বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

ঈশা দেবপাল'এর গল্প : সরীসৃপের সঙ্গে কিছুক্ষণ

রিক্স থেকে নামবার সময়ই ছেলেটা কে দেখতে পেল কুয়াশা। তাদের এয়াপার্টমেন্টটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটার চাহনি মোটেই সুবিধের লাগেনা কুয়াশার। একটা চোখ খারাপ। পাথরের চোখের মতো চকচক করে। মুখটার মধ্যেও একটা অদ্ভুত শয়তানি কাজ করে যেন। কুয়াশা যতটা সম্ভব কাঠিন্য ফুটিয়ে তোলে নিজের মুখে। তারপর দ্রুত গেট ঠেলে ঢুকে পড়ে।

আজকাল বড্ড অন্যরকম লাগে তার পাড়াটাকে। জায়গাটায় যেন কিসের ছায়া পড়েছে বলে মনে হয়। কেমন যেন অকারণ থমথমে লাগে। অথচ চিরকালই এ জায়গাটা শান্ত। প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেল সে কিনেছে এই ফ্ল্যাটটা। একাই আছে। রাজনৈতিক অদল বদলও তো হলো। তাতেও তেমন কোনও পরিবর্তন তো হয়নি। কিন্তু আজকাল যেন বিপুল বদলে গেছে সবকিছু। পাড়ায় একটা লোক ইস্ত্রির দোকান খুলেছে নতুন। লোকটাকে দেখলে কেমন মাথা থেকে পা অব্দি জ্বলে যায় কুয়াশার। এরা জুটছে কোথা থেকে সবাই? ছোট্ট গ্রসারি শপটার সামনে একগাদা লোক আড্ডা দেয়, কেমন যেন নিচু গলায়। লোকগুলোকে ভাল লাগেনা কুয়াশার। সে কি আজকাল একটু সিনিক হয়ে পড়ছে, না কি ভীতু? সে-ই কি সবকিছুকে অপছন্দ করতে শুরু করেছে? সব কিছু হয়ত আগের মতই আছে। নিজেকে নিয়েই সে কেমন একটা সন্দিহান হয়ে বাড়ি এসে পৌঁছল।

তাদের এপ্যার্টমেন্টটার নাম “ আনন্দ”। তাদের কোনও কেয়ারটেকার নেই। নিজেদের কেয়ারেই থাকতে হয় আরকি। এই নিয়ে সে অনেকবার অবজেকশন দিয়েছে সেক্রেটারির কাছে। আজকে কিন্তু তার নিশ্চিন্ত লাগল। ঐ লোকটার মতই কেউ একটা জুটত, তারপর মুম্বই এ যে ঘটনাটা ঘটে গেল, তেমন কিছুই হতো হয়ত। একটা মেয়েকে ধর্ষণ বা খুন কিছুই নয় এই সব লোকেদের কাছে।
ডবল লক খুলে চাবি ঘোরাতেই চিচিং ফাঁকের মত যখন তার দরজাটা খুলে গেল, তখন সে যেন দুম করে কেমন ভয় পেয়ে গেল। প্রথমেই সে যেন দেখল মুখোমুখি দেওয়ালে তার দিকে পাথরের চোখে তাকিয়ে আছে একটা ডাইনোসর। তার সাড়ে ছয়শ স্কোয়ার ফিট এর ফ্ল্যাট টা কেমন যেন অচেনা ঠেকল তার নিজের ই কাছে। কারণটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সে বুঝল। গোটা ঘরে কেমন যেন একটা অচেনা গন্ধ। কেমন যেন একটা পুরুষ মানুষের গন্ধ। প্রায় গুটি গুটি পা করে সে এসে দাঁড়াল । সে ছাড়া এই ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় প্রাণী থাকেনা। সকালে প্রতিদিনের মত আজ ও সে নিজের হাতে দরজা বন্ধ করে গেছে। তার কোনও আলাদা করে বারান্দা নেই। তাই অন্য কারোর আসা প্রায় অসম্ভব ই। সে দরজাটা খলা রেখেই পা টিপে টিপে সারা ঘর ঘুরল। তখন তার নিজের কাছেই লজ্জা লাগল একটু। এই তো একটা একরত্তি বাড়ি। মাটিতে বড় করে বিছানা, একটা লম্বা ওয়ারডোর্ব, বাইরে বেতের সোফা টেবিল—এই তো আসবাব। তার মধ্যে কোন ও মানুষ লুকোবেই বা কি করে, যদি আবার ধরে নেওয়া যায় বন্ধ ফ্ল্যাটে তার পোষা দু একটা টিকটিকির মত কেউ বুঝিবা প্রবেশ করেছে। সে দেখল দেওয়ালে সবুজ চোখের টিকটিকি টা তখন ও তার দিকে তাকিয়ে আছে স্থির ভাবে।

বাইরের দরজা বন্ধ করে বাথরুমে স্নান করার সময় তার বেশ হাসি পেল। সে নিজেই আসলে ধরা পড়ে গেছে নিজের কাছে। সে ভয় পেয়েছে। পাঁচ বছর ধরে একা আছে সে, একা থাকার রীতি নিয়ম সে জানে। তার সুবিধে অসুবিধেগুলো সে ব্যবহার এবং অতিক্রম করতে পারে। তবু সে ভয় পেয়েছে। মুম্বই এ ঘটে যাওয়া যে ঘটনাটা নিয়ে গোটা দেশ তোলপাড় সেটা আর ও অনেকের মত তাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে আসলে। মেয়েটা কোন ও দিন তার কেয়ারটেকার কে বকাবকি করেছিল। ছেলেটার গ্রাম্য মেইল ইগো তে লেগে গিয়েছিল আধুনিক পোশাক আসাক পরা, স্বাধীনচেতা, লিভ ইন করা একটা মেয়ে তার ওপর বসিং করছে দেখে। তাই নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিয়েছে সে এসবের। তাই যেদিন একা ছিল মেয়েটা সেদিন তাকে ধর্ষণ ই শুধু নয়, কুপিয়ে খুন করেছে তাকে। কত সামান্য কারণে বা অকারণেই হয়ত মেয়েরা লালসার শিকার হয়ে ওঠে! ঐ ঘটনাটাই তার অবচেতনে সম্ভবত বেশ জায়গা করে নিয়েছে।

স্নান করে সে একটা বড় করে কাঁচের কাপে কফি নিয়ে তার মাটিতে পাতা সুন্দর গদিওলা বিছানাটায় আধশোয়া হয়। ফোনে নেট অন করে। তার শাক্যকে জানাতে ইচ্ছে করে এই তার অকারণ ভয় এবং এই ভয় থেকে বেরিয়ে আসাটা ও। কিন্তু সে কোন ও মেসেজ পাঠায়না। শাক্য বাড়ি পৌঁছে গেলে একটা অলিখিত বারণ থাকে কথা না বলার। যদি ও শাক্য প্রায় প্রতিদিন নিয়ম করে বউ তুলিকার নিন্দে করে, এমনভাবে ই বলে যেন ভেঙে ই গেল বিয়ে, বা নেহাত দয়া করে সঙ্গে আছে ও। তবু বাড়ি ফিরে বা ছুটির দিন শাক্যকে পুরো ধরাছোঁয়ার বাইরে হিসেবে যখন টের পায় কুয়াশা, তখন বোঝে সে নেহাত ই বাইরের লোক। শাক্যর সঙ্গে সম্পর্কটায় সে শুধুই হাতড়ে বেড়াচ্ছে হয়ত। প্রায় ই তার অভিমান জন্মায়......সেগুলো জমতে জমতে পাহাড় হয়। তারপর সপ্তাহান্তে শাক্যর বলিষ্ঠ শরীরের চাপে সেই বরফের পাহাড় গলে জল হতে থাকে। সে শাক্যকে হোয়াটসআয়াপে একটা সাদামাটা মেসেজ করে। সে অবশ্য জানে, এই মেসেজ সীন হলেও উত্তর দেবেনা শাক্য। দেবে কাল অফিসে ঢুকে। আজ অব্দি একবিন্দু এলোমেলো হতে দেখেনি সে শাক্যকে। সে যেন কুয়াশার ব্যাপারে সমস্ত রেজোলিউশন আগেই নিয়ে রেখেছে। ঠিক কী কী করবে আর কী ই বা করবেনা। তাই বহুদিন কুয়াশা র প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শাক্য কোন ও দিন রাত কাটায়নি তার ফ্ল্যাটে। একেক সময় কুয়াশা ভাবত, এ সমস্ত ই বুঝি শাক্যর কুয়াশার সামাজিক কোন ও অসুবিধে ভেবেই করা। এখন মনে হয়, বোধহয় এগুলো শাক্যর নিজের বেশি যুক্ত হয়ে যাবার সাবধানতাই।

মা মারা যাবার পরই সে ফ্ল্যাট টা কিনেছিল। বাবা-দাদা-বউদি সবাইকে জানিয়েই। সে বাবা কে তার নিজের কাছে নিয়ে আসতেই চেয়েছিল। কিন্তু বাবা দাদার সংসারে ভাল ই মানিয়ে আছে। নিজেই আসতে চায়নি। কুয়াশার একা থাকা নিয়ে প্রথমে অনেক আপত্তি থাকলে ও এখন সবাই ই মেনে নিয়েছে। ফ্রাইডে তে প্রায় ই অফিস ফেরত সে বাড়ি যায়.........গল্প করে, খায় দায়। শাক্যর কথা ও আভাসে ইঙ্গিতে শোনে বাড়ির লোকেরা। জানে সে বিবাহিত একজন পুরুষ সে কথা ও। তবু তারা তাকে কুয়াশার একজন ভাল বন্ধু হিসেবেই চেনে। কিন্তু আজ অব্দি এইসব বিষয় নিয়ে কোনরকম অস্বস্তিকর প্রশ্ন তাকে কেউ করেনি। তার বাবা চিরকাল ই অত্যন্ত আধুনিক মন নিয়ে বড় করেছেন তাকে, সে ও নিজে পড়শোনা, চাকরি এ সমস্ত কিছু দিয়েই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। বাবা, দাদা চিরকাল ই তার বিবেচনা বা বুদ্ধির ওপর গুরূত্ব দিয়েছে। কুয়াশা ও খুব আয়োজন করে কিছু আড়াল করা পছন্দ ই করেনা। সে তার অন্য বন্ধুদের মতই শাক্য কে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে নিজের জীবনের চারপাশে। কিন্তু শাক্য কি তাই চেয়েছে ? সে বুঝতে পারেনা, শুধু ঘনিষ্ঠ অবস্থাতে যখন শাক্য তার বউ এর বিরুদ্ধে জমে থাকা সব অভিযোগ উগরে দেয়, তখন সে বিশ্বাস করতে ভালবাসে, অসুস্থ কে সেবা করার মহান ভূমিকায় সে বিরাজ করছে। শাক্যর তাকে প্রইয়োজন। এই ফিলিং টাই তাকে দুর্বল করে রেখেছে। শাক্যর কথা ভাবতে ভাবতে কোন ও মেসেজ না করেই প্রায় ঘুমিয়ে পড়ে কুয়াশা। একটা না পাঠানো বার্তা , অনেকগুলো না বলা কথা নিঃসঙ্গতার মত শুধু ঘিরে রাখে তাকে। আর ঘুমিয়ে যাবার মুহূর্তে সে দেখে তার শোবার ঘরের দেওয়ালে হেঁটে বেড়াচ্ছে সেই ডাইনোসরটা। তার সবুজ চোখের আলো ঘুমের মধ্যে ও আতঙ্কিত করে রাখে তাকে।


দুই

মধুদি হাহা করে হাসছে। এরকম ই হাসে অবশ্য। মধুদির পরনে রোজকার মতই টকটকে লাল লিপস্টিক, কপালে বড় টিপ, উজ্জ্বল শাড়ি আর তার সঙ্গে মধুদির গায়ের টকটকে রং , সব মিলিয়েই একটা উজ্জ্বল আবেদন আছে। মধুদির উপস্থিতি টাই এরকম। জোরালো। কখনও কখনও দেখলে মন ভাল হয়ে যায়। কুয়াশা শুনেছে, অল্প বয়সে মধুদি যখন জয়েন করেছিল তাদের অফিসে তখন নাকি বেশ পাতলা ছিল। লম্বা বিনুনি করত। হাল্কা কাজল ছাড়া অন্য কোন ও প্রসাধন করতনা। অথচ তখন নাকি অফিসসুদ্ধু লোক মধুদির জন্য পাগল ছিল। পরে মধুদি নিজেই কেমন বদলে গেল। ডিভোর্স হয়ে যাবার পর মোটা হয়ে গেল খুব। সাজগোজ বাড়িয়ে তুলল। জোরে জোরে হাসে, শব্দ করে খায়, দুমদুম করে হাঁটে। কুয়াশার মনে হয়, মধুদি যেন কোথায় অস্বীকার করতে চায় এই চারপাশ। বিশেষত এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ টা কে। তাদের আর একজন সহকর্মী রিনি একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল---মধুদি , দিনদিন তুমি কেমন যেন ছেলে ছেলে হয়ে উঠছ, ...... মধুদি হা হা করে হেসে উঠে একটু ও গলা না নামিয়ে বলেছিল,---আরে, একদিন রাত কাটিয়ে দেখ তাহলে, কতটা ছেলে হ্যেছি.........রিনি, কুয়াশার সঙ্গে পার্থদা, দীপকরা ও হেসেছিল হো হো করে। এখন মধুদি হাসছে, কারণ শুভম নামে একটা নতুন ছেলে জয়েন করেছে অফিসে, সে অফিস ছুটির পর রোজ ই পর্ণা কে ফলো করছে। বাড়ি ফিরতে চাইছে একসঙ্গে। পর্ণা প্রাণপণ কাটাতে চাইছে.........পারছেনা। তাই মধুদি হাসছে আর পর্ণা কে টিপস দিচ্ছে , ঠিক কীভাবে কাটাতে পারে আর কি।

আজকে অফিসেই লাঞ্চে তারা খাবার অর্ডার করেছিল। প্রণ চাউমিন আর চিলি চিকেন সহযোগে মধুদির টিপস শুনে তারা হাহা করে সবাই হাসছে। ছেলেরা নাকি প্রাথমিক ভাবে মেয়েদের সঙ্গে ঠিক তিনবার শোয়ার কথা ভাবে, আর মেয়েরা সাতবার। ঐ হিসেবের কারণেই যত গন্ডগোল। তাই একটা ছেলেকে ঝোলানোর প্রথম ধাপ হচ্ছে, ঠিক দুবার শুয়ে তাকে ছেড়ে দিতে হবে। তাহলেই সে লাট খেতে থাকবে। পর্ণা হইহই করে ওঠে---- আর লাট খেতে হবেনা। এতেই আমি চটে লাল। একবার ও শুতে চাইনা ওরকম একটা গায়ে পড়া আকাটের সঙ্গে। পার্থদা হাসতে হাসতে বলে— তাহলে মোবাইলে মিথ্যে কথা বলা ই ভরসা। আমি তো কাউকে কাটাতে চাইলে তাকে দেখতে পেলেই ফোন নিয়ে বকবক করি একা একা। কিন্তু সেই ফোনটা ও মিথ্যেই করতে হয়, কারন যাকে ফোন করব, সে যদি আবার পিছনে পড়ে যায়, কি হবে ? .........

সবার হাসির মধ্যেই অন্যমনস্ক হয়ে যায় কুয়াশা। প্রন চাউমিনের মধ্যে সে একটা বিচ্ছিরি গন্ধ পায়। কেমন অদ্ভুত রসুন রসুন একটা গন্ধ। কোনও কারণ ছাড়াই সে নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে ওঠে। তার নিজেকে হঠাৎ বড্ড ক্লেদযুক্ত মনে হয়। মনে হতে থাকে তার মুখ ঘেমে গেছে, চোখ ক্লান্ত হয়ে প্রেছে.........এবং তাকে দেখতে লাগছে খুব খারাপ। সে খাবার ফেলে উঠে দাঁড়ায় আর সবাইকে আসছি বলে ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেকে নিরীক্ষণ করে মনযোগের সাহায্যে। তার নিজেকে বড্ড মোটা মনে হয়। তার চুল ভীষণ ই বিচ্ছিরি রকমের তেলতেলে মনে হয়। নিজের মেরুণ রঙের সালোয়ারটা বড্ড বেমানান লাগে। তার কানের দুলগুলো সে খুলে রাখে, আর চুলটাকে উঠিয়ে বাঁধে। তারপর ও কি যেন একটা মনখারাপে সে কাবু হয়ে থাকে। অন্যমনস্ক ভাবেই সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে। তখন ও মধুদি পার্থদারা হাসাহাসি করছে। পর্ণা অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে, বলে—খেলি না ? –নাঃ, সে অল্প হাসে আর স্বাভাবিক গলায় বলে – ভাল লাগছে না। জল খাব। টেবিলে রাখা সবুজ টাপারওয়ারের বোতল টা থেকে হাঁ করে জল খেতে যায় আর ভয়ে হিম হয়ে যায়। বোতলের ভেতর কিলবিল করছে একটা টিকটিকি। জলের ভেতর দিয়ে সোজাসুজি তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঠিক যেন ডাইনোসরের বাচ্ছা। এক্ষুনি গিলে ফেলবে তাকে। সে কখন চিৎকার করে উঠেছে বুঝতে পারেনা। শুধু টের পায়, হাত থেকে বোতল টা পড়ে জলে ভেসে যাচ্ছে টেবিল। সকলে ব্যস্ত আর উদগরীব হয়ে পরে তাকে নিয়ে। তার শুধু মনে হয়, এই প্রাণীটার মুখ তার খুব চেনা.........খুউব।


তিন


সন্ধ্যেবেলার মধ্যে একটা ম্যাজিক আছে। অল্প মনখারাপ মেশানো আনন্দের জাদু। খানিকটা ছোটবেলার গন্ধ ও মিশে থাকে তাতে। গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের রেলিং বেয়ে চুঁইয়ে পড়ছে শেষ বিকেলের আলো। সেই আলোর সঙ্গে নাগরিক বিকেলের রজনীগন্ধা, গোলাপফুল, পারফিউম, লিপস্টিক মিলে মিশে একাকার।

কুয়াশা রামকৃষ্ণ মিশনের রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে কেমন একটা জলছবির মত চারপাশটার রং বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে। সন্ধ্যা নামছে, না শিশিরের শব্দের মত নয়, বরং বেশ হই হই করে ই। আনন্দ আনন্দ সুরে আর খানিকটা চকচকে সেজে ও। অফিস থেকে আগে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে কুয়াশা। অন্য দিনের মত জিন্স টিশার্ট এ নয়, গোলাপী সালোয়ার, হাল্কা সোনার গয়না। সঙ্গে একটা সাদা লেদারের ব্যাগ ও। ব্যাগে একটা স্যান্ডুইচ বক্স ছিল, তার দুটো স্যান্ডুইচ ই খাওয়া হয়ে গেছে দুপুর বেলায়। এখন বেশ খিদে পেয়ে গেছে তার। এখন প্রায় পৌনে ছটা। পাঁচটার অল্প পর থেকে সে দাঁড়িয়ে আছে। শাক্যর আসার কথা। আজ তার খুব ইচ্ছে করছিল শাক্যর সঙ্গে একটা ঝরঝরে সন্ধ্যে কাটানোর। যার পরে সে বেরিয়ে আসতে পারবে এই কদিনের অকারণ দুশ্চিন্তা থেকে। তাই সে অপেক্ষা করে আছে, শাক্য আসলে তারা নির্ভার হয়ে একটা বিকেল হাঁটবে। ঢাকুরিয়া ব্রীজের যানজট তুচ্ছ করে তারা আকাশের গন্ধ নিয়ে পৌঁছে যাবে কোন ও মৃদু আলোর রেস্টুরেন্টে। সেই প্রথম প্রেমে পড়ার মত নতুন করে উপলব্ধি করবে, তারা আছে পরস্পরের পাশে। এই প্রায় দুবছর ধরে শাক্যর সঙ্গে সে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কিন্তু কুয়াশার মনে পড়েনা কবে তারা এলোমেলো দুপুর কাটিয়েছে। হেঁটে যাওয়া সন্ধ্যা কাটিয়েছে। কুয়াশার একা থাকা, তার নির্জন একটা ফ্ল্যাট তাদেরকে গৃহমুখী কিংবা শরীরমুখী সম্পর্কের আবর্তে ফেলে দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করেছে, এটাই দুটো মানুষের মনে পৌঁছনোর একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পথ।

শাক্য আসে প্রায় সোয়া ছটায়। কারোর সঙ্গে মৃদু গলায় মোবাইলে কথা বলতে বলতে। খুব শান্ত, রিল্যাক্সড মুডে হেঁটে আসে শাক্য। কুয়াশা এতক্ষণের একা দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট, বেশ জমে ওঠা ক্ষিদে,---এই কদিনের দুঃস্বপ্ন এই সব ভুলে সে মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে লাগল শাক্য আসছে তার জন্য—সান্ধ্য মায়া ছুঁয়ে যাচ্ছে শাক্যর লম্বা চেহারাটায়। হ্যালোজেনের আলো পিছলে যাচ্ছে শাক্যর একমাথা কালো চুলে—তার রাগ করতে ইচ্ছে করেনা শাক্যর ওপর, দেরি করে আসার জন্য। মনে মনে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকে সে শাক্য শুধু এসেছে বলেই। ফোনে কথা বলতে বলতেই তার দিকে তাকিয়ে হাসে শাক্য। সে হাসিতে অপরাধবোধ খোঁজে কুয়াশা। সেসবের বদলে একটা স্মার্টনেস আর স্যাটিসফেকশান দেখে শুধু। ফোনে কথা বলতে বলতেই শাক্য এগোয় তার পাশাপাশি। সে দু একটা হুঁ হাঁ ছাড়া আর কিছুই বোঝেনা। খানিকটা বেদনা নিয়েই সে পা মেলায়—তার ভয় করতে থাকে। মনে হয়, যেকোন ও মুহূর্তেই এই মায়াবী পৃথিবী থেকে সে ছিটকে যাবে। তাকে ঠেলে ফেলে দেবে পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া শাক্যর এই উদাসীনতা। ছোটবেলায় বাবার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে যেভাবে সে আঁকড়ে ধরত বাবার পাঞ্জাবি, সেভাবে তার ধরতে ইচ্ছে করে শাক্যর শার্টটা কে। কিন্তু ঠিক চিনতে পারেনা যেন পাশের মানুষটাকে।

রাস্তার শেষপ্রান্তে অটোস্ট্যান্ডের সামনে এসে এবার ঘুরে দাঁড়ায় শাক্য। ফোনে কাউকে বাই জানিয়ে ফোনটাকে পকেটে রাখে সে। তারপর তার দিকে তাকিয়ে সেই মনোরম হাসিটা হাসে সে। যে হাসিটা দেখে সে অনেককিছু ভুলে যায়। যে হাসিটা দেখে সে প্রেমের নতুন মানে বুঝতে চেয়েছে। শাক্যর এই হাসিটা দেখেই সে বিশ্বাস করেছিল, বিবাহিত, এক সন্তানের বাবা শাক্য আসলে একটা ভুল জীবন যাপন করছে, জাস্ট একটা সহনশীলতায় শাক্য ধরে রেখেছে এই দাম্পত্যটা। কুয়ায়াশার সঙ্গে পথ চললেই সংশোধন হবে সেই ভুলটার। শাক্য স্মার্ট আর মিষ্টি করে হেসে বলে—চল, ফাঁকা অটো আছে, তোমার বাড়িতেই গিয়ে অল্প বসি। আজ তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।

কুয়াশা কিছু বলবে ভাবে। ছায়াপথ হেঁটে যাওয়ার কথা। বলা হয়না। শাক্য ততক্ষণে উঠে গেছে একটা ফাঁকা অটোয়, দুর্বল গলায় বলে কুয়াশা—তাহলে কিছু খাবার নিয়ে নিলে হতনা ? বাড়িতে এখন কি যে আছে !

শাক্য তাকে আশ্বস্ত করে পরম বন্ধুর মত বললে—কী দরকার খাবার নেওয়ার ?? আমি তো অফিস থেকে এই টোস্ট আর কফি খেয়েই বেরোলাম। রাতে আবার বিয়েবাড়ি আছে...।

সে কিছু বলতে গিয়ে ও চুপ করে যায়। শাক্য তো তার কথা বলেনি। দুপুর দুটোয় টিফিন খেয়ে এক কাপ চা খেয়েছে সে। কিন্তু এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার ক্ষিদে পেয়ে গেছে বেশ। 
 
প্রায় একটা অভিমানী বালিকার মতই অবুঝ অভিমানটা লেগে রইল কুয়াশার শরীরে। অভ্যস্ত হাতে শাক্য যখন তাকে উদ্ঘাটন করছে তখন ও। আর আচমকা ই নিরাবরণ করার মুহূর্তে কান্না পেয়ে গেল তার। মনে হল, গোটা পৃথিবীর সামনে বেআব্রু হয়ে গেছে সে। এবার যেন সেই চরম, বিপজ্জনক ঘটনা টা ঘটবে। সে আপত্তি করতে শুরু করে। ভাবে এভাবেই ঠেকিয়ে রাখবে বিপদকে। আর শাক্য তার আপত্তিকে নেহাত ই লজ্জা ভাবে। পুরনো খেলায় নতুন আনন্দ সংযোজনে সে কুয়াশাকে গ্রহণ করে দ্রুত। আর শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত শরীরে মেনে নেয় কুয়াশা। ভাবে, এর নাম ই বুঝি সমর্পণ। এই নিবেদন দিয়েই হয়ত পৌঁছনো যায় রূপকথার জগতে, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে একটা তেপান্তরের মাঠ--- পক্ষীরাজের ঘোড়া এসে থামবে সেখানে।

প্রায় মৃতদেহের মত পড়ে রইল কুয়াশা। সে ভাবতে চেষ্টা করল, শাক্যর কাছে তার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তার পুরুষ বিহীন জীবন,--দামী সাবান-শ্যাম্পুতে সজ্জিত মহার্ঘ শরীর—এ জীবন যৌবনের মূল্য শাক্য তাকে দিতে চাইছে। এই আনন্দে তার ও পার্টিসিপেট করা উচিত। এতদিন তো সে তাই ই করেছিল। আজ ই যে কেন তার মন অন্য কথা বলেছে। সে নিজেকে বোঝায়।

আর ঠিক তখন ই , সুরলোকের ছন্দপতনের মত ঝট করে উঠে দাঁড়ায় শাক্য। অম্ল ঢেকুরের মত একটা বাহূল্য গন্ধে চমকে ওঠে কুয়াশা। সমস্ত খোলা শরীরটায় তার ঠান্ডা লাগতে থাকে দ্রুত। আর দেখে পরিতৃপ্ত মুখে নিজের সুঠাম চেহারাটাকে ঢাকছে শাক্য। হটাৎ তার ভয় করে ওঠে। শাক্যকে হারানোর ভয়। সে নিজেই শোনে, একটা ভীতু, দুর্বল গলায় সে বলছে—চলে যাবে ?

নেহাত পরিচিত মানুষের গলায় বলে ওঠে শাক্য—হ্যাঁ গো, বললাম না—বিয়েবাড়ি আছে। বউ আবার অর্ডার করেছে—মাথায় গোঁজার ফুল নিয়ে যেতে হবে।

কুয়াশা শুকনো বাসি ফুলের মতই হাসে। শাক্য রেডি হয়ে ডাইনিং এ বসে জুতো মোজা পরে। আর হাউসকোট টা টেনে নিয়ে কুয়াশা এগিয়ে আসে। শেষ চেষ্টা করে বাউলগানের সুরকে ধরার। -----চা খাবে না ?

লাফ দিয়ে উঠে পড়ে শাক্য, যেন পথ আটকে দাঁড়াতে পারে কুয়াশা। যেন দাবী করতে পারে বিগত অনেক দিনের হিসেব চেয়ে। যেন টলিয়ে দিতে পারে শাক্যর এই সুখী জীবনের নির্লিপ্ততা। চরম স্বার্থপর নিশ্চয়তা। শাক্য তাড়াতাড়ি করতে থাকে আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কুয়াশা। শাক্য চলে গেলে কোলাপসিবল গেট টা বন্ধ করে দেয় ধীরে ধীরে। ভাল করে। তারপর ফিরে আসে তার তেপান্তরের মাঠের মত শূন্য আর একাকী বিছানায়। তার খুব একলা লাগে। আধা অন্ধকার ঘরে সে আর একটি যে প্রাণী থাকে তার সঙ্গে তাকে ই খুঁজতে থাকে.........টিকটিকি টাকে দেখতে পায়না, বরং বিছানায় ই জোনাকির মত কি একটা জ্বলছে নিভছে দেখে এগিয়ে দেখে –শাক্যর মোবাইল। তাড়াহূড়োয় ফেলে গেছে শাক্য। কোন ও এক বার্তা এসে প্রবেশ করছে তাতে । হয়ত বউ এর ফুল কেনার আবদার আসছে নিঃশব্দে সেখানে।

তার ছোট্ট ফ্ল্যাট টা সচকিত করে কলিং বেল বাজছে। একবার, দুবার, তিনবার। কুয়াশা দেখছে আইহোল দিয়ে। সে। ঠিক সেই দুটো চোখ। ডাইনোসরের মত, বা গিরগিটির মত। নির্লিপ্ত অথচ তীব্র। শিকার কে কব্জা করতে মুহূর্তমাত্র লাগবে তার। সেই চোখ এখন তাকে খুঁজছে। শাক্যর নীল শার্ট টা পরনে। কিন্তু তাতে ও লোকটা কুয়াশা কে ভোলাতে পারবেনা। শাক্যর সেই মনোরম হাসিটা নেই মুখে। বদলে জিঘাংসা, ক্রোধ। হিসেবের বাইরে চলে যাচ্ছে তার এই দাঁড়িয়ে থাকা, অপেক্ষা করা। তাই রেগে উঠছে সে। কিন্তু কুয়াশা দরজা খুলবেনা। সে ক্লান্ত। সরীসৃপের সঙ্গে সে আর একমুহূর্ত ও কাটাতে চায়না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন