সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত'র গল্প : সহোদরা

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত

বারবার ঢিলটা ঠিক পাশের ডালটায় গিয়ে লাগছে। বেশ ক’বার মারল বাবলি। এবারের ঢিলটা অনেকক্ষণ তাক করে ধরে রাখল, উফ ! সূর্যটা এত চোখে লাগছে। ঠিক মাথার ওপর এখন, আর সময় পেল না মাথায় চড়বার, মনেমনে গজগজ করে বাবলি। লেগেছে! একেবারে মোক্ষম জায়গায় লেগেছে ঢিলখানা। টোপা কুল প্রায় আট-দশটা এদিক-ওদিক ঝুপঝাপ পড়তে শুরু করল। ঢিলটা এত জোরে মেরেছে বাবলি যে ওটা সামনের বাগান পার করে বারান্দা ঘেঁষে গিয়ে পড়ল। আর পড়েই ফেটে চৌচির। বারান্দার রোদে বসে স্নানের পর চুল খুলে কোনও বই পড়ছিল রুমকি। ভাঙা ঢিলের দু-এক টুকরো ওর গায়ে এসে লাগল। বই বন্ধ করে রেগেমেগে তেড়ে এল সে। বাবলি’র কাছে গিয়ে এক ধাক্কা মেরে ওকে মাটিতে ফেলে দেয়। বাবলি ঝুঁকে ফ্রকের কোঁচড়ে কুলগুলো কুড়োচ্ছিল। আবার সব পড়ে যায়। হতভম্ব হয়ে বাবলিও চেঁচিয়ে ওঠে।

-- কি হচ্ছে কি দিদি ...। আমি কিন্তু মাকে বলে দেব।

-- কি হচ্ছে না ? কি হচ্ছে ? পাজি মেয়ে এত বড় হয়েছিস ফ্রক তুলে কুল কুড়োচ্ছিস! বারোটা বেজে গেছে চান করিসনি তুই মা’কে বলবি কি ... চল আমি মা’কে বলছি।

ক্ষেপে গিয়ে বাবলি’ও রুমকি’কে মারতে যায় আর সজোরে নিজের গালে একটা চড় খায়। সেও রুমকি’র চুলগুলো খানিক চেপে ধরে, কিন্তু পাঁচ বছরের বড় দিদি’র সাথে গায়ের জোরে পেরে ওঠে না। এবার রুমকি বাবলি’র হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মারে আর বাবলি ‘আঁক’ করে ককিয়ে ওঠে। রুমকি হাত ছেড়ে দিয়ে-

-- ন্যাকামি করছিস কেন হ্যাঁ ? চল মা’র কাছে চল!

এরপরই বাবলি কেঁদে ফেলে।

রিক্সা করে বাবলি যখন মা’র সাথে হসপিটাল থেকে ফিরল, প্রায় তিনটে বাজে। দুপুরে খাওয়া হয়নি পেট চোঁচোঁ করছে খিদেয়। হাতের হাড় সরে গেছিল, সেট করে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়েছে।

-- এত লিকলিকে চেহারা, রুমকি হাত ধরে টান দিয়েছে একটু আর ডিস্লোকেশন হয়ে গেছে। হবে না? ভাত খাবার নামে নেই শুধু পেয়ারা, কুল, চিপস এসব খেয়ে থাকলে।

পাশের বাড়ির সন্ধ্যামাসি বারান্দা থেকে দেখতে পেয়ে জিগ্যেস করায় শ্রাবণী জবাব দেন।

-- মা আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।

দরজা খুলতে আসা রুমকি’র দিকে একবারও না তাকিয়ে বাবলি বলে। শ্রাবণী উত্তর দেন না। সুশোভন লাঞ্চ-ব্রেকে এসে শুনেছেন ছোটমেয়ের হাতের কথা। খাওয়া-দাওয়া সেরে অপেক্ষা করছিলেন। এখনও বেরোননি। রুমকি’র চোখ মুখ দেখে বাবলি’র এমন মনে হল না যে বাবা ওকে বকেছেন বলে।

-- কি হাত ভেঙে বসলে? পরীক্ষাটা ভাগ্যিস হল, নয়ত কি করতে? ডান হাতটাই তো।

বলে বাবা হাতটা যেই মাথায় রেখেছে বাবলি’র, তার গলায় কান্না এসে গেছিল, কিন্তু দিদিকে ঘরে ঢুকতে দেখে সে আবার কান্না গিলে ফেলে। বাবা সন্ধ্যেতে ফিরতে দেরি হবে জানিয়ে স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে যায়। বাবলি একটা কমিক্স নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। বড়দিনের ছুটিতে পরীক্ষার পর সামনের গুহ-কাকুদের লনে রোজ সন্ধ্যেতে ব্যাডমিন্টন খেলা হয়। সব বন্ধ হয়ে গেল।


* * *

বাবলি ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে রুমকি খাটে ওর কাছে এসে বসে। পুরো ডান হাত জুড়ে প্লাস্টার করা, বোনের যে এত জোরে লাগবে সেটা ও বুঝতে পারেনি। ল্যাকপ্যাকে সিং আর কাকে বলে। পর মুহূর্তে রুমকি আয়না’র সামনে চিরুনি দিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের চুল দেখতে লাগল। লম্বা ঘন চুল রুমকি’র। বাবলির চুল এখনও ছোট। সে মভ-রঙা নেইলপলিশ’টা নিয়ে বসল, তারপরই ঘড়ির দিকে চোখ পড়ায় ধড়মড় করে উঠে প্রায় দৌড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সওয়া চারটে বেজে গেছে, এক্ষুণি হরি বলে তামিল ছেলেটি কলেজ থেকে ফিরবে। বিআইটি কলেজে পড়ে। কি তাকাতে তাকাতে যায় ! মাঝেমাঝে তো রুমকি’র দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি ও হাসে। ভয়ে রুমকি’র বুক ঢিপঢিপ করে। কেউ দেখে ফেললে রক্ষে নেই। একদিন তো সামনের বাড়ির গুহকাকু তক্ষুণি ওনাদের বাড়ির গেট খুলে বেরিয়েছেন। রুমকি জানে না গুহকাকু কিছু বুঝেছেন কিনা। অবশ্য এতে রুমকি’র কোনো দোষ নেই। তাও কেন যে এত ভয় । ওই যে যাচ্ছে। কিরকম পাজি দেখেছ! বাইক’টা রুমকি’দের বাড়ির ঠিক সামনে এসে কেমন আস্তে করে দেয়। ইশ, সামনে যদি কোনো গাড়ি এসে যায় এই মুহূর্তে, ও তো ঘাড় ঘুরিয়ে আছে রুমকি’দের বারান্দায়। চোখাচোখি হতেই আজও মুচকি হাসল পাজিটা। এরপর থেকেই রুমকি জানে যে সে পড়ায় ঠিক মত মন বসাতে পারবে না। চোখের সামনে বই ধরলেই হরি’র মুখটা ভেসে আসবে। পুরো নাম হরিহরণ নাইয়ার। রোড়াবাঁধের দিকে থাকে, এফ-টাইপে। রুমকি’দের বাড়ির দিকে ওর আসার দরকারই নেই, বিআইটি কলেজ তো রোড়াবাঁধের দিক দিয়ে গেলেই সুবিধে। ফেরাও তাই। ছুটির দিনে এমনিই বাড়ির সামনে দিয়ে চক্কর দিয়ে যায়, হেঁটে। হরি আবার পড়াশুনোয় খুব ভালো, এটাই ফাইনাল ইয়ার। রুমকি’র ক্লাসমেট পল্লবী’র দাদাকে তো হরি’ই গাইড করেছিল বিআইটি এন্ট্রান্সের আগে। পল্লবী’র দাদাও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে বিআইটিতে, ফার্স্ট ইয়ারে। রুমকি’র এবার ক্লাস ইলেভেন, ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল । ওর খুব ইচ্ছে বিআইটি’তে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। ওকে যদি হরি টিউশন পড়াত। আরক্ত মুখে রুমকি ভাবল, তাহলে নির্ঘাত সে ফেল করত!

দু’দিন হল বাবলি’র জ্বর। বাবলি’র ধারণা হাত মচকানোর জন্যই তার জ্বর এসেছে। কিন্তু মা সমানে বলে চলেছে অন্য কথা-

-- সারাক্ষণ ঐ কাঁচা কাঁচা কুল খা আরো। দিদিকে দেখে শিখতে পারিস না কিছু ? দিদিকে কোনোদিন সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেতে দেখেছিস ?

খুব ছোটোতে বাবলি’র ধারণা ছিল যে রুমকি মায়ের সুয়োমেয়ে আর সে দুয়োমেয়ে। রুমকি দেখতে ভালো, লম্বা চুল, ক্লাসে ফার্স্ট হয়, ভালো গান গায়। কত গুণ দিদির। তবে বাবলি জানে দিদি খুব হিংসুটে। মায়ের ফেভারিট হচ্ছে দিদি। তবে বাবার যে কে ফেভারিট সেটা ঠিক বাবলি বুঝে উঠতে পারেনি এখনও। মা প্রায়ই রুটি বেলতে বেলতে বা রান্নাঘরের কোনও কাজ করতে করতে মুখে মুখে অঙ্ক জিগ্যেস করে। ক্লাস টেস্টের নম্বর দিয়েছে, বাবলি নম্বরটা যেই বলবে তক্ষুণি মা ঠিক জিগ্যেস করবে ‘বল তো কত পার্সেন্ট পেলি?’, এই প্রশ্নটাকেই বাবলি সবচাইতে ভয় পায়। ১০০-টা ওপরে বসাব না নিচে বসাব কিছুতেই আর মনে পড়ে না বাবলি’র। আন্দাজে যা খুশি একটা বলে আর ওমনি শুরু হয় মা’র বকাবকি আর দিদির সঙ্গে তুলনা। অনেকেই যে দিদিকে বেশ অন্যভাবে দেখে সেটাও বাবলি লক্ষ্য করেছে। বিশেষ করে পাড়ার দু-একজন দাদা। যদিও দিদি তাদের পাত্তা দেয় না। জ্বর হলেই বাবলি ছোটদের মহাভারত নিয়ে পড়ে। এটা তার খুব প্রিয় বই। সব শব্দের মানে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না যদিও। ‘ঔরস’ মানেটা আজই বাবাকে জিগ্যেস করতে হবে।

****

রেজাল্ট বেরোল আজ। স্কুলের অঙ্কে যে হাইয়েস্ট পেয়েছে তার কাছ থেকে বাবলি কত পার্সেন্ট পেয়েছে সেটা বের করিয়ে নিয়েছে। আজ নিশ্চয়ই বিরিয়ানি আর কষা মাংস নিয়ে আসবে বাবা। দিদি তো ফার্স্ট হবেই জানা কথা। দিদি ফিরে এসেছে আগেই, মা’র ঘরেই দুজনে। রুমকি পেয়েছে ৯১% আর বাবলি ৭৩%। মা অবশ্য বকল না আজ বাবলি’কে।

-- মা তুমি বাবলি কে বোকো না যেন। ও অনেক পেয়েছে। ৭০% এর মুখ আগে কখনও দেখেছে ও?

বলেই রুমকি বারান্দার দিকে পা বাড়াল। বাবলি শুনল যে আজ বাবা খাবার আনবে না, সবাই মিলে ‘দাওয়াত’ নামে যে নতুন রেস্তোরাঁ হয়েছে সেখানে যাওয়া হবে। ক’দিন হল বাবলির হাতের প্লাস্টার কাটা হয়েছে। সে ঠিক করে নিল নীল আর সাদা নতুন সোয়েটার’টা, বেলামাসি বানিয়ে দিয়েছেন, সেটা পরবে প্যারালালের সাথে। এদিকে শীতে সন্ধ্যের পর বেরোলে পা খোলা রাখা যায় না, তাই ভালো ফ্রক এখন সব বাক্সবন্দী। বাবলি বারান্দায় যায় দিদিকে জিগ্যেস করতে সে কি পরবে, আর গিয়েই দেখে রাস্তা দিয়ে বাইক চালিয়ে একটা ছেলে যেতে যেতে দিদির দিকে তাকিয়ে হাসল। দিদির মুখটাও যেন একটু হাসি হাসি। বাবলি অবশ্য এখন বেড়াতে যাওয়া নিয়ে উত্তেজিত থাকায় ব্যাপারটা নিয়ে তেমন গা করে না। কি মনে হতে বাবলি ঘরে ঢুকে নিজের ড্রেসটা আলমারি থেকে বার করে বিছানার ওপর রাখে। রুমকি ঘরে ঢুকে যেই দেখল যে বাবলি’র জামা বিছানায় রাখা, ওমনি চেঁচিয়ে বলল-

-- এমা, তুই প্যারালাল বার করেছিস কেন? আমি প্যারালাল পরব। ও মা দেখো না, আমি তখন থেকে ঠিক করে রেখেছি যে আমি প্যারালাল আর স্কিভি পরব।

-- দুজনেই পরো। বাবলি পরলে তোমার না পরার কি আছে?

-- না না, ছিঃ, ওই এক ধরণের ড্রেস দুজনে পরে আমি কিছুতেই যাব না। বাবলি তুই অন্য কিছু পর।

-- না মা আমি আগে বার করে রেখেছি, দিদিকে বলো অন্য কিছু পরতে।

-- আচ্ছা, থাক থাক । বাবলি যাও তুমি ওই সোয়েটারের সাথেই তোমার পকেট দেওয়া ব্ল্যাক প্যান্টটা পরে নাও।

বাবলি জানে জেদ করা বৃথা। দিদি কিছুতেই শুনবে না। একই জামা তো দু’বোনের কখনও কেনা বা বানানো হয়ই না। এক ধরণের জামা দু’বোনে পরে বেরোবে সেটা রুমকি কখনোই হতে দেয় না। বাবলি’র অবশ্য এসব নিয়ে মাথাব্যাথা নেই। আয়নার সামনে সে দু’মিনিট দাঁড়ায় কিনা সন্দেহ। রুমকি যেতে আসতে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুল এদিকে ফেলে একবার দেখবে, ওদিকে ফেলে একবার দেখবে। বাবলি’র চুল ছোট। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বাবলি রেডি। আর তক্ষুণি রুমকি নিজের ড্রেস নিয়ে ঢুকল এই ঘরে।

-- বাহ এই তো খুব স্মার্ট লাগছে।

-- এই দিদি হারামজাদা মানে কি রে ?

-- কি ? চুপ কর। পাজি কোথাকার!

-- বল না!

-- বাবলি যা ও ঘরে আমি রেডি হবো। ওটা একটা গালি। ওসব আমরা উচ্চারণও করি না।

-- তুই মানেটা বল না।

-- যার মা বাবার ঠিক নেই। কে বলেছে ওটা?

-- সেটা তো হারামি!

-- উফ, হিন্দিতে আমরা শুনি ওটা আর জাদাটা হচ্ছে ছেলে। যার বাবা কে, তা কেউ জানে না।

-- ওহ, তার মানে বাবা ছাড়া অন্য কারো ঔরসে হয়েছে।

-- কি সব বলছিস? যা বেরো এখান থেকে। পড়াশুনোয় নেই আর গালাগালির কালেকশন করছে। মা কে ডাকব এবার কিন্তু।

বাবলি বুঝল কোথাও একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে, সুড়সুড় করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। ইস্কুলেও ওর বন্ধুরা কি সব বলাবলি করে বাবলি বুঝতে পারে না। প্রায় সব বন্ধুরাই ওর থেকে বড়। ওরা চাপা কিছু আলোচনা করে বাবলি গেলেই হয় চুপ করে যায় নয়ত বলে --

-- এই তুই এখনও ছোট, বুঝবি না।

মা’র ঘরে এসে দেখে বিছানায় একটা খুব সুন্দর মেরুণ রঙা সিল্কের শাড়ি আর ম্যাচ করা ব্লাউজ রাখা। মা চুল বাঁধছে। মা’রও খুব লম্বা বিনুনি হয়। মা খোঁপা করে না, খোঁপা করলেই চুলের ভারে তা খুলে আসে। মা যে কেন সাজে না ! শুধু হালকা রঙের সুতির শাড়ি পরে। আজ নিশ্চয়ই দিদি এই সুন্দর শাড়িটা বার করে দিয়ে গেছে মা’র জন্য। মা টিপও পরে না।

-- মা তুমি আজ শাড়ির সাথে ম্যাচ করে টিপ পরবে, দিদির কাছে মেরুণ রঙের টিপ আছে আমি দেখেছি।

-- কোথায় যাচ্ছি যে এত সাজব? যা তো বারান্দায় গিয়ে দেখ তোদের বাবা আসছে কি না।

বাবলি মোটেও মা’র কথা শুনে বারান্দায় দেখতে যায় না। আরে বাবা যখন আসবে, তখন তো বসার ঘর দিয়েই ঢুকে আসবে। বাবলি’দের ইন্ডাসট্রিয়াল শহরটিতে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ছাড়া প্রায় কেউই বাইরের দরজা বন্ধ করে না। কলিং বেলের আওয়াজ শোনা যায় কদাচিৎ। দিদি আর মা দুজনকেই সুন্দর দেখতে লাগছে। মা টিপ পরেছে। দিদি নিজের লম্বা চুলে হর্সটেল করে রেখেছে, বিনুনি বাঁধেনি, তাই মা গজগজ করছে। অবশ্য দিদি যা চাইবে তাই করবে। মা’ই এক দু’বার বলে চুপ করে যায়।

-- কি রে তোদের বাবা এখনও আসছে না, এসে চা খেয়ে বেরোবে বলল তো। ফোন করবি রুমকি একবার? না থাক গে, ফোন করলে আবার রেগে যায়।

বাবলি, রুমকি, আর মা তিনজনেই এবার বারান্দায় এসেই দাঁড়িয়েছে। এভাবে সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়া কমই হয়। তাই কারোরই আর বিলম্ব ভালো লাগছে না। একটা স্কুটারের আলো মোড়ের কাছটায় দেখা যাচ্ছে।

-- ওই মনে হয় আসছে তাই না রে রুমকি ?

বাবলি সঙ্গেসঙ্গে উত্তর দেয়।

-- এটা বাবার স্কুটারের আলো নয়।

স্কুটার’টা এ’বাড়ির গেটের সামনেই এসে দাঁড়াল। বাবলি মুখ চেপে তক্ষুণি বলে ওঠে--

-- এই দিদি,প্রবীরকাকু আসার আর সময় পেল না, দেখ!

-- দেখো মা, বাবলিটা কি অসভ্য। প্রবীরকাকু এসো। বাবা কোথায় গো ? জানো ?

-- রুমকি ভেতরে আয়, বৌদি শুনুন।

বাবলি দেখল প্রবীরকাকুর মুখটা জানি কেমন হয়ে আছে। প্রবীরকাকু দিদিকে প্রায় জড়িয়ে ধরে আর মা’কেও নিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বোকার মত মুখ করে বাবলি ভেতরের ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল।

****

রুমকি আর মা খাটে বসে, প্রবীরকাকু দাঁড়িয়ে মা’র ড্রেসিংটেবিলের সামনে। প্রবীরকাকু অনেক কথা বলছেন, শুনতে শুনতে মা ধপ করে খাটে শুয়ে পড়ল। পড়পড় করে মেরুন রঙা সিল্কের শাড়িটার আঁচলটা নিয়ে ছিঁড়তে শুরু করেছে মা। স্থানুর মত বসে আছে রুমকি। বাবা নাকি মাথাটা টেবিলে রেখে আর ওঠেনি। সবাই ভেবেছে বেরোবেন বলে হয়ত মাথা নিচু করে জুতো-মোজা ঠিক করছেন। না বাবা আর ওঠেনি। কোম্পানি’র ডাক্তার সঙ্গেসঙ্গেই ছুটে আসেন। স্ট্রোকের সঙ্গেই মারা গেছে বাবা। এরপর একটার পর একটা দৃশ্য রুমকির চোখের সামনে ঘটে যেতে লাগল। কত কত লোক বাড়ি ভর্তি হয়ে আছে। মা’কে দেখতে ডাক্তার আর তারপর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বাবা এলো। সন্ধ্যামাসি মা’কে ধরে নিয়ে গেলেন বাবার কাছে। বাবাকে নিয়ে বেরোনোর সময় হঠাৎ কোথা থেকে বাবলি এসে রুমকি’র হাতটা চেপে ধরেছে। এতক্ষণ বাবলি’কে দেখতে পায়নি তো, কোথায় ছিল ও?

-- আমিও যাব।

প্রবীরকাকু বাবলি’র হাত ধরে আবার ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। বাবলি কেঁদে কেঁদে বলছে যে সেও রুমকি’দের সাথে যাবে।

******

প্রবীরকাকু প্রায় রোজই আসেন। কখনো সকাল-সন্ধ্যে দু’বার করে। অনেকেই আসেন। এসে অনেকক্ষণ বসে থাকেন কেউ কেউ। নানা কথা বলেন। মা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তাদের কথা শোনে। রুমকি’র মাঝেমাঝে হাঁফ ধরে, এত চারিধারে লোকেদের কথা শুনতে একটুও ভালোলাগে না। ইচ্ছে করে মা, বোন আর সে আগের মত বসে গল্প করুক। বোনের নানা ছেলেমানুষিতে রাগ করে মা বকে উঠুক। ইস্কুলের দারোয়ানের মুখে শোনা খৈনি খাবার নানা গুণের বর্ণনা দেওয়া যে গানটা বাবলি রোজ গাইত, নিজের দু’হাতে খৈনি ডলার বিশেষ ভঙ্গিমা করে, সেটা কি ভুলে গেছে বোন? পঁয়তাল্লিশ, সতের আর এগার বছরের তিনটে বোবা মানুষ কিছুতেই একে অন্যের সামনে থাকতে চায় না যেন। কাছাকাছি হলেও চোখাচোখি পারতপক্ষে এড়িয়ে চলে তিনজনই। আজ সন্ধ্যেতেও প্রবীরকাকু এসেছেন বাবার অফিস থেকে কিসব কাগজপত্র নিয়ে। প্রবীরকাকু বাবার ডিপার্টমেন্টেই কাজ করেন। বাবার থেকে অনেক ছোট, ব্যাচেলর। মা কত সময় ঠাট্টা করে ঘটকালির কথা বলেছে। কিন্তু প্রবীরকাকু বয়স হয়ে গেছে বলে এড়িয়ে গেছেন। রুমকি ভাবে নিজের পরিবার নেই বলেই হয়ত নিঃস্বার্থ ভাবে ওদের এত সাহায্য করছেন।

-- বৌদি শুনুন মন দিয়ে, রুমকি তুইও এখানে বোস। আমাদের কোম্পানির তো কমপ্যাশনেট গ্রাউন্ডে চাকরি দেবার নিয়ম আছে। তাছাড়া দাদা অন ডিউটি মারা গেছেন। সেসব কোনো সমস্যাই নয়, কিন্তু বুঝলি রুমকি, তোর মা যে গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করেনি না, বুঝলি তো, তাই চাকরিটা তেমন সুবিধের তো হবে না রে।

রুমকি আর শ্রাবণী দু’জনেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রবীরের দিকে।

-- আমি বলছি কি, এখন থাক। বৌদি আপনাকে চাকরি নিতে হবে না। অফারটা হোল্ড করা থাক। রুমকির তো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ইচ্ছে। পাশ করার সাথে সাথে না হয় জয়েন করবে এখানে। জানি ছ-ছটা বছর, কিন্তু আপনাদের খানিক হিসেব করে চললে অসুবিধে হবে না বৌদি। দাদা গোছানো ছিলেন, কোম্পানি থেকেও ম্যাক্সিমাম অ্যামাউন্ট আমরা ডিম্যান্ড করেছি। আশা করছি কনসিডার করবে। আর কোয়ার্টারও ছাড়তে হবে না। আপনাদের ব্যাপারটা খুব সিমপ্যাথি নিয়েই দেখছে ম্যানেজমেন্ট। দাদা সকলের প্রিয় ছিলেন তো।

রুমকি মা’র দিকে তাকিয়ে দেখল, প্রবীরকাকুর শেষ কথাটা মা যেন কেমন প্রবীরকাকুর মুখ থেকে শুষে নেবার মত করে নিয়ে শুনছে। টাকা-পয়সার হিসেব রাখতে মাকে কোনোদিন দেখেনি রুমকি। মা ঘরসংসার করতেই ভালোবাসে। আই-এ পাশ। বি-এ কমপ্লিট করেনি। কিন্তু অঙ্কে ভালো। নিচু ক্লাশে মা-ই পড়া দেখিয়ে দিত । তবে আলজেবরা’র অঙ্ক মা সুবিধে করতে পারে না। এরিথমেটিকে খুব ভাল মা, মুখে মুখে উত্তর দিয়ে দেয়। অফিসের নিয়মে কোন ভালো চাকরি মার হবে না, ডিগ্রী না থাকার জন্য। রুমকি’র হঠাৎই মনে হল তার কাঁধে কি অনেক ভার এসে পড়ল? পড়াশুনো করতে তার ভালো লাগে, কিন্তু সাথেসাথে তার শখ-আহ্লাদও অনেক। সাজগোজ, গানবাজনা, সিনেমা দেখা, সবেতেই তার উৎসাহ। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তার এম-টেক করার ইচ্ছে, তারপর একটা বেশ বড় চাকরি করার ইচ্ছে। তা নয়, এই শহরেরই কারখানায় তাকে চাকরি নিতে হবে? কেমন যেন এক শিরশিরিনি ভয় করে উঠল রুমকি’র।

পরের দিন সকালে ইস্কুলের সময় হয়ে যেতেও রুমকি দেখল বাবলি তৈরি হচ্ছে না। জিগ্যেস করায় বলল যে শরীর খারাপ লাগছে, ইস্কুল যাবে না। রুমকি লক্ষ্য করল বাবলি’র মুখটা বেশ ফ্যাকাসে।

-- শরীর খারাপ লাগছে তো শুয়ে থাক, ঘুরঘুর করছিস কিসের জন্য?

বাবলি উত্তর না দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ইস্কুল থেকে ফিরে বিকেলে রুমকি-বাবলি দু’জনেই ভাত খায়। আজ রুমকি একা খাচ্ছে। রুমকি দেখল বাবলি বিকেলে বেরোয়নি। অবশ্য বাবা মারা যাবার পর বাবলি খুব একটা খেলতে যায় না। গল্পের বই পড়ে, কোনো কোনো দিন ওর বন্ধু ডেইসি কিংবা বুবলা এলে গেটের সামনের সিমেন্টের বেদিটায় বসে গল্প করে। রুমকি দেখে বাবলি এসে ডাইনিং টেবলের একটা চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে রইল। মুখটা জানি কেমন। মুখ ধুয়ে ঘরে রুমকি খবরের কাগজ নিয়ে বসার ঘরে এল, আড়চোখে দেখে বাবলিও এসে দাঁড়িয়েছে ।

-- এই কি হয়েছে রে তোর? সকাল থেকে দেখছি পেছু পেছু ঘুরঘুর করছিস।

-- দিদি তোর কাছে তুলো, ব্যান্ডেজ আছে? অনেকটা --

-- কি ? তুলো ব্যান্ডেজ ?কেন ?

জিগ্যেস করেই রুমকি বুঝতে পারল কি হয়েছে।

-- কবে থেকে ? মাকে বলিসনি?

বাবলি উত্তর দিল না। সত্যি তো মাকেই বা কি বলবে বাবলি। যা হোক করে রান্না করে, আর সারাদিন শুয়ে থাকে মা। ইশ, বোনটা সারাদিন এভাবে আছে ? বসছে না, পাছে দাগ লেগে যায় কোথাও। একটা স্টেফ্রি’র প্যাকেট আলমারি থেকে বার করে রুমকি বোনকে দেয়।

-- শোন, ইন্সট্রাকশন প্যাকেটে দেওয়া আছে। এরপর থেকে নিজের ব্যবস্থা নিজে বুঝে নিবি।

কথাটার কি মানে বাবলি বুঝল না। সে কি চাকরি করে যে নিজের ব্যাবস্থা বুঝে নেবে। হয়ত দিদি মা’কে বলে কেনানোর কথা বলছে। যাক গে, পরে এটা ভাবা যাবে, বাবলি প্যাকেট’টা নিয়ে বাথরুমের দিকে এগোল।

*****

দিদির রেজাল্ট বেরোনোর পর থেকেই দিদির আর মা’র রোজই গণ্ডগোল বাঁধছে। বাবলি’ও এখন অনেক কিছু বোঝে । বাবা মারা যাবার পর থেকে তাদের পরিবারে কেউ উপার্জন করে না, বাবার জমানো টাকা আর কোম্পানি’র থেকে পাওয়া টাকার ইন্টারেস্টে তাদের সংসার চলছে। সেই একই কোয়ার্টারে থাকা, একই ইস্কুলে যাওয়া। কিন্তু বাবলি টের পায় কোথাও একটা সূক্ষ্ণ তফাৎ হয়েছে। হৈ হৈ করে সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া, হঠাৎ হঠাৎ অনেক গল্পের বই কেনা, বাবা চলে যাবার পর এসব পুরোপুরি বন্ধ। প্রবীরকাকু অবশ্য মাঝেমাঝে রুমকি আর বাবলি’র জন্য অনেকরকম খাবার-দাবার কিনে আনেন। প্রবীরকাকুর ব্যাপারটা বাবলি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। প্রায় রোজ এখানে আসেন। দিদিকে পড়ান। তবে বাবলি দেখেছে যে ওরা খুব গল্প করে, আর প্রায়ই প্রবীরকাকু দিদিকে জড়িয়ে ধরেন। দিদি ভাল রেজাল্ট করতে পারেনি। আইএসসি আর বিআইটি এনট্র্যান্স দুটোই খারাপ হয়েছে। বিআইটি’তে দিদি স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে পারবে না, পড়তে গেলে অনেক খরচ। তাই মা বলছে বিএসসি পড়তে কাছাকাছি যে কলেজটা আছে তাতে। দিদি কিছুতেই বিএসসি পড়বে না। বিএসসি পাশ করেও দিদি বাবা’র অফিসে চাকরি পেতে পারবে । বাবলি’র বন্ধু বুবলা’র মা বলেন --

-- রুমকি তো ওর বাবার চাকরিটা পাবে।

বাবলি ভাবে বাবার চাকরিটা কি করে পাবে দিদি? বাবা তো অনেক উঁচু পোস্টে চাকরি করত। দিদিকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতে হলে মাকে অনেক টাকার ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে ফেলতে হবে। সেটা মা’র ইচ্ছে নয়। সেজন্য রাগ করে দু’দিন ধরে দিদি ঠিক মত খাওয়াদাওয়া করছে না। এমন কি প্রবীরকাকুও মা’কে বারবার বলছেন যে দিদিকে ইঞ্জিনিয়ারিংই যেন পড়তে দেওয়া হয়। বাবলি একদিন মা’কে গজগজ করে বলতে শুনেছে--

-- আমার কি একটা মেয়ে ? যে আমি সব পয়সা শুধু বড় মেয়ের পেছুনেই খরচ করব ? রুমকিকে তো ছোট থেকেই দেখছি শুধু নিজেরটা হলেই হল। এত বড় দিদি হলে কি হবে, বোনের প্রতি একটুও টান নেই।

প্রবীরকাকুই শেষ পর্যন্ত মা’কে বুঝিয়ে রাজি করান। দিদি বিআইটি কলেজে ভর্তি হয়ে যায়। তবে এখনও ক্লাস শুরু হয়নি। প্রবীরকাকু সন্ধ্যে্তে দিদিকে পড়ান। বসবার ঘরে ওরা বসে। বাবলি তাই মা’র ঘরে বাবার একটা ছোট টেবিল আছে সেখানে পড়াশুনো করে। দু-একদিন কি কাজে বাবলি হঠাৎ বসবার ঘরে গিয়ে দেখেছে দিদি আর প্রবীরকাকু দেয়ালের দিকের সোফায় বসে সেদিনের খবরের কাগজটা দু’জনে দু’দিক থেকে ধরে পড়ছে। বাবলি’কে দেখে দিদি যেন কেমন অস্বস্তি বোধ করে। বাবলি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বাবলি’র এবার ক্লাস নাইন। লম্বায় দিদিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আর রুমকি’র চেয়ে ভরা চেহারা বাবলি’র। তবে চুল লম্বা করেনি বাবলি। ক্লাস এইট অব্দি বাবলি মা’র কাছে বায়না করত নাচ শেখার জন্য। রবীন্দ্রজয়ন্তী, ইস্কুলের ফাংশানে প্রতিবার নাচলেও আলাদা করে কোনো নাচের স্কুলে বাবলি শেখেনি। কাছাকাছির মধ্যে বর্ধন-আন্টি নাচ শেখান, কিন্তু ওনার মেয়ে বুই’দি দিদির ক্লাসমেট। পড়াশুনোয় দিদির সাথে খুব রেষারেষি, তাই দিদি চায়নি বাবলি ওর মা’র কাছে নাচ শিখুক। বাবলি ভাবে দিদি যখন চাকরি করবে, তখন আর কি কি করবে। বাবলি আজকাল মন দিয়ে শুধু পড়াশুনো করে। ভাল রেজাল্ট বাবলি’কে করতেই হবে। এবার বুই’দি ওদের স্কুলের মধ্যে হাইয়েস্ট নাম্বার পেয়েছে আইএসসি’তে। ৯৪%। এখনও পর্যন্ত কেউ এই স্কুলে এত ভাল রেজাল্ট করে নি। বাবলি’র আদর্শ হচ্ছে বুই’দি। দিদি আসলে বুইদি’কে প্রচন্ড হিংসে করে।

-- কি বাবলি, পড়াশুনো কেমন হচ্ছে? বুঝলেন বৌদি, আপনার দুই মেয়ের মধ্যে কোনো মিল নেই। না দেখতে না স্বভাবে। বাবলি তো দিনদিন পালটে যাচ্ছে।

-- তোমার পড়ানো হল রুমকিকে?

প্রবীরকাকু কখন ঘরে এসে দাঁড়িয়েছেন বাবলি খেয়ালই করেনি। প্রবীরকাকু বেরিয়ে গেল, গেটের শব্দে বুঝল বাবলি। তারপরই স্কুটার স্টার্ট দেবার আওয়াজ। বাবলি’কে পাশের বাড়ির সন্ধ্যামাসি একদিন রাস্তায় একা পেয়ে জিজ্ঞেস করেছেন--

-- হ্যাঁ রে বাবলি, প্রবীর কি তোদের বাড়ি রোজ আসে? রুমকিকে পড়ায় বুঝি?

বাবলি সন্ধ্যামাসি’র প্রশ্নের সুরটা ধরতে পারে। কিন্তু কাউকে বাড়ি ফিরে কিছুই বলে না। দিদি এঘরে ঢুকতেই বাবলি বুঝল মা কিছু দিদিকে বলবে। বাবলি টেবিল থেকে নিজের বইখাতা তুলে বসার ঘরে এসে বসল।

*****

বাবা মারা যাবার পর থেকে বোন মা’র সাথে শোয়। রুমকি অন্য ঘরে একা। এই ব্যবস্থা রুমকি’র খুব পছন্দ। সে দু’টো ঘরের মাঝের দরজাও বন্ধ করে শোয়। এই রাতের সময়টা তার নিজের, একেবারে প্রাইভেট। সে আর থাকবে তার ডায়ারি। কেউ নাক গলাতে আসবে না। অবশ্য রুমকি’র ব্যাপারে কেউ নাক গলাতে আসেও না। বোন যখন ছোট ছিল তখন এটা-সেটা ছুঁত আর বকা খেত, মার খেত রুমকি’র কাছে। বাবলি’টা হঠাৎই বড় হয়ে গেছে। আর ভীষণ চুপচাপ। দেখতেও বেশ বড় সড় লাগে। রুমকি লক্ষ্য করেছে বাবলি’র বুক এখনই তার থেকে ভারি। প্রবীরকাকু সেদিন বাবলি’র দিকে অমন করে তাকিয়ে ছিল বেশ কিছুক্ষণ, তারপরই রুমকি ভাল করে বোনকে আপাদমস্তক খেয়াল করে দেখে।

বাবা ওরকম হুট করে চলে যাওয়ায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিল রুমকি। সে তখন বোনের মত ছেলেমানুষ না আবার মা’র মত স্বামী-বিয়োগের যন্ত্রণাও তার নয়। কিন্তু কি যে এক ফাঁকাফাঁকা ভয়ের অনুভূতি। তার ওপর মনের ভেতর একটা দায়িত্ববোধের চিন্তা। বাড়িতে কেউ রুমকি’র এই কষ্ট বোঝার অবস্থায়ও ছিল না। মা শোকে মূহ্যমান। আর বোন ছোট। প্রবীরকাকু ঠিক সেই সময় রুমকি’র সমব্যাথী হয়ে খুব কাছের একজন হয়ে পড়ল। সমস্ত আলোচনা, দুঃখকষ্ট সব প্রবীরকাকুকেই রুমকি বলত। তাছাড়া রুমকি ভাবে প্রবীরকাকু সব ব্যাপারে যেভাবে তাদের সাহায্য করেছেন সেটা কে করে আজকাল। একদিন খুব কান্নাকাটি করছিল রুমকি, প্রবীরকাকু পিঠে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল আর আস্তে আস্তে রুমকির শরীরে-মনে যেন কি এক ভালোলাগার প্রলেপ পড়তে শুরু করে, আর একটু পরেই রুমকি খেয়াল করে প্রবীরকাকু তার বুকে হাত রেখেছেন। এরপর থেকে ব্যাপারটা প্রায় রোজকার হয়ে যায়। যেন একটা খেলা। রুমকি বোঝে এসব ভালো নয়। কিন্তু আটকাবার পথ খুঁজে পায় না। প্রবীরকাকুর ওপর যে ওদের পরিবারটি নির্ভর করে আছে। কে পোহাবে নানারকমের ওসব ঝামেলা! মা যে একটুও স্মার্ট নয়। আর রুমকি কলেজ করবে না ওসব দেখবে। ছোট শহরে নানা কানাঘুষো হয়। এমন কি হরিহরণ যে এসব কারণেই আর রুমকি’দের বাড়ির সামনে দিয়ে যায় না, তাও জানে রুমকি। মা রোজ রাগারাগি করে। চোখ ভিজে যাচ্ছে রুমকি’র।

-- বাবা তুমি কেন চলে গেলে ?

হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে রুমকি। মনে হয় মা, বোন আর কি তাকে বিশ্বাস করে না!

কলেজ চালু হয়ে গেছে রুমকি’র। হরিহরণ’কে যদিও এখনও দেখেনি কলেজে। তবে ওর জন্যই কি না জানে না রুমকি, তাকে কেউ তেমন র‍্যাগিং করতে এল না। অবশ্য হোস্টেলে বেশি হয় র‍্যাগিং, রুমকি তো বাড়ির থেকেই যাতায়াত করছে। ক’দিন পর সন্ধ্যেতে বাড়ি এসে শুনল যে প্রবীরকাকু এবার বাবলি’কে পড়াবেন। রুমকি তো আর পড়ছে না, ওই সময়টা বাবলি পড়বে এবার থেকে।

-- না মা, বাবলিকে প্রবীরকাকুর কাছে পড়তে হবে না। ও এমনিই আজকাল ভাল রেজাল্ট করছে তো।

-- মানে ? প্রবীর নিজে বলেছে, তুই কি সবার গার্জেন হলি?

-- দরকার হলে আমি পড়িয়ে দেব মা।

-- রুমকি তুই সব কিছুতেই বোনকে দমিয়ে রাখতে চাস কেন, তা কি আমি বুঝি না ভাবিস?

দুজনের দিকে একবার তাকিয়ে বাবলি এবার বলে ওঠে--

-- মা আমার কিন্তু এবার খানিকটা গাইডেন্সের দরকার।

রুমকি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় ।

-- বাবলি, যা পারবি না আমি ফিরলে আমায় জিজ্ঞেস করবি।

এবার শ্রাবণী একেবারে গর্জে ওঠেন ।

-- তোকে আমি চিনি না ! সেবার প্রবীর পাঁচ-পাঁচটা ক্যাডবেরি বার তোকে দিল তুই একটা ভেঙেও বোনকে দিসনি।

-- উফ মা। ওটা একটা বাজি ধরেছিলাম। জিতলে পাঁচটা ক্যাডবেরি খাবার কথাই হয়েছিল, তাই খেয়েছি।

আজ খুব কান্না পাচ্ছে রুমকি’র। বাবাকে মনে পড়ছে। মা আজকাল সবসময় সে যে ‘বড়’ সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। রুমকি তো জানেই, তাই সে চাইছে না যে প্রবীরকাকু বোনকে পড়াক। প্রবীরকাকু বোনের সাথেও যাতে ওই একই কাজ না করতে পারেন। কিন্তু বোন কেমন রুমকি’কে আজ বিপাকে ফেলে দিল। রুমকি’র ধারণা বোন জানে যে সে হরিহরণ’কে পছন্দ করে, ভীষণ পছন্দ করে।

-- তা হলে দিদি ওই হরিহরণ বলে ছেলেটিকে তুই বল আমি ওর কাছে পড়ব।

রুমকি চমকে ওঠে বোনের কথায়।

-- হরিহরণ ? সে তো ইলেভেন-টুয়েলভ থেকে পড়ায় তোকে কেন পড়াবে বাবলি?

-- পড়াতেও পারে, তুই চেষ্টা কর যাতে পড়ায়। তুই আর ও তো এখন এক কলেজেই পড়িস।

রুমকি উত্তর দেয় না। বোনকে এত প্রত্যয় নিয়ে কথা বলতে কখনও শোনেনি। বাবলি কি কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে কথাটা বলল? আজ যেন বাবলি’র পারসোন্যালিটির সামনে সে গুটিয়ে গেল। বোন সব কিছুতে তার থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। রুমকি পড়াশুনোয় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে, আর বোন লাফিয়ে-লাফিয়ে ভাল রেজাল্ট করছে। বাবার মত লম্বা ফর্সা চেহারা হয়েছে বাবলি’র, বেশ ভাল দেখতে।

পরের দিন কলেজে লাঞ্চের সময় রুমকি হরিহরণ’কে অনেক কষ্টে ধরল। ছেলেটি রুমকি’র প্রাণের ধুকপুকুনি। কত রোম্যান্টিক কল্পনা একে নিয়ে রুমকি’র সেই কবে থেকে। কিন্তু অন্য কোনও কথা না বলে প্রথমেই সে বলে--

-- তোমার সাথে একটা দরকার আছে।

-- সিওর।

-- আমার বোন ক্লাস টেনে পড়ে, পড়াশুনোয় ভাল, ওকে একটু গাইড করবে ?

-- ইওর সিসটার? ইলোরা ? দ্যাট বিউটিফুল গার্ল ? ইউ আর অজন্তা রাইট?

জবাব শুনে খানিক অবাক রুমকি, একটু হাসল শুধু।

-- পড়াবে হরিহরণ ?

-- ইয়েস আই ক্যান টিচ হার। আই লভ টু গাইড ব্রিলিয়ান্টস। আই এম ফ্রি অ্যাট ফোর থার্টি ইন দ্য আফটারনুন, ইজ দ্যট টাইম ওকে উইথ ইওর সিসটার? অ্যান্ড ওয়ান আওয়ার ওনলি।

-- হ্যাঁ মনে হয় ওকে হবে। তাও আমি কাল তোমায় কনফার্ম করছি।

-- ফাইন।

রুমকি ভাবে, ওদের দু’জনের আগে থাকতে ঠিক করা ছিল? হরি’কে বলতেই কেমন রাজি হয়ে গেল। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল রুমকি’র।

এই সপ্তাহ থেকেই পড়াতে আসছে হরিহরণ বাবলি’কে। রুমকি’র ফিরতে দেরি হয়। ততক্ষণে ওদের পড়ানো-পড়া সব শেষ হয়ে, হরিহরণ চলে যায়। কম ক্লাস থাকলেও রুমকি আগে ফিরতে পারে না। ছুটির পর কলেজের গার্ল’স বাসে করে সে ফেরে। হরিহরণ নিজের বাইকে যাতায়াত করে তাই আগে চলে আসে। নাইন থেকে টেনে খুব ভাল রেজাল্ট করল বাবলি। মা খুব খুশি। প্রবীরকাকু আজকাল রোজ আসেন না।

একদিন কলেজে খুব মাথা ধরায় রুমকি আর কলেজ বাসের জন্য অপেক্ষা না করে বাইরে থেকে বাস ধরে বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ির কাছে এসে দেখে হরিহরণের বাইক। গেট খুলে বসার ঘরের সামনে এসে বাবলির গলা শুনে রুমকি থমকে দাঁড়ায়।

-- তুমি বলেছিলে ফার্স্ট, সেকেন্ডের মধ্যে হলে কিছু দেবে।

-- ইয়েস, আই ডোন্ট ফরগেট মাই প্রমিস, ওয়াট ড্যু ইউ ওয়ান্ট, ডিয়ার?

-- ফাইভ বিগ চকোলেট বারস।

****

আজ শরীরখারাপ তাই সন্ধ্যেতেই রুমকি দরজা বন্ধ করেছে। ডায়ারি খুলেছে, হাতে পেন, কিন্তু কি লিখবে রুমকি? পাঁচ বছর ধরে রোজ রাতে হরিহরণ’কে চিঠি লেখে সে ডায়ারির পাতা ভরে। আজ যে কি লিখবে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না রুমকি।

“ বাবা,


তুমি চলে যাবার পর হরি কেন এলো না একবারও আমার কাছে ? তাহলে তো সব এলোমেলো হত না। বাবা, বোনকে আমি বাঁচিয়েছি। বড় মেয়ের দায়িত্ব আমি পালন করেছি বাবা ...”

1 টি মন্তব্য: