বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

তমাল রায়'এর গল্প : সিংঘি লেক আর ছ’টা পঁয়ত্রিশের ট্রেন

লেকের ধারে এ-সময়টা অদ্ভুত সুন্দর। পাতার ফাঁক দিয়ে আসে সূর্যাস্তের আলো। জলটা অল্প নড়ছে, আর জলে ভেসে রয়েছে না-খোলা-কমলালেবু। লেকের ওপার দিয়ে ঠিক ছ'টা পঁয়ত্রিশ বাজলে ট্রেন যায়, জলে ট্রেনের ছায়াও পড়ে। জল কাঁপে, যারা সান্ধ্যভ্রমণে লেকের ধারে হাত নাড়ে, পা নাড়ে, তারাও কেমন চুপ করে দাঁড়ায় ঠিক ওই সময়টায়। স্যালুটেশন? না’কি স্যালভেশন? বোঝা যায় না ঠিক। যেসব প্রেমিক-প্রেমিকার দল পরস্পর আলিঙ্গনে, হয়ত ঠোঁটে ঠোঁট... তারাও অল্প সময়ের জন্য সরে বসে। গুছিয়ে নেয় পোষাক। সন্ধ্যে না নামলেও ট্রেনের ভেতরের সাদা আলোর জানলাগুলো জলের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট দূরত্বে দ্রুত এগিয়ে যায়। 

এখানে তখন সন্ধ্যে নামছে। পাখিরা এসে বসছে তাদের নির্দিষ্ট গাছে। দু-একটা দল ছাড়া কিচির মিচির শেষে, তারাও পেয়ে যায় গাছ। চাঁদ ওঠে বা ওঠে না। মেঘ থাকলে চন্দ্রমা ভারি সুন্দর হয়ে ওঠে মেঘের কানায়। চুমু খেতে গিয়েও হাঁ করে তাকিয়ে থাকে প্রেমিক, অভিমান ভর করে প্রেমিকাকে। সে হয়ত মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে ততক্ষণে। এবার মান ভাঙাতে হবে পুরুষকে। 

রবি ঠাকুর যেবার নোবেল পেলো, সে সময়ে এ বাংলাদেশ বড় বিভিন্নতায় বিদীর্ণ। কত লোক কত কি বলত তার আগেও পরেও। রবি ঠাকুর বড় বাড়ির মানুষ, তার কাছে সে খবর পৌঁছত না। যা পৌঁছত সেই সজনীকান্তর শনিবারের চিঠি, তার হুলেই তিনি এত বিদ্ধ, বাকি ফিসফাস কানে এলে তিনি হয়ত নেকা নিকি বন্ধই করে দিতেন। সেই সময়ে রায় বাহাদুর শাস্ত্রজ্ঞ অজিত সিংহ বর্মন, যিনি কিনা প্রকৃতিবিদও ছিলেন, এই সরোবর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাটান। মাঝে একটা দ্বীপের নির্মাণ করেন। তিনিও ব্রহ্মের উপাসক। সাধনা তাঁকেও করতে হয়। বড় সাধ ছিলো রবি ঠাকুর স্বয়ং এসে এই সরোবর উদ্বোধন করুক। তা রবি ঠাকুর তখন খুব ব্যস্ত হওয়ায় ওনার জগদাকে পাঠিয়ে দেন এই সরোবর উদ্বোধনে। মনে ভারি দুঃখ আর বিষাদ নিয়েই দেহত্যাগ করেন সিংহ বর্মন। টেগোর লেক না হয়ে এ-লেকের নাম হল শেষমেশ সিংহ সরোবর। তবে খুব যত্ন আত্তি করত বটে তেনার ছেলেরা। সরোবরে তখন শালুক ফোটে, পদ্ম অলি ভন ভন করে। সিংঘিরা নিজেদের জন্য শৌখিন বজরার মত নৌকোও বানিয়েছে। সেই বজরা ঘোরে সারা সরোবর। আর তাতে কোবতে পড়তে আসে কোলকেতার সব বড় বড় কবি সাহিত্যিকের দল। সে এক্কেরে যারে বলে জমজমাট ব্যাপার। কিছু কানাঘুষোও আছে। সেতো আর সবার সামনে বলার না। কেচ্ছার কথা। অজিত সিংহ বর্মন ছিল গুটিকয় পাটকলের মালিক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা দুনিয়ায় পাটজাত দ্রব্যের প্রভূত চাহিদা দেখা দিল। বুকে সাহস মনে বল আর সামনে ডোয়ারকানাথ-কে মনে রেখে সিংগি বাবু জাহাজে করে মাল পাঠালো বিদেশ। সেই শুরু সিংগিদের উত্থান। তবে মনে একটা খেদ ছিল সিংগি বাবুর। ডোয়ারকা যেমন ভিক্টোরিয়ার সাথে ফষ্টিনষ্টির সুযোগ পেয়ে মান বাড়ালো পরিবারের, তার তো অমন হয় না। অনেক খুঁজে পেতে পাওয়া গেল ইন্দুমতীকে। বিদুষী নারী। কেবল বংশটা ভালো না। তা হোক। এ কথা উহ্য বা গুহ্যই থেকে যাবার কথা ছিল। কিন্তু বাঙালি হল শকুনের জাত। ঠিক জেনে গেল সক্কলে। মায় ধম্ম পত্নী চন্দ্রবালাও। সে বিষ খেয়ে... থাক।

তো কি হল এই সরোবরের মাঝে একটা সুন্দর ঘর বানিয়ে তাকে রেখে দিলো সিংগি বাবু। বয়সে পেরায় ৩৫ বছরের ছোট ইন্দু। কিন্তু সে রূপে লক্ষ্মী গুণে সাক্ষাৎ সরস্বতী। সে নিজে গান লেকে সুর দেয় গায়। আর মুগ্ধ হয়ে শোনে সিংগি বাবু। বয়স তো তারও হল পেরায় ৭০। পুরুষাঙ্গ আছে। কিন্তু তেমন সবল কই। ফলে ইন্দুর দুঃখ আর কমে না। তবে সিংগি বাবু উদার, বৃহৎ হৃদয়। তাই কবিদের ডাকতে শুরু করলেন। কোবতে পাঠ হয়। গান, নাচ। জমে গেল সিংগি সরোবর। সিংগির বড় ছেলেটার ছিল ছুঁচোর স্বভাব। কেবল উঁকি ঝুঁকি। সিংহর বেটা ছুঁচো হবে কে জানতো। তা বাপ পাট বেচতে দিল্লী না আমেদাবাদ কোতায় যেন গেচে। বড় ছেলে ভাব জমালো ইন্দুর সাথে। আর যা হয়। হল সব। যথাসময়ে বাচ্চাও প্রসব করল ইন্দু। কদিন হল একটা নতুন ট্রেন চালু হয়েছে। সন্ধ্যে ছটা পঁয়ত্রিশ এর ট্রেনটা ঠিক সরোবরের পাশ দিয়ে যায় আওয়াজ করতে করতে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে। সে আওয়াজে ঢাকা পড়ে অন্য সব আওয়াজ। এবার তো কেলেঙ্কারি। সিংগি পরিবারের সম্মান বলে কতা। ওই ট্রেন আসার হিসেব কষেই আগুন লাগিয়ে দিলো ইন্দুর ঘরে সিংগির বাঁধা লেঠেলরা। সেটা দেশ ভাগের সময়। চারদিকে এমনিই গোলাগুলি। আগুন জ্বলছে সর্বত্র। এ সিংগি সরোবরে আগুন জ্বললো না নিভলো সে খবর আর কে রাখে। শেষ হল ইন্দু অধ্যায়, খুব না’কি চীৎকার চেঁচামেচি শোনা গেছিল। না ভয়ে কেউ এগোয়নি। দেশ স্বাধীন হল। সিংগি বাবু পতাকা তুললেন ১৫, ১৬ মায় গোটা হপ্তা ভর। কিন্তু মনটা বড় ভারি। বুকে ব্যথা। এই সরোবরে তিনি এয়েছিলেন একবার, ওই দ্বীপের দিকে যাননি। সব ঝলসানো, ভয় লাগে, মায়াও। বড় ছেলেটাকে তেজ্যপুত্তর করতে গিয়েও থেমেছেন তাঁর বন্ধুদের পরামর্শে। আসলে হজম করতেও তো লাগে হে। বজরাতেই হেলে পড়লেন তিনি। আর উঠলেন না। তখনও ট্রেন যাচ্ছে, ছটা পঁয়ত্রিশের ট্রেনটা। লোক বলে ওই ট্রেনের আওয়াজ শুনেই না’কি… 

পেরায় তিন বছর ওই সরোবরে কেউ যেত না। রাত হলে,যদি চাঁদ উঠতো ইন্দু আর সিংগি বাবুকে না’কি দেখা যেত। আর ওই সেই ট্রেনটা। উফফ। সাধের সিংগি সরোবর খাঁ খাঁ শ্মশান হয়ে গেল। দেশভাগের উপুর্যপরি ঠেলায় এই বাংলায় আছড়ে পড়ল উদ্বাস্তুর ভিড়। তাদের না ঘর না দোর না আশ্রয়, শোনা যায় তারাই না’কি লোকজন নেই, ফাঁকা পতিত অঞ্চল দেখে ওখানে ঠাঁই গাড়ে। পরে শনি মন্দির, বাজার, দুধের ডিপো, চুল্লুর ঠেক একটু দূরে বেশ্যা পাড়া, নগরায়ন যেভাবে হয় আর কি। আর হ্যাঁ, সাথে সন্ধ্যা ছটা পঁয়ত্রিশ...ঝিক ঝিক… 

লেকের ধারে এ সময়টা অদ্ভুত সুন্দর। পাতার ফাঁক দিয়ে আসে সূর্যাস্তের আলো। জলটা অল্প নড়ছে, আর জলে ভেসে রয়েছে না-খোলা-কমলালেবু। লেকের ওপার দিয়ে ঠিক ছ'টা পঁয়ত্রিশ বাজলে ট্রেন যায়, জলে ট্রেনের ছায়াও পড়ে। জল কাঁপে, যারা সান্ধ্যভ্রমণে লেকের ধারে হাত নাড়ে, পা নাড়ে, তারাও কেমন চুপ করে দাঁড়ায় ঠিক ওই সময়টায়। স্যালুটেশন? না’কি স্যালভেশন? বোঝা যায়না ঠিক। যেসব প্রেমিক প্রেমিকার দল পরস্পর আলিঙ্গনে, হয়ত ঠোঁটে ঠোঁট... তারাও অল্পসময়ের জন্য সরে বসে। গুছিয়ে নেয় পোষাক। সন্ধ্যে না নামলেও ট্রেনের ভেতরের সাদা আলোর জানলাগুলো জলের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট দূরত্বে দ্রুত এগিয়ে যায়। এখানে তখন সন্ধ্যে নামছে। সেতো অনেক দিনের কথা। অরিন্দ্রজিৎ সিংহ। আসলে সিংহ বর্মন সংক্ষেপে সিংহই লেখে ওরা আজকাল। যুগ এগিয়েছে। অতবড় পদবী আর কেউ ব্যবহার করে! আশুতোষ কলেজের কেমিস্ট্রি অনার্সের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র আজ তার বান্ধবী না’কি বন্ধু চন্দ্রমাকে এলিয়াস চন্দ্রাকে নিয়ে এসেছিলো সিংগি সরোবরে। শহরের উপকন্ঠে ওই এক রবীন্দ্র ছাড়া আর সরোবর কই। তবু এটা তুলনামূলক ফাঁকা। লোকজনের ভিড় কম। লেকের জলে হাত ডুবিয়ে জল ছিটোচ্ছিল অরি। আর চন্দ্রা তখন নিজের লেখা কবিতা পড়ছে। অরি চন্দ্রাকে বলছিল- জানিস এই লেকটা না আমাদের। এই অরি আসলে সেই সিংগিবাবুর বড় ছেলের একমাত্র নাতি। চন্দ্রা মুখ ভেঙচে বলছিল- হ্যাঁ তুই তো জমিদারের নাতি। এই লেক, ওই উড়ালপুল, ওই আকাশটাও তোদের বলে দে, তাহলেই মিটে যায়। অরির রাগ হল। হাত ধরতে গেল চন্দ্রার। চন্দ্রা হাত দিলো না। এরপর বলবি এই হাতও তোর। অরি রেগে গিয়ে বলছিলো

-হ্যাঁ আমারই তো। 

- দেব না, কি করবি? 

- দিবি?

-না দেব না।

-শিওর?

-দেব না, দেব না, দেব না। 

-ওকে, তাহলে দেখ। কি করতে পারি।

হিড়হিড় করে টানতে টানতে চন্দ্রাকে নিয়ে তুললো একটা নৌকোয়। যতদূর সম্ভব মুখ স্বাভাবিক করে মাঝিটাকে বলল যাবে? ওই মাঝখানে? মাঝি বলল- ২০০টাকা। 

-দেব। 

চন্দ্রা মুখ গম্ভীর করে বসে নৌকোয়। আলো নিভে আসছে…

ছটা পঁয়ত্রিশ। ট্রেনটা আসছে এখন লেকের পাশ দিয়ে। মাঝি তাড়া দিচ্ছে- এবার আসুন। অরি চন্দ্রার দিকে এগিয়ে এলো। পকেট থেকে কী একটা বের করল। বলল- এই নে তোকে শাস্তি দিলাম। 

সিঁদুরের কৌটোটা বের করে পরাতে চন্দ্রার সিঁথিতে সময় লেগেছিল ঠিক ত্রিশ সেকেন্ড। ট্রেনটা তখনো যাচ্ছে ঝিক ঝিক করে। নৌকোয় উঠে অরি চন্দ্রাকে বলল- নে তোর সেই কবিতাটা বল। চন্দ্রার লাজুক হাসি চেপে কবিতা বলতে লাগলো। ট্রেন চলে যাচ্ছে ছটা পঁয়ত্রিশের ট্রেনটা। চন্দ্রমা ওরফে চন্দ্রা ঘটনাচক্রে ইন্দুমতীর বোন বিধুমুখীর মেয়ের নাতনী। লেক ফিরে যাচ্ছে নিজের অবস্থায় সন্ধ্যে নামলে, যেমন যায় যে কোনো নগরই তার অবস্থানে। 



লেখক পরিচিতি-- 

তমাল রায়ের জন্ম ১৯৭০-এর নকশাল আন্দোলনের জন্য বিখ্যাত বরানগরে। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে ও বাংলা সাহিত্যে স্নাতক। ছোটগল্প লেখার শুরু ২০বছর বয়সেই। ছক ভাঙা গল্প লেখার দিকেই ছিলো মূল ঝোঁক। গল্প ও গদ্য উভয় ধারাতেই সাবলীল। ১৯৯০থেকে ঐহিক পত্রিকার সম্পাদক। প্রকাশিত ছোটগল্পের বই দুটি। নিঝুমপুরের না-রূপকথা ও তিতিরের নৌকোযাত্রা। ২০১৫-তে একাডেমি পুরস্কারে সম্মানীত, সম্পাদনার জন্য।

1 টি মন্তব্য: