বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

শিমুল মাহমুদ'এর গল্প : কুকুরজীবন

১. দেবলোকের কাহিনি

কথিত আছে অতীব প্রাচীনকালে দেবতাগণের দেহে কোনো পাকস্থলি ছিল না। ফলে ক্ষুৎপিপাসার অভিজ্ঞতা তখনও তাদের মেধায় প্রতিস্থাপিত হয়নি। সেই অতীব প্রাচীনকালে সূর্য ও চাঁদ একত্রে পৃথিবীতে বাস করতো। তখন সমুদ্র ছিল চাঁদ-সূর্যের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই চাঁদ-সূর্য প্রায়ই সমুদ্রের বাড়িতে বেড়াতে যেত। কিন্তু সমুদ্র কখনই চাঁদ-সূর্যের বাড়িতে বেড়াতে আসত না। ফলে চাঁদ-সূর্যের মনে বেশ কষ্ট। একদিন সূর্য বলে ফেললো, তুমি ভাই আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আস না কেন? আমরাই শুধু তোমার বাড়িতে যাই। এটা কি ভালো দেখায়?

সমুদ্র বললো, তুমি যথার্থ বলেছ। আমার খুব তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে ইচ্ছে করে কিন্তু আমাকে বিস্তর বন্ধু-পরিজন নিয়ে বসবাস করতে হয়; আমি যদি তোমাদের ওখানে যাই তবে তারাও আমার সঙ্গে যাবে। তোমাদের বাড়িতে তাদের স্থান সংকুলান হবে কিনা, এই চিন্তায় তোমাদের বাড়ি যাই না।

সূর্য বললো, তুমি একথা ঠিক বলেছ, আমাদের বাড়িটি একটু ছোটই আছে। আমরা তাহলে একটা নোতুন বড়ো বাড়ি বানাচ্ছি।

অতঃপর চাঁদ ও সূর্য দুজনে মিলে অনেক দিনের প্রচেষ্টায় সত্যি সত্যি পৃথিবী জুড়ে একটা মস্ত বাড়ি বানিয়ে ফেললো এবং সমুদ্রকে তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবার জন্য নিমন্ত্রণ জানালো। এরপর একদিন সমুদ্র এলো চাঁদ-সূর্যের বাড়িতে। সঙ্গে এলো রাজ্যের যত মাছ আর সমস্ত জলজ প্রাণি।

সমুদ্র বললো, আমি কি সঙ্গীসাথিসহ তোমাদের ঘরে বসতে পারি?

সূর্য সাগ্রহে বলে উঠলো, এসো এসো সবাই এসো।

সূর্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমুদ্র তার সঙ্গীসাথিসহ চাঁদ-সূর্যের ঘরে ঢুকে পড়লো। সমস্ত ঘর তখন জলে সয়লাব হয়ে গেলো। আস্তে আস্তে জলের পরিমাণ বেড়েই চললো। সেই সাথে মাছ এবং জলজ প্রাণিসমূহ প্রচুর সংখ্যায় আসতে লাগলো। সূর্য ও চাঁদের দিশেহারা অবস্থা। কিন্তু আমন্ত্রিত অতিথি বিধায় কিছুই বলতে পারলো না।

এ অবস্থায় চাঁদ-সূর্য কী আর করবে? প্রথমে তারা ঘরের পাটাতনে গিয়ে উঠলো। কিন্তু সেখানেও জল এসে ভর্তি হয়ে গেলো। এবারে তারা ছাদে উঠে পড়লো। সেখানেও মুহূর্তে জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। অগত্যা অবশেষে চাঁদ-সূর্য বাধ্য হলো আকাশে গিয়ে আশ্রয় নিতে। সেই থেকে তারা আকাশেই থেকে গেলো।

অতঃপর পৃথিবী জলে পরিপূর্ণ হলো। ধান উৎপাদনের জন্য এক ছটাক জমিও অবশিষ্ট রইল না। অবশেষে একদিন অতি প্রত্যূষে ধানী দেবতা নিদ্রা থেকে জেগে উঠলেন এবং পৃথিবী থেকে জল অপসারণের চিন্তায় মশগুল হলেন।

এদিকে দেবলোকে ভয়ানক রকম পাপাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। দেবতা আফ্রোদিতির অভিশাপে মিরা নিজ পিতার সাথে অন্ধকারে প্রণয়ে লিপ্ত হয়ে গর্ভধারণ করলো। পিতা সাইনিরাস নিজের পাপকর্মের কথা বুঝতে পেরে ঘৃণায় নিজ কন্যা মিরাকে হত্যার জন্য উদ্যত হলো। দেবতারা মিরাকে বৃক্ষে পরিণত করে দিলো এবং সেই বৃক্ষ থেকে অ্যাডোনিসের জন্ম হলো; অতঃপর পরম রূপবান অ্যাডোনিসকে দেখে আফ্রোদিতি তার প্রতি আসক্ত হলো। দেবী পার্সিফোনও একই ভাবে তার জন্য কাম যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে উঠলো। অবশেষে দেবতা জিউসের মধ্যস্থতায় তারা উভয়ই বছরে চারমাস করে অ্যাডোনিসকে ভোগ করতে থাকে। কিন্তু আফ্রোদিতির আরেক জন প্রেমিক রণদেবতা অ্যারেস ঈর্ষাকাতর হয়ে বুনো শুকরের রূপ ধরে অ্যাডোনিসকে হত্যা করলো। আর ক্ষতবিক্ষত অ্যাডোনিসের দেহনিঃসৃত রক্ত থেকে জন্ম হলো কালো গোলাপের। অথচ আসঙ্গলিপ্সা এমনই উচ্চাকাশে আলোড়ন তুললো যে, পার্সিফোন অ্যাডোনিসকে পুনরুজ্জীবিত করে অমরত্ব দান করার পর আফ্রোদিতি আর পার্সিফোন উভয়ই তাকে পুরো বছরের ছয়মাস ছয়মাস করে ভোগ করার শর্তে আত্মহারা হলো।

এদিকে নদীদেবতা অ্যালফিউস সরোবরে স্নানরতা উলঙ্গ অ্যারিথিউসকে দেখে কাম যন্ত্রণায় উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সতীত্ব রক্ষার জন্য এক পর্যায়ে অ্যারিথিউস নিজেকে নির্ঝরে রূপান্তরিত করতে বাধ্য হলো। কিন্তু কামার্ত অ্যালফিউস সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অ্যারিথিউসকে ভোগ করলে লজ্জায় ক্ষোভে অ্যারিথিউস নিজেকে অন্তঃসলিলা নদীতে পরিণত করলো। এবং চারজন দেবতা একত্রিত হয়ে একজন কুমারীকে ধর্ষণের পর যখন কুমারীর শরীরে আগুন ধরিয়ে দিলো তখন দেবলোক ও মর্ত্যলোক উভয়ই আন্দোলিত হলো; শুরু হলো মহাপ্লাবন আর যেহেতু তখন পর্যন্ত দেবতাদের ছিলো না কোন পাকস্থলি সেহেতু ক্ষুধা কী জিনিস তা তারা জানতো না বরং শুধুই যৌন তাড়না।

দেবলোকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। ধানী দেবতা চিন্তিত হলেন। ভাবতে থাকলেন দেবতাদের জন্য এমনই এক ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে তারা ভিন্ন কিছু নিয়ে এমনই মশগুল থাকবে আর এমনই পেরেসানিতে আটকে যাবে যে, এতে তারা ভুলে যাবে তাদের উচ্ছৃঙ্খল যৌন-জীবনের কথা।

আর অতঃপর কোনো এক অমাবস্যার রাতে দেবলোকের সকল দেবদেবীদের একত্রিত করে ধানীদেবতা উচ্চারণ করলেন, আজ থেকে তোমাদের প্রত্যেকের দেহের সাথে সংযুক্ত হোক এক একটি ক্ষুধার্ত পাকস্থলি। এতে তোমরা ক্ষুৎপিপাসায় বড়োই পেরেসানি হবে এবং এই ক্ষুৎপিপাসা মিটাবার জন্য তোমাদেরকে মাটির পৃথিবীতে পদার্পণ করতে হবে এবং মাটি কর্ষণে ফসল উৎপাদন করে তা থেকে তোমাদের ক্ষুৎপিপাসা নিবারণ করতে হবে এবং এই কাজে জীবনভর তোমাদেরকে এমনই পেরেসানিতে থাকতে হবে যে তোমরা তোমাদের বর্তমান জীবনের পাপ-পঙ্কিলতাকে ভুলে যাবে।

তখন সমস্ত পৃথিবী ছিলো জলে পরিপূর্ণ শেওলায় মোড়ানো এক জলজ-জীবন। দেবদেবীগণ মাটির পৃথিবীতে প্রেরিত হলেন। আর তখন থেকে জীবন যেন বা এক ঝুলন্ত সেতু। তারা জীবনের সেতু পারাপারে লিপ্ত হলো।



২. মর্ত্যলোকের কাহিনি 

শুরু হলো জলে মোড়ানো পৃথিবীকে প্রকৃত মাটির পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবার সাধনা। যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে এ কাজে নিয়োজিত থাকতে থাকতে দেবতাগণ বিশ্রুত হলেন তাদের দেব-পরিচয়। অতঃপর সফলতার এক পর্যায়ে তারা পরস্পর পরস্পরকে আবিষ্কার করলো মানব সন্তান হিসাবে। তখন তারা কর্ষণযোগ্য ধানী জমি আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছে। আর এই ঘটনারও বহু আগে নৌ যানবাহনে তাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীসহ তাদেরকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল জল থেকে জলে। আর এভাবেই তাদের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস, ক্ষুৎপিপাসার ইতিহাস, সন্তান উৎপাদনের ইতিহাস জল থেকে জলে ভেসে বেড়িয়েছে শতাব্দী থেকে শতাব্দীকাল অবধি। তখনো এই জনগোষ্ঠী পশু চরিত্রের মুখোমুখি হয়নি বিধায় তাদের জন্য প্রয়োজন ছিল না কোনো দেবগ্রন্থ অথবা কোনো ধর্মগ্রন্থের। সুতরাং তারা জানতো না আশরাফুল মাখলুকাতের কথা। অতঃপর আরো যুগ আরো শতাব্দী অতিক্রমণের পর ওরা ওদের পবিত্র গ্রন্থে ঘোষণা করলো, ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’।

এই সেরা জীব-গোষ্ঠীর একটি দল একদা জল থেকে জলে নৌকা ভাসিয়ে গেয়ে উঠলো জলজ-জীবনের গাথা। কালক্রমে পশুকুলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা রহস্যে মোড়ানো যৌনতার বিষে জর্জরিত সর্প জগতের সাথে গড়ে উঠলো তাদের সখ্যতা। তারা উচ্চারণ করলো,

আমরা সাপ খেলা দেখাই
দাঁতের পোকা ফেলাই
মাজার বিষ নামাই

কিন্তু ধানী দেবতার ইচ্ছা ঠিক তেমন ছিল না । সুতরাং তাদের ফিরে আসতে হয়েছিলো কর্ষণযোগ্য ভূমির কাছে। অতএব বেদেনীর বেসুরো গলায় এসব হাঁক ডাক আর শোনা গেলো না। বেদে জীবন বদলে গেলো। বেদেগোষ্ঠী আর নৌকার বহর নিয়ে ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়ায় না। তাদের যাযাবর জীবন থিতু হয়ে এলো। সুনামগঞ্জের সোনাপুর গাঁয়ে তারা বসত নিলো।

সুনামগঞ্জ শহর থেকে সুরমা পাড়ি দিয়ে ওপাড়ে উত্তরে মেঠোপথ ধরে এগোলেই সোনাপুর বেদেপল্লী। এখানে প্রায় আড়াই হাজার বেদে বেদেনীর বাস। কথিত আছে, এর আগে এদের জীবনেও ছিল নৌকাভাসা এক যাযাবর বেদে-জীবন। 

শোনা যায়, জলিল কদর খান নামে এক বেদে সর্দার বিক্রমপুর থেকে জ্ঞাতিগোষ্ঠীসহ সোনাপুর গ্রামে এসে জানতে পারে, এখানে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হচ্ছে। ধানী দেবতার ইচ্ছায় তখন জলিল কদরের যাযাবর রক্ত থিতু হতে চাইছে। আর সেই যে ওদের জ্ঞাতি গোষ্ঠীর লটবহর সমেত যাযাবর নৌকার বহর হাছন রাজার ঘাটে এসে তরী ভিড়ালো সেই থেকে আর বৈঠা চলে না।

অতঃপর সোনাপুর গ্রামে খাসজমি বন্দোবস্ত নিয়ে সোনার পিঞ্জরা বানিয়ে শুরু হলো বসবাস।

তারা ঘর বানালো।

ঘর বানালো আর পুত্র কন্যার জন্ম দিলো

পুত্র কন্যার জন্ম দিলো আর সাপের বিষের মতোই বিষক্রিয়ায় জর্জরিত হলো ক্ষুৎপিপাসার বিষ। পাকস্থলির বিষ। 

কার্যকর হতে থাকে ধানী দেবতার অভিশাপ। সুতরাং ওরা ঘর বাঁধতে বাধ্য হয়।

হায়, ‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরো মাঝার’

অথচ তারপরও ঘর ওঠে

ওঠে আর ওঠে! মানুষের ঘর।



এই ঘটনার বহু সহস্র শতাব্দী পূর্বেই বিলুপ্ত হয়েছিলো এই মানুষগুলির দেব-চরিত্র। তারা বিশ্রুত হয়েছিলো ধানীদেবতার কাহিনি। তারা বিশ্রুত হয়েছিলো কোথা থেকে কোন দেবতার অভিশাপে কোন পাপে স্বর্গ থেকে তাদেরকে মাটির পৃথিবীতে নেমে আসতে হয়েছে। বল্গাহীন এই জনগোষ্ঠী শুধুই ভাবতে থাকে ক্ষুধার কথা; পেটভর্তি বিষ, ক্ষুৎপিপাসার বিষ।

সুতরাং বেদেরা ঘর বাঁধে, জমি চাষ করে, ফসল ফলায়। বদলে যায় তাদের আজন্ম লালিত যাযাবর জীবন। আর দশটা গৃহস্থ পরিবারের মতোই তারা ঘর-সংসার করে। গরু কেনে, ছাগল পালে, হাঁস-মুরগির খুপড়ি তোলে। বাড়ির আঙিনায় তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে লাউয়ের ডগা, শিমের মাচা। পুঁই শাকের লতা সবুজ থেকে আরো সবুজ হয়। ঝাঁকড়া গাছের লম্বা লম্বা বাঁকানো রেখায় ঝুলতে থাকে সইজনা ডাঁটা। নিকানো উঠানে গুটিগুটি পায়ে ছুটে বেড়ায় কালো কালো স্নেহকাতর বেদেশিশু।

সইজনা ডাঁটার মতোই শিশুরা বেড়ে ওঠে। স্কুলে যায়। কেউ কেউ কলেজেও যায়। বাবা-মায়ের সাথে অবসরে ক্ষেতে-খামারেও যায়। যায় না শুধু নৌকায়; আদি পুরুষের যাযাবর পেশায়। ওরা আর সাপ ধরে পোষ মানায় না। স্কুল পড়–য়া শিশুরাও সাপ নিয়ে আর খেলে না। ওদের সমাজে এখন তা নিষিদ্ধ। বেদে বাবা-মা, এখনো যারা আদি পেশার টানে নৌকা ভাসায় অজানা বসতির উদ্দেশ্যে তারাও এ অলিখিত আইন মেনে চলে।

সোনাপুর গ্রামে একদিন প্রতিষ্ঠা হয় বেদে সম্প্রদায়ের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘সোনাপুর বেদেপল্লী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। আনন্দ! স্বপ্ন! রাজকীয় ভবিষ্যৎ! নিজেদের সন্তানেরা শিক্ষার আলো পায়। পুলক জাগে বুকে। আশা জাগে ক্ষুৎপিপাসায় ভরপুর পেটে। হতদরিদ্র স্কুল। জরাজীর্ণ স্কুল ঘর। একদিন হাওয়া লাগে ক্ষেতে। ধানী জমিগুলি লকলকিয়ে ওঠে। স্কুল কমিটির সভাপতি আরেফ আলী খান বেদেপল্লীর মুরুব্বি। তিনি যত্নবান হন স্কুলের অবকাঠামোগত পবির্তনে। সাথে থাকে সর্পরাজ রজব আলী খান, পল্লী চিকিৎসক ফারুক আহমেদ। ২২৬ জন ছেলমেয়ে স্কুলে পড়তে আসে। কী এক প্রাকৃতিক রহস্যে মেয়ে শিশুর সংখ্যা বেশি। এই শিশুরা জানতো না তাদের পূর্বপুরুষেরা বাস করত সাপের সাথে আর এখনো তাদের জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়ে গেছে সাপের বিষ, সাপ স্বভাবের মানুষ। 

এই ২২৬ জন বেদে শিশুর মধ্যে একজন, নাম তার ফুলবিবি। ফুলবিবির বয়স আট কী নয়। উঠতি বুক জোড়া উঁকি মারতে চায়, উঁকি মারতে চায় নিষ্পাপ চোখ। ভুরু জোড়ায় যেন বা সাপ সাপ টানা টানা একটা হিমশীতল মায়া। স্কুলের উঠান জুড়ে আমাদের মেয়ে কালো ফুলি এক্কাদোক্কা খেলছে। খেলছে আর ওর নানাভাই আরেফ আলী খান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। দেখছে আর চোখ জোড়ায় যেন বা সর্পদৃষ্টি উঁকি দেয়। উঁকি দেয় আর শ্বাস ফেলে টাকাওয়ালা আরেফ আলী।

হাওয়া লাগে। হাওয়া লাগে বেদেপপল্লীতে। ব্যবসা-চাকুরি; দ্রুত বদলাতে থাকে সব কিছু। এরপরও নেশা জেগে থাকে। সাপধরা, সাপখেলা, দাঁতের পোকা বের করা, কোমরের ব্যাথা সারানো,-- এসব চমকপ্রদ পেশা ওদের সমাজে কারো কারো মধ্যে টিকে থাকে। আর যদিও যেকোনো বেদে ঘরে ঢুকলেই সাপের ঝাঁপি দেখা যাবে না, ফোঁস করে উঠবে না সাপের ফণা তথাপি সর্পরাজ রজব আলীর ঘরে সাপ থাকলেও থাকতে পারে; তার সন্তানেরা সে খবর রাখে না। তারা বাঙালি গৃহস্থ ঘরের আর দশ জনের মতোই বড়ো হয় সময়ের সাথে সমৃদ্ধির সাথে তাল রেখে। আজকাল তাদের বিয়ে থাও হচ্ছে অন্য সম্প্রদায়ের সাথে।

সোনাপুর বেদেপপল্লীর এই মানব সম্প্রদায়ের ভিটেমাটি হয়েছে, জমিজমা হয়েছে, আয়-রোজগার বেড়েছে, যাপিত জীবনে সচ্ছলতা এসেছে, কোথাও কোথাও আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে। আরেফ আলী খানের দালান বাড়ির টিনের চালে দেখা দেয় সৌর বিদ্যুতের এন্টেনা। আহা চমক! আহা সম্ভ্রম! আহা সমৃদ্ধি। ২৪ হাজার টাকার বিনিময়ে সৌর বিদ্যুৎ, আলোর ঝলকানি, পাখনা ঘোরে, টেলিভিশনে আজব ছবি। আর রাত এগারোটায় আরেফ আলী খান যখন টেলিভিশন বন্ধ করে শুতে যায় তখন মনে পড়ে নাতনি ফুলবিবির কথা। আরেফ আলী খান ডাকতে থাকে, ও ফুলি, বোনডি ঘুমাইছনি? এদিক আইও দেহি।

নানাভাইয়ের ডাকে ফুলবিবি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। নানাভাইয়ের খাটের কাছে আসতেই নানাভাই ওর হাত টেনে ধরে ওকে কাছে নিয়ে আসে।

বোনডি গা-গতর বিষাইছে, একটু টিইপা দিবা?

চঞ্চলমতি বালিকা আরেফ আলীর উপর হরাহুরি শুরু করে। যত্রতত্র টেপাটেপি শুরু করে; আর হাসতে থাকে খিলখিলিয়ে। আরেফ আলী ফুলিকে টেনে বুকের কাছে আনে। আদর করে। বুকের ওপর হাত রাখে; তারপর আরও জোরে ঠেঁসে ধরে বলে ওঠে, ও ফুলি তুই আজকা আমার সাথত থাক।

ফুলি আরো জোরে হেসে ওঠে; তারপর এক সময় পাশে শুয়ে বায়না ধরে গল্প বলার জন্য। আরেফ আলী আঁটকুইড়া রাজার কিস্সা বলে আর আদর করে। আদর করে আর কিস্সা বলে, এক রাজা আছলা। তান কুনু বাইচ্চা বাইচ্চি নাই। তার রাজত্বি খুব মোটা। রাজার আত্তি ঘোড়া ছিপ্পাই ছপ্তরি লোক লস্কর বেশুমার। রাইত অইতে নাচ গানোর তালে তালেই রাইত ফুয়ায়। আতোতার মাঝেও রাজার প্রাণে সুখ নাই, মনো শান্তি নাই, খানিত রুচি নাই, চখুত ঘুম নাই। রাজায় ঠিক করলা নিজোর আথে নিজোর জান তেয়াগি লইবা। মনে মনে আযান পাংগিয়া থইলা যে শিকারোর উছলত করি যাইমু গি, আর জংলো উঁচা মোটা এক গাছ চাইয়া দড়িদি গলাত ফাঁশ লাগাইয়া মরি যাইমু। আমি নাই আমার দুইনা নাই, সুখ নাই দুখ নাই।

এ পর্যন্ত বলতেই আরেফ আলী বুঝতে পারে ফুলি ঘুমিয়ে পড়েছে। আরেফ আলীর ঘুম আসে না। আন্ধারে ফুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। ফুলি ঘুমায়। নিষ্পাপ। কচি বুক জোড়া ওঠানামা করে। আরেফ আলী বুকের ওপর আদর করে। তারপর দক্ষিণ দিকের গাব গাছে যখন পেঁচা ডেকে ওঠে তখন আরেফ আলীর হাত ফুলির শরীরের নিচের দিকে নামতে থাকে। ঘুমের মধ্যে ফুলি মোচড় দেয় আবার ঘুমায়। অনেক সময় ধরে চেষ্টার পরও যখন আরেফ আলী কিছু করে উঠতে পারে না তখন যেন বা বার দুই আরেফ আলী সাপের মতো ফোস করে উঠে হঠাৎ বেতাল হয়ে পড়ে আর তারপরই জেগে ওঠে ঘুমিয়ে থাকা কাম দেবতা। 

ধানী দেবতা চমকে ওঠে। চিৎকার করে ওঠে ফুলি। মুখে শক্ত হাত রাখে আরেফ আলী। অতঃপর চরমানন্দে পৌঁছিবার পূর্বে খানিকটা গুঙ্গিয়ে ওঠে আরেফ আলী। ফুলির কণ্ঠনালীতে চাপ। ফুলি এক ঝলক বাতাসের জন্য হাসফাস করে, মোচড় খায় আর চিকন গলায় দুর্বোধ্য যন্ত্রণাকাতর শব্দ তৈরী করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়। পেশাবের জায়গাটা ভিজে ওঠে। দম আটকে আসছে। দপদপে ব্যথা, গরম একটা কড়াই ঠেঁসে ধরেছে যেন কেউ। মাথাটা ডিপ ডিপ করতে করতে সবকিছু কেমন যেন অনুভূতিহীন হয়ে এলো। শতসহস্র ব্যথারা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে ভোতা হয়ে যাচ্ছে। আরেফ আলী আরো জোড়ে ফুলিকে ঠেঁসে ধরলো। ফুলি যেন স্বপ্নে আটকুইড়া রাজার কিস্সা শুনতে থাকে, জংলা উঁচা এক গাছ চাইয়া দড়িদি গলাত ফাঁশ লাগাইয়া মরি যাইমু; আমি নাই, আমার দুইনা নাই।

রাত্রি তিন প্রহরে আরেফ আলী ফুলির মাথায় পানি ঢালে। পানি ঢালে আর প্রলাপ বকে। ফুলির শরীরে প্রচ- জ্বর। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা। ভিজা গামছায় মা-মরা ফুলিকে আরেফ আলী পরিষ্কার করতে থাকে। এক সময় ফজরের আজান ভেসে আসে। অতঃপর আরেফ আলী ভিজা গামছা গায়ে জড়িয়ে মসজিদের দিকে হাঁটা ধরে। মসজিদের কাছে গিয়ে কেমন ভয় হয়। ভেতরে ঢোকার সাহস হয় না। আস্তে আস্তে মসজিদের পিছনে গিয়ে মাটিতে লেপটিয়ে বসে পড়ে। বসেই থাকে আর বিড়বিড় করে, আমি নাই আমার দুইনা নাই, সুখ নাই দুখ নাই। 

এক সময় চোখের সামনে যেন বা ধানী দেবতাকে দেখতে পায় আরেফ আলী খান। দেবতা স্বয়ং নেমে এসেছেন দেবলোক থেকে। দেবতার অসহায় চোখ মানুষের চোখের সামনে অসহায় জ্বলতে থাকে।

আরেফ আলী খান নিজের দালান বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। ভালো লাগে। দেখে আর ভালো লাগে। ভালো লাগে আর বিজলী বাতি দেখতে থাকে। আহা সাপের কান নাই। বীণ বাজালে সাপ শুনতে পায় না। শুনতে পায় মানুষরূপী সাপেরা, আশরাফুল মাকলুকাত। আহা হাতের তালে সাপ নাচে, মানুষ নাচে চেটের তালে। আহা সাপে কাটা বাইদানীরে নায়ে ভাসাও। ওঝা বিষ নামাবে; মাজার বিষ, পেটের বিষ, লিঙ্গের বিষ। মজার খেলা, সবইতো খেলা। 

জীবনটাই একটা খেলা। একেক জন একেক ভাবে খেলছে। বেদেরাও খেলছে। খেলায় হারতে চায় না কেউ। হার মানে না আরেফ আলী। শুরু হয় দেবলোকের মতোই খেলা। আরেফ আলীর বুকে রাজ্যির যত ভাব এসে ভর করে। আহা কী ঘর বানাইলাম আমি শূন্যেরো মাঝার; লোকে বলে, বলে রে ঘর বাড়ি ভালা না আমার। 

আরেফ আলীর আদিরক্তে নেশা চাড়া দিয়ে ওঠে। চোখ খুলে দেখতে পায় ওদেরই সমাজে প্রতিষ্ঠিত সব ছোটলোক আর বড়োলোকদের ছবি প্রতিচ্ছবি। কী যেন মনে পড়তে চায়। ওর বুকের মধ্যে ভাদ্র মাসের তাল; তালে তালে যেন বা তাল ঠুকে চলেছে। আর অবশেষে আজ অনেক দিন পর হাড়িয়া খাবার নেশা, দো-চুয়ানি খাবার নেশায়, সাপের বিষ খাবার নেশায় তাকে পেয়ে বসে। অবশেষে সন্ধ্যার অনেক পর রাত তখন দুই প্রহর, আরেফ আলী খান নেশা করে ঘরে ফিরে ঘরের অন্ধকারে চার হাত বাই পাঁচ হাত চৌকিতে বসে ঝিমোতে ঝিমোতে গান ধরে। ফুলবিবি তখন জ্বরের গভীরে তলিয়ে গিয়ে স্বপ্ন দেখছে, একটা কালো মোটা দাঁড়াশ সাপ ওর নিম্নাঙ্গের ভিতর ঢুকে পড়ে কেবলই খলবলিয়ে ওঠে। স্বপ্নের মধ্যেই ফুলবিবি শুনতে পায় আরেফ আলীর কণ্ঠে গানের ধুয়া,

অগ্নি পাটির কাপড়া বা কইন্যায় রে,স
ও কইন্যায় ছিড়িয়া ফ্যালাইলো রে,
ওরে আড়াই গজ মাতার চুল গো,
ও কইন্যা আউলিয়া ফ্যালাইলো!
ওলোঙ্গ হয়্যা দ্যাকো কইন্যা গো,
ও কইন্যা টলিয়া পড়িলো!


৩. আরেফ আলীর নরক জীবন

অতঃপর রাত্রি ত্রি প্রহরে আরেফ আলী দ্বিতীয় বারের মতো ধানী দেবতার সাক্ষাৎ লাভ করিল এবং নিজ মানবগোষ্ঠী সম্পর্কে সমুদয় সংবাদ জ্ঞাত হইল। জ্ঞাত হইল দেবলোকের কথা। জ্ঞাত হইল মর্ত্যলোকের কথা এবং দেখিতে থাকিল যে এই মর্ত্যলোকেই তাহাদের জনজীবনে নামিয়া আসিয়াছে এক নরক জীবন। গহীন অরণ্য। অরণ্যের বাসিন্দারা বিচিত্র সব পশু-পাখির আদলে ভ্রমণরত; প্রকৃত প্রস্তাবে মর্ত্যলোকে যাহাদের ছিলো এক বেদে জীবন। যে জীবনে ছিলো ফুলবিবির মতো স্কুল পড়ুয়া কিশোরী আর আরেফ আলীর মতো বেদে সর্দার। সর্পরাজ রজব আলীসহ কামাল খান, হাসেম খান সহ নাজির খান মাসুম আলী খান আর বেদেনীদের ঝাঁক। আহা আড়াই হাজার বাসিন্দা আর ২২৬ জন স্কুল পড়ুয়া শিশু কিশোর আর তরুণ। ধারাপাত আর গণিত পড়–য়া শিশু কিশোর। ছিলো টাকা আর টাকার হিসাব।

গহীন অরণ্যে আরেফ আলী নিজেকে সিংহবেশে দেখিয়া আরো খানিকটা অহংকারী হইল। এবং তাহার চতুষপার্শ্বে প্রচুর সংখ্যক কুকুররূপী বেদে-বেদেনীদের দেখিয়া বুঝিতে পারিল যে, এই জগতেও সেই একমাত্র শক্তিমান।

অতঃপর তাহারা নয়জন কুকুর ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হইয়া শিকারের অভিপ্রায়ে বনে গমন করিল। এমন সময় তাহাদের সাথে পশুরাজ সিংহের দেখা। সিংহ বলিল, আমিও শিকারে চলিয়াছি। আমি খুবই ক্ষুধার্ত, চলো আমরা মানব জীবনের মতো একত্রে শিকার করি, যাহাতে সোনাপুর পপল্লীর মতো আমরা সকলেই সুখী হই।

অতঃপর তাহারা নয়জন কুকুর সিংহের প্রস্তাবে রাজি হইল।

সমস্ত দিন ধরিয়া সিংহ এবং কুকুর দল শিকারের কাজে ব্যস্ত থাকিল। এবং অবশেষে তাহারা সকলে মোট দশটি গাভি (যাহা দ্বারা ভূমি কর্ষণ করা হইত) শিকার করিল। দিন শেষে তাহারা সকলে একত্রিত হইল। সিংহ বলিল, এখন আমাদের শিকার ভাগ করিয়া নেওয়া কর্তব্য। কীভাবে বন্টন করা যায় তাহা তোমরা বলো।

এই সময় নয়জন কুকুরের মধ্যে একটি কুকুর উৎসাহের সাথে বলিয়া উঠিল, এ আর কী এমন কঠিন কাজ! এতো খুবই সহজ। সিংহরাজ আপনাকে দিয়ে আমরা সকলে সংখ্যায় মোট দশজন আছি এবং গাভীও আছে দশটি। সুতরাং আমরা প্রত্যেকে একটি করিয়া ভাগে পাইতেছি।

কুকুরটির কথা শুনিয়া সিংহ ভয়ানক ক্রুদ্ধ হইল। সিংহ তৎক্ষণাৎ কুকুরটিকে এমন একটি থাবা বসাইল যে, বেচারীর দুইটি চোখই গলিয়া গেল এবং চিরজীবনের জন্য সে অন্ধ হইল। অতঃপর সিংহ মন্তব্য করিল, সমাজে কুকুরদের অন্ধ থাকাই উত্তম।

দেখিয়া এবং শুনিয়া অপরাপর কুকুরেরা ভয়ে জড়োসড়ো। তাহারা বলিল, প্রভু আমরা অন্ধ আছি এবং চিরকাল অন্ধই থাকিব?

এক্ষণে সিংহ প্রফুল্ল হইল। অতঃপর একজন কুকুর সাহস সঞ্চয় করিয়া বলিল, প্রভু আমাদের প্রথম বন্ধু ভুল বলিয়াছিলো। আমরা অবশ্যই আপনার ভাগে নয়টি গাভী প্রদান করিব এবং আমরা কুকুরেরা আমাদের ভাগে একটি মাত্র গাভী লইব। এতে করিয়া ভাগাভাগি সমান সমান হইবে। কারণ নয়টি গাভী এবং পশুরাজ আপনি মিলিয়া মোট হইতেছেন দশ। আর আমরা নয়জন কুকুর এবং একটি গাভী মিলিয়া হইতেছি দশ। সুতরাং হিসাব কাটায় কাটায় সমান হইল।

এই কুকুরটির উত্তর সিংহের অতিশয় পছন্দ হইল। সিংহ অত্যাধিক আনন্দিত হইয়া বলিল, তুমি অত্যন্ত জ্ঞানী। তোমার এই বিচার-ব্যবস্থা খুবই উত্তম। কে তোমাকে এই রকম চমৎকার ভাগাভাগি শিখাইয়াছে বৎস?

পশুরাজ যদি অভয় দেন, তাহা হইলে বলি।

সিংহ সহোৎসাহে বলিল, বলো বৎস, নির্ভয়ে বলো।

অতঃপর কুকুরটি বিষণ্ন কণ্ঠে উচ্চারণ করিল, পশুরাজ এইমাত্র আপনার থাবায় অন্ধ হইয়া যাওয়া কুকুর ভগ্নিটির করুণ অবস্থাই আমাকে এমন চমৎকার ভাগাভাগি করিতে শিখাইল।


৪. পরিশিষ্ট


পৃথিবীবাসীর এ হেন বন্টন-প্রক্রিয়া দেখে খাদ্য ও ভোগের দেবতা সহসা বুঝতে পারলেন, অসাম্যের সমাজে মানুষের রিপুতাড়না এমনই প্রবল যে মানুষ এ জন্য প্রতিনিয়ত পেরেসানির মধ্যে থাকলেও প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষ পেরেসান হয় না; বরং পক্ষান্তরে দেবতাগণই পেরেসান হন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন