বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

আলেক্সান্দর পুশকিনের গল্প : স্টেশনের ডাকবাবু


অনুবাদ : ননী ভৌমিক

পদে অবিশ্যি কেরানীবাবু,
ডাক-স্টেশনেতে স্বৈরপ্রভু।

প্রিন্স ভিয়াজেমস্কি

এমন কে আছে যে স্টেশনের ডাকবাবুকে অভিশাপ দেয়নি, গালাগালি দেয়নি? রুঢ়তা, বেয়াদবি ও বেআক্কেলেপণার নিস্ফল নালিশ টুকে রাখার জন্যে হঠাৎ ক্ষেপে উঠে সেই করাল খাতাখানা চেয়ে বসেনি; সেকেলে নায়েবদের মতো, এবং অন্ততপক্ষে মুরোম দস্যুদের মতোই মানবজাতির কুলাঙ্গার বলে তাকে ভাবে না কে ? তবু একবার নিরপেক্ষ হবার চেষ্টা করা যাক এবং ওদের জায়গায় দেখা যাক নিজেকে দাঁড় করিয়ে। তাহলে হয়ত বা অনেক ক্ষমার চোখে ওদের দেখা সম্ভব হবে। ডাকবাবুটি কে ? নিতান্তই সর্বনিম্ন কর্মচারী পদের এক শহীদ। চড়চাপড় ঘুষি থেকে যে বাঁচে। শােধ তার সরকারী তকমাটির জোরে, তাও সর্বদা নয় (পাঠকেরা নিজের বিবেকের দিকে তাকান)। প্রিন্স ভিয়াজেমস্কি যাকে রহস্য করে ‘ডাক-ষ্টেশনের স্বৈরপ্রভূ’ বলে অভিহিত করেছেন সেই লোকটির কাজটা কী রকম ? একেবারে খাঁটি কয়েদ খাটুনি নয় কি ? দিনে রাতে শান্তি নেই। বিরক্তিকর যাত্রাপথে যত রাগ জমে ওঠে, তার সবই এসে যাত্রীরা ঝাড়ে ডাকবাবুর ওপর। আবহাওয়াটা বিশ্ৰী, রাস্তা জঘন্য, কোচোয়ানটা একগুঁয়ে, ঘোড়াগুলো গেঁতো — এর সব দোষ ডাকবাবুর। তারই হতভাগ্য ঘরখানায় এসে উঠে যাত্রীরা তাকেই গণ্য করছে শত্রু বলে। অনিমন্ত্ৰিত এই অতিথিদের কবল থেকে তাড়াতাড়ি রেহাই পেলে সে তার সৌভাগ্য। আর যদি ঘটনাচক্রে সে সময় ঘোড়া মজুত না থাকে ?... হায় ভগবান, তাহলে, সে কী গালাগালি তর্জনগর্জনের পালা! বৃষ্টি হোক কাঁদা হোক এবাড়ি ওবাড়ি ছুটােছুটি করে বেড়াতে সে বাধ্য। ক্ষিপ্ত যাত্রীর চিৎকার আর ঘাড় ধাক্কা থেকে ক্ষণিকের মুক্তির জন্যে তাকে হয়ত বড়োদিনের তুষার-পাত আর ঝড়ঝঞ্জার মধ্যেই গিয়ে দাঁড়াতে হবে বাইরের খোলা বারান্দায়। হয়ত এলেন এক জেনারেল, কম্পমান ডাকবাবুকে তার শেষ দুটাে ত্রয়কাও ছেড়ে দিতে হল – অথচ ওর একটা ছিল ডাকগাড়ির জন্যে রিজার্ভ করা। মৌখিক একটু ধন্যবাদ পর্যন্ত না দিয়ে জেনারেল চলে গেলেন। আর তার পাঁচ মিনিট পরেই শোনা গেল ঘণ্টার শব্দ - সরকারী হরকরা এসে টেবিলের ওপর হকুম-নামা ফেলে দিয়ে তাজা ঘোড়ার চাহিদা জানিয়ে বসল !... এইসব ঘটনাগলো ভালো করে ভেবে দেখলে ক্রোধের বদলে হৃদয় ভরে উঠবে অকৃত্রিম সহানভূতিতে। তাছাড়া আরো কয়েকটা কথা বলি। কুড়ি বছর ধরে আমি রাশিয়ার সবত্র ঘুরে বেড়িয়েছি। প্রায় সব ক’টি ডাক রাস্তা আমার চেনা। কোচোয়ানদের কয়েক পুরুষের সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি চিনি না কিংবা সংশ্রবে আসিনি এমন ডাকবাবু নেই বললেই হয়। আমার এইসব সফরের সময় যে সব চমকপ্ৰদ অভিজ্ঞতা লাভ করেছি তা যথাসত্বর প্রকাশ করার একটা আশাও আমার আছে। আপাতত এইটুকু বলি যে স্টেশনের ডাকবাবু এই সম্প্রদায়টা সম্পর্কে সাধারণ লোকের যে ধারণা সেটা খুবই ভুল। বহু নিন্দিত এই সব ডাকবাবুরা আসলে বেশ শান্তিপ্রিয় লোক, পরোপকারী স্বভাব, বেশ মিশুক ব্যবহার, নিজেদের মানমর্যাদা নিয়ে খুতখুতি নেই, আর টাকার খাঁইও খুব বেশি নয়। বেশ শিক্ষাপ্রদ এবং চিত্তাকর্ষক বহু বিষয় তাদের কথাবার্তা থেকে আহরণ করা সম্ভব, (পরিব্রাজক মহাশয়েরা অযথাই এগুলি তাচ্ছিল্য করেন)। আমার কথা যদি বলেন, আমি বরং সরকারী কাজে ভ্ৰাম্যমাণ কোনো ষষ্ট পঙক্তির রাজপুরুষের ভাষণ শোনার চাইতে এদের সঙ্গেই আলাপ করতে ভালোবাসি।

বুঝতেই পারছেন, ডাকবাবু এই শ্রদ্ধেয় সম্প্রদায়টির মধ্যে আমার অনেক বন্ধু আছে। বলতে কি, এদের একজনের স্মৃতি আমার কাছে অতি মুল্যবান। ঘটনাচক্ৰে আমায় তার সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। তারই কথাইই আমি এবার আমার দরদী পাঠকদের কাছে বলব।

১৮১৬ সালের মে মাসে আমাকে ক ... গুবের্নিয়া দিয়ে যেতে হয়েছিল, সে পথটা এখন লুপ্ত হয়ে গেছে। আমি তখন ক্ষুদে এক অফিসারের পদে ঢুকেছি, যেতে হয়েছিল ডাক রাস্তা দিয়েই, কিন্তু পয়সা ছিল কেবল দুটি ঘোড়ার জন্যে। ফলে ডাকবাবুরা আমায় বিশেষ সম্ভ্রম দেখাত না। তাই আমার যা ন্যায্য প্রাপ্য বলে আমার ধারণা, তা আমাকে প্রায়ই আদায় করতে হত জোরজার করে। বয়স তখন কাঁচা, স্বভাবটাও ছিল একটু রগচটা। তাই যখন আমার ত্রয়কার জন্যে তৈরি রাখা ঘোড়া হঠাৎ কোনো এক বুড়ো চাকুরিয়াকে দিয়ে দেওয়া হত তখন এই সব ডাকবাবুদের নীচতা ও কাপুরষতা আমাকে ক্ষেপিয়ে তুলত। এটা গা-সহা করতে আমার ততদিন লেগেছিল, যতদিন লেগেছিল লাট সায়েবের ভােজসভায় বিচক্ষণ ভূত্যের খাদ্য পরিবেশনে আমার বাদ পড়াটা গা-সহ করে নিতে। আজকাল ও দুটাে ব্যাপারই আমার কাছে অতি স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কেননা পদমর্যাদার হিসাবে যারা ছোটাে তারা বড়োকে মানবে এই নিয়মের বদলে যদি ধরা যাক মননশক্তির হিসেবে যারা ছোট তারা তাদের চেয়ে বড়দের মানবে এই নিয়ম চালু করা যায় তাহলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াবে ? কী ভয়ানক তর্কই না শুরু হয়ে যাবে!

চাকরবাকরেরাই বা কাকে পরিবেশনের সময়ে তোয়াজ করবে প্রথম ? কিন্তু সে কথা যাক, কাহিনীতে ফিরে আসি।

সে দিন বেশ গরম পড়েছিল। ক ... ডাক-স্টেশনটায় পৌছতে তখনো তিন ভার্স্ট পথ বাকি, এমন সময় ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তে শুরু করল। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঝমঝম বৃষ্টিতে ভিজে চবচবে হয়ে গেলাম। ডাক-ষ্টেশনটায় পৌছে আমার প্রথম কাজ হল যত তাড়াতাড়ি পারা যায় পোষাক বদলে ফেলা এবং দ্বিতীয় কাজ চায়ের হকুম করা। ডাকবাবু হাঁক দিল, “এই, দুনিয়া, সামোভারটায় আগুন দে তো, আর গিয়ে খানিকটা ক্রীম জোগাড় করে আন।” জবাবে পার্টিশান দেয়ালের ওপাশ থেকে বছর চোদ্দ বয়সের একটি মেয়ে বেরিয়ে এসে ছুটে গেল বাইরের বারান্দার দিকে। মেয়েটির রুপ দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওঁ কে, তোমার মেয়ে ?” বেশ অহঙ্কারের সুরে ডাকবাবু বললে, ‘হ্যাঁ, ভারি বুদ্ধিমতি, ভারি চটপটে – ঠিক ওর পরলোকগত মায়ের মতো।” লোকটা আমার অর্ডার টুকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরখানার দেয়ালে-টাঙানো ছবিগুলো দেখতে শুর করলাম। ছবিগলোতে কুপুত্রের কাহিনী” বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম ছবিখানায় দেখা যাচ্ছে একজন শ্রদ্ধাভাজন বৃদ্ধকে। মাথায় তার রাতের টুপি, গায়ে ড্রেসিং গাউন। একটি অস্থিরমতি যূবককে তিনি বিদায় দিচ্ছেন। যুবকটি তাড়াহুড়ো করে তাঁর কাছ থেকে আশীর্বাদ আর একটি টাকার থলি গ্রহণ করছে। পরের ছবিতে খাব জাজ্বল্যমান করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যুবকটির স্খলিত চরিত্রের কথা। পানভোজনের টেবিলের সামনে সে বসে আছে আর তার চারিপাশে ঘিরে আছে কপট বন্ধু ও লজ্জাহীনা নারীর দল। এর পরে রয়েছে যুবকটির সর্বনাশ ঘটার ছবি। — পরনে ছেঁড়া-ছেঁড়া পোষাক, মাথায় তেকোণা টুপি, শুয়োর চরাচ্ছে আর ওই শুয়োরের খাদ্যই ভাগ করে খাচ্ছে। মুখে তার গভীর বিষাদ ও অনুশোচনার ছাপ। শেষ ছবিখানায় দেখা যাচ্ছে সে বাপের কাছে ফিরে এসেছে, সহৃদয় বৃদ্ধ মানুষটির মাথায় এবারেও সেই রাতের টুপি, গায়ে ড্রেসিং গাউন। তিনি ছুটে এসেছেন তাকে গ্রহণ করতে। কুপুত্র তাঁর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসেছে — পেছনে দেখা যাচ্ছে বাবুর্চি একটি মোটাসোটা গোবৎস জবাই করছে আর যুবকটির বড়ো ভাই চাকরবাকরদের জিজ্ঞেস করছে ধুমধামের কারণটা কী ? প্রত্যেকটি ছবির নিচেই জুতসই সব জার্মান ছড়াও বেশ পাঠ করা গেল। এ সবটাই এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে - মনে আছে সেই ফুলভতি ভাঁড়াটা, রঙচঙে পর্দা ঢাকা বিছানাটা, আমার চারপাশে যত কিছু জিনিস ছিল সব। গৃহকর্তাটির মূর্তি এখনো আমার চোখে ভাসছে — স্বাস্থ্যবান, ফূর্তিবাজ, বছর পশ্চাশেক বয়স, গায়ে একটা লম্বা সবুজ জোব্বা, তাতে বিবৰ্ণ ফিতোয় লটকানো তিনটি মেডেল।

আমার আগের কোচোয়ানকে পাওনা মিটিয়ে দিতে না দিতেই দনিয়া ফিরে এল। তার সামোভার নিয়ে। কিশোরী এই লাস্যময়ীর বুঝতে দেরি হয়নি, আমার মনে সে কী রকম ছাপ ফেলেছে। আমাকে দেখে সে তার বড়ো বড়ো নীল চোখদুটাে নামিয়ে নিলে। তার সঙ্গে কথা কইতে শুর করলাম। আমি — সে একটুও সঙ্কোচ না করে জবাব দিয়ে গেল। সংসারাভিঙ্গ মেয়ের মতো। দুনিয়ার বাপের দিকে আমি এক গ্লাস মদের পাণ্ড এগিয়ে দিলাম - দুনিয়ার জন্যে এগিয়ে দিলাম। এক কাপ চা। তারপর তিনজনে কথা কইতে শুরু করলাম যেন কতকাল থেকে আমাদের জানাশোনা।

অনেক আগেই ঘোড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ডাকবাবু, আর তার মেয়েটিকে ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না। তবু একসময় উঠতে হল। বাপ শুভযাত্রা কামনা করলে, মেয়ে আমাকে গাড়ি পর্যন্ত পৌছিয়ে দিতে এল। বার-বারান্দায় এসে আমি একটু দাঁড়ালাম, চুমা খাওয়ার অনুমতি চাইলাম। দুনিয়া অ্যপত্তি করলে না।

"যেদিন থেকে নেমেছি এই পথে ...”। সেদিন থেকে অনেক চুম্বনই আমি পেয়েছি। কিন্তু তার কোনটার স্মৃতিই এমন দীর্ঘ, এমন মধুর হয়ে থাকেনি।

বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। ঘটনাচক্ৰ আবার আমাকে সেই একই পথ দিয়ে সেই একই সব জায়গায় যেতে হয়েছিল। বুড়ো ডাকবাবুর মেয়েটির কথা আমার মনে ছিল। তাকে আবার দেখা যাবে এই কল্পনায় খুশি হয়ে উঠেছিল মনটা । কিন্তু মনে হল, হয়ত বুড়ো ডাকবাবুর জায়গায় এখন অন্য কেউ এসেছে, ইতিমধ্যে দুনিয়ার বিয়েও হয়ে গেছে নিশ্চয়।

ওদের কেউ একজন হয়ত বা বেঁচেই নেই - একথাটাও আমার মনে উঁকি দিয়ে গেল। আর ডাক-ষ্টেশনের দিকে যত এগুতে লাগলাম ততই নানা আশঙ্কায় মন হয়ে উঠছিল বিষন্ন।

ঘোডাগুলো এসে ডাক-বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতর ঢুকতেই নজরে পড়ল সেই কুপুত্রের কাহিনী' বৰ্ণনা করা ছবিগুলো। টেবিল আর বিছানাটা সেই পুরনো জায়গাটিতেই আছে। কিন্তু জানলায় এবার আর কোনো ফুল দেখা গেল না। ঘরের সব কিুছতেই কেমন একটা জীৰ্ণতা আর অবহেলার ছাপ। ডাকবাবু একটি ভেড়ার চামড়ার কোট গায়ে ঘুমিয়ে ছিল। আমার আগমনে ঘুম ভেঙে উঠে বসল... হ্যাঁ, সিমিওন ভিরিনই বটে, কিন্তু কী ভয়ানক বুড়িয়ে গেছে লোকটা ! ও যখন আমার অর্ডার নকল করে নিচ্ছিল তখন ওর পাকা চুল, না-কামানো গালের ওপর গভীর ভাঁজ, আর কুঁজো হয়ে আসা পিঠের দিকে তাকিয়ে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না, অমন হৃস্টপুষ্ট একটা মানুষ এই তিন চার বছরেই এমন জরাজীর্ণ বৃদ্ধ হয়ে গেল কী করে! আমায় চিনতে পারছ না? আমি বললাম, “আমরা পুরনো আলাপী।’ ও বিমৰ্ষভাবে বললে, “তা খুবই সম্ভব। রাস্তাটা বড়ো, অনেক যাত্রীই এখানে আসে।’ বললাম, “তা তোমার দুনিয়া ভালো আছে তো ?’ বুড়োমানষটা ভ্ৰকুটি করলে, বললে, “ভগবান জানেন।” ‘ওর বিয়ে হয়ে গেছে তাহলে ?” বুড়ো লোকটা ভাব দেখালে যেন আমার কথা সে শুনতে পায়নি। বিড়বিড় করে আমার অর্ডারখানা পড়ে যেতে লাগল। সুতরাং প্রশ্ন করা বন্ধ রেখে কেটলিটা চাপাতে হুকুম দেওয়া গেল। কৌতুহল আমায় খোঁচা মারছিল। আশা করলাম একগ্লাস পাশ্চ দিয়ে আমার পুরনো বন্ধুর মুখ খোলা যাবে।

আশাটা ভুল হয়নি। এগিয়ে দেওয়া গ্লাসটাতে বুড়োর আপত্তি হল না। দেখা গেল। ‘রাম” টানতে টানতে ওর বিমর্ষ ভাবটা কেটে যাচ্ছে। দ্বিতীয় গ্লাসের শেষে সে কথা কইতে শুরু করলে। আমি কে তা চিনতে পারলে, অন্তত চিনতে পারার ভান করলে। অতঃপর তার কাছ থেকে যে কাহিনীটা শোনা গেল, তা যুগপৎ আমায় ভয়ানক রকমের আকৃষ্ট ও বিচলিত করে তুলেছিল।

ও শুরু করলে, “তাহলে আমার দনিয়াকে আপনি চিনতেন ? কেই বা তাকে না চিনত! দুনিয়া! দুনিয়া রে! কী মেয়েই না সে ছিল ! এখানে যেই এসেছে সেই ওর তারিফ করেছে। কেউ নিন্দে করেনি। জমিদার গিন্নিরা ওকে কত উপহারই না দিয়েছে, কেউ একটা রুমাল কেউ এক জোড়া দুল। জমিদার বাবুরা এলে খাবার দাবারের অজুহাতে ইচ্ছে করেই দেরি করত, আসলে ওকে আরো কিছুক্ষণ দেখতে চাইত। যতই রাগ হোক না কেন, ওকে দেখামাত্র রাগ জল হয়ে যেত। — আমার সঙ্গে তারা কথা শুর করত। ভদ্রভাবে। বিশ্বাস করবেন না হয়ত – কিন্তু হরকরা আর সরকারী পিয়নরা পর্যন্ত আধ ঘণ্টা খানেক কথা কয়ে যেত ওর সঙ্গে। ওর দৌলতেই সংসার চলত। এটা পরিস্কার করা, ওটা রান্না করা, সবই পরিপাটী।

আর আমি এই বুড়ো বেকুব — দেখে আমার আর আশ মিটত ना, আনন্দ আমার আর ধরতো না। দুনিয়াকে ভালোবাসিনি তা তো নয়, ওকে মাথায় করে রাখতে চাইনি তা তো নয়। জীবনে ওর দু:খ কষ্ট তো কিছু ছিল না! কিন্তু ভগবানের পায়ে মাথা খুড়ে কি আর কেউ সর্বনাশ ঠেকাতে পেরেছে? — কপাল খন্ডাবে কে!' এই বলে ডাকবাবু সর্বনাশের বিশদ বিবরণ আমায় শোনালে:

তিন বছর আগে এক শীতের সন্ধ্যায় ডাকবাবু নতুন একটা খাতার ওপর রােল টানছে আর তার মেয়ে পার্টিশানের পেছনে বসে বসে নিজের জন্যে একটা পোষাক সেলাই করছে। এমন সময় একটি ত্রয়কা এসে থামল। একজন যাত্রী ঘরে ঢুকল। মাথায় তার একটা চেকেসীয় টুপি, গায়ে একটা মিলিটারি গ্রেটকোট আর মোটা মাফলার। ঢুকেই সে ঘোড়ার তলব করলে। ঘোড়া তখন সব বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা শুনে যাত্রীটি তার গলার পর্দা চড়ালে, উঁচু করলে হাতের চাবুক। এ রকম ঘটনা দেখতে দুনিয়া অভ্যন্ত ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তে পার্টিশনের পেছন থেকে ছুটে এসে সে মোলায়েমভাবে জিজ্ঞেস করলে উনি কিছু খাবেন কিনা। দুনিয়ার উদয়ে সচরাচর যা ঘটে এবারেও তাই ঘটল। যাত্ৰীটির রাগ পড়ে গেল। ঘোড়া না ফেরা পর্যন্ত সে অপেক্ষা করতে রাজী হয়ে রাতের খাবারের ফরমাশ দিলে। ভেজা খসখসে ফারের টুপিটা খুলে, মাফলারটা খসালে আর গ্রেটকোটটা ছুড়ে ফেললে। দেখা গেল লোকটা ছিমছাম চেহারার একজন তরুণ ঘোড়সওয়ার অফিসার। মুখে তার ছোটাে কালো একটু মোচ। ডাকবাবুর সংসারে সে বেশ জমে বসল, ডাকবাবু আর তার মেয়ের সঙ্গে খোশ-গল্প শুরু করে দিলে। রাতের খাবার দেওয়া হল। ইতিমধ্যে ঘোড়াও এসে গিয়েছিল। ডাকবাব হকুম দিলে ঘোড়াগুলোকে দানাপানি দেবারও দরকার নেই। এখনি তাদের ঐ যাত্ৰীটির স্লেজের সঙ্গে যাতে দিতে হবে। ঘরে ফিরে কিন্তু দেখা গেল যুবকটি প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় বেডের ওপর পড়ে আছে। লোকটার নাকি অসুস্থ্য বোধ হচ্ছে, মাথা ধরেছে, সফর করার মতো অবস্থা নয়, … কী আর করা যায়? ডাকবাবু তার নিজের বিছানাটি ওর জন্যে ছেড়ে দিলে। ঠিক হল রোগী যদি সকালের মধ্যে ভালো হয়ে না ওঠে তাহলে স... শহর থেকে বৈদ্য ডেকে আনতে হবে।

পরের দিন ঘোড়সওয়ারটির অবস্থা আরো কাঁহিল হয়ে দাঁড়াল। ওর চাকর গেল ঘোড়া চেপে কাছের শহরটায় বৈদ্য ডেকে আনতে। ভিনিগারে রােমাল ভিজিয়ে দুনিয়া তার কপালে জলপটি দিয়ে বিছানার পাশে গিয়ে বসল। সেলাই নিয়ে। ডাকবাবু সামনে থাকলে রোগী শুধু উঃ আঃ করত, একটা কথাও প্রায় বলতে পারত না, যদিও কাপ দুয়েক কফি সে খেলে ঠিকই আর গোঙাতে গোঙাতেই ফরমাশ দিলে ডিনারের। দুনিয়া তার পাশ থেকে কখনো নড়ত না। মিনিটে মিনিটে লোকটার তেষ্টা পেত। আর দুনিয়া তার জন্যে নিজের হাতে-তৈরি-করা এক এক মগ লেমনেড এনে দিত। রোগী তা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মগ ফেরত দেবার সময় প্রত্যেকবারই দুনিয়ার হাতটা নিজের দূর্বল মুঠিতে ধরে চাপ দিয়ে তার কৃতজ্ঞতা বোঝাত। বৈদ্য এলেন ডিনারের সময়। তিনি রোগীর নাড়ী দেখলেন, রোগীর সঙ্গে কথা কইলেন জার্মান ভাষায়, তারপর রুশ ভাষায় জানালেন যে এখন রোগীর প্রয়োজন শুধু বিশ্রামের। দিন দিয়েকের মধ্যেই সে সফর করার মতো অবস্থায় ফিরে আসবে। ঘোড়সওয়ারটি তাঁকে ভিজিট বাবদ পঁচিশ রুবল শোধ দিয়ে ডিনারে নেমন্তন্ন করলে। বৈদ্য নিমন্ত্রণ গ্রহণ করতে আপত্তি করলেন না। তারপর দুজনে মিলে খেল পেট পরে, এক বোতল মদ নিঃশেষ করলে আর বিদায় নিলে অতি বন্ধুর মতো।

আরো একদিন কাটল। ঘোড়সওয়ারটি পুরোপরি ভালো হয়ে উঠল। ভারি খুশি দেখা গেল তাকে, অনবরত রহস্য তামাসা করলে কখনো দুনিয়ার সঙ্গে, কখনো ডাকবাবুর সঙ্গে, লেজারে যাত্রীদের অর্ডার সব নিজেই টুকে রাখলে, লোকটাকে শেষ পর্যন্ত ভালোমানুষ ডাকবাবুর এতই পছন্দ হয়ে গেল যে তৃতীয় দিন সকালে এই অমায়িক অতিথিটিকে বিদায় দিতে কষ্ট হল তার। দিনটা ছিল রবিবার। — দুনিয়া গিজায় যাবার জন্যে তৈরি হয়েছিল। ঘোড়সওয়ারটির স্লেজটিকে ঠিক করে রাখা হয়েছে। তার থাকা-খাওয়ার বাবদ লোকটা ডাকবাবুকে ঢালাও ভাবে বকশিস করে বিদায় নিলে। দুনিয়ার কাছেও সে বিদায় নিলে, প্রস্তাব করলে যাবার পথে দুনিয়াকে সে গির্জায় পৌছে দিয়ে যাবে, কারণ গির্জাটা ছিল গাঁয়ের শেষ প্রান্তে।

মনে হল দুনিয়া একটু বিব্রত বোধ করছে। কিন্তু বাপ বললে, ‘ভয় কী, হুজুর তো আর নেকড়ে নন। খেয়ে ফেলবেন না; তা গাড়ি করেই যা না গির্জায়।” দুনিয়া স্লেজে উঠে লোকটার ঠিক পাশেই বসল। চাকরটি লাফিয়ে উঠল বক্স-সীটে। কোচোয়ান শিস দিলে, ঘোড়া ছােটল কদমে।

বেচারী ডাকবাবু কখনো ভেবে পায়নি কী করে সে তার দুনিয়াকে ও লোকটার সঙ্গে যেতে দিল, কী করে আমন অন্ধ হয়ে গিয়েছিল সে, কী করে আমন বুদ্ধি ভ্ৰংশ হয়েছিল তার। আধা ঘণ্টাও কাটেনি, ডাকবাবুর বুকটা টন টন করতে শুরু করল। এমনই দুশ্চিন্তা পেয়ে বসল তাকে যে সে আর থাকতে পারল না, দুনিয়ার খোঁজ করতে গেল গির্জায়। গির্জার কাছে পৌছতে দেখা গেল লোকজন সব বেরিয়ে আসছে কিন্তু গির্জার দাওয়ায় বা আঙ্গিনায় কোথাও দুনিয়ার দেখা পাওয়া গেল না। গির্জার ভেতরেও সে ঢুকলে হন্তদন্ত হয়ে। পুরোহিত বেদী ছেড়ে চলে গেছে। সেক্সটন মোমবাতিগলো নিবিয়ে দিতে শুরু করেছে, শুধু এককোণে দুটি বাড়ির তখনও প্রার্থনা শেষ হয়নি। কিন্তু দুনিয়া নেই কোথাও। অভাগা বাপ শেষ পর্যন্ত সেক্সটনকেই জিজ্ঞেস করলে, দুনিয়া প্রার্থনায় এসেছিল কিনা। সেক্সটন জানালে সে আসেনি। ডাকবাবু যখন বাড়ি ফিরল তখন তাকে জ্যান্ত মানুষ বলে আর চেনা যায় না। তার শেষ আশা তখনো এই – দুনিয়া হয়ত তার এক কৈশরের লঘুচিত্ততায় পরে ডাক-ঘাঁটি পর্যন্ত উজিয়ে গিয়ে থাকবে, সেখানে তার ধর্ম মা আছেন। যে গাড়িখানা দেওয়া হয়েছিল সেটা ফিরে না। আসা পর্যন্ত ডাকবাবকে দারণ যন্ত্রণা নিয়ে অপেক্ষা করতে হল। সারাদিন কেটে গেল, কোচোয়ান ফিরল না। অবশেষে রাতের দিকে সে ফিরল একা এবং একটু মত্ত অবস্থায়। যে সংবাদ সে দিলে তা মারাত্মক। পরের ডাক-ঘাঁটি থেকে দনিয়া লোকটার সঙ্গেই কোথায় চলে গিয়েছে।

বুড়ো মানুষটা এই দূর্বিপাক সইতে পারল না। সেই রাতেই সে বিছানা নিলে - সেই বিছানা যাতে ঠিক আগের দিন তরুণ প্রতারকটি শুয়েছিল। সব ব্যাপারটা মনে মনে খতিয়ে দেখে ডাকবাবুর এখন মনে হল অসুখের ঘটনাটা ছিল ভান। বেচারীর জ্বর বাড়তে লাগল হুহু করে, তাই তাকে স... শহরে নিয়ে যাওয়া হল। অন্য একজন ডাকবাবু তার জায়গায় বহাল হল সাময়িকভাবে। যে বৈদ্যটি সেই ঘোড়সওয়ারটিকে দেখেছিলেন তিনিই ডাকবাবুরও চিকিৎসা করলেন। তাঁর কাছ থেকে সন্দেহাতীতভাবে জানা গেল যে লোকটা নাকি বেশ সুস্থ্যই ছিলেন, তখনই নাকি বৈদ্যটি তার বদ মতলব টের পেয়েছিলেন, কিন্তু ঘোড়সওয়ারটির চাবুকের ভয়ে কাউকে কিছু বলেননি। জার্মানটা সত্যি কথাই বলুক কিংবা নিতান্তই তার দুরদৃষ্টির বড়াই করে থাকুক, তাতে বেচারা রুগীর কোন সান্তনাই ছিল না। অসুখ সারামাত্রই সে সি ... শহরের ডাককর্তৃপক্ষের কাছে দুমাসের ছুটির দরখাস্ত করলে এবং কাউকে কিছু না বলে মেয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল পায়ে হেঁটে। লেজার থেকে সে দেখে নিয়েছিল ক্যাপটেন মিনস্কির গন্তব্য ছিল স্মলেনস্ক থেকে পিটার্সবুর্গ। যে-কোচোয়ান তাদের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো সে বললে দুনিয়া নাকি সারা রাস্তা কেঁদেছে, যদিও দেখে মনে হচ্ছিল সে নিজের ইচ্ছেতেই গিয়েছে। ভাবল, “আমার হারিয়ে যাওয়া মেষশাবকটিকে হয়ত ফিরিয়েই আনিব।” এই আশায় ডাকবাবু এসে পৌঁছল পিটার্সবুর্গে। সেখানে সে উঠল ইজমাইলভ রেজিমেণ্টে, অবসর-প্রাপ্ত এক ননকমিশনড অফিসারের ঘরে। সামরিক সাভিসের সময় এ লোকটি ছিল তারই এক সহযোদ্ধা। সেখান থেকে সে তার সন্ধান শুরু করলে। শীগগিরই খোঁজ পাওয়া গেল যে ক্যাপটেন মিনস্কি পিটার্সবুর্গেই আছে — দেমতভা পান্থনিবাসে নাকি তার আস্তানা। ডাকবাবু ঠিক করলে তার ওখানে গিয়ে হাজির হবে।

অতি প্ৰত্যুষে সে মিনস্কির সদর ঘরে এসে সেপাই চাকরকে অন্যুরোধ করলে — হুজুরকে যেন সে খবর দিয়ে বলে যে একজন বৃদ্ধ সৈনিক তার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। একটা সওয়ারী-বুট খোঁটায় লাগিয়ে চাকরাটা সেটাকে পরিস্কার করছিল। সে বললে, “কর্তা ঘুমাচ্ছেন, এগারোটার আগে তিনি কারুর সঙ্গেই সাক্ষাৎ করেন না।” ডাকবাবু তখন চলে গেলেও ফিরে এল ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে। গায়ে একটা ড্রেসিং গাউন, মাথায় একটা লাল ফেজ - মিনস্কি নিজেই এসে তার সঙ্গে দেখা করলে। বললে, “কী চাই ভাই তোমার ?” বুড়োর বুকের ভেতরটা তখন টগবগ করছে, চোখ ছাপিয়ে জল আসছে, কাঁপা কাঁপা গলায় সে শুরু করলে, হুজুর, ভগবানের দোহাই, হুজুর দয়া করবেন!..’ মিনস্কি তার দিকে একবার ক্ষিপ্ৰ দৃষ্টিপাত করে লাল হয়ে উঠল। তারপর তাকে হাতে ধরে নিজের আপিস-ঘরে নিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলে। বুড়ো বলে চলল, ‘হাজার, কথায় বলে একবারের পতন, চিরকালের মতন। তবু অন্তত আমার বেচারী দুনিয়াকে ফিরিয়ে দিন। তাকে নিয়ে আপনার যা আনন্দ করার তা তো করেছেন — মিছিমিছি তাকে আর মারবেন না।’ যুবাপুরষটি ভয়ানক থতমত খেয়ে বললে, “যা ঘটেছে তাকে তো আর ফেরানো যাবে না। তোমার প্রতি আমি অবিচার করেছি, আমায় ক্ষমা কোরো। তবে ভেবো না যে দুনিয়াকে ফেলে পালাব। ও সুখী হবে — তোমায় শপথ করে বলছি। তাকে নিয়ে তুমি, কী করবে? আমায় সে ভালোবাসে। তার আগের জীবনের সঙ্গে সে আর খাপ খাবে না। যা ঘটে গেছে তা ভুলতে তুমিও পারবে না, সেও পারবে না।’ তারপর ডাকবাবুর অস্তিনের মধ্যে কী একটা গুজে দিয়ে সে দরজা খুলে দিলে। ডাকবাবু ঠাহরও করতে পারলে না কখন সে আবার রাস্তায় এসে দড়িয়েছে।

বহুক্ষণ সে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেষ পর্যন্ত খেয়াল হল অস্তিনের মধ্যে কী এক গোছা কাগজ রয়েছে। জিনিসটা বার করতে দেখা গেল পঞ্চাশ-রুবলের কয়েকটা দালামোচড়া নোট। চোখ ছাপিয়ে আবার তার কান্না এল - ক্ৰোধের কান্না। নোটগলো একটা দলা পাকিয়ে সে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিলে, তারপর জগতের গোড়ালি দিয়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলে গেল সে ... কয়েক পা যাবার পর দাঁড়িয়ে পড়ে আবার কী ভাবলে, তারপর ... ফিরে এল। ... কিন্তু নোটগলো তখন আর সেখানে নেই। বেশ সাজগোজ করা একটি যুবক ওকে দেখে ছুটে গেল একটা ছ্যাকরা গাড়ির দিকে এবং চটপট বসে হকুম দিলে, চালাও!” তাকে অনুসরণ করার কোনো চেষ্টাই ডাকবাবু আর করলে না। ঠিক করল ষ্টেশনেই ফিরে যাবে। কিন্তু তার আগে মাত্র একবারের জন্যে হলেও অভাগা দুনিয়াকে একবার দেখে যেতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে দিন দুই পরে সে আবার গেল মিনস্কির কোয়ার্টারে। কিন্তু সেপাই চাকরটা কড়া গলায় জানিয়ে দিলে তার মনিব কারো সঙ্গেই দেখা করবে না। তারপর ঘাড়ে ধরে তাকে হলের বাইরে ঠেলে দিয়ে মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দিল। দাঁড়িয়ে থেকে থেকে তারপর ফিরে গেল ডাকবাবু।

সেইদিনই সন্ধ্যায় সে দীন-গির্জায় সাধারণ প্রার্থনার পর লিতেইনায়া স্ট্রিট ধরে ফিরছিল। এমন সময় একটা দামী গাড়ি তাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। ডাকবাবুর নজরে পড়ল তাতে মিনস্কি বসে আছে। গাড়িটা তিনতলা একটা বাড়ির সামনে দরজার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল আর মিনস্কি লাফ দিয়ে নামলো বাড়ীটার বার বারান্দায়। একটা আশা ঝলক দিয়ে গেল। ডাকবাবুর মনে। ফিরে এসে সে কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে, “কার গাড়ি ভাই এটা ? মিনস্কির নয়কি?” কোচোয়ান বললে, “তারই বটে, কেন ?” “ব্যাপার হয়েছে কি, তোমার মনিব আমায় বলেছিলেন তাঁর দুনিয়ার কাছে একটা চিঠি পৌছে দিতে। কিন্তু এই দুনিয়া কোথায় থাকে, সেই ঠিকানাটা ভুলে গেছি।’ - সে কী ? সে তো এখানেই থাকে, ঐ দোতলায়। কিন্তু চিঠি পৌঁছাতে ভাই তোমার বড়ো দেরি হয়ে গেছে। মিনসিক নিজেই এসে হাজির হয়ে গিয়েছেন ষে।” ডাকবাবার বকের মধ্যে দিবোধ একটা আন্দোলন শহর হয়ে গিয়েছিল। বললে, দরকার আর নেই। পাত্তা মিলিয়ে দিলে সে জন্যে ধন্যবাদ। তবে আমার যা কাজ, তা করি।” এই বলে সে সিড়ি ভাঙতে শুরু করলে।

দরজা বন্ধ ছিল। ঘণ্টা দিয়ে সে ডাকলে। প্রতীক্ষার যন্ত্রণায় কয়েক সেকেন্ড তার কাটল। অবশেষে দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ পাওয়া গেল, দরজা খুলিল। সে জিজ্ঞেস করলে, “আভদোতিয়া সিমিয়োনোভনা কি থাকেন। এখানে ?” অলপ বয়সী ঝিটি উত্তর দিলে, ‘হ্যাঁ, থাকেন, কী দরকার ?” কোনো কথার জবাব না দিয়ে ডাকবাবু, ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে হলের ভেতরে। ঝি পেছন থেকে হাঁক দিলে, “না, না, ভেতরে যাওয়া চলবে না! আভদোতিয়া সিমিয়োনোভনার কাছে এখন অতিথি।” কিন্তু ডাকবাবু কোনো ভ্ৰক্ষেপ না করে এগিয়েই গেল। প্রথম যে দুটি ঘর পড়ল তা অন্ধকার। কিন্তু তৃতীয় ঘরখানায় আলো জ্বলছে। খোলা দরজাটার কাছে এসে সে থমকে দাঁড়াল । অতি সুসজ্জিত ঘরখানার ভিতর মিনস্কি গভীর কী একটা চিন্তায় মগ্ন। দুনিয়া তার চেয়ারের হাতলে বসে আছে ঠিক ইংরেজী কায়দায় ট্যারচাভাবে ঘোড়ায় চাপার ভঙ্গিতে। সাজসজ্জায় তার ফ্যাশনের বেশ ঘটা। মিনস্কির দিকে সে চেয়ে আছে স্নেহ-কোমল দৃষ্টিতে আর তার কোঁকড়ানো কালো চুলের গােচ্ছ নিয়ে জড়াচ্ছে তার জড়োয়া আঙুলে। বেচারী ডাকবাবু! মেয়েকে তার এত রূপসী সে আর কখনো দেখেনি। মুগ্ধের মতো সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ‘কে ওখানে?” মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করলে দুনিয়া। ডাকবাবু, চুপ করে রইল। জবাব না পেয়ে দুনিয়া মুখ তুলে তাকালে ... আর তারপর চিৎকার করে লুটিয়ে পড়ল কার্পেটের ওপর। ভয় পেয়ে মিনস্কি দুনিয়াকে ধরে তোলার জন্যে যেতে গিয়ে হঠাৎ দেখল। দরজায় বুড়ো ডাকবাবু দাঁড়িয়ে আছে। দুনিয়াকে ফেলে রেখে সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এল তার দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলে, “কী চাও তুমি ? ডাকাতের মতো আমার পিছু নিয়েছ। কেন বলো তো? নাকি খুন টুন করার ইচ্ছে ? বেরোও এক্ষণি!" তারপর সজোরে বুড়োর কোটের কলার ধরে টানতে টানতে সে তাকে সিঁড়ির দিকে ঠেলে দিলে।

বুড়ো মানুষটা তার ডেরায় ফিরে এল। বন্ধুটি পরামর্শ দিলে নালিশ করতে। ডাকবাবু, কী ভাবল খানিক, তারপর হাত নেড়ে ঠিক করলে কিছুই সে করবে না। দুদিন পরে পিটার্সবুর্গ ছেড়ে সে ফিরে এল। তার ডাক স্টেশনে এসে বসিল তার সেই পুরুনো কাজেই। গল্প শেষ করে ডাকবাবু বললে, “সেদিন থেকে আজ প্রায় তিন বছর – দুনিয়া আমার কাছ-ছাড়া। খবর নেই, সংবাদ নেই। ভগবান জানেন, মেয়েটা এখনো বেচে আছে কি নেই। কী না ঘটতে পারে। পথ চলতি লম্পট মেয়ে ফুসলিয়ে নিয়ে দিন কয়েক রেখে ভাগিয়ে দিলে এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটলো তাতো নয়, এই শেষও নয়। পিটার্সবুর্গে এরকমের কাঁচা বয়সের বেকুফ মেয়ে কত! আজ হয়ত তারা সাটিন আর মখমলে সাজগোজ করছে। কাল দেখবেন চৌমাথার মোড়ে ঝাড় দিচ্ছে সর্বশান্ত কাঙাল ভিখিরিদের সঙ্গে। যখন মাঝে মাঝে মনে হয় কে জানে আমার দুনিয়াও হয়ত ঐ অবস্থায় গিয়ে পড়বে, তখন ইচ্ছে না থাকলেও পাপ চিন্তাই মনে আসে, ভাবি কবরেই যাক মেয়েটা...”

এই হল আমার বন্ধু বুড়ো ডাকবাবুর কাহিনী - সে কাহিনী বলতে গিয়ে বারবার তাকে থামতে হয়েছে চোখের জলে, দমিত্রিয়েভের সেই অপরুপ ব্যােলাডের জেদী তেরোন্তিচের মতো সে-চোখের জল সে কোটের প্রান্ত দিয়ে বারবার যেভাবে মুছে নিচ্ছিল তা দেখবার মতো এই চোখের জলের আংশিক একটা কারণ অবশ্যই আমার দেওয়া সেই পাণ্ড — কাহিনী বলতে বলতে সে পাঁচ গ্লাস টেনেছিল। কিন্তু সে যাই হোক, তার কান্না আমার খুবই মর্ম স্পর্শ করে। তার কাছ থেকে বিদায় নেবার পর অনেকদিন পর্যন্ত বুড়ো ডাকবাবুর কথা আমি ভুলতে পারিনি, অনেক দিন ধরেই মনে হয়েছে হতভাগিনী দুনিয়ার কথা...

কিছদিন আগে ক ... শহরের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় এই পুরনো বন্ধুর কথা আবার মনে পড়েছিল। খবর পেলাম যে-ডাক-স্টেশনটায় সে একচ্ছত্র ছিল সেটা আর নেই। "বুড়ো ডাকবাবু কি এখনো বেচে আছে ?” এ প্রশ্নের কেউ সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারলে না। ইচ্ছে হল একবার আগের সেই সব পরিচিত জায়গাগুলো দেখে আসি। ঘোড়া ভাড়া নিয়ে ন... গাঁয়ের দিকে গাড়ি হাঁকালাম।

তখন শরৎকাল। ধুসর রঙের মেঘে আকাশ ছাওয়া — ফসল কাটা খেত থেকে হিমেল বাতাস বইছে, লাল হলুদে ঝরা পাতা উড়িয়ে আনছে সঙ্গে করে। সূর্য ডোবার ঠিক আগেই গাঁখানায় এসে পৌছলাম এবং ডাক-ঘরের সামনে থামলাম। মোটামতো একটা মাগী এসে দাঁড়াল বার-বারান্দায়, (একদিন এখানেই আমায় চুমু খেয়েছিলযহতভাগিনী দুনিয়া)। আমার প্রশ্নের জবাবে মেয়েটি জানাল যে বুড়ো ডাকবাবু বছরখানেক আগে মারা গেছে, তারা বাড়িতে এখন থাকে। একজন শুড়ী, মেয়েটি আসলে সেই শুড়ীরই বৌ। আমার এতখানি আসা আর তার জন্যে সাত রুবল খরচই সার হল দেখে আফশোস হচ্ছিল। শুড়ী-বৌকে জিজ্ঞেস করলাম, 'মারা গেল, কী হয়েছিল ?” মেয়েটা বললে, “মদ খেয়েই গেছেন বাবু।” — 'কোথায় তাকে কবর দেওয়া হয়েছে ?? — ‘গাঁয়ের ঠিক শেষে - ওর বউয়ের কবরের পাশে।’ - “আমায় কেউ তার কবরে একবার নিয়ে যেতে পারে?” – “তা কেন পারবে না। এই ভানকা! বেড়াল নিয়ে খুব হয়েছে, এবার এই ভন্দরলোকটিকে একটু কবরখানায় নিয়ে যা। গিয়ে ডাকবাবুর কবরটা দেখিয়ে দিবি৷”

ছেড়াখোঁড়া জামা পরা, বাদামী চুল, এক-চোখ কাণা একটা ছেলে। ছুটে এসেই চটপট পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল গাঁয়ের শেষ প্রান্তে।

যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি ডাকবাবুকে চিনতে?”

চিনবো না কেন? ঐ তো আমাকে বাঁশি বানাতে শিখিয়েছিল। যেই সে শুড়ীখানা থেকে বেরােত — ভগবান তার আত্মার মঙ্গল করন – অমনি আমরা তার পেছনে ছুটতাম, “দাদু, ও দাদু, বাদাম দাদু!” আমাদের সকলকে সে বাদাম বিলাত। আমাদের সঙ্গে ভারি ভাব ছিল তার।’

“আচ্ছা, যাত্রীরা তার খোঁজ খবর করে এখনো ?”

‘আজকাল যাত্রী তো আর বিশেষ আসে না। হাকিম-টাকিম মাঝে মধ্যে আসে, কিন্তু মরা লোকেদের নিয়ে তাদের কোনো গরজ নেই। তবে এই বছর গরমকালে একজন ভদ্রমহিলা এসেছিলেন। তিনি বুড়ো ডাকবাবুর কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, তার কবর দেখতেও এসেছিলেন।”

কৌতুহল হল। জিজ্ঞেস করলাম, কী রকম মহিলা ?”

ছেলেটা বললে, “ভারি সুন্দর দেখতে। ছয়-ঘোড়ার এক গাড়িতে করে উনি এসেছিলেন। সঙ্গে তিনটে বাচ্চা, একজন আয়া, আর একটা কালো বাঁটকুল কুকুর। যেই শুনলে বুড়ো ডাকবাবু মরে গেছে, অমনি কী তার কান্না, ছেলেমেয়েদের বললেন, “তোরা চুপ করে একটু বসে থাক, আমি কবরখানায় যাব।” পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার ডাক পড়েছিল আমার। কিন্তু উনি বললেন, “পথ আমি চিনি।” ভারি দরাজ মেয়ে - আমায় পাঁচ কোপেকের চাঁদি সিক্কা দিয়েছিলেন একটা।”

কবরখানায় পৌছানো গেল। ন্যাড়া একটা জায়গা। — কোথাও এতটুকু বেড়া নেই। এখানে ওখানে কাঠের ক্রস -

গাছের কোনো চাঁদোয়াও নেই তাদের ওপর। এমন বিষন্ন একটা কবরখানা আমি জীবনে কখনো দেখিনি।

ছেলেটা একটা বালির ঢিপির ওপর লাফিয়ে উঠে বললে, 'এই হল বুড়ো ডাকবাবুর কবর।'

ঢিবিটার ওপর পেতলের মুর্তি লটকানাে কালো একটি ক্রেস পুতে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা, এইখানেই এসেছিলেন মহিলাটি ?”

ভানিয়া বললে, ‘হ্যাঁ, এসেছিলেন। আমি দুর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। এসে লুটিয়ে পড়লেন। এখানে, পড়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তারপর মহিলাটি গাঁয়ে ফিরে এসে দেন পাঁচ কোপেকের একটা চাঁদি সিক্কা — ভারি দিলাদরিয়া মহিলা !'

আমিও ছোঁড়াটাকে একটা পাঁচ-কোপেকী সিক্কা দিলাম। এখানে আসা বা তার জন্যে যে সাত রুবল খরচা হল - তাতে আমার আর কোনো আফসোস ছিল না।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন