বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্প : বনের রাজা


‘গাছ আমার সঙ্গে কথা বলে।’
 ‘গাছের ডাল ? পাতা ? 
‘ডাল পাতা ফুল কুঁড়ি ফল সব—সবাই ফিসফিস করে আমার সঙ্গে কথা বলে। 
“আমার সঙ্গে বলবে ? 
‘ই, বলবে না আবার 'নাতির হাত ধরে সারদা তাকে কাছে টেনে নেন। তারপর ওর ছোট মাথাটা বাদাম গাছের গুঁডির সঙ্গে ঠেকিয়ে দিয়ে সারদা অল্প শব্দ করে হাসলেন, এই বেলা কানটা চেপে ধর, কথা শুনবিI'
মতি তাই করে। প্রকান্ড গাছের গুঁড়ির দিকের মোটা বাকলে ঢাকা কান্ডের ওপর কান চেপে ধরে মতি স্থির হয়ে দাঁড়ায়। গ্রীষ্মের দুরন্ত এলোমেলো হাওয়া বইছে। সবুজ সতেজ বাদাম-পাতার সরসর শব্দ তুলে হাওয়া অন্যদিকে ছুটছে। মতির মাথার চুল নড়ছে, সারদার মাথায় টাক, চুল নেই, পাকা গোঁফটা হাওয়ায় একটু একটু কাঁপছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কাঁপছে সারদার ঠোঁট জোড়া। অবশ্য এটা হাওয়ার জন্য না, শব্দ না করে হাসিটা মুখের ভিতর গলার কাছে ধরে রাখছে বলে দাদুর ঠোঁট নড়ছে, দশ বছরের মতি টের পায়। এটা দাদুর দুষ্টামি। দাদুর বয়সের আর কোনো বুড়ো বা বুড়ী এমন দুষ্টামি করে কি না মতি মাঝে মাঝে চিন্তা করে।
“কি হ’ল, শুনলি কিছু ?
‘নাঃ । মতি মুখ বেজার করে মাথা নাড়ল ও সঙ্গে সঙ্গে কানটা গাছ থেকে আলগা করে আনল। কিছুই শুনছি না।
ওয়াক থু:। সারদা মুখ ঘুরিয়ে মাটির ঢিবির পাশের কচু জঙ্গলের ওপর থুতু ফেলেন। এবার আর হাসেন না। গোঁফের আড়ালে পুরু ঠোঁট জোড়া স্থির হয়ে আছে। অস্থির হাওয়ায় বাদামগাছটা বেশি নড়ছে বলে হলদিবনা পাখিটা ডাল ছেড়ে অন্যদিকে উড়ে গেল। যেন হলদিবনার উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে সারদা একটা লম্বা নিশ্বাস ছাড়েন। তারপর চোখ নামিয়ে নাতির মুখ দেখেন ।
'কান নষ্ট হয়ে গেছে তোর—শহরে থেকে থেকে এটি হয়েছে দাদু।
" তাই কি ?’ দাদুর চোখের ধূসর বাদামী রঙের মণি দুটাে দেখতে দেখতে কী যেন ভাবে ও, তারপর দুধ-সাদা দাঁতের সারি বার করে মতি হাসে, মাথা নাড়ে। ‘কেন, আমাদের বীডন ষ্ট্রীটের বাসায় তো একটা পেয়ারাগাছ আছে—রাস্তার ওপর কত বড় গোলমোহর ফুলের গাছ—কৈ, সে দুটো গাছ তো কথা বলে না ? 
বীড়ন ষ্ট্রীটের গাছ । গলার বিশ্রী শব্দ করে সারদা কথা বলেন, ‘দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা গাড়ির ঘড়ঘড় ভেঁপু, রেডিওর চিৎকার শুনে সেসব গাছের কিছু আছে নাকি । সব বোবা হয়ে গেছে, কথা বলবে কি, কোনোরকমে প্রাণটা টিকিয়ে রেখে ধুকপুক করছে। সারদা আর এক দলা থুতু ফেলেন । 
‘তোদের বীডন ষ্ট্রীটের পেয়ারা গোলমোহর গাছের পরমায়ু ক'দিন ? 
মতি চুপ। 
এখানে গাছের কাছে গাছ ছাড়া আর কিছুই নেই। গুড়ির কাছে কত ঘাস মাটি ! আর ঐ দ্যাখ, এক-একটা গাছকে কেমন আদর করে জড়িয়ে ধরেছে অপরাজিতা-লতা, ঝুমকা-লতা '
 মতি হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে চারদিকের গাছ, ঘন লতাঝোপ দেখে। সারদা আঙুল দিয়ে গাছের ডালপাতা দেখান । 
"আর পাতার ফাঁকে ফাঁকে ডালে ডালে রঙবেরঙের পাখিরা এসে উড়ে বসে, গান গায়, পাতার বোঁটায় ঠোঁট ঘষে, ফলে ঠোকর মারে, তাই না ?
দাদুর চোখের ধূসর বাদামী মণি দুটাে উত্তেজনায় ঝিকিয়ে ওঠে। নাতি ঘাড় কাত করে অস্ফুট গলায় বলে, “তাই ।
 গোঁফের আড়ালে সারদার কালচে পুরু ঠোঁট দুটো হঠাৎ আবার বেঁকে যায়। 
আর তোদের বীডন ষ্ট্রীটের গাছের গুড়ির কাছে কি ? পাথরের খোয়া, গরম পীচ, গাছকে জড়িয়ে থাকে ইলেকট্রিক তার, গাছের মাথা ডিঙিয়ে ওঠে চারতলা, দু'তলা দালান, কেমন ? 
নাতি এবারও ঘাড় কাত করে অস্ফুট স্বরে দাদুর কথায় সায় দেয়। দিয়ে চুপ করে পায়ের নখ দিয়ে মাটির ঘাস খোঁটে । 
কাজেই শহরের গাছেরা কথা বলে না, পোড়া পেট্রলের ধোঁয়া খেয়ে খেয়ে তাদের জিভ খসে পড়েছে, গাড়ির ঘড়ঘড় আর রেডিওর চেচামেচি শুনে শুনে তাদের কান ভোঁতা হয়ে গেছে।' কথা শেষ করে সারদা কচুজঙ্গলের গায়ে থুতু ছিটান । 
‘গাছের কান আছে দাদু ? 
আছে বৈকি। জিভ আছে, কান আছে। নাক আছে, চোখ আছে। দাদু গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়েন । 
“আমাদের মতো ওরাও সব কিছু দেখতে পায়। 
কালো চকচকে চোখ জোড়া বড় করে মতি এদিক-ওদিক দেখে। সারদা হাঁটেন। মতি হাঁটে । কচুজঙ্গল পিছনে রেখে দু’জন ঢালু জমিতে নামে। রাত্রে জোর বৃষ্টি হয়েছে। হাঁটু-সমান জল দাঁড়িয়েছে সেখানে । দুজন জলের ধারে গিয়েছে কি না গিয়েছে, জলে পা ডোবালো কি না ডোবালো যেন দু তিনশ ব্যাং লাফিয়ে ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে জলে ঝাঁপ দিল। প্রথমটায় হঠাৎ ভয় পেলেও পরে মতি যেন খুব মজার জিনিস দেখল, দু হাতে তালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। 
"তোর প্যান্টের পকেটে এক-আধ ডজন ঢুকিয়ে নে না। গম্ভীর থেকে দাদু প্রস্তাব দেন। কেমন হলদে তেলতেলে চেহারা ওদের ' 
"ধ্যেৎ কী হবে ব্যাং দিয়ে ?’ মতি নাক সিটকায় । 
‘খাবি ভেজে চচ্চড়ি করে।' ওয়াক থু:। মতি থুতু ছিটায়। চীনারা ব্যাং খায়। আমরা খাব কেন ?
 “হুঁ, তোমরা বরফচাপা পচা পচা মাছ খাবে। পচা বাসি মাছ খেয়েই তোর এমন হাড়গিলে চেহারা হয়েছে, বুকের সব কটা হাড় গোনা যায়।' 
কথাটা সত্য । মতির শরীর খারাপ হয়ে গেছে। তাই না দাদুর চিঠি পেয়ে সামারের ছুটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে চলে এল। পাঁচ-সাত দিনেই শরীরটা ভাল বোধ করছে সে । পুকুরের টাটকা মাছ আর খাঁটি দুধ খেতে পারছে এখানে । 
মাঠের জল পার হয়ে দু'জন তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যায়। একটা না, সাত-আটটা জামগাছ। ডালপালা ছড়িয়ে জায়গাটা অন্ধকার করে রেখেছে। আর থোকা থোকা কালো জাম ঝুলছে মাথার ওপর । যেন শ্রাবণ আকাশের অগুনতি ছেড়া ছেড়া মেঘ গাছের মাথায় এসে বাসা বেঁধেছে। মতি হাঁ করে তাকিয়ে দেখে। এক সঙ্গে এত পাকা জাম সে কোনোদিন দেখেনি। সব অবশ্য পাকেনি। কাঁচা কচি সবুজ রঙের–আধপাকা লাল রঙের জামই বা গাছে কম কি। লাল সবুজ কালো। যেন এক-একটা গাছের ডালের মাথায় লাল সবুজ কালো পাথরের মালা ঝুলিয়ে রেখেছে কে। 
“হাঁ করে দেখছিস কি ?’ দাদু ধমক লাগায়। 
‘দেখছি, ভারি সুন্দর লাগছে। 
“হু । সারদা হঠাৎ কি ভেবে হাসেন । সুন্দর লাগছে বলে গাছতলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে ফলগুলো তোর মুখের ভিতরে লাফিয়ে এসে ঢুকবে, কেমন ?
 'না, তা ঢুকবে কেন । মতি মাথা নাড়ে। 
সুন্দর সুন্দর করেই তো তোরা মরলি।' সারদা কাঁধের গামছাটা কোমরে বেঁধে নেন। মতির মতো তাঁর পরনেও হাফপ্যান্ট। খালি গা, খালি পা। বুড়ো হলে হবে কি, হাতের পায়ের মাংসের গোছার এখনও শক্ত পাথুরে চেহারা : দাদু গাঁয়ে থাকে বলেই শরীর এত ভাল। মতি ভাবে । অথচ তুলনায় মতির বাবা, হাঁ, এই সারদা রায়ের ছেলে সুকুমারবাবুর শরীর কেমন নরম ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। বাবার চেহারাটা মতির এখন মনে পড়ল। এখন বেলা এগারোটা । তার বাবা অফিসে চলে গেছেন। ডালহৌসি স্কোয়ারে একটা প্রকাণ্ড লাল বাড়িতে তার বাবার অফিস। একদিন তাদের চাকরের সঙ্গে গিয়ে মতি বাবার অফিস দেখে এসেছে। মতি চিন্তা করল, যদি তার বাবা গ্রামে চলে আসেন, দাদুর মতো তাঁরও শরীরটা ভাল হবে, ভাল থাকবে। এবার কলকাতায় ফিরে গিয়ে বাবাকে তাই পরামর্শ দেবে কিনা মতি তা-ও চিন্তা করল। কিন্তু তার বাবা আসতে চাইলেও মা আসবে না। মতি জানে। এখানে তার আসা নিয়ে মা ভীষণ আপত্তি তুলেছিল। সাপ ব্যাং জঙ্গল জল কাদা ছাড়া কিছু নেই এখানে। গাঁয়ে কোনো ভদ্দরলোক বাস করতে পারে নাকি । তাছাড়া, কেবল চাষাভুষো নিয়ে কারবার। হয়তো ওদের ছেলেপুলেরাই মতির সঙ্গী হবে। একটা ভাল কথা শুনবে না, লেখাপড়ার চর্চা থাকবে না, দিনরাত মাঠে জঙ্গলে ঘুরে পাখির ছানা চুরি আর গরু-ছাগল ঠেঙানো শিখে আসবে মতি । অবশ্য মা আপত্তি করলেও দাদুর চিঠি পেয়ে বাবা তাকে একজন লোক দিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন। এখানে এসে মতির ভাল লাগছে। চাষাভুষো সাপ ব্যাং জঙ্গল কাদা ছাড়াও এখানে এমন অনেক কিছু আছে যেগুলি সত্যিই ভাল, সত্যিই সুন্দর। মতির ইচ্ছা, কেবল সামারের ছুটি না, সব সময়ের জন্য এখানে থেকে যায়। তার বাবা-মাও এখানে চলে আসুক । 
এই আশ্বিনে উনষাট পেরিয়ে ষাটে পা দিচ্ছেন সারদা। গাছের উচু ডালে চড়ে তিনি তাঁর দশ বছরের শহুরে নাতিকে অবাক করে দিতে পেরেছেন কিনা চিন্তা করার আগে হাত বাড়িয়ে কালো জামের ছড়া ছিড়ে কোমরের গামছায় পোরেন। চার-পাঁচটা জাম মুখে ফেলেন। দশ-বারোটা জাম ছড়া থেকে আলগা হয়ে ছিটকে নিচে পড়ে। মতি মহানন্দে সেগুলি কুড়াতে লেগে যায় । পুষ্ট পাকা জামের মধুর টক-টক রসে-মাসে সারদার মুখগহ্বর যখন ভরে ওঠে তখন তাঁর চোখের মণি দুটো একটি ছোট ছেলের চোখের মণির মতো চকচকে হয়ে ওঠে, ঘোলাটে বাদামী রং মিলিয়ে গিয়ে পাকা জামের বিচির মতো লাল টুকটুকে হয়ে ওঠে। 
"দেখতে সুন্দর। সুন্দর সুন্দর করে তোরা মরবি।" গাছের মগডালে উঠতে চেষ্টা করেন সারদা । যা দেখতে ভাল তা খেতেও ভাল। কিন্তু খাওয়া জিনিসটা তোরা ভুলে গেছিস । মগডালে চড়ে সারদা মনে মনে নাতির সঙ্গে কথা বলেন । তোদের বীডন ষ্ট্রীটের বাসায় সুন্দর সুন্দর সোফাসেটি পর্দা, ফুলের টব আছে। রেডিও আছে, নিয়োন আলো আছে, ড্রেসিং টেবিল কাচের বাসন প্লাস্টিকের খেলনা পুতুলে ঘর বোঝাই। তোর মা এ-বেলার শাড়ি ও-বেলা পরে না ; সকালের সুন্দর শাড়ি ব্লাউজ ছেড়ে বিকেলে তার চেয়েও কোনটা সুন্দর, কোনটা বেশি মানাবে ভেবে দিশাহারা হয়। তোর বাবার সুন্দর টাই সুট জুতো গাড়ি কেতাদুরস্ত আর্দালি পিওন নিয়ে দিন কাটে। না, তোরা উপোস থাকিস বলব না। কাচ-ঘেরা বদ্ধ অফিস-কামরার পাখার তলায় বসে সুকুমার পাউরুটি, টিনের মাখন, শিয়ালদার ঠাণ্ডাঘরে জিইয়ে রাখা দুটো আলু সিদ্ধ, মরিচওঁড়ো, বাসি ডিম আর কিছু শুকনো আনাজ সিদ্ধ ও গুড়ো দুধ জমিয়ে তৈরি একটা বড় বরফি দিয়ে লাঞ্চ খায়। ব্যালান্সড ডায়েট ? অস্বীকার করবে কে । রীতিমতো শহরের নামী ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সুকুমার অফিসে বসে খবরকাগজের ওপর চোখ বুলোতে বুলোতে প্রোটিন ফ্যাট কার্বোহাইড্রেট মিনারেলস সহযোগে তার দুপুরের সুষম আহার সম্পন্ন করে। ঘরে সুকুমারের স্ত্রী ভেজাল তেল আর গুঁড়ো হলুদ লঙ্কায় রান্না করা মাছের ঝোল ও চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খেয়ে উঠে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে চিন্তা করছে, শহরের কোন সিনেমা-ঘরে ভাল ছবি এল, ম্যাটিনী শো দেখে আসা যাক। সিনেমা ? কথাটা মনে হতে সারদা মুখ বিকৃত করলেন এবং তাড়াতাড়ি একটা ডবল সাইজের পাকা জাম মুখে পুরলেন। ‘মানুষের পরমায়ু নিয়ে তোরা শহরে বসে আছিস । কেবল বাইরের রংচং আর ঠাটঠমক । এদিকে ভেজাল খাদ্য আর বদ্ধ বাতাস যে তোদের আয়ুর বারোটা— 
নীচে থেকে মতি চেঁচাতে থাকে,’ দাদু, অত উচোয় উঠছ কেন—ডাল ভেঙে—’
সারদা হাসেন । উচু ডালের ওপর বসে মাটির দিকে তাকান। 
‘ভাঙবার আগে ডাল জানান দেবে, মটমট শব্দ হবে, তোদের বীডন ষ্ট্রীটের গাড়িঘোড়া জানান না দিয়ে এসে ঘাড়ে পড়ে। 
মতি নীরব হয়ে যায়। এ গাছের শালিক বুলবুলির দল দাদুর তাড়া খেয়ে অন্য গাছে উড়ে গিয়ে জটলা করে, পাকা জামে ঠোকর লাগায়। কিন্তু বুড়ো দাদুই বা কম যায় কি ! মতি চিন্তা করে। এই তো সকালে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে চারটে পাকা আম দিয়ে এতবড় বাটির এক বাটি ক্ষীর মুড়ি খেয়ে এসেছে। এখন আবার গাছে উঠে প্রাণভরে পাকা জাম খাচ্ছে। শ-দেড়শ এর মধ্যে খাওয়া হয়েছে ঠিক । মতি বেশি খেতে পারে না। পেট চিমসি মেরে গেছে, শহুরে ছেলে, কী আর খাবি, কতটা খাবি। সকালে দাদু তাকে ঠাট্টা করছিল। কেননা এত ভাল দুধ মেরে তার ঠাকুমা কাল রাত্তিরে ক্ষীর তৈরি করেছে, সেই ক্ষীর মতি কতটা খেতে পারল ! ক্ষীরের গন্ধটা এখনও তার হাতে লেগে আছে। দুধের গন্ধ, ঘিয়ের গন্ধ, ক্ষীরের গন্ধ কী মতি এখানে এসে জানতে পারছে। 'খেতে খেতে খাওয়া বাড়বে। দাদুর ঠাট্টা শুনে মতির ঠাকুমা বলছিল, 'খাওয়াটা অভ্যাসের কাছে, —কলকাতায় থাকতে তুমি কি আর বেশি খেতে পারতে,—এখন তো তোমার খাওয়া দেখে আমিই মাঝে মাঝে অবাক হই।" দাদু হাসছিল। 'অবাক হচ্ছ কি ভয় পাচ্ছ খাঁটি কথাটা বলে ফেল। যেন দাদুর খোঁচা গেয়ে ঠাকুমা লজ্জা পেয়ে চুপ করে ছিল, কিন্তু দাদু চুপ ছিল না। হুঁ, ভূড়িটা বেজায় বড় হয়ে যাচ্ছে দেখে ভয় পাবারই কথা,-আয়ুর ফিতে লম্বা করতে হলে খাওয়াটা ঠিক রাখতে হবে বৈকি। নাকি ধরে ফিতেটা যদি ফটাস করে ছিড়ে যায়, থ্রম্বসিস, কি ঐরকম কিছুতে হুট করে মরে যাই তো তোমার সাহস বাড়বে ? শুনে ঠাকুমা রেগে গিয়ে বলছিল : আহা, কথার কী ছিরি ! কেন, তোমার কি মরবার বয়স হয়েছে নাকি যে, এসব যা-তা বলছ ? আর কথা না বলে দাদু আম-ক্ষীর খাওয়ায় মনোযোগ দিয়েছে এবং ঠাকুমা আরো কিছুটা ক্ষীর দাদুর বাটিতে ঢেলে দিয়েছে। একসঙ্গে দাদুর চোখ ও ঠাকুমার চোখ দেখে তখন মতি বুঝে ফেলেছে, খেতে পেয়ে বুড়ো যেমন খুশী, তেমনি খাইয়ে বুড়ি মহাখুশী । 
আয়ুর ফিতা। কথাটা মনে পড়তে মতি তার বাবার কথা চিন্তা করল। না, তার বাবা মোটে খেতে পারে না। এই এতটুকুন ভাত, দু তিনখানা লুচি কি এইটুকুন সুজি খাওয়ার পর দু হাত তুলে বাবা মাকে আর কিছু দিতে নিষেধ করে। যেন আর একটা লুচি কি এক মুঠো ভাত বেশি খেলে বাবার পেট ফেটে যাবে। এটা তো ভাল লক্ষণ না, মতি এখন দাদুকে দেখে, দাদুর কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারছে ; তার বাবা হয়তো হুট করে একদিন—
 "নে ধর ।” 
মতি চমকে ওঠে। দাদু গাছ থেকে নেমে এসেছে। এই এত জাম কোমরের গামছায় বাঁধা। দরদর করে ঘামছেন সারদা। রোমশ ভূড়িটা ফলের রসে যেন আরো ফুলে উঠেছে। 
আমি আর খেতে পারছি না দাদু। মতি ঘাড় নাড়ে।
 'ঐ মাটিরটা কুড়িয়ে খেয়েই তোর পেট ভরে গেল ! গাছেরটা খা, দুটো-একটা খা । হেসে সারদা এক খাবলা জাম নাতির হাতে তুলে দেন। মতি আর আপত্তি করে না, দুটো-একটা জাম মুখে ফেলে দাদুর সঙ্গে হাঁটে । 
হুঁ, আমার জামবাগান দেখলি, আমবাগান দেখলি,—এইবেলা তোকে জামরুল আর পেয়ারাবাগানটা দেখাব |" 
মতি খুশী হয়ে পা চালায়। দাদুর আমবাগান কাল দেখা হয়ে গেছে, আজ জামবাগান দেখল।
 ‘সব গাছ তুমি লাগিয়েছ দাদু ? 
সারদা থুতু ফেলেন। জামের রসে থুতুর রং গাঢ় নীল রং ধরেছে। জামগাছ আগেই ছিল। এতগুলি জামগাছ এক জায়গায় আছে দেখে তো এধারের জমিটাও কিনলাম । 
আম—সব আমের গাছ তোমার হাতের বলছিলে কাল।" 
"হুঁ, সারদা আকাশের দিকে তাকান। আমি এসে একটাও আমগাছ পাইনি। হাজার টাকার আমের কলম কিনে আমাকে লাগাতে হয়েছিল। তাই না আজ অত বড় বাগান হয়েছে।"
”বেশ ভাল ভাল আম হয় তোমার বাগানে ' 
হিমসাগর আর মোহনফুলি ছাড়া কোনো আমের কলম লাগানো হয়নি, দাদু,-আমের বেলায় আমি বেজায় খুঁতখুতে। বাজে আম আমার দুচোখের বিষ । সারদা আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে নাতির দিকে ঘাড় ফেরান। যেন ছেলেটা কি ভাবছে। ঘেমে মুখখানা লাল টুকটুকে হয়ে গেছে। দাদুর সঙ্গে চোখাচোখি হতে মতি ফিক করে হাসল। 
হাসছিস যে । সারদা ভুরু কুঁচকান। ভুরুতে একটা-দুটো সাদা চুল এখনও রয়ে গেছে, বাকি চুল উঠে যাওয়ার দরুন কপালটা আগের চেয়ে চওড়া হয়েছে মনে হয়। কপালের দু তিনটা গভীর রেখার খাঁজে খাঁজে ঘাম জমে রোদে চিকচিক করে। গত বছর পাঁচশ টাকার সিঙ্গাপুরী কলা আর আনারসের চারা লাগিয়েছি।" 
কলাবাগান দেখেছি—আনারসের বাগান দেখা হয়নি। মতি ঢোক গিলল । 
‘একে একে সবই দেখা হবে, এখানে এসে গেছিস যখন আনারস, পেয়ারা, কামরাঙা, জামরুল, সবেদা সব কিছুর বাগান দেখতে পাবি।'
মতির চোখের তারা ঝিকিয়ে উঠল।
সবেদা খেতে আমি খুব ভালবাসি।
সারদা কথা বলেন না, হাঁটেন। মতি হাঁটে । একটা বড় দিঘির পাড় ঘুরে দু'জন আবার রাশি রাশি ডাল পাতা ছড়ানো বিশাল ছায়ার জগতে এসে দাঁড়াল। মতি গুনে গুনে দেখল এক এক সারিতে চারটে করে গাছ, তিন সারিতে একুনে বারোটা জামরুল গাছ। এক একটা গাছে পাতার চেয়েও যেন ফল ফলেছে বেশি। ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে নধর পুষ্ট দুধরং অসংখ্য জামরুল ঝুলে আছে। জামগাছের চেয়ে এখানে পাখির সংখ্যা বেশি। এখানে তারা বেশি চঞ্চল, বেশি কলমুখর। মতি বুঝতে পারল, টিয়া বুলবুলি শালিক কাক কালো জামের চেয়ে দুধবরন জামরুল পছন্দ করে বেশি। আর কাঠবিড়াল। লেজ ফুলিয়ে ফুলিয়ে ওরা এ-ডাল থেকে ও-ডালে ছুটে বেড়াচ্ছে।
‘কেমন দেখছিস মতি ?
“ভারি সুন্দর,—মনে হয় গাছে গাছে তারা ফুটে আছে, রাতের আকাশে যেমন তারা ফোটে।
কাব্য " সারদা মুখ বিকৃত করলেন, থুতু ফেললেন। তারপর হাত বাড়িয়ে ঝুলে পড়া একটা ডাল থেকে এক ছড়া জামরুল ছিড়ে নাতির হাতে তুলে দেন। 'খেয়ে দাখ, কেমন মিষ্টি রসালো ফল আমার গাছের।'
‘খুব মিষ্টি । মতি একটা ফলে কামড় বসায় । অবশ্য নাতির কথা শুনতে সারদা চুপ করে দাঁড়িয়ে নেই। হাত বাড়িয়ে আর এক ছড়া জামরুল পেড়ে টপাটপ মুখে ফেলেন, কচমচ করে চিবোন। ছোট ছেলের মতো জামরুলের রস ঠোঁটের কশ বেয়ে থুতনির আগায় এসে ঝুলতে থাকে সারদার। দেখে মতি মজা পায়। তার ষাট বছরের বুড়ো দাদু যে সত্যি একটি ছেলেমানুষ ছাড়া আর কিছু না, মতি এখানে এসে বুঝতে পারছে, দেখছে। একটা জামরুল সে খেয়ে শেষ করতে পারছে না। দাদু পাঁচটা সাবাড় করে দিচ্ছে। আয়ুর ফিতে লম্বা করছে দাদু। ভেবে মতি নিজের মনে হাসল।
'এইবেলা বুঝি আনারস-ক্ষেত দেখতে যাব আমরা ?
উ হুঁ। সারদা মাথা নেড়ে বলেন, 'আনারস-ক্ষেতে যাবি কি,এখনো পাতার রং যায়নি, আর দু-এক পশলা বৃষ্টি হলে তবে তো আনারস পাকতে আরম্ভ করবে। এখন সব কাঁচা রয়ে গেছে।
কেবল ফলের বাগান দেখা না, দেখার সঙ্গে খাওয়ার একটা অচ্ছেদ্য যোগাযোগ রয়েছে, সারদা নাতিকে বার বার বোঝাতে চাইছেন । বুঝতে পেরে মতি আর আনারসের কথা তুলল না। কিন্তু কথা না বললেও ছেলেটা আবার কি ভেবে ভেবে মিটিমিটি হাসে ।
হাসছিস যে বড়ো ?
“আমার ইচ্ছা করে তোমার একটা নাম দিই দাদু ।
কি নাম ? সারদা খুশীই হন । পিটপিট করে নাতির চকচকে চোখ দুটাে দেখেন। বল, বলে ফেল ।"
‘ফলের রাজা। মতি ফিক করে হাসল।
“হুঁ, তার চেয়ে বল গাছের রাজা, বাগানের রাজা । সারদা হাতের শেষ জামরুলটা কচকচ করে চিবোন। ‘ফল পিছে, গাছ আগে, বুঝলি।' কি ভেবে সারদা নিজের মনে হাসেন । তারপর গেলবার আমার একটাও আম খাওয়া হয়নি জানিস ?
মতি ফ্যালফ্যাল করে দাদুর মুখ দেখে ।
‘গেল-বার ঝড়ে সব আমের বোল গুটি নষ্ট হয়ে যায়। এতবড় আমবাগানে একটা আম বড় হতে পারেনি, পাকেনি।'
"তারপর ?
তারপর আর কি, পাকা আম খাইনি তো খাইনি, তাই বলে কি আমি বাগানের গাছগুলির ওপর রাগ করেছিলাম, না গাছের যত্ন করিনি। বরং গত বছর আমি আমার নিস্ফলা আমবাগানেই বেশি সময় কাটিয়েছি, ওদিকে জামের বাগানে জাম পেকে ঝরে ঝরে নিচে পড়েছে, ঘাসের ওপর হাঁটু-উচু কালে জাজিম তৈরি হয়েছে পাকা জামের, কিন্তু আমি একবার ওদিক মাড়াইনি। হুঁ, জামরুল পেকে পেকে সব কটা গাছ সাদা হয়ে গেছে, কাঠবিড়াল আর রাজ্যের পাখি পেট ভরে জামরুল খেয়েছে, আমি একবার এখানে চুপি দিতে আসিনি।
তবে তো তুমি ফলের চেয়ে গাছকেই বেশি ভালবাস । মতি আমতা আমতা করে বলল । তবে ? সারদা নাক দিয়ে শব্দ বার করলেন । আমি আর কটা ফল মুখে দিই, না কি একলা আমি খাব বলে এত এত গাছ লাগিয়েছি, বাগান করেছি। আমার গাছের ফল পাখিরা বেশি খায়, বাদুড় আর কাঠবিড়ালগুলি বেশি খায়, খাচ্ছে।
 "তাই দেখছি। সারদার দশ বছরের শহুরে নাতি জামরুলের ডালে ডালে লেজমোটা কাঠবিড়ালগুলির ছুটোছুটি দেখতে দেখতে খুশী হয়ে ওঠে, উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বীডন স্ত্রীটের বাসায় সে তার গুলতিটা ফেলে এসেছে। ওখানে কি আর কাঠবিড়াল আছে। কেবল ইলেকট্রিক তার, ট্রাম টেলিফোনের তার। তারের গায়ে গুলি ছুড়ে ছুড়ে মতি কাঠবিড়াল আর পাখি মারার সাধ মিটিয়েছে। তারের ঝনঝন শব্দটা এখনও তার কানে বাজছে। শহরের কথা মনে হতে সে দাদুর দিকে তাকায় । 
কিছু বলছিস ? 
মতি অল্প অল্প হাসে । 
‘তোমার একটা বড় গাড়ি ছিল, হলদে রঙের গাড়ি ? 
"হাঁ, সারদা থুতনি নাড়েন । ‘কার কাছে শুনলি ?
 ‘মা বলছিল একদিন, গাড়িটা বেচে দিয়েছ ? 
'বেচে দেব না তো সঙ্গে করে ওটা গাঁয়ে নিয়ে আসতাম নাকি । সারদা থামেন, চারদিকে তাকান। "ভাল রাস্তাঘাট নেই, এখানে আমি গাড়ি দিয়ে করতাম কি ? 
তাও বটে। দাদুর মত নাতিও ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক দেখে। মাঠ জঙ্গল ডোবা খানা আর এবড়ো-থেবড়ো মেঠো পথে দাদু কী করে গাড়ি চালাতো ! 
‘বেচে দিয়ে ভাল করিনি ? সারদা নাতির চোখ দেখেন । মতি ঘাড় কাত করে। সারদা হাসেন । 'না কি মাঠের ওপর দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে আমি আমবাগানে জামবাগানে এসে আম জাম খেতাম ?
 ‘ধ্যেৎ । ছবিটা মতিরও মনঃপূত হয় না। তাছাড়া, ঘাসের ওপর দেদার পাকা জাম জামরুল ছড়িয়ে থাকে। গাড়ি ছুটিয়ে এলে চাকার তলায় সব থেতলে যেত।" 
সারদা শব্দ করে হাসেন । 
যা বলেছিস দাদু, তাছাড়া, একবার এখানে গাড়ির হন শুনলে আমার গাছের সব পাখি কাঠবেড়াল ভয়ে ছুটে পালাতো। কেমন না ? 
মতি ঘাড় কাত করল। কি একটু ভাবল । চঞ্চল চোখে এদিক-ওদিক দেখল। তারপর :
 “আমার তো মনে হয় গাড়ির শব্দ শুনে ফড়িং প্রজাপতিগুলিও ভয়ে পালিয়ে যেত । 
তাই, গাড়ি বাজে জিনিস। সাধে কি আর বেচে দিলাম। সারদা নাতির ওপর সন্তুষ্ট হন। 
‘তবে কিনা—
’ আবার তবে কিনা কি ' সারদা রুখে ওঠেন। আর কি বলার আছে শুনি ? 
ঘাড় গুজে মতি পায়ের নখ দিয়ে ঘাস খোঁটে । ‘পায়ে যদি ধুলো না লাগল, নরম ঘাস না মাড়ালাম তো বেঁচে আছি বলে আমার মনে হয় না। কথা শেষ করে সারদা গোড়ালি দুটো জোরে জোরে ঘাসের ওপর ঘষেন। তাই, মতি চিন্তা করল, দাদু সারাদিন খালি পায়ে থাকে, গাছের রাজা জুতো পরে না। কিন্তু যে কথাটা তার জিভের ডগায় এসেছিল বলতে না পেরে মতি অস্বস্তি বোধ করে। দাদু হাঁটে, মতি হাঁটে । জামরুলবাগানের ঠাণ্ডা ছায়া মাথার ওপর থেকে সরে যায়। দুজন রৌদ্ররুক্ষ আকাশের নিচে চলে এল । 
“বেজায় রোদ । মতি আস্তে বলল । 
‘এটা জ্যৈষ্ঠ মাস।’ চড়া গলায় দাদু বলল,"শ্রেষ্ঠ ঋতুর শ্রেষ্ঠ মাস, রোদ তো চড়বেই না হলে আম জাম কাঁঠাল কলা পাকবে কেন । 
তাও বটে। মতি বিড়বিড় করে দাঁদুর কথায় সায় দেয়, হাতের পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মোছে। তার কপালটা ঘামছিল বেশি। 
'এক কাজ কর না। সারদা নাতির দিকে ঘাড় ফেরান । 
কি ?’ মতি ঘাড় ফেরায় । 
সারদা হাঁটা বন্ধ করে থমকে দাঁড়ান। মতি বুড়োর চোখ দেখে । বুড়োর চোখের বাদামী মণি দুটো রোদের তাপে লাল হতে শুরু করেছে কি ।
‘রোদটা তোর মাথায় বেশি লাগছে, কেমন ? সারদা অল্প হাসেন । 
‘হুঁ।' ‘তা তো লাগছেই, সারদা আবার এক দলা থুতু ছিটান। মাঠের গরম বালি থুতুটাকে চোখের নিমেষে শুষে নিচ্ছে, যেন মতি তাই দেখতে আরম্ভ করেছিল। সারদা আঙুল দিয়ে মতির পরনের হাফপ্যান্ট দেখান। ওটা খুলে ফেল—খুলে মাথায় জড়িয়ে নে, মাথাটা ঠাণ্ডা থাকবে। 
‘ধ্যেৎ, মতি ফিক করে হাসল, “তুমি যেন কী দাদু, মাঠের ওপর দিয়ে আমি লেংটা হয়ে হাঁটব নাকি ! 
“আমি গরু, আমি ছাগল, আমি গাছের কাঠবিড়াল, জঙ্গলের শেয়াল, সারদা ভেংচি কেটে বড় একদলা থুতু ফেলেন। "তোকে এখানে দেখছে কে, কতবড় একটা মানুষ হয়ে গেছিস শুনি ? লজ্জা করে " একটু থেমে সারদা বললেন, "এ তোমার বীডন ষ্ট্রীটের ছাদ দেয়াল ডিঙিয়ে আসা মরা হাজা রোদুর না, এ হল গিয়ে মাঠ ফাটানো দিঘি শুকানো তেজী খাড়া রোদ ; অভ্যাস নেই যখন তোমার মাথাটিও ফেটে চৌচির হতে পারে, তাই বলছিলাম—দাদু ওটা মাথায় জড়িয়ে নিতে । 
যেন দাদুকে খুশি করতে মতি পরনের প্যান্ট খুলে মাথায় জড়ায়। প্রথমটায় কেমন বাধো-বাধো ঠেকে তার, কানটা গালটা লাল লাল হয়, তারপর অবশ্য মতি স্বাভাবিক হয়ে যায় ; দাদুর সঙ্গে লম্বা পা ফেলে হাঁটে । সত্যি তো, কে আছে কে দেখছে তাকে এই রোদুরে ; কাক শালিকটা পর্যন্ত ধারেকাছে নেই। বুঝলি ; সারদা হাসেন, নাতির কাঁধে হাত রাখেন ; নাতি তাঁর বাধ্য হয়েছে দেখে খুশী গলায় বলেন, “আমি কিছু গ্রাহ্য করিনে। আমবাগানে কি জামবাগানে থাকলে, যখন দেখি বেশি ঘাম দিচ্ছে শরীরে, গরম কমছে না, গায়ে কিছু থাকলে খুলে ফেলে-স্রেফ লেংটা হয়ে ঘাসের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ি । 
‘খুব আরাম লাগে ? 
"আলবত লাগতে হবে, হিহি । ছোট ছেলের মতো শোনায় সারদার হাসি। নরম ঘাস তোমার শরীরকে আদর করছে, গাছের মিষ্টি ছায়া তোমার শরীর ঢেকে রাখছে, আরাম না লেগে পারে দাদু। জামা কাপড় কিছু না । যেন দাদুকে আর একটু খুশী করতে মতি বলল, আগে মানুষ যখন জঙ্গলে ছিল, বনে ছিল তখন তো শুনেছি ওরা জামা কাপড় চিনতই না। 
তবে আর কি, জানিস তো সব । সারদা আকাশের দিকে চোখ তোলেন। আগে মানুষ সুখে ছিল, এখন পোশাক-আশাক তার যন্ত্রণা বাড়িয়েছে। 
দাদুর মেজাজ ফিরে এসেছে বুঝতে পেরে মতি কথাটা বলে ফেলল, মা বলে, এতবড় ইঞ্জিনীয়ার ছিল তোর দাদু, এখন একটা চাষাভুষো হয়ে গাঁয়ে আছে।' 
বলুক না, বলতে দে,–চাষা বলছে শুনলে আমি রাগ করিনে । 
মা দুঃখ করছিল এলগিন রোডের এত বড় বাড়ি তুমি বেচে দিলে।’ 
“তোর মা তো দুঃখ করবেনই, তোর মা ইট কাঠ লোহা বালির স্বপ্ন দেখেন। আমার স্বপ্ন মাটি, আমার স্বপ্ন গাছ । 
ঘাস ছায়া পাখি কাঠবিড়াল। মতি যোগ করল । 
কাজেই শহরের বাড়ির বদলে এখানে আমি কী পেয়েছি তোর বাবা-মা জানবে না।" যেন বিরক্ত হয়ে সারদা তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গটা শেষ করতে চাইলেন। শহরের পুরনো পচা আকাশের নিচে থেকে ওদের ইমারতের স্বপ্ন দেখতে দে, কল ইঞ্জিনের ধোঁয়া কালি গিলে গিলে আয়ুর ফিতা গুটিয়ে নিতে দে। সারদা ভেংচি কাটার মতো চেহারা করে নাতির মুখ দেখেন। 
"ওরা তোমার আগে মরে যাবে দাদু ?’ মতি প্রশ্ন না করে পারল না। আমার বাবা-মা ? 
সব, কলকাতা শহরটাই যে মরতে বসেছে। দাদু নাকে হাসল। 
যেন মতি কি ভাবল, ভেবে প্রশ্ন করল, বাড়িগুলো ? বাড়িগুলোর কী হবে, এত বড় বড় দালান ? 
‘ভেঙে পড়বে, ভেঙে মাটির সঙ্গে একদিন মিশে যাবে।' 
“তারপর " 
তারপর সেখানে ঘাস গজাবে, গাছ হবে । ফুল ফুটবে, ফল হবে।’ 
‘খুব চমৎকার হয় তা হলে, না দাদু ? কলকাতার এখানে-সেখানে পাখি ডাকছে, প্রজাপতি উড়ছে। 
তাই তো হতে হবে, তা না হলে পৃথিবীর নিত্যনতুন চেহারা থাকবে না যে।
কথা শুনতে শুনতে দাদুর সঙ্গে মতি একটা সুন্দর জায়গায় এসে পৌছল। এর আগে সে এদিকে আর একদিনও আসেনি। ভারি সুন্দর গোলমতন একটা প্রকান্ড পুকুর । আয়নার মত ঝকঝক করছে জল । পুকুরের একদিকে শাপলা আর একদিকে পদ্মবন। থালার মতো সবুজ গোল পদ্মপাতাগুলো জলের ওপর চুপচাপ শুয়ে আছে। শাপলা-পাতাগুলো গোল না, অনেকটা পানের মতো দেখতে । টুকটুকে লাল দুটো শাপলা ফুল ফুটেছে। কাল আরো দু-চারটা ফুল ফুটবে, পরশু এক ডজন ফুটতে পারে, তার পরদিন আরো অনেক বেশি ফুল ফুটবে। সবুজ ডাঁটার আগায় আগায় অসংখ্য কুঁড়ি কলি তৈরী হয়ে আছে। কলিগুলোর গা ছুয়ে এক ঝাঁক ফড়িং উড়ছে। ‘পদ্মের কলি দেখছি না দাদু। মতি বলছিল। দাদু হেসে উত্তর করল, এখন কি, বর্ষা পড়ুক—বর্ষার জলে কলি কুঁড়ি গজাবে আর শরৎকালে সব ফুটবে। অবাক হয়ে মতি পদ্মবন দেখল আর চিন্তা করল কবে শরৎকাল আসবে আর রাশি রাশি পদ্ম ফুটবে । ‘তুই কেবল জলের ওপরের ফুলের কথা ভাবছিস, আমার এই পুকুরের জলে কত বড় বড় মাছ আছে জানিস, তোর চেয়েও বড় এক একটা রুই কাতল এই পুকুরে আছে।’
ফুলের কথা ভুলে গিয়ে মতি জলের নিচের মাছের কথা চিন্তা করতে লাগল। বড় মাছ মানে অনেকদিনের পুরনো মাছ। 
পুরনো মাছ খেতে ভাল দাদু। 
হুট করে নাতির মুখে খাওয়ার কথা শুনে সারদা খুশী হলেন । ভাল না মানে ?সারদার চোখ দুটো কলসে উঠল। টাটকা হলে সব মাছই খেতে ভাল, নতুন পুরনো বুঝি নে ? 
দাদু যে মাছের খুব ভক্ত মতি এখানে এসে জেনে গেছে। 
তাও কি তাদের কলকাতার বাসার মতন একটুকরো দেড়টুকরো মাছ দিয়ে ভাত খাওয়া ! 
গাদাগাদা মাছ চাই সারদার। দুবেলা । 
বাটি ভরে ভরে ঠাকুমা দাদুরপাতের সামনে মাছভাজা, মাছের ঝোল,মাছের চচ্চড়ি সাজিয়ে দেয়। তাই বুঝি সারদা কাল দুপুরে খেতে বসে নাতিকে বলছিলেন । মাছ খাওয়ার জন্যে তিনটে দিঘিপুকুর কাটিয়েছেন তিনি। ‘হুঁ, এমনভাবে মাছ খেতে হয় যেন কেবল হাতে-মুখে না, গা দিয়েও আঁষটে গন্ধ বেরোয়—তবে না মাছ খাওয়া ।
আর মতির তখন মনে পড়েছে, তার মাকে বাবাকে হাতে একটু আঁষটে গন্ধ থাকবে বলে খেয়ে উঠে ভাল করে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। মা সাবান দিয়ে ধুয়ে পরে হাতে পাউডার মাখেন। 
এ-ওষুধ সে-ওষুধ খেতে পরামর্শ দেয় । আমি খাই গরম গরম টাটকা মাছের তেলভাজা । সর্দি-কাশি ধারেও ঘেঁষতে পারে না।" 
সুতরাং এখন মাছের কথা উঠতে দাদুর চোখ চকচকে হবে, জিভে জল গড়াবে স্বাভাবিক। জলের দিকে তাকিয়ে সারদা হাই তোলেন। বড় খিদে পেয়েছে রে নাতি, পেট চৌ-চোঁ করছে।’ 
মতি অবাক হবার ভান করল । হাসল। 
"সকালে অনেক আম ক্ষীর খেয়েছ দাদু, তারপর এত এত জাম-জামরুল, এর মধ্যে তোমার— 
আমারটা পেট না, পিপে, কিছুতে কি আর ভরতে চায়—তোর খিদে পায়নি ? সারদা ঘাড় ফেরালেন।
মতি মাথা নাডলো
“একটুও না”।
“তোরটাও পেট না, হোমিওপ্যাথির শিশি । 
দাদুর কথা শুনে মতি শব্দ করে হাসল। সারদা এখন আর থুতু ফেলেন না, একটা বড় ঢোক গিললেন । 
“সুর্যি এখন মাথার ওপর দেখছিস তো। বলতে বলতে আকাশের দিকে তিনি চোখ রাখেন। আজ আমার উত্তরের পুকুরে জেলেরা জাল ফেলেছে। এতক্ষণে বাড়িতে মাছ পৌঁছে গেছে জানা কথা। হু, চেতল মাছ, বলে দিয়েছি। আমার তো মনে হয়, তোর ঠাকুমা এখন চেতলের পেটিগুলো দিয়ে কালিয়া রাঁধতে বসে গেছে।’ -
 ‘তা হবে । মতি খুক করে হেসে ফেলল। তাই তোমার পেট চোঁ-চোঁ করছে।
‘তা হবে মানে ? সারদা রুখে ওঠেন। নির্ঘাত কালিয়া পাক করছে বুড়ি, আমি এখান থেকে গন্ধ পাচ্ছি।"
 - বুড়ো না একটি শিশু । তেমনি লোভী, চঞ্চল। তা হতেই হবে, মতি চিন্তা করল। এই বয়সে আয়ুর ফিতে লম্বা করতে হলে এদিকের অনেকগুলি বছর কমিয়ে দিয়ে বাদুড়কে গাছের মগডালে উঠে জাম-জামরুল খেতে হবে, মাছের কালিয়ার নামে বেসামাল হয়ে পড়তে হবে।
 ‘তুমি তা হলে এখন বাড়ি ফিরছ দাদু ? নাতি শুধোয় । আলবত, ভাত খাব মনে পড়লে আমার অন্য কোথাও যেতে, আর কিছু করতে ইচ্ছা করে নাকি ? 
কিন্তু আনারসের বাগানটা দেখা হল না যে যেন দুষ্টুমি করে মতি বলল, ইচ্ছা ছিল তোমার সঙ্গে আর একটু বেড়াব, তোমার পেয়ারাবাগানটাও দেখব— 
‘পেয়ারা এখন পাথরের গুটি হয়ে আছে, আষাঢ় মাস আসুক, দু-চারটা জলের ঝাপটা লাগুক, তবে তো পেয়ারা ডাঁসবে পাকবে, এখন বাদুড়েও পেয়ারা ছোঁয় না।
 কাজেই মতি নিবৃত্ত হয় । 
জাম-জামরুল বাঁধা গামছাটা সারদা কোমর থেকে খুলে আলগা করে নেন। 'নে ধর—তোর ঠাকুরমার জন্যে কটা তো নিয়ে যেতে হবে, আমি নিজের হাতে তুলে না দিলে একটা ফল বুড়ি মুখে দেবে নাকি ? 
হাত বাড়িয়ে মতি ফলের পুটলিটা নেয়। 
ইচ্ছা হলে তুইও দুটো -একটা খা না, অনেক আছে, হ্যাঁ, এই ছায়ায় বসে বসে খা । সারদা কোমরের বেল্ট খুলতে ব্যস্ত । 
তা অবশ্য ইচ্ছা হলে মতি একটা-দুটো ফল মুখে দেবে । পুকুরপাড়ের এই ছায়াটাও চমৎকার। মাথার ওপর প্রকান্ড হরীতকী গাছ। পুকুরের চার পাড় ঘিরে ঘন বেত জঙ্গল । কিন্তু তার দাদু এ কী করছে। 
দাদু তুমি কি— মতির কথা আটকে গেল ।
 ‘হু, একটানে সারদা বেল্ট খুলে ফেলেন, 'এখানেই একটা ডুব দিয়ে যাই, বাড়ি গিয়ে আর চানটান হবে কি, গিয়েই খেতে বসে যাব, মাছের কালিয়া আর ভাত । 
সারদা হাসলেন । মতি অবাক হল কি, ভয় পেল কি ! বুকের মধ্যে কেমন একটা ধাক্কা অনুভব করল সে। তাড়াতাডি অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। 
পরনের প্যান্ট ঘাসের ওপর রেখে দাদু পুকুরে নেমে গেল। না, যদি ওটা তাদের মানিকতলার মোড় কি শেয়ালদা হত ; অনেক মানুষ, অনেক দোকান, গাড়ি ঘোড়া পুলিস ফেরিওয়ালা থাকত তো মতি মনে করতে পারত লোকটার মাথা খারাপ। একবার টালিগঞ্জ মাসির বাড়ি যেতে মতি ট্রাম থেকে এমন বুড়ো বয়সের একটা পাগলকে দেখেছিল । সম্পূর্ণ উলঙ্গ। দেখে রাস্তার লোক হি-হি করে হাসছে। 
কিন্তু এখন ? এখানে ? 
- মতি ঘাড় ফেরাল, একটা ঢোক গিলল, ভয়ে ভয়ে ঘাসের ওপর রাখা সারদার ছাড়া হাফপ্যান্টটা দেখল, তারপর যেন একটু সাহস বাড়ল, চোখ তুলে সে পুকুরের জল দেখল। দাদু সাঁতার কাটছে। মতির সঙ্গে চোখাচোখি  হতে সারদা হেসে ফেলে জলের নিচে মাথা ডুবিয়ে দেন। আর দেখা যায় না মানুষটাকে । এক দুই তিন.যেন মনে মনে মতি গুনছে, দাদু কতক্ষণ জলের নিচে থাকতে পারে। দূরে জলের ধাক্কায় পদ্মপাতাগুলি কাঁপছে, কলি কুঁড়ি নিয়ে শাপলার ডাঁটাগুলি নড়ছে। বুঝল মতি, দাদু ডুবসাঁতার কেটে দূরে চলেছে। আর ঠিক তখন তার মাথার ওপর হাওয়া লেগে হরীতকী গাছের পাতার সরসর শব্দ হল, বেতজঙ্গলের কোন দিকে একটা ডাহুক ডাকে, কোথা থেকে একটা সাদা মেঘ উড়ে এসে আকাশের কিনারে ঝুলছে—একটা মাছরাঙা ক্রিক শব্দ করে পুকুরের জলে ঝাঁপ দিয়ে তৎক্ষণাৎ একটা রুপোর পাত ঠোঁটে করে আকাশে উড়ে যায়। 
মতির খুব ভাল লাগে। হাত বাড়িয়ে ঝুলি থেকে একটা কালো জাম তুলে সে মুখে পুরল। হুঁ, ঠাকুমার জন্যে দাদু জাম নিয়ে যাচ্ছে। বাবার কথা মনে পড়ল তার। মার কথা। কোনোদিন জাম-জামরুল না, আম-আনারস না—অফিস থেকে বাবা যখন বাড়ি ফেরে, তার হাতে থাকে মার পাউডারের ডিবি, স্নো, ক্রিম। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলল মতি, তারপর উঠে দাঁড়াল । 
মতির এখন খেয়াল হল, সে নিজেও লেংটা । সেই যে দাদুর কথায় প্যান্ট খুলে রোদ বাঁচাতে মাথায় দিয়েছিল, আর সেটা পরা হয়নি। কিন্তু তা হলেও মতির এখন একটুও ইচ্ছা করছিল না, ওটা পরে। কলেজ স্ট্রীট থেকে তার বাবা এটা কিনে দিয়েছিল। তা দিক । তার মনে হল, এটার আর দরকার নেই, বাজে জিনিস। ভীষণ ইচ্ছা করছিল তার এমনি এ অবস্থায় দাদুর মতো সে পুকুরের জলে নেমে যায়। ডুবসাঁতার কেটে শাপলা আর পদ্ম বনের কাছে চলে যায়। কিন্তু ইচ্ছা হলে কী হবে, সে সাঁতার জানে না। 
তা হলেও সে মন খারাপ করল না। কি একটা পাখি হরীতকীর ডালে এসে উড়ে বসে ভীষণ কিচিরমিচির শুরু করেছে। দাদুর মাথা একবার জলের ওপর ভেসে ওঠে। আবার ডুব দেয়। মতির মনে হয়, ডুব মেরে মেরে দাদু জলের নিচে পুরনো মাছগুলিকে দেখছে। মাছের ভক্ত, কে জানে একটা মাছ না হাত দিয়ে ধরে ফেলে ডাঙায় তুলে আনে। 
ভেবে মতি নুয়ে হাত বাড়িয়ে ঠাকুরমার জামের পুঁটলি থেকে আর একটা জাম তুলতে যাবে, চমকে উঠলো। 
 হাসির শব্দ। তার পিছনে কে হাসছে। মতি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে । ঘাড় ফেরায় । একটা মেয়ে । বেতঝোপের কাছে দাঁড়িয়ে । হাতে একছড়া বেতফল। বেতফল খাচ্ছে আর মতির দিকে তাকিয়ে আছে। চকচক করছে চোখ দুটো। ছিপছিপে লম্বা গড়ন। এখানে এসে মতি কালো বাসক গাছ চিনেছে। রোগা লম্বা মেয়েটাকে দেখে তার সরু লিকলিকে বাসক-ডাঁটার কথা মনে পড়ল। তেমনি কালো মিশমিশে গায়ের রং । হাসির ঠমকে নড়ছে, বাতাস লেগে বাসক-ডাঁটা যেমন নড়ে, কাঁপে। 
কিন্তু তার দিকে মেয়েটা এমন করে তাকাচ্ছে দেখে মতির দুকান লাল হয়ে উঠল, গরম হয়ে উঠল। চালাক ছেলে, শহরের ছেলে । মেয়েটার এভাবে তাকানোর অর্থ বুঝতে মতির এক সেকেন্ড দেরি হয় না—খপ করে সে ঘাসের ওপর থেকে হাফপ্যান্টটা কুড়িয়ে নিয়ে পরে ফেলল। এই এক সেকেন্ডেই সে বেজায় ঘামছে ।
 কি চাই তোর, কি দেখছিস ? প্যান্ট পরে মতি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ধমক লাগায়। 
কিসসু না, এটা বেতফল খাচ্ছি। -
 একটা তো না, একছড়া। মতি রাগে গসগস করে । কটমট করে মেয়েটাকে দেখে। গায়ের রং যেমন ময়লা তেমনি ময়লা কুটকুটে পরনের শাড়িটা। তার ওপর ছেড়া। কিন্তু দাঁতগুলি খুব ফরসা । বকের পাখার মতো সাদা ধবধবে দাঁতগুলি দেখে মতির তবু কিছুটা ভাল লাগল ; ভাল লাগল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কি মনে পড়ে তার বুকের ভিতর ঢিব করে উঠল। আড়চোখে সে ঘাসের ওপর ছেড়ে-রাখা বড় হাফপ্যান্টটা দেখল। দাদু এখন কী অবস্থায় জলে সাঁতার কাটছে, সে জানে। ঐ বুঝি দাদুর স্নান সারা হয়েছে, পাড়ের দিকে আসছে না ? 
এই, কোথায় যাচ্ছিস তুই ?’ মতি আগের চেয়েও জোরে ধমকে ওঠে, 'কোথায় চললি ? 
এটু জল খাব । ওর সঙ্গে একটা চটের বস্তা। মতি এতক্ষণ এটা লক্ষ্য করেনি। বেত ঝোপের ধার থেকে বস্তাটা টানতে টানতে হরীতকীর গাছের নিচে নিয়ে এল মেয়েটা, তারপর বুঝি জল খেতে পুকুরের দিকে পা বাড়ায়। 
না, এখন জল খেতে হবে না।’ মতি রুখে দাঁড়ায়, “তোর এই বস্তার মধ্যে কি ? ‘শুকনা পাতা 
' “অ, তুই পাতাকুড়ুনী। মতি নুয়ে বস্তার ভিতরটা দেখে ! শুকনো পাতার সঙ্গে দুটো আনারস । বেশ তাজা । যেন এইমাত্র বাগান থেকে কেটে আনা হয়েছে। মতি সোজা হয়ে দাঁড়ায় । 
"কোথায় পেলি আনারস ? 
প্রথমটায় একটু থতমত খায় মেয়েটা, তারপর হাসে, আঙুল দিয়ে পুকুর দেখায়। 
‘রাজাবাবুর ক্ষেতের, দুটি কেটে আনলুম নুন দিয়ে খেতে । তার মানে দাদুর বাগানের ; পুকুরের দিকে আঙুল দেখিয়ে দাদুকে রাজাবাবু বলছে ও, মতি বুঝল । 
“তোর পিঠের ছাল তুলে ফেলবে রাজাবাবু। তুই কাঁচা আনারস কেটে আনলি " 
কিছুটি বলবে না মুইকে, মুই কত ফলপাকুড় খাই রাজাবাবুর গাছের, বাগানের, কিচ্ছুটি বলে না। 
বকের পাখার মতো সাদা ধবধবে দাঁত বের করে মেয়েটা হাসে, ঘাড় নাড়ে, ভুরু বেঁকায় ; তারপর : যাই, রাজাবাবুর দিঘির মিঠা জল এখন পেটটি পুরে খাই।’ বলে কোমরে ক্ষিপ্ৰ মোচড় তুলে ঘাসের ওপর দিয়ে তরতর করে ও পুকুরের ধারে চলে গেল, জলের কাছে।
মতি হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। এইমাত্র যে দুশ্চিন্তাটা তার মনে এসেছিল সেটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে । মেয়েটা ঠিক জলের কিনারে চলে গেল তো । দাদু সাঁতার-জল ছেড়ে কোমর-জলে এসে দাঁড়ালো না ! ইস, দাঁত দিয়ে ঠোঁট-কামড়ে ধরল মতি। মুখটা ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল তার। তবে কি দাদু, এত বড় মেয়েটার সামনে জল থেকে ডাঙ্গায় উঠবে। দাদু ! যেন চিৎকার করে ডেকে বুড়োকে সাবধান করে দিতে চাইছিল সে,—গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না ; ভয় বিস্ময় ঘৃণা আশঙ্কা। বিতৃষ্ণা বিষন্নতার ছোট বড় নানা রকম তরঙ্গ তার বুকের মধ্যে খেলা করে গেল। এই একটু সময়ের মধ্যে। উন্মাদ না, শিশু না,—মতি মনে মনে বলল, আমার দাদু, এক কালের বড় ইঞ্জিনীয়ার, এলগিন রোডের বাসিন্দা সারদা রায় একটা জন্তু, একটা দানো, একটা ভয়ঙ্কর কুৎসিত জীৰে পরিণত হয়েছে। 
হাসছে ? মেয়েটা দাদুকে দেখে হাসছে ? কিন্তু দাদু যে এখনো কোমর-জলে দাঁড়িয়ে। নাভিটা পর্যন্ত দেখা যায় না। অণুবীক্ষণের মতো দৃষ্টিটাকে পুকুরের দিকে ধরে রেখে মতি একটা শুকনো ঢোক গিলল। হাওয়ার দোলায় মাথার ওপর হরীতকী গাছের মাথায় নতুন করে সরসর শব্দ জাগল। দূরের বেতঝোপের ভিতর ডাহুকীটা ডাকছে। আকাশের কিনারে সাদা মেঘের দলাটা আরো সাদা হয়ে তুলোর মতো ছিড়ে ছিড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এসব কিছুই দেখতে শুনতে ভাল লাগছিল না মতির । তার চোখ তার মন তার সবটুকু চৈতন্য এখন জলের ধারে, জলের ওপর। 
ও কি ! দাদু হাসছে মেয়েটাকে দেখে ? ঘাড় নাড়ছে ? পায়ের পাতা জলে ডুবিয়ে মেয়েটা ঘাটের সিড়িতে বসে পড়ল যে ! সাদা ধূসর লোমে ঢাকা দাদুর ভূড়িটা জলের ওপর জাগছে না ? নাভিটা দেখা গেল না ? মতির শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে, নিশ্বাস ফেলছে না, ঢোক গিলতে পারছে না সে । অবশ্য তখনই মতি একটা হালকা নিশ্বাস ফেলল, বড় করে ঢোক গিলতে পারল । দাদু আবার গলাজলে সরে গেছে, সাঁতার-জলে। দাদু সাঁতার কাটছে। মেয়েটা হাত তুলে শাপলা বন দেখাচ্ছে। সবুজ ডাঁটা সমেত বড় শাপলা ফুলটা সারদা ছিড়ে আনেন। ফুল নিয়ে ডুব দেন। তারপর ভেসে ওঠেন পুকুরের এধারে। আবার মতির বুকের ভিতর দুবদুব করে। কিন্তু না,—সারদা এবার ঘাটের ওপরের সিড়িতে পা রেখে আগের মতো কোমরজলে কি বুকজলেও দাঁড়ান না । গলার কাছে জল । জলের সঙ্গে সারদার থুতনি। সেখান থেকেই তিনি ডাঁটা সমেত লাল শাপলা ফুল ডাঙ্গার দিকে ছুড়ে দেন। হাত বাড়িয়ে মেয়েটা তা লুফে নেয়। তারপর ডাঁটা থেকে ছিড়ে ফুলটা খোঁপায় গোঁজে। গলাজলে দাঁড়িয়ে দাদু হাসে, মেয়েটাও হাসে । খোঁপায় ফুল গোঁজা হয়ে যেতে মেয়েটা আঁজলা আঁজলা জল খেল ঘাড় নুইয়ে । চুলের লাল ফুলটা হাওয়ায় কাঁপছিল। জল খাওয়া সেরে ও সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর এক ছুটে উঠে আসে তীরের সবুজ ঘাস আর হরীতকী গাছের গুড়ির কাছে। শুকনা পাতার বস্তাটা টেনে কাঁখে তোলে তারপর কোমরের একটা ক্ষিপ্ৰ মোচড় তুলে ওধারের বেতঝোপের ভিতর ঢুকে পড়ে। যেন বেতজঙ্গলের মধ্য দিয়ে ওর বেরোবার পথ । 
হাঁ করে একটু সময় সেদিকে তাকিয়ে থেকে মতি নিশ্চিন্ত হয়, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। বাঁচা গেল, আপদ গেল। বিড়বিড় করে উঠল সে ; আর তৎক্ষণাৎ দাদুকে দেখতে পুকুরের দিকে চোখ ফেরাল । দাদু তোমার স্নান হয়ে গেছে ? খুশি গলায় মতি ডাকল। ডাকতে পারল । 
হাঁ রে দাদু, হয়েছে, হয়ে গেল। সারদা জল ছেড়ে ডাঙ্গায় ওঠেন। ডাহুকটা ভীষণ জোরে ডাকছে। পেজা তুলোর মতো সাদা পাতলা মেঘগুলো এখন গায়ে গায়ে লেগে একটা বিশাল শ্বেতপদ্মের চেহারা ধরতে আরম্ভ করল না। আশ্চর্য এক মেঘের ফুল। খুশী হয়ে মতি দাদুকে দেখছিল। টপটপ জল ঝরছে কান থেকে, নাকের ডগা থেকে, থুতনি থেকে, হাতের আঙুলগুলি থেকে। দাদুর উলঙ্গ ভেজা শরীরটা দেখে মতির মনে হচ্ছিল একটা পুরনো গাছ। অনেকদিন জলের নিচে থাকার পর এখন উঠে এসেছে। গাছের রাজা তো গাছই হবে, মতি ভাবল । দাদুর গায়ের সাদা ধূসর লোমগুলি যেন গাছের গায়ের শ্যাওলা । শ্যাওলা থেকে টুপটাপ জল ঝরছে। হরীতকী গাছের সরসর শব্দটা মতি কান পেতে শুনল । 
সারদা তাঁর হাফপ্যান্ট পরেন, কষে বেল্ট আঁটেন। 
ঠাকুমার জামের পুটলিটা মতি হাতে তুলে নেয়। 
"একটু দেরি করে ফেললাম, কেমন রে নাতি । 
মতি হাসে, কথা বলে না, দাদুর সঙ্গে হাঁটে ।
আমার এই পুকুরের জল চমৎকার ঠাণ্ডা, একবার নামলে আর উঠতে ইচ্ছা করে না । 
হুঁ। মতি প্রথমটায় অস্পষ্ট একটা আওয়াজ করে, তারপর কি ভেবে বলল, “আমার তো মনে হয় ঠাকুমা অনেকক্ষণ কালিয়া রাঁধা শেষ করে বসে আছে। 
সারদা কথা বলেন না, হাঁটেন। মতি চুপ থেকে হাঁটে । দাদু কি কিছু ভাবছে ? মতি ভাবে । দাদুর আগে আগে, মাথার সামনে, কপালের সামনে একটা লাল ফড়িং উড়ে উড়ে চলে । 
আচ্ছা দাদু ? 
কি বলছিস ? সারদা থুতু ফেলেন না, আড়চোখে নাতিকে দেখেন, নাতি তাঁর হাত ধরে হাঁটে । 
‘তোমার বাগান থেকে দুটো আনারস কেটে এনেছে মেয়েটা, শুকনা পাতার বস্তার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে । 
হুঁ, মৃদু গলায় হাসেন সারদা। "কাঁচা আনারস নুন লঙ্কা মেখে খাবে আর কি। সারদা কপালের সামনে উড়ন্ত লাল ফড়িংটাকে লক্ষ্য করেন। তা আনুক না, কত আর খাবে, হাজারের ওপর আনারস হয়েছে এবার আমার ক্ষেতে ।" 
মতি একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলল । 
এবার নাতির কাঁধের ওপর হাত রেখে সারদা হাঁটেন। 
বাদুড় কাঠবিড়াল শালিক বুলবুলিতে কি কম ফল নষ্ট করে আমার ! করুক ! আমি একটুও রাগ করি না। আমার অনেক আছে বলেই তো ওরা খাচ্ছে।" 
মতি নিরুত্তর। অনেক হেঁটে তার পা দুটাে ধরে গেছে। কিন্তু হঠাৎ একটা জিনিস আবিষ্কার করে যেন সে কেমন চঞ্চল, উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। তার কাঁধের ওপর দাদুর হাত। দাদুর গায়ের গন্ধ চামড়ার গন্ধ তার নাকে লাগছে। মাছের গন্ধ না, আমের গন্ধ না, ক্ষীরের গন্ধ না, জাম-জামরুলের গন্ধ না। জলের গন্ধ ? শ্যাওলার গন্ধ ? তা-ও না। কোমল মিষ্টি ঠাণ্ডা মৃদু শাপলা ফুলের গন্ধ এটা । মতি বুঝল। মতি বুঝল না আয়ুর ফিতে লম্বা করতে এই গন্ধও শরীরে ধরে রাখার দরকার আছে কিনা। বুঝতে না পেরে সে ভিতরে ভিতরে ছটফট করতে লাগল। আর হাঁটতে লাগল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন