সোমবার, ১ আগস্ট, ২০১৬

বোধিসত্ত্ব ভট্টাচার্যের গল্প : বুরবুদ


অন্ধকারের প্রথম মুহূর্ত:


শহরটি যেখানে শেষ হয়ে গিয়ে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া শরীরের মতো কুঁচকে বেঁকে গেল, সেই জায়গাতেই একতলা বাড়িটি। সামনে একফালি জায়গা। সেখানে শিরদাঁড়া টান করে শুয়ে থাকা একটি শুকনো পাতাভর্তি উঠোন এবং কুয়োর পাড়। উঠোনে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় গাছ। অনেক আগে পাতাগুলো পরিষ্কার করে দেওয়া হত মাঝেমাঝেই।
দীর্ঘদিন ওসব আর হয় না। কুয়োর পাড় থেকে উত্তরমুখে সোজাসুজি লম্বা দুটো লাফ দিলেই পাওয়া যাবে এই বাড়ির গেটটি। তারপরে পিচের ছোটরাস্তা। রাস্তাটি এই বাড়ির গেটের কাছে এসেই শেষ। তারপরে যা রয়েছে অবশিষ্টের মতো, তা আদতে একটি খোয়াপথ। যা অনেকটা টানা যাওয়ার পর মিশে গেছে কয়েকশো বিঘা লম্বা একটি প্রান্তরে। সেখানে চাষ-বাস হয়। নেশা হয়। কখনও কখনও দুটো-একটা ‘বডি’ পড়ার কথা শোনা যায়। প্রান্তরটির গায়ে গা ঠেকিয়ে লেগে রয়েছে একটি রেললাইন। সেখান দিয়ে ঠিক এই মুহুর্তে প্রচন্ড জোরে হুইসল দিয়ে একটি বুড়ো মালগাড়ি কাশতে কাশতে চলে গেল।
সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। বারান্দার পঞ্চাশ ওয়াট ছাড়া গোটা বাড়িটায় আর আলো নেই। সেই বারান্দাতেই একটু দূরত্ব রেখে বসে আছে দুজন। একজন ফুল ছাপ ম্যাক্সি পরা। আরেকজনের গলায় অল্প পোড়া দাগের উপর সেঁটে আছে সিটি গোল্ডের চেন। তারা দুজন জীবিত মানুষ। দুজন...মৃত মানুষ। এক সময় গেট খোলার আওয়াজ পাওয়া গেল। বাড়িটির বারান্দায় ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র শুকিয়ে যাওয়া ফুলগাছ। টব বলতে বিভিন্ন সাইজের হুইস্কির বোতল। ওগুলোকে বাঁচিয়েই চেয়ার থেকে উঠে খুব ধীরে পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকে গেল ম্যাক্সি পরা মানুষটি। আরেকজন তখনও বসেছিল বারান্দায়। একতলা বাড়িটির গেটের মাথার উপর দিয়ে ইলেকট্রিক তার চলে গেছে। সেখানে একটি প্যাঁচা বসেছিল। তার চোখে এসব ধরা পড়ে গেল। পঞ্চাশ ওয়াটের আলোয় বাড়ির মানুষগুলোকে ডেটল লাগানো তুলোর মতো মনে হচ্ছিল...





সাদা ধবধবে মাদুরের মতো গুটিয়ে থাকা উন্মুক্ত একটা শরীর। তার বিশেষ বিশেষ জায়গায় মাংসল এবং রোমশ কুটির শিল্পের মনোযোগী কাজ। সেই শরীরের বিভিন্ন বাঁকে ধাক্কা খেতে খেতে পিছলে নেমে আসছে আরেকটা শরীর। তার মাথা নেই। সেই জায়গায় লাগানো দেশি হুইস্কির খালি বোতল। জলের ভিতর ঘটি ডুবিয়ে দিলে যেমন শব্দ হয়, সে রকমই এক শব্দ তৈরি হচ্ছে ফাঁকা বোতলের মধ্যে থেকে। বুরবুদ বুরবুদ বুরবুদ… সাদা ধবধবে মাদুর এবার পাশ ফিরল। তাকে এখন কাত করে রাখা
তানপুরা মনে হচ্ছে।
…………………………………………………….
আমি আর মা। আমাদের বাড়িতে মানুষ বলতে এই দুজনই। খুব দরকার ছাড়া মায়ের সঙ্গে আমার কথা হয় না তেমন। ‘মায়ের সঙ্গে কথা নেই’ কিংবা ‘আমার মা-ই নেই’, এই ব্যাপারটা কেন জানি আমার মধ্যে একটা উল্লাস এনে দেয়। উল্লাস মানে আমাদের একতলা বাড়ির উপর ভাসতে থাকা কোনও আচমকা কেটে যাওয়া মোমবাতি ঘুড়ি।
মা এক বিখ্যাত ইংলিশ মিডিয়াম ইস্কুলে পড়ায়। বেগম আখতারের ভক্ত। প্রেমে পড়তে ভালবাসে। এই মুহুর্তে প্রেম করছে নিজের ফিজিওথেরাপিস্টের সঙ্গে। মায়ের থেকে সতেরো বছরের ছোট এই ছেলেটি বছর খানেক আগে আমার প্রেমিক ছিল। খুব ছোটবেলায় আমি একবার জ্বলন্ত স্টোভের উপর পড়ে গিয়ে ডানদিকের কানের নিচের গলার কিছুটা অংশ পুড়িয়ে ফেলেছিলাম। সেই পোড়া দাগ এখনও রয়েছে। জায়গাটা ঢাকাই থাকে। তবু কেউ আমার দিকে তাকালে মনে হয়, বুক নয়, পেট নয়, প্রথমে মেপে দেখছে ওই পোড়া দাগটাই। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে আমার মা-ও সেদিন পুড়েছিল খানিকটা। পিঠের নিচের দিকটা পুড়েছিল একটুখানি। আমার আর মায়ের মধ্যে এই একটাই মিল। ব্যস!
আমাদের বাড়িটা একটু অদ্ভুত। পাড়ার লোকের তুমুল কৌতূহল এই বাড়ি নিয়ে। দুটো নাম তারা দিয়েছে আমাদের বাড়ির। আমাদের দুজনেরই যদিও পাড়ার লোকের সঙ্গে তেমন কোনও যোগাযোগই নেই, তবু, নামগুলো কানে এসেছে। একটা হল- পাগলাগারদ , আরেকটা- পঁচিশে বৈশাখ। দুটো নামের মধ্যে দ্বিতীয়টা শুনলে চট করে আমাদের প্রবল কালচারাল মনে হলে দোষটা অবশ্যই শ্রোতার নয়। তবে, এর পেছনের আসল কারণটা হল, আমাদের বাড়ির আরও যে দুই সদস্য ছিল, আমার জ্যাঠা আর বাবা, তারা দুজনেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে দুটো ভিন্ন বাংলা সনের পঁচিশে বৈশাখে।
বাবা থাকত নিজের জগত নিয়ে। মা-ও তাই। জ্যাঠার কাছেই ছিল আমার যা সব সাবান গোলা জলের বুনো রূপকথা। একটি উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে বায়োলজির টেম্পোরারি শিক্ষিকা আমি। চাকরিটা জ্যাঠাই ম্যানেজ করে দিয়েছিল। জ্যাঠা ছিল গভর্নমেন্ট ক্লার্ক। রিটায়ার করার বয়সের বছর দশেক আগে ভিআরএস নিয়ে নেয়। আমার বাবার ছিল বই, খাতা, পেনসিলের দোকান। দোকানটা বেশিরভাগ দিনই বন্ধ থাকত। কোনওবিষয়েই মাথা না ঘামানো বাবার শখ ছিল হুইস্কির বোতলে ফুলগাছ পোঁতা। এই ব্যাপারে বাবার একটা সংস্কার ছিল। যে কোনও ফাঁকা হুইস্কির বোতল নয়, কেবলমাত্র নিজের শেষ করা হুইস্কির বোতলগুলোতেই ফুলগাছ পুঁতত। একের পর এক ফুলগাছে ভরে গিয়েছিল আমাদের ছাদ-উঠোন-বারান্দা, এমনকি শোওয়ার ঘর- খাবার ঘরও। শেষের দিকটা এমন হয়েছিল, ফুলগাছ পুঁতবে বলেই হুইস্কি খেত ছ’ফুট হাইট এবং মাঝখান দিয়ে তেলতেলে সিঁথির বীরেন নন্দী। পাড়ার লোকে ডাকত, বচ্চন। বাড়ির বাকিরা বোতলগুলোকে বাঁচিয়ে ঘরের মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করলেও জ্যাঠা সবসময় পারত না। রিফ্লেক্সে গন্ডগোল হয়ে পা লেগে ফুল-টুল সহ বোতল উলটে গিয়ে বিচ্ছিরি ব্যাপার। সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে উঠত জটিলতর খাঁচার মধ্যে আটকে থাকা মানুষটার দুর্বোধ্য মুখ- ‘‘মদের বোতল নিয়ে এটা কী চ্যাঙড়ামো হচ্ছে ঘরের মধ্যে বানচোত’’! প্রবল অ্যাজমা থাকায় ‘বানচোত’ এর ‘চোত’-টুকু আর শোনা যেত না। ওই জায়গাটা শোঁ শোঁ করে আওয়াজ হত
কেবল। 

নকশাল আন্দোলনেরর সময় জ্যাঠা প্রচুর দৌড়েছিল। ডানপায়ের গোড়ালিটা তার ফলেই রূপান্তরিত হয়ে গেছিল কাঠের বলে। গল্প করতে বসলে একথা সেকথার পর ওই গোড়ালিতেই পৌঁছে যেত। যেমন, যে কোনও বিষাক্ত সাপ কোমরের নিচে ছোবল মারতে গেলে সব সময় মারার চেষ্টা করে গোড়ালি বা ওর আশেপাশের অঞ্চলেই। ঠিক করে ওখানে মারতে পারলে বিষ মুহুর্তের মধ্যে রক্তে মিশে ব্রহ্মতালু অবধি পৌঁছে গিয়ে শরীরটাকে কাটা কলাগাছ করে ফেলে দেবে মাটিতে। জ্যাঠার ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। শুধু তফাতের মধ্যে, ওই কাঠের বলে ছোবল মারার পর বিষ তো ঢোকেইনি রক্তে, উল্টে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সাপটি নিজের গর্তে পালিয়েছে। যেমন, নকশাল আমলে একবার পুলিশ জ্যাঠাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল স্রেফ এই সন্দেহে যে, ওই গোড়ালির ভেতর সেলাই করে নকশালরা তাদের বিভিন্ন প্ল্যানের ব্লু-প্রিন্ট রেখে দিয়েছে। ওই সন্দেহবশতই জ্যাঠার গোড়ালিটা অপারেশন করে খোলার চেষ্টা হয়। বড় বড় সার্জেনরা পর্যন্ত পারেননি! নিরূপায় হয়ে পুলিশ ছেড়ে দেয় মানুষটাকে। এ সব কথা বলার পর বিড়বিড় করত জ্যাঠা---তোদের জান বুকের বাঁ-দিকে। আমার জান এই কাঠের বলে...

আমাদের বাড়ি থেকে আধঘন্টাটাক হাঁটা পথেই একটা রেললাইন পড়ে। তার পাশে বড় খোলা প্রান্তর। সেখানেই একটা অংশ জুড়ে বড় ছড়ানো ধানজমি। ধানজমির পাশে ইটগাঁথা একতলা বাড়ি। বহু পুরনো। সাপখোপ ছাড়া কেউ থাকে না। তৈরি করা মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল লোকজন। সেই কাঠামোর ছাদে উঠেই চাষ দেখতাম আমি আর জ্যাঠা। আকাশের তলায় এই বড় সবুজ মলাটকে দেখভালের জন্য তখন কয়েকগন্ডা চাষি। ধান চাষের ব্যাপারে খুব উৎসাহ ছিল জ্যাঠার। ফিসফিস করে কথা বলে যেত নিজের মনে- এই জমিতে ভাল ফলন চাইলে ধান লেগে যাবে বিঘা পিছু সাড়ে তিন কেজি মতো। এরা তো দু’কেজি মতো দিচ্ছে দেখছি। তা-ও আবার আই.আর.এইট! ফালতু! কেমন হবে জানি না! তবে এমনিতে পাঁচ থেকে সাত সপ্তাহের মধ্যে বীজ ভেঙে বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে টিপে নিয়ে প্রতি খোপে তিন-চারা করে যদি রুয়ে দেওয়া যায়, তাহলেই ব্যাস! সে চারা তিন হপ্তা যেতে না যেতেই পোড়া টোস্টের মতো রঙ নিয়ে নেবে। তখন থেকে গোড়া খোঁচানো...

একটু রাত হয়ে গেলে চাষিরা চলে যেত যে যার ঘরে। আমি আর জ্যাঠা শুয়ে থাকতাম ওই বাড়ির ছাদের উপর। অন্ধকার গিলে নিত আমাদের। দুরপাল্লার ট্রেনের বাতাস
এসে চুলকে দিত চুলের গোড়া অবধি। সেই বাতাস কোনও লেখাপড়া জানত না। এগুলো ছিল আমাদের আনন্দ। তেলাকুচো লতার উপর থোকা জোনাকিরা লেজে আগুন লাগিয়ে
হেঁটে বেড়ালে যেমন আনন্দের দেখায়, সেরকম আনন্দ। এই ধরনের আনন্দের সময় পাঁজরের ভিতর অল্প অল্প শিশির পড়ে। এক পঁচিশে বৈশাখে বাড়ির কাছের এই রেললাইন ধরেই হেঁটে চলে গিয়েছিল বাবা। ফিরে আসেনি।
...


বাবার চলে যাওয়ার পর জ্যাঠাকে মাঝেমাঝে মায়ের উপর শুয়ে থাকতে দেখতাম আমি। জ্যাঠার সঙ্গে ততদিনে ধান চাষ দেখতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বিছানায় থেবড়ে বসা রোমশ মানুষটার মাথা দেখা যেত না। মুন্ডুটা কেটে তার জায়গায় কেউ একটা হুইস্কির খালি বোতল লাগিয়ে দিয়েছে মনে হত। সেই হুইস্কির বোতল মায়ের কপালে গালে ঠোঁটে নাভিতে নেমে আসত ধীরেধীরে। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখতাম আমি। মায়ের শরীর তখন সাদা মাদুর।



আমাদের বাড়িতে আসার লোক বলতে এখন তিনজন। মায়ের ফিজিও, হোম ডেলিভারিতে আমার খাবার দেওয়ার লোক, হোম ডেলিভারিতে মায়ের খাবার দেওয়ার লোক। দুজন মানুষ, দুটো ভিন্ন হোম ডেলিভারি থেকে খাবার আসে। মা আর আমার মধ্যে কথা হয় না তেমন। ওই টুকটাক কিছু। মা কোনওদিনই আমার কাছাকাছি আসেনি। আমিও যে খুব, তা নয়। দুজনে দুঘরে থাকি। হোম ডেলিভারির খাবার খাই। ফর্ম ফিল আপের সময় যে টুকু লিখতে হয়, সেটুকু বাদে আর কোনও বাঁধন নেই আমাদের মধ্যে। আমি শুনেছিলাম মা চায়নি আমি হই। মা সন্তানই চায়নি কোনও। এই নিয়ে অবশ্য কিছু আর জিজ্ঞাসা করা হয়নি। কৌতূহল কম আমার। স্কুলে পড়াই। কাগজের জিনিসপত্র
বানাই। ভদকা আর কমদামি সিগারেট খাই। মাঝেমাঝে ওই সাদা ধবধবে মাদুর আর তানপুরা সংক্রান্ত স্বপ্নটা দেখে কাঁচা ঘুম টুকরো করে ফেলি।

মানুষ বাস্তবে যা দেখে, তা হুবহু স্বপ্নে দেখে না। দেখলে স্বপ্নের কোনও মানে থাকে না। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একদম উল্টো। সেই এক ছবি আমি দেখে যাই প্রায় প্রতি রাতে। স্বপ্নের ভিতর শব্দ পাই, বুরবুদ বুরবুদ বুরবুদ...
কখনও কখনও হয়তো খানিক স্বাদ বদলানোর জন্যই হবে, দেখে ফেলি যে, পর্দার ফাঁক দিয়ে বাবার লাগানো ফুলগাছগুলোর কোনও একটা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া কয়েকটা মরা ফুল ওদের দিকে ছুড়ে দিচ্ছি। সে যা-ই হোক, ঘটনা হল, গত কয়েক বছর ধরে এই বিশেষ স্বপ্নটি লম্বা লোহার স্ক্রু হয়ে কেবলই প্যাঁচ কেটে কেটে আমার মগজ নামের খোলটিকে ছ্যাঁদা করে ভিতরে ঢুকে চলেছে। যার কোনও অন্তিম নেই।
পরিত্যক্ত, ভেজা, পচা লতাপাতায় জাল হয়ে যাওয়া খোলটি চাপা পড়ে থাকে। জালটির বিভিন্ন গর্তের মধ্যে লতাপাতা সরিয়ে আলো ঢুকে গেলে শূন্যের মতো শীতল অথচ তরতাজা কিছু স্মৃতি টের পাওয়া যায়। সেই স্মৃতির তলায় যে চেতনাটুকু থাকার কথা, তা তখন থাকে না। তার বদলে নড়াচড়া করতে থাকে অন্য কিছু। ছায়ার মতো। ছায়ার দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ছায়ার মতো... মনে পড়ে যায় পপুলার সিনেমার গান গাইতে গাইতে সাইকেলের সামনে আমায় বসিয়ে ছেলেটি পার করে দিত গলির পর গলি। মনে পড়ে যায় বৃক্ষরোপণের চেনা শ্লোগান বিড়বিড়িয়ে ফাঁকা বোতলে বাবার ফুলগাছের চারা পোঁতার কথা। কখনও হাসি পায় কাঠের বল নিয়ে জ্যাঠার বুকনির কথা মনে করে… আমি আর মা বসে থাকি। একটি অপরিচ্ছন্ন দুর্গন্ধময় মনোটনাস বারান্দায় বসে থাকি কখনও আমি একা, কখনও বা আমরা দুজন। বসে থাকি আমরা। চুপচাপ। যে যার মতো। গেট খোলার শব্দ হলে মা উঠে যায়। যে ছেলেটির জন্য মা উঠে যায়, তার সঙ্গে পরিচয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে লাভ নেই। আর পাঁচটা প্রেমের মতোই তা একসময় গিয়ে ক্লান্তিকর। শুধু কয়েকটি কথা বলে রাখা যাক।

এক) ওর তাকানোটা ছিল অদ্ভুত। আমি প্রেমে পড়েছিলাম সেই তাকানোরই। ও আমার দিকে তাকাত। আমি ওর তাকানোর দিকে তাকাতাম। খানিকক্ষণ ওইদিকে তাকিয়ে থাকার পর মনে হত আমি শুয়ে রয়েছি ল্যাবের টেবিলে। সেই ছেলেটি টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার শরীরের চামড়া কেটে মাংসের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তার গায়ে লেগে থাকা ফাইবারে আঙুল বুলোচ্ছে। পিয়ানোর মতো কিলবিল করে তখন বেজে উঠছে ফাইবারগুলো। আর আমি, উচ্চমাধ্যমিক ইস্কুলে সদ্য ঢোকা এক বায়োলজির টিচারথেকে ধীরে ধীরে হয়ে উঠছি বিটোভেনের সুর।

দুই) ছেলেটি ভীষণ চুমু খেত আমায়। একটা ছোট ডিমের মতো সুখ আমার নাভির কাছাকাছি এসে ঘুমিয়ে পড়ত। উন্মাদের মতো চুমু খেয়ে যেত আমার গলা থেকে বুক পর্যন্ত টানা পোড়া জায়গাটায়। সিটি গোল্ডের একখানা চেন দিয়েছিল আমায়। পোড়া জায়গাটাকে তাতে নাকি আগুনের মতো সুন্দর লাগবে...

তিন) বছর পাঁচেকের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল, তোর শরীরে এই পোড়া জিনিসটা দগদগ না করলে তোকে হয়তো এক মুহুর্তও ভালবাসতে পারতাম না…
………………………………………………..
আর্থারাইটিস আছে মায়ের কোমরে। জেল, ওষুধ, আলট্রা-সাউন্ড থেরাপি… ফিজিওথেরাপি করতে করতেই হাসে ওরা দুজন। বারান্দা থেকে নিজের ঘরে চলে আসি আমি। অন্ধকারে বেগম আখতার বাজে- ফিরায়ে দিয়ো না মোরে শূন্য হাতে…অবহেলা নয় প্রিয়, চাহো যদি ব্যথা দিয়ো। গানের মাঝখানে সেতারের অল্প একটু জোড়ের কাজ আছে। অল্প একটু ঝুঁকে পড়ে তিলককামোদ। তার মধ্যে দিয়েই হাসির শব্দ থেমে থেমে আসে। বুকের মধ্যে কতগুলো ট্র্যাফিক সিগনাল থাকে, তা জানা নেই।
গানের ভিতর থেকে ফিনকি দিয়ে ওঠা হাসির এক এক টানে সেসব ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় শব্দহীন… রাত যায়। এক-একটি রাত চলে যায়।

বারান্দায় রাখা ফুলগাছগুলো বাবার মৃত্যুর এতদিন বাদেও সরানো হয়নি। বাবারমৃত্যুর পর জ্যাঠা সেগুলোর দিকে নজর দিয়েছিল। জ্যাঠার মৃত্যুর পর ঘরের ভিতরের বোতলগুলো সরিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হলেও বারান্দারগুলো সরানো হয়নি। মরে যাওয়া ফুলগুলোর উপর ফড়িং এসে বসে মাঝেমাঝে ।




একটু পাস্তা করব? মা'কে প্রশ্ন করলাম আমি।

না। মা বলল।

তাহলে?

কিছু লাগবে না।

আচ্ছা।

তারপর দুজনে বসে রইলাম চুপ করে। বিকেল শেষ হয়ে যাচ্ছে ধীরে। অনেক ছোট হয়ে আকাশটা নেমে এসেছে মাথার কাছে। প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর লেজ হয়ে ঝুলছিল একটি মেঘ। তার নিষ্প্রাণতার উপর দিয়ে চিল উড়ে যাচ্ছিল। ডানায় লুকনো রঙের সওগাত ...কাল পঁচিশে বৈশাখ। আমি আর মা প্রায় রোজকার মতোই বারান্দায় বসেছিলাম। একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে সবটা। কী মনে হওয়ায়, কী যেন মনে হওয়ায় নিজে থেকেই পাস্তা খাওয়ার প্রশ্ন করে ফেললাম।

কাল তো পঁচিশে বৈশাখ? মা জিজ্ঞাসা করল।

হ্যাঁ।

গান চালাব? শুনবে? মার গলাটা নরম ছানার মতো লাগছিল।

না।

কাল কিছু করবে?

কী?

ওই, যেমন অনুষ্ঠান করে লোকে, রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে...

না। কোনওদিন তো হয়নি আমাদের বাড়িতে এ সব। কে-ই বা করবে?

ও। আচ্ছা... মা এতক্ষণ আমার দিকে চেয়েছিল। এবার গেটের দিকে চাইল। অন্ধকার
নেমে আসছে সেখানে।

উঠোনটা কী প্রচণ্ড ময়লা আমাদের… মা নিজের মনে বলল।

দেখেছি।

কিন্তু, ভাবোনি। আমার কথার পিঠেই কথা বলল মা।

আমি চুপ করে রইলাম।

বাড়িটা কিন্তু আমরা পরিষ্কার করে রাখতেই পারতাম, তাই না? মা প্রশ্ন করে।

পারতাম। আচ্ছা, একটা প্রশ্ন করব তোমায়?

না।

ঠিক আছে।

তার আগে আমি তোমায় একটা প্রশ্ন করি?

করো।

তুমি জানো, আমি কেন সন্তান চাইনি?
তোমাকে চাইনি?

প্রশ্নটা শুনে ঘাবড়ে গেলাম আমি। যথাসম্ভব শান্তভাবে বললাম, না!

শুনবে?

না। একইরকম শান্তভাবে বললাম।

আমি জানি, তোমার সঙ্গে ওর সম্পর্কের কথা। আমি কিন্তু প্রথমে রাজি হইনি। তারপর যে কী হল...
ফাঁকা সিরিঞ্জ দিয়ে মায়ের গলায় বাতাস ভরে দিচ্ছিল যেন কেউ।

আচ্ছা।

সেই গল্পটা জান? প্রতি পূর্ণিমায় রাক্ষস খেতে আসত বাড়ির এক সদস্যকে? কোনওভাবেই আটকানো যেত না...

ওটা তুমিই পড়ে শুনিয়েছিলে। ছোটবেলায়।

ঠিক। অনেকদিন বাদে এভাবে কথা বলছি আমরা...

হুম।

পূর্ণিমার গল্পটার কথা বললাম কেন জান?

কেন?

কাল যদি তোমার বাবা আর জ্যাঠার মতো আমিও হারিয়ে যাই?

প্রশ্নটা শুনে অবাক হলাম। এত নাটকীয়তা তো মায়ের ধাত নয়। আবার চুপ করে রইলাম নাটকীয়তাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনও মানে নেই।

বাইরেটা গুমোট হয়ে গেছে। একটু হাওয়া দিলে... মা থামল।

একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? বলবে?

কী কথা?

তোমার পিঠের পোড়া দাগটা আছে এখনও?

আছে।

ও কোনওদিন চুমু খেয়েছে ওখানে?


কেউ কোনও কথা বলে না তারপর । নৈঃশব্দের ভিতর দিয়ে রাত্রি গাঢ় হল ।

অন্ধকারের অন্তিম মুহূর্ত
:

পিস্তলসম ঠাণ্ডা নির্জনতা। মফসসলের একতলা বাড়িটির সামনের ইলেকট্রিক তারের উপর প্যাঁচাটি বসে নেই আর। বারান্দাটিতে বসে আছে সিটি গোল্ডের চেন পরা মানুষটি। বাড়ির কাছের খোলা প্রান্তর থেকে হাওয়া আসছিল। বুড়ো মালগাড়ি তার ঘরে ফিরছিল একইরকমভাবে কাশতে কাশতে। গোটা পৃথিবীতে আলো বলতে বারান্দার পঞ্চাশ ওয়াটের বালবটুকু। সেই আলোতেই দেখা গেল বাড়ির উঠোনটাকে। ভীষণ ময়লা, সাদা রঙের...










1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ লেখা। শব্দের মাঝে যে নৈশব্দ থাকে তাকে কী করে বাইরে টেনে আনা যায়, কী ভাবে তার হাহাকার আর বিষকে আর্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, এই লেখা তার উদাহরণ হয়ে থাকবে।

    উত্তরমুছুন