বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

আহমেদ খান হীরক'এর গল্প : ফেসবুকের আত্মা

'মৃত আত্মা'র ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে এতটুকু আশ্চর্য হই নি; ফেসবুক একাউন্টগুলোর এখন কত যে উদ্ভট নাম আছে তা গুনতে গেলে তারা গোনার মতোই ব্যর্থ শ্রম হবে। বরং, অন্য রিকোয়েস্টের বেলায় যা করি- 'মৃত আত্মা'র সাথেও তাই করলাম- সরাসরি তার প্রোফাইলে চলে গেলাম।

'মৃত আত্মা'র প্রোফাইল ছবিটা অস্পষ্ট- আলো-ছায়ায় ভরা; তবে তার কভার ফটোটা বেশ জমকালো। জমকালো মানে রোদ ঝলমলে। ঠা ঠা দুপুরে তোলা একটা কবরস্তানের ছবি। কবরস্তানটা বেশ বড়-সড়; উঁচু পাঁচিলের মাঝ বরাবর লোহার শিকের দরজা; দরজায় খয়েরি রঙ- দরজার ওপর স্থায়িভাবে কবরের দোয়া লেখা আছে।

বেশ, 'মৃত আত্মা'র এবাউটে হানা দেয়া যাক- বাহ্‌, কোনো তথ্যই নেই দেখছি। ফেক আইডির এক শেষ আর কি! নিজের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শুধু লিখেছে 'আমি মৃত। আত্মার কেনা-বেচা করি।'
তা তো বটেই, নইলে আর 'মৃত আত্মা' নাম কেন? মনে মনে হাসলাম যথেষ্ট। ভাবলাম রিকোয়েস্টটা ঝুলিয়ে রাখব- কিন্তু কী জানি মনে করে 'একসেপ্ট'ই করলাম। আমার ফেসবুক বন্ধুর মধ্যে একজন মৃত আত্মাও থাকুক!

ফেন্ড্র রিকোয়েস্ট একসেপ্টের পর 'মৃত আত্মা'কে প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। মাঝে মাঝে অনলাইনে থাকতো সে। চ্যাটবক্সে তার উপস্থিতি সবুজ বৃত্তের মধ্যে জানান দিত। তবে এসবই কিন্তু রাত বারটার পর। সকালে আমার অফিস, তাই ওই রাতে 'মৃত আত্মা'র তৎপরতা দেখার সময় আমার থাকতো না।

একদিন কী কারণে যেন গভীর রাতেও ঢুকেছি ফেসবুকে। হ্যাঁ, 'মৃত আত্মা' আছেই। মাত্রই নোটিফিকেশনে দেখলাম 'মৃত আত্মা' একটা ভিডিও আপলোড করেছে। নোটিফিকেশন অনুসরণ করে গেলাম ভিডিওর লিংকে। ভিডিওর শিরোনাম 'মৃত্যু'। বুঝলাম, 'মৃত আত্মা'র ভেতর ভালোমতোই মৃত্যু ঢুকেছে।

ভিডিওটা চালু হতে কিছুক্ষণ সময় লাগলো। পর্দা কাঁপলো অল্প সময়; তারপর হঠাৎ একটা ছবি এসে লহমায় মিলিয়েও গেল। অবশেষে স্ক্রিন শান্ত হলো- সাদা-কালো ছবি ফুটে উঠল। ফাঁকা ধু ধু প্রান্তর। বুক সমান উঁচু পাটখেত। পাট গাছগুলো অনড়। গাছগুলোর উপর দিয়ে ক্যামেরা আমাদের ছুটিয়ে নিয়ে গেল কিছুক্ষণ। তারপর একটা অতিকায় গাছ দেখতে পেলাম। গাছটার দুইটা ডাল অবিকল মানুষের দুটি হাত যেন; আর ওই দুটি ডালে গাঢ় লাল রঙের সাপের মতো লম্বাটে কাপড় ঝুলছে, হাওয়ায় অল্প দুলছে। হ্যাঁ, পুরো ভিডিও চিত্রটি সাদা-কালো হলেও কাপড়গুলো লাল, গাঢ় লাল। গাছের কালচে শরীর বেয়ে ক্যামেরা আমাদের নামিয়ে নেয়। দেখি, গাছের গোড়ায়- ছাইরঙা মোটা মোটা শিকড়ের উপর একজোড়া পা দাঁড়িয়ে আছে। পা বেয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ক্যামেরা উঠতে থাকে। উঠতে উঠতে একেবারে মাথায় যখন ক্যামেরা স্থির হয়- দেখি এ আমাদের কলিগ- ইয়াকুব ভাই।
ইয়াকুব ভাই ভ্রম্ন টানটান করে, চোখের মণি বাঁকিয়ে, গাছের চূড়ার দিকে বা লাল কাপড়গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখের, মুখের, গলার এখানে ওখানে ছোপ ছোপ অন্ধকার। শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দ হচ্ছে- মনে হচ্ছে সে বাতাস ল্যাপটপ পেরিয়ে এ পাড়ে চলে আসছে।

এ রকম একটা মুহূর্তে হঠাৎই ভিডিওটা শেষ। এর মানে কী? ইয়াকুব ভাই সহজ-সরল মানুষ- তিনিই বা এমন ভিডিওতে অংশগ্রহণ করলেন কেন?

পরদিন সকালেই ইয়াকুব ভাইকে ধরি। জিগ্যেস করি, এমন উদ্ভট ভিডিও চিত্রে আপনি কীভাবে?
ভিডিওর কথা শুনে ইয়াকুব ভাই আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়লেন। জানালেন এ রকম কিছুই তিনি করেন নি। আমিই নাকি ভুল দেখেছি।

সাথে সাথে ফেসবুক ওপেন করে চলে গেলাম 'মৃত আত্মা'র ওয়ালে। কিন্তু এ কী! ভিডিওটা নেই। নেই নেই নেই... ওয়ালের কোথাও নেই।

আফসোস হলো... গতরাতে ভিডিওটা যদি ডাউনলোড করে নিতাম তাহলে ইয়াকুব ভাইকে হাতে-নাতে ধরতে পারতাম। দেখে মনে হয় ভাজা মাছটা পাল্টিয়ে খেতে জানেন না... অথচ মিউজিক ভিডিও টাইপ ভিডিও চিত্রে ঠিকই মডেল হচ্ছেন, আবার ধরা পরে অস্বীকারও করছেন!

দুঃসংবাদটা এল দুইদিন পরে। ইয়াকুব ভাই মারা গেছেন। প্রতিদিনের মতোই লেগুনার সামনে বসে অফিস থেকে বাসায় ফিরছিলেন। বিপরীতমুখী বাস গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে লেগুনার উপর চেপে বসে। লেগুনার চালকের সাথে ইয়াকুব ভাইও অকুস্থলেই মারা যান।

ইয়াকুব ভাইয়ের গ্রামের বাড়ি যশোর। লাশ নিয়ে আমরা যশোর পৌঁছাই পরের দিন ভোরে। লাশের জানাজা হয় বাদ আসর। কবর দিয়ে কবরস্তান থেকে বেরিয়ে একটা কোণা বুঝে সিগারেট ধরাই। বুক ভরে টেনে ধোঁয়া ছাড়তে মুখ তুলতেই চোখ গেল কবরস্তানের পাঁচিলঘেরা দরজার দিকে। এতক্ষণ এখানে থাকলেও লাশ নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম- কবরস্তানটা ভালো করে দেখা হয় নি। এখন, দেখে, ধোঁয়া বুকের মধ্যেই গুমড়ে গেল- কাশি এল... এই কবরস্তান আমি আগেও দেখেছি... কোথায় দেখেছি মনে করে বুকের ভেতর রক্ত ছলকে গেল। হার্টের রিদম একবার মিস করল।

সেই উঁচু পাঁচিলঘেরা, লোহার শিকের দরজা, উপরে কবরের দোয়া লেখা- 'মৃত আত্মা'র কভার ফটোটা আসলে এই কবরস্তানেরই। মাথার মধ্যে শাঁ শাঁ করে ঝড় বইতে শুরু করল। এই ঝড় অনুভব করেছিলাম সেই ভিডিও চিত্রটি দেখার সময়। অসুস্থ বোধ করতে থাকলাম, মনে হচ্ছে বমি হবে। মুখের ভেতর টক স্বাদ নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। ল্যাপটপ চালু করে আক্ষরিক অর্থেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম 'মৃত আত্মা'র প্রোফাইলে। একটার পর একটা অপশন ক্লিক করে চলেছি- কী যে খুঁজছি জানি না!
না, কিছুই পেলাম না... কিছুই না... কিন্তু কী পাবো তাই জানি না। শেষে কাঁপা কাঁপা হাতে 'মৃত আত্মা'কে ইনবক্স করলাম। লিখলাম, কে আপনি?
সাথে সাথে, ম্যাজিকের মতো, ইনবক্স এল, আমি মৃত আত্মা।
লিখলাম, ফাজলামি রাখেন... আপনি ইয়াকুব ভাইকে কীভাবে চেনেন?
কোনো উত্তর নেই। আবার লিখলাম, আপনি ইয়াকুব ভাইকে চেনেন না?
কোনো উত্তর নেই।

দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও কোনো উত্তর না এলে জীবনে ব্যবহার করি নি এমন গালাগালি লিখে তার ইনবক্স উপচে ফেললাম। কিন্তু, তারপরেও, কোনো উত্তর এল না।


দিন সাতেক পর 'মৃত আত্মা'কে যখন ভুলতে বসেছি তখন দেখলাম একটা ভিডিওতে সে আমাকে ট্যাগ করেছে। দেখলাম নিজের কভার ফটোটাও পাল্টেছে। আগের কবরস্তানের জায়গায় নতুন একটা কবরস্তানের ছবি।

চালু করলাম ভিডিওটা। সেই অস্বচ্ছ শুরু। সেই সাদা-কালো। সেই পাটের খেত। সেই ছুটে চলা। সেই অতিকায় বৃক্ষ। সেই সাপের মতো লম্বাটে গাঢ় লাল কাপড়। সেই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে... না, এতো আর ইয়াকুব ভাই না... ভ্রু টান টান করে, চোখের মণি ওপরের দিকে উঠিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি আমি... ছোপ ছোপ অন্ধকারের ঠোঁট দিয়ে কি একটু হাসছিও আমি?

ভিডিও চিত্রের শেষ দিকে শোঁ শোঁ বাতাসও অনুভব করলাম অবিকল।
এরপরই ইনবক্স এল। ভেতরে লেখা, আপনার আত্মাও বেচে দিয়েছি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন