনে চেয়ারের ওপর রেখে পাতা খুলে দিয়ে বলল, “এই দেখুন স্যার খরচের বহর। এর ওপর যৎসামান্য প্রফিটের মার্জিন রেখে বিলটা করেছি।”

আমায় বিলটা দেখতে দিয়ে নিজে সোফার গায়ে হেলান দিয়ে নেতিয়ে পড়ল।

ইংরাজিতেই তর্জমা করে দিলাম—

১। আরব তরুণীর ভূমিকায় মিস হেন হাজরা ফিল্ম স্টার, সানরাইজ ফিল্মস আমেদাবাদ–৩০০
২। কাফ্রী খোজা—লতিফ বেপরোয়া—২০০
ঐ ঐ
৩। পাগলা মেহের-দৌলৎ আলি–১০০
ঐ ঐ
৪। নেপথ্য সংগীত–ধীরাজ চট্টরাজ–২০০
ঐ ঐ
৫। ভাড়ায় সাজসজ্জা—৫০
৬। আলোক—৫০ মোট–৯০০

এবার তালিকাটায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মনটা গুছিয়ে নিতে অনেকক্ষণ গেল! লোকটি সোফায় হেলান দিয়ে, কী ভেবে গুনগুন করে একটা সুর তুলতে যাচ্ছিল, ‘হু!' বলে আমি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে মাথা তুলতে, সোজা হয়ে বসল, ঘুরে বললাম, দেখেছি, তোমার ট্রেড সিক্রেট।'

“আজ্ঞে হ্যা স্যার। আশা পেয়েছি বলে আপনাকেই দেখালাম। আর সবার বিলে শুধু খোলাখুলি ওইটুকুই থাকবে—স্পিরিট ওয়ার্লড এনটারটেনমেন্ট। কেমন বুঝছেন স্যার?”

ভালই।’ বলে একটু হাসিও টেনে আনতে পারলাম ঠোঁটে। ভগবান কৌতুকবোধটুকু দিয়ে এই রকম নিরুপায় পরিস্থিতিতে শেষরক্ষা করিয়ে দেন। যেখানে একটা হইচই ওঠানো যেত, একটু হেসেই বললাম, দেখা যাচ্ছে, তা হলে বাড়িটা ক্ষুধিত পাষাণ নয়, ক্ষুধিত পাষাণ আসলে হচ্ছেন.'

“কী যে লজ্জা দিচ্ছেন স্যার!” বাধা দিয়ে হাত কচলে বলল, “একটা আইডিয়া এল মনে—গল্পটার মস্ত বড় একটা ট্রেড পসিবিলিটি (Trade possibility) আছে. ইন্টারন্যাশনাল..."। ভাল আইডিয়া' একটু হাসি নিয়েই উঠে পড়লাম। বললাম, সুইচ টিপে বেয়ারাকে একটা ট্যাক্সি ডেকে দিতে বলে দিন। বিলটা ক্লিয়ার করছি।”

ট্যাক্সিটা ছাড়বার সময় আবার মনে করিয়ে দিল, “ওই শেয়ারের কথাটা স্যার…

বললাম, 'ভেবে দেখতে হবে বইকি।"

1 টি মন্তব্য: