সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প : কৃষ্ণকলি

আপনে বেশি মিছা কথা কন। পাতলা ঠোঁটে সলাজ হাসি ফুটিয়ে বলে মেয়েটি। কালো মুখে মেহেদিরঙ আভা, চোখের চাউনিতে কেমন এক দুষ্পাঠ্য ভাষা।

তুমি সুন্দর — আমার কাছে যা সত্যি মনে হয় তাই বলি। মিথ্যা কথা বলি না আমি। স্মিত হেসে বলে আলিনূর। গায়ের রং কালো হলে কী হবে দক্ষ ভাস্করের হাতে কষ্টিপাথরে খোদাই করা দেবীমূর্তির মত নিখুঁত গড়ন মেয়েটির। ডাগর ভাসাভাসা চোখ, টিকালো নাক, বেলিফুলের পাপড়ির মত শুভ্র দু’সারি দাঁত। ওপরের পাটির সামনের দাঁত দুটো সামান্য বড়, হাসলে ভালোই দেখায়।
ক্ষীণাঙ্গী তরুণীটির বয়স কতই বা হবে, ওর মায়ের কথা অনুযায়ী বড়জোর সতের। সস্তা ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখলেও, মনোযোগী হলে বক্ষদেশের সৌন্দর্য অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। চিকন কটি আর নাতিস্থূল নিতম্ব দুলিয়ে যখন ও হাঁটে, যেকোনও পুরুষের চোখে সে-দৃশ্য নেশা জাগাতে পারে! অথচ কী আশ্চর্য, কতবার দেখেছে ওকে নূর; চোখে কি এতদিন ছানি পড়ে ছিল!

দক্ষিণদুয়ারি বাড়ির সামনের খোলা বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে অ্যালবাম খুলে ছবি দেখছিল নূর। পেছনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়ায় মেয়েটি। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অ্যালবামে আঁটা ফটোগুলোর দিকে। পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করে আলিনূর, – এত কী দেখছো অমন করে? আমার ছবি, অনেকদিন আগের তোলা। এখনকার চেহারার সঙ্গে মেলে? কত বুড়িয়ে গেছি, তাইনা? যখনকার ছবি তখন তোমার দেখা পেলে ঘটনা একটা ঘটিয়েই ফেলতাম —। কথাগুলো বলে হো হো করে হেসে ওঠে নূর। মেয়েটির চেহারায় কেমন এক অভিব্যক্তি! কোনও কথা না-বলে দ্রত চলে যায় বারান্দা ছেড়ে। নূর অ্যালবাম বন্ধ করে চেয়ে থাকে বাড়ির সম্মুখের দিগন্তবিস্তৃত বিলের দিকে। বহুদূরে কালো রেখার মত দেখা যায় লোকালয়ের চিহ্ন, আর শুধু থৈথৈ জলরাশি। ঢেউয়ের ওপর এসে ঢেউ ভেঙে পড়ে গম্ভীর গর্জন তুলে।

কিছুক্ষণ পর চা আর ঝালমুড়ি ট্রেতে সাজিয়ে টেবিলে রাখতে যাবে মেয়েটি ঠিক তখুনই শাহনূর বলে ওঠে, –এমন নিখুঁত মুখ জগতে কোথাও কেউ খুঁজে পাবে নাকো।

আবার...! কৃত্রিম রাগের সুরে বলে ওঠে মেয়েটি।

অতিশয়োক্তি না হোক কথাগুলোতে যে কবিতার ঢঙ, তা তো অস্বীকার করবার জো নেই। আর প্রকৃতির এমন রূপের স্পর্শে কবি না হয়ে উপায় আছে? ভরাবর্ষায় প্রকৃতি সেজেছে নয়নজুড়ানো এক অপরূপ সাজে। কদমগাছে থোকায় থোকায় প্রস্ফুটিত কদমফুল—বর্ষণসিক্ত অন্যান্য বৃক্ষগুলোকেও দেখাচ্ছে সদ্যস্নাত কুমারীর মত।



মেয়েটির বাড়ি আলিনূরদের বাড়ির পাশেই। আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বাবা মারা গিয়েছিল ওর বয়স যখন ছয়—হৃদরোগে। ছোট একটা বোনও আছে। মা স্বামীর রেখে-যাওয়া বিঘা তিনেক জমি আর কাঁথা সেলাইয়ের আয়ের ওপর নির্ভর করে টেনেটুনে কোনওভাবে সংসার চালায়। মাথা গোঁজার ঠাঁই—চার ডেসিমেল ভিটার ওপর চৌচালা একখানা টিনের ঘর।

আলিনূর ঢাকাতেই কাটায় বছরের বেশিরভাগ সময়। বাড়ি আসে বুড়ি মা-কে দেখতে — জমি-জমার খোঁজখবর নিতে। দীর্ঘদেহ, ফর্সা, মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল — বয়স ষাটের কাছাকাছি পৌঁছালেও দেখতে অনেক কম মনে হয়। ঢাকাতে মন টেকেও না ইদানীং। বউটা মারা গেছে বছর খানেক হল। ফাঁকা বাসা। দু’ছেলের একজন স্টেটস্-এ থাকে, অন্যজন স্কলারশিপ নিয়ে ইউকেতে গেছে হায়ার এডুকেশনের জন্য। তবু ঢাকা না-থেকে উপায় কী! ইন্ডেটিঙের ব্যবসা; শুধু স্টাফদের ওপর নির্ভর করলে কি চলে?

গ্রামের বাড়িটি বিশাল এলাকা জুড়ে — খাঁখাঁ করে বসবাসের লোকের অভাবে। নূরের বিধবা বোনটি শুধু থাকে মায়ের সঙ্গে। পাড়াপড়শিরা যার যখন সময় হয় অশীতিপর বৃদ্ধাকে সঙ্গ দিতে আসে। মানুষের সঙ্গ বৃদ্ধা ভালোবাসেন। এর-ওর খোঁজখবর নেন। কারও কোনও সমস্যা হলে উদ্বিগ্ন হন। নিজে সাহায্য করেন। ছেলে নূরকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন পরিচিত লোকদের এ-সমস্যা ও-সমস্যার কথা বলে। এলাকার তাবৎ লোকের সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যেন বৃদ্ধার কাঁধে।



হ্যাঁরে নূর, রাজিয়ার ফরম্ ফিলাপের টাকাটা দিস। ওদের অবস্থা তো জানিসই...। আদেশের সুরে বলেন মা। মেয়েটি তখন ওর বড়মা অর্থাৎ বৃদ্ধার চুলে বিলি কাটছিল। আলিনূর তাকায় ওর দিকে। মাথা নিচু করে রাজিয়া।

রাজিয়ার ওপর মায়া ধরে গেছে নূরের — একটু বেশি রকমই যেন। অভাবের সংসার সামলাতে মায়ের সঙ্গে ওকেও হাত লাগাতে হয় গেরস্থালি কাজে। এমন কি ঝাঁঝাঁ রোদ্দুরে মায়ের সঙ্গে কখনও-বা চকে যেতে হয় ফসল দেখতে। নূর ভাবে, কোনও বড়লোকের ঘরে জন্মালে আদরে-আহ্লাদে চেহারার জেল্লা আরও কত বেড়ে যেত ওর। গায়ের রঙ ফর্সা না-হোক উজ্জ্বল শ্যামলা তো হতই। রাজিয়াকে ও দামি সানস্ক্রিন, বডিলোশন, স্কিনব্লিচার যে কিনে দেয় না, তা নয়। কিন্তু ব্যবহার করলে তো! নিজের প্রতি ওর এই উদাসীনতার অর্থ খুঁজে পায় না নূর।

ফরম্ ফিলাপ করতে আর ক’টাকাই-বা লাগে। পড়াশোনার কী অবস্থা জানতে চায় নূর। রাজিয়ার মা জামিলা দ্বিধা মেশানো কণ্ঠে বলে, – চাচামিয়া, মেয়াডা ইংরাজি আর অংকে কাঁচা, ইস্কুলের মাস্টাররা নাহি মাসে দুইশ টাহা লিয়ে পাইভেট পড়ায়, রাজিয়া কচ্ছিল।

পরীক্ষায় ভালো করার জন্য ওর যা যা দরকার তা তো করতেই হবে। কোন কোন মাস্টার ভালো প্রাইভেট পড়ায়, তাদের কাছে পড়ুক। পয়সার চিন্তা করতে হবে না। আলিনূর বলে।



টেবিলে লুচি আর সবজি সাজিয়ে দিয়ে চলে যেতে নেয় রাজিয়া। নূরের ডাকে ফিরে থমকে দাঁড়ায়।

দেখি দেখি দাঁড়াও তো এখানে। ভালোই মানিয়েছে কিন্তু তোমাকে। বলে নূর।

আপনে পছন্দ কইরা কিনছেন — দামি থ্রিপিস। কালো মানুষের গায়েও তাই ভালোই লাগতেছে—।

তোমার ওই এক কথা। গায়ের রঙটাই কি সব? চেহারা শুধু রঙে হয় না গো, রঙে হয় না। রবি ঠাকুরের কবিতাটা পড়নি? ‘কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ...। কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি...।’ অনেক ফর্সা পেত্নি আছে, দেখবে?

না, দরকার নাই দেখার। নাস্তা কেমন হইছে তাই কন।

ভালো, কে বানিয়েছে?

আমি, বললে বিশ্বাস করবেন? হাসির টুকরো মাখানো কথাগুলো ঝরে পড়ে রাজিয়ার ঠোঁট থেকে।

করব না কেন? তোমার হাতের খিচুড়ি খেয়ে সেদিন প্রশংসা করিনি? মনে হচ্ছে মুখে এখনও লেগে আছে; আহ্!

আপনে সবকিছু বাড়ায়ে বলেন, ভাই।

ভাই। ওর মা নূরকে চাচা ডাকে; সেই হিসাবে ও নানাভাই। প্রথম-প্রথম নানাভাই বলেই ডাকত। ওর নিষেধে সম্বোধনের প্রথমাংশ বাদ পড়ে গেছে।

নানা ডাকলে নিজেকে খুব বুড়ো মনে হয়। বুড়ো তো হয়েইছি, কিন্তু বারবার তা মনে না করিয়ে দিলে চলে না? শুধু ভাই ডাকলে মুখের পরিশ্রমও কম হবে। হেসে বলেছিল নূর। সেই থেকে ভাই।



ফরম্ ফিলাপ হয়েছে। প্রাইভেট পড়াও চলছে দুজন টিউটরের কাছে। ভালোই এগোচ্ছে সবকিছু। ইংরেজি আর গণিত এখন অনেকটাই আয়ত্বে এসে গেছে। আলিনূরও মাঝেমধ্যে পড়াশোনা নিয়ে কথা বলে। ইংরেজিতে আর অংকে কতটুকু এগোলো তাও পরখ করে দেখে।

নূরের যেন জেদ চেপে গেছে — একটা অভাবি মেয়েকে সে গড়ে তুলতে চায় নিজের মনের মত করে। কথাচ্ছলে বলে, – এসএসসি, এইচএসসি তারপর মেডিক্যাল। ডাক্তারনি হিসেবে ভালোই মানাবে আমার বান্ধবীকে...।

তাতে আপনার লাভ?

লাভ-লোকসানের হিসাব করি না। তোমার ওই কালো হরিণ চোখদুটো শুধু দেখতে পেলেই হল। বলে নূর।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কও অনেকটা সহজ হয়ে উঠেছে ওদের দুজনের মধ্যে। এখন নূরের কথার পিঠে কথা বলতেও দ্বিধা করে না একসময়কার স্বল্পবাক রাজিয়া। চালচলনেও ব্যাপক পরিবর্তনের ছোঁয়া।



সকাল বেলায় জামিলা আসে। কাঁচুমাচু করে জানায়: চাচামিয়া, আপনার চিষ্টায় পড়াশোনায় তো ভালোই আগাইছে রাজি; কিন্তুক বয়স তো আর বইসা থাহে না। বিয়ার বয়স ওর পার হয়া যাতিছে যে!

কী বল, কী এমন বয়স হয়েছে ওর! আজকাল মেয়েদের তেইশ-চব্বিশ বছরের আগে বিয়ে হয় না। পড়াশোনা শেষ করতেই ওই বয়স লেগে যায়। বলে নূর।

বড়লোকগরের মিয়াগেরে কতা আলাদা। আমরা গরিব, মিয়ার বয়স বেশি হলি যৌতুকের ট্যাহা লাগবিনি ম্যালা। বয়স বেশি হলি বিয়া দেওয়া যে কী সমিস্যা তা আপনে বুইজবেন না।

তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করার দরকারটা কী, যা খুশি করো —। বিরক্তি মেশানো সুরে বলে নূর।

না, মানে, একডা সম্পর্ক আইছে। গেরস্তঘর। জোতজমি ভালোই আছে। ছাওয়ালডারও শুনিছি স্বভাব-খাসলত ভালো। তাই চিন্তা কইরলাম আপনের সাথে আলাপ করি। আপনেরা ছাড়া আমার আর আছে কিডা?

ঠিক আছে, যা ভালো বোঝো কর। বিয়ের খরচাপাতির ব্যাপারে কী করতে হবে বলো, করা যাবে। আলাপের ইতি টেনে উঠে পড়ে নূর।



রাজিয়াদের বাড়ির পাশেই এক অবস্থাপন্ন কৃষকের বাড়ি। কদিন আগে ছেলের বিয়ে দিয়ে বউ এনেছে ঘরে। বিয়ের দিন মাইক বেজেছিল, দল বেঁধে মেয়েরা গান গেয়েছিল — বিয়ের গীত। অনেক রাত ধরে চলেছিল গীত আর হৈহুল্লোড়ের পালা।

কিছুটা আনমনা নূর চোখ বুজে ভাবে; ক’দিন বাদে রাজিয়ারও তো বিয়ে হবে। কনের সাজে কেমন দেখাবে ওকে।

একা একা বারান্দায় বসে কী ভাবতেছেন অতো? রাজিয়ার কথায় সংবিৎ ফিরে পায় নূর।

না, এমনি, কী আবার ভাবব? কাল তোমার মা এসেছিল, বলল বিয়ের একটা ভালো প্রস্তাব নাকি এসেছে ...।

তা আপনি কি বললেন? খুশি হইছেন, তাইনা? কিছুটা তেতো শোনায় রাজিয়ার কণ্ঠস্বর।

ভারী কিছু পতনের শব্দে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় নূর। রাজিয়াদের পাশের বাড়ির অল্পবয়স্কা এক মেয়ে কাঁখে করে ঝুড়িতে গোবর বয়ে এনে গর্তে ফেলছে। মেয়েটির পরনে শাড়ি। দেখতে ভালোই।

আগে তো দেখিনি কখনও; মেয়েটা কে? জিজ্ঞেস করে নূর।

আগে দেখবেন কী করে, সেদিন বউ হয়ে আসলো মোটে! কেমন অদ্ভুত হাসির রেখা রাজিয়ার ঠোঁটে — ওরে কেউ ডাক্তারনি বানাইতে চাইছিল কিনা, কে জানে! কথা শেষ করেই অতি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে রাজিয়া। ওর আচরণে রীতিমত বিস্মিত হয় নূর। অনেক পরিবর্তন এসেছে রাজিয়ার মধ্যে। কথা বলে আগের চেয়ে অনেক গুছিয়ে। নিজের শরীরের পরিচর্যার ব্যাপারেও বেশ সজাগ ইদানীং। কে বলবে অসহায় এক দরিদ্র বিধবার সন্তান ও।



দুদিন বাদে আবার আসে রাজিয়ার মা — জামিলা। মুখ যেন আষাঢ়ের মেঘ; কোনও রা নেই। জড়সড় ভঙ্গিতে একঠাঁয় দাঁড়িয়েই থাকে। নূরই জিজ্ঞেস করে, – কী ব্যাপার, ও-ভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন, কিছু বলবে?

কী আর কব চাচামিয়া, ভালো সম্বন্ধ কি সকসমায় জোটে? তার উপর মেয়ার চেহারা-সুরত তো যা একখান মাশাল্লা...! কপালে কী-যে আছে আল্লাপাক জানে! আপনে যদি একটু বুজাইয়া কন, ও রাজি হতি পারে। আপনেক ও খুব মানে...।

ও কী বলে? সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন নূরের।

পড়ালেহা কইরবার চায়। গরিবের মেয়ার অত পড়ালেহা কইরা হবিডা কী? পড়ালেহা করতি ট্যাহাও তো লাগে ম্যালা। একজন মানষির আরও কত খরচ, খাওয়া পরা...। একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামে জামিলা।

আগেই তো বলেছি পড়াশোনার খরচ আমি দেব। অন্যান্য খরচের ব্যাপারেও চিন্তা করা যাবে। ও রাজি না হলে জোর করে কিছু করা মনে হয় ঠিক হবে না। নূর বলে। নূরের কথা জামিলার মনোঃপুত হয়েছে বলে মনে হয় না।

কালই আমাকে ঢাকা যেতে হবে; এটা রাখো। জামিলার হাতে এক তাড়া নোট তুলে দেয় নূর।



বেশ কিছুদিন ঢাকা কাটিয়ে নূর ফিরে আসে বাড়ি। খবর পেয়ে জামিলা এসে জানায়: চাচামিয়া, রাজিয়ার শইলডা ভালো যাতিছে না। সমায় সমায় পেটে, হাত-পায়ের গিরায় গিরায় ব্যথা। কী যে করব মাথায় কুলাতিছে না।

কবে থেকে এ-অবস্থা? জিজ্ঞেস করে নূর।

আপনে ঢাকা যাওয়ার কয়দিন পর থেইকাই, দুইমাস তো পরায় ঘুইরা আসলই। জামিলা বলে।

ডাক্তার দেখাওনি?

দেখাইছি। অসুধ খাওয়াইতেছি সেই কবে থেইকা, কিন্তুক অবস্থার উন্নতি নাই।

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নূর জিজ্ঞেস করে, – আগেও কি এ-রকম হয়েছে কখনো?

হইছে, কিন্তুক এত বেশি আগে কুনো সমায় হয় নাই। তাছাড়া সারা শইল্যে কীরহম লাল ছোপছোপ সব দাগ দেখা যাতিছে। মুখে কিছু লিতেও পারতিছে না। কী মসিবতে পড়লাম আমি, খোদা —! ছলছল চোখে বিলাপের সুরে বলে জামিলা।

অসুস্থতার খবর শুনবার পর এই প্রথমবার নিজেই রাজিয়াদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয় নূর। ওর শিয়রের কাছে মোড়া টেনে বসে হাত বোলায় কপালে, মাথার চুলে। মুখে কৃত্রিম হাসি টেনে বলে, – কী, পরীক্ষার ভয়েই বুঝি এই অসুখ বাধানো?

রাজি — রাজিয়া খুব কষ্টে শুকনো ঠোঁটে একটুকরো হাসি ফোটাতে চেষ্টা করে। চুলে হাত বুলিয়েই চলে নূর।

কী হতে পারে রোগটা! লিভার বা কিডনিতে কিছু হল নাতো! দুশ্চিন্তার বৃশ্চিক মনের গহিনে অনবরত দংশন করেই চলে। ঢাকায় নেওয়া দরকার রাজিয়াকে। গ্রামে এ-ধরনের রোগের চিকিৎসার সুযোগ কোথায়! নূরের প্রস্তাব শুনে কিছুটা দ্বিধা-সঙ্কোচ মেশানো সুরে জামিলা বলে, – আপনের লাতনি চাচামিয়া, কী কইরবেন আমি তাক্কি জানি!

বেঁকে বসে রাজিয়া। একরোখা স্বভাবের ও বরাবরই। না, ও ঢাকা যাবে না। কিন্তু ঢাকায় না গেলে চিকিৎসা হবে কী করে! ওর এক কথা, – অসুখ এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। না-হলে না-হবে, কিন্তু আমি বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না।

রাজিয়ার প্রতি নূরের এই বাড়াবাড়ি মনোযোগ দেখে প্রতিবেশীদের অনেকে অনেক কথা বলে। ষাট হোক আর সত্তরই হোক, বউমরা ব্যাটাচ্ছেলের ভিমরতি বয়সের ধার ধারে না! তাছাড়া ওরা হল গিয়ে এ-এলাকার সব থেকে প্রভাবশালী পরিবারের লোক। কী নেই ওদের; কিন্তু এটাও একটা বিস্ময়ের ব্যাপার বটে; এলাকাতে বা ঢাকা শহরে সুন্দরী মেয়েমানুষের কি আকাল পড়েছে? কালি-পুঁচকে এই মেয়েটার মধ্যে কী পেল মিয়াসাহেব!



বারবার ফোন আসতে থাকে ঢাকা থেকে। জরুরি ব্যবসায়িক কাজ; ও না গেলে বিরাট এক অর্ডার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। রাজিয়াকে এ-অবস্থায় ফেলে যেতেও মন সায় দিচ্ছে না। কী করবে আলিনূর—ভেবে হিমশিম খায়। ঢাকা যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও গত্যন্তরও নেই। মনস্থির করে ফেলে, তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফিরে এলেই হবে।

ঢাকা এসে প্রথম প্রথম কদিন রাজিয়াকে নিয়ে খুব ভাবলেও কাজের চাপে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে গ্রামে ফেলে-আসা মেয়েটার চিন্তা। একসময় প্রায় ভুলেই যায়।

মাসখানেক পর মোবাইলে কাঁদো কাঁদো গলায় জামিলা যা জানায় তার সারসংক্ষেপ: রাজিয়ার অবস্থা খুবই খারাপ। ওকে দেখতে হলে নূর যেন খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসে।

নূরের হাতে তখনও অনেক কাজ। তাছাড়া একজন প্রতিবেশীর জন্য অনেক কিছুই তো করেছে। অবস্থা খারাপ হতেই পারে। ওকে যেতে হবে তারই-বা কী মানে!

‘আপনে বেশি মিছা কথা কন —।’ রাজিয়ার স্মিত হাসি আর সলাজ মুখচ্ছবি হঠাৎই ভেসে ওঠে নূরের মানসপটে।



নূর যখন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে, রাজিয়া তখন চেতনার শেষ প্রান্তে। জামিলার মুখ থেকে শোনে রাজিয়ার শেষ দিনগুলোর কথা। দিনকে-দিন অবস্থা জটিল হচ্ছিল। প্রশ্রাব হচ্ছিল যেন সরষের তেলের মত গাঢ় — পরিমাণেও কমে আসছিল ক্রমশ; প্রায় বন্ধ হবার যোগাড়। কাশির সঙ্গে মাঝেমধ্যে যাচ্ছিল রক্ত। উপায়ান্তর না দেখে জেলা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানে কাজ না হওয়ায় নিয়ে গিয়েছিল আরও বড় শহরের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। অনেক কিছু পরীক্ষা করেছিল ডাক্তাররা। চোটপাটও কম দেখায়নি, – এত দেরিতে রোগী আনলে কি কিছু করার থাকে! বিরক্তিভরা গম্ভীর মুখে শেষমেশ জবাব দিয়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে বাড়িতেই। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনটা দেখে নূর। ওতে হিজিবিজি করে ইংরেজিতে লেখা অনেক কিছুর মধ্যে একটি লেখায় চোখ আটকে যায়, RPGN। ডাক্তার না হলেও রোগী ঘাঁটাঘাঁটি করে এ-শাস্ত্রে ওর অভিজ্ঞতা একেবারে কম নয়। রোগটা যে কী তা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। ওর খালাও মারা গিয়েছিল এ-রোগে। রেপিডলি প্রগ্রেসিভ গ্লোমারেলো নেফ্রাইটিস। রেনাল ফেলিওর। রাজিয়ার দুটো কিডনি-ই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

রাজিয়ার দিকে তাকায় নূর। দেখে, ডাগর চোখের ভাষাহীন দৃষ্টি নিয়ে রাজিয়া অপলক চেয়ে আছে ওরই দিকে। নাকি ওর চোখ একই লক্ষে স্থির হয়ে আছে! আঁতকে ওঠে নূর, রাজিয়ার কপালে হাত রাখে। হিমশীতল কপাল! পাথরের মত বোধশক্তিহীন নূর। হাতের আলতো স্পর্শে রাজিয়ার খোলা চোখজোড়া বন্ধ করে দিতে নেয়। জামিলা ত্বরিতগতিতে সরিয়ে দেয় ওর হাত। জামিলার এ-আচরণে বিস্মিত হয় নূর! আহাজারি আর মড়াকান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের গোটা পরিবেশ।



পরে জেনেছিল নূর, জামিলার জবানিতে, – মরার আগে রাজি বার বার কিরে-কসম দিয়া কইল; ‘মা গো মরার পর আমার চোখ দুইখান খোলা রাইখো। মনে থাকপিনি তো? কতা দিলা তো? কাউক্কু বন্দ কইরবার দিবা না। একজন আসপিনি কইল, তার ছবি পরবিনি আমার খোলা চোখে। সে,’ কী জানি কইল রাজি, যাহ্ ভুইলা গেলাম, কোন ঠাকুরের কবিতা, ‘কালো তা সে যত কালো...’ মুরুখ্খু মানুষ অত মনে থাহে না চাচামিয়া, ‘সেই কবিতা আমাক শুনাবিনি।’ ওই ঠাকুরডা কিডা চাচামিয়া?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—কবি, তুমি চিনবে না। তাঁরই কবিতা, ‘কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ!’ গলা জড়িয়ে আসে নূরের।

যার আসপার কতা কইল, সে কিডা, চাচামিয়া? জামিলার করুণ জিজ্ঞাসা।




তা শুনে এখন আর কী লাভ বল; সে এসেছিল —। ধরা গলায় উত্তর করে নূর।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন