বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য্য'এর গল্প : আউশভিৎস

প্রতি সন্ধেবেলা যখনই অফিসফেরতা বাসটা ঠাকুরপুকুর ছাড়িয়ে ডানদিকে বাঁক নেয় ত্রিদিবের আজকাল পেটের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে ভয় পাকিয়ে উঠতে থাকে। তার মনে হয় কলকাতার সভ্যতা থেকে এবার সে আদিম অন্ধকারের রাজ্যে প্রবেশ করছে।

তার নতুন কেনা ফ্ল্যাট হাঁসপুকুর ছাড়িয়ে এক অনন্ত নিঃসীম মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে নিঃঝুম হয়ে। চারদিকে ঘাপটি মেরে থাকা অন্ধকার লাফিয়ে পড়তে চায় সুযোগ পেলেই। সেই অন্ধকারকে টর্চের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা করে দিয়ে দুই পাশের মজা পুকুরের মধ্যেকার সরু রাস্তা দিয়ে পাঁক কাদা আর সাপখোপ এড়িয়ে সন্তর্পণে মেন গেটের দিকে এগিয়ে যেতে হয় । এই নতুন ফ্ল্যাটের পেছনেই লুকিয়ে রয়েছে গণ্ডগ্রাম।
মরা ঝোপ, বুনো জংগল, ক্ষেতের জমিতে সিমেন্ট ফেলে তার ওপর মাথা তুলছে প্লাস্টিক কারখানা, খোলা মাঠের এখানে ওখানে শ্বেতীর মতন জমাট বেঁধে টুকরো টুকরো বাড়িঘর, কলাবন, অবৈধ খাটাল। কলকাতার দিকে কিছুটা এগোলে ঠাকুরপুকুর বাজার। কিন্তু এইদিকটায় বড়ই নির্জন। সন্ধ্যে হয়ে গেলে শুধু টিমটিম করে মোবাইল রিচার্জের দোকান, চায়ের গুমটি অথবা ম্যাড়ম্যাড়ে মুদীর দোকানের আলো জ্বলে। মাঝে মাঝে রাস্তা কাঁপিয়ে বাস বা ট্রেকার চলে যায় গুম গুম করে। এই ধু ধু প্রকৃতির মধ্যে রিয়েল এস্টেট বানাবার কথা সমাদ্দার ছাড়া আর কেউ ভাবতেই পারত না।

যদিও প্রথমদিন ফ্ল্যাট দেখে বন্যা একটু হতাশ হয়েই সমাদ্দারকে বলেছিল “এত ভেতরে? এখানে তো শরীর খারাপ হলে ডাক্তারও ডাকা যাবে না”।

প্রোমোটারের ঝানু হাসি দিয়ে তুষ্ট করার ভংগীতে সমাদ্দার উত্তর দিয়েছিল “ম্যাডাম, একবার সবকটা প্রজেক্ট কমপ্লিট হতে দিন। দেখবেন নতুন শহর গড়ে উঠছে এখানে। আর কলকাতার কথা যদি বলেন তো, খাতায় কলমে এটাও তো কলকাতা হয়ে আছে, না কি?”

আজন্ম পার্ক সার্কাস নিবাসী বন্যা এবং হাতিবাগানের ত্রিদিবের মন থেকে খুঁতখুঁতানি যাচ্ছিল না, এটা জেনেই যে প্রায় জলের দরে পেয়ে যাচ্ছে এই ফ্ল্যাট। কলকাতার মধ্যে কিনতে গেলে এর তিনগুণ দাম দিতে হত।

আঙ্গুলে ক্লাসিক মাইল্ডস গুঁজতে গুঁজতে আত্মবিশ্বাসী হেসেছিল সমাদ্দার “ম্যাডাম, কলকাতা বাঘের থাবায় বেড়ে চলেছে। লাফিয়ে পড়ে নিজের জায়গাটুকু এখনই যদি দখল না করে নিতে পারেন, পরে দেখবেন আর কোথাও মাথা গোঁজবার ঠাঁই মিলছে না”।

সমাদ্দারের ওই এক গুণ ছিল। কথা বলতে পারত জাদুকরের মতন। বন্যা আর ত্রিদিব প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতন ফ্ল্যাট বুক করে ফেলেছিল।

বন্যা ভালই আছে। তার অফিসের বাসও ঠাকুরপুকুর পর্যন্ত ছেড়ে যায়। কিন্তু এখন ত্রিদিবের ভয় করে। বাড়ি ফিরতে ভয় করে। রাত্রে ঘুমোতে ভয় করে। সকালে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে বসে দুরের সবুজের মধ্যে মাথা উঁচু কারখানার ধুসর চিমনি দেখে ভয় করে। আর এই ভয় শুরু হয়েছে মা্স দুই আগে থেকে, যেদিন সন্ধ্যেবেলায় ত্রিদিব বসার ঘরে প্রথম টিকটিকিটাকে দেখেছিল।

সেদিন ছিল রবিবার। তারা সবে তিন সপ্তাহ হল ফ্ল্যাটের পজেশন নিয়েছে। তখনো সব কিছু গুছিয়ে উঠতে পারেনি। বন্যা গিয়েছিল গড়িয়াহাটায় পর্দা বাছতে। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল বলে ত্রিদিব আর বেরয়নি। সন্ধ্যেবেলায় এক কাপ চা বানিয়ে ড্রইং রুমের সোফায় বসতে গিয়েই লাফিয়ে উঠেছিল। সদ্য কেনা লাল কালো কভারের ওপর স্থির হয়ে গা এলিয়ে পড়ে আছে একটা কালো কুচকুচে বিশাল টিকটিকি।

ত্রিদিবের ছোটবেলা থেকেই টিকটিকিতে ফোবিয়া আছে। দেখে ভয় লাগে, ঘেন্না হয়। তাদের হাতিবাগানের বাড়িতে দুই একটা ছিল কিন্তু তারা ঘুলঘুলি থেকে বেরোত না বিশেষ। তাদের দেখলেই ত্রিদিব তাড়া লাগাত ফুলঝাড়ু বা লাঠি দিয়ে। দুড়দাড় করে পালাবার পথ পেত না। কিন্তু এই টিকটিকিটা কিরকম ভয়শূন্য চোখে চেয়ে আছে তার দিকেই।এটা বুনো টিকটিকি। সম্ভবত পেছনের বনবাদাড় থেকে এসেছে। ত্রিদিবের পেটের ভেতর থেকে গুলিয়ে ভয় পাক দিয়ে উঠেছিল। স্থির হয়ে গেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। নড়াচড়া করার শক্তি ছিল না। তারপর ধাতস্থ হয়ে নিজেকেই ধমকাল--ধ্যাত, এ তো সামান্য একটা টিকটিকি মাত্র !

হাতে চাপড় মেরেও যখন যায়নি ত্রিদিব জগের জল হাতে নিয়ে ছিটিয়ে দিয়েছিল। টিকটিকিটা লাফিয়ে দেওয়ালে উঠে গেল। সড়সড় করে বুকে হেঁটে টিউবলাইটের পেছনে ঢুকে যাবার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার যেন দেখে নিল ত্রিদিবকে। অথবা মনের ভুলও হতে পারে।

সোফার কভারটা তুলে কাচতে দিয়ে দিল। কিরকম ঘেন্না লাগছে। চেয়ারে বসে থাকল সারা সন্ধে আর একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে গেল। বারে বারে চোখ চলে যাচ্ছে টিউবলাইটের দিকে। জন্তুটাকে আর দেখা যাচ্ছে না ঠিকই কিন্তু ত্রিদিব জানে সে ঘাপটি মেরে আছে। যে কোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে।

বন্যা ফিরল রাত সাড়ে নটায়। ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল, “সোফার কভার কি হল?”

ত্রিদিব আংগুল তুলে টিউবলাই্টের দিকে দেখাল। টিকটিকিটা আবার বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেওয়াল ঘেঁসে।

মুখ বিকৃত করল বন্যা “এ ম্যা গো ! কি বীভৎস দেখতে! তাড়াওনি কেন?”

“যাচ্ছে না যে”, হতাশায় কাঁধ ঝাঁকাল ত্রিদিব, “সোফার ওপর বসেছিল। কিরকম ঘেন্না লাগছে!”

“ঘেন্নার আবার কি হল? টিকটিকি খুব নিরীহ প্রাণী। নিজের মতন থাকে, কারোর ক্ষতি করে না”।

“আমি ছোটবেলা থেকেই টিকটিকি সহ্য করতে পারি না। গা গুলিয়ে ওঠে দেখলে”।

“ড্রইং রুমের আলো নিভিয়ে দাও। চলে যাবে। ওরা আলো দেখে আসে। এ তো পেছনের জংগল থেকে এসেছে মনে হয়। আমায় একটু চা করে দাও না গো ! মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে”।

কিন্তু টিকটিকিটা গেল না। সেই দিন থেকে মাঝে মাঝেই উঁকি ঝুঁকি দিতে থাকল কখনও বসার ঘরের দেওয়ালে, কখনও বাথরুমের জানালায়, আবার কখনও বা কিচেনে। ত্রিদিবের শান্তি স্বস্তি সব গেল।

রাত্রে শুয়ে যখন চারধারে সব নিস্তব্ধ, শুধু ফ্ল্যাটের পেছনের জংগল থেকে একঘেয়ে ঝিঁঝিঁর ডাক ভেসে এসে, ত্রিদিবের মনে হয় সেই অরণ্য তার দিকে এগিয়ে আসছে। জানালার পাশের নিমগাছের গোড়ায় ফণা বাগিয়ে উদ্যত বসে আছে কেউটে সাপ। তার হিসহিসানি মিশে যাচ্ছে ঝিঁঝিঁর ডাকের সংগে। কালো রং-এর বুনো টিকটিকি ওঁত পেতে আছে তার মাথার ওপরেই। যে কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঝাঁকে ঝাঁকে শ্যামাপোকা উড়ে আসতে চাইছে ঘরের ভেতর। ত্রিদিবের ঘুম হয় না। উঠে বসে। জল খায়। অন্ধকার ঘরে মাথা উঁচু করে তাকায় ছাতের দিকে। এবং দেখতে পায় স্থির বসে আছে টিকটিকি। সময় মাপছে।

ত্রিদিব মশারী কিনে আনে। বন্যা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “হঠাৎ? কখনও তো ব্যবহার করতে দেখিনি!”

“ভয় লাগে বন্যা! যদি গায়ের ওপর টিকটিকি পড়ে?”

“তোমার কি হয়েছে বলো তো! ঠিক মতন ঘুমোচ্ছ না। রাতে জেগে বসে রয়েছ। খাবারে রুচি নেই। ডাক্তারের কাছে যাবে একবার?”

“না না এটা ডাক্তারের সমস্যা নয়”। অস্থির ত্রিদিব হাত নাড়িয়ে বন্যার কথা উড়িয়ে দিতে চায়। “আমার কিরকম অস্বস্তি হচ্ছে জানো! টিকটিকিটাকে নিয়ে”।

“টিকটিকি? এ তো মনের রোগ তাহলে ! ওরা কারোর কোনো ক্ষতি করে না। নিজের মতন থাকে। এটা তো ওদেরও থাকার জায়গা তাই না? বরং আমরাই ওদের জায়গায় থাকতে এসেছি বলতে পারো।”

“কিন্তু তবুও আমার দেখে ঘেন্না হয়। গা গোলায়। মনে হয় আমার আর তোমার থাকার জায়গায় জোর করে ঢুকে পড়েছে। আর কিরকম জঘন্য দেখতে হয় ওদের! ওরা নোংরা হয়! যেখান দিয়ে যায় সেই দেওয়ালের ওপর কালো কালো পায়ের দাগ করে দিয়ে যায়। গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা করে। এখন থেকে যদি না তাড়াও দেখবে দুদিন বাদে বাড়ি ঘর দোর গিজগিজ করছে আর আমাদেরই থাকার জায়গা নেই”।

বন্যা তোয়ালে নিয়ে এসে ত্রিদিবের হাতে ধরিয়ে দিল, “ভাল করে স্নান করে এসো। মাথা গরম হয়ে আছে তোমার। প্রজেক্ট নিয়ে ঝামেলা চলছে? যদি কাজের চাপ না থাকে তো চলো বাবা মায়ের কাছ থেকে ঘুরে আসি আজ”।

প্রজেক্ট নিয়ে কোনও ঝামেলা নেই। অফিস মসৃণ গতিতেই চলছে। ত্রিদিবকে বলা হয়েছিল অনসাইটে ছয় মাসের জন্য আমেরিকা যেতে। কিন্তু সে যেতে চায়নি। তার ভাল লাগে নিশ্চিন্ত ঘরের এককোণে বন্যার সাথে অলস সন্ধ্যে কাটাতে। তার মন্থর টিউবলাইটের আলো, তার ল্যাপটপে সেভ করে রাখা গান, কফিমেকারের কমফর্ট, এবং নরম সোফার আদর তাকে বাইরের পৃথিবীতে কি হচ্ছে সব ভুলিয়ে দেয় । তাদের পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবন, বাচ্চা হয়নি এখনো। সে চায়ও না। এভাবেই থাকতে চেয়েছিল। তাদের হাতিবাগানের বাবা মা দুই বোনের সংসার ছেড়ে এই ফ্ল্যাট কেনাও ওই কারণেই। এক নিশ্চিন্তির জন্য। দুজনের একান্ত নিভৃত অবসর।

কিন্তু বাদ সেধেছে এই সব ঝামেলা। বন্যা বলে “তোমার ফোবিয়া হয়ে গেছে”। ত্রিদিবের মন সায় দেয় না। ফোবিয়া নয়। এটা সত্যিকারের উৎপাত। সে সমাদ্দারকে ফোনও করেছিল একদিন।

“টিকটিকি?” সমাদ্দার অবাক হয়ে গেছিল। “সে তো সব বাড়িতেই থাকে”।

“আরে না। ঝামেলা শুধু টিকটিকির নয়। এমন জায়গায় ফ্ল্যাটটা দিলেন, পেছনেই এঁদো গ্রাম, জংগল। নোংরা পানাপুকুরে ভরে আছে। পোকামাকড় সাপখোপ ঢুকতে কতক্ষণ?”

“কোনো ব্যাপার না। আরো অনেকেই তো ওই বিল্ডিং-এ আছে। আমি বরং আমার পেস্ট কন্ট্রোলকে একদিন পাঠিয়ে দিচ্ছি। সাফ করে দেবে। ঘাবড়াবেন না। সাপখোপ মানুষকে ভয় পায়। তাড়া না খেলে বা ওদের না ঘাঁটালে ওরা কিছু করে না”।

“বাহ, এ কেমন কথা বলছেন আপনি?” রেগে মেগে অফিসের মধ্যেই গলা চড়িয়েছিল ত্রিদিব। “তাহলে ওদের সাথেই থাকি না হয়! শুধু ওদের বিরক্ত করা চলবে না তাই তো?”

“স্যার আমিও মফস্বলের ছেলে। এসব দেখেই বড় হয়েছি। সেই জন্যেই বললাম যে ওরা ক্ষতি করে না। এত চাপ নিচ্ছেন কেন, বলেছি তো লোক পাঠাব। আর একটু মানিয়ে গুছিয়ে নিন না! এত মাথা গরম করলে চলে? আরো অনেক ফ্ল্যাটই তো আছে ওখানে। তাদের তো কোনো অসুবিধে হচ্ছে না!”

মোবাইলটা কেটে দিয়ে ত্রিদিব দাঁতে দাঁত চিপল, “মানিয়ে গুছিয়ে নিন! চুতিয়া শালা!”

সারাদিন মাথা গরম করে কাটল। ক্লায়েন্টকে এই অবস্থায় প্রেজেন্টেশন দেওয়া উচিত হবে না ভেবে ডেফার করল। বাড়ি ফিরে তুচ্ছ কারণে ফাটাফাটি ঝগড়া হয়ে গেল বন্যার সংগে। এক পর্যায়ে থাকতে না পেরে বন্যা বলে দিল “তোমার মাথার দোষ দেখা দিয়েছে ত্রি! হয় ডাক্তার দেখাও আর নাহলে এই ট্যান্ট্রামস থেকে আমাকে মুক্তি দাও”।

“হেল উইথ ইওর ডক্টর”। ত্রিদিব দুম করে চায়ের কাপ টেবিলে রাখল। চা চলকে পড়ল কাঁচের ওপর। “যখন একটা স্পেসিফিক বিষয় নিয়ে তর্ক হচ্ছে তখন অন্য পক্ষকে মাথার দোষ আছে বলা মানে আসলে তাকে অপমান করা। এটুকু শিক্ষা স্কুল কলেজ থেকে দেয়নি?”

“না দেয়নি”। বন্যাও গলা চড়াল। “আমিও জানি তুমিও জানো কেন তোমার এরকম মেজাজ হয়েছে আজকাল। একটা সামান্য কারণকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এত বড় করছ নিজের মনের ভেতর। কোনোকিছুতেই এত বাড়াবাড়ি ভাল নয়। কি হয়েছে টিকটিকি থাকলে? তুমি কোন বিলেত আমেরিকা থেকে এসেছ যে একটা টিকটিকি দেখে এরকম ভয় পাচ্ছ? আর যদি সত্যিই আনইজি ফিল করো তো কাউন্সেলিং করতে চলো বলছি তো বারবার! কই আমিও তো আছি আমার তো অসুবিধে হচ্ছে না?”

“হ্যাঁ তুমি আছ কারণ তুমি চোখে ঠুলি পড়ে আছ বন্যা। প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিয়ে এই ফ্ল্যাট কিনেছি। মাসে মাসে কাঁড়ি টাকা ইএমআই দিতে হচ্ছে। সাধ মিটিয়ে নিজেদের এটুকু একটা মাথা গোঁজার জায়গা সাজাচ্ছি আর সেখানে কারোর ভাল লাগে না যে ওরকম বীভৎস দেখতে অন্য কেউ সারাক্ষণ চোখের ওপর ঘোরাফেরা করুক। তুমি দেখতে পাচ্ছ না। পেলে তাড়ানোর চেষ্টা করতে”।

চোখে চোখ রাখল বন্যা, “তুমি তো চেষ্টা করেছ। পেরেছ?”

গুম হয়ে গিয়েছিল ত্রিদিব। না পারেনি। সারা বাড়িতে ডিমের খোসা ঝুলিয়েছে। কাঁচা রসুন আটকে দিয়েছে জানালার খাঁজে, এমনকি কেরোসিন তেলও ছিটিয়ে দিয়েছে আনাচে কানাচে। তবু আটকানো যায়নি। টিকটিকিটা থেকে গেছে বহাল তবিয়তে। শুধু তাই নয়। আজকাল আরো একটা টিকটিকি উঁকি ঝুঁকি দেয় বাইরের ব্যালকনি থেকে। সেটা অবশ্য অত বড় নয় প্রথমটার মতন। কিন্তু এবার ওদের দলে দলে আসার সময়।

সেদিন বাথরুমে ঢুকে কমোডে বসতে গিয়ে আঁতকে উঠেছিল সে। সড়সড় করে কমোডের পেছন দিয়ে উঠে ঘুলঘুলির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল জন্তুটা। ত্রিদিবের নিঃশ্বাস আটকে গিয়েছিল। সেদিন থেকে সে বাথরুমে ঢোকে প্রখর সাবধানতা নিয়ে। ঢোকার সময় মাথার ওপর দেখে নেয়। হাত দিয়ে চাপড় মারে। অত্যন্ত সাবধানে মগ উলটে দেখে যদি মগের ভেতর লুকিয়ে বসে থাকে। দাড়ি কামাতে কামাতে ঝট করে পেছন ফিরে দেখে নেয় একবার। বেশির ভাগ সময়েই বাথরুম ফাঁকা থাকে। তবু তার মনে হয় নিশ্চয় লুকিয়ে রয়েছে কোনো খাঁজে। আর দেখে যাচ্ছে তাকে এক দৃষ্টিতে।

মশারি ছাড়া ঘুমোবার কথা কল্পনাও করা যায়না আজকাল। অন্ধকার ঘরে ধড়াম করে লাফিয়ে পড়তে পারে তার শরীরের ওপর যে কোনও সময়ে। হয়ত সে হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। টিকটিকিটা লাফিয়ে তার মুখের ওপর পড়ল। সে চমকে উঠে দাঁতে দাঁত চিপে ফেলল আর দাঁত বসে গেল জন্তুটার নরম কালো গায়ের ওপর। সাদা রস আর আঁশটে রক্ত তার মুখে মাখামাখি--ত্রিদিবের ঘুম ভেংগে যায়। বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে থাকে। মনে হয় দম আটকে আসছে। আরো বেশি গুটিশুটি মেরে বসে মশারির মধ্যে, যেন মশারির গায়ে পা না লাগে। যে কোনো জায়গায় ঘাপটি মেরে থাকতে পারে। পা ঠেকে গেল, আর সেখান থেকে তাকে স্পর্শ করল একটা কালো খসখসে কাঁটাকাঁটা লেজ, এরকম কোনও সুযোগই দেওয়া চলবে না। ত্রিদিব দিনে দিনে সাবধানী হয়ে ওঠে আরো, আরো বেশি করে। খেতে বসার আগে মুখ তুলে চারপাশ দেখে নেয়, যাতে ডালের বাটিতে আচমকা টিকটিকি না পড়ে। সাবধানে পা টিপে টিপে সন্ত্রস্ত ভংগীতে হাঁটতে থাকে এ ঘর থেকে ও ঘর, যেন মাথায় না পড়ে। আর দিনে দিনে একটা একটা করে বাড়তে থাকে টিকটিকির সংখ্যা। ঘুলঘুলির ফোকর দিয়ে উঁকি মারে। রান্নাঘরের দেওয়ালে ঘুরে বেড়ায়। ঠাকুরের সিংহাসনের পেছনে লুকিয়ে থাকে। তাড়া দিলে দুড়দাড় লুকিয়ে যায় ফাঁকফোকড়ে। আবার সময় বুঝে বেরিয়ে এসে। এহেন গেরিলা অ্যাটাকের মুখে দাঁড়িয়ে পাগল পাগল লাগে ত্রিদিবের।

“তুমি কি এভাবেই সারা জীবন কাটাবে? নিজের বাড়িতে চোরের মতন?”

“নিজের বাড়ি? তোমার মনে হয় আমরা নিজের বাড়িতে আছি? গুনে দেখো কতগুলো টিকটিকি এখন। তাড়াতেও পারছ না, আর সারাক্ষণ মনের মধ্যে কাঁটা বিঁধে আছে। নোংরা হচ্ছে ঘরবাড়ি। গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা ছাড়বে এবার। এরপর সাপের বাসা হবে। দেখো একবার চোখ মেলে, পোকার জ্বালায় অস্থির। ঘরে টেকা যায় না। এভাবে থাকা সম্ভব?”

বন্যা ওর হাতে হাত রাখে, “কালীপুজোর আগে তো পোকা বেশি হয়। দেখো নি? আর টিকটিকি থাকা তো ভাল। ওরা পোকা খায়”।

অস্থির ত্রিদিব দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরে। কেউ বোঝে না কি দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছে সে। সারাদিন সব জানালা বন্ধ করে রাখতে হয় নাহলে রাশি রাশি শ্যামাপোকায় ছেয়ে যায় ঘর। বাড়িতে এখন অনেক টিকটিকি। কখন কোথা থেকে হানা দেবে, কোথায় অ্যাটাক করবে কেউ জানে না। এরকম আদিম পরিবেশে সে বাঁচবে কি করে?

অফিস কামাই হতে শুরু করল। স্বাভাবিক, না ঘুমিয়ে রাতে্র পর রাত জেগে বসে থাকলে শরীর খারাপ হবেই। পেটের গন্ডগোল হল বেশ বাজে রকমের। সেই সংগে বমি এবং মাথাঘোরা। বন্যা অফিস ছুটি নিয়ে দুদিন বাড়িতে থাকল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে খুলে বলল সব কিছু। ডাক্তার বিশেষ পাত্তা দিল না। বলল “ও টু ট্যাবলেট খেয়ে নিন পাঁচদিন। আর বাইরে থেকে কোথাও ঘুরে আসুন দুজনে। এসব চিন্তা মাথা থেকে দেখবেন বেরিয়ে গেছে”।

সমাদ্দার এখনো পেস্ট কন্ট্রোলের লোক পাঠায়নি। প্রায় একমাস হয়ে গেল। ফোন করলেও ধরছে না। বন্যা পাতলা তেলাপিয়ার ঝোল আর ভাত রান্না করে ত্রিদিবকে খাওয়াল। তারপর পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “শোনো না। যদি এতই অসুবিধে হয়, কয়েকদিন বরং হাতিবাগানেই গিয়ে থাকি চলো”।

ত্রিদিব দাঁতে দাঁত চিপল, “না বন্যা। এটা আমাদের বাড়ি। বাইরের কারোর ভয়ে এই বাড়ি ছাড়ব না”।

“কিন্তু কি করবে বলো? তুমিই তো ভয় পাচ্ছ! ওরা তো আর আমাদের মতন নয়!ওরা অন্যরকম। তাড়ালেও যায়না দেখছ তো! এটাই তো ওদের থাকার জায়গা, তাই না?”

“সে দেখা যাবে”।

বন্যা ত্রিদিবের কাঁধে মাথা রাখল। “ভয় পেও না প্লিজ। এটা কেটে যাবে। তুমি আবার আগেরমতন হয়ে যাও। আমার ভাল লাগে না তোমাকে এরকম দেখতে”।

সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও ত্রিদিব অফিস জয়েন করল না। বন্যারও মনে হল কয়েকদিন একটু রেস্টে থাক। সে রান্না করে মশারি টাংগিয়ে দিয়ে অফিস চলে গেল। বলে গেল কাজের মাসি আসলে ত্রিদিব যেন দরজা খুলে দেয়। ত্রিদিব মশারির ভেতর বসে ল্যাপটপ খুলল। একটা বিশেষ পাতা সে স্টাডি করছে কয়েকদিন ধরেই।

দুদিন বাদে রবিবার। বন্যার বাবা মায়ের কাছে যাবার কথা। কিন্তু ত্রিদিব বলল তার আজ ইচ্ছে করছে না। বন্যা চলে যাক।

“শিওর? তুমি পারবে একা থাকতে?”

“মানেটা কী? এই দুদিন তো একাই ছিলাম যখন তুমি অফিস গেলে। অসুবিধে তো হয়নি!”

“আমার আসলে আজ ছুটির দিন তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না”। বন্যা ঘনিষ্ঠ স্বরে বলেছিল।

ত্রিদিব বন্যার হাত ধরল, “আমি ভাল হয়ে যাচ্ছি বন্যা। দেখছ তো আর শরীর খারাপ করছে না। এই দিনটা যদি একটু একা থাকতে ভাল লাগে তো থাকি না!”

“ভয় লাগবে না?”

“এই দুদিন তো লাগেনি। আর অনেকদিন তোমারো পার্ক সার্কাস যাওয়া হয়নি। ওনারা আশা করে আছেন। চলে যাও”।

বন্যা তবু দোনোমোনো করছিল। ত্রিদিব ওর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “আমি কি বাচ্চা ছেলে বন্যা? একটু নিজের মতন থাকলে আমারি ভাল লাগবে”।

বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাবার পর একটু বাদে ত্রিদিব বেরোল। অটো করে ঠাকুরপুকুর বাজারে এসে ট্যাক্সি ধরে বেহালা। একটা দোকানের সন্ধান পেয়েছে নেট ঘেঁটে। ফেরার সময় কেক, চকলেট এবং নকুলদানা কিনল। তারপর বাড়ি ফিরে এসে ঢুকে গেল মশা্রির ভেতর।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধে হল। ধীরে ধীরে নির্জনতা গিলে নিল চারপাশ। অন্ধকার আকাশের গায়ে শুধু ভূতের মতন ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি নিম পাকুড় বাতাবিলেবুর গাছ। ঝিঁঝিঁর ডাক বাড়ছে আস্তে আস্তে। একটা পাতলা কুয়াশার চাদর পেছনের মাঠের ওপর এলিয়ে রয়েছে। সেই চাদর ফুঁড়ে মাথা উঁচু প্লাস্টিক কারখানার চিমনিকে কিরকম অপ্রাকৃত লাগছে। নিচে বিহারী কেয়ারটেকারের ঘর থেকে গুনগুন করে ভজনের গান ভেসে আসছে। পাশের ফ্ল্যাটে হঠাৎ করে টিভির চ্যানেল চেঞ্জ হয়ে স্টার জলসার সিরিয়াল শুরু হয়ে গেল। সামনের আধো অন্ধকার বাখরাহাট রোডের ওপর চায়ের গুমটির গা ঘেঁসে চাদরমুড়ি জবুথবু তাসের আড্ডা বসবে এবার।

ত্রিদিব মশা্রি থেকে বেরোল। আলো জ্বালাল সারা ফ্ল্যাটে। কাঁচি নিয়ে এসে টেবিলে রাখা একটা প্যাকেট থেকে সেলোফেন পেপার বার করে কাটল। সেলোটেপ রাখল হাতের কাছেই। তারপর শোবার ঘরে এসে বন্ধ জানালা খুলে দিল সব। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঝাঁক বেঁধে শ্যামাপোকার দল ঢুকে পড়ল ঘরে। ত্রিদিব কেক চকলেট নকুলদানা এসব গুঁড়ো গুঁড়ো করে ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে রাখল। তারপর একটা চেয়ার টেনে চুপচাপ বসে রইল ঘরের এককোণে।

বেশ অনেকটা সময় কাটল। কিছু ঘটল না। ঘরময় পোকা উড়ে বেড়াচ্ছে। সেই সাথে মশার গুনগুনানি বাড়ছে। ত্রিদিব ঘড়ি দেখল। সাড়ে সাতটা বাজতে চলল প্রায়।

প্রথমে কালো বিশালদেহী বুনো টিকটিকিটা ঢুকল বাথরুম থেকে ঘরে। এদিক ওদিক তাকিয়ে একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সড়াত করে বিদ্যুৎবেগে পিছলে ধেয়ে গেল আলমারির মাথায়, যেখানে অনেক পোকা মিলে গুলতানি পাকিয়েছে। পোকার ঝাঁক উড়ে গেল নিমেষে, শুধু একটা পোকা পারল না। গিলে নিয়ে আবার স্থির হয়ে গেল টিকটিকি।

আস্তে আস্তে অন্যান্য টিকটিকিরা আসা শুরু করল। কেউ বাইরের ঘর থেকে। কেউ জানালা দিয়ে ভেতরে, কেউ ঘুলঘুলি দিয়ে, কেউ বা বেরোল বেডসাইড টেবিলের প্রান্ত থেকে। কেউ ধেয়ে গেল পোকাদের দিকে, কেউ মাটিতে ছড়িয়ে রাখা খাবারের দিকে। নেট ঘেঁটে ত্রিদিব জেনেছে যে লিজার্ড জাতীয় প্রাণি মিষ্টির প্রতি আকৃষ্ট হয় তাড়াতাড়ি।

প্রায় দুই ঘণ্টা স্থির হয়ে বসে ওদের সময় দেবার পর ত্রিদিব উঠে দাঁড়াল। ঘরময় টিকটিকি। সাবধানে মাটিতে পা ফেলে ফেলে জানালার কাছে গেল। কয়েকটা তার পায়ের শব্দে লাফিয়ে উঠে পালাল। লুকিয়ে পড়ল। আবার কয়েকটা একটু দূরে সরে গিয়ে দেখতে লাগল কি হয়। ত্রিদিব গিয়ে জানালা বন্ধ করল। তারপর খাটের ওপর চেয়ার রেখে তাতে উঠে ঘরের একমাত্র ঘুলঘুলিতে সেলোফেন পেপার আটকে দিল সেলোটেপ দিয়ে। নেমে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল আবার ঘরের এককোণে।

আশু বিপদ নেই বুঝে টিকটিকির দল আবার বেরতে শুরু করল। বীরবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল খাদ্যবস্তুর ওপর। ত্রিদিব পা টিপে টিপে বাইরের ঘরে গেল। বেহালা বাজার থেকে কিনে আনা মাস্কটা মুখে পরল। তারপর ওই একই জায়গা থেকে কেনা স্প্রে-র শিশিটা তুলল। বিষাক্ত গ্যাস একটা। সাধারণত কীটনাশক স্প্রে হিসেবে ব্যবহার হয় কিন্তু শিশির গায়ে কড়া করে লিখে দেওয়া আছে যে প্রয়োজনের বেশি ব্যবহার করলে মাটি নষ্ট হয়ে যাবে। ইন্টারনেটের পেজ আরো জানিয়েছে যে প্রথম বিশ্বের দেশগুলি এই বিশেষ প্রোডাক্ট ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছে কারণ এতে শুধু পোকামাকড় বা সাপই মরে না, ইকোলজি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নিয়মিত ব্যবহার করলে মাটি অনুর্বর হয়ে যায়। এমনকি খাদ্যশস্যের সংগে মিশে ক্যান্সার জাতীয় রোগও ঘটাতে পারে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশে এখনো এর বহুল চাহিদা। বেহালা বাজারের কোন দোকানে পাওয়া যাবে সেটাও বলে দিয়েছিল ইন্টারনেট।

স্প্রে হাতে মাস্ক পরা ত্রিদিব ঘরে এসে দাঁড়িয়ে দরজা বন্ধ করল। পিল পিল করে টিকটিকি এসেছে। এত ছিল কোথায়? ঘরের মেঝে ভর্তি টিকটিকি, দেওয়ালেও অনেকগুলো। এমনকি ছাতের মাথাতেও। পা টিপে টিপে গিয়ে বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে লক করে দিল সে। খাদ্যে মশগুল জন্তুগুলো ফিরেও তাকাল না তার দিকে। তাদের ভয় কেটে গেছে। ত্রিদিব দরজার কাছে দাঁড়াল। তারপর বুকভরে নি;শ্বাস নিয়ে স্প্রে করতে শুরু করল প্রাণপণে। করেই যাচ্ছে করেই যাচ্ছে। কোনোদিকে তাকাবার অবসর নেই এখন। যাদের ওপর এই বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করছে তারা কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সেসবও দেখছে না। পাগলের মতন স্প্রে করে যাচ্ছে। গোটা ঘর অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে ধোঁয়ায়। একটা টিকটিকি লাফিয়ে পায়ের পাতায় পড়ল কি? ত্রিদিব লাথাল। যেদিকে খুশি যাক যা হয় হোক।

একসময় সব গ্যাস বেরিয়ে গেল। ফশফশ করে আওয়াজ হচ্ছে। ঘরের আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। চারদিক ঝাপসা। ত্রিদিব দরজা খুলে বেরিয়ে লক করে দিল।

ঘড়িতে এখন পৌনে দশটা বাজে। চারপাশ নিঃঝুম হয়ে আছে। ত্রিদিব বাইরের ঘরে বসে বসে সিগারেট খেল চারখানা। মাথাটা হালকা লাগছে। কিরকম অসাড় হয়ে আছে যেন। কোনো বোধ নেই আর।

রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ আবার মাস্ক পরে পা টিপে টিপে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। দরজা খুলল। ব্যালকনির দরজা এবং জানালাও খুলে দিল। ধোঁয়াটা বেরিয়ে যাক আগে।

কিছুক্ষণ বাদে ঝাপসা ভাবটা কাটল। একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে দৃষ্টি। ত্রিদিব দেখল সার সার টিকটিকি আর পোকার মৃতদেহ পড়ে আছে মাটিতে এবং খাটের ওপর। জানালার কাঁচে ছেতরে আছে দুখানা মৃতদেহ। রক্ত মাংস বেরিয়ে এসেছে। মনে হয় বাঁচার মরীয়া চেষ্টায় কাঁচ ভাংতে চেয়েছিল। ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে শরীর। সাতাশখানা গোনার পর হাল ছেড়ে দিল ত্রিদিব। এত এত টিকটিকি তাকে ঘিরে ধরে ঘাপটি মেরে ছিল এমন সন্ত্রাসের খবর সে জানতেই পারেনি এতদিন।

আর ঠিক তখনি কলিংবেল বেজে উঠল। বন্যা ফিরেছে।

কিন্তু ত্রিদিব নড়তে পারল না। সে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মৃতদেহগুলোর দিকে।

দূরে কোথাও একটা সাপের হিশহিশানির আওয়াজ পাওয়া গেল না? নাকি লেজ আছড়াল? টিকটিক করে যেন ডেকে উঠল কেউ?

জানালার পাশের নিমগাছটা কি আর একটু এগিয়ে আসছে? দেখে মনে হচ্ছে যেন লুটিয়ে পড়বে কাঁচের ওপর।

একঝলক বাতাস আছড়ে পড়ল জানালার গায়ে। কাঁচগুলো কেঁপে উঠল।

কলিংবেল বেজেই চলেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন