বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

অতিকায় ডানাঅলা অতিশয় বৃদ্ধ এক লোক

মূল: গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস

অনুবাদ: শামসুজ্জামান হীরা

বাদল নামার তৃতীয় দিনে তারা ঘরের মধ্যে এত কাঁকড়া মেরেছিল যে, পেলাইয়োকে তার বর্ষণসিক্ত উঠান পেরিয়ে ওগুলোকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলতে হয়েছিল, কারণ নবজাত শিশুটির সারা রাত জ্বর ছিল, এবং তাদের ধারণা হয়েছিল এর জন্য কাঁকড়ার তীব্র দুর্গন্ধই দায়ী।
মঙ্গলবার থেকে বিষণ্নতায় ছেয়ে ছিল বিশ্বচরাচর। সাগর আর আকাশ একাকার ছিল ছাইরঙে এবং সৈকতের বালুকারাশি, মার্চ মাসের রাতে যা গুড়ো-করা আলোর মত চমকায়, তখন হয়ে পড়েছিল কাদা এবং পচা শক্ত খোলযুক্ত মাছগুলোর আধাসেদ্ধ ব্যঞ্জনের ন্যায়। 

পেলাইয়ো যখন কাঁকড়াগুলো ফেলে ঘর মুখো ফিরছিল, দুপুরবেলাতেই আলো এতটাই কম ছিল যে, উঠানের পেছন দিকটায় কী যেন একটা নড়ছিল এবং গোঙাচ্ছিল যা দেখা তার পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাকে খুব কাছে গিয়ে দেখতে হল। ওটা এক বুড়ো, অতিশয় বৃদ্ধ এক লোক। কাদায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। প্রবল প্রচেষ্টাতেও উঠে দাঁড়াতে পারছে না; বাধা সৃষ্টি করছে তার অতিকায় ডানা দুটো।

দুঃস্বপ্নে আতঙ্কগ্রস্ত পেলাইয়ো তার স্ত্রী এলিসেন্দার কাছে ছুটে গেল। এলিসেন্দা তার অসুস্থ শিশুর কপালে জলপট্টি দিচ্ছিল। পেলাইয়ো তাকে উঠানের পেছনে নিয়ে গেল। তারা উভয়েই হতভম্ব হয়ে সেখানে পড়ে থাকতে দেখল একটা নিঃশব্দ-অসাড় দেহকে। বুড়ো লোকটির পরনে ছিল আবর্জনাস্তূপ থেকে ন্যাকড়া সংগ্রহকারীদের মত পোশাক। তার টেকো মাথায় সামান্য কটা ধূসর চুল, মুখগহ্বরে অল্প কটা মাত্র দাঁত — ভিজে জবজবে প্রপিতামহতুল্য লোকটির এতটাই করুণ দশা যে তার কখনও ঠাটবাট থাকতে পারে সে বোধটুকুও যেন মুছে গিয়েছিল। ঈগলের মত তার বিশাল ডানা, নোংরা এবং আদ্দেক পালক ওঠানো, কাদার মধ্যে যেন চিরতরে জড়িয়ে গিয়েছিল। খুব কাছ থেকে এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার দিকে তাকিয়ে থেকে সহসাই পেলাইয়ো ও এলিসেন্দা তাদের বিস্ময় থেকে বেরিয়ে এল, এবং অবশেষে তাকে পরিচিত মনে হল। তখন তারা সাহস সঞ্চয় করে তার সঙ্গে কথা বলল। সে দুর্বোধ্য ভাষায় একজন নাবিকের চড়া গলায় কথার জবাব দিল। এভাবে তারা ডানা নিয়ে যে দ্বিধায় ছিল তা এড়িয়ে গেল, এবং যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল যে, সে ঝড়ে বিধ্বস্ত কোনও বিদেশি জাহাজের একজন নিঃসঙ্গ নাবিক। তা সত্ত্বেও, তারা তাকে দেখাবার জন্য প্রতিবেশী এক নারীকে ডাকল, যে জীবন-মৃত্য সম্পর্কে সবকিছু জানত, মহিলাটির শুধু প্রয়োজন ছিল একনজর দেখে তাদের ভ্রম শুধরে দেওয়া।

“সে একজন দেবদূত”, মহিলাটি বলল। “সে নিশ্চয়ই শিশুদের জন্য আসছিল, কিন্তু বেচারা এতটাই বুড়ো যে বৃষ্টি তাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে।”

পরদিন সবাই জানল যে, একজন রক্তমাংসের দেবদূতকে পেলাইয়োর বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। দেবদূতরা সেই সময়ে ছিল স্বর্গীয় ষড়যন্ত্রের কারণে জীবিত পলাতক, তার কাছে মনে হলেও, বিজ্ঞ প্রতিবেশী মহিলার এই বিচারের বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবার ইচ্ছা জাগল না তাদের মধ্যে। পেলাইয়ো সারা বিকেল তার সেপাইয়ের লাঠি হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে তার প্রতি নজর রাখল, এবং শুতে যাওয়ার আগে সে তাকে কাদা থেকে টেনে তুলে জালে তৈরি মুরগির খাঁচায় আটকে রাখল। মাঝরাতে যখন বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল, পেলাইয়ো ও এলিসেন্দা তখনও কাঁকড়া মেরে চলেছিল। কিছুসময় পর শিশুটির জ্বর সেরে গেল; কিছু খাওয়ার ইচ্ছায় সে জেগে উঠল। তখন তারা প্রসন্ন বোধ করল এবং দেবদূতকে বিশুদ্ধ জল ও তিন দিনের প্রয়োজনীয় বিবিধ সরঞ্জামসহ ভেলায় তুলে দিয়ে গভীর সমুদ্রে তার নিয়তির ওপর ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিল। প্রত্যুষের প্রথম আলোতে যখন তারা আঙ্গিনার দিকে গেল, গ্রাম ভেঙে-আসা সকল প্রতিবেশীকে মুরগির খাঁচার কাছে দেবদূতের সঙ্গে কৌতুক-মশকরায় মেতে থাকতে দেখল। সামান্যতম সম্মানবোধের বালাই নেই। তারা খাঁচার তারের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে খাওয়ার জন্য বিভিন্ন দ্রব্য তার দিকে ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছিল। যেন সে কোনও অলৌকিক কিছু নয়, সার্কাসের জন্তু মাত্র!

খবরটা জেনে বিস্মিত ফাদার গোনজাগা সকাল সাতটা বাজার আগেই এসে হাজির। ততক্ষণে ভোরবেলায় আসা দর্শনার্থীদের তুলনায় সদ্য আগত দর্শকদের মধ্যে উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়েছিল, তারা বন্দির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনায় মেতে উঠেছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে যে ছিল সরল, সে ভেবেছিল তাকে ‘বিশ্বের মেয়র’আখ্যা দেওয়া উচিত। কঠোর-মনের অন্যেরা ভাবল তাকে পাঁচ-তারকা-বিশিষ্ট জেনারেলে পদোন্নতি দেওয়া উচিত যেন সে সব যুদ্ধে জিততে পারে। কোনও কোনও কল্পনাবিলাসী আশা করল, তাকে উন্নত প্রজাতি সৃষ্টির কাজে লাগানো যেতে পারে, যাতে করে সে মানবজাতিকে পাখনাবিশিষ্ট বিজ্ঞ প্রজাতিতে পরিণত করার বীজ পৃথিবীতে বপন করতে পারে, যারা গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দায়িত্ব নিতে সক্ষম হবে! তবে ফাদার গোনজাগা, ধর্মযাজক হবার আগে যিনি ছিলেন একজন জবরদস্ত কাঠুরে, খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে চটজলদি ধর্মানুশাসন ঘেঁটে দেখলেন, তাদেরকে খাঁচার দরজা খুলতে বললেন, যাতে তিনি বেচারা লোকটিকে খুব কাছ থেকে দেখতে পারেন, যাকে উচ্ছ্বল মুরগিছানাগুলোর মধ্যে বিশাল জরাজীর্ণ এক মুরগির মত দেখাচ্ছিল। সে এক কোনায়, ভোরে-আসা দর্শনার্থীদের তার দিকে ছুড়ে-দেওয়া ফল-ফলারি ও প্রতঃরাশের উদ্বৃত্তের মধ্যে শুয়ে সূর্যালোকে তার ডানা শুকাচ্ছিল। ফাদার গোনজাগা যখন তার খাঁচার ভেতর ঢুকে লাতিন ভাষায় তাকে সুপ্রভাত জানালেন, পৃথিবীর অভদ্র আচরণ সম্পর্কে অপরিচিত সে তখন শুধু তার প্রাচীন চোখজোড়া তুলে তার ভাষায় চাপাস্বরে কিছু একটা বলল। ছোট গির্জার যাজকের প্রথমেই সন্দেহ হল, সে একজন প্রতারক, যখন দেখলেন, সে ঈশ্বরের ভাষা বোঝে না, জানে না কীভাবে প্রভুর প্রতিনিধিকে অভ্যর্থনা জানাতে হয়। তারপর তিনি লক্ষ করলেন, কাছ থেকে দেখে তাকে অনেক বেশি মানুষ বলে বোধ হচ্ছিল: তার গা থেকে ভেসে আসছিল ভিনদেশীয় অসহনীয় গন্ধ, তার ডানার পেছন দিকটায় ছড়ানো ছিল পরজীবী-ছত্রাক, ডানার মূল পালকগুলো জাগতিক কোনও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, একজন গর্বিত দেবদূত হওয়ার মত তার মধ্যে কিছুই ছিল না। তখন খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি কৌতূহলী নিরীহ লোকদেরকে এ-ব্যাপারে সাবধান থাকতে সংক্ষিপ্ত নসিয়ত করলেন। তিনি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, অসাবধান লোকদেরকে বিভ্রান্ত করবার জন্য শয়তানেরও খ্রিস্টীয় উৎসবের সময় চালাকি চালানোর কূটঅভ্যাস আছে। তিনি যুক্তি দিয়ে বোঝালেন, পাখা যদি উড়োজাহাজ আর বাজপাখির ভেতর তফাত নির্ণয়ের কোনও উপাদান হিসাবে বিবেচিত না-হয়, একজন দেবদূত নির্ণয়ে তা আরও বেশি বিবেচিত না-হওয়ার কথা। যাহোক, তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, এ ব্যাপারে তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন পাদ্রির কাছে পত্র লিখবেন যেন তিনি তা বিভাগীয় পর্যায়ের পুরোহিতের কাছে পাঠান এবং তিনি যেন মহামান্য পোপের সমীপে এর ওপর সর্বোচ্চ আদালতের একটা রায় চেয়ে সেই পত্রখানা পাঠান।

তাঁর জ্ঞান অনুর্বর হৃদয়সমূহে নাড়া দিল। বন্দি দেবদূতের খবরটি এত দ্রুত ছড়াল যে, ক’ঘণ্টার মধ্যেই উঠানটি হৈচৈমুখর বাজারে পরিণত হল এবং বিশৃঙ্খল জনতাকে, যারা তাদের ঘরটিকে প্রায় ধসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছিল, ছত্রভঙ্গ করবার জন্য বেয়োনেটসহ সেনা তলব করতে হল। জটলার এত জঞ্জাল ঝাট দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে এলিসেন্দার মেরুদণ্ড প্রায় মুচড়ে গিয়েছিল, তখন তার মাথায় চমৎকার এক বুদ্ধি এল, উঠানটিকে ঘিরে ফেললে এবং দেবদূতকে দেখার জন্য জনপ্রতি পাঁচ টাকা করে প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়!

কৌতূহলীরা দূরদূরান্ত থেকে এসেছিল। উড়ন্ত দড়াবাজসহ (acrobat) চলমান এক আনন্দমিছিল এল। দড়াবাজটি জনসমাগমের মাথার ওপর দিয়ে সশব্দে বারবার উড়ে চক্কর দিচ্ছিল। কিন্তু কেউ তাতে আমল দিলে তো! দেবদূতের ডানার মত তার ডানা থাকলে তো! তারটা ছিল ছোট, খুদে বাদুড়ের ডানার মত! স্বাস্থ্যের খোঁজে এসেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা অক্ষম ব্যক্তিরা: এক বেচারি স্ত্রীলোক এসেছিল যে বাল্যকাল থেকে গুণে আসছিল আর হৃদস্পন্দন, গনার সংখ্যা এখন তার হাতে আর নেই ; এসেছিল একজন পর্তুগিজ, যে রাতে তারকাদের হট্টগোলের জ্বালাতনে ঘুমাতে পারে না; একজন ঘুমেহাঁটা-লোক এসেছিল যে রাতে জেগে ওঠে, জাগ্রত অবস্থায় যাকিছু সে করেছিল ঘুমের ঘোরে তা বাতিল করবার জন্য; তুলনামূলক কম অসুস্থতা নিয়ে এসেছিল আরও অনেকে। দুনিয়া কাঁপানো জাহাজভাঙা বিশৃঙ্খলার মধ্যে পেলাইয়ো এবং এলিসেন্দা পরিশ্রমে খুশিই ছিল, কেননা সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তারা তাদের কক্ষগুলো টাকায় ভরে ফেলেছিল এবং ভেতরে প্রবেশের জন্য অপেক্ষমাণ তীর্থযাত্রীদের লাইন তখনও দিগন্ত ছাড়িয়ে চলে গেছে!

একমাত্র দেবদূতই যে তার নিজের এই নাটকে কোনও অংশ নিচ্ছিল না। সে সময় কাটাচ্ছিল তার ধার-নেওয়া নীড়ে স্বস্তিতে থাকার চেষ্টায়, কুপি-বাতি এবং তারের বেড়া বরাবর স্থাপিত পবিত্র মোমবাতিগুলোর বিদঘুটে গরমে কেমন এক বিহ্বলতা নিয়ে। শুরুতে, দেবদূতদের জন্য নির্ধারিত খাদ্য বলে সেই বিজ্ঞ প্রতিবেশী মহিলার ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী তারা তাকে ন্যাপথালিন খাওয়াতে চেষ্টা করল। কিন্তু ওগুলো সে ফেলে দিতে থাকল, যেমন সে ফেলে দিচ্ছিল পোপের দেওয়া খাদ্য, যা পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আনা হয়েছিল। তারা খুঁজে পাচ্ছিল না কী তার খাদ্য, হয়ত এজন্য যে, সে একজন দেবদূত অথবা এজন্য যে, সে একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ। শেষপর্যন্ত সে খেয়েছিল আর কিছুই নয় — বেগুনের ঘেঁট। ধৈর্যই ছিল, মনে হয়, তার একমাত্র অলৌকিক গুণ। বিশেষ করে প্রথম দিনে, যখন তার ডানায় ছড়িয়ে থাকা ব্যাপক বাসি পরজীবী-ছত্রাকের খোঁজে মুরগিগুলো তাকে ঠোঁকরাচ্ছিল, এবং পঙ্গু-খোড়ারা তার ডানার পালক তুলে নিচ্ছিল নিজেদের শরীরের খুঁতে ছোঁয়াবার জন্য, তাদের মধ্যে যারা ছিল সবচেয়ে দয়ালু তারাও ছুড়ছিল পাথরের ঢিল, চেষ্টা করছিল সে যেন উঠে দাঁড়ায়, যেন তারা তাকে দাঁড়ানো দেখতে পায়। একবারই তারা তাকে জাগাতে পারল, যখন তারা বলদের গায়ে চিহ্ন দেওয়ার তপ্ত শিক দিয়ে তার একপাশে ছ্যাঁকা দিল। সে বহুক্ষণ যাবত অসাড় পড়ে থাকায় তাকে তারা মৃত ভেবেছিল। সে সচকিত হয়ে জেগে উঠল, জলভরা চোখে রাগত স্বরে অপার্থিব ভাষায় গর্জে উঠল, এবং বার দুয়েক ডানা ঝাপটাল, যা সৃষ্টি করল মুরগি-বিষ্ঠা, মিহি ধুলোর ঘুর্ণিবাত্যা, এমন এক ভীতিকর ঝড় যা এই ধরাধামের নয় বলে মনে হল। যদিও কেউ কেউ ভাবল, তার এই প্রতিক্রিয়া ক্রোধ নয় বরং বেদনাসঞ্জাত, সেই থেকে তারা তাকে বিরক্ত করা থেকে সতর্ক থাকল, কারণ অধিকাংশ লোক মনে করল, তার এই নিস্পৃহতা কোনও বীরের নিজেকে সহজ রাখা নয়, বরং প্রলয়ের শান্ত ভাব ধরে থাকা।

পুরো বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ও বিরক্তির কারণে জনতার ছ্যাবলামো থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন ফাদার গোনজাগা। অপেক্ষা করছিলেন বন্দিটির ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় পাওয়ার। কিন্তু রোম থেকে আসা পত্রের ক্ষেত্রে কোনও দ্রুততা দেখা যাচ্ছিল না। তারা সময় ক্ষেপণ করছিল, বন্দির নাভি আছে কিনা, তার ভাষার সঙ্গে ‘আরামিক’ (প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিরিয়া অঞ্চলের চালু ভাষা -- অনু:) ভাষার কোনও মিল আছে কিনা, কতবার একটা সুচের ডগায় নিজেকে সে আঁটাতে পারে (এটা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় ধারণা যে, যেহেতু দেবদূতরা দেহধারী নয়, দেহ ধারণ করলেও অলৌকিক সত্তা, তাই একটি সুচের ডগায় অসংখ্য দেবদূত নিজেদের আঁটাতে পারে -- অনু:), নাকি সে কেবলই পক্ষবিশিষ্ট কোনও এক নরওয়েবাসী। সেই ক্ষুদ্র পত্রগুলো সময় শেষ না-হওয়া পর্যন্ত আসা-যাওয়া করতে পারত যদি না এক দৈবাধীন ঘটনা যাজকের ক্লেশের সমাপ্তি ঘটাত।

ঘটনাটা এরকম ঘটল যে, সেই দিনগুলোতে অনেক ভ্রাম্যমাণ আনন্দমেলার আকর্ষণের মধ্যে, শহরে আবির্ভূত হল এক নারী যে তার পিতামাতার অবাধ্য হওয়াতে একটি মাকড়শায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তাকে দেখার দর্শনি দেবদূতকে দেখার দর্শনির চেয়ে কম ছিল না, কিন্তু তাকে তার এই উদ্ভট দশা সম্পর্কে যেকোনও ধরনের প্রশ্ন করবার সুযোগ ছিল যে-কারও, তাকে আগাপাশতলা নিরীক্ষা করবার সুযোগ ছিল, যাতে তার আতঙ্ককর অবস্থা সম্পর্কে কারও মনে কোনও সন্দেহ না থাকে। সে ছিল ভয়ঙ্কর এক ‘তেরান্তুলা’ (দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলের অতিকায় একধরনের বিষাক্ত রোমশ মাকড়শা যা ছোট পাখি, গিরগিটি বা ব্যাঙ ধরে খেয়ে ফেলতে পারে -- অনু:), আকারে ভেড়ার মত — মাথাটা বিষণ্ন কুমারীর। যা ছিল সবচেয়ে হৃদয়বিদারক, তা তার বিশ্রী আকৃতি নয়, বরং তার দুর্দশার আন্তরিক বিস্তারিত বয়ান। যখন সে বলতে গেলে বালিকা, পিতৃগৃহ থেকে চুপিচুপি পালিয়েছিল এক নাচের আসরে যোগ দেওয়ার জন্য। বিনা অনুমতিতে সারা রাত নেচে যখন সে বনের মধ্য দিয়ে ফিরে আসছিল, একটা ভয়াবহ বজ্রধ্বনি আকাশকে দ্বিখণ্ডিত করেছিল এবং সেই ফাটল গলিয়ে বজ্রের উজ্জ্বল শিখা এসে তাকে মাকড়শায় পরিণত করেছিল। তার একমাত্র পুষ্টিকর খাদ্য ছিল মংসের বড়া, যা তার মুখে ছুড়ে দিত দানশীল আত্মারা। ওরকম দৃশ্য, এত মানবিক সত্যতায় পূর্ণ, এত ভয়াবহ শিক্ষণীয়, সেই উদ্ধত দেবদূত, যে মাঝেমধ্যে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল মানুষগুলোর দিকে তাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। উপরোন্তু, দেবদূতের ওপর আরোপিত কিছু অলৌকিকত্ব নেহাত মানসিক বৈকল্যের সাক্ষ্য দিয়েছিল, যেমন অন্ধ ব্যক্তিটি তার দৃষ্টিশক্তি ফেরত পায়নি, তবে তার নতুন তিনটি দাঁত গজিয়েছিল, অথবা যে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হাঁটতে পারত না, লটারিতে প্রায় জিতে গিয়েছিল সে, আর যে কুষ্ঠরোগী এসেছিল, তার ক্ষত থেকে বার হচ্ছিল সূর্যমুখিগাছের চারা। সেসব সান্ত্বনামূলক অলৌকিকত্ব, যা ছিল হাস্যকর কৌতুকের চেয়েও বেশি, দেবদূতের সুনামকে এরই মধ্যে নষ্ট করে দিয়েছিল। সেই নারীটি, যে মাকড়শায় রূপান্তরিত হয়েছিল, শেষমেশ একেবারে ধ্বংসই করে দিয়েছিল তার যত নামডাক। এটা এরকম যে, ফাদার গোনজাগা তাঁর নিদ্রাহীনতা রোগ থেকে চিরতরে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং পেলাইয়োর উঠান তিনদিন আগে বৃষ্টি শুরুর পূর্বাবস্থায় যেমন ফাঁকা ছিল, কাঁকড়াগুলো শোবার ঘরের মধ্যদিয়ে হেঁটে যেত না, সে অবস্থায় ফিরে গিয়েছিল।

গৃহমালিকদের অনুশোচনার কোনও কারণ ছিল না। জমানো টাকা দিয়ে তারা ঝোলানো বারান্দাঅলা দোতলা বাড়ি বানাল, সৃজন করল বাগান এবং উঁচু জালের ঘেরাওয়ের ব্যবস্থা করল যাতে শীতকালে ভেতরে কাঁকড়া ঢুকতে না পারে, এবং জানালায় লাগাল লোহার শিক যেন আর কোনও দেবদূত ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। পেলাইয়ো শহরের কাছে খোরগোশের এক বিশাল খামার গড়ে তুলল, চিরতরে ইস্তফা দিল কোর্টের সেপাইয়ের চাকরি থেকে, এবং এলিসেন্দা কিনল সেই এলাকায় সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত এবং কাঙ্ক্ষিত মহিলারা রোববারে যেসব পোশাক-আশাক ব্যবহার করত, উঁচু হিলের পায়ের পাতা আবৃতকারী জুতা, প্রচুর ঝলমলে সিল্কের পোশাক, যা আলোর হেরফেরে রং বদলায়। মুরগির খাঁচাটাই একমাত্র বস্তু যা কোনও গুরুত্ব পেল না। তারা যদিও তা জীবাণুনাশক ‘ক্রেওলিন’ দিয়ে ধুয়ে সাফ করত, প্রায়শই লোবান জ্বালাত, সেটা আদৌ দেবদূতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়, বরং বিষ্ঠাস্তূপের অতি দুর্গন্ধ যা তখনও ভূতের মত সর্বত্র ঝুলে থাকছিল এবং নতুন বাড়িটাকে পুরনোটাতে পরিণত করছিল, তা দূর করবার জন্য। ওদের বাচ্চাটা যখন সবে হাঁটতে শুরু করেছিল, তারা খুব সতর্ক থাকত যেন বাচ্চাটা মুরগির খাঁচার খুব কাছে যেতে না পারে। পরে তারা তাদের ভয় থেকে মুক্ত হতে লাগল এবং দুর্গন্ধের সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকল। বাচ্চাটির দ্বিতীয় দাঁত ওঠার আগে সে মুরগির খাঁচার ভেতর খেলা করতে যেতে লাগল। অযত্নে খাঁচাটির তারের বেড়া ছিড়ে গিয়েছিল। দেবদূত অন্যলোকদের চেয়ে বাচ্চাটির সঙ্গে যে কম উদ্ধত ছিল, তা নয়, কিন্তু সে কুকুরের নির্মোহ ধৈর্য নিয়ে বাচ্চাটির যত উদ্ভট অবজ্ঞা সহ্য করে যাচ্ছিল। তারা উভয়েই একই সঙ্গে জলবসন্ত রোগে আক্রান্ত হল। ডাক্তার, যে শিশুটির চিকিৎসা করছিল, দেবদূতের হৃদয়ের ধুকপুকোনি শুনবার ইচ্ছা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখতে পারল না, এবং সে লক্ষ করল হৃৎপিণ্ডে অতি জোর শিসের ধ্বনি, এবং কিডনিতে অতি বিচিত্র সব আওয়াজ, এতে করে তার মনে হল, বুড়োর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সে যাহোক, যা তাকে খুব আশ্চর্য করল তাহল তার ডানার যৌক্তিকতা। সেগুলোকে মানুষের পুরো দেহে এতটাই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল যে, সে বুঝতে পারছিল না, কেন অন্য সব মানুষের শরীরে ওগুলো লাগানো হল না।

যখন শিশুটি স্কুলে যেতে শুরু করল, সেই সময়ের মধ্যে রোদ-বৃষ্টিতে ধসে গিয়েছিল মুরগির খাঁচা। দেবদূতটি একজন পরিত্যক্ত মৃতপ্রায় লোকের মত নিজেকে হেথা-হোথা টেনে-হিঁচড়ে বেড়াতে থাকল। তারা তাকে ঝেঁটিয়ে শয়নকক্ষ থেকে দূর করলেও মুহূর্তের ব্যবধানে তাকে রান্নাঘরে দেখতে পাওয়া যেতে লাগল। তাকে একই সময়ে অনেক জায়গায় দেখা যেতে লাগল, তাতে তাদের মনে হল তার প্রতিলিপি অনবরত তৈরি হয়ে চলেছে, যেন সে নিজেকে পুনরুৎপাদন করে চলেছে সারা ঘরময়, এবং এলিসেন্দা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ক্রোধে চিৎকার করে উঠল: দেবদূতদের এই নারকীয় দঙ্গলের মধ্যে বাস করা অসম্ভব! বুড়োটি থোড়াই কিছু খেতে পারছিল এবং তার প্রাচীন চক্ষুদ্বয় এতই ঘোলা হয়ে পড়েছিল যে, কাঠের দণ্ডের ওপর বারবার তার আছড়ে পড়বার উপক্রম হচ্ছিল। তার শুধুমাত্র যা অবশিষ্ট ছিল তাহল শেষ পালকগুলোর সরু নল। পেলাইয়ো তার ওপর একটা কম্বল ছুড়ে দিল। তার প্রতি দয়া দেখাল ছাউনিতে শোওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে, আর ঠিক তখনই তারা টের পেল যে, রাতে তার গায়ে জ্বর এবং উন্মত্ত অবস্থা, জড়ানো জিহ্বায় সে প্রলাপ বকছিল একজন বৃদ্ধ নরওয়েবাসীর মত। এটা অনেক সময়ের মধ্যে প্রথম, যখন তারা উদ্বিগ্ন হল এই ভেবে যে, সে মারা যাচ্ছে এবং প্রতিবেশী বিজ্ঞ মহিলাটিও হয়ত মৃত দেবদূতকে নিয়ে কী করা যায় তা বলতে সক্ষম হবে না।

কিন্তু সে যে কেবল খারাপ শীতকালটাই উতরে গেল তাই নয়, বরঞ্চ মনে হল প্রথম সূর্যালোকিত দিন থেকেই তার অবস্থার উন্নতি হতে থাকল। উঠানের সবথেকে দূর কোনায় সে নিঃসাড় অবস্থায় পড়ে থাকল বেশ কিছুদিন। সেখানে কেউ তাকে দেখতে যেত না। ডিসেম্বরের শুরু থেকে কিছু খাড়া পালক তার ডানায় গজাতে লাগল। কাকতাড়ুয়ার পালক, যাকে আরেকটি দুর্ভাগা জরার আভাস বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সে নিশ্চয়ই জেনে থাকবে এই পরিবর্তনের কী কারণ, কারণ সে যথেষ্ট সতর্ক ছিল যেন কেউ ওগুলো লক্ষ না করে, যেন কেউ না শোনে সাগর-নাবিক-গীত যা সে গায় আকাশের নক্ষত্রের নিচে। এক সকালে এলিসেন্দা কিছু পেঁয়াজ কাটছিল দুপুরের খাবার রান্না করবার জন্য, তার মনে হল একঝলক বাতাস যেন দূর-সাগর থেকে এসে রান্নাঘরে ঝাপটা দিল। তখন জানালার কাছে গিয়ে দেবদূতকে তার উড়ালের প্রথম প্রচেষ্টাতেই সে দেখতে পেল। এটা এতটাই অগোছালো, কৌশলহীন প্রচেষ্টা ছিল যে, তার নখরগুলো সবজিখেতের স্থানে স্থানে খাঁজ কেটে দিচ্ছিল এবং তার এলোমেলো ডানা ঝাপটানো ছাপরাটিকে ভেঙে ফেলার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, আলোতে পিছলে যাচ্ছিল ডানা, বাতাস আঁকড়ে ধরতে পারছিল না সে জুত মত। যাহোক, অনেক চেষ্টা করে সে উচ্চতা লাভ করতে সক্ষম হল। এলিসেন্দা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, নিজের জন্য এবং তার জন্য, যখন সে দেখল, শেষ বাড়িগুলোও সে পেরিয়ে যাচ্ছে বৃদ্ধ-জরাগ্রস্ত শকুনের ঝুঁকিপূর্ণ ডানা ঝাপটানির দ্বারা নিজেকে কোনওভাবে শূন্যে সামলে রেখে। সে তাকে দেখতেই থাকল, এমন কী যখন সে পেঁয়াজ কাটছিল, সে দেখতেই থাকল ততক্ষণ পর্যন্ত, যখন তাকে দেখা আর সম্ভব হল না। কারণ তখন সে তার জীবনে বিরক্তি উৎপাদনকারী আর কিছু নয় — সমুদ্রের দিগন্তরেখায় একটি কল্পনিক বিন্দু মাত্র। 





লেখক পরিচিতি
শামসুজ্জামান হীরা
মুক্তিযোদ্ধা। গল্পকার। অনুবাদক।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন