বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

মোহছেনা ঝর্ণা'এর গল্প : রহস্যকূপ

বাড়িটা এখন বেশ ফাঁকা। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে অনেক্ষণ। সারাদিনের দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটি ব্যস্ততা মুখর সময় কাটিয়ে ফিরে গেছে সবাই যার যার বাড়ি। সবাই অবশ্য ফিরে যায়নি। শরীফা ফিরে যায়নি তার বাড়িতে।

সকাল থেকে আবহাওয়াটা বিরূপ আচরণ করছে। আমগাছে এ বছর মুকুল এসেছে অনেক। আবার সামান্য বাতাসেই ঝরে পড়ছে অসংখ্য মুকুল। মুকুল পড়ে পুকুর ঘাটটা ভরে আছে। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে সবাই চলে যাওয়ার পর এখন শরীর জুড়ে রাজ্যের ক্লান্তি টের পাচ্ছেন হায়দার আলী। বিধ্বস্ত চেহারায় পুকুরঘাটে বসে তিনি সেই জায়গাটা দেখছেন, যেখান থেকে তোলা হয়েছিল শরিফার মৃতদেহটা।


রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উড়ছে। শাহানা রান্নাঘরে কি রাঁধছে কে জানে! আজ সারাদিন চুলায় আগুন জ্বলেনি। আশ্চর্য! ক্ষুধার কথাও মনে ছিল না এতক্ষণ। যেই না ক্ষুধার কথা মনে হলো ওমনি পেট চোঁ চোঁ করে ওঠে হায়দার আলীর। হেলেন ঘর ঝাড় দিচ্ছে। সকাল থেকে কত মানুষ এসেছে! পাড়া-পড়শী, মেম্বার, চেয়ারম্যান, থানার দারোগা, সাংবাদিকসহ আরো কত গন্যমান্য ব্যক্তি!

হঠাৎ করে দমকা বাতাস ছুটেছে। হায়দার আলীর চোখে বাতাসের ঝাপটায় কি যেন ঢুকে গেল। তিনি চোখ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শাহানার চুলার আগুন বারবার নিভে যাচ্ছে। সে নিশ্চয়ই বাতাসের সাথে নীরব প্রতিবাদ করছে। রান্নাঘরে দক্ষিণের মূলি বাঁশের বেড়াটা ভেঙ্গে আছে বেশ ক’দিন ধরে। হায়দার আলী ঠিক করবেন, ঠিক করবেন করেও সময় করে উঠতে পারেন নি।

অন্যদিন হলে শাহানা, হায়দার আলীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বাতাসের সাথে ঝগড়া করতো। আর নিজের কপালের দোষ দিয়ে ক্ষান্ত হতো। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। বাতাসের বেগ বাড়ার সাথে সাথে হঠাৎ করে এলোমেলো ভাবে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। বাতাসের তীব্র বেগ আর তীর্যক বৃষ্টিতে পুকুরঘাটের সাথে লাগোয়া আম গাছ থেকে শত শত মুকুল ঝরে পড়ল।

হেলেন ডাকছে, বাবা ঘরে আসো। বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছ তো।

হেলেনের কথা শুনে হায়দার আলী উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু তিনি ঘরে না গিয়ে পুকুর পাড় দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমলকী গাছটার তলায় এসে দাঁড়ালেন। আমলকী গাছটার সাথেই পুকুরের কিনার ঘেঁষে ভেসে ছিল শরীফা। পরনে কলা পাতা রঙের জামা, দু’হাতে কাঁচের চুড়ি, চুলে লাল ফিতা দিয়ে ঝুটি করা। হায়দার আলী যখন শরীফাকে পানিতে ভেসে থাকতে দেখলেন হঠাৎ করে তার মনে হলো ছোট্ট শরীফা যেন নরম কোনো বিছানায় শুয়ে আছে। ছোট্ট শিশু যেমন দোলনায় দুলতে থাকে ঠিক সে রকম। শরীফার ফর্সা গাল দুটো একদম ফ্যাকাসে হয়েছিল।

সকাল বেলা স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন তিনি। শামার চিৎকার শুনে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। আমলকী গাছটার নিচে গিয়ে শরীফার মৃত দেহটা ভাসতে দেখে মাথায় একটা চক্কর দিয়ে উঠল তার। একে একে আমলকী গাছটার নিচে জড়ো হয় হেলেন, শাহানা, হায়দার আলীর বড় ছেলে জিতু। সবার চিৎকার চেচাঁমেচি আর সোরগোল এ আশেপাশের বাড়িগুলোর সব মানুষজন এসে উপস্থিত। মকবুল আর মকবুলের বউ রাবেয়া তখনো খবর পায়নি। হায়দার আলীর বড় ছেলে জিতু পুকুর থেকে পাঁজকোলা করে শরীফার মৃত দেহটা তুলে আনল।

খবর পেয়ে ছুটে আসে মকবুল আর রাবেয়া। দিগ্বিদিক জ্ঞান শুন্য রাবেয়া হুমড়ি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে গেলে বাধা দেয় কেউ কেউ। কারণ তখনো হেলেন আর জিতু শরীফার পেটে মৃদু চাপ দিয়ে পানি বের করার চেষ্টা করে। রাবেয়া মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে। তার গায়ের কাপড় সরে যায়। বুকের কাপড়, আঁচল মাটিতে লুটায়। শাহানা রাবেয়ার গা ঘেঁষে বসে।শাহানাকে জড়িয়ে ধরে রাবেয়া কাঁদে,খালাম্মা গো কি হইয়া গেল এইটা? আমার বুকের ধন মাটিতে শুইয়া আছে ক্যান খালাম্মা? ও মাষ্টার চাচা আপনি কথা কন না ক্যান? মাষ্টার চাচাগো আমার বুকের ধন কে নিল গো?

রাবেয়ার গগন বিদারী আহাজারিতে পরিবেশটা ভারী হয়ে আসে। উপস্থিত শোবার চোখ থেকেই ক’ফোটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ে।

মকবুল বিহবল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মেয়ের দিকে। কথা বলার ভাষা যেন হারিয়ে গেছে দূরে কোথাও।বাকরুদ্ধ মকবুল মাথায় হাত দিয়ে আমলকি গাছটাতে ঠেস দিয়ে বসে হায়দার আলীর বাড়িতে ঢোকার সরু পথটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সরু পথটার দু’ধারে সারি সারি সুউচ্চ ইউক্যালিপটাস গাছ।ফাঁকে ফাঁকে কাঁঠাল গাছ, পেয়ারা গাছ, বড়ই গাছ, বেল গাছ,কদম গাছ, দু’একটা কৃষ্ণচূড়া গাছও আছে।

নতুন বাড়ি করেছে হায়দার আলী। নানা প্রজাতির ফুল গাছ আর ফল গাছে সমৃদ্ধ নয়নাভিরাম বাড়িটি ছেলে বুড়ো সবার কাছেই প্রিয়। দখিনের বিলের প্রান্তর থেকে ছুটে আসা হিমেল হাওয়া,বাঁধানো পুকুর ঘাট, বাচ্চাদের খেলার মতো খোলা আঙিনা আর হায়দার আলীর মতো শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের সঙ্গে কিছুক্ষণ থাকার জন্য কম বেশি প্রায় সবাই আসে এখানে। কে যেন একজন ডাক্তার নিয়ে এলো। ডাক্তার শরীফার মৃত দেহটা ভালোভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। কিন্তু না, কোথাও আঘাতের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। ডাক্তার বললেন, বাচ্চাটা পুকুরে পড়ল কিভাবে? বাচ্চাটা কি সাঁতার জানত না?

হায়দার আলী কথা বলার আগেই শরীফার মা রাবেয়া চিৎকার দিয়ে বিলাপ জুড়ে দিয়ে বলে জানতো গো ডাক্তার সাব আমার মা সাঁতার জানতো। সাঁতরাইয়া এই পার থেইকা হেই পারে চইলা যাইতো। এইটা তো ছোড পুষ্কুনী। এইটার থেইকা কত বড় পুষ্কুনীতে আমার মা সাঁতরাইছে গো ডাক্তার সাব। ও আল্লাগো তুমি আমারে কোন অপরাধের শাস্তি দিলা গো আল্লাহ?

গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান এলেন। সাথে থানার দারোগাও আছে। পুকুর পাড়টা সবাই দেখলেন ভালো করে।

বেশিদিন হয়নি নতুন বাড়িতে উঠেছেন হায়দার আলী। এলাকার হাই স্কুলের শিক্ষক তিনি। সে হিসেবা সবার কাছে ‘মাষ্টার সাব’ নামেই বেশি পরিচিত। গ্রামের লোকজন যখনই কোনো সমস্যায় পড়েছে, ডেকেছে তাকে।তিনিও ছুটে গিয়েছেন। যতটুকু পেরেছেন ভালো পরামর্শই দিয়েছেন। মানুষের উপকার করার চেষ্টাই করেছেন সবসময়। কিন্তু এ মুহূর্তে কি হয়ে গেল এটা?

থানার দারোগা লাশের পোষ্টমর্টেম করার কথা বলতেই চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, বাচ্চা একটা মেয়ে হয়তো খেলতে খেলতেই বেকায়দায় পড়ে গেছে।উঠতে পারে নাই। তার মৃত্যুতে আমরা সবাই শোকাহত। কিন্তু পোষ্টমর্টেম করার বোধহয় খুব একটা দরকার নাই। মাষ্টার সাহেব এলাকার সম্মানিত মানুষ।কি বলেন মেম্বার সাহেব?

জবাবে মেম্বার সাহেব বলেন, হ আমারও সে রকমই মনে হয়। তারপরও মকবুলরে একবার জিগান দরকার। কি কস মকবুল? তোর মাইয়ার মৃত্যুতে মাষ্টার সাবের উপর তোর কোনো অভিযোগ আছে? মামলা করবি?মামলা করলে তোর মাইয়ার লাশ মর্গে পাঠাইতে হইব। ওইখানে কাঁটা-ছেঁড়ার কত ঝামেলা!

মকবুল কিছু বলে না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেম্বার সাহেবের কালশিরা পরা মুখটার দিকে।

চেয়ারম্যান সাহেব মকবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ছেলে-মেয়ে কোথায় যায়, কি করে এগুলো দেখবি না ?খালি একটার পর একটা বাচ্চা-কাচ্চা হলেই তো হবে না। বাচ্চা-কাচ্চা চোখে চোখে রাখতে হয়।

মেম্বার সাহেব হায়দার আলীকে বলল, মাষ্টার সাব ঘটনা টা কেমনে ঘটছে একটু খুইলা কন তো দেখি?

হায়দার আলীর বুকে পাথর চেপে বসে। তিনি বুঝতে পারছেন না তিনি কিভাবে কি বলবেন। তিনি তো শুধু শরীফাকে ভাসতে দেখেছেন ভেলার মতো। কি বলতে কি বলে ফেলেন, কোনটাতে আবার সমস্যা হয় তিনই বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি ঘামছেন অনবরত।

চেয়ারম্যান সাহেব আবার বললেন, পুকুরটাতো বেশি গভীর না , তাই না ?

হায়দার আলী বললেন, জ্বি। দুই বছর হয়েছে পুকুর কেটেছি।

দারোগা সাহেব বললেন, সকাল থেকে কোনো চিৎকারের শব্দ শোনেন নাই?

হায়দার আলী কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, কই না তো।সে রকম চিৎকারের শব্দ কানে আসেনি তো!

ওহ! আই সি। আচ্ছা লাশটা কে তুলেছে পানি থেকে?

জ্বি, আমার বড় ছেলে জিতু।

জিতু। কি করে সে?

ডিগ্রী পাশ করেছে। মাষ্টার্সে ভর্তি হবে। পাশাপাশি একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীতে চাকরি করছে।

আপনার ছেলে-মেয়ে ক’জন?

তিনজন। এক মেয়ে, দুই ছেলে। মেয়ে সবার বড়। হেলেন। বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে জিতু আর ছোট ছেলে শিপু।

শিপু কি করে?

ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে।

ও কোথায়?

জ্বি, আছে নিশ্চয়ই কোথাও। ডাকব?

না থাক। লাশটা প্রথম কে দেখেছে?

আমার নাতনী শামা।

দারোগা সাহেব কি যেন চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলেন।

হায়দার আলীর বাড়িটা লোকে লোকারন্য হয়ে আছে। হায়দার আলীর স্কুলের সহকর্মীরা প্রায় সবাই এসে উপস্থিত।আশেপাশের গ্রামের, বাড়ির, পরিচিত, অপরিচিত নানা মানষের ভিড়। কেউ কেউ শরীফার মৃত দেহটার সাথে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ মেম্বার, চেয়ারম্যান,দারোগা , হায়দার আলী আর মকবুলের কথোপকথন শুনছে। তবে তুলনামূলকভাবে এখানটাতে ভিড় কম। কারণ একটাই। দারোগা কখন কাকে আসামী করে বসে! সবাই এ কথা ভালো করেই জানে যে বাঘে ছূঁলে আঠার ঘা, আর পুলিশ ছূঁলে ছত্রিশ ঘা।

আমলকি গাছটার নিচেও অনেক ভিড়।আবার কেউ কেউ হায়দার আলীর ঘরের ভেতর শামার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

শরীফার মৃত দেহটা তোলার পর থেকেই শামা বমি টমি করে একাকার। কিছুক্ষণ পর পর ফিট হয়ে যাচ্ছে।হেলেন মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত।কি করবে, কি হবে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। পরশুদিন চট্টগ্রাম থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে সে। এখন কি ফ্যাসাদেই না পড়ল! হেলেনের স্বামীকে এখনো খবর দেয়া হয়নি যে তাদের বাড়িতে এত বড় লংকা কান্ড ঘটে যাচ্ছে।

মেম্বার সাহেব তার ছাগলা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, তাইলে তো আর থানা পুলিশ করনের খুব একটা দরকার নাই। কি কন চেয়ারম্যান সাব?

হু, আমারও তো সেরকমই মনে হচ্ছে। এটা আসলে নিছক একটা দুর্ঘটনা।

দারোগা সাহেব বললেন, আপনারা মামলা করতে না চাইলে তো আমার আর কিছু করার নাই। কিন্তু বাচ্চাটা খুব ভালো সাঁতার জানতো, আবার পুকুরটাও খুব বেশি গভীর না। আর তাছাড়া এত সকালে বাচ্চাটা এখানে এলোই বা কেন? কোনো চিৎকার কিংবা কোনো কিছু পড়ার শব্দও নাকি পাননি মাষ্টার সাহেব। একটা বাচ্চা পা পিছলে পড়ে গেলে সে তো অন্তত চিৎকার করবে। সবকিছু কেমন জানি অস্বাভাবিক ঠেকছে আমার কাছে। আচ্ছা বাচ্চাটার একুরেট বয়স কত হবে বলুন তো? প্রশ্নটা মেম্বার সাহেবের দিকে।

মেম্বার সাহেব মকবুলকে জিজ্ঞেস করলেন , তোর মাইয়ার বয়স জানি কত রে মকবুল?

নয় বছর। ক্লাস থ্রিতে পড়তো।

দারোগা সাহেব হায়দার আলীকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা মাষ্টার সাহেব আপনার সাথে কারো কোনো শত্রুতা নেই তো! ধরুন কেউ ষড়যন্ত্র করে বাচ্চাটাকে মেরে ফেলে গেছে আপনাকে বিপদে ফেলতে, এমন কেউ কি আছে?

মাষ্টার সাহেব অনেকটা আঁতকে উঠে বললেন, না, না, অসম্ভব। কারো সাথেই আমার কোনো সমস্যা নেই।

চেয়ারম্যান সাহেবও মাষ্টার সাহেবের কথায় সম্মতি জানিয়ে বললেন, মাষ্টার সাহেব এলাকার সবার বেশ পছন্দের মানুষ। কখনোই কারো সাথে ওনার কোনো ঝামেলার কথা শুনিনি।

তারপরও আমি বলছিলাম পোষ্টমর্টেম করলে নিশ্চিত একটা সিদ্ধান্তে আসা যেত, বললেন, দারোগা সাহেব।

চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, সেটার আসলে দরকার নাই। মাষ্টার সাহেবকে খুব ভালোভাবেই চিনি আমরা। তাছাড়া মকবুলের তো কোনো অভিযোগ নাই। এনিওয়ে , সিদ্ধান্ত আপনাদের। আপনারা যা বলছেন তার উপর তো আমার আর কছু বলার থাকতে পারে না। আমি তাহলে উঠি বলে দারোগা সাহেব যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।

দারোগা সাহেব চলে যাওয়ার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল হায়দার আলী। অকারণ ভয়ে এতক্ষণ সিঁটিয়ে ছিলেন তিনি। কারন কথা বলতে গিয়ে কোথায় যে জট পাকিয়ে ফেলেন!

রাবেয়া এখনো কাঁদছে। তার গলায় এখন আর তেমন জোরালো শব্দ নেই। ফোঁস ফোঁস জাতীয় একটা শব্দ বের হচ্ছে। রাবেয়ার অন্য দুটি ছেলে-মেয়েও তার গা ঘেঁষে বসে আছে। ওদের চোখে মুখেও কান্নার দাগ শুকিয়ে আছে।

চেয়ারম্যান সাহেব মকবুলকে ডেকে বললেন, আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবি? মেয়ের লাশ কবর দিতে হবে না? আর কতক্ষণ এভাবে ফেলে রাখবি? মেয়ের রুহের কষ্ট হচ্ছে। যা কবরের ব্যবস্থা কর। এই টাকা গুলা রাখ বলে মকবুলের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিলেন।

মেম্বার সাহেব একজনকে শরীফার দাফনের জন্য কাফনের কাপড় আনতে পাঠালেন। শরীফার দাফন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই। হঠাৎ করে চিৎকারের শব্দে সম্বিত ফিরে পান হায়দার আলী। তিনি ভেবেছেন শামা হয়তো ভয় পেয়ে আবার বমিটমি করেছে। কিন্তু এসে দেখেন শাহানা রান্নাঘরের সামনের উঠানটাতে কাদামাটিতে পড়ে লেপ্টে আছে। হায়দার আলী শাহানাকে টেনে তুলতে গিয়েও পারলেন না। তিনি নিজেও বৃষ্টিতে ভিজে জুবুথুবু হয়ে আছেন। হেলেনটা যে কোথায় গেল! হেলেন, হেলেন বলে ডাকছেন হায়দার আলী।

ভেতর থেকে হেলেন ছুটে এসে বলল, কি হয়েছে বাবা?

তোর মা বলে তিনি মাটিতে পড়ে থাকা শাহানার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন হেলেনের।

দু’জনে মিলে শাহানাকে ঘরে তুলতে তুলতে হায়দার আলী বললেন, শিপুটা কোথায় রে? সকাল থেকে একবারও দেখিনি। তুই দেখেছিস?

না, বাবা আমিও দেখিনি। বাড়িতে এত বড় একটা বিপদ। অথচ এর মধ্যে কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে?

শাহানার কাপড়-চোপড় বদলিয়ে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল হেলেন। হায়দার আলী শাহানার মাথার পাশে বসে আছে।

শাহানা জড়ানো গলায় বলল, হেলেনের বাবা, শরীফা মরে নাই।

হায়দার আলী চমকে উঠে বললেন , কি?

হু, শরীফা মরে নাই। শরীফা হাঁটে। আমি নিজ চোখে দেখছি।

কি বলছ? কোথায় দেখেছ?

পুকুরে। শরীফা পুকুরে হাঁটে। হেইলা-দুইলা হাঁটে।

শাহানার কথা শুনে হায়দার আলীর চেহারায় চিন্তার ছাপ পড়ে। চিন্তিত মুখে তিনি বসার ঘরে গিয়ে দেখলেন বসার ঘরের বিছানায় শিপু শুয়ে আছে। জিতু এখনো বাইরে। ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি শুরু হয়।

নিশুতি রাত। ঝিঁ ঝিঁর শব্দ চারদিকে।হায়দার আলী কার যেন বিলাপ করা কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলেন আমলকি গাছটাতে কিছুক্ষণ পর পর পাতা নড়ছে। টর্চ লাইটা নিয়ে আমলকি গাছটার দিকে তাক করতেই দেখেন একটা হুতোম প্যাঁচা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা জিনিস দেখে হায়দার আলীর মাথাটা ঘুরে উঠেছে। শরীফা হাঁটছে পুকুরে। পুকুরের পানি যেন নরম কাদার মাঠ। সে হাঁটছে হেলে-দুলে।তার গায়ে কলাপাতা রঙের সেই জামাটা। দু’হাতে কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ। মাথার চুলগুলো লাল ফিতায় ঝুটি বাঁধা। হায়দার আলী যেন স্ট্যাচু হয়ে গেছেন। নড়তে পারছেন না কোনোমতেই। বেশ জোর করেই পা টেনে টেনে ঘরের ভেতর এলেন। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ভাবছেন নিশ্চয়ই তার হেলুসিনেশন হচ্ছে। সকাল থেকেই শরীফাকে নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হলো। হয়তো একারণেই শরীফা মাথায় চেপে আছে। কড়া একটা ঘুম হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

হারিকেনের আবছা আলোয় তিনি দেখলেন শিপু বিছানায় ছটফট করছে। পল্লী বিদ্যুত থাকে না বললেই চলে। আর ঝড় বৃষ্টির সময় তো পল্লী বিদ্যুতের দেখাই পাওয়া যায় না। তিনি শিপুর পাশে গিয়ে দেখছেন শিপু একবার এপাশ ফিরছে, আবার ওপাশ ফিরছে। কিছুক্ষণ পর পর হাত পা গুটিয়ে ফেলছে।মনে হচ্ছে খুব অস্থির সে। তিনি শিপুর বিছানায় গিয়ে বসলেন। ছেলে-মেয়েদের তিনি যথেষ্ট ভালোবাসা আর উদারতা দিয়েই বড় করার চেষ্টা করেছেন। তিনি শিপুর গায়ে হাত রাখতেই শিপু লাফিয়ে উঠে বলল, আমার কোনো দোষ নাই বাবা।বিশ্বাস করো আমি যে কি করতে গিয়ে কি করে ফেলেছি আমি নিজেও জানি না বাবা।

হায়দার আলী শিপুর কথা না বুঝেই বললেন, কিসের দোষ? কি হয়েছে? কি করেছিস তুই? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

আমি ইচ্ছে করে কিছু করিনি বাবা। হঠাৎ করে আমার যে কি হয়ে গেল আমি শরীফাকে…।

শিপুর কথা শুনে হায়দার আলীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কি? কি বলছিস তুই? শরীফাকে কি করেছিস তুই?

শিপু হায়দার আলীর হাতদুটো নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, আমাকে ক্ষমা করে দাও বাবা। আমাকে ক্ষমা করে দাও বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। একপর্যায়ে খাট থেকে নেমে হায়দার পা দুটো জড়িয়ে ধরে।

হায়দার আলী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি পাথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। তার রক্ত এমন দূষিত একথা ভাবতে তার বুকের সব কটা পাঁজর যেন মড়মড় করে ভেঙ্গে যাচ্ছে।

ভেতর বাড়ির সবাই গহীন ঘুমে আচ্ছন্ন। পাশের খাটে জিতুও ঘুম।শুধু হায়দার আলীর দু’চোখের ঘুম যেন হারিয়ে গেছে কোনো দূর অরণ্যে। তিনি বিস্ময় ভরা কন্ঠে বলল, কিন্তু ডাক্তার যে বলল, শরীফার গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন নাই! শিপু অস্ফুট স্বরে কি যেন বলতে চাইল, কিন্তু হায়দার আলী শুনলেন না। শিপু এখনো তার পা দুটি জড়িয়ে আছে। কাঁদছে সে। কি ভেবে যেন হায়দার আলী ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। অপরাধের ছাপ ছেলের চেহারায়। পাশাপাশি অনুতাপও।

সত্য প্রকাশের কথা ভাবতেই সন্তান হারানোর আশংকায় হায়দার আলীর বুকে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। বুকের ভেতরতাতে হু হু করা হাহাকার জেগে ওঠে। কয়েক মুহূর্ত ভেবে আর পারলেন না তিনি। ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, এটা তুই কি করলি বাবা?কি করলি? কেন করলি? একবারও আমার কথা ভাবলি না? আমার মান-সম্মান? আমার রক্ত এত জঘন্য! এত বিষাক্ত! ছি!

পরদিন সকাল বেলা বেশ ক’জন মৌলভী এসে উপস্থিত হায়দার আলীর বাড়িতে। মেম্বার সাহেব পাঠিয়েছেন।সবার ধারনা হায়দার আলীর নতুন বাড়ি। বাগানের ভেতর বাড়ি। জ্বিন, ভুতের আছর থাকতে পারে। তাই আল্লাহর পাক কলাম দিয়ে জ্বিন, ভুতের আছর বন্ধ করতে হবে। হায়দার আলী মৌলিভীদের বসার ব্যবস্থা করে দিলেন। খতম পড়া সুরু হয়েছে। সারা বাড়ি জুড়ে কোরয়ান তেলাওয়াতের মিহি সুর। হায়দার আলীর পুকুরের অলৌকিক রহস্য খূঁজে বের করার চেষ্টায় মগ্ন মৌলভীরা।

জ্বিন, ভুতের কোনো তথ্য হায়দার আলী জানেন না। আদৌ এ বাড়িতে অশরীরী কিছু আছে কিনা নিশ্চিত নন তিনি। তবে শরীরী একটা অপরাধী সন্তান তার আছে এটা তিনি জানেন। আর সে অপরাধী সন্তানকে তিনি বুকের মাঝে আগলে রেখেছেন পিতৃত্বের টানে। পুকুরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে মৌলভীরা বিভিন্ন দোয়া –দরূদ পড়ে ফুঁ দিতে থাকে।



পুকুরটার মূল রহস্য আর জানা হয় না কারো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন