বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়'এর গল্প : মানডে ব্লুজ


বিষণ্নতা আর মহামারী তাড়ানোর মহৌষধটা কী করে আবিষ্কৃত হল বলা খুব কঠিন। আইডিয়াটা পুরোটাই স্বাতীর। আমার গোড়া থেকেই আপত্তি ছিল। আইডিয়া বলতে ক্যাফে। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বে সবুজের সমারোহে একটি নিবিড় অথচ আর্বান প্রেমকুঞ্জ। ক্যাফে ডি মাডান, আমাদের প্রিয় ক্যাফে। আমাদের মানে আমার আর স্বাতীর। আমরা দুজনে এটা চালাই। ক্যাফে অবশ্য নামেই। দিনের বেলা আমরা বেচি ভাত, মুর্গির ঝোল, রুটি। যেকোনো একটা তরকারি।

চা, বিস্কুট আর বাপুজি কেক। রাতে বেচি বিয়ার আর বাংলা। কফি সারাদিনই পাওয়া যায়। ক্যাফে ডি ম্যাডান, শুনতে ফরাসী-ফরাসী লাগলেও, নামটা শুদ্ধ বাংলা। মদনের ক্যাফে। অন্য সবকিছুর মতো নামের আইডিয়াটাও স্বাতীর। ক্যাফে যেমনই হোকনা কেন, নামের আইডিয়াটা ম্যাগনিফিক, সন্দেহ নেই। শীতের রাতে ক্যাপুচিনোয় চুমুক দিতে-দিতে নায়ক ও নায়িকা মদনবাণে বিদ্ধ হবে, চোখে-চোখে কথা হবে, টেবিলের নিচে পায়ে-পায়ে হবে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা, আর আমাদের এই কুঞ্জবন ফুলে ও ফলে পল্লবিত হয়ে উঠবে, আদতে এটাই ছিল কনসেপ্ট। মদন কথাটা শুনতে খারাপ লাগায় রতি দিয়েও ভাবা হয়েছিল, কিন্তু র্যাটিস ক্যাফেটা কেমন র্যাটিশ র্যাটিশ লাগায় ওটা বাতিল হয়। ইঁদুর এবং আরশোলা, স্বাতীর দুচোখের বিষ। ফরাসী কায়দায় তাই ওটাকে ম্যাডান করে দেওয়া হয়।


তবে বললে হবেনা, স্বাতী বড়ো করে ভাবতে টাবতে পারে। ক্যাফেটা বানানোর সময়ই এটা নিয়ে স্বাতীর খুব বড়ো স্বপ্ন ছিল। তখনও অবশ্য মহামারীর ব্যাপারটা ভাবা হয়নি। ভাবার কোনো কারণও ছিলনা। ওইসব আপদ তো শুরু হয় শীতে, আর তখন শরৎকাল হলে কী হবে, ফাটিয়ে গরম। তখনও দুনিয়ায় ফূর্তির ফোয়ারা বইছে। যাবতীয় রইস আদমীরা সুট কোট ছেড়ে রাস্তায় হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ঘুরছে। তাদের এক আনা এই ক্যাফেতে ঢুঁ মারলেও কাফি, এরকমটাই ছিল স্বাতীর আইডিয়া। কার্যক্ষেত্রে অবশ্য দেখা গেল, যে, খদ্দের বলতে চাট্টি হাড়বজ্জাত ছাড়া আমাদের বিশেষ কেউ জোটেনা। কথাটা আমি আগেই বলেছিলাম, কিন্তু স্বাতী কান দিলে তো। ইউনিভার্সিটি পাড়া হলে কী হবে, এখানে সব লোকই হয় নিষ্কর্মা নয় চোর, গুলবাজ কিংবা ভিখিরি। কয়েকপিস মার্ক্সিস্টও আছে। তারা সারাদিন বসে বুকনিবাজি করে, দাড়ি চুমরোয়, মেয়েদের সঙ্গে ছক-টক করে, আর খেয়েদেয়ে চান্স পেলেই পয়সা না দিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। প্রেমিক-প্রেমিকারা একদম আসেনা তা নয়, কিন্তু তারা কেউ আর নবীন পল্লবটি নয়। সব সিজনড মাল, অন্য কোথাও শুয়ে টুয়ে এখানে সন্ধ্যেবেলা আসে ঝগড়া করতে। কিছু লাগবে কিনা, জিজ্ঞাসা করলে দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে। যেন বসে থেকেই উদ্ধার করছে। ছাত্রছাত্রী যে কটা আসে, সেগুলোও বাপে তাড়ানো, মায়ে খেদানো। যমের অরুচি। হয় অ্যানার্কিস্ট নয় লম্বাচুলো গিটার বাদক। বছর বছর ফেল মারে। গাঁজা-ফাজা খায়।

ক্যাফেতে অবশ্য গাঁজা চলেনা। স্বাতী পরিষ্কার বলে দিয়েছে, এখানে নেশাভাঙ চলবেনা। খেতে হলে আমাদের বিয়ার খাও, আর গাঁজাগুলি খেতে হলে বাইরে খেয়ে এসো। একটা কথা বলতেই হবে, র্যাডিকাল হোক বা উগ্রপন্থী, স্বাতীর কথা এখানে সবাই শোনে টোনে। চোর হোক ছ্যাঁচোড় হোক, ক্যাফে উঠে গেলে যাবে কোথায়? এই ক্যাফের পিছনে স্বাতী তো কম পরিশ্রম দেয়নি। প্রথম যখন তৈরি করা হয়, তখন আমাদের পকেটে ছিল ফুটো কড়ি। এদিক-সেদিক থেকে স্বাতী জোগাড় করে এনেছিল এইসব চেয়ার-টেবিল। বাবুরা যাতে বসে গুলতানি দেন। বেশিরভাগই ফেলে দেওয়া মাল। ডাস্টবিনের পাশ থেকে তুলে আনা। বাকিগুলো লোকের বাড়ির সস্তা মাল, জলের দরে কেনা। সেই জন্য আমাদের এখানে প্রত্যেকটা চেয়ারই ইউনিক পিস। কাঠের হাতলওয়ালা ইজিচেয়ারের পাশে নড়বড়ে টিনের চেয়ার। লোহার উঁচু টেবিলের পাশে স্টাইলিশ কম্পিউটার টেবিল। একপিস সিঙ্গল সিটার সোফাও আছে, যার পেট ফেটে বেরিয়ে এসেছে নাড়িভুঁড়ি। সব মিলিয়ে একটা প্রচণ্ড ইন্টেলেকচুয়াল ব্যাপার। সবুজ কাঠের বারস্টুলে বসে পাইপ টানতে টানতে দাড়িওয়ালা অধ্যাপক যখন সোফায় বসা পেশাদার ছিঁচকে চোরের সঙ্গে দর্শন আলোচনা করেন, সে এক দেখার মতো দৃশ্য হয়। ভাষায় যার বর্ণনা হয়না।

অক্ষয় করে রাখবার জন্য ক্যাফের এইসব অবিস্মরণীয় দৃশ্যের ছবি আমরা কিছু তুলে-টুলে রেখেছিলাম। সেখান থেকেই পুরো ব্যাপারটা শুরু বলা যায়। তখন সবে শীতের শুরু। মহামারীর ব্যাপারটা তখনই আমাদের মাথায় আসা উচিত ছিল। কারণ, প্রায় প্রতি শীতেই নিয়ম করে এই উপদ্রব দেখা যায় আমাদের শহরে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়, লোকজন বেরোয়না, আর মহামারীতে অন্য কিছু হোক বা না হোক, দোকান-বাজার-ব্যবসাপত্তর পটল তুলতে বসে। খাবার দোকান, পান্থশালা, হোটেল-রেস্তোরাঁ সব খাঁখাঁ করে। টপাটপ কাজ যায় লোকের আর বিক্রিবাটা বন্ধ হয়ে ব্যবসাপাতি লাটে ওঠার উপক্রম হয়। সেজন্য শীতের আগে থেকেই এখানকার ব্যবসাদাররা কারবার বাঁচাতে হরেক রকম উদ্ভাবনী স্ট্র্যাটেজি নেয়। দোকান সাজাতে শুরু করে লাল-নীল আলো দিয়ে। কেউ দেয় ডিস্কোলাইট। কেউ মায়াবী নিয়ন। কোনো কোনো দোকান ফ্রিতে পপকর্ন খাওয়ায়। কেউ আধন্যাংটো মেয়েদের ছবি টাঙিয়ে রাখে। যেমন করে খদ্দের টানা যায় আর কী।

আমাদের অবশ্য এসব ব্যবসা-বুদ্ধির বালাই ছিলনা। ঐসব ডিস্কোলাইট দেবার পয়সাও ছিলনা অবশ্য। মহামারীর কথাটা আমি বলেছিলাম যদিও। শীতের শুরুতেই। তখনই আমাদের খদ্দের কমতে শুরু করেছে এক এক করে। ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায়, এমনকি চোর-ছ্যাঁচোড়-ভবঘুরেরাও ক্যাফে থেকে খসে যাচ্ছে একটা-দুটো করে। সেসবও বলেছিলাম। কিন্তু স্বাতী কান দিলে তো। সে তখন ছবি তুলতে ব্যস্ত। ক্যাফের নানা অবিস্মরণীয় মুহূর্ত, সময় ও তার প্রতিবিম্ব, এইসব। আমাদের ফটোগ্রাফির নেশার সূচনা এইখান থেকেই। আমি অবশ্য বারণ করেছিলাম, কিন্তু স্বাতী শুনলে তো। হটশট না শুট অ্যাট সাইট কি একটা ক্যামেরা ছিল আমাদের, সেটা দিয়ে ঝপাঝপ করে কটা ছবি তুলে ফেলল। বেচু নামে আমাদের এক মাথামোটা খদ্দের সেগুলো সস্তায় প্রিন্ট করেও দিয়েছিল। সস্তা কাগজে। পোস্টারের সাইজে -- বেচুর ঐরকমই বুদ্ধি। অবশ্য বড়ো করে প্রিন্ট করে ভালই করেছিল বলতে হবে, তবেই না স্বাতীর মাথায় সব্বোনেশে আইডিয়াটা এল। তার সঙ্গে মহামারীর সম্পর্কটা অবশ্য বুঝিনি তখন। তবু কী জানি কেন, আমারও আইডিয়াটা ভালো লেগে যায়। কাজকর্ম না থাকলে যা হয় আর কি। দুম করে একদিন সারা রাত্তির জেগে আমরা পুরো ক্যাফেটারই ভোল বদলে ফেলি। দুজনে মিলে। প্রিন্ট করা ছবিগুলো দেওয়ালে ঝোলানো হয়। পাশের সার্কাস ময়দান থেকে কিনে আনা হয় চে গুয়েভারার একটা সাদাকালো পোস্টার। কাউন্টারের ঠিক পিছনে সারি-সারি বয়ামের আড়ালে যেখানে আমি ঝিমোই, তার ঠিক উপরে টাঙিয়ে দেওয়া হয় পোস্টারখানা। ছাত্রদের কাছ থেকে জোগাড় করা হয় বিক্রি না হওয়া গুচ্ছ র্যাডিকাল বইপত্র, লিফলেট। তার পাতা আর প্রচ্ছদ ছিঁড়ে লাগিয়ে দেওয়া হয় দেওয়ালের রঙচটা প্লাস্টার খসে পড়া জায়গাগুলোতে। আর ঝুলে থাকা টিমটিমে বাল্বগুলোর গায়ে লাল-হলুদ লিফলেটগুলো পাকিয়ে ল্যাম্পশেড বানিয়ে তোলা হয়। কাউন্টারের মাথায় মেনু হিসেবে ঝোলানো হয় একটা হাতে লেখা কাগজ। তাতে খবরের কাগজে লাল অক্ষরে লেখা, "যেদিন যা মেলে'। বেঁচে যাওয়া বইপত্তরগুলোকে ডাঁই করে রাখা হয় কাউন্টারের পাশে। আরবী-ফার্সি জিহাদি লিফলেটের পাশে শোভা পেতে থাকে জনগণতান্ত্রিক ইশতেহার। মার্কসের পাশে পর্নোগ্রাফি। আধছেঁড়া কবিতার বই।

আমাদের সব্বোনেশে ফটোগ্রাফি চর্চার সূত্রপাত এখান থেকেই। আইডিয়াটা বেজায় হিট করে যায়। ঐ প্রচন্ড শীতেও পরদিন ক্যাফেতে দেখা যায় থিকথিকে ভিড়। দেড়েল অধ্যাপক স্বাতীর পাছায় ঠোনা মেরে বলেন, বেড়ে জিনিস বানিয়েছ কিন্তু। ছাত্ররা ইনকিলাব-জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে ভুলে যায়। প্রেমিক-প্রেমিকারা ঝগড়া বন্ধ করে ফিসফিস করে কথা বলতে থাকে। একজন র্যাডিকাল বুদ্ধিজীবী কনসেপ্টটার নাম দেন নিয়ন্ত্রিত অ্যানার্কি। যা কিনা, অ্যানার্কির মোড়কে পুরোনো মদ। মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি, চুরি-চামারি একদম কমে যায়। সব মিলিয়ে আমাদের একটা ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হয়। বেচু কলার তুলে ঘুরতে থাকে। স্বাতী সালোয়ার কামিজ ছেড়ে স্প্যাগেটি টপ ধরে। আমি দাড়ি ট্রিম করি। প্রতিটি সন্ধ্যায় আমাদের ক্যাফেয় উপচে পড়ে ভিড়। "চলমান বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক' লেখা লাল ল্যাম্পশেড থেকে ছড়িয়ে পড়ে রহস্যময় আলো। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আমি লেড়ো বিস্কুট বেচেবেচে হদ্দ হয়ে যাই। ঝিমোতে সময় পাইনা।

আর সেই রাতেই স্বাতীর মাথায় আসে ছবি তোলার যুগান্তকারী সেই নতুন আইডিয়া। যা আসলে মড়ক তাড়ানোর মহৌষধ। ক্যামেরা ছেড়ে সেই রাতে স্বাতী নিজেই ছবির সাবজেক্ট হয়ে যায়। গভীর রাতে সব খদ্দেররা চলে যাবার পর রহস্যময় লাল আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আমি স্বাতীর দিকে ক্যামেরা তাক করি। স্বাতী বিভিন্ন পোজ দেয়। খুঁটির নিচে দুহাত তুলে দাঁড়ায়। টাইট জিন্স আর কালো টপ পরে মেঝেতে বসে পড়ে। ব্রা পরে চে'র ছবির নিচে দাঁড়িয়ে মাটির খুরিতে চা খায়। আর সেইসব অপার্থিব ছবি আমি টপাটপ ক্যামেরাবন্দী করতে থাকি।

এই সময়ই আমরা ক্যাফেতে সেল্ফ সার্ভিস চালু করি। বাধ্য হয়ে। তখন প্রবল শীত। ঝুপঝাপ বরফ পড়ছে, থেমে যাচ্ছে জনজীবন। রাস্তায় আটকে থাকছে বিগড়ে যাওয়া বাস আর বিষণ্ন পথিককুল। সারারাত আগুন জ্বালিয়ে আমরা ঘর গরম রাখি। আর সেই গনগনে আগুনের আলোয় আমি সারারাত ছবি তুলি। স্বাতী সারারাত পোজ দেয়। ভোরবেলা আমরা ক্যামেরার ডিসপ্লেতে খুঁটিয়ে দেখি সেসব। আর প্রথম কাক ডাকার পর দোকান খুলে বসি। রাত্রি জাগরণে চোখ বুজে আসে। স্বাতী স্প্যাগেটি টপ পরে ঘুরতে থাকে চেয়ার-টেবিলের মধ্যে আর আমি সারি-সারি বয়ামের পিছনে ঝিমোতে থাকি। একটু পরে দেখি একটা চেয়ারে ঠ্যাং তুলে স্বাতী ঘুমিয়ে আছে। কোনোকোনো দিন আমি ওর স্কার্ট ঠিক করে দিই। তারপর বয়ামের পিছনে এসে ঘুমিয়ে পড়ি। খদ্দেররা খাবার চাইতে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘুম ভেঙে কোনোকোনোদিন দেখি লম্বা লাইন পড়ে গেছে। ভাত আর মুর্গির ঝোলের। চেঁচামেচি কেউ করেনা অবশ্য। কিন্তু তাতে কী। আমাদের তো একটা ব্র্যান্ড ইমেজ আছে। দেশ-বিদেশ থেকে টুরিস্ট আসে আমাদের দোকানে। তাদের তো আমরা দাঁড় করিয়ে রাখতে পারিনা। তাই বাধ্য হয়েই চালু করে দিই সেল্ফ সার্ভিস। চিরকালই যেমন হয়, এই আইডিয়াটাও স্বাতীর। কাউন্টারের পাশে আমরা সাজিয়ে রাখি খাবার-দাবার। চা। লেড়ো বিস্কুট। ভাত। মুর্গির ঝোল। তরকারি। বিয়ার। আর জলের মতো কফি। তার পাশে ডাঁই করা থালা। কাগজের কাপ। কাউন্টারের কোনে রাখা থাকে আমাদের ছোট্টো পিগি ব্যাঙ্ক। পয়সা ফেলার জন্য। পাশের সার্কাস ময়দান থেকে স্বাতী এটা কিনেছিল। খদ্দেররা নিজে নিজে খাবার নেয়। নিজেদের মধ্যে গজল্লা করে। তারপর উঠে যাবার সময় পিগি ব্যাঙ্কে ফেলে দিয়ে যায় পয়সা। যে যা পারে দেয়। ও ব্যাপারে আমাদের কোনো গাইডলাইন নেই। আমরা টাকা-ফাকা গুনিনা। চাইওনা। দিনের শেষে পিগি ব্যাঙ্ক খুলে দেখে নিই কতো হল। ব্যস। এটা অবশ্য দিনের বেলার গল্প। রাত্তিরে কেসটা উল্টে যায়। রাত্তির হলেই ঝিমুনি ছেড়ে আমরা চেগে উঠি। বিশেষ করে শনি-রবিবার। কেউ বিশেষ খেয়াল করেনা ব্যাপারটা। কারণ, এই জানুয়ারিতে, এমনিতেই, আমাদের এই শীতশহর, শুধু সন্ধ্যেতেই জেগে ওঠে। প্রতি শীতেই, যখন বরফে ঢেকে যায় চারদিক, তখনই এখানে মহামারীর উপদ্রব হয়। যাতে কাবু হয়ে যায় সমস্ত শহরবাসী। রবিবার ভোরের কুয়াশার সঙ্গে এক ধরণের অদ্ভুত বিষণ্নতার জীবাণু সারা শহরের দখল নিয়ে নেয়। প্রায় প্রতিটি মানুষকে ঘায়েল করে ফেলে এক ধরণের বিপজ্জনক অবসন্নতা। মনকে বিকল করে দেয়। রোব্বারের ঝোলানো পাঁঠা আর দুপুরের ভাতঘুম শেষ করে লোকে হপ্তার বাজার করতে দোকানে-হাটে যায়। বরফের উপর দিয়ে তারা যখন খড়মড় শব্দ করে হেঁটে যায়, মেরুপ্রদেশের দিক থেকে তখন হুহু হাওয়া বয়, আর ছড়িয়ে পড়ে জীবাণু। তারা দোকানে যায় বৌ-বাচ্চা নিয়ে, সঙ্গে থাকে খুশি আর রংচঙে ভেঁপু, হাসি। ফিরে আসে বিকল, ব্যথাতুর। শক্তিহীন শরীরের গাঁটে গাঁটে অবসন্নতা কামড়ে ধরে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে মাথা ধরে থাকে। কাজে যেতে শরীর চলেনা।

এই অসুখের পোশাকি নাম মানডে ব্লুজ। কাজে যাবার অনীহা। বিশেষ করে রবিবার সন্ধ্যায় এই মহামারীর প্রকোপ বাড়ে। আর লোকে ভিড় জমায় এই ক্যাফেতে। বিয়ার আর বাংলা খেয়ে নিজেদের চাঙ্গা করার জন্য। টেবিলে-টেবিলে ধোঁয়া ওঠে। গজল্লায় গমগম করে চারদিক। ফুর্তির ফোয়ারা ছোটে। মেয়েরা প্রেমিকের কোলে উঠে বসে। ছেলেরা হেঁড়ে গলায় গান গায়। আর স্বাতী ঝলমলিয়ে সেজে ওঠে। কানে লম্বা দুল পরে। ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষে নেয়। চোখে দেয় কাজলের আবছায়া। হাতে বিয়ার নিয়ে ঘুরতে থাকে টেবিলে-টেবিলে। ফেনায় মিশে থাকে উচ্ছলতা আর হাসির রঙ। এমন ছবিতে কিশোরী মানায় ভালো। আমিও তখন ঝিমুনি ছেড়ে দুপাত্তর নিয়ে বসি। শরীরে উত্তেজনার বোধ আসে। আমি ছাড়া আর কেউ জানেনা, যে, এ শুধু উপক্রমণিকা মাত্র। রাত যুবতী হলে, যখন কেউ কোত্থাও থাকবেনা, আমরা যখন ঝাঁপ ফেলে দেব দোকানের, মোহময়ী নারীটি তখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে। লাল-হলুদ রিমঝিমে আবছা রহস্যময় মায়াময় আলোয় শরীর মেলে দেবে। টেবিলের উপর মিনিস্কার্ট পরে পা মেলে বসবে। দেখা যাবে উরুবাসনা। চোখের কাজলের পাশে রবে অন্ধকার। নির্লোম কাঁধ থেকে স্তনবৃন্তের দিকে পিছলে যাবে আলো।

আমি আমার পুরোনো সুটকেস খুলে বার করে আনব ভুলে যাওয়া এক নরম পর্নোকাগজ। হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে নগ্নিকা আর অর্ধনগ্নাদের ছবি। সঙ্গমদৃশ্য। প্রতিটি পোজ আমরা খুঁটিয়ে দেখব। যেমন রোজ দেখি। তারপর স্বাতীকে চিত করে শুইয়ে দিই ছেঁড়া সোফার উপরে। টেবিলে বসিয়ে রাখি দু-পা ফাঁক করে। ক্রস চিহ্নের সামনে হাঁটু গাড়িয়ে বসাই। আগুনের আলোয় পটাপট তুলতে থাকি ছবি। আবছায়া ও অন্ধকারে। পছন্দ না হলে ডিলিট করি ছবি। আবার তুলি। এমনিতেও অবশ্য প্রতি রাতে আমাদের আগের দিনের সব ছবি মুছে দিতে হয়। আমাদের এই ডিজিটাল ক্যামেরায় শ খানেক ছবি ধরে। শেষ পর্যন্ত ছবি তুলি। পরপর। তারপর এক এক করে সবকটা খুঁটিয়ে দেখি। দুজনে মিলে। দেখতে দেখতে ভোর হয়ে যায়। মেঘলা সকালে যখন একচিলতে আলো জানলা দিয়ে উঁকি মারে, তখন আমরা জানলার পর্দা অল্প করে ফাঁক করি। স্বাতী আমার কোলে এসে বসে। আমি ওর স্তনে হাত দিই। স্তনে ও শরীরে। আমরা জানলা দিয়ে বাইরে দেখি। চারিদিক সাদা আর ধূসর। কুয়াশা। ন্যাড়া গাছ। পূর্ব ইউরোপের সিনেমার কথা মনে পড়ে। চওড়া পিচের রাস্তার পাশে সারিসারি বাড়ি। কুয়াশায় আবছা হয়ে আসা। স্পষ্ট দেখা যায়না। বরফে ঢাকা ফুটপাথে জনপ্রাণী নেই। শুধু চাবড়া-চাবড়া বরফ, আর সারি-সারি মুখ-বন্ধ প্লাস্টিকের বস্তা রাখা আছে ফুটপাথের উপর। বেশিরভাগই কালো। ইয়াব্বড়ো সব বস্তা, দেখলে মনে হয় লাশ ভরা আছে। প্রতিটি বাড়ির সামনে কুয়াশার আলো-আঁধারিতে, দেখে মনে হয়, সারিসারি লাশ সাজিয়ে রাখা আছে। বস্তায় ভরা।

আসলে লাশ-টাশ না। সোমবার আমাদের পাড়ায় জঙ্গল সাফ করার দিন। বাড়ির ময়লা নিতে আসে মিউনিসিপ্যালিটির ট্রাক। লোকে গোটা সপ্তাহের জাল প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে জমিয়ে রাখে বাড়ির সামনে। অন্য কিছু না। মহামারীর প্রকোপেই ওদের লাশ মনে হয়। এর মধ্যে কোনো কোনো দিন সকাল থেকেই আবার বরফ পড়ে। ঝুরঝুর করে। কিংবা আইস রেন। ঠকাঠক করে আওয়াজ হয় গাড়ির চালে। মনে হয় ভূতে ঢেলা মারছে। কখনও সখনও এক আধটা গাড়ি আসে চার-মাথার মোড়ে। চাকা পিছলে যায় বরফে। গাড়ি স্টিয়ারিং এর শাসন মানেনা। যেমন খুশি চলে। বোঁবোঁ করে ঘুরে যায়। জানলা থেকে আমাদের মনে হয় কোনো অশরীরী হাত দিয়ে টানছে। মোড়ের মাথায় থামতে গিয়ে কোনো কোনো গাড়ি ক্যারামের স্ট্রাইকারের মতো চক্কর খেতে থাকে। অন্য দিক থেকে বাইচান্স কোনো গাড়ি এসে গেলে, সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ না চক্কর শেষ হয়। গোলচক্কর শেষ হয়, কিন্তু কোনো শব্দ শোনা যায়না। দূরে হাইওয়ের পাশে দেখা যায় উল্টে আছে ট্রাক। থেমে আছে গাড়ি। চুপচাপ। আকাশ থেকে নেমে আসছে বরফ, আর এই ভূতের রাজত্ব আলো করে রাস্তার ধারে সারিসারি সাদা-কালো লাশ বসে আছে। আমরা ভোরবেলা বসে বসে এইসব দেখি। স্বাতীকে কোলে বসিয়ে দেখি আলো-আঁধারি শীতের সকাল। মারীগ্রস্ত ভূতের শহর। সারিসারি লাশ আর গাছের কঙ্কাল। শরীরে শরীরে খেলা হয় অল্প। চোখ বুজে ঘুম আসে ক্লান্তিতে। তবু চোখ খুলে রাখি। কারণ, একটু পরেই খুলে যাবে, আমাদের প্রিয় ক্যাফে, ক্যাফে ডি মাডান। এই রোগগ্রস্ত শহরের একমাত্র আশার আলো। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বে সবুজের সমারোহে একটি নিবিড় অথচ আর্বান প্রেমকুঞ্জ। আমাদের একান্ত আপন ক্যাফে। বিষণ্নতার এপিডেমিক থেকে বাঁচতে হলে, এই শহরে, যার আর কোনো বিকল্প নেই।

1 টি মন্তব্য: