বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

সাম্প্রদায়িকতার গভীর অসুখ নিয়ে কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমানের সঙ্গে আলাপ : যে লেখক বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ, আমি তাকে লেখক মনে করি না।

সাম্প্রদায়িকতা আমাদের এই ভূখণ্ডের গভীর অসুখ। এ অসুখ একই সঙ্গে মর্মঘাতী ও প্রাণঘাতী। এর কোনো নিরাময় এখনো পর্যন্ত মেলেনি। অদূরভবিষ্যতে মিলতে পারে বলেও কোনো আশা দেখা যায় না।
এই অসুখের কবলে পড়ে ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন। দেশ ছেড়েছেন। নিঃশ্ব হয়েছেন। সমষ্টিগত বিষাদ বহন করতে হচ্ছে বংশ পরম্পরায়।

এর নিদান হিসেবে ধর্ম-সম্পদায় অনুসারে দেশভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার অসুখ সারার লক্ষ্মণ দেখা যায়নি। ১৯৫০, ১৯৫৪ , ১৯৬৪ সালে রক্তক্ষয়ী হামলা ঘটেছে ধর্ম-সম্প্রদায়ের মধ্যে।

অসাম্প্রদায়িক দেশ  নির্মাণ করার আকাঙ্ক্ষায় বাংলার পূর্ব ভূখণ্ডে ৩০ লক্ষ মানুষ আত্মত্যাগ করেছিল। জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ১৯৯২, ২০০১, ২০১৪, ২০১৬ সালে পুরনো কৌশলে সেই সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবল হেনেছে।
এই মর্মভেদী বিষয়গুলো নিয়ে গল্পপাঠের প্রকাশক মৌসুমী কাদের কথাসাহিত্যিকদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। আলাপে অংশ নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান।  নিচে সেই আলাপগুলো পত্রস্থ হলো--

প্রশ্ন  ১. মৌসুমী কাদের : 
ইদানীং ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ বিষয়টি নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে । সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক ‘মানুষ’ আদৌ আছে কি? একজন লেখক কতটা অসাম্প্রদায়িক হতে পারেন?



১. স্বকৃত নোমান : 
সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক মানুষ নিশ্চয়ই আছে। আমি তো প্রায়ই ঘুরে বেড়াই। সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক মানুষের সন্ধান করে বেড়াই। হাটে মাঠে ঘাটে এমন অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, যারা প্রকৃত অর্থেই অসাম্প্রদায়িক। তারা আমাদের মতো পুঁতিগত বিদ্যায় বিদ্বান নন। তারা সহজিয়া মানুষ। তারা অসম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করেন, লালন করেন, চর্চা করেন। তাদের নিয়ে আমি লিখেছিও বিস্তর।

নবী ও কবির মধ্যে ফারাক আছে। কবি মানে লেখক বোঝাচ্ছি। নবীর কাজ ধর্ম প্রচার। লেখকের তা নয়। লেখক তার পাঠকের বুদ্ধির মুক্তি ঘটান। বুদ্ধির মুক্তি ঘটলে যে কোনো মানুষ সাম্প্রদায়িক থাকতে পারে না। লেখককে প্রচলিত সকল ধর্মমতের উর্ধ্বে উঠতে হয়। অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক। অসাম্প্রদায়িকতা বলতে আমি নাস্তিকতা বোঝাচ্ছি না। নাস্তিকতা মানে অসাম্প্রদায়িকতা নয়। অসাম্প্রদায়িকতা মানে সব ধর্মমতকে অস্বীকার করাও নয়। পাঁচ অক্ত নামাজ পড়ে কিংবা নিত্য পুজা করেও একজন মানুষ অসাম্প্রদায়িক হতে পারেন। এমন বহু অসাম্প্রদায়িক মানুষ আমি দেখেছি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বিজয়া-সম্মিলন’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘যে চাষী চাষ করিয়া এতক্ষণে ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণে ফিরাইয়া আনিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নমাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো।’ তাঁর এই কথাতেই অসাম্প্রদায়িকতা নিহিত। লেখক হবেন ঠিক এমনই। সবাইকে তিনি সম্ভাষণ করবেন। মানুষকে তিনি মানুষ হিসেবে দেখবেন। যে লেখক বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ, আমি তাকে লেখক মনে করি না। তিনি লেখক হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতে পারবেন না। তার সকল নিবেদনই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।



প্রশ্ন ২. মৌসুমী কাদের
একজন মহৎ লেখকের দায়বদ্ধতার জায়গাটি থেকে অসাম্প্রদায়িকতার গুরুত্ব কতটুকু?


২. স্বকৃত নোমান : 
লেখক তো তার লেখার কাছেই দায়বদ্ধ। লেখক তার লেখার কাছে দায়বদ্ধ থাকলে আপনাতেই অসাম্প্রদায়িকতা এসে যাবে তার লেখায়। আর যদি সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলি, তাহলে বলতে হবে, লেখক তো আর ইউটোপিয়ার অধিবাসী নন। যে কোনো একটা সমাজেই তার বসবাস। সেই সমাজের ভালো-মন্দের সঙ্গে তাকে থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যে দেশের মানুষ এখনো রাস্তায় থুতু ফেলে, বাসের জানালা নিয়ে ঠেলাঠেলি করে, ধর্মের মোহে আরেকজনের মাথায় বাড়ি মারে, ধর্মের জন্য চাপাতি নিয়ে অন্যের ঘাড়ে ঝাপিয়ে পড়ে, সেই দেশের কোনো লেখক সামাজিক দায়বদ্ধতাহীন থাকতে পারেন না। থাকা উচিত নয়। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তাকে অসাম্প্রদায়িক হতেই হবে। হতে না পারলে, ঐ যে আগেই বলেছি, তার সকল নিবেদনই ব্যর্থ। তার মধ্যে আর একটি সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। বেহুদাই তিনি কাগজ-কালি নষ্ট করতে থাকবেন।


প্রশ্ন ৩. মৌসুমী কাদের : 
 ব্যক্তি জীবনের ‘সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতা’ লেখক হিসেবে প্রকাশ করবার সময় কতটা ‘নৈর্ব্যক্তিক’ হওয়া সম্ভব?

৩. স্বকৃত নোমান : 
নৈর্ব্যক্তিক হওয়াটাই তো লেখকের সাধনা। এই সাধনায় তাকে জয়ী হতে হয়। অবশ্যই। নইলে তিনি লেখক কিসের?



প্রশ্ন ৪. মৌসুমী কাদের
সমাজকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে লেখক যখন কোন একটি সম্প্রদায়কে সমর্থন করতে বাধ্য হয় (যেমন সংখ্যালঘু) এবং তিনি যদি সেই একই গোষ্ঠিরই লোক হন তখন কি উপায়ে লিখলে ‘পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে’ বলে মনে হবে না।

৪. স্বকৃত নোমান : 
 লেখক কোনো কিছুতে বাধ্য নন। হতে পারেন না। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ বা খৃষ্টান সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি যেমন সোচ্চার থাকবেন, বাংলাদেশে শিয়া বা আরাকানে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার থাকবেন। নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়কে তিনি সমর্থন করবেন কেন? হ্যাঁ, ক্ষেত্রবিশেষ যদি তিনি সমর্থন করতে বাধ্য হনও, সেটা তার ব্যক্তিসত্তার বাধ্যতা। সামাজিক সত্তার বাধ্যতা। লেখকসত্তার নয়। লেখার সময় তার এই বাধ্যবাধকতা থাকবে না। লেখায় তা প্রতিফলিত হবে না। লেখায় তিনি নিরপেক্ষ থাকবেন। এই নিরপেক্ষতা নির্যাতিত গোষ্ঠীর পক্ষে চলে গেলে তাতে লেখকের নিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন হবে না। কারণ তিনি তো সমাজিক বাস্তবতাকে লেখায় এনেছেন। যেমন বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতিত হচ্ছে। লেখক যদি হিন্দু সম্প্রদায়ের হন এবং এই নির্যাতনের কথা লেখেন, তাতে তার নিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন হবে না। কারণ তিনি তো সমাজিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরেছেন।


প্রশ্ন ৫. মৌসুমী কাদের :
 লেখক যখন স্বার্থপর হয়, আত্মপ্রচারণায় মগ্ন থাকে, ‘মানুষ এবং মাধ্যম’ উভয়কে ব্যবহার করে, নির্লজ্জ আত্মপ্রচার এবং স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টায় লিপ্ত হয় এবং একসময় সুনাম এবং গ্রহণযোগ্যতা পায়, এমনকি মহৎ লেখকের খেতাবও অর্জন করে; নব্য লেখকরা কী ভাবে তাকে গ্রহণ এবং অনুসরণ করবে?

৫. স্বকৃত নোমান : 
 এগুলো লেখকের ব্যক্তিগত সমস্যা। অনেক লেখক এসব সমস্যায় আক্রান্ত। এসব সমস্যার কারণে তিনি একা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তার জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন না। দেখতে হবে, তার এসব সমস্যা তার লেখায় চলে এলো কিনা। লেখায় যদি চলে আসে তিনি নবীনদের কাছে পরিত্যাজ্য হবেন। কিন্তু লেখায় যদি তিনি সৎ থাকেন, আপোস না করেন, তাহলে অবশ্যই তিনি নমস্য। বাল্মিকী তো এক কালে ডাকাত ছিলেন। তাতের রামায়ণের কী ক্ষতি হলো? ‘কবিকে খুঁজো না তার জীবনচরিতে’। রবীন্দ্রনাথের কথা। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে আল মাহমুদ ব্যক্তিজীবনে ধার্মিক হলে অসুবিধা কোথায়? উত্তরটা হচ্ছে, আল মাহমুদ ব্যক্তিজীবনে ধার্মিক নন। জামায়াত। জামায়াত আর ধর্ম এক জিনিস না। ধরে নিলাম এক জিনিস। কিন্তু আল মাহমুদ ব্যক্তিজীবনের সীমাবদ্ধতাকে লেখায় প্রকাশ করেছেন। বখতিয়ারের ঘোড়া তার প্রমাণ। এ কারণে তিনি পরিত্যাজ্য। তাকে গ্রহণ বা অনুসরণের কিছু নাই।


প্রশ্ন ৬. মৌসুমী কাদের :  
সরকার, রাজনীতি, ধর্ম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখার সময় একজন সংখ্যালঘু লেখকের ভয় কাটিয়ে ওঠার উপায় কি?

৬. স্বকৃত নোমান : 
ভয় থাকলে তো তিনি লেখক হতে পারবেন না। লেখকের পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। প্রয়োজনে তাকে মস্তক বন্ধক দিতে হয়। চলে যাক কল্লা, তবু তিনি লিখবেন। এই সাহস না থাকলে লেখালেখি বাদ দিয়ে বরং তিনি হাল চাষ করুন, তাই ভালো।


২টি মন্তব্য:

  1. “যে লেখক বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ, আমি তাকে লেখক মনে করি না। তিনি লেখক হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতে পারবেন না। তার সকল নিবেদনই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।”

    উত্তরমুছুন
  2. খুব স্পষ্টাপষ্টি কথা বলেছেন। ভালো লেগেছে।

    উত্তরমুছুন