বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প : সই

দুপুরে বাসায় শুইয়া আছি, এমন সময় উচ্ছলিত খুশী ও প্রচার তরল হাস্য-মিশ্রিত তরুণ কন্ঠস্বরে শুনিতে পাইলাম; ও সই, সই লো-ও-ও, ক্যামন আছ, ও সই?

পাশের ঘর হইতে আমার ভগ্নি(বিধবা, বয়স ত্ৰিশের বেশী)হাসির সুরেই বলিল, এস সই এস। বস, কি ভাগ্যি যে এ পথে এলে?


–এই তোমার সয়া হাট কত্তি এল। নতুন গুড়ের পাটালি সের দুই করেলো আজ বেন বেলা। ছোট ছেলেডার আবার জ্বর আর ছর্দি। তাই তোমার সয়াকে হাটে পাঠালাম, আমি বলি সইয়ের সঙ্গে কতদিন দেখা হয় নি। ছেলেডাকে নিয়ে আর হাটের ভিড়ের মধ্যে কনে যাব, সইয়ের বাড়ি একটু বসি।

কথার ভঙ্গিতে মনে হইল দুলে কি বাগদীদের মেয়ে। আমার বোনের সহিত সই পাতানো তাহার পক্ষে আশ্চর্য নয়, কারণ তাহারও শ্বশুরবাড়ী নিকটবতী এক পল্লীগ্রামেই। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার সুবিধার জন্য শহরের বাসায় থাকে।

দুপুরের ঘুম নষ্ট হইল। বোনের নবাগত সঙ্গীটি লেখাপড়া ভাল করিয়া শিখিলে এ্যানি বেসান্ট হইতে পারত। মুখের তাহার বিরাম নাই। অনবরত বকিয়া যাইতেছে এবং কথার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে ছেদস্বরুপ বলিতেছে, সই একটা পান দেবা? দোক্তা খাও না? তা দাও একটা এমনি পানই দাও। ও হাবলা, এই তোর সেই সই-মা চিনতে পেরিলি, হারে বোকা ছোঁড়া? গড় করলি নি যে সই-মাকে? নে পায়ের ধুলো আর নিতি হবে না, এমনি গড় কর।

পান খাইয়া সে আবার শুরু করিল, ঘরের কত ভাড়া দাও, হ্যাঁ সই? তের টাকা? ও মা, কনে যাব। তা কি দরকার তোমার শহরে এত টাকা খরচ করে থাকবার, হ্যাঁ সই?

দিব্যি তোমার ঘরডা-বাড়ীড়া রয়েচে গেরমে। আম কাঁঠাল গাছগুলো দেখা-অবানে নষ্ট হয়ে যাবে। ন্যাও সই, মেয়ে যেন তোমায় চাকরি করে নিয়ে খাওয়ালে লেখাপড়া শিখে, হি—হি—হি—হি—বলিয়া সে হাসিয়া লুটাইয়া পড়ে আর কি!

আমার শোবার ঘরের বাহিরের রোয়াকে তাহার হাসি ও বক্তৃতা চলিতেছে, তা-ও এমন উচ্চকণ্ঠে যে, কলকাতা শহরে হইলে ফুটপাতে ভিড় জমিয়া যাইত। আমি একে কাল রাত্রে মশার উপদ্রবে তেমন ঘুমোইতে পারি নাই, এমন বিপদও আসিয়া জোটে, আর জুটিল ঠিক কিনা দুপুর বেলাতেই। ছোট বাসা, অন্য কোন ঘরও নাই যে সেখানে গিয়া ঘুমাই।

–ও সই ছেলেডাকে একটা জল দাও দিকিন, অনেকক্ষণ থে খাবে বলচে। তা ওর আবার লজ্জা দেখলে হয়ে আসে! জল চাবি তোর সই-মার কাছে, তার আবার লজ্জা দেখ না ছেলের?

আমার বোন জল আনিতে ঘরের মধ্যে ঢুকিলে তাহার ছেলেকে আশ্বাসের সুরে বলিতে শুনিলাম—তোর সই-মা কি তোরে এমনি জল দেবে? কিছু খ্যাতি দেবে অখন দেখিস। দেখি? পেটটা পড়ে রয়েচে, অ মোর বাপ, সেই সকালে দুটা পান্তা খেয়োলো, আহা। পাটালি হাটে বিক্রি হলি চাল কিনে নে যাব, এ-বেলা ভাত রাঁধব অখন। এখন তোমার সই-মা যা খাতি দ্যায়, তাই খেয়ে থাক। পয়সা নেই যে, মানিক।

এই সময় আমার বোন জল এবং বোধ হয় বাটিতে একটু গুড় লইয়া রোয়াকে গিয়া উপস্থিত হইল—কারণ শুনিলাম সে ছেলেটিকে বলিতেছে—নে, হাবলা, হাত পাত, গুড়টা খেয়ে জল খা। শুধু জল খেতে নেই।

হাবলা ও হাবলার মা যে একটু নিরাশ হইয়াছে, ইহা আমি তাহাদের গলার সুর হইতেই অনুমান করিলাম। হাবলার মা নিরৎসাহভাবে বলিল, নে, গুড়টুকু হাতে নে। খেয়ে ফেল। যেন রোয়াকে না পড়ে—

–ঠিক দুপুরের পরই সময়টা, এখন যে কিছু খাইতে দেওয়া প্রয়োজন, এ-কথা আমার বোনের মাথায় আসে নাই বুঝিলাম। তা ছাড়া পল্লীগ্রামে এ-রকম নিয়মও নাই।

–ভালো কথা সই, তোমার জন্য ভালো নঙ্কার বীজ এনেলাম। এই মোর আচিলে বাঁধা ছেলো, তা রাস্তার মাঝখানে কোথায় পড়ে গিয়েচে। বাসায় জায়গা আছে গাছপালা দেবার? আসচে হাটবার আবার নিয়ে আসব।

এই সময়ে আমার ছোট ভাগ্নে স্কুল হইতে ফিরিল। টিফিনের ছুটি হইয়াছে, সে সকালে খাইয়া যাইতে পারে নাই বলিয়া ভাত খাইতে আসিয়াছে।

–ও টুলু, চিনতে পার তোমার সই-মারে? হি হি, ও মা ছেলে এরি মধ্যে কত বড় হয়ে গিয়েচে মাথায়। গায়ে এটা কি, জামা? বেশ জামাটা।

আমার ভাগিনেয় এই বয়সেই একটু চালবাজ। গ্রাম হইতে আগত এই সই-মাকে দেখিয়া সে যে খুব খুশি হইয়া উঠিয়াছে, এমন কোন লক্ষণ তাহার ব্যবহারে প্রকাশ পাইল না। তাহার সই-মা বলিল, বেশ জামাটা টুলুর গায়ে। টুলুর আর কোন ছোড়াকাটা জামা-টামা নেই? হ্যাঁ সই? ছেলেডা এই শীতে আদুড় গায়ে থাকে। তোমার সয়া এবার অসুখে পড়ে গাছ কাটতে পারে নি। মোটে দশটা গাছে যা রস হয় তাই জাল দিয়ে সের আড়াই পাটালি হয়। হাটরা হাটে পাটালির দর নেই, তার ওপর ছ’পয়সা সের। ওই থেকে চাল ডাল, ওই থেকে সব। গাছের আবার খাজনা আছে। ছেলেডাকে একখানা দোলাই কিনে দেব ভাবচি আজ তিন হাটে, কোথা থেকে দেই বল দিকিন সই? কি রে— কি? হুঁউউ? ছেলের আবার আবদার দেখ না?

আমার বোন বলিল, কি বলচে হাবুল?

–ওর কথা বাদ দাও সই। রাস্তা দিয়ে ওই যে মিন্সে চিনির কি বলে ওগুলো—

হাবুল বলিল—গোলাপছড়ি।

–তা যে ছড়িই হোক, ওই ওঁকে কিনে দিতে হবে। না, ও খায় না। কি ছড়ি: গোলাপছড়ি? হি হি, নাম দেখ না? –গোলাপছড়ি।

আমার ভাগ্নের দৃষ্টিও বোধ হয় ইতিমধ্যে গোলাপছড়ির দিকে পড়িয়াছিল। সে ছুটিয়া গিয়া ফিরিওয়ালাকে ডাকিয়া আনিল ও আমায় সটান আসিয়া বলিল–গোলাপছড়ি কিনব, মামা। পয়সা দাও।

বোধ হইল হাবুলেও কিছু ভাগ পাইয়াছে, কারণ একটু পরেই হাবুলের মায়ের খুশিভরা গলার সুর শুনিতে পাইলাম-নাও, হ’ল তো? কেমন, বেশ মিষ্টি? খাও। পাটালির চেয়ে কি বেশি মিষ্টি? দেখি দে তো একটু গালে দিয়ে? কি জানি, এ-সব কখনও দেখিও নি চক্ষে।

একটু পরে টুলুকে ভাত দিতে তাহার মা রান্নাঘরে চলিয়া গেল। সেই সময়ে শুনিলাম, হাবুল নাকিসুরে বলিতেছে, না, মা, হ:আর তোমারে দেব না। আমি তবে কি খাব?

হাবুলের মা তাহার সইকে আর পাইল না, কারণ ছেলেকে খাওয়াইয়া স্কুলে পাঠাইয়া দিয়া নিজের ঘরের মধ্যে বিছানায় শুইয়া পড়িয়াছে। অনুপস্থিত সইয়ের উদ্দেশ্যে হাবুলের মা আপন মনে অনেক গল্প করিয়া গেল। খানিক পরে শুনিলাম বলিতেছে-ওই, সই কনে গেলে? ঘুমুলে না কি? মোরে আর একটা পান দেবা না?

কেহ তাহার কথার উত্তর দিল না।

বেলা তিনটা বাজিয়াছে। আমি বেড়াইতে বাহির হইতে গিয়া দেখি অতি মলিন শাড়ি পরনে এক বাইশ তেইশ বছরের কালো-কোলো মেয়ে একটা চুপড়ি পাশে রাখিয়া ঠিক পৈঠার কাছে বসিয়া আছে। তার ছেলেটিও কাছে বসিয়া তখনও গোলাপছড়ি চুষিতেছে। আমাকে দেখিয়া মেয়েটি থতমত খাইয়া মাথায় ঘোমটা তুলিয়া দিল। দুপুরের বিশ্রামের ব্যাঘাত হওয়ায় মনটা বিরক্ত ছিল, একটু রুক্ষ সুরেই বলিলাম–একটু সরে বস পথ থেকে। চাপড়িটা রাস্তার ওপর কেন?

মেয়েটি ভয়ে ও সংকোচে জড়সড় অবস্থায় চাপড়ি সরাইয়া এক পাশে রাখিয়া নিজে যেন একেবারে মাটির সহিত মিশিয়া গেল।



সন্ধ্যার কিছু আগে উকিলদের ক্লাবে টেনিস খেলিয়া বাসায় ফিরিতেছি, দেখি বাসার পাশে বড় রাস্তার ধারে তুঁততলার শুকনো পাতার উপর আমার বোনের সই তাহার ছেলেটিকে লইয়া রসিয়া আছে। পাশে সেই চাপড়ি ও একটা ছোট ময়লা কাপড়। সন্ধ্যা হইবার দেরি নাই, তুঁতগাছের মগডালেও আর রোদ দেখা যায় না। হাবুলের বাপ এখনও পাটালি বিক্ৰী করিয়া হাট হইতে ফিরে নাই। মেয়েটি যেন কেমন ভরসা-হারা নিরাশ মুখে বসিয়া আছে, অন্ততঃ তেমন হাসিখুশির ভাব আর দেখিলাম না।

1 টি মন্তব্য: