বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

ওয়াহিদা নূর আফজা'র গল্প : বর্ণিল ক্যানভাস



বারিধারা তখনও থরে থরে দালানকোঠা, বিপণী বিতান, রেস্টুরেন্ট আর বিদেশি দূতাবাসে ভরে উঠেনি। বিকেল হলেই আমরা বান্ধবীরা, মূলত তালাত আর আমি, শো শো করে সাইকেল ছুটিয়ে আমেরিকান দূতাবাস পর্যন্ত ছুটে যেতে পারতাম অনায়াশে। তারপর হঠাৎ করে জানি কী হয়ে গেল। খালি জায়গাগুলোর গর্ভ চিরে দুম দুম করে এক একটা প্যালেস তৈরি হলো।
নিরিবিলি শান্ত-সিগ্ধ এলাকাটি ভরে গেল লোকে-লোকারণ্যে। তাও ভালো আমাদের পাশের প্লটটি অনেকদিন খালি ছিল। শেষ পর্যন্ত সেখানে যখন একটা লাল ইটের দোতলা বাড়ি উঠলো তখন আমার এ’লেভেল দেওয়ার আর ছয়মাস বাকী। বাড়িটার নাম নিভৃতি। কিন্তু আমরা চিনলাম হাই সাহেবের বাড়ি বলে। সে সময়টা আমি বড্ড একা। খুব লাজুক আর অন্তর্মূখী। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আর তেমনটি যায় না। ওদের হই-চই, লেইট নাইট পার্টি, সীসা ক্লাব, আড্ডা সব কিছুতেই আমি বড় অবার্চীন। তাই গোত্র ছাড়া। একমাত্র বান্ধবী তালাত। ও একটা পার্টি এনিমেল। আমার জন্য ওর সময় খুব একটা নেই। আমার সেই একাকীত্বের সময়টাতে প্রথম সে ছেলেটিকে দেখি। হাই সাহেবের বাড়ির দোতলা গাড়ি বারান্দার উপড়ে। বুঝলাম দু’বাড়ির দোতলায় আমরা দুজন পাশাপাশি ঘরের বারাব্দা। আমাদের ঘর-বারান্দা মুখোমুখি। আমরা দুজনই একই বয়সী। কিম্বা হয়তো মার থেকে একটু বড়ই হবে। সে দারুণ ফিট। বারান্দায় বেরুলে তার সাথে দেখা হতো। কিন্তু কখনও কথা হতো না। কেন? বোধহয় আমরা একই মাত্রার অহংকারী ছিলাম। কিম্বা ওর হয়তো কোন আগ্রহ ছিল না। বিপরীত লিঙ্গ দেখলে কথা বলা যাবে না এরকম কোন মূল্যবোধের সাথে তো আমরা পরিচিত নই। গ্রিন হেরাল্ডে ও’লেভেলের সময়েও তো শর্টস পড়ে ছিল্লুর সাথে টেনিস খেলতাম। ছিল্লু ছিল আমার প্রথম ক্রাশ। কিনতয় নাচ জানা কোন ছেলেকে বিশ্বেস করতে নেই। ছিল্লু এখন নাজিফার সাথে ঘুরে বেড়ায়। হয়তো ছেলেটি ম্যানারথে পড়েছে। ছেলেটির মা কোন হালাক্কা পার্টির দলনেত্রী যেখানে মহিলারা হিসেব কষে বলছেন কে কতবার হজ্বে গেলেন কিম্বা কার কতটা আধুনিক সৌদি মডেলের বোরখা আছে, আর আছে দুবাই থেকে সদ্যই কেনা ডায়মন্ডের সেট। নতুন পয়সা হওয়া এখনকার বড়লোকদের যা হচ্ছে আরকি! সেদিন আব্বুর কথা শুনে অবশ্য তা মনে হল না। হাই সাহেবদের দুই প্রজন্মের ব্যবসা। উনার প্রথম স্ত্রী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে পিএইচডি করেছেন। হুম … প্রথম স্ত্রী …এখানে একটি প্রশ্ন থাকে বইকী। কিন্তু তাই বলে কী তার কোন মেয়ের সাথে ভাব জমাতে নেই? তাহলে কী ধরে নেব সে আসলে গে? একজন সমকামী? আমার প্রতি কোন আকর্ষণ বোধ করে না? এই চিন্তাটা অবশ্য তালাত আমার মাথায় ঢুকিয়েছে। একদিন আমার ঘর থেকে ওকে দেখে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, ‘দেখ, দেখ, সাফা, গে’দের মতো বামকানে একটা দুল পড়ে আছে।’ নানারকম চটকদার কথা বলে তালাত প্রায়ই ওভারস্মার্ট ভাব করে। তাই ওর কথা আমি খুব একটা বিশ্বাস করিনা। তবে এ কথাটি বিশ্বাস করলাম। আমার প্রতি ওর এতো নিঃস্পৃহ আচরণের একটা ব্যাখ্যা দরকার ছিল। অন্তত আমার অহমকে একটা সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হলেও। তা সে যা হয় হোক - তারপরও কি আমরা বন্ধু হতে পারি না? শুধুই বন্ধু? সেও তো আমার মতোই। কোন হই-হুল্লোর দলবাজিতে নেই। নির্জনতায় বিশ্বাসী। ভোরবেলায় বারান্দায় এসে যোগীর মতো যোগব্যায়াম করে। আর বাদবাকি সময় যতোটুকু দেখি হাতে থাকে বই। কখনও ওকে হাতে বই ছাড়া দেখিনি। কী অতো পড়ে? অথচ সেদিন আব্বু ডাইনিং টেবিলে বলছিলেন যে হাই সাহেবের ছেলেটা নাকি কোন ডিগ্রি না নিয়েই লন্ডন থেকে ফিরে এসেছে। গত এক বছর ধরে বাসাতেই বসে আছে। তারপর আক্ষেপ করে বললেন, 'যাদের অফুরন্ত সুযোগ তারা অবলীলায় সে সুযোগটা নষ্ট করছে। আর যাদের হাজারটা অসুবিধা রয়েছে দেখা যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত তারাই লেখাপড়াটা শেষ করছে।' আব্বুকে অনেক কষ্ট করে উপরে উঠতে হয়েছে। আমাদের সে গল্প প্রায়ই শুনতে হয়। আমি মাথাটা নীচু করে ছিলাম। চোখাচোখী হলেই আব্বু হয়তো আবার আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে শুরু করবেন। তিনি চান আমি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ি। তারপর আব্বু একটা পত্রিকা বের করবেন। আমি হব সেটার সম্পাদক। আর ভাইয়া দেখবে গার্মেন্টসের ব্যবসা। আশির দশকে আব্বু এটি শুরু করেছিলেন। সে সময় আমদের খুব অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে। নব্বুয়ের দশকে এর পালে হাওয়া লাগে। ঠিক হয়ে আছে ভাইয়া এর হাল ধরবে। এর মধ্যে আমি নেই। সহজ হিসেব। মসনদ পাক্কা। এ’লেভেলের পর লণ্ডন যাচ্ছি লেখাপড়া করতে তা ঠিকঠাক হয়ে আছে। আব্বুর যতো ভয় এর মধ্যে যদি একটা ভুল প্রেম-ট্রেম করে বসি। হয়তো ওকে নিয়েই ভয়টা কাজ করে। তাই আজকাল প্রায়ই ডাইনিং টেবিলে হাই সাহেবের পরিবারের প্রসঙ্গ চলে আসে। শিল্পমন্ত্রীর সাথে হাই সাহেবের নাকি তেমন ভালো সম্পর্ক যাচ্ছে না। বি-ঘরানার লোক বলে এ-ঘরানার পার্টিকে ঠিকমতো চাঁদা দেননি। সামনেই নাকি পত্রিকাগুলোতে ঋণখেলাপির তালিকায় ভদ্রলোকের নাম উঠবে। তা ঋণখেলাপি এই বিষয়টি আব্বুর কাছে খুব একটা বড় বিষয় নয়, পত্রিকায় নাম ছাপানোটা ব্র্যান্ডনেমের উপর ব্রনের কালো দাগের মতো। হাই সাহেবের প্রথম স্ত্রীর প্রসঙ্গও আসে। সে মহিলার মৃত্যু নিয়ে বাজারে অনেক গুজব আছে। ছেলেটি হচ্ছে সেই প্রথম স্ত্রীর সন্তান। গুজবটা কিন্তু মারাত্মক রকমের ভয়ংকর। বুঝতে পারছি আব্বু আমাকে খুব পরোক্ষভাবে সাবধান করে দিচ্ছেন। এতো কিছুর দরকার ছিল না। ছেলেটির আমার উপর কোন আগ্রহ নেই। বরং আব্বু এতো সব গল্প বলে ওর উপর ওর প্রতি আমার আগ্রহটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঠিক আগ্রহ নয়, এক ধরনের মায়া। আহা, ওর তাহলে নিজের মা নেই! হাই সাহেবের বর্তমান স্ত্রী খুবই সুন্দরী। এক সময় ভদ্রলোকের সেক্রেটারি ছিলেন। এখানেই রহস্য আরও ঘোরালো হয়েছে। এতসব রহস্য ছাড়িয়ে আমার শুধু মনে হয়, আহারে এই জন্য বুঝি ও এমন একা। সবার থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখে। এখন তো ভার্সিটিই ছেড়ে দিয়েছে। মাঝে মধ্যে কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। যায় কোথায়? অবশ্য ছেলে মানুষ। ওরা তো যে কোন সময়ই ডানা মেলতে পারে। পুরো আকাশ জুরে উড়ে বেড়াতে পারে। তারপর যখন ইচ্ছে হবে তখন ডেরায় ফিরবে। আচ্ছা মাঝে মধ্যে আমাকে নিয়ে উড়তে পারে না? আমি একদমই বিরক্ত করবো না। শুধু পাশে থাকবো। বিশাল আকাশটাকে একটু কাছ থেকে দেখবো। একদিন রাতে ছাদে গিয়ে দেখি ওদের ছাদের উপর সে উপুড় হয়ে শুয়ে অন্ধকার আকাশের তারা দেখছে। একদম ধ্যানস্থ মুনির মতো নিশ্চুপ হয়ে তারা দেখা। এই নাগরিক জংগলে আমাদের দু’ছাদের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। একটু ডাকলেই সে শুনতে পেত। কিন্তু এতো কাছাকাছি থেকেও দূরত্ব যে অসীম। কিভাবে এই অপরিচয়ের অসীমতা ভাংগা যায়? গে না হলে লন্ডনে চলে যাবার আগে ওর সাথে একটু এপেটাইজার টাইপের প্রেম করলে মন্দ হতো না। এরকম ধ্যানমগ্ন ছেলেরা খুব গভীর হৃদয়ের হয়। হয়তোবা সে কবিও। এই মুহূর্তে যদি ওর পাশে থাকতে পারতাম তাহলে হয়তো আমাকে অনেক কবিতা শোনাতো।



সেবার শীতের শেষে পাহাড় কাঞ্চনপুরে চলে গেলাম। সেখানে আব্বুর একটা বাগানবাড়ি আছে। তার পাশ দিয়ে তুরাগ নদী বয়ে যাচ্ছে। শান্ত-সম্মোহিত স্রোত সেখানে ধীরে ধীরে বয়। গোধূলীর সময় হরেক রঙের পাল তোলা নৌকা আর দূর থেকে ভেসে আসা মাঝির ভাটিয়ালী সুর পরিবেশটাকে সম্মোহিত করে তোলে। অনেকটা আমার বাড়ির পাশের বাড়ির পড়শীর মতো। হায়, সব আরশীনগরের বাসিন্দাদেরই কেন মরীচিকা হতে হবে? ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। মায়াবী গোধূলী খুব দ্রুতই ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে যায়। আমি ফিরে আসি বাংলোতে। অনেকটা দিন কয়েক থাকবো এখানে। আব্বুকে বললাম নিরিবিলি কোথাও যেতে চাই। পড়াশোনায় মনসংযোগের জন্য। ইদানিং আমারও খুব ধ্যানস্থ হওয়ার ইচ্ছে জাগে। হয়তো ওকে দেখে এমনটা হয়েছে। ঢাকায় থাকলেই বন্ধু-বান্ধবদের হল্লা চাইলেও খুব একটা এড়ানো যায় না। বিশেষ করে তালাত আমাকে প্রায়ই ডলের সাথে জুড়ে দিতে চাইছে। রেস্টুরেন্টে খেতে যাও তো নয় দুম করে কলকাতা যেয়ে হিন্দি মুভি দেখে আস। এবার ওরা চেপে ধরল দুবাইতে যাওয়ার জন্য। একটা বড় কনসার্ট আছে। আমার ভয় এতসব কিছু করলে পড়শীর থেকে দূরে সরে যাব। পড়শী হয়তো জানেই না যে সে আমাকে কিভাবে প্রভাবিত করছে। এখন আমার খুব বই পড়তে ভাল লাগে।স্ট্যাইনবেক আর হেমিংওয়েতে নেশা হয়ে গেছে। কিম্বা গভীর রাতে ছাদে চলে যাই আকাশের তারা দেখতে। গত দুদিন ধরে ওকে দেখছি না। আর তাতেই আমার উধাও হবার ইচ্ছেটা জাগলো। পাহাড় কাঞ্চনপুরের এই বাংলোটাতে মামনি আসেন না। আব্বু আসেন। আব্বুর জীবনেও অনেক রহস্য আছে। সেসব নিয়ে মাঝে মধ্যে মামনির সাথে আব্বুর খুব ঝগড়া হয়। বিশেষ করে আব্বুর একটা লম্বা বিদেশ ট্যুরের পরে। আমি সেসব না শোনার ভাণ করি। আব্বুর কাছ থেক দামী কোন উপহার পেয়ে মামনিও আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেন। আমরা আসলে সবাই এক অদ্ভুত নিরাপত্তার শেকলে বাঁধা পড়ে আছি। পাহাড় কাঞ্চনপুর তাই আমার কাছে দুদিনের মুক্তি। খুব নিরিবিলি এখানটা। চারপাশে এখনও ছোট এক টুকরো বণ জেগে আছে। দোতলার ব্যালকণিতে দাঁড়ালে শান্ত-সিগ্ধ তুরাগ নদীর রূপালি স্রোত কুলকুল শব্দে বইতে দেখা যায়। তার ওপাশে বাসন্তী বাতাসে ঢেউ খেলানো সবুজ ধানক্ষেত। এই এপ্রিলে গেটের পাশের মস্ত বড় মহুয়া গাছটার ফুল থেকে চারদিকে মাতাল হাওয়া ছুটছে। কিছুক্ষণ দুচোখ বন্ধ করে ভাবি জীবনটা কি ঠিক এই মুহূর্তে স্থির হয়ে থাকতে পারে না? আর তখনি বন্ধ চোখের পর্দার উপর ওর ছবি ভেসে উঠে। কী যন্ত্রণা! মানুষ কি একা ভাল থাকতে পারে? বিশেষ করে এই বয়সটাতে? একটা সময় আব্বু আর মামনির মতো ঝগড়া করতে হবে জেনেও? অস্থিরতা না দুঃখবোধ জানিনা কোনটি আমাকে ধেয়ে নিয়ে যায় তুরাগ নদীর কাছে। হাঁটতে শুরু করি নদীর পাশ ঘেঁষে। একা একাই। মানা করার পরও দেখি কেয়ারটেকার সাহেব একটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে আমার সাথে হাঁটছেন। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যাই পেছনের দৃশ্যপট। এগিয়ে যাই সামনে। থমকে দাঁড়াই নদীটার বাঁকের মুখে এসে। আমার সামনে ও দাঁড়িয়ে আছে। স্বপ্ন না বাস্তব! একদম সিনেমাটিক। অনেকে হয়তো বলবে এমন কাকতলীয় ঘটনা বাস্তবে সচরাচর ঘটে না। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল এমনটা ঘটারই কথা ছিল। এটিই স্বাভাবিক। কারণ আমরা তো একই বলয়ের। একই ক্লাস। আমাদের আব্বুদের ইনভেস্টমেন্ট প্যাটার্ণটা তো এরকমই হওয়ার কথা। তুরাগ নদীর পাশে আমাদের মতো আরও অনেকের বাংলো আছে। ওদেরও।



জানলাম ওর নাম। আরও জানলাম ও ছবি আঁকে। লেখালেখি করে। হাই সাহেবের এই বাংলোটা আসলে ওর ছবি আঁকার একটা স্টুডিও। দোতলায় একটা বিশাল হল ঘর। প্রথমটায় টারপেন্টাইন, লিনসীড ওয়েল আর ওয়েল পেইন্টের মিশেলে একটা বোটকা গন্ধ নাকে এসে লাগে। কিছুক্ষণ পর তা সয়ে আসে। আসলে চারপাশের ক্যানভাসগুলোতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে সম্মোহিত হয়ে যাই। এক-একটা ক্যানভাস এক একটা গল্প বলছে। দুটোতে শুধু পাহাড় কাঞ্চনপুর। সবুজ বণ, ঢেউ খেলানো ধানক্ষেত, তুরাগ নদী আর তাতে লাল-নীল-হলুদ পাল তোলা নৌকা। আর বাকীগুলোতে আবস্ট্র্যাক্ট আর্ট। একটা ক্যানভাসে যতসব অন্ধকার এসে জমে গেছে। সেখানে তাকালে কেমন জানি মন খারাপ করে উঠে। আবার তার পাশের ক্যানভাসটাই একদম অন্য গল্প শোনাচ্ছে। সেখানে খুব সবুজ আর হলুদের ছটা। মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। আমি বিহ্বল দর্শক। ক্যানভাস থেকে ক্যানভাসে ছুটতে থাকি আর স্থবির হয়ে পড়ি। ওর নাম দিই পিকাসো। পিকাসো আমার ছেলেমানুষি দেখে হাসে। তারপর আবার ছবি আঁকায় নিবিষ্ট হয়। ছবি আঁকার স্টুডিওর পাশের রুমটা ওর লাইব্রেরি। ফ্লোর থেকে সিলিং পর্যন্ত বিস্তৃত বুকশেলফে থরে থরে সাজানো বই। সেখানে আছে প্লেটো, অ্যারিস্টটল, মিশেল ফুকো, ক্যান্ট, ডারউইন, বারট্রেন্ড রাশেল, দস্তভয়েস্কী, জন স্টুয়ার্ট মিল, ভার্জিনিয়া উলফ, রুমী, শাদী, থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, মাণিক বন্দোপাধ্যায়, সুনীল আরও কতো জানাঅজানা লেখকেরদের বই। প্যারিসের ইম্প্রেশেনিজম আর বাঙ্গালদেশের মৃৎশিল্পের উপর বই দুটি পাশাপাশি। সেখান থেকে আমি টলস্টয়ের আন্না ক্যারেনিনা টেনে নিই। ওর স্টুডিও রুমের সোফার উপর আলতো করে শুয়ে পড়তে শুরু করি। পিকাসো তখন নিবিষ্ট হয় ওর ক্যানভাসে। ওকে দেখলে আমার তুরাগ নদীর কথা মনে হয়। স্রোতস্বী আবার মগ্ন। একজন পুরোপুরি ধ্যনী মানুষ। এরপর থেকে আমার প্রতিদিনের রুটিন হল পিকাসোর স্টুডিওতে চলে আসা। আমি ওর সোফায় আধশোয়া হয়ে বই পড়তে থাকি। আর পিকাসো একমনে ছবি আঁকতে থাকে। মাঝে মধ্যে আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হই। ঘুমিয়ে পড়ি। জেগে দেখি সে আমার মাথার কাছে বসে আছে। আমাকে জাগতে দেখে দুজনের জন্য স্বচ্ছ কাপে ছাইয়ের লিকার নিয়ে আসে। এর রং আর মৌ মৌ সুগন্ধ দু’টোই আমার কাছে অপরিচিত। জানতে চাই এর রহস্য। তখন পিকাসো ওর মায়ের কথা বলতে শুরু করে। ওর নানার চাবাগান আছে। ওর মায়ের ছিল নানান রকম চায়ের ব্লেণ্ড তৈরি করা। পিকাসোও এখন তা চালিয়ে যায়। এই লিকারে আছে গ্রিন টি, পেঁপে, কমলার খোসা, রোজমেরী, দারচিনি আর আনারসের নির্যাস। এরকম এখন প্রায়ই হয়। ধ্যান ভেঙ্গে পিকাসো একটা সময় আমার সোফায় এসে বসে। তারপর টুকটাক কথাবার্তা। আনা ক্যারেনিনার প্রথম লাইনটি আমাদের দুজনেরই খুব প্রিয়।

“All happy families are alike; each unhappy family is unhappy in its own way.”

আমরা আমাদের ডিসফাংশন্যাল পরিবারের গল্পগুলো খুব অবলীলায় বলে যাই। এর মধ্যে পিকাসো আমাকে রং চেনায়। আনন্দের রঙ শেখায়, বেদনায় রঙ চেনায়। লাল আর বেগুনীর মিশেলে ঐ কোণার ছবিটা কেন এতো প্রাণপ্রাচূর্যময় তা আর বুঝতে বাকী থাকে না। নিবিষ্ট মনে শুনে যাই উনিশ শতকে প্যারিসে ঘটে যাওয়া বিমূর্ত শিল্পের বিপ্লব। বোঝাবার চেষ্টা করে এর ভাষা। বিপ্লবের পেছনের সংগ্রাম। কিভাবে একদল পাগলা আর্টিস্ট মানুষের মন থেকে পেন্টিং সম্পর্কে সনাতনী ধারণাটা পাল্টে দিয়েছিলেন। সেসময় তাঁদের ছবি দেখে সমালোচকরা মানসিক রোগীর পাগলামো বলতেন। আমি জিজ্ঞেস করি, 'আচ্ছা তুমি ভার্সিটি ছাড়লে কেন?'

সে বলে, ‘না, ঐ আর্কিটেকচার আমাকে দিয়ে হবে না।’

‘তাহলে তুমি অন্য কিছু পড়। যা ভাল লাগে তাই।’

‘তাই তো পড়ছি। তুমিই তো বলো ভাল ছাত্রের মতো প্রতিটি বই আমি দাগিয়ে রাখি। মার্জিনে নোট টুকে রাখি।’

‘কিন্তু এসব তো তোমাকে কোন ডিগ্রি দেবে না।’

পিকাসো চুপ।

‘তুমি কি সারা জীবন ছবি এঁকে যাবে? তোমার আব্বার বিজনেস দেখবে না?’

‘আমার জীবনের জন্য কারও কিছু আটকে থাকবে না।’

কথাগুলো বলার সময় পিকাসোর চারপাশ ধূসর হয়ে আসে। ধূসরতা বেদনার রঙ। পিকাসোই আমাকে তা চিনিয়েছে। আমরা এখন কথা দিয়ে রঙয়ের লেখা খেলতে পারি। ওর ধ্যানমগ্নতার রঙ নীল। নদীর পাড় ঘেঁষে আমরা যখন এক এক করে ধানক্ষেত আর সর্ষেক্ষেতের আইল দিয়ে চলি তখন এক রাশ সবুজ আর হলুদ আমাদের আনন্দময় সময়গুলোকে রঙিন করে তোলে। এর মধ্যেই আমরা আমাদের বেদনার কথা বলি। স্বপ্নের কটাহ বলি। পিকাসো ওর মাকে নিজের চোখের সামনে আত্মহত্যা করতে দেখেছে। গনগনে আগুণের মধ্যে ওর মা পুড়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারি মাকে বাঁচাতে না পারার বেদনা ভুলবার জন্য ও একটি ভিন্ন পৃথিবী সৃষ্টি করেছে। সে পৃথিবীতে কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। এমনকি আমারও। গত কয়েকদিন আমাকে চুপচাপ অপেক্ষা করে যেতে হয়েছে কখন সে তার ঐ ভুবন ছেড়ে আমার কাছে আসবে। যখন আসে তখন আমার পৃথিবী আলোকিত হয়ে উঠে। আমি প্রতীক্ষায় থাকি। প্রত্যাশাহীন এক অনন্ত প্রতীক্ষা। যার শেষ কোথায় তা জানা নেই। এই অনিশ্চয়তাটুকু আমাকে আরও স্থির হতে শেখায়। এক সময় আমার যাবার সময় হয়। এক যোগীর কাছে দীক্ষা নিয়ে এক অন্য আমি অবশেষে আবার নাগরিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

অনুভব করি পিকাসো আমাকে ভালবাসা চিনিয়েছে। প্রত্যাশাহীন ভালবাসা।



একদিন কলেজ থেকে বের হয়ে দেখি পিকাসো গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে দেখে একটু হাসল। লাজুক হাসি। অপ্রস্তুত ভাবভঙ্গি। যেন অজুহাত খুঁজছে এদিকটায় ভুল করে চলে আসার। আমি বললাম, ‘আমার কেন জানি মনে হতো একদিন তোমাকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবো।’

পিকাসো সহজ হয়। জানালো দৃক গ্যালারিতে ওর প্রদর্শনী চলছে। আজকেই শেষ দিন। অভিমানী হতে গিয়ে হলাম না। যাক বাবা তাও তো আসলো। আমাকে নিয়ে গেল দৃক গ্যালারিতে। পাহাড় কাঞ্চনপুরে ওকে এই ছবিগুলো আঁকতে দেখেছিলাম। জানলাম ওর সব ছবি বিক্রি হয়ে গেছে। কানেকশন একটা শক্তিশালী মাধ্যম। পিকাসোর সমাজের বাসিন্দারা ওর ছবি কেনার সামর্থ রাখে। আমিই তো কিনতাম। কিন্তু আর তো আর কোন ছবি বাকী নেই। এবার সত্যি সত্যিই অভিমানী হলাম। ‘আমার জন্য একটা পেইন্টিংও রাখলে না?’

‘সব ছবি এখানে আনিনি। কয়েকটা এখনও স্টুডিওতে রয়ে গেছে। তার মধ্যে একটা তোমাকে দেখাতে চাচ্ছিলাম।’

‘আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করেছে। গ্যালারিতে আনবে কবে?’

‘আজকে প্রদর্শণীর শেষ দিন না? আর তো এখানে আনা হবে না।’

‘তাহলে চল এই শুক্রবার পাহাড় কাঞ্চনপুরে যাই।’

‘আমি একমাস পর প্যারিস চলে যাচ্ছি। পেইন্টিংএর উপর পড়তে। আর কালকে যাচ্ছি ইন্ডিয়াতে।’

স্তম্ভিত আমি এতোটুকু বুঝলাম প্রচণ্ডরকম এই অন্তর্মুখী মানুষটার সাথে রাগ দেখিয়ে, অভিমান করে কোন লাভ নেই। আর তাছাড়া আমরা তো জানি না আমাদের সম্পর্কটা কিরকম। সে বিষয়ে আমাদের মধ্যে তো কোন কথা হয়নি। প্রত্যাশাহীন সম্পর্ককে প্রত্যাশার বেড়াজালে বাধতে নেই।

‘ঈশ একদিনের জন্য যদি এয়ারপোর্টটা বিকল হয়ে যেত!’ খুব মৃদু স্বরে কথাটা বলে ফেললাম। এর থেকে আমার আর কী চাওয়ার থাকতে পারে?

পরদিন কলেজে ঢোকার সময় দেখি পিকাসো ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এগিয়ে গেলাম। বিস্মায়াভূত আমাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে খুব অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে পিকাসো বলে উঠলো, ‘ফ্লাইটটা একদিন পিছালাম। কালকে ভোরে যাব।’

এরপর আর দেরী না করে কলেজ পালিয়ে পিকাসোর গাড়িতে করে আমরা পাহাড় কাঞ্চনপুরের দিকে ছুটে গেলাম।

পিকাসো আমাকে সাহসী করে তুলল। জীবনে এই প্রথম নিয়ম ভাঙলাম।



এই সেই গ্যালারি। পিকাসোর প্রার্থণার স্থান। রুমে ঢুকতেই অভ্যর্থনা করে ল্যানসীড ওয়েল আর তৈলরঙের মিশেলে এক মিষ্টি মিহি গন্ধ। দেয়ালের চারপাশে ঠেক দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে থরে থরে ক্যানভাস। আগের থেকে এখন ক্যানভাসের সংখ্যা অনেক কম। সবই অসমাপ্ত অথবা অব্যহৃত। শুধু ইজেলের উপর রাখা ক্যানভাসটা সম্পূর্ণ। পিকাসো আমাকে অবাক করতে চেয়েছিল। এবং আমি সত্যি সত্যিই অবাক হই। আশ্চর্য! ক্যানভ্যাসের মধ্যে আমার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সচরাচর যেভাবে আমি এই ঘরের সোফাটায় আধশোয়া অবস্থায় থাকতাম ছবিতেও সেরকম। পেছনে এই ঘরের বড় জানলাটা। সেখানটায় নীল আকাশ আর লাল কৃষ্ণচূড়া। বাইরে এতো উজ্জ্বল রং আর ভেতরটা কেমন যেন ধূসর। পিকাসো আমাকে এমন বিষণ্ণ আঁকলো কেন? ও কী তবে আমার মনের ভেতরটা দেখতে পায়? আনমনা উদাস দৃষ্টিতে সিলিংএর দিকে তাকিয়ে আছি। আমার লম্বা চুলগুলো মেঝেতে লুটাচ্ছে। সাইড টেবিলে খোলা বই। যে কটা দিন এখানে এসেছিলাম তখন ঘুণাক্ষরেরও বুঝতে পারিনি পিকাসো আমাকে এতো নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। হয়তো এটাই প্রকৃত শিল্পীর ধর্ম। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যাবে না, তাঁদের উদাসীনতাটুকুই সাধারণ মানুষের কাছে প্রকট হয়ে উঠে। কিন্তু তাঁদের অন্তঃদৃষ্টির প্রখরতা অনেকটা সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনার মতো। ছবিতে আমার অভিব্যক্তির প্রতিটি রেখা মুক্তার মতো প্রখর, উজ্জ্বল। প্রায় স্বচ্ছ মসলিনে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি। অনেকটা বট্টেসেলির এলেগরি অব স্প্রিং এর অপ্সরাদের মতো। স্বচ্ছতার আচ্ছাদনে পবিত্র অবয়ব। নিজের ছবির মুখোমুখি হয়ে বাস্তবের এই আমার চোখের দু’কোণ চিকচিক করে উঠলো। অনুভব করলাম সেখানে পিকাসোর স্পর্শ। ওর মুখ আমার মুখের খুব কাছে চলে আসে। খেয়াল করলাম পিকাসোর বাম কানে কোন দুলের চিহ্ন নেই। তালাতটা আসলেই খুব চাপাবাজ। ততক্ষণে আমার অশ্রুবিন্দুর উপর ও তার ঠোঁট চেপে ধরেছে। আমি সম্মোহিত। আমি প্রস্তুত। ওর দু’হাতের কোলের মধ্যে করে সেই সোফায় নিমজ্জিত হলাম। এ এক অন্য তুরাগ! এখন সেখানে তীব্র জলোচ্ছ্বাস। কখনোবা আমাকে ভাসাচ্ছে আবার ডুবাচ্ছে। কখনোবা শক্ত করে পিকাসোকে জড়িয়ে ধরি যাতে এ যাত্রায় আমরা বিচ্ছিন্ন না হয়ে পরি। এ এক অদ্ভুত আবেশ! ভেসে আসে দূর থেকে সেতারের ঝংকার। ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে আছড়ে পড়ে সোনালী রোদ। স্রোত, সুর আর মিষ্টি আলোয় স্নাত হতে হতে এক প্রশান্তিময় আচ্ছন্নতা আমাকে অবশ করে ফেলে। এক সময় আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আমার যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

আমি জানলাম প্রেম কী! ওহ পিকাসো!



পিকাসো গাড়ি চালিয়ে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে। এর আগে কখনই এতো রাত করিনি। আমার বান্ধবীরা করেছে। কিন্তু আমি একদমই ভীতু। আমার শৈশবের মধ্যবিত্ত আচ্ছাদন এখনও আমাকে অনেক হাতছানি থেকে টেনে ধরে রাখে। আবার তারুণ্যের বৈভবতার প্রেক্ষাপট অনেক মধ্যবিত্ত মূল্যবোধকেই এড়িয়ে চলার সাহস দেখাতে পারে। এই যেমন পিকাসোর বাংলোতে আজ একটি নিয়ম ভাঙলাম - রক্ষণশীল সমাজের মধ্যবিত্তের নিয়ম। প্রাশ্চাত্যের সাহিত্য আর চলচিত্রে প্রভাবিত হওয়া আমার চারপাশের ইংরেজি মিডিয়ামের বান্ধবীরা এরকম নিয়ম অহরহই ভাঙ্গছে। তাই কোন অপরাধবোধ নেই। বোধের উৎস তার পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতা। তাই কেউ দূর্নীতি করেও ভালো থাকে, সহকর্মীরা করছে বলে। আবার অনেকে বন্ধুমহলে গর্ব করে নিজেদের করা ধর্ষণের সংখ্যা গোণে - একেবারে অনুতাপহীন মানসিকতায়। মানুষ পরিবেশ গড়ে। আবার সেই পরিবেশ গড়ে মানুষ। আমি প্রথবিরোধী নয়। আমি আজকে আমার পরিবেশের কোন নিয়ম ভাঙ্গিনি। তবে সংকোচ যে কিছুটা নেই তা নয়। প্রথম তো। তাই এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরে আব্বুর মুখোমুখী হতে চাই না। গেঁটের সামনে থেমে পিকাসোকে বলেছিলাম চলে যেতে। কিন্তু ও ভদ্রছেলের মতো আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলো। আর তখনই আব্বু দরজাটা খুললেন। আমাকে এড়িয়ে পিকাসোর দিকে তাকিয়ে একটি সৌজন্যসূচক হাসি দিলেন। তাকে ঘরের ভেতর আসার আহবান জানালেন। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। পিকাসো আব্বুকে অনুসরণ করে লিভিং রুমে ঢুকল। আমাদের এই রুমটায় দেয়ালের চারপাশে জয়নুল আবেদিন, শাহাবুদ্দিন, কালিদাস আর ফিদা হুসেনের ছবি টাঙ্গানো আছে। সব কটিই অরিজিন্যাল। শাহাবুদ্দিনের পেন্টিংটা আব্বু প্যারিস থেকে কিনে এনেছিলেন। গতবছর। আব্বু খুব যে একটা চিত্রকলা বোঝেন তা নয়। পুরো ব্যাপারটাই সোশ্যাল স্ট্যাটাস। দেয়ালে থাকতে হবে বিখ্যাত আঁকিয়েদের ওরিজিন্যাল। মেঝেতে থাকতে হবে পারসিয়ান কার্পেট, লনে বেলজিয়াম ঘাস আর গ্যারেজে নিদেন পক্ষে মার্সিডিজ। এখন অবশ্য তাতেও কুলাচ্ছে না। আব্বুর এক বন্ধু নাকি একটা ট্যাক্স ফ্রী পোরশে কিনেছে। ঘরে ঢুকে পিকাসো বিভোর হয়ে জয়নুল আবেদীনের ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। দুর্ভিক্ষের ছবি। মৃতপ্রায় মা রাস্তায় শুয়ে আছে। পাশে বোধহয় তার ছেলে আর একটি কাক। মাথার উপর উড়ছে একটি শকুন। দু’দুটো পাখী আর দু'দুটো মানুষ। ছবির পাখী দুটো সুস্থ সবল কিন্তু মানুষ দুজন কংকালাসার। কী অদ্ভুত! দুর্ভিক্ষে পাখীদের পোয়াবারো। মানুষ মরলে ওদের ভোজ শুরু হয়। আব্বু পিকাসোর পিছনে দাঁড়ালেন। বললেন, “ছবিটা ১৯৪২ সালের। জয়নুল আবেদীনের। ওরিজিন্যাল। এই ছবিটি আমি সংগ্রহ করি …”

ওখান থেকে চলে আসি। আব্বু এরপর চিত্রকলা নিয়ে যত কথা বলবেন সব আমার জানা আছে। ঘড়ি ধরে বলতে পারবো পাক্কা বিশ মিনিট লাগবে। ফ্রেশ হয়ে আসতে আসতে লিভিংরুমে ঢুকে দেখলাম পিকাসো এর মধ্যে চলে গেছে। সোফার মধ্যে আব্বু চুপচাপ একা বসে আছে। আমাকে দেখেও না দেখার ভাণ করলেন। আমি স্তম্ভিত! আব্বু কী আমার সাথে সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট শুরু করছে? হ্যাঁ, তাই’ই। প্রায় একমাস আব্বু আমার সাথে কোন কথা বললেন না, দেখেও না দেখার ভাণ করলেন। এ এক নরকবাস! যেদিন নীরবতা ভাঙলেন তার পরদিন আমাকে সাথে করে অফিসে নিয়ে গেলেন। আব্বুর সেক্রেটারি মিস রমিতাকে বোধহয় আগেই নির্দেশ দেওয়া ছিল। কিছু সস্তা দরের কাপড় পড়ে এপ্রণ জড়িয়ে আমাকে একদম গার্মেন্টকর্মীদের সাথে কাজ করতে হলো। এটাকে আমি একদিনের এডভেঞ্চার হিসেবেই নিলাম। কিন্তু রাতে ডিনারের টেবিলে বিষয়টি অন্যদিকে গড়ালো। আব্বু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন কাটল আজকে সারাদিন?’

‘বেশ ভালো। একটা পিকনিক ভাব?’

‘এটি কিন্তু একদিনের পিকনিক নয়। পারবে তুমি সারাজীবন এমন কাটাতে?’

আমি খুব অবাক দৃষ্টিতে আব্বুর দিকে তাকালাম। আব্বু কখনো আমার সাথে এমন করে কথা বলেনি।

‘একজন আর্টিস্টের বউ এর থেকে ভালো জীবন কাটাতে পারে না। হাই সাহেবের অবস্থা খুব পরতির দিকে। গুজব আছে সম্পত্তি সব নিলামে উঠছে। যদি কিছু রাখতে পারে তো ছোট ছেলেটা সব পাবে। বড় ছেলেটার না সে বুদ্ধি আছে,না আছে কোন বাস্তব জ্ঞান। ছবি এঁকে আর কয় পয়সা পাওয়া যায়? তাও যদি কোন বিখ্যাত আর্টিস্ট হতো?’

‘আব্বু কেউ তো একদিনে বিখ্যাত হয় না।’

‘কেমন লাগবে তোমার যখন দেখবে যে তোমার ছবি এঁকে এঁকে বাইরে বিক্রি করছে? তাও আবার যেই সেই ছবি না একেবারে ন্যা… তুমি বুদ্ধিমান মেয়ে। বুঝতে পারছ নিশ্চয় কী বলতে চাচ্ছি।’

‘এটা কী বলছ তুমি?’

আব্বু তার সব সময়ের সহকারী এখলাসকে ডাক দিলেন। এখলাস একটা বড় ক্যানভাস নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমার সেই ছবিটা। পিকাসো এটি তার স্টুডিও এঁকেছিল। একদম আমাকে না জানিয়ে। তারপর এই ছবিটার সামনে আমরা …। অদ্ভুত ব্যাপার যে পরিবেশ একটি ছবির আবেদনকেও সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে। পিকাসোর স্টুডিওতে আমার শরীরে জড়ানো স্বচ্ছ মসলিণকে কী পবিত্র লাগছিল! অথচ এখন তা কিরকম অশ্লীল দেখাচ্ছে।

আব্বু বললেন, ‘ছবিটা চিনতে পারছ? এটি বিক্রি হচ্ছিল। আমি কিনলাম।’



এরপর অনেক সময় পেড়িয়ে গেছে। ঘটনার পরপর আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। আব্বু লন্ডনে নিয়ে আসলেন চিকিৎসার জন্য। চিকিৎসকদের মতে আমি ক্রনিক ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। এরপর আর দেশে ফিরিনি। পিকাসোকে এড়িয়ে যাবার সব পন্থাই অবলম্বণ করি। কিন্তু আমার জীবন আর আগের মতো থাকেনি। এখলাসের হাতে আমার ছবিটি দেখার ঠিক সেই মুহূর্তটির পর থেকে। সেসময়টায় আমার ঠিক কেমন অনুভূতি হয়েছিল তা এখনও মনে করতে পারিনা। ওটি আমার জন্য একটি ব্ল্যাক-আউট সময়। কিন্তু ক্যানভাসটি নয়। পিকাসো এরপর থেকে হঠাৎ হঠাৎই আমার স্মৃতিতে দুপ করে ভেসে উঠত। আমার একা থাকার মুহূর্তগুলোতে এমনটি হলে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠতে চেয়েছি। কিন্তু পারিনি। একটা বোবা কান্নার ঘূর্ণিঝড় আমার ভেতরটা বারে বারে ক্ষতবিক্ষত করেছে। সেই ঘূর্ণিঝড়টা ফিরে এলেই দেখতে পেয়েছি একটি ক্যাসভাস। সেখানে আমার ছবি। একটি বিক্রীত বিশ্বাস।

পিকাসো আমাকে প্রচণ্ডরকমভাবে মানুষকে ঘৃণা করতে শেখাল। আমি আর এরপর কাউকে বিশ্বাস করতে পারিনি।



লন্ডনে এসে এ লেভেল শেষ করে পুরাতত্ত্বের উপর পড়াশোনা শেষ করলাম। আব্বুর পছন্দ মতো বিয়ের আসরে বসে পড়লাম। লন্ডনে ওদের বিরাট পারিবারিক ব্যবসা। কাঁচা সবজি আমদানি আর রেস্টুরেন্টের। দুই প্রজন্মের ব্যবসা। দ্বিতীয় প্রজন্ম অ্যামেরিকা থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসেছে। এক-একটা চেকমার্ক দিয়ে গেলে আমার বরের সবই আছে। টাকা, ডিগ্রি, চেহারা-সুরৎ - সব। কিন্তু নীরবে যে ব্যাপারটা একটা মানুষকে গড়ে তোলে তা হচ্ছে সেই চিরাচরিত পরিবেশ। আমাদের দুজনের বেড়ে উঠার সেই পরিবেশটা খুব ভিন্ন ছিল। সে চেয়েছিল আমি শুধুই মিসেস সব্জিওয়ালা হয়ে থাকি। তাতেও আমার খুব একটা আপত্তি ছিল না। আমি তো আর খুব ক্যারিয়ারিস্ট মহিলাদের আশপাশে দেখিনি। দেখেছি মামনির মতো মিসেস হাই, মিসেস রবদের। তারা সবাই সুন্দর সুন্দর বাড়িতে থাকে, বাচ্চাদের দেখাশোনা করে আর সময়মতো পার্টি করে। এরকম জীবনের ব্যাপারে আমার তেমন আপত্তি ছিল না। সমস্যাটি ছিল অন্য জায়গায়। তাই আর আমাদের একসাথে থাকা হল না। সেপারেশনে চলে গেলাম। সরকারী একটা যাদুঘরে কিউরেটের চাকরী পেয়ে গেলাম। তেমন আহামরি বেতন না - তবে কাজটায় অনেক মজা আছে। অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হওয়া যায়। বিশেষ করে শিল্পীদের সাথে। এই চাকরীতে আমার একার ভালোই চলে যায়। আব্বু বিষয়টি একদমই পছন্দ করেননি। ডিভোর্সের আগ দিয়ে মামনি এসে একটা শেষ চেষ্টা করেছিল আমাদের মিলিয়ে দিতে। পারেনি। তবে সেবার মামনির সাথে খুব খোলামেলা আলোচনা হয়। জীবনে প্রথমবারের মতো। হয়তো এটাই শেষ।

“সাফা, তুই এভাবে চলে আসলি অথচ জামাই এখনও তোর ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। কোন শর্ত ছাড়াই। কই জামাইয়ের কী বিরাট প্যালেস আর কই তোর এই এক বেডরুমের ছোট্ট এপার্টমেন্ট! একেবারে আগরতলা আর জুতোরতলা। এটা কোন একটা জীবন হল?”

“মামনি তুমি বাবুই পাখী আর চড়ুই পাখীর গল্পটা জানো না? এটা হল আমার বাবুই পাখীর জীবন। নিজের তৈরি করা ভূবন। যেমনই থাকি নিজের পছন্দ-অপছন্দ আর মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বাস করার বাধ্যবাধকতা এখানে নেই।“

“জামাইয়ের কী অপরাধটা শুনি? একবার একটা পুলিশি কেসে নাম জড়ালো তো সব শেষ? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটি শুধু সুসময়ের বন্ধুর মতো যে একবার কেউ বিপদে পড়লে তাকে ছেড়ে চলে আসতে হবে?”

“মামনি, এটি শুধুই একটা পুলিশি কেস নয়। আমি ওর দিকের সাইড-টেবিলের ড্রয়ারে একটা ড্রাগের প্যাকেট দেখতে পেয়েছিলাম। তার থেকেও বড় কথা যখন আমি প্যাকেটটা নিয়ে তোমাদের জামাইকে প্রশ্ন করলাম তখন সে বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করলো। আমি অনেক প্রমাণ পেয়েই নিশ্চিত হয়েছি যে সে এখন ড্রাগের ব্যবসাও শুরু কয়েছে। তাকে শেষ পর্যন্ত জেলে যেতে হয়নি কারণ ওরা সেটা কোনভাবে ম্যানেজ করে ফেলেছে। সব লেভেলেই ওদের কানেকশন আছে।”

“ওরকম সৎ মানুষের বউ হতে চাইলে আমি বলব তুই এখনও রূপকথার রাজ্যে বাস করছিস। তোর বাবার অনেক কিছু মেনে নিয়ে আমি কী তার সাথে সংসার করে যাইনি?”

আরও দশবছর আগে আব্বুর সম্পর্কে এরকম কিছু বললে আমি সেটি মেনে নিতে পারতাম না। কিন্তু এখন বেশ বুঝে গেছি একই পুরুষের এক বাবা আর আরেক স্বামী হিসেবে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি স্বত্বা থাকতে পারে। কারণ দুটি স্বত্বাকে দেখা হয় দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বাবাও কখনও কখনও হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ঠতম স্বামী। আমি জানি মামনি অনেক কিছুই মেনে নিয়েছে। এই যেমন রমিতা অ্যান্টির ব্যাপারটি। আব্বুর সাথে মামনির এই নিয়ে অনেক ঝগড়া হতো। কিন্তু মামনি কখনই সেই চড়ুই পাখীর রাজপ্রাসাদের স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করতে পারেনি। এখানে প্রশ্নটা কে ভুল কে ঠিক তা নিয়ে নয়। সবারই নিজেদের পছন্দ মতো জীবন গড়ে নেবার স্বাধীনতা আছে। আবার স্বাধীনতার সাথে ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি চলে আসে। মামনি আগের প্রজন্মের। তার হয়তো এই ক্ষমতায়ন প্রয়োগের সামর্থ ছিল না। আমার আছে। আমি কী তা করবো না?

“মামনি, তুমি তো নানীর মতো জীবন কাটাওনি। ক্লাব করেছো, পার্টি করেছো। তোমার নিজেরও একটা হিসেব ছিল। একপাল্লায় ছিল আব্বুর প্রতি তোমার যত অভিযোগ আর অন্যপাল্লায় ছিল আব্বুর তৈরি করে দেওয়া স্বাচ্ছন্দ্য আর স্ট্যাটাস। তুমি দ্বিতীয় পাল্লাটি বেছে নিয়েছ। সেটি ছিল তোমার সিদ্ধান্ত, তোমার জীবন। এটি ২০১৩ সাল। আমি তো তোমার জীবনের কার্বনকপি হতে পারিনা। ঠিক তুমি যেমনটি হওনি নানীর জীবনের। তোমার মতো হিসেব কষার আমারও দুটো পাল্লা আছে। প্রথম পাল্লায় তোমার জামাইয়ের প্রতি অভিযোগের পাশাপাশি আমি আরও চাপাচ্ছি স্বাধীনতাবোধ, আত্মসম্মানবোধ, এথিক্স। দ্বিতীয় পাল্লার স্ট্যাটাসের থেকে আমার জীবনে প্রথম পাল্লাটা যে অনেক বেশি ভারী মামনি, তাই আমার সিদ্ধান্তও অন্যরকম। তুমি তোমার জীবনে যে সিদ্ধন্ত নিয়েছ তার ব্যাপারে আমি কোন জাজমেন্টাল হচ্ছি না। আমি শুধু চাইছি আমাকে তোমার জামাইয়ের কাছে ফিরে যেতে আর অনুরোধ করো না।”

মামনি এবার হাল ছেড়ে দিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “কখন আবার বিয়ে করবি? সময় তো চলে যাচ্ছে। কবে আবার মা হবি? বাচ্চাকাচ্চা না হলে বুড়ো বয়সে একা একা হয়ে পড়বি।”

“তোমার তো দুটো বাচ্চা ছিল। তারা তোমার একাকীত্ব কাটাতে পারছে? এই আমি তোমার থেকে অনেক দূরে লন্ডনে বসে আছি। ভাইয়া তো ব্যস্ত ব্যবসা নিয়ে। আর ভাবি দোতলা থেকে গুণে গুণে তিনবার একতলায় নামবে। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার। সকালে ফ্রুট স্মুদি, দুপুরে চিকেন স্যালাড আর রাতে স্যুপ। সেটার ব্যবস্থা আবার তোমাকেই করে দিতে হয়। সারাদিনে কয়টা কথা বলতে পারো ভাবির সাথে?”

না, এভাবে বলাটা হয়তো আমার ঠিক হল না। নিজের কাছেই কেমন যেন ননদীয় কূটনামী শোনাল। আর মামনিও খুব আহত হলেন। আমরা এ যুগের আত্মকেন্দ্রিক সন্তান। আমাদের জন্য ওনাদের কতো আত্মত্যাগ ছিল। তার বিনিময়ে কী পেলেন? আগের প্রজন্মকে দেখে আমরা এখন নিজেরা সাবধানী। বাবা-মায়েদের আত্মত্যাগটা তো আসলে এক ধরণের বিনিয়োগঃ সন্তানদের দুর্বল সময়ে আমরা ছিলাম, আমাদের দুর্বল সময়ে ওরা থাকবে। জীবনের চাহিদা ক্রমশ বেড়ে যাওয়াতে আগের সেই বিনিয়োগ সিস্টেমটা এখন প্রায় ভেঙ্গে পরার দশা। যারা বিষয়টি বুঝতে পেরেছে তারা খুব ভেবেচিন্তে সন্তান নিচ্ছে। আমাদের এই প্রজন্মের নারীদের খুব স্বার্থপর বলা হয়। কিন্তু আমরাই পারছি বুড়ো বয়সে ওরা আমাদের দেখবে না সেটি মাথায় রেখেই সন্তান পালন করতে। সত্যিকারের আত্মত্যাগ এটিই। যারা এই ত্যাগে বিশ্বাসী নয় তারা সন্তান নিবে না। এই কথাটি এখন বললে মামনি আরও মন খারাপ করবে। তার থেকে বরং মামনির মন ভালো করে দেওয়ার চেষ্টা করি। মামনির কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বললাম, “এখন আমরা ডিভোর্স করি সামনের দিনগুলোতে আরও ভালো থাকবো বলে, দুঃখ পুষে জীবনটা শেষ করে দেবার জন্য নয়। দেখো তোমার সব্জিওয়ালা জামাইও তার মনের মতো বউ পেয়ে যাবে আর আমিও খোঁজ পাব আমার স্বপ্নের পুরুষের।”

মামনি আমাকে জড়িয়ে ধরে হাসলেন। আমি বললাম, “হেসো না মা, বুড়ো বয়সে স্বপ্ন দেখতে নেই? অল্প বয়সের প্রিন্স চার্মিং একটি অলীক ধারণা। এই বয়সেই বরং আমরা সত্যিকারের রক্তমাংসের স্বপ্নপুরুষ রচনা করতে পারি। তুমি শুধু আমার জন্য তোমার শুভকামনা রেখো।”



এই ছোট্ট এপার্টমেন্টের আমার এই জীবনটা কখনও যে থমকে দাঁড়ায় না তা নয়, তখন নানাভাবেই এই জীবনকে গতিময় করে তুলি। মিট-আপ গ্রুপে আমাদের বান্ধবীদের দলটি সুযোগ পেলেই ইউরোপের কোন দুর্গম অঞ্চলে চলে যাই। গত বছর ঠিক করেছিলাম সবাই মিলে ভারত যাব। পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত। ভারতে মহিলা টুরিস্টদের উপর যেরকম ধর্ষণের কাহিনী প্রচার পাচ্ছে তাতে আর আমাদের সাহস হয়ে উঠলো না। ট্রেসি খুব মজা করে বলে, “তোমরা এশিয়ানরা আসলে খুব হিপোক্রেট। পশ্চিমাদের খোলামেলা জীবন নিয়ে তোমরা খুব সমালোচনা করো। আর এখন টুরিস্টরাও তোমাদের ওখানে নিরাপদ নয়। না জানি ঘরে ঘরে কী হয়। তোমাদের শুধু খাবারই অভাব না, সেক্সেরও অভাব। নইলে সবাই এরকম হামলে পড়ে ধর্ষণ করে কেন?”

ট্রেসি আমার খুব ভালো বান্ধবী। আবার সহকর্মীও। এ বিষয় নিয়ে ওর সাথে আর তর্ক করি না। করলে সেটা হিপোক্রেসি হতো। বাংলাদেশের কথাই ধরি, এখানে মানুষের অভাব নেই, কিন্তু যৌনকাতর মানুষের সংখ্যা অগণিত। একটু ভীর বা আড়ালের মধ্যে সেসব মানুষজনের ক্ষুধার্ত হাতগুলো পিপাসা মিটিয়ে নিতে চায়। তবে সমাজের উপরতলা আর নীচের তলার হিসেব কিছুটা আলাদা। মাঝখানের মানুষজনেরা পড়েছে বেশি বিপদে। চাকরী না হলে তারা বিয়ে করতে পারে না। বিয়ে না করতে পারলে ক্ষুধা মেটাতে পারে না। তাই তাদের চুরি করতে হয় বাসের ভিড়ে, ডাকাতি করতে হয় বাসার দুর্বল কাজের মেয়ের উপর হামলে পড়ে। বিবাহিত মানুষজনেরাও কি ধোয়া তুলসীপাতা? অপরিতৃপ্ত হৃদয়ও ক্ষুধার্ত রয়ে যায়। যেনতেন রেসিপিতে কার মন ভরে? হাতের কাছে ভরা কলস, তবু তৃষ্ণা মেটে না। না, এসব নিয়ে কথা বলা যাবে না। পুরুষদের থেকেও ভয় নারীকূলের তীব্র সমালোচনা। তারা শুধু মনে করে দশ রকম পদ রেঁধে পুরুষের পেট ভরিয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করতে হবে। এর বাইরে আর নতুন কোন পথের সন্ধান তারা চান না। তবে ট্রেসির সাথে নিজের দেশের সমালোচনা করতে চাইনা। কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বলে উঠি, “এখানেও তো ধর্ষণ হচ্ছে। তার কারণ কী?”

“সব দেশেই কিছু না কিছু সেক্স ম্যানিয়াক থাকে। এখানে সাবওয়েতে তো নিয়মিত চড়ছো। তোমার কি মনে হয়েছে একটু ভীড়-ভাট্টা হলেই ছেলেরা মেয়েদের শরীরে হাত বুলতে চাচ্ছে?”

এই জন্যেই ট্রেসির সাথে আমি তর্কটা করতে চাইনা। ওর অনেক পড়াশোনা। ওর সাথে সাথে আমিও একটা বুকক্লাবের মেম্বার। আমরা অনেক কিছুই একসাথে করি। চাকরীর জায়গায় আমাদের দুজনের শিফট দুই-একটা বিশেষ দিনে আলাদা হয়ে যায়। যেমন আজকে ওর দিনে আর আমার বিকালের শিফট। কিছুক্ষণ আগে আমাকে সে ফোন করে বলল প্যারিস থেকে গতকাল যে শিল্পী এসেছেন তার উপর ট্রেসির ক্রাশ হয়েছে। কিছুক্ষণ পর অন-এয়ারে বিবিসি থেকে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচার করা হবে। আমাকে অবশ্য বিকেল থেকেই সে শিল্পীর সাথে সময় কাটাতে হবে। গ্যালারীতে তাঁর চিত্রপ্রদর্শণীর দায়িত্ব আমার।

১০

সকাল আর দুপুরের খাবারটা আজকে এক সাথে প্রস্তুত করে নিলাম। আট আউন্স এলমণ্ড দুধের সাথে এক টেবিল চামচ অরগ্যানিক প্রোটিন পাউডার, একটা কলা আর আধ কাপ ওটমিল। সবকিছু একসাথে মিলিয়ে লাই বানিয়ে নিলাম। এখন বেলা বারটা। রাত আটটা নাগাদ এই দিয়ে বেশ চলে যাবে। বাসার মধ্যে খুব একটা রান্নাবান্না করা হয়না। উৎসাহও নেই, পারিও না। আমার বিয়েটা না টেকার পেছনে এটাও একটা কারণ ছিল। লন্ডনে জন্ম, লন্ডনে বড় হয়েছে, তারপরও বাঙালি বউ দশ রকম মিষ্টি বানাতে জানে না সেটি তার কাছে একটি বিস্ময় ছিল। তারপর উপর আমার পছন্দ গ্রিন টি। গ্রিন টির কথা মনে হতেই মাথার মধ্যে কী জানি ক্লিক করে উঠলো। রিমোটে বোতাম চেপে চ্যানেল সচল করলাম। যা ভেবেছিলাম তাই। সেই’ই। পিকাসো। মাথায় টাক পড়েনি, একটুও মোটা হয়নি। বয়স কেন মানুষকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে? সময় কেন ঘৃণার তেজ মিইয়ে দেয়? নাকি আমার মধ্যে দার্শনিক-উদারতা ভর করেছে? সাক্ষাৎকারটা মাঝ পথে। উপস্থাপক জিজ্ঞেস করছেন,

‘তারপর আপনার সেই অনুপ্রেরণার সাথে আর দেখা হয়নি? কোন যোগাযোগ হয়নি?’

‘না, যেভাবে আকস্মিক সে আমার জীবনে এসেছিল ঠিক সেভাবে হঠাৎ করেই সে হারিয়ে যায়। তার বাসায় অনেক চিঠি লিখেছিলাম। কোন চিঠির উত্তর পায়নি। ফোন করেছিলাম। তার পরিবার থেকে জানিয়েছে সে আর আমার সাথে কোন যোগাযোগ রাখতে চায়না।’

‘তাঁর কোন চিহ্ন নেই?’

‘আমি তার একটাই ছবি এঁকেছিলাম। কিন্তু সে ছবিটা আমার স্টুডিও থেকে চুরি হয়ে যায়।’

‘আপনি কী তার জন্যই অবিবাহিত থেকে গেছেন?’

‘আসলে উত্তরটা আমি নিজেও জানি না। আমার সংগ্রামের সময়টাতে অনুপস্থিত থেকেও সে আমাকে যেভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছ, সেসময় হাত ধরে দুজন পাশাপাশি চললে এর হিতে বিপরীতও হতে পারতো। যে স্পেসটা আমি পেয়েছি সেটি হয়তো পেতাম না। ও খুব স্বাচ্ছন্দ্যে বড় হয়েছে। আমার সেই সংগ্রামী জীবনের সাথে সে মানিয়ে নাও নিতে পারতো।’

‘আর এখন যদি তার দেখা পান?’

‘সে হয়তো এখন বেশ সুখে আছে। হয়তো তার দুটি সন্তান আছে। ওদের কাছে সে আমার থেকেও বেশি জরুরী। আমি শুধু ওকে একটাই প্রশ্ন করবো, আমার কী অপরাধ ছিল?’

সেল ফোনটা বেজে উঠলো। ট্রেসির ফোন। ধরলাম না। থাক ট্রেসি ওর ক্রাশ নিয়ে। আমার কিছুটা সময় একা থাকার দরকার। অনেক বছর ধরে বুকের ভেতর আটকে থাকা এক বোবা কান্নার ঘূর্ণিঝড় দমকা বাতাসের মতো বাইরে বেড়িয়ে যাচ্ছে। ভার নেমে গেলে যেরকম হাল্কা বোধ হয়, আমার সেরকম হচ্ছে। আব্বু তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমাদের বিচ্ছেদ পিকাসোকে শিল্পী বানিয়েছে আর আমি পুতুল থেকে হয়ে গেছি সত্যিকারের মানুষ। এই পিকাসো একদিন আমাকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছিল, আবার আজ এই পিকাসোই আমাকে ক্ষমা করতে শেখালো।


১১

আমি এখন গ্যলারীতে ছুটছি। আজ পিকাসোর সাথে আমার অনেক বোঝাপড়া আছে। আমার জীবনটা তো একটা সাদামাটা ক্যানভাস হতে পারতো - দুলাইনেই যার গল্প শেষ। পিকাসো সেটি হতে দিল না। বার বার সেখানে সে রংয়ের আঁচর বুলিয়েছে। আমি ভালবাসতে জানলাম; সাহসী হতে শিখলাম; প্রেম বুঝলাম; ঘৃণা, অবিশ্বাস আর ক্রোধে ফেটে পড়লাম; ক্ষমার মহাত্ম অনুভব করলাম - সব শেষে জানলাম মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন