বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

শামসুজ্জামান হীরা'র গল্প : হাইজ্যাক

চিন্তাই করা যায় না — মাসে অন্তত দু’তিনবার ঢাকা পাবনা যাতায়াত কিন্তু গাবতলীতে বাস থামার পর এত সহজে ইস্কাটনে যাওয়ার অটোরিকশা পাওয়া এই প্রথম। তা-ও আবার বেশি ভাড়া হাঁকা নেই — মিটারে যা ওঠে তাতেই সই। হতে পারে থ্রি-হুইলারটা ওদিককার, খেপ নিয়ে গ্যারেজে গাড়ি জমা দেবে। হতে পারে অটোরিকশা ড্রাইভার নতুন এই পেশায়, এখনও ধান্দাবাজি ঠিকমত রপ্ত করেনি। হতে পারে ড্রাইভার ভাল লোক — নিয়ম মেনে চলে।


সরকার নিয়ম বেঁধে দিয়েছে, ভাড়া কিলোমিটার প্রতি পঞ্চাশ পয়সা বেশি নাও কিন্তু যাত্রী যেখানেই যেতে বলবে যেতে হবে, ‘না’ বলা চলবে না। সে যা-ই হোক, আমার তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরাটাই হল আসল কথা। সকাল থেকে দিনটা আজ ভালোই কাটছে, সোলেমান ভাবে, মনিং শোজ দ্য ডে — ইংরেজরা এমনিতেই প্রবাদটা তৈরি করেনি। ওরা সভ্য জাতি। সভ্য জাতির মাথায় বুদ্ধি থাকে, পেশীতে শক্তিও থাকে খুব। বুদ্ধি আর শক্তি দিয়ে ওরা প্রায় সারা দুনিয়া জয় করেছিল, মালে গনিমতে আরও সভ্য হয়ে উঠেছিল। এখন যেমন অ্যামেরিকা, অতি সভ্য জাতি, দুনিয়াকে সভ্য করার দায়িত্ব সদাপ্রভু ওদের ওপর ন্যস্ত করেছেন। অ্যাকসিস অব ইভিলস, ওয়ার অন টেরর — কী-সব মূল্যবান বাণী ওরা আমাদের উপহার দিচ্ছে! ওয়ার অন টেরর কী-ভাবে করতে হয় তাও দেখিয়ে দিচ্ছে ইরাক আর আফগানিস্তানের নিরীহ মানুষ মেরে! বর্তমান সময়ে শক্তি-ই সভ্যতা। সারভাইবাল অব দ্য ফিটেস্ট, ব্যস্।

সভ্যরা আইন করে নিজেদের স্বার্থে, আবার যখনই ওই আইনে স্বার্থ রক্ষা হয় না, ছুঁড়ে ফেলে দেয় হাগুকাগজের মত। যাক ওসব কথা। যা ঝক্কি গেল দীর্ঘ এই জার্নিতে! দু’শ পঞ্চাশ কিলোমিটার তো হবে নিদেনপক্ষে। বিকেল চারটায় বাসে চেপেছে, রাত এখন সোয়া ন’টা।

সঙ্গে-আনা মালামাল অটোরিকশায় তুলতে নেয় সোলেমান। একটা বেশ ঢাউস ট্র্যাভেল ব্যাগ, একটা ব্রিফকেস, মা আবার সাধ করে তাঁর নাতি-নাতনির জন্য বস্তা ভরে দিয়েছেন মুড়ি-নাড়ু-নারকেল আরও কত কী। ড্রাইভার বাধা দেয়, বলে: থাউক থাউক স্যার, আপনের কষ্ট করতে অইবো না। আমি ঠিকঠাকভাবে তুইলা নিতাছি।

কী অদ্ভুত লোক গো! সবাই যদি ওর মত ভদ্র হত, যাত্রীদের ভোগান্তি থাকত? ইচ্ছা হয় জিজ্ঞেস করে, বাড়ি কোথায়। সোলেমানের বদ্ধ ধারণা, কোনও কোনও এলাকার লোকেরা বেশির-ভাগই ভাল। অনেকে ওর সঙ্গে একমত নয়। কিন্তু ওর অকাট্য যুক্তি, মাটির গুণ অস্বীকার করবে কী করে? চাপাইয়ের ল্যাংড়া আম কি চাটগাঁয়ে ফলবে? বিক্রমপুরের মাটিটাই দ্যাখো, স্যার জগদীশ, মেঘনাদ, অতীশ দীপঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় — আরও কত নাম, মাটির গুণ না থাকলে জন্মাত? এ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করার ইচ্ছা মাঝেমধ্যেই মনে চাড়া দেয়।

সোলেমানের বসতে যেন অসুবিধা না হয়, ব্রিফকেস ছাড়া অন্য মাল সিটের পেছনে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে ড্রাইভার। আহ্, আরাম করে পা ছড়িয়ে বসে পনের-বিশ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যাবে বাসায়। পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে স্ত্রীকে জানায়: এখন গাবতলী, সিএনজিতে উঠছি, এই তো পৌঁছে গেলাম বলে। রাস্তা ফাঁকা থাকলে পনের মিনিট, জ্যামে পড়লে কিছুটা বেশি। কী রেঁধেছো গো? কি বললে শর্ষেবাটা দিয়ে ইলিশ? শুনেই জিভে জল আসছে গো...

ভটভট্ শব্দ তুলে অটোরিকশা স্টার্ট নেয়। গুনগুনিয়ে গান ধরে সোলেমান। রবীন্দ্রসংগীত — ফুলে ফুলে ঢ’লে ঢ’লে বহে কিবা মৃদু বায়...। রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অন্য কোনও গান ও শোনে না, গায়ও না। গানের গলা ওর মন্দ নয়। তারিফ করে বন্ধুরা। বাথরুম সিংগারদের কোনও কম্পিটিশন হলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এ-ধরনের প্রতিযোগিতার স্পন্সর নাকি খুঁজেই পাওয়া যায় না। ওর ধারণা পৃথিবীতে রবীন্দ্রসংগীতের চেয়ে উন্নত কোনও গান আজও তৈরি হয়নি। আধুনিক গান, মান্নাদে ফান্নাদে — রাবিশ! শুধু সুরে গান হয় না, বাণী লাগে হে — বাণী!

অটোরিকশা এগিয়ে চলে। আজ শুক্রবার, ছুটির দিন, রাস্তাঘাট ফাঁকা-ফাঁকা। ঢাকা শহরটা যদি সবসময় এ-রকম ফাঁকা থাকত কী মজাটাই-না হত — সোলেমান ভাবে, শালা জ্যামের ঠেলায় কোথাও কি পৌঁছান যায় সময়ের হিসাব কষে! ঘাড় ফিরিয়ে বাঁয়ে তাকায় সোলেমান, ফুটপাত একদম জনশূন্য। রাজধানী শহর অথচ ছিরি দেখ! স্ট্রিট লাইট নেই এখানটায়; এমনিতেই নেই লাইট তার ওপর পথের পাশের ঝাঁকড়া গাছগুলো অন্ধকার আটকে রেখে এমন এক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে যে, ঢাকা শহর না গাঁওগেরাম ঠাওর করাই মুশকিল। অন্ধকার নিয়ে ভাববার কী আছে, অন্তত যখন বাহনে এগিয়ে যাচ্ছি অতি দ্রুত। পায়ে হাঁটলে কথা ছিল, চোখে তো দিনের বেলাতেই দেখতে অসুবিধা, রাতে কোনও ম্যানহোলে টুপ করে পড়ে গেলে কেউ টেরও পাবে না। ডায়বেটিসের প্রথম টার্গেট চোখ। ষাট বছরেই ডান চোখে ছানি — চশমা না থাকলে ওই যাকে বলে, চোখ থাকিতে অন্ধ!

ব্যাপারটা কী, নির্জন এলাকা পেরোনোর আগেই ভড়ভড়্ করতে করতে অটোর স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল! কীরে ভাই, নষ্ট হল নাকি? এ আবার কোন জ্বালায়...: সোলেমানের কথা শেষ হতে পারে না — দু’পাশ থেকে তিনজন কমান্ডো কায়দায় উঠে পড়ে অটোতে। সোলেমানের দু’পাশে দু’জন, কোলের ওপর একজন। কোলের ওপরের লোকটা অন্য দু’জনের তুলনায় গাব্দা-গোব্দা — ভীম মার্কা। এমনিতেই হাঁটুতে ব্যথা, পাইলসের সমস্যাও আছে; কোলের ওপর আড়াই মণ; হাঁটু ভেঙ্গে যাবে এমন অবস্থা, পাইলসের যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে ওঠে সোলেমানের। কিছু বুঝে উঠবার আগেই, চোখের নিমিষে ঝট করে হাত দিয়ে চোখ ওর বন্ধ করা সারা। চশমা কখন খুলে পড়েছে টেরও পায়নি। চোখে-চাপা-হাত থেকে কেমন বোটকা গন্ধ এসে নাকে লাগে — গা গুলিয়ে ওঠে সোলেমানের। করার কী আছে! ক্যান্সারের রোগীর পাছার ফোড়া নিয়ে ভাববার ফুরসত কোথায়! হালার পো, কতা কইলে এক্কেবারে জানে শ্যাস, চুপচাপ বইয়া থাক ... চোখ খোলোনের চেষ্টা করবি না...। কথা বলা আর পকেট হাতড়ানোর কাজ যুগপৎ চলছে ওদের। মানিব্যাগে খুচরো টাকাই বেশি, তাই ফোলা। পাজামার চোরা-পকেটে-রাখা মানিব্যাগ অনায়াসে বার করে নেয় ওরা; পকেট থেকে মোবাইল সেট ।

জীবনে এধরনের ঘটনার মুখোমুখি আগে কখনও হয়নি সোলেমান। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী সন্দেহভাজনদের চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যেত, তারপর গায়েব...। এখনও দেশের একটি এলিট বাহিনী চোখ বেঁধে নিয়ে যায় কুখ্যাত ক্রিমিনালদের। গায়েব হয় না — পাখিহীন খাঁচাটা পড়ে থাকে খানাখন্দে — খোলামাঠে। সোলেমানের অবশ্য চোখ বাঁধা হয়নি, হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরা হয়েছে, এই যা।

—আপনারা তো চোখ বন্ধ করেই রেখেছেন, খুলব কী করে? খুললেই বা কী, চোখ খোলা থাকলেও কিছু দেখা না গেলে সে চোখের কী দাম?

—বিটকেসের বিত্রে দুই লাখ টাহা আছে, খবর পাইছি, চাবিডা দেহি: ডানপাশে বসা লোকটা কর্কশ স্বরে হুকুম করে।

—ভুল খবর, দুটাকাও নাই, টাকা যা আছে সব মানিব্যাগে: নিরুদ্বেগ গলায় বলে সোলেমান।

ব্রিফকেসটা কোলের ওপর নিয়ে লোকটা বলে: এইডা তো দ্যাখতাছি নাম্বারিং তালা; নাম্বার কত? আবে নাম্বার কত ক তারাতারি। খুইল্যা দেহি...

—বাম দিকের তালার নাম্বার দুই, চার, ছয়; ডান দিকেরটা নষ্ট, নাম্বার মেলানোর দরকার পড়ে না; এদিক-ওদিক নাড়াচাড়া করলেই খুলে যায়। না খুললে ওটার পিঠের ওপর থাপ্পড় দিতে হয়; থাপ্পড় দিলেই খুলে যায়...

—এই মটকু লাইটডা মার তো দেহি... আন্ধারে কিচ্ছুই দেহন যাইতেছে না। কোলের ওপর বসে-থাকা লোকটাকে উদ্দেশ করেই বলে মনে হয়। ও একহাতে চোখ চেপে অন্যহাতে পেন্সিল টর্চ ধরে; চোখ-ধরা হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখে সোলেমান। ডান পাশের লোকটা ব্রিফকেস হাতড়ায়, তারপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে: টাহাপসা এক্কেবারে নাইক্যা হালায়, কয়ডা কয়েন আছে কেবল, আর কি সব কাগজপত্র—ওসুদ...

—বললামই তো টাকা নাই ওতে, বিশ্বাস করেন না...

—বিস্যাসের কাতা পুরি, বিস্যাস মারাইবার লাগছে, বিস্যাস আছেনি দুনিয়ায়...? মনে অয় বুদ্ধি কইরা মোডা ব্যাগের বিত্রে রাখছে, ব্যাগডা লামা তো দেহি পিছন থেইক্যা...

—নামানোর দরকার নাই, ওর মধ্যে কাপড়চোপড়, লুঙ্গি, তয়লা, আন্ডারওয়্যার এইসব আছে.... ব্যাগটা বরং নিয়ে যান, পরে তল্লাশি করবেন: স্বাভাবিক গলায় বলে সোলেমান।

—থাউক, লামানির দরকার নাইক্যা। ওইডা যা মোডা, চেকিং করতে সময় লাগবো। ছালার বস্তার বিত্রেও ভি বুদ্দি কইরা টাহা রাখবার পারে। সব থেইক্যা ভালা অয় — হ বুদ্দি পাইছি, ওই জাগায় নিয়া চল — চোকখে মলম লাগাইয়া ছাইড়া দিমুনে, হেরপর আস্তেদিরে মালসামানা খুইজ্যা দেখুমনে...

—চোখে মলম দিলে কী হয়? তোতলায় সোলেমান।

—হেইডাও জানে না হালায় — পত্তিকায় মলম পাট্টির কতা ছাপা অয়, ব্যাকতেই জানে — চোকখে মলম দিলেই টের পাইবানে। সাতদিন চোকখে আন্ধার দেখবা কেবল...

—সাতদিন? একদিন না দেখলেও চলতো, কিন্তু পরশু যে আমার মিটিং, চোখে না দেখলে মিটিং করব কি করে? মলম না লাগালে চলে না? কাতর কন্ঠে বলে সোলেমান।

—চলব না কেলায়, চলে; কিন্তুক হেইডা আরো খতরনক্। পেডের বিত্রে এইডা হান্দাইয়া রাস্তায় ফালাইয়া দিলে চলে: পেটের ডানপাশে কি একটা সূচলো জিনিস ঠেকিয়ে বলে লোকটা।

—মলমই ভালো; মিটিঙের চেয়ে জীবনের মূল্য ঢের বেশি...: ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে অনুচ্চ স্বরে বলে সোলেমান।

—জব্বর কতা কইছেন, কতা তো ভালাই কইবার পারেন দ্যাখতাছি, ডর লাগতাছে না? পাশে-বসা লোকটার কথায় পরিবর্তন লক্ষ করে সোলেমান। একটু যেন ভদ্র ভদ্র ভাব — তুমি থেকে আপনি।

—ডর লাগবে ক্যান? আপনারা কি আমাকে রিমান্ডে নিচ্ছেন নাকি যে ডর লাগবে? এবার একটু হাল্কা সুরে বলে সোলেমান।

—ভালাই কতা কইতাছেন। রিমান্ডে হুনছি বাঁশ দিয়া ডলা দেয়, তয় আপনে কি পলেটিস টলেটিস করেন নিহি? মিটিঙের কতা কইলেন, কাপুর চোপুরেও তো হেই রহমই লাগে — খদ্দরের পাঞ্জাবি পরছেন: বাম পাশে বসে-থাকা লোকটা এবার মুখ খোলে। দু’আঙ্গুলে পাঞ্জাবির কাপড় পরখ করে বলে: মুলাম খদ্দর, কুমিল্লার অজ্জিনাল খদ্দর মনে অয়...।

—বাসায় ফিরা কী করবেন? জিজ্ঞেস করে ডান পাশের লোকটা।

—ভাত খাবো, তারপর ঘুমাবো। তবে হ্যাঁ, আপনারা যদি দয়া করে বাসায় যাবার এজাজত দেন তাহলেই: যথেষ্ট সহজ গলায় জবাব সোলেমানের।

—ও ওস্তাদ, বাসায় ইলিস মাছ রানছে, মোবাইলে ইস্ত্রির লগে কতা কইলো, হুনলাম: অটোরিকশা চালক একগাল হেসে বলে।

—তাই নাহি, খুব ভালা। মাছের রাজা ইলিস আর দ্যাসের রাজা পুলিস... কী ঠিক কই নাইক্যা? কী কন পাসিন্দার সাব? কতাডা আমার বানানি না, হেদিন এক নেতায় কইছিল...

—পুরাপুরি ঠিক না। পুলিশি রাষ্ট্র বলে একটা কথা অবশ্য আছে। তবে পুলিশ তো চোর-ডাকাত ধরা আর মিছিল-মিটিঙে লাঠিপেটা করা ছাড়া আর তেমন কিছু করে না। ও হ্যাঁ যে-দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে তাদেরকেই ধরে, লাঠিপেটা করে... হুকুমের দাস!

—তয় দ্যাসের রাজা কেডা? আপনে তো পলেটিস করেন, কইন চাইন দেহি? মৃদু হেসে ডানে-বসা লোকটা জিজ্ঞেস করে।

—আমি পলিটিক্স করি আপনাদের বললো কে? আমি এনজিওতে ছোটখাটো চাকরি করি। জানি, কিন্তু বলা যাবে না...।

—আবে জ্বালা, জানেন কিন্তুক কওন যাইব না, এইডা আবার কোন সিস্টেম?

—বললে বিপদ, দেশে জরুরি আইন, জানেন না?

—আচ্ছা ঠিক আছে। তাইলে বুজান দেহি এই জরুরি আইনডা আবার কী জিনিস? দ্যাসের অন্য আইনগুলা কি জরুরি না?

—বললাম তো দেশে জরুরি আইন — জরুরি আইন কী জিনিস সেটা বলাও নিষেধ, এসব কথা রাজনীতির আওতায় পড়ে — রাজনীতি করা নিষেধ...: বিজ্ঞের মত মুদু মাথা নেড়ে বলে সোলেমান।

—সাব, আমারও খবর-উবর রাহি, অত ভোদাই ভাইব্যেন না, ঘরোয়া রাজনিতি না কি জানি কয়, অহন আর নিসেদ না...হুঁ...

—কথা ঠিক, কিন্তু আমরা তো ঘরের বাইরে; আমার বাসায় চলেন, ঘরে বসে জরুরি আইন, দেশের রাজা কে সব বলব, যাবেন? ইলিশ মাছ ভাগ করে খাওয়া যাবে...।

—আবে কয় কী পাসিন্দার, ঘরে নিয়া আটকানির ফন্দি...; ফন্দি করলে বিপদ আছে কিন্তুক, এই যে দ্যাখতাছেন এইডা ঢুকাইয়া দিমু। চালাকি করার ফল কী অয়, খবরের কাগজে পরেন নাইক্যা, টিভিতেও তো দেখাইছে, একডারে হেদিন খোঁচা দিয়া ওই পারে পাডাইয়া দিলো...।

—দোষ তো ওই ব্যাটারই। চালাকি করতে গেল, মারা পড়লো। চালাকি করা খুব খারাপ কাজ — চালাকি করে অনেক লোক মারা পড়েছে। চালাকি ভালো না...। কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে যায় সোলেমান।

—আপনে বুজেন? হাচা কইতাছেন নাহি রং তামাসা করতাছেন?

—মিথ্যা বলে আমার লাভ? আপনারা তো মানুষ মারার জন্য ধরেন না; টাকা-পয়সা এটা-ওটা হাতিয়ে নেন; মানুষকে জানে মারলে তো অনেক ঝামেলা... তাই না?

—হুনছোস সুক্কুর, থুক্কু নামডা কইয়া ফেলাইলাম, পাসিন্দার খুব বুজমান মানুস। বেকতেই যদি আপনের লাহান অইতো কত আরামই না অইত আমরার। রোজা রাখছিলেন?

—না, আপনারা রেখেছিলেন?

—সুক্কুইরা রাহে — একডাও ভাঙ্গে না, খুব ফরেজগার...।

—আর আপনারা বুঝি পরহেজগার না? রোজা রাখেন না?

—আবে জালা, আমি অইলাম গিয়া অনিল পাল, থুক্কু নামডা কইয়া ফালাইলাম আর ও অইলো গিয়া, আপনের কোলে আরাম কইরা বইয়া আছে, প্রসান্ত বরুয়া, আর থুক্কু দিয়া লাভ কি, বেকতের নামই তো ফাস কইরা দিলাম...।

—আপনারা যে আমাকে ধরে সবকিছু ছিনতাই করছেন এটা কি ভালো হচ্ছে?

—হাইজাক করার কতা কইতাছেন? শুক্কুর প্রশ্ন করে।

—এটাকে হাইজ্যাক বলা চলে না। হাইজ্যাকের অর্থ অন্যকিছু, হাইজ্যাকের আভিধানিক অর্থ, এটিদেবয়ের ইংলিশ-টু-বেঙ্গলি ডিকশনারি অনুযায়ী...

সোলেমানকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বেশ উত্তেজিত গলায় বলে ওঠে শুক্কুর: আবে রাহেন আপনের এটিদেব — বইপত্রে কী লেহা আছে হেইডা মাইন্যা লোকে চলে? ফখরুদ্দিন সাব খেমতায় আওনের আগে বক্তিতা ভাসন আমরাও হুনছি; খালি কী জানি কয় সংবিদান... সংবিদান-সংবিদান হুনতে-হুনতে কান পইচ্যা যাওনের অবস্থা, তো সংবিদান গুইল্যা খাওয়াইলেও লাভ নাইক্যা। আসল কতা মেঘনা বিরি...।

—আপনারা অনেক কিছুই বোঝেন, তো ওই মেঘনা বিড়িটা আবার কী? বুঝলাম না।

—আমরার গেরামের হাটে এক বিরি বেবসায়ী গানবাজনা কইরা লোক জমা করত, হেরপর মেঘনা বিরি বেচতো। গানবাজনা আসল কাম না, আসল কাম অইল মেঘনা বিরি বেচন। সংবিদান গণতন্ত্র জনগণ সব হালায় ফালতু কতা, আসল কতা খেমতায় থাহা, খেমতায় যাওনের বেবস্থা করা... হেরপর লুটপাট...; কতা কি খারাপ কইলাম? শুক্কুরের গলায় গর্বের আভাস।

সোলেমান রীতিমত তাজ্জব বনে যায় শুক্কুরের কথা শুনে।

—থাউক ওইসব কতা, আমরা অইলাম গিয়া হাইজাকার, পলিটিসের কতা আমরার মুখে আনন ঠিক না। তয় আপনের মানিব্যাগে কত টাহা আছে? হাল্কা থেকে একটু যেন ভারী শুক্কুরের গলা।

—গুনি নাই, বেশি নাই মনে হয়, বাসে ওঠার দু’মিনিট আগে এক পাওনাদারকে দশ হাজার টাকা না দিলে পনেরো হাজারের মত থাকত হয়তো: বলে সোলেমান।

—ইহ্ হিরে কয় কি! হালায় পাওনাদার আর সময় পাইলো না, বাসে উঠনের সময় আইয়া হাজির। বাস লেইট করছিলো নাহি?

—বেশি না, মিনিট দশেক: বলে সোলেমান।

—ইহ্ হিরে, হালার বাসের মায়েরে বাপ, হালারা পাসিন্দারগর সুবিদা অসুবিদা বুজে না, ভাড়া ঠিহই ছ্যাপ দিয়া গুইন্যা লয় কিন্তুক লেইট করে; লেইট করে কেলায় জানেন?

—কেন?

—লেইট করলে বেসি পাসিন্দার পাওন যায়। হেদিন হালায় গুলিস্থান থাইক্যা আমিন বাজার গেতে তিন ঘন্টা লাগায়া দিল। বাসের ডাইভারের মায়েরে চু...

—ছিঃ, অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতে নেই: নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে প্রতিবাদের সুরে বলে সোলেমান।

—কী কইলেন, অস্লিস না কী জানি? আমরা সোজা কতা কইলে অস্লিস আর আপনের নেতারা যে কয়, দুই নারীর মিলন অইলে কিছুই পয়দা অয় না ওইডা বুজি অস্লিস না? আসল কতা অইল গিয়া আমরা যা করি তাই খারাপ, যাই কই তাই অস্লিস। হাইজাকাররা ভালা কতা কয় ক্যামতে? আক্ষেপের সুরে বলে শুক্কুর।

—কে বলে আপনারা খারাপ? আমি তো মনে করি যতোটা বলা হয় ততোটা খারাপ আপনারা নন...।

—দ্যাখতাছোস অনিল্যা, হুনছোস, পাসিন্দার সাব কি কয়? বুজমান মানুস, ঠিহই ধরছে, আমরা জানের খত্রা নিয়া হাজার টাহা, খুব বেসি অইলে লাখ টাহা হাইজাক করি, কিন্তুক কোকালোলা আর গ্যাইস্যা হালায়, ব্যাকতেই কয় হুনি, পাবলিকের কুটি কুটি টাহা মাইরা বিদেসে পাডাইয়া দিছে, হেরা আমরার থেইক্যা ভালা কুন দিক দিয়া? আমরা তো ফরেন্টে, মানে বিদেসে টাহা কেমতে পাডায় তাও জানি না—পাডাইবার টাহা কই? দেইখ্যা বুজন যায় না আমরার অবস্থা? যা ইনকাম করি নেসা কইরাই স্যাস...।

—ঠিকই বলেছেন, আপনাদের চেয়ে অনেক বড় হাইজ্যাকার ওরা। ওদের চেয়েও বড় হাইজ্যাকার আছে, যারা পুরো দেশটাই হাইজ্যাক করে সুযোগ পেলেই, এ-উসিলায় ও-উসিলায়; মানুষের জান-মাল, সব অধিকার হাইজ্যাক করে। কিন্তু তাই বলে আপনাদের কাজটাকেও সমর্থন করা যায় না। শেষ কথাটা মুখ দিয়ে বেরোতেই একটু যেন থতমত খায় সোলেমান ।

—আবার ভাসন মারাইবার লাগছেন, থুক্কু অস্লিস কতা কইয়া ফালাইলাম। আপনে আসলে ভালা মানুস আঙ্কেল...।

স্তম্ভিত সোলেমান। এদের মত লোক ওকে ভাল মানুষ বলছে, এতক্ষণ তো কখনও হালার পো, কখনও পাসিন্দার, কখনও পাসিন্দার সাব, এখন আঙ্কেল! একটু টোকা দিয়ে দেখা যাক্ না, ওদের মনে আসলে কী আছে। সত্যি সত্যি ভাল মানুষ বলছে নাকি ইয়ার্কি করে...।

—তোমরা বাবা আমার ছেলের বয়সী, একটা কথা বললে শুনবে? ক’সেকেন্ড নীরবতা। সোলেমান আশ্বস্ত হয়, ইয়ার্কি করেনি, করে থাকলে ওদেরকে তুমি সম্বোধন করাতে ক্ষেপে উঠত।

—কন আঙ্কেল, আঙ্কেল যহন বানাইয়াই ফালাইছি কন কি কইবার চান, তুই কী কস্ বরুয়া? শুক্কুর বলে ওঠে।

—হহ্ ঠিকই আছে, আঙ্কেল গম মানুষ, কি কথা কইবেন যে তারাতারি কই ফেলন, অনেক পথ কিন্তু ঘোরা অইয়ে অনেরে লই...। বড়ুয়া বলে।

—তোমরা মন্দ বোঝো, তারপরও কর...।

—আবে আঙ্কেল কয় কি, আমরা মন্দ কাম করি! বিস্ময় মেশান গলায় অনিলের উক্তি।

—যে লোকগুলোর কথা একটু আগে বললে, তোমরাই বললে ওরা খারাপ লোক, বলোনি? বললে দেশের টাকা লুটপাট করে মৌজ করে, বিদেশে পাঠায়। ওদের তুলনায় তোমরা তো চুনোপুঁটি...।

—চুনাপুটি ভাজা কিন্তুক খুব মজা...: কথায় মাঝখানে বলে ওঠে অনিল: ফেনসিডাইলের লগে জমে খুব...।

—তোমাদের কুকাম ওদের তুলনায় ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না... কথা বুঝতে পারছো আমার?

—হহ্, পারুম না কেলায়, চালাইয়া যান...: মাথা ঝাঁকিয়ে বলে অনিল।

—খারাপ কাজ বেশি করলে খারাপ অল্প করলেও খারাপ: বলে সোলেমান।

কিছুক্ষণ কারও মুখে কথা নাই। শুধু অটোরিকশার ভটভট্ আওয়াজ। কোথায় যে এসেছে বুঝতে পারে না সোলেমান। রাত, যদ্দুর আঁচ করে, ভালই হয়েছে। বউ নিশ্চয়ই খুব দুশ্চিতায় পড়ে গেছে। এত দেরি হবার কথা নয় বাসায় পৌঁছতে। মোবাইলের সিম তো ওরা খুলে ফেলেছে হস্তগত করামাত্র। নিশ্চয়ই বারবার ফোন করে কোনও সংযোগ না-পেয়ে আরও অস্থির হবে। কিছুই করার নাই, থাকুক অস্থিরতার মধ্যে। মাঝে মাঝে অস্থিরতার মধ্যে পড়লে ভালবাসা তাজা হয়। উনুনে খোঁচা দিয়ে ছাই-চাপা-পড়া আগুন উসকে দেওয়া আর কি! তাছাড়া অস্থিরতার কারণে মারাত্মক কোনও কিছু ঘটে যাওয়ার ভয় নাই। ওর হার্টের কোনও সমস্যা এখনও পর্যন্ত ধরা পড়েনি।

কিছুটা দুশ্চিন্তা যে সোলেমানের ওপর ভর করেনি তা নয়। কথাবার্তা অনেক হল, কিন্তু কখন ছাড়া পাবে — আদৌ ছাড়া পাবে কিনা, বুঝতে পারছে না।

—এই মনছের গারি রুখ এহানেই: হুকুমের সুরে বলে শুক্কুর। সোলেমান বাইরের দিকে তাকায় — চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হলেও বোঝে নির্জন এলাকা, মনে হয় আগারগাঁও বিএনপি কলোনির আশেপাশে এসে দাঁড়িয়েছে অটোরিকশা। একেবারে নিঝুম — শুনশান, জনমানবের চিহ্ন নাই যতদূর চোখ যায়। এখানে এসে থামল কেন ওরা? অন্য কোনও মতলব আছে নাকি ওদের মাথায়, কে জানে! কয়লা ধুলে না যায় ময়লা। অল্প সময়ের কথাবার্তায় ওদের মধ্যে এতদিনের জমে থাকা ময়লা ধুয়ে যাবে; এত অল্প সময়েই বিরাট কোনও পরিবর্তন আসবে ওদের মধ্যে — বড় বেশি আশা করা হয় নাকি? আমাকে বোকা বা অপ্রকৃতিস্থ ভাবেনি তো? অপ্রকৃতিস্থ ভাবতেই পারে। যে-পরিস্থিতিতে ওদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করেছি তাতে অপ্রকৃতিস্থ ভাবা অযৌক্তিক নয়। দেখা যাক, ঘটনা শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। খুব বেশি হলে টাকা ক’টা যাবে, যাবে মোবাইল আর ঘড়ি, দুটোই পুরনো। শুধু ব্রিফকেসটা গেলেই খুব ক্ষতি হবে; ওর মধ্যে যত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। সব যাক, ভালোয় ভালোয় বাসায় ফিরতে পারলেই হয়। চোখে মলম না লাগালেই হয়।

— অ্যাই অনিল্যা আঙ্কেলের মোবাইল আর ঘরিডা দিয়া দে, আঙ্কেল ভালা মানুস...; তয় দেইখ্যা তো বুজন যায় না, আপনে কোন ধম্মের লোক...।

— আমি ধর্মকর্ম করি না, ওসব নিয়ে মাথাও ঘামাই না। নাম মোহাম্মদ সোলেমান; নামটা কে রেখেছে, জানি না — বুদ্ধি হবার আগেই নামের সাথে ধর্মের সিল আমার ওপর মেরে দেওয়া হয়েছে...: শুক্কুরকে লক্ষ করে বলে সোলেমান: কী ব্যাপার ও-ভাবে তাকিয়ে আছো কেন?

— আবে কয় কি! ধম্ম না করলে চলে? ধম্ম না করলে মানুস কি ভালা থাকবার পারে? বিস্ময় মেশানো সুরে শুক্কুর বলে।

— তোমরা তো ধর্ম করো, খারাপ কাজ করো না? যে খারাপ লোকগুলোর কথা কিছুক্ষণ আগে বললে ওরাও কিন্তু ধর্ম করে। ধর্ম-ধর্ম করে মুখে ফেনা তোলে। বিসমিল্লাহ বলে মুখে, করে যতো কুকাম — তবে ধর্ম করে এমন ভালো লোকও অনেক আছে, তারা ঢোল পেটায় না: বক্তৃতা দেওয়ার ঢঙে বলে সোলেমান: কথাগুলো বুঝতে পারছ?

— বুজুম না কেলায়, তয় ব্যাকতেই ধম্ম করে, আমিও করি। আল্লায় তো কইছে, শিরক ছারা তোমরার বেবাক গুনা আমি ইচ্ছা করলে মাফ কইরা দিবার পারি, নেকির কাম করো। হাসরের দিন নেকি গুনা দারিপাল্লায় মাপমু আমি। আপনের কি মনে অয়, হাইজাকের গুনার ওজন কি রোজা নামাযের নেকির থন বেসি অইবো? কী কন আঙ্কেল? শুক্কুর অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে সোলেমানের দিকে।

— জানি না, হাশর নিয়ে মাথা ঘামাই না। এই জগতে সবাই ভালো থাকুক, সুখে থাকুক শুধু এটাই চাই। ধর্মের কথা থাক, তোমরা অনেকের চেয়েই ভালো।

— হুনছস অনিল্যা, হুনছস বরুয়া, কী বুজতাছস... আঙ্কেলে কি কয়? আঙ্কেল ভালা মানুস, কিন্তুক এইডা বুজবার পারতাছি না, ধম্ম না করলে ভালা থাহন যায় ক্যামতে!


তিনজন সোলেমানের জিনিসপত্র অটোরিকশা থেকে নামিয়ে ফুটপাতে সাজিয়ে রেখে আবার গিয়ে অটোতে উঠে বসে। থ্রি-হুইলারটা স্টার্ট নেয়। তারপর এক সময় দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------
ক’টি কথা:
গল্পে সোলেমান ছাড়া অন্যদের সংলাপের বানান যতটা সম্ভব উচ্চারণ অনুযায়ী রাখা হয়েছে। ঢাকার সংলাপে ‘শ’, শ্ব ও ‘ষ’ কে ‘স’ দিয়ে লেখা হয়েছে (এই ‘স’-এর উচ্চারণ ইংরেজি ‘S’-এর মত), ‘ড়’কে ‘র’।

গল্পটি ২০০৮এ লেখা। তাই সেই সময়কার রাজনীতির ছাপ গল্পের গায়ে বেশ প্রকটভাবেই লেগে আছে।

—শামসুজ্জামান হীরা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন