বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

তসলিমা মুন'এর গল্প : প্রবেশপত্র

ভরা বর্ষায় সীতারানীর বিয়ে। সকাল থেকে কয়েকটা ঢোল আর সানাই বেজে চলেছে। উঠোনে প্যাঁচপ্যাঁচে কাঁদা। একটি সামিয়ানা টানানো হয়েছে। সকাল থেকে এক ঘেয়েমি বৃষ্টি। সামিয়ানা উঠোন শুকনো করতে পারেনি। এসব কিছুই সীতারানীর বিয়ে আটকাতে পারবেনা। গরীবের মেয়ে পার করা বলে কথা। ছেলের বাড়ি থেকে হ্যাঁ বলার পর অহেতুক দেরী করার মানুষ সীতা রানীর বাবা না।

বরপক্ষকে আপ্যায়ন করার জন্য বাজার থেকে পাকা কাঁঠাল আনা হয়েছে। এক কাধি দেশি কলা। খই চিড়ের সাথে দেওয়া হবে। গরীব মানুষের মেয়ের বিয়ে পোলাও কোর্মাতো আর হবেনা? হাজী সাহেবের দোকান থেকে এক বস্তা চাল বাকীতে এনেছে। সাথে ভাদুরে কুমড়ো ঘণ্ট। ছোলার ডাল হবে। সে ই অমৃত। এই রান্না করার জায়গা করতেই হিমসিম অবস্থা সকলের। সীতারানীর দিদিমা টিনের বাক্স করে নাড়ু আর মুড়ির মোয়া এনেছে। এ দুর্দিনে এক বিরাট সাশ্রয়। বাজার থেকে বেঁছে বেঁছে প্রান ভরা পান এনেছে সীতারানীর বাবা। সুপারি চুন একটি ঝুড়িতে রাখা হয়েছে। আয়োজন খারাপ না। সীতারবাবা বেশ সন্তুষ্ট। 

বিল ঘেঁষে বাড়ি। বরপক্ষ নৌকা করেই বিয়ে করতে আসবে। সীতারানীর জন্য বাজার থেকে একটি লাল সুতী শাড়ি আনা হয়েছে। সেটি পরে সে ঘরের একটি কোনে মাদুরে বসে সুপারি কাটছে। মাথাটা সুপারি কাটা জাঁতির দিকে একটু বেশি ঝুকে আছে। সে কাঁদছে কিনা সেটি বাইরে থেকে বুঝা যাচ্ছেনা। সীতারানী এবার ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠবে বলে সব ঠিক ছিল। এখন সে এই বর্ষায় নৌকা চড়ে দূর গ্রামে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। 

বরও গরীব ঘরের। নিজেদের জমি বলতে কিছু নেই। তিন ভাইয়ের যৌথ সংসার। ভিটেটুকুন আর তিন শরিকের কয়েক কাঠা জমি বাড়ির সাথে লাগোয়া। সে জমি সারা বছরের ভাত যোগান দিতে পারেনা। অন্যের জমিতে বর্গা খেঁটে কোনমতে জীবন চলে। তিন শরিকের মেঝ ভাই হারাধনের মেট্রিক ফাইল ছেলেটার সাথে সীতারানীর বিয়ে ঠিক। সীতারানীর বাবা গদগদ। তাঁদের বংশে এর আগে মেট্রিক পর্যন্ত পড়া জামাই আর কেউ পায় নাই। ছেলেটা দেখতে বোকা সোকা হলেও কাজে কর্মে খারাপ না। মহাজনের দোকানে কাজ করে। হিসাব কিতাব লেখে। অনেক ভাগ্যে সীতার এমন একটা বিয়ে হতে যাচ্ছে। তাও ছেলে পক্ষের দাবী দাওয়া তেমন কিছু না। নগদ চার হাজার টাকা আর একটা সাইকেল দিতে হবে ছেলেকে। কিন্তু সেটা বর্ষার পরে দিলে হবে রফা করে বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে। ছেলের বাবা হারাধনের অবশ্য বাকীতে বিয়ের তারিখ ঠিক করায় আপত্তি ছিল। কিন্তু ছেলে আর তার মার পিরাপিড়িতে হারাধন না করতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। সীতারানী রূপসী। 

সীতারানী স্কুলে যেতো বুকে বই চেপে। বইপত্র বেশির ভাগই সে চেয়ে চিনতে যোগাড় করতো। পাশের বাড়ির মজুমদারদের ধান ভেনে দেয় সে আর তার মা। এটা করে সীতা চাল পায় কিছু। সেটা বিক্রি করেই সে কাগজপত্র কেনে। পুরনো বই যোগাড় না হলে একটা দুটো কিনতে হয় তাকে। সারারাত ধরে ধান ভাঙে তারা। সকালে সীতারানীর মা ফেনা ভাত রান্না করে। গোয়ালে দুটো গরু একটা বাছুর। তাদের জল ভুষি দিয়ে গোবর ছিটা দিয়ে উঠোন লেপে সীতা। পুকুরে একটি ডুব দিতে দিতে স্কুল বেলা হয়ে যায়। সীতার খুব ইচ্ছে মেট্রিক পর্যন্ত পড়ে। স্কুলের দিদিমণির মত একটি চাকরি করার তার খুব স্বপ্ন। সারারাত ধান ভেনে সকালের কাজ সেরে ফেনা ভাত খেয়ে স্কুলে এসে বসলে শরীর এলিয়ে পড়ে সীতারানীর। কিন্তু দিদিমণির দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে খাড়া রাখে। দরিদ্র বলে এক কোনে পড়ে থাকে সে। অন্য মেয়েদের সাথে খুব বেশি মিশতে বা কথা বলতে পারেনা সে। তাতে অবশ্য সীতারানী জন্য সুবিধা হয়। প্রত্যেক ক্লাস শেষে সে পরের দিনের পড়াটা সেরে ফেলে। পরীক্ষায় সেজন্য সীতারানী বরাবরই ভাল করে। হেড স্যার সেদিন বাজারে বাবাকে ডেকে বলেছে। হরিনাথ, মেয়েটাকে মেট্রিক পর্যন্ত পড়িও। মেয়েটার মাথা ভাল। 

সন্ধ্যের মুখে বরদের নৌকা এসে উঠোনে থামলো। মেয়েরা উলুধ্বনি দিয়ে বর বরণ করলো। তেমন কোন হৈচৈ নেই। আত্মিয় স্বজনেরও সমাগম নেই। বর ঘিরে খুনসুটি করারও কেউ নেই। সীতার রুগ্ন বোনটি বড় বড় করে অবাক হয়ে বাড়িতে এত মানুষের সমাগম দেখে। সে কোনদিন তাদের বাড়িতে এত মানুষ আগে দেখেনি। দিদির আজ বিয়ে হবে। কাল দিদি নৌকা চড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে তাদের সেই বাড়িতে থাকতে হয়। সে জানে। দিদির জন্য পেটের ভেতর মুচড়ে ওঠে। চুপ করে বসে থাকে সে দিদির পাশে। কেমন যেন লাগছে দিদিকে। একটি নতুন লাল শাড়িতে একটি নতুন গামছা বাঁধা। অচেনা লাগছে দিদিকে। 

বর পক্ষ হাতে বিশাল আকারের দুটি মাটির হাড়ি নিয়ে নামলো। বাজারের পুরনো খবরের কাগজে মাটির হাঁড়ি দুটোর বাঁধা। রসগোল্লা মিষ্টি না। চিনির বাতাসা। 

তারা দুটো সরু নৌকা নিয়ে এসেছে। গেঞ্জির নীচে পানাজবি লুকিয়ে বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা সকলের। একটি ছাতায় চার পাঁচজনের মাথা জামা বাঁচানোর চেষ্টা। হুড়মুড় করে গোটা বিশেক খেটে খাওয়া মানুষ উঠোনে নামে। তারা বরযাত্রী। যথাসম্ভব সাজগোজের ছাপ তাদের চুল দাঁড়ি কামানো মুখে। বর সামনে। সাথে বরের বাবা আর মুরুব্বি শ্রেণীর একজন। বরের পরনে নতুন ধূতি। একটি হাঁফ হাতা ওয়ালা গেঞ্জি। একটি খন্ড কাপড় চাদরের মত করে গায়ে দেওয়া। মাথায় শোলার তৈরি টোপর। চুল নতুন কাটা। দাঁড়ি গোঁফ কামানো। কপালে চন্দন বা সাদা পাঊদার গুলে ফোঁটা ফোঁটা দেওয়া। 

বরযাত্রীর দাবী বরপক্ষের অবশ্য আরও ছিল। খরচ সামলাতে পারবেনা। সীতার বাবা হাত জোড় করে বিশ জনে রফা করেছে। নিজেদের মানুষ সেজন্য তাকে কমাতে হয়েছে। 

বরপক্ষ হাতের মাটির হাড়ি আর একটি রঙিন টিনের স্যুটকেস মেয়েদের হাতে দিয়ে গোয়াল ঘরে গিয়ে বসে। মেয়েরা স্যুটকেসে কি আছে সেটি দেখতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। একটি লাল ‘টীস্যু’ শাড়ি। আয়না কাঁকই। সস্তা স্নো। ব্লাউজ সায়া।এক জোড়া শাখা সাথে লাল চুড়ি। সকলে বেশ সন্তুষ্ট। বর পক্ষের সদাইপাতি খারাপনা। সীতারানী ভাগ্যবতী। গরীবের ঘরের সীতারানীর ভাগ্যে কি আর সাতনরি সীতা হার আছে নাকি? 

গোয়াল ঘরটিই ঝেড়ে মুছে বসার জায়গা করা হয়েছে। চাটাই পেতে বসতে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। সবার জায়গা হবেনা। বারান্দায় বসতে হবে। সেখানেই খাবার দেওয়া হবে। বর পক্ষের আপ্যায়নের জন্য খই মুড়ি মোয়া পৌঁছে গেছে। 

উঠোনে সামিয়ানার নীচে চারটি কলা গাছ পুঁতে বিয়ের আয়োজন। নিচু জাতের গরীব ঘরের বিয়ে। সাধারনভাবেই সারা হবে। ঝুম সন্ধ্যা নেমে গেছে ইতিমধ্যেই। বিয়ের লগ্ন না হলে বিয়ে শুরু হবেনা। খাওয়া দাওয়া সেজন্য বিয়ের আগেই হবে।

সীতারানীর বিয়ের গল্পটা এরকমই ছিল। ভোররাতে সীতারানী মালাবদল করে সাতপাক ঘুরেছিল ঘুম চোখে। সকালে বাসী বিয়েতে সস্তা সিঁদুরে মাথা রাঙিয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছিল। রাতে অচেনা একজন মানুষ তার দিকে চেপে আসছিল। সীতারানী বুঝেছিল এর নাম বিয়ে। 

সীতারানীর মেট্রিক দেওয়া হয়নি। শ্বশুরবাড়িতে সে নতুন উঠোন পেয়েছে ঝাড়ু দিতে। উঠোনের পাশে বিশাল দুটো চুলো। ভোর পাঁচটায় উঠে ধান সিদ্ধ করে। পুকুরে এঁটো বাসন ধোয়। বিয়ের এক বছর পার হয়ে গেছে বাবা আজও চার হাজার টাকা আর সাইকেল কিনে দিতে পারেনি। 

শ্বশুর সকালে উঠে একবার টাকা আর সাইকেলের কথা বলে দিন শুরু করে। দুপুরের খাওয়ার সময় শ্বশুরের কাঁসার থালায় ডাল তরকারি ঢালার সময় আরেকবার বলে। 


বাপের কাছ থেকে আমাদের পাওনা বুঝে আনো। বাটপাড় বাপের মাইয়া। কথাগুলান কানে দিও। 

সন্ধ্যেটা ঘনিয়ে এলে তুলশি তলায় তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে এক ফোঁটা কেরসিন খোঁজে সীতারানী। অন্ধকার উঠোনের বাইরে পা দিতে গা ছমছম করে। পুকুরের পাড়ে আজকাল একা যেতে ভয় করে সীতারানীর। গ্রামের মজিদ মিয়ার ছেলেটাকে কয়েকবার দেখেছে সে। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় পুকুরে নামে সে গা ডলার জন্য।ময়লা জমে থাকা শরীরটি পরিচ্ছন্ন করতে তাকে সন্ধ্যে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আজকাল ভয় করে সীতারানীর। গ্রামটি ফাঁকা হয়ে গেছে। হিন্দুরা বাড়ি ঘর বিক্রি করে চলে যাচ্ছে। তিন শরিকের দু শরিক চলে গেছে তিন মাস হয়ে গেল। সীতারানীদের এ অংশটুকুন ফাঁকা হয়ে গেছে। অচেনা মানুষ বাড়ি করছে তাদের জায়গায়। অচেনা মানুষদের বাড়ির আশে পাশে ঘুরতে দেখে। তাদের হাব ভাবে অন্য কথা বলে। সীতারানী বুঝে সে ভাষা। সীতারানী ভীত হয়। কিছু কথা কাউকে বলা যায়না। এমন কি স্বামীকেও না। বলবে, মাগী যাস ঢলাঢলি করতে! ক্যান যাস? 

বাড়িতে বন্ধু বলতে তার কেউই নাই। সকাল বিকাল টাকা আর সাইকেলের বাক্যবাণ ছাড়া কোন কথাই কেউ তার সাথে করেনা। 

দূর গ্রামে কোথায় একটি বিদ্যালয় কক্ষে মন পড়ে থাকে সীতারানীর। 

স্বামী দোকান থেকে ফেরে অনেক রাত্রিতে। ভাত নিয়ে বসে থাকতে থাকতে ঝিমায় সীতারানী। মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে। 

খড়ের গাঁদায় রক্তাক্ত সীতারানী পড়ে ছিল। স্বামীর দোকান থেকে ফিরতে দেরী হয়েছিল। ভাত তরকারি নিয়ে বসেছিল সীতারানী। কখন বুঝি ঘুমে ঢলে পড়েছিল। পেছন থেকে কেউ এসে মুখ চেপে ধরেছিল। কেউ গামছা পেচিয়েছিল মুখে। অনেকগুলো হাতে ঘুরছিল সীতারানী। পুকুর ঘরের গরু আর খড় রাখা ঘরে সেকল তুলে দিয়ে সীতার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল একদল নেড়া কুকুর। ছিঁড়ে খেয়েছিল খোবলা খোবলা করে। 

সীতারানী অন্ধকারে প্রবেশ করতে করতে হঠাত দু পাখায় উড়ে চলে গিয়েছিল। দূরে একটি বালিকা বিদ্যালয়। একটি লাল চেলি। 

বাবা ও বাবা চার হাজার টাকা যোগাড় করতে তুমি কবে পারবে বাবা? ফিনিক্স সাইকেল কিনে রাখবে বলেছিলে। আমি নিতে এসেছি।

তুই না এসএসসি পরীক্ষা দিবি এবার? আমি পরীক্ষার ফি জমা দিয়ে রেখেছি। 

কি বলো বাবা আমি কি আর পরীক্ষা দিতে পারবো? 

হ্যাঁ হ্যাঁ পারবি। এই যে আমি তোর প্রবেশপত্র যোগাড় করে রেখেছি। দেখ। এই দেখ লেখা সীতা রানী রায়। তোর ছবিও দেওয়া দেখ। 

সীতা রানী রায়। সীতা রানী রায়। 

পুলিশ সীতারানী রায়কে মাদুরে মুড়িয়ে ভ্যানে উঠায়। একটি ট্যাগ লাগিয়ে দেয় তার গায়ে।
সীতারানী রায়।

২টি মন্তব্য: