বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

ইমতিয়ার শামীম : প্রতিটি লেখককেই একটা পর্যায় পর্যন্ত অ্যানথ্রপোলজিস্টও হতে হয়--নইলে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে নৈর্ব্যক্তিকতা অর্জন করা সম্ভব নয়।


মৌসুমী কাদের
ইদানীং ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে । সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক ‘মানুষ’ আদৌ আছে কি? একজন লেখক আদতে কতটা অসাম্প্রদায়িক হতে পারেন?

ইমতিয়ার শামীম
অসাম্প্রদায়িকতা বলতে কী বোঝাচ্ছেন তা যদি জানা থাকত, তা হলে হয়তো বুঝতে একটু সুবিধা হতো, অসাম্প্রদায়িক মানুষ থাকা না-থাকার এই সংশয়, সন্দেহ আর প্রশ্ন কেন আসছে।
তবে সাধারণভাবে আমার এরকমই ধারণা, আমাদের দেশের গড়পড়তা মানুষ অসাম্প্রদায়িকতা বলতে সহজ সরলভাবে ধরে নেয় যে, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান বা আরও যারা আছেন, তারা সবাই মিলেমিশে থাকবেন, কেউ কারও ধর্ম পালনে বাধা দেবেন না, আবার এমনভাবেও তা পালন করবেন না যে অন্য পক্ষ উত্যক্ত বোধ করবেন কিংবা কারও ধর্ম পালন না করাটাকেও সংকট বা বিপর্যয় হিসেবে দেখা হবে না। আমিও তেমনটা ধরে নিয়ে বলছি, তেমন মানুষ নিশ্চয়ই আছেন, অবশ্যই আছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন কি অসাম্প্রদায়িক নন? বিদ্যাসাগর কি অসাম্প্রদায়িক নন?

এটা শুধু আমার বিশ্বাস নয়, বাস্তবেও অসাম্প্রদায়িক মানুষ অজস্র; তবে দেশবন্ধু ও বিদ্যাসাগরের কথা আমি বিশেষভাবে বলছি এ কারণে যে, আমার নিজের ক্ষুদ্র বিবেচনায় গত ২০০ বছরে তাদের মতো আর কেউই সুনির্দিষ্টভাবে সামাজিকতা ও রাজনৈতিকতাকে সমন্বিত করে সাম্প্রদায়িকতা দূর করার লক্ষ্য নিয়ে একাগ্র হয়ে কাজ করেননি। এখনও অনেকে কাজ করছেন, তবে তা যত না সামাজিকভাবে, তারও বেশি রাজনৈতিকভাবে। এর ফলে তা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিহত করতে উদ্বুদ্ধ করছে না। আপনি দেশবন্ধুর কথা ভাবুন, তিনি ফজলুল হকের সঙ্গে মিলে বেঙ্গল প্যাক্ট করেছিলেন। তা তখনকার মুসলমান সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছিল। কিন্তু আমরা স্বাধীনতার পর থেকে এতগুলো বছর গেল, ‘সংখ্যালঘুবান্ধব’ দাবিদার আওয়ামী লীগ সরকারও কত বছর থাকল, অথচ সেই ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ (আওয়ামী লীগ সরকার অবশ্য এইটুকু করেছে, এর নাম পাল্টিয়ে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইন’ রেখে একটু জ্বালামুক্ত করার পর্দা লাগিয়েছে) সমস্যার সমাধান এলো না। 

আমাদের বিশাল অসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী অবশ্য খুবই ধৈর্যশীল--এখনও আশায় বুক বেধে আছেন তারা--আওয়ামী লীগ সরকারই পারবে এ সমস্যার সমাধান করতে! তো, কথা হলো, মানুষ জন্মসূত্রেই কোনো না কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত, এতে তার সংযুক্তির একটি সম্প্রদায়গত চরিত্রও দাঁড়িয়ে যায়; কিন্তু একইসঙ্গে কি সম্প্রদায়ে, কি সমাজে সামাজিকীকরণের জন্যে তাকে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েও যেতে হয়। এইভাবে সে বিকাশের প্রক্রিয়ায় এটাও বুঝে নেয়, সম্প্রদায়ের বৃত্তে আবদ্ধ থাকলে তার বিকাশও বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু সাম্প্রদায়িক হওয়াটা একটি বিশেষ প্রক্রিয়া; একজন ব্যক্তি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক সংঘের যে কোনও একটির মিথস্ক্রিয়া থেকেই এই প্রক্রিয়ার খপ্পরে পড়তে পারে। একটি সমাজে পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘের মধ্যে আদর্শগত মিথস্ক্রিয়াই নির্ধারণ করে দেয় সে কতটুকু সাম্প্রদায়িক কিংবা অসাম্প্রদায়িক হবে; কোনও একটি থেকে সাম্প্রদায়িকতায় আক্রান্ত হলে আরেকটি সূচক আবার কতটুকু ক্ষতিপূরণ করতে পারবে। 

আর একজন লেখক আদতে কতটা অসাম্প্রদায়িক হতে পারেন, তার উদাহরণ দিতে গেলে তো রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আমাদের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসেও এত বেশি উদ্ধৃতি-বক্তব্য পাওয়া যাবে যে ক্লান্তি এসে যাবে। রবীন্দ্রনাথের গল্পে উপন্যাসে অবশ্য মুসলমান চরিত্র নেই বললেই চলে, কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে তিনি এত ভেবেছেন, এবং এ সমস্যা নিয়ে তার বিভিন্ন গদ্যে এত চিন্তার দিগন্ত উন্মুক্ত করেছেন যে ভেবে বিস্মিত হতে হয়।


মৌসুমী কাদের
একজন মহৎ লেখকের দায়বদ্ধতার জায়গাটি থেকে অসাম্প্রদায়িকতার গুরুত্ব কতটুকু? 

ইমতিয়ার শামীম
লেখকের কিংবা মহৎ লেখকের-যার কথাই বলি না কেন, শুধু দায়বদ্ধতার কারণে নয়, শান্তিপূর্ণ ব্যক্তি জীবনযাপনের জন্যেও তো অসাম্প্রদায়িকতার গুরুত্ব সীমাহীন। বঙ্কিমচন্দ্র, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ফররুখ আহমদ কিংবা এখনও আমাদের মধ্যে আছেন--আল মাহমুদ, এদের কথাই ধরুন-এই গুরুত্বকে দায়বদ্ধতার স্থান থেকে না নেয়ার কারণে তারা সমূহ ঔজ্জ্বল্য থাকার পরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আসছেন।


মৌসুমী কাদের
ব্যক্তি জীবনের ‘সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতা’ লেখক হিসেবে প্রকাশ করবার সময় কতটা ‘নৈর্ব্যক্তিক’ হওয়া সম্ভব?

ইমতিয়ার শামীম
এটি তো একপাক্ষিক ব্যাপার নয়--তিনি কতটা নৈর্ব্যক্তিক হয়েছেন সেটা বোঝা সম্ভব কেবল তখনই, যখন পাঠকও নৈর্ব্যক্তিক হয়ে তা পড়তে পারবেন। একজন সাম্প্রদায়িক মানুষের পক্ষে তো কখনোই সাদত হাসান মান্টোর কিংবা কৃষণ চন্দরের রচনার বেদনা বোঝা সম্ভব নয়। তিনি বরং এটা পড়ে আরও বেশি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারেন। মীজানুর রহমান ‘কৃষ্ণ ষোলোই’ লিখেছেন, আমার তো মনে হয় নৈর্ব্যক্তিকতার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। বিষয়টা তাই পাল্টাপাল্টি দুই সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখানোর ব্যাপার নয়, নৈর্ব্যক্তিকভাবে উপলব্ধি করার।

অনেকের অতীত স্মৃতিচারণায় দেখি, হিন্দু বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে কত বিপত্তিতে পড়েছেন তারও বয়ান আছে। আসলে তিনি নিজেও তো অন্য ধর্মাবলম্বী হিসেবে গেছেন, নিজের সতীত্ব নাশ হওয়ার আশঙ্কা নিয়েও গেছেন, তাই ওইসব আচরণ বড় বেদনার মতো বেজেছে; এই বোধটুকু আর উচ্চকিত হয়নি, সাম্প্রদায়িকতা নয়--ব্যক্তির নিতান্তই সাধারণ ধর্ম বিশ্বাস বা ধর্মাচারের স্থান থেকেও এমন হতে পারে। প্রতিটি লেখককেই একটা পর্যায় পর্যন্ত অ্যানথ্রপোলজিস্টও হতে হয়--নইলে এই নৈর্ব্যক্তিকতা অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রসঙ্গত এই মুহূর্তে হঠাৎ একটি রাশান উপন্যাসের কথা মনে হচ্ছে। সেটি অবশ্য সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা নয়। বোধহয় তারাস বুলবা নামের ওই গল্প একজন গোত্রপ্রধানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে লেখা, সংকীর্ণতা নিয়ে লেখা; কিন্তু লেখক নৈর্ব্যক্তিক বলেই সেটি পড়তে পড়তে আমরা ওই গোত্রপ্রধানের মহীয়ানতাগুলো অনুভব করতে পারি এবং তিনি, কী বলব, প্রতিক্রিয়াশীল এটা উপলব্ধি করার পরও তার জন্যে কিন্তু আমাদের কষ্টও হয়।


মৌসুমী কাদের
সমাজকে সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে লেখক যখন কোন একটি সম্প্রদায়কে সমর্থন করতে বাধ্য হন (যেমন সংখ্যালঘু) এবং তিনি যদি সেই একই গোষ্ঠিরই হন তখন কী উপায়ে লিখলে ‘পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে’ বলে মনে হবে না।

ইমতিয়ার শামীম
আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘু নিপীড়ন চলেছে। তখন রণেশ দাশগুপ্ত, নির্মল সেন, অজয় রায় কিংবা যতীন সরকারের মতো অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু এই জন্যে তাদের ‘পক্ষপাতিত্বের’ দায়ে অভিযুক্ত হতে হয়েছে বলে অন্তত আমি শুনিনি। তার মানে এই নয় যে, সমস্যা সুগভীর নয়। আসলে আমরা যে পথে নির্বাণ বা মুক্তি খুঁজেছিলাম, তাতেও তো কোনো না কোনো ভাবে সাম্প্রদায়িকতার চিহ্ন রয়েছে। কথায় কথায় আমরা সাম্প্রদায়িকতার জন্যে ইংরেজ শাসনকেই চূড়ান্তভাবে দায়ী করে থাকি; কিন্তু ইংরেজ শাসন আসার অনেক আগেই ১৭৩০ সালে মুঘল সম্রাট ফররুখ শিয়ারের সময় দোলখেলা নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের এমন এক দাঙ্গা হয়েছিল যা ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে তুলেছিল।

আমার চিন্তা ভুল হলে খুশি হবো, কিন্তু একটা ব্যাপার একবার ভেবে দেখুন তো--ইংরেজদের মতো শাসকরা দীর্ঘ ১০০ বছর ধরে শাসন করলেও আমাদের ঘুম ভাঙল না, শেষমেষ আমাদের ঘুম ভাঙানোর জন্যে ১৮৫৭ সালে বলতে হলো, বারুদ-টোটা বানানোর সময় শুয়োরের চর্বি দেয়া হয়েছে, তাতে আমাদের মুসলমান ভাইদের ঘুম ভাঙল, আমাদের বলা হলো, গরুর চর্বি দেয়া হয়েছে, তাতে আমাদের হিন্দু ভাইদের ঘুম ভাঙল। ভারতবর্ষ স্বাধীন করার ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ ধরে এগোলেও যুগান্তর ও অনুশীলনের সদস্যরা আমাদের নমস্য। এদের মধ্যে হিন্দু সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণই ছিলেন বেশি, তাই বলে মুসলমান ছাত্র, শিক্ষক ও যুবক যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। কিন্তু কী নিয়ম করা হলো? কালীমূর্তির সামনে গোপনীয়তা রক্ষার ও সহযোদ্ধাদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে হবে। 

সন্ত্রাসবাদিতায় দীক্ষা নেয়ার পরও মুসলমান তরুণরা তাই ধীরে ধীরে এই বিপ্লববাদ থেকে সরে এলো, তাদের কাউকে টাকাপয়সা সংগ্রহের, কাউকে ডাকাতি করে অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হলো, কিন্তু প্রতিবাদের মূলধারায় তারা থাকলেন না। আমরা ১৯৪২ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে ফজলুল হককে শেরে বাংলা বলে ডাকতে শুরু করলাম; কেন? কারণ এর আগে পাটনার এক জনসভায় তিনি ঘোষণা দিলেন, কংগ্রেসশাসিত প্রদেশগুলোতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর কোনো হামলা হলে বাংলায় তিনি তার প্রতিশোধ তুলবেন! ফজলুল হক কিন্তু বলতে গেলে সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, তিনি অভিজাত ছিলেন, সামন্তবাদী ছিলেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িক বোধহয় বলা যায় না। পরে তো পাকিস্তান আমলে ভারত সফরে গিয়ে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে যেসব কথা বললেন, সেসব কথাবার্তার ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে তাকে রাজনীতিতে একঘরে করা হলো। 

কিন্তু আমাদের এই যে বাগাড়ম্বর, পরস্পরের প্রতি আস্ফালন, এইসবই কিন্তু ইংরেজদের শিখিয়েছে, এদের ধর্মের নামে বিভক্ত করে রাখা যাবে, বিভক্ত হয়ে থাকার জন্যে এরা নিজেরাই মুখিয়ে আছে। অতীতের হিন্দু-মুসলমানদের ওইসব হ্যাঙওভার এখনও আছে, লেখকদের মধ্যেও আছে। কিন্তু এমন কোনও উপায় কি আসলে বাতলে দেয়া সম্ভব যাতে মনে হবে একই গোষ্ঠীভুক্ত হওয়ার পরও পক্ষপাতিত্ব করছেন না তিনি? এমন ব্যাকরণ দাঁড় করানো অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এটা ভেবে দেখা যেতে পারে, আমরা যখন কাফকা কিংবা আনা ফ্র্যাঙ্ক পড়ি, দাঙ্গার বিভিন্ন ডায়েরি অথবা স্মৃতিচারণা পড়ি, এ জাতীয় লেখাগুলো পড়ি, তখন কি মনে হয় কোনো নির্যাতিত ধর্মাবলম্বীর কথা পড়ছি? নাকি উন্মূল কোনো মানুষের কথা পড়ছি? আমার মনে হয় ইস্যু আর অবস্থানই বলে দেবে, তিনি সঠিক পথে আছেন কি না।


মৌসুমী কাদের
লেখক যখন স্বার্থপর হয়, আত্মপ্রচারণায় মগ্ন থাকে, ‘মানুষ এবং মাধ্যম’ উভয়কে ব্যবহার করে, নির্লজ্জ আত্মপ্রচার এবং স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টায় লিপ্ত হয় এবং একসময় সুনাম এবং গ্রহণযোগ্যতা পায়, এমনকি মহৎ লেখকের খেতাবও অর্জন করে; নব্য লেখকরা কী ভাবে তাকে গ্রহণ এবং অনুসরণ করবে?

ইমতিয়ার শামীম
এমন কোনো কোনো ‘মহৎ লেখক’ এখনও জীবিতও আছেন। নতুন লেখকরা তাদের প্রতি যে আচরণ করেন তা থেকেই বোঝা যায়, তাদের জন্যে কোন ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে। মন্তব্য তাই নিষ্প্রয়োজন।


মৌসুমী কাদের
সরকার, রাজনীতি, ধর্ম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লেখার সময় একজন সংখ্যালঘু লেখকের ভয় কাটিয়ে ওঠার উপায় কি?

ইমতিয়ার শামীম
তিনি সত্যিই কোনো লেখক হলে অন্তত লেখার সময় তো তার ভয় পাওয়ার কথা নয়। হ্যাঁ, লেখা শেষ হওয়ার পর পাঠক হিসেবে পড়তে গিয়ে তিনি তা প্রকাশের পর নিজের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আবিষ্কার করে সংশয়ে পড়তে পারেন, ভীত হতে পারেন; কিন্তু লেখার আগেই সে প্রশ্ন আসছে কেন? ধারণাগত দিক থেকে একজন সত্যিকারের লেখকও তো সংখ্যালঘুই। দেবীপ্রসাদ যখন ‘যে গল্পের শেষ নেই’ লেখেন, তখন তো তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ার পরও সংখ্যালঘুই হয়ে পড়েন, রফিক আজাদ যখন ‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাব’ লেখেন তিনিও তখন সংখ্যালঘুই হয়ে যান। তারা এসব লিখতে গিয়ে নিজেদের অযথাই যেমন দুঃসাহসী ভাবেননি, তেমনি ভীতও ভাবেননি। তারা তাদের হৃদয়ের কথা শুনেছেন।

আরজ আলী মাতুব্বরের পাণ্ডুলিপি দিনের পর দিন অপ্রকাশিত থেকেছে, কিন্তু লেখার সময় তিনি ভয়ে কুঁকড়ে যাননি। হয়তো তা যথাসময়ে প্রকাশ করতে পারেননি, সেজন্যে অপেক্ষা করেছেন। প্রসঙ্গত শরৎচন্দ্রের কথা বলি। শরৎচন্দ্র যখন ‘পথের দাবি’র মতো বই লিখে সংখ্যালঘু হয়ে গেলেন, তার বইও বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল, তখন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বই পাঠিয়ে প্রতিবাদ প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাকে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তুমি কাগজে রাজবিরুদ্ধ কথা লিখলে (মানে ধরুন আজকের এই কলাম লেখা) তার প্রভাব স্বল্প ও ক্ষণস্থায়ী হত--কিন্তু তোমার মতো লেখক গল্পচ্ছলে যা লিখবে তার প্রভাব তো নিয়ত চলতেই থাকবে।’ তিনি এ-ও বললেন, ‘শক্তিমানের দিক দিয়ে দেখলে তোমাকে কিছু না বলে, তোমার বইকে চাপা দেয়া প্রায় ক্ষমা করে দেয়া।’ 

রবীন্দ্রনাথ যে শরৎকে কত বড় শক্তিমান লেখক মনে করতেন, তা বোঝার জন্যে এই একটি বাক্যই যথেষ্ট। কিন্তু তার পরও শরৎচন্দ্র এরকম একটি চিঠি পাওয়ার ক্ষোভ সারা জীবন বয়েছিলেন। হয়তো তা রবীন্দ্রনাথের লেখা এই কথাগুলো খেয়াল করেই, ‘শক্তিকে আঘাত করলে তার প্রতিঘাত সওয়ার জন্যেও তৈরি থাকতে হবে।’ তাই সরকার, রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে ক্রিটিক্যালি কিছু লিখতে চাইবেন, অথচ লেখার আগেই ফলাফল চিন্তা করে নেবেন, এমন অদ্ভূত প্রত্যাশাই যদি থাকে, তা হলে আপনার না লেখাই ভাল।

২টি মন্তব্য:

  1. অসাধারন (একজন সাম্প্রদায়িক মানুষের পক্ষে তো কখনোই সাদত হাসান মান্টোর কিংবা কৃষণ চন্দরের রচনার বেদনা বোঝা সম্ভব নয়। তিনি বরং এটা পড়ে আরও বেশি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারেন।)
    দারুন (কথায় কথায় আমরা সাম্প্রদায়িকতার জন্যে ইংরেজ শাসনকেই চূড়ান্তভাবে দায়ী করে থাকি; কিন্তু ইংরেজ শাসন আসার অনেক আগেই ১৭৩০ সালে মুঘল সম্রাট ফররুখ শিয়ারের সময় দোলখেলা নিয়ে হিন্দু-মুসলমানের এমন এক দাঙ্গা হয়েছিল যা ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে তুলেছিল।)

    রাজ্য হারানোর বেদনায় মসুলমানেরা লড়ছিল ও দুর্বল হচ্ছিলো ১৭৫৭ থেকেই কিন্তু হিন্দু ভাইদের ঘুম ভাঙ্গলো গরুর চর্বিতে, তাই এটা ভুল(১৮৫৭ সালে বলতে হলো, বারুদ-টোটা বানানোর সময় শুয়োরের চর্বি দেয়া হয়েছে, তাতে আমাদের মুসলমান ভাইদের ঘুম ভাঙল)

    এটা কিন্তু সাম্প্রদায়ীকতা ও সংখ্যাগুরুর জোর এর উদাহরন (কালীমূর্তির সামনে গোপনীয়তা রক্ষার ও সহযোদ্ধাদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে হবে। )
    অসাধারন (‘শক্তিকে আঘাত করলে তার প্রতিঘাত সওয়ার জন্যেও তৈরি থাকতে হবে।’ তাই সরকার, রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে ক্রিটিক্যালি কিছু লিখতে চাইবেন, অথচ লেখার আগেই ফলাফল চিন্তা করে নেবেন, এমন অদ্ভূত প্রত্যাশাই যদি থাকে, তা হলে আপনার না লেখাই ভাল।)

    উত্তরমুছুন
  2. আমি নিজে মনে করি, মানুষের মনের গহীনে নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি একটা টান থেকেই যায়। কিন্তু, সাহিত্য পাঠককে অসাম্প্রদায়িক করে। এ বোধ সৃষ্টিই একজন সাহিত্যিকের মহান দায়িত্ব। যেমন,সুনীল গঙ্গপাধ্যায়ের ‘পূর্ব পশ্চিম’ পড়তে গিয়ে আমার এ অনুভূতির অভিজ্ঞতা। ইংল্যান্ডে গিয়ে কলকাতার মেয়ের সাথে(তোতন বা তুতুল) বাংলাদেশের ছেলে সিরাজুল আলমের (? অনেকদিন আগে পড়া। নামগুলো ঠিক বলছি কি না, বুঝতে পারছি না। )প্রেম। এ প্রেম বিয়েতে রূপ নিলে একমাত্র সন্তানের এহেন কর্মে কলকাতায় মেয়েটির বিধবা মায়ের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমি বইটি পড়তে পড়তে মনে প্রাণে চাচ্ছিলাম বিয়েটি হোক।একটি হিন্দু মেয়ে মুসলিম যুবকটিকে বিয়ে করুক। বিধবা মায়ের চেয়ে প্রেমটাকেই সুনীল বড় করে দেখাতে পেরেছিলেন।
    যাহোক, সাক্ষাৎকারটি বেশ ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন