বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

নাসরীন জাহান'এর গল্প : গরঠিকানা

ছেলেটাকে কুড়াল দিয়ে দু'টুকরো করে কাদের আলি যখন উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে গ্রামের শেষ মাথার নদীটির সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। সামনে বেমক্কা দমকা হাওয়া, কখনো নিথর নিস্তরঙ্গ, কখনো এমন চাপড় লাগায়, চমকে উঠতে হয়। প্রকৃতির এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় নদীর জল পড়েছে বিপাকে। ভাগ্যিস ঘুটঘুটে আঁধার নামছে, নইলে বাতাসের এহেন আচরণে স্রোতের আঁচল একদিকে টানতে গিয়ে অন্যদিক মাঝে মাঝেই যেভাবে উদোম হয়ে পড়ছে, বিষয়টা তাকে রীতিমতো বেইজ্জত করে ছাড়ত।


কিন্তু কাদের আলি কি আদৌ নদীর সামনে আছে?

তার সারা শরীরে ছিটকে থাকা রক্তের এক ফোঁটা তরলও এখন বাতাস শুষতে পারে নি, এর মধ্যে জঙ্গল থেকে বেরোতেই বিকট এক ঘুড়ি আকৃতির শকুন তাকে সারাপথ ধাওয়া করতে করতে নদী অবধি এনে ফেলেছে। শকুনটাকে সে জঙ্গল থেকে বেরিয়েই দেখেছিল, আসমান ছেড়ে পাখার ভারে ক্লান্ত হয়ে একটা মরা গাছের কাটা গুঁড়িতে জুতমতো বসার কায়দা করছিল। তখন পর্যন্ত খুনিটি কাদের আলির ভেতর জ্বলন্ত ছিল। শকুন দেখে তা একেবারে লেলিহান হয়ে উঠল। সেই ধাঁই ধাঁই করে কুড়ালটাকে ওটার ওপর ছুড়ে মারতেইÑ ব্যাটা ছুট ছুট!

কিন্তু বেশ কিছু দূর এসে কানের কাছে খাঁখাঁ বিরান প্রান্তরে কী এক বোঁ শব্দ শুনে মাথা তুলতেই দেহের রক্ত জল হয়ে গেল। শালা সাক্ষাৎ টিকটিকির ভূমিকা নিয়েছে। কাদের আলিকে সে পালাতে দেবে না।

পশুদের এরকম ধুরন্দর আচরণে কাদের আলি অভ্যস্ত না। যদিও সে এই গল্প শুনেছে, জোড়া গোখরোর একটাকে মেরে ফেললে, যে মারে সে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গেলেও অন্যটা প্রতিশোধ নেয়। কিন্তু কুড়ালের তাড়া খেয়েও খুনির পেছন ধাওয়া করতে পারে কোনো শকুন, তাও দলে ভারি থাকলে একটা কথা ছিল... একলা... মাস্তানী আর কী... এই বিষয়টা কাদের আলির বোধের মধ্যে কখনো ছিল না।

মাথা থেকে পা পর্যন্ত এতক্ষণ একটা দাউদাউ আগুন ছিল, সুতোহীন পোশাকের মতো ক্রমশ তা পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়তে থাকায় কাদের আলি প্রচণ্ড শীত বোধ করে, শকুনটা কি আমাকে চলন্ত শব ভাবতে শুরু করেছিল?

ছায়া আকাশটা ঘাই খেয়ে ঢেউ খেয়ে কাদের আলিকে গভীর সাগরে রেখে কোথায় যে চলে যাচ্ছে। না, শকুনটা নেই। সে ক্ষিপ্রচোখ চারদিকে ঘোরায়, না নেই। এতক্ষণ সে নিজের মধ্যে ছিল না। কী এক পৈশাচিক দাবানল তাকে তাড়াতে তাড়াতে এ্যাদ্দুর নিয়ে এসেছে। পা ছিঁড়ে গেছে, অকৃষ্ট আলের ঘাস-কাঁটায় লুঙ্গি জড়িয়ে গেছে, কিচ্ছু সে টের পায় নি, যেন কিছুক্ষণের জন্য সে আচমকা দোযখের এমন এক বাসিন্দা হয়ে উঠেছিল, দোযখের আগুন যার চামড়ায় আলাদা কোনো উপলব্ধি দেয় নি।

এইবার নদী সামনে।

পেরোতে হলে ওপার থেকে হাত ইশারায় মাঝিকে ডাকতে হবে। তার সাথে কিঞ্চিৎ বিরতি। তার সাথে নিজের সামনে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়ানোর সুযোগ।

রক্তাক্ত দু’হাত আবছা ছায়ায় মেলে ধরতেই বোঁ বোঁ করে ওঠে মাথা। সে ধপাস করে ঘাসের ওপর বসে পড়ে।

সামনে কী ঘনকালো আঁধার নামছে!

তারও ওই পারে পারুল ফুলের মতো গোল গোল আলোর ফুটকি জ্বলতে শুরু করেছে। বিক্ষিপ্ত জলের ওপারে সেই কমলা চাকতিগুলো যেন আঁধারের প্রাণ। আঁধার নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কাদের আলি ভঙ্গুর নখগুলো দিয়ে মুখের চামড়া খামচে ধরে... বিছানার ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে পদ্মিনী... না, আয়েশা... না, পদ্মিনী... আয়েশা, পদ্মি... আয়ে... সব কেমন জট পাকিয়ে যায়। বুক থেকে হাঁটুর তল অব্দি ঢেকে উঁচু বুকে নিঃশ্বাস টানছে আয়েশা... ওই তো ছেলে কোলে নিয়ে গান গাইছে, সন্ধ্যায় বেড়ার ফোঁকড় দিয়ে দেখছে কাদের আলির দোকান থেকে ফিরে আসা। বিয়ের পরে একবারও তার ভাবার প্রয়োজন পড়ে নি, মেয়েটাকে সে প্রথম কোথায় দেখেছিল। কেবল আচমকা জল ফুঁড়ে যেভাবে একটা মাছ লাফ দিয়ে ফের জলের তলায় ডুবে যায়, তেমন করে মাঝে মধ্যে তন্দ্রায় অথবা অলস প্রহরে কাদামাখা সেই ফর্সা সুন্দর রূপ, দু’হাত ভর্তি ছিল মাটি দিয়ে; দোল দিয়ে উঠত, মনে হতো ওটা তার নিষিদ্ধ জগতের স্বপ্নের কেউ ছিল। ও আয়েশা ছিল না। ও পদ্মিনী, যাকে সে তার চাচার সাথে মূর্তি বানাতে দেখেছিল, তাকে সে এই জীবনে পায় নি, সে তার স্ত্রী হয় নি, আয়েশা অন্য কেউ। যে কাদের আলির জীবন এবং ধর্মের মধ্যে নিজেকে উপুড় করে নিয়েছিল, সে কখনো পদ্মিনী ছিল না, কখনো মূর্তি বানায় নি।

ওই তো সামনের কল্লোলিত আঁধার ফেনায় সব ভাসছে। যেন বহুকাল পর সার বেঁধে স্মৃতিগুলো আসছে। আহা মূর্তি বানাতে দেখে কাদামাটি ভর্তিও মেয়েটাকে কী রূপসী-ই না মনে হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে বেহেশতের হুরির লোভ, দোযখের ভয় সব সরে গিয়ে সমস্ত অস্তিত্ব অসাড় করে রেখেছিল একটাই অনুভব-- এই নারীকে তার চাই। এ না হলে জীবনের সবকিছু অর্থহীন। যথারীতি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ধর্ম। কাদের আলি খুব একটা অবস্থাপন্ন গৃহের সন্তান না হলেও তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা তেজ ছিল যা কেবল জমিদার কিংবা রাজরাজড়াদের থাকে। যখন সে টের পেল বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধর্ম... তখন এই বিষয়টাকেই আগে ভাঙতে সে আগ্রাসী হয়ে উঠল। বাড়িতে সে নামাজ রোজা সব ছেড়ে ক্রমশ বিবাগী হয়ে যেতে থাকলো। কাদের আলির জেদ সম্পর্কে সবাই জানত। ফলে বাড়ির মুরুব্বিরা পড়ল মহামুশকিলের মধ্যে। তারা নানাভাবে তাকে বোঝাল একটা হিন্দু মেয়েকে বিবাহ করার শাস্তি আল্লাহর দরবারে কত কঠিন হতে পারে।

কাদের আলি ঠোঁট উল্টে বলে, যার ইহকালের কোনো ঠিকঠিকানা নাই, পরকালের শান্তিরে ডরায়া তার কী লাভ? এইসব কোনো যুক্তির কথা? বুদ্ধির কথা? সবাই যখন এ নিয়ে অতল সাগরে নিমজ্জিত, তখন এক সন্ধ্যায় কাদের আলি পদ্মিনীকে বিয়ে করে এই বাড়ির দরজায় পা রাখল।


নদীর মধ্যে থেকে কী একটা ভুস করে উঠল।

ছটফট করতে করতে কাদের আলি দাঁড়ায়। গলায় কেউ যেন রশি দিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে, সে মহাশূন্যের দিকে তাকায়, মোষের মতো কালো চামড়ায় পানসে নক্ষত্র ফুটতে শুরু করেছে... মাঝখানের দুটি তারা যেন দুটি শিশুচোখ, গলা চেপে ধরে বমির মতোন ছিটকে আসে একটি শব্দ, আকবর আলিরে...এ...এ...।

ওই যে ক্ষুদে আকবর মাথায় জরির টুপি পড়ে বাপের আঙুল ধরে মসজিদে যাচ্ছে নামাজ পড়তে, ওই যে মায়ের হাতের তসবি নিয়ে হুল্লোড় করতে করতে মায়ের সুরার সংখ্যায় গণ্ডগোল লাগিয়ে দিচ্ছে। আর তার মা ? বিয়ের সময় কী সাহসী! কী প্রেম তার! ইমাম সাহেবের সামনে নিষ্কম্প কণ্ঠে লা ইলাহা পড়ে মুসলমান হয়ে বাসরশয্যায় স্বামীর উষ্ণ আলিঙ্গনে নিজেকে ছেড়ে দিয়ে বলেছিল, তুমি আমার ধর্ম... ইহকাল পরকাল।


একসময় পদ্মিনীকে নিজের কব্জায় পাওয়ার উত্তেজনায় কাদের আলির সর্বাঙ্গের আগুনে ঝিম ধরে, এই স্বপ্নের পরী তার আয়ত্তে, কোনো রাজপুত্রের সাথে এ জন্যে তাকে যুদ্ধ করতে হয় নি, প্রচুর অর্থ খরচ হয় নি, ধানচালের কারবারি তাগড়া দেহের অধিকারী সে, যথেষ্ট যৌতুক সহকারে বিবাহ করতে পারত, আফসোস এইটুকুই। কিন্তু মাথার মধ্যে এমন একটা জ্বলন্ত আগুন রেখে সে যৌতুকের টাকা নিয়ে কী করত? বরং ওকে দেখার পর তার ব্যবসা লাটে উঠেছিল, পাগল প্রেমে পড়ে বুদ্ধিমান থাকা সম্ভব? না, ধর্ম কোনো সমস্যা করে নি। বরং একটা হিন্দু মেয়েকে মুসলমান বানিয়ে বিয়ে করে সে বেহেশতের একটা শেয়ার কিনেছে। ধর্মগ্রন্থে তো এমনই আছে, মা-বাবাকেও সে তাই বুঝিয়েছিল। তার নিজের মধ্যেও তখন পর্যন্ত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোনো উপলব্ধি ছিল না। কিন্তু মায়ের কাছে যখন পদ্মিনী কায়দা পড়া থেকে শুরু করে কোরআন শরীফ পড়তে শুরু করল, আর কারবালার কাহিনী বয়ান করতে করতে চোখে জল তুলতে শুরু করল, রক্তে মাংসে আয়েশা হয়ে উঠতে থাকা এই নারীকে কাদের আলি নতুন সৌন্দর্যে আবিষ্কার করতে শুরু করে।

দিন যায়।

সংসারে সন্তান আসে। সন্তান বড় হতে থাকে। আশ্চর্য মাটির প্রতিমা পদ্মিনী, কোনোদিন তার অতীত জীবন, তার ধর্ম কিচ্ছু নিয়ে ওকে কাদের আলি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখে নি। কাদের আলি প্রশ্ন করলে বলতÑ এতে আপনের মনে যদি বিষ ঢুইক্যা যায়? আমি তো কইছিই আমার ইহ পর সব কাল আপনি।

ক্রমশ কাদের আলি টের পায় মেয়েটি এই একটি শক্ত গেড়ো দিয়ে তাকে সারা জীবনের জন্য বেঁধে ফেলেছে। সে যদি বাপ-ভাইকে স্মরণ করত, এই ধর্মটাকে সহজভাবে না নিতে পারত, তবে কাদের আলির যে মেজাজ, ওকে হয়তো মেরেই ফেলত। সে মেয়েটাকে রাতের পর রাত বুঝিয়েছে, পদ্মিনী কত ভাগ্যবান। সে যদি ধর্মান্তরিত না হয়ে এখনো ওখানে পড়ে থাকত, তবে কী ঘোর অন্ধকারে পড়ে থাকত তার জীবন। সে ইসলাম ধর্মের মহান নবিদের সম্পর্কে আলোচনা করেছে, বিবি ফাতিমা, খলিফা ওমর...। এছাড়া অল্প পুণ্যে কত বড় প্রাপ্তি বেহেশতে ঘটবে। অল্প পাপে কী ভয়ানক দোযখ...। এইসব বলে বলে যখন মেয়েটাকে প্রাণের মধ্যে চেপে ধরেছে, একদিন সেই মেয়ে বড় আজব প্রশ্ন করে, আমি মুসলমান না হইলে আপনে আমারে বিয়া করতেন?

কী? কী কইলা তুমি? দুইজন দুই ধর্ম নিয়া এক সংসারে? কী কইলা তুমি? তুমি হিন্দু হইলে... হেঃ হেঃ তাইলে তো বিয়াই জায়েজ হইত না, কাজি বিয়া পড়াইত না।

কী এক গভীর নিঃসীমে তলিয়ে গিয়েছিল পদ্মিনী। এরপর সে কখনো এ ধরনের কথা আর বলে নি। সে বিশ্বাস করেছিল স্বামীর সেই কথা, তাকে ইসলামের আলোতে এনে তাকে অনন্ত জীবনের জন্য রক্ষা করেছে কাদের আলি।

দিন যায়।

ছেলের মুসলমানি করার সময় ঘনিয়ে আসে। ইতোমধ্যে ধর্মেকর্মে গভীরভাবে মন দিয়ে কাদের আলি ধর্মপ্রাণ মানুষ হয়ে উঠেছে। ওয়াজে যায়, তবলিকে যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। স্ত্রী সরষের তেলে ইলিশের টুকরো ছেড়ে দিয়ে স্বামীকে দেখে মাথায় আঁচল টানে। তার মধ্যেও পরিবর্তন আসছে। গম্ভীর আর ভারিক্কি হয়ে উঠতে শুরু করেছে সে। কাদের আলির বাবা গত হয়েছেন। মা মৃত্যুশয্যায় শুয়ে নাতির মুসলমানি দেখে যাওয়ার আশা পোষণ করেছেন।

কাদের আলি সাধ্যমতো গ্রামের গরিব দুঃখীকে দাওয়াত করে। ছেলে মায়ের বুকে গুতো খেয়ে খেয়ে প্রশ্ন করে, মা মুসলমানি কী? আয়োজনের চেয়ে কাদের আলির হাঁকডাকেই বাড়ি গরম হয়ে উঠেছে। সে রান্নাঘরের সামনে বসে রসালো কণ্ঠে পদ্মিনীকে প্রশ্ন করে, কী হে আকবরের মা, ছেলের বিয়া দিতে কেমন লাগতাছে? কেমন যেন আচ্ছন্নের মধ্যে আছে পদ্মিনী। সকালের কাঁচা বাতাসে কাঁচা রোদ্দুরে আশ্চর্য এক রহস্য খেলে যাচ্ছে তার মুখে। যেন সে নিজের মধ্যে নেই, কিছু তার ওপর ভর করে আছে। স্বামীর কথা শুনে পলকে চোখ তোলে, মুসলমানি কী?

কী? কী জিগাইলা তুমি? তুমি জানো না মুসলমানি কী? কী হইছে তোমার?

না না তুমি যে কইলা, বিয়া?

ঠাট্টা বোঝ না? অনাবিল হাসিতে ঘর ভাসিয়ে কাদের আলি কাচারি ঘরের দিকে হেঁটে যায়। আয়েশা, আইজ তোমার হইল কী?


আঁধারে স্রোতগুলি সাঁতার কাটছে। বাতাসের বেগ বাড়ছে। ঝিঁঝি পোকা, শেয়াল... আড়মোড়া দিয়ে উঠছে রাত্তিরের প্রাণীগুলো। কাদের আলির বোধ হয় সে এই পৃথিবীতে নেই... রক্ত... রক্ত... কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! যেন কোরবানিতে বাছুর জবাই হয়েছে... না-না, ও আকবর ছিল না, অন্য কেউ, অন্য কোনো শিশুজন্তু... ইব্রাহিম যেভাবে নিজ সন্তানকে কোরবানি দিয়েছিলেন! হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! কোন সে মনের বলে ইব্রাহীম এই কাজ করতে পেরেছিলেন ? না, আমার কোনো অতীত নাই, ভবিষ্যৎ নাই, আমার ধড়ের মধ্যে কোনো প্রাণ নাই... আমি মানুষ না। অস্পষ্ট ভেসে আসে স্ত্রীর মুখ। কাদের আলি দাঁতে দাঁত চাপে... পাপিষ্ঠা!

দুটি পা কাদামাটির মধ্যে ঠেসে যেতে থাকলে পরক্ষণে সে কেমন বোকার মতো হেসে উঠতে চায়... লাগ ভেলকি লাগরে... না না না... ওহ্ হো হো আকবর... যেন কেউ তার মস্তক বরাবর প্রস্তরখণ্ড ছুঁড়ে মারল, বোধশূন্য অবস্থায় সে ফের মাটির ওপর বসে পড়ে। না, দুঃস্বপ্ন সব। সে এখন ঘরে যাবে, বাতি জ্বালিয়ে পাখা হাতে এগিয়ে আসবে স্ত্রী, বারান্দায় বসে নামতা পড়বে আকবর। না, সে খুন করেছে! সে তো আকবরকে মারতে চায় নি। কোপ বসিয়েছিল পদ্মিনীর উদ্দেশ্যে। সে ধর্ম বাঁচাতে এ কাজ করেছে। কিন্তু ছেলেটা মাকে বাঁচাতে গিয়ে...।


উৎসব শেষ।

নতুন লুঙ্গি পরে আকবর মা’র কোল ঘেঁষে বসে আছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। পদ্মিনীর আচ্ছন্নতা কাটে না। খিড়কি দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে কোন বাতাসে যে সে উন্মনা হয়! কাদের আলির চোখে তন্দ্রা এসেছিল। স্ত্রীর মনোব্যারাম দেখার সময় তার নেই।

ঘুম ভেঙে সে স্ত্রীকে খুঁজে পায় না।

পুত্রকে পায় না। সারাবাড়ি খোঁজে। সারা পাড়া খোঁজে। নেই। কেউ একজন বলে, উত্তরের জঙ্গলের দিকে ওদের যেতে দেখেছে। বিস্ময়ে ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য কাদের আলি কাউকে সাথে না নিয়ে একলা জঙ্গলে যায়। ঘরের পর্দা পেরিয়ে কোন সে রোগে পদ্মিনী জঙ্গলে যায়, এর বিচারের মধ্যে সে কাউকে রাখতে চায় না।

খট খট।

ঘন বুনো লতাপাতায় আচ্ছন্ন বনে কী যেন কাটার শব্দ। পায়ের নিচে রাজ্যির শুকনো পাতা, মাটির ঢেলা। গাছ ধরে ধরে কিছুদূর হেঁটে সে দেখে, গ্রামের হারানলাল গাছ কাটছে। আকবরকে দেখে সে অদ্ভুত ঠোঁটে হেসে ফের গাছে জোর কোপ লাগায়। ওই তো কিছুদূরে খোলা জায়গা!

ওই তো, আকবর! পদ্মিনী!


কাদের আলি টাল খেয়ে পাক খেয়ে ছুটতে ছুটতে কাছে গিয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়। পদ্মিনীর সারা গায়ে মাটি লেপটে আছে। সামনে একটা ক্ষুদ্রাকৃতির কালীমূর্তি। তারই সামনে পড়ে মা আর ব্যাটা মিলে উপুড় হয়ে কাঁদছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন