বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

রিমি মুৎসুদ্দি'র গল্প : ভয়

চাক ভাঙা মৌমাছিদের মত পিলপিল করে ছুটে আসছে বন্দুক হাতে কালো মাথার সারি। সামরিক পোশাকের মত একধরণের পোশাক তারা পরেছে। সমস্ত জায়গাটাকে তারা ঘিরে নিল কয়েক মুহুর্তেই। পালাবার পথ নেই। চারদিক থেকে বেয়োনেট তাক করে আছে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক শপিং মলে কেনাকাটা করতে আসা, বেড়াতে আসা অথবা নিছক সময় কাটাতে আসা নিরীহ মানুষগুলোর দিকে। মাইকে কিছু ঘোষণা হচ্ছে। প্রথমে উর্দু, তারপর ইংরাজীতে। সবাইকে নীল-ডাউন করে বসতে বলা হল।
ভীত, সন্ত্রস্ত মানুষগুলো বাধ্য ছাত্রের মত নীল-ডাউন হল। ছোট-ছোট ছেলেমেয়েগুলোও প্রচণ্ড আতঙ্কে চিৎকার করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। মাইকে এবার ইংরাজীতে ঘোষণা হল “যাঁরা যাঁরা কোরাণের কোন সুরা মুখস্থ বলতে পারবেন, তাঁরা যেন হাত তোলেন। আল্লাহা-তালার পাক বান্দাদের কোন ভয় নেই। তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হবে।” স্কুলের অত্যুৎসাহ ছাত্রদের মত বেশ-কয়েকজন হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের এক-এক করে ডাকা হল মাইকের সামনে। পবিত্র কোরাণের সুরা পাঠ হয়ে চলল মাইকে। এক-এক করে সফল ছাত্ররা মৃত্যু-মুখ থেকে রেহাই পেল। এইবার অবশিষ্ট দুষ্টু ছাত্রদের শাস্তি দেওয়ার পালা। চরম শাস্তি! পবিত্র কোরাণের সুরা মুখস্থ না বলতে পারা সেইসব নাপাক ছাত্ররা চরম শাস্তি পাবে। বন্দুকের গুলিতে একে একে ঝাঁঝরা হয়ে যাবে তারা।

অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মুখে নীল-ডাউন হয়ে বসে থাকা মানুষদের মধ্যে রয়েছেন যাদবপুরের নেতাজীনগর-কলোনির বাসিন্দা অম্বরীশবাবু। যে কোন মুহুর্তে বন্দুকের গুলি এসে অম্বরীশবাবুর অস্তিত্বটুকু মুছে দিতে পারে। অথচ ভয়ের থেকে বেশী তাঁর অভিমান হচ্ছে। আর নিজের উপর রাগ! ইস্! লক্ষীর পাঁচালীটা অন্তত মনে রাখতে পারলে তাই দিয়ে উদ্ধার হওয়ার চেষ্টা করতে পারতেন। এমনিতেও মরতে হবে। একটু বাঁচার চেষ্টা করলে কি আর এমন ক্ষতি হত? অভিমান হচ্ছে স্ত্রী আর একমাত্র মেয়ের উপর। এই শুভানুধ্যায়ীদের ভালবাসার অত্যাচারে তাঁকে জীবন থেকে বাদ দিতে হয়েছে অনেক স্বাদ-আহ্লাদ। সুগার-প্রেসার-থাইরয়েড নামক এই তিন দস্যির আক্রমণে এমনিতেই খাবার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রিয় সব খাবারগুলো। অনেকদিনধরেই তাঁর মিষ্টি দই খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল। সুগারের কারণে মিষ্টি দই খাওয়া বারণ। ঘরে পাতা টক দই নয়, পাতে জোটে বাজার থেকে কেনা আমূলের দই। চিনি ছাড়াই ঐ ভয়ানক টক-দই খেতে হয় রোজ। আজ, এই ঊনসত্তর বছরের জীবনের ইতি হতে চলেছে। তাও আবার বন্দুকের গুলিতে! এইরকম ভয়ানক একটা মুহুর্তে ভয়ের বদলে এইসব ভাবনা মাথায় আসায় নিজেকে একটু বীর বীর মনে হচ্ছে অম্বরীশবাবুর। একটাই যা আফশোস! মানিকতলার অমৃতের দই খাওয়ার ইচ্ছে ছিল ক’দিন ধরেই। সেই কোন ছোটবেলায় মামাবাড়িতে গেলে বড়মামা একভার অমৃতের দই খেতে দিতেন। আর, যাব যাব করেও মানিকতলায় যাওয়া হয়ে ওঠে নি।

বিশাল এক ধাক্কা, যেন বেয়োনেটের গুঁতো! “কি হল কি? ক’টা বাজে খেয়াল আছে?” “অ্যাঁ! তুমি এখানে?” “না, আমি কেন হব? কোন স্বপ্নচারিণী হলে ভাল হত, তাই না?” স্ত্রীর অভিমানভরা কথাগুলো শুনতে পেলেও এখনও ঠিক সম্বিৎ ফিরে পান নি অম্বরীশবাবু। কোরাণের সুরা,বন্দুকের নল আর অমৃতের দই- সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। “বলি, রাত বারোটায় ফ্লাইট। আর এখন সন্ধ্যে ছ’টা বাজে। সেই দুপুরে খেয়ে উঠে থেকে ঘুমোচ্ছ। কি, না চোদ্দ ঘণ্টার প্লেন-জার্ণি, আর তার উপর প্লেনে ঘুম হবে না। আজ রাতের ঘুমটা পুষিয়ে নিতে হবে। তা, এতক্ষন ঘুমিয়েও কি হল না? যাওয়ার আগে শেষবারের মত গোজগাজও তো করতে হবে, নাকি?” অন্য সময়ে হলে স্ত্রীর এহেন গোজগাজ বাতিকের জন্য ধমক দিতেন। কিন্তু আজ দুপুরের ঘুমে অর্থাৎ দিবাস্বপ্নে যা দেখলেন তারপর আর কোন কথা যোগাল না তাঁর মুখে। একমাত্র মেয়ে ত্রিপর্ণা তাঁর স্বামীর সাথে থাকে আমেরিকার হিউস্টনে। আজ রাত বারটার ফ্লাইটে তিনি সস্ত্রীক যাচ্ছেন মেয়ের কাছে হিউস্টনে। এমনিতেই প্লেনে চড়ায় তাঁর ফোবিয়া। তার উপর গতকালই ব্রাসলেস-এ উগ্রপন্থী হানার খবরটা টিভিতে দেখেছেন। এই তো ক’দিন আগেই ফ্রান্সে হল আক্রমণ। আর আমাদের নিজেদের দেশেই বা কম কি? ক’দিন আগেই পাঠানকোটে যা হল! এই এতসব কাণ্ডে মাথা ঠিক থাকে? কোথাও যাত্রা করলেই মনে হয় ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে পারবে তো? এইসব প্লেনে-টেনে তো সব-সময়ই ভয়। একে মাঝ-আকাশ, যাকে বলে মধ্য গগন, তার উপর যদি প্লেন হাইজ্যাক-ট্যাক হয়, অথবা আত্মঘাতী বোমা মেরে উড়িয়েই দেয় যদি প্লেনটা! কিন্তু কোন ভয়ই তাঁকে হিউস্টন যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত করতে পারে নি। স্ত্রীর অনুরোধের জন্যও নয়। স্কাইপে সাড়ে তিনবছরের নাতনী ত্রিজ্ঞাকে দেখে মনের কোণে স্নেহসুধা জমে উঠছিল। ত্রিপর্ণাদের ব্যস্ত কর্মজীবনে দেশে ফেরার ফুরসৎ নেই। তাই রিটায়ার্ড অম্বরীশবাবুই নাতনীর টানে সস্ত্রীক পাড়ি দিচ্ছেন সুদূর আমেরিকায়।

একেই ব্রিটিশ-এয়ারওয়েজ-এর প্লেনটা ব্রিটিশ সময়ানুবর্তিতার অহঙ্কারকে কলা দেখিয়ে চোদ্দ ঘণ্টার বদলে আটত্রিশ ঘণ্টা সময় নিয়ে হিথরো এসে পৌঁছাল। এখন বলছে মাত্র একঘণ্টা-তেইশ মিনিট স্টপ-ওভার টাইম। অর্থাৎ, প্রায় একঘণ্টার মধ্যেই আবার হিথরো থেকে হিউস্টনের কানেকটিং প্লেনে উঠতে হবে এবং কম করে এখন আবার দশ ঘণ্টার প্লেন জার্ণি। যা এদের সময়ানুবর্তিতার বহর দেখা যাচ্ছে, তাতে দশ ঘণ্টাটা কুড়ি ঘণ্টা হলেও আশ্চর্য হওয়ার নয়। প্লেনের ফোবিয়া কিছুটা কাটলেও একনাগাড়ে অতক্ষণ উড়ান-যাত্রার ধকল অম্বরীশবাবুকে বেশ কাহিল করে দিয়েছে। একঘণ্টা-তেইশ মিনিট সময় তাই এয়ারপোর্ট লাউঞ্জেই বসেছেন স্ত্রীকে পাশে নিয়ে। “এক রকম ভালই হল বুঝলে! তাড়াতাড়ি, হিউস্টনের ফ্লাইট হওয়াতে।” কথা শেষ করতে পারলেন না, অম্বরীশবাবু। ভ্রু-জোড়া কুঁচকে উঠল। পাশে এসে বসেছে এক বোরখাবৃত মহিলা। আপাদমস্তক কালো বোরখায় ঢাকা হলেও বোঝা যাচ্ছে মহিলা কি যেন খুঁজছেন চারিদিকে ভাল করে লক্ষ করে। অম্বরীশবাবু লক্ষ করছেন মহিলাটিকে। এতে তাঁর স্ত্রী ঈষৎ বিরক্ত। তিনি পাত্তা দিলেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোরখাবৃত ভদ্রমহিলার পাশে এসে বসলেন একজন শক্ত-সমর্থ, লম্বা-চওড়া মধ্যবয়স্ক পুরুষ। কালো রঙের ফিরহান গোছের একটা কোট ও সাধারণ প্যান্ট পরিহিত ভদ্রলোকটির দাড়ি ও চুলে মেহেন্দির লালচে বাদামি রঙ। পাশে বসা মহিলাটির সাথে চাপা গলায় কিছু কথা বলল লোকটা। তারপর পায়চারি করতে করতে মোবাইলে খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস স্বরেই কথা বলছে। এত আস্তে লোকটা কথা বলছে যে চেষ্টা করেও অম্বরীশবাবু ভাষাটা উদ্ধার করতে পারছেন না। এবার লোকটা চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি বোলাতে বোলাতে টয়লেটের দিকে এগোচ্ছে। লোকটার ফিসফিস, চাপা স্বরে কথা, চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি বোলানো- এইসব লক্ষ করে কেমন যেন খটকা লাগছে অম্বরীশবাবুর। তিনি ঠিক করলেন লোকটাকে অনুসরণ করবেন। কিন্তু স্ত্রীকে এই বোরখাবৃত ভদ্রমহিলার পাশে একা বসিয়ে যাবেন? তাই, খুব ধীরে বাংলায় স্ত্রীকে বললেন “যাও, ওইদিকে গিয়ে বসো আর ঐ ভদ্রমহিলাকে লক্ষ রেখো।” এই কথা শুনে গিন্নী তো বেজায় চটে গেলেন। “কি আমি এখন তোমার জন্য অন্য মহিলার উপর নজরদারি করব? না, আমি পারব না! আর, অন্য কোথাও নয়, আমি এইখানেই বসে থাকব।” এই অবস্থায় গিন্নীর সাথে বাকবিতণ্ডা করলে সময় নষ্ট হবে। তাই তিনি আর কথা না বাড়িয়ে টয়লেটের দিকে গেলেন। নিজে চোখে একবার ভদ্রলোক কি করছে দেখে নিলে কিছুটা স্বস্তি। তবে কি করলে যে আসলে স্বস্তি পাবেন তা এইসময় তাঁর বোধগম্য হচ্ছে না। হয়ত, ওঁরা নিছকই সাধারণ প্যাসেঞ্জার! তবু কেন মনের মধ্যে এত খটকা হয়? যাইহোক খটকার কারণেই অম্বরীশবাবু লোকটাকে ফলো করছেন।

লোকটা একরকম ক্ষিপ্রগতিতে টয়লেটে ঢুকে গেল। হয়ত, প্রবল বেগ সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। অম্বরীশবাবু ভাবলেন, যাক, তিনিও নিশ্চিন্তে একটু ফ্রেশ হতে পারবেন। প্লেনে টয়লেটে গেলেও ঊড়ান-পথে ঠিকমত বেগ আসে না। কিন্তু, একি? টয়লেটে ঢুকে তিনি অবাক! কই, লোকটা তো ইউরিনারিত ঢোকে নি? বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাতের ছোট সাইড-ব্যাগ থেকে একটা বড় ওষুধের বোতলমত কি যেন বার করল। তারপর ঐ ব্যাগ থেকেই আরেকটা ছোট্ট শিশি বার করে বড় বোতলটার মধ্যে কয়েক ফোঁটা ঢালল। এইবার বড় বোতলের শিশির তরলের রঙ পরিবর্তন হল। গাঢ় সবুজ রঙের তরলযুক্ত বোতলটা ব্যাগে চালান করে লোকটা টয়লেট থেকে ধীরে সুস্থে বের হল। লোকটার কাণ্ড-কারখানা দেখে অম্বরীশবাবু তাজ্জব বনে গেলেন। অম্বরীশবাবুর উপস্থিতিতে লোকটা একটুও বিচলিত হয় নি। বেশ ফুর্তির সঙ্গেই আবার শুরু করল মোবাইলে কথোপকথন। এবার অম্বরীশবাবু কিন্তু সত্যিই খুব ভয় পেলেন। এতক্ষণ যা নিছক কৌতুহলমিশ্রিত সন্দেহমাত্র ছিল তা যেন গূঢ় সন্দেহে পরিণত হচ্ছে। বোতলের ঐ তরলটা কি কোন কেমিক্যাল বোমা? কি করে আনল এই এয়ারপোর্টে? অবশ্য আজকাল সিকিউরিটি চেকিং-এর যা হালচাল, তাতে সাধারণ মানুষকে একটা নেল-কাটার কিম্বা পারফিউমের বোতল নিয়ে প্লেনে উঠতে দেবে না অথচ যারা সর্বনাশ করার জন্য প্লেনে ওঠে, তারা দিব্যি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উঠে যায়! অম্বরীশবাবুর মনে পড়ল কিছুদিন আগে একটা হিন্দি সিনেমা দেখতে গিয়ে সিনেমা হলে দেখা একটা বিজ্ঞাপণের ক্যাপশান –‘সতর্কতাই নাগরিক সুরক্ষার একমাত্র উপায়’। মনে হওয়ামাত্র তিনি দ্রুত লোকটার পাশে চলে গেলেন। পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খুব মনোযোগ দিয়ে মোবাইলের কথোপকথন শোনার চেষ্টা করলেন। যদিও বাংলা, ইংরাজী আর বলিউড ফিল্ম বোঝার জন্য যেটুকু হিন্দি লাগে তাছাড়া আর কোন ভাষা তাঁর জানা নেই। বলাবাহুল্য কথোপকথনের কিছুমাত্র কানে এলেও বিন্দু-বিসর্গ বুঝতে পারলেন না। বৃথা চেষ্টা জারী রইল। সাবধানে পাশে পাশে হাঁটছেন। এবার কানে এসে লাগল দুটো শব্দ- ‘খুরবানি’ আর ‘জন্নত’! সর্বনাশ! কিছু একটা অঘটন ঘটবেই। হিন্দি সিনেমার দৌলতে এইটুকু আম্বরীশবাবু জানেন যে খুরবানি অর্থাৎ কুরবানি- এই শব্দটা যারা আত্মঘাতী বোমায় আঘাত হানে তারাই ব্যবহার করে এবং নিজেদের কাজ সম্পর্কে তাদের এতই উচ্চধারণা যে তারা মনে করে এই মহান কাজ করার জন্য মৃত্যু-পরবর্তীকালে তাদের স্থান হবে খোদার জন্নতে অর্থাৎ স্বর্গে।

ঘনীভূত সন্দেহ দৃঢ় মনে হলেও ঠিক কি যে করবেন তা তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। বিস্ফোরণ যদি হয়ও তাহলে কি এই হিথরো এয়ারপোর্টেই হবে? নাকি কোন দুর্ভাগা প্লেনের যাত্রীদের কপালে ঝুলছে মৃত্যু পরোয়ানা? কিন্তু তিনি সাধারণ এক যাত্রী। কার কাছে যাবেন? কেই বা তাঁর কথা শুনবে? তাছাড়া, তিনি তো একশ-শতাংশ নিশ্চিতও নন! তিনি যেটুকু দেখেছেন বা শুনেছেন তার ভিত্তিতে কি কোন অভিযোগ করা যায়? তিনি ঐ লোকটাকে ফলো করেছিলেন নিছক একটা দিবাস্বপ্নে পাওয়া ভয়ের ভিত্তিতে। এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে তিনি তাঁর স্ত্রীর কাছে চলে এলেন। সর্বনাশ! গিন্নীতো দিব্যি গল্প জুড়েছে বোরখাবৃত মহিলাটির সঙ্গে। স্ত্রীর প্রতি একরাশ বিরক্তি নিয়ে এগিয়ে এসে শুনলেন দুজনেই স্টার-প্লাসে একই হিন্দি-সিরিয়াল দেখেন এবং সেই নিয়েই চলছে গল্প। তাঁকে হতবাক করে দিয়ে স্ত্রী পরিচয় করিয়ে দিলেন “মেরা হাজব্যাণ্ড। আর উনি করাচি থেকে এসেছেন ছেলের কাছে হিউস্টন যাচ্ছেন। ভালই হল আমার দশ-ঘণ্টা প্লেন-জার্ণিতে গল্প করার সঙ্গী হল।”

হিথরো-হিউস্টন-ব্রিটিশ-এয়ারওয়েজ-এর যাত্রীদের ফ্লাইট-কল হয়েছে। সিকিউরিটি-চেক-ইন-এর জন্য অম্বরীশবাবুরা এগিয়ে গেলেন। মনের কোণে একটু ক্ষীণ আশা। সিকিউরিটি-চেক-এর নিরাপত্তাবলয় যদি কোনভাবে আটকে দিতে পারে মারণসামগ্রীদের! গিন্নী মহিলা-লাইনে এগিয়ে। তুলনায় তিনি একটু পিছিয়ে। ওইখান থেকেই দেখতে পেলেন, বোরখাবৃত মহিলাকে নিরাপত্তা-কর্মীরা ঘিরে ধরেছে। ওই তো তার সঙ্গীও হাজির। হাত-পা নেড়ে কি যেন বোঝানোর চেষ্টা করছে নিরাপত্তা-কর্মীদের। একটু আশ্বস্ত হলেন। এইবার গিন্নীর হ্যান্ড-ব্যাগটা চলে গেল সিকিউরিটি-স্ক্যানারে। একি? লাল আলো জ্বলে উঠল কেন? সর্বনাশ! এতক্ষণ স্টার-প্লাসের হিন্দী-সিরিয়ালের গল্পের আড়ালে কি গিন্নীর ব্যাগে কিছু নিষিদ্ধবস্তু চালান করেছে? আর মাথা কাজ করছে না!

চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছে নিরাপত্তা-কর্মীরা। একদিকে কাঁচুমাচুভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছেন অম্বরীশবাবু। সঙ্গে ওনার সন্দেহভাজন সেই মুসলমান লোকটা। আর তাঁর গিন্নী এবং ঐ লোকটার স্ত্রী অর্থাৎ সেই বোরখাবৃত মহিলা দুজনেই নিরাপত্তা-কর্মীদের কিছু বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। সামনের টেবিলে ছড়ানো- বড়ি(অম্বরীশবাবু গড়িয়াহাট থেকে কিনেছিলেন), আঁচারের শিশি, সরষের তেল, সিমুউ-এর প্যাকেট, ঘি-এর শিশি, জ্যাফরানের প্যাকেট ইত্যাদি। সেই সবুজ তরলটাও রয়েছে, সেটা করাচির কোন হাকিমের দেওয়া অ্যালার্জির ওষুধ! সামনে বকরীদ! মহিলা বোঝানোর চেষ্টা করছেন নিরাপত্তা-কর্মীদের, মশলাগুলো অন্তত নিয়ে প্লেনে উঠতে দিক! নাহলে প্রায় দশবছর দেশে না ফেরা ছেলেকে সাধের বিরিয়ানি খাওয়াবেন কি করে? একই বক্তব্য অম্বরীশ-বাবুর স্ত্রীরও। কলাই-এর বড়ি খেতে মেয়েটা যে বড্ড ভালবাসে! নিরাপত্তার কঠোর ঘেরাটোপ দুই-মা’কেই নিরাশ করে। অগ্যতা সাধের জিনিষগুলো পিছনে ফেলেই দুই পরিবার রওনা হয় প্লেনে ওঠার জন্য। একজন মহিলা অস্ফুটে বলে ওঠেন, “হে ঠাকুর! সবই তোমার ইচ্ছে!” আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রায় একই সঙ্গে বলেন, “ইয়া আল্লা! তেরি রেজা!”



লেখক পরিচিতি
রিমি মুৎসুদ্দি
গল্পকার। শিক্ষক। অর্থনীতিবিদ। গবেষক।
দিল্লীতে থাকেন। 
সানন্দা, দৈনিক বর্তমান্সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন