বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৬

মোমিনুল আজমের গল্প : ডাক পিয়নের চশমা


মধ্যাহ্নের পরে, বাড়ির পিছনের গাছগুলোর ছায়া যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতো, আমরা হয়তো তখন স্কুল থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসেছি; এমন সময় সালাম ভাই তার গলার স্বর লম্বা করে নাম ধরে বলতেন, . . .আজ তোমার চারটা চিঠি এসেছে।' আমরা, খাওয়া ছেড়ে পড়িমডি করে ছুটে যেতাম বাড়ীর বাইরে। কাঁধে ক্যানভাসের ব্যাগ, হাতে পরিপাটি করে সাজানো একগাদা চিঠি আর মুখভর্তি হাসি নিয়ে বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি।

চিঠির জন্য তখন আমাদের ভিতরে ছটফটানি কিন্তু সালাম ভাই আমাদের চিঠির কথা বেমালুম ভুলে আলাপ জুড়ে দিতেন. . . কেমন আছো? স্কুল থেকে কখন এসেছো? ভাত খেয়েছো? . . এমন সব ছন্নছাডা আলাপ। সে আলাপে আমাদের কোন আগ্রহ নেই, চোখ বারবার চলে যেত সালাম ভাইয়ের হাতভর্তি চিঠির দিকে। আমাদের অস্থিরতা টের পেয়ে মিটিমিটি হেসে তিনি তার আলাপ আরও লম্বা করতেন। আমরা তখন বলতাম-
সালাম ভাই আলাপ রাখেন, আগে চিঠি দেনতো।
আরে রইসো রইসো বলে তিনি চোখের খুব কাছে নিয়ে, ভালো করে ঠিকানা পড়ে একটা একটা করে চিঠি হাতে দিতেন। আমরা অধৈর্য হয়ে বলতাম-
সালাম ভাই, এতো সময় লাগে কেন ঠিকানা পড়তে, চোখে কম দেখেন নাকি?
সালাম ভাই একগাল হাসি দিয়ে বলতেন-
চোখে একদম এখন আর দেখি না। 
চোখে আসলেই কম দেখতেন সালাম ভাই, বয়সের কারনেই হয়তোবা। আমরা পা উঁচু করে সালাম ভাইয়ের হাতের চিঠিগুলোর নাম ঠিকানা পড়ার চেষ্টা করতাম যাতে তার ক্ষীণ দৃষ্টির কারনে কোন চিঠি পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হই। 

সালাম ভাইয়ের চোখে একটা চশমা ছিলো বটে, অনেক আগে কেনা সে চশমা এখন আর তার হ্রষ্য দৃষ্টিকে দীর্ঘ দৃষ্টিতে পরিণত করতে পারে না।

চিঠি দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলতেন- কাল আবার আসবো। 
পরের দিন সালাম ভাই আবার আসতেন। বাড়ীর সামন দিয়ে যাওয়ার সময় সেই পরিচিত সুরে নাম ধরে বলতেন, . . .আজ তোমার কোন চিঠি নাই, আমরা হয়তো বাড়ীর সামনে বেরিয়ে আসতাম কিন্তু সালাম ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা না করে লম্বা পা ফেলে পরবর্তি চিঠি বিলির জন্য চলে যেতেন। 

আমরা যারা কৈশোরে পত্রমিতালী করতাম, এরমাঝেই খুঁজে নিতাম অনাবিল আনন্দ কিংবা যারা লেখালেখি করতাম, ছাপার অক্ষরে নাম দেখার মাঝে জীবনের সার্থকতা খুঁজে ফিরতাম, তাদের কাছে সালাম ভাই ছিলেন প্রিয়ার চেয়ে প্রিয় একটি নাম। ছাপার অক্ষরে নিজের নামসহ মফস্বল শহরের লিটল ম্যাগাজিন আর দেশ বিদেশের পত্রমিতাদের চিঠি নিয়ে সালাম ভাই যখন বাসার সামনে আসতেন আমরা তখন পড়িমড়ি করে ছুটে আসতাম তার  সামনে।  

সালাম ভাই ছিলেন ধবধবে ফর্সা, ছয় ফুটের উপরে লম্বা। মুখটা ছিলো লম্বাটে, হাতের আঙ্গুল গুলো এতো বড় বড় ছিলো যে একহাতের মধ্যে দিনের সবগুলো চিঠি ধরে যেত। তাকে দেখলে আমার কেন জানি রবীন্দ্রনাথের গল্পের কাবুলিওয়ালার কথা মনে হতো। নতুন কেউ তাকে দেখলে তার দৈত্য মার্কা চেহারা দেখে হয়তো ভয় পেয়ে যাবে কিন্তু আমাদের সাথে তার সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো। চিঠির প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ আর সালাম ভাইয়ের ব্যবহার সম্পর্কের এই ভীতটুকু তৈরি করে দিয়েছিলো।

মাঝে মাঝে আমরা স্কুল থেকে সরাসরি চলে যেতাম পোস্ট অফিসে। লোহার রডের জালানা দেয়া যে ঘরে চিঠিপত্র বাছাই করা হতো, সে ঘরে সালাম ভাই টেবিলের উপর ঝুঁকে চিঠিপত্র বাছাই করতেন। আমরা জানালায় দাঁড়িয়ে সালাম ভাইয়ের মনযোগ আকর্ষনের চেষ্টা করতাম। পাশে থেকে কেউ একজন হয়তো আমাদের কথা বলতেন। তিনি জানালার কাছে এসে অপেক্ষা করতে বলে আবার চলে যেতেন। কিছুক্ষণ পর হাতে চিঠি নিয়ে আসতেন। কাজ শেষ হলে চিঠি নিয়ে মাঝে মাঝে বাইরেও আসতেন, রাস্তার পাশের দোকান থেকে চা কিনে খাওয়াতেন। আমরা যতোই না না করি না কেন, সালাম ভাই তা শুনতেন না। মাঝে মাঝে টোষ্ট বিস্কুট দিতেন, চায়ের মধ্যে ভিজিয়ে খাওয়ার জন্য।

চিঠি বিলি করতে বের হয়ে অবিরাম হেঁটে চলতেন সালাম ভাই, মাঝে মাঝেই ক্লান্ত হয়ে আসতেন। তখন বাইরের ঘরের বারান্দায় রাখা একটা চেয়ারের উপর বসে ক্ষীণ স্বরে ডাকতেন। চৈত্রের রোদ এবং ভ্যাপসা গরমে সালাম ভাইয়ে ফর্সা মুখ তখন লাল হয়ে উঠেছে, ফোঁটা ফোঁটা ঘাম তার সমস্ত মুখ জুড়ে । তিনি তখন আমাদের দেখে বললেন- এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবা। আমরা দৌড়ে ভিতরে গিয়ে কাচের গ্লাস পরিস্কার করে, টিউব অয়েলের পানি কয়েকচাপ ফেলে দিয়ে ঠান্ডা এক গ্লাস পানি এনে তার হাতে দিতাম। তখন কৃতজ্ঞতায় তার চোখ চিকচিক করতো। এমনি একদিন তার হাতে পানির গ্লাস দিতে গিয়ে ফিক করে হেসে উঠেছিলাম। সালাম ভাই হয়তো আমার হাসির কারন বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি চোখ থেকে চশমাটা খুলে আমাকে দেখিয়ে বললেন-
কী করবো বলো? ছোট ছেলেটা গত সপ্তাহে ভেঙ্গে ফেললো, এখনি তো আর কিনতে পারবো না। আর সবকিছু তো ঠিকই আছে, শুধু ডাটাটা ভেঙ্গে গিয়েছিলো, তাই জোড়া দিয়ে নিলাম। 
আমরাও দেখলাম চশমার ভাঙ্গা ডাটাটার সাথে বাঁশের একটা চিকন পাত মিহি সুতো দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে।
-তা সালাম ভাই, বাঁশের পাতটা ভিতরের দিকে দিতেন, দেখা যেতো না।
-কাজ তো চলে যায়, চশমা তো আর ফ্যাশন করার জিনিস না, বলেই তিনি হাঁটা দিলেন। 

আমি সরলতায় মুগ্ধ হয়ে তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ভাবলাম, সালাম ভাইকে একটা চশমা কিনে দিলে কেমন হয়। কিন্তু সেতো অনেক টাকার ঝামেলা। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে তা করতে গেলে কয়েক বছর লেগে যাবে। উপায় একটা আছে, স্কলারশীপের টাকাটা আছে, প্রথম ছয়মাসে পাওয়া গেছে একশ আশি টাকা, পোষ্ট অফিসেই রাখা আছে টাকাটা। কিন্তু সেটা করতে গেলেও আব্বার অনুমতি নেয়া দরকার। অথবা আব্বাকে বলা যেতে পারে। কিন্তু সেটা বলা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে তাও ভাবি। আমরা অনেকগুলো ভাই পডাশুনা করি, আব্বার চাকুরির বেতন দিয়ে কুলিয়ে উঠতে যে পারেন না তা মাঝে মাঝেই টের পাই । মাসের শেষের দিনগুলোতে তার মেজাজ এতো খারাপ থাকে যে সে সময়ে তাকে আমরা খাতা পেন্সিল কেনার কথা বলতেও ভয় পাই। স্কলারশীপের টাকা খরচ করার সে অনুমতি আর নেওয়া হয়না। সালাম ভাইয়ের সে চশমা দেখতে দেখতে আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

এর মাঝে একদিন সালাম ভাইয়ের চির পরিচিত ডাক শুনে বাড়ীর বাইরে বের হয়ে এলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন-তোমার আব্বাকে ডাকো।
আমি একটু অবাকই হলাম। আব্বার কোন চিঠি আসে না। সালাম ভাই আব্বাকে চেনেন, এমনটি কখনও মনে হয় নি। তবে কী আমরা কোন অন্যায় করেছি, যার নালিশ তিনি আব্বার কাছে দিতে চান।
অনিচ্ছা সত্বেও আব্বাকে ডাকতে হলো। সালাম ভাই তার খাকি রঙের ব্যাগের ভিতর থেকে ছোট একটা পার্সেল বের করলেন। কাঠের সে পার্সেল দেখেই আব্বা বুঝলেন, এর ভিতর তাঁর চশমা আছে। দু সপ্তাহ আগে তিনি এর জন্য মানি অর্ডার করে টাকা পাঠিয়েছিলেন।

বারান্দায় বসেই সে পার্সেল খোলার ব্যবস্থা করা হলো। সালাম ভাই তার ব্যাগ ও চিঠিপত্র এক কোণায় রেখে আব্বাকে পার্সেল খোলায় সাহায্য করতে লাগলেন। পার্সেল খোলার পর সোনালী ফ্রেমের চশমা দেখে তিনি উচ্ছাস প্রকাশ করে বললেন-বাহ্ ! কী সুন্দর। আব্বা চশমা হাতে নেয়ার আগেই তিনি তা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকলেন। চোখে দিয়ে বললেন- কী পরিস্কার, আপনার আর আমার চোখের পাওয়ার মনে হয় একই। তার অনুরোধে ভিতর থেকে আয়না নিয়ে আসা হলো। চশমা চোখে দিয়ে আয়নায় তা আবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকলেন। এ নিয়ে তার কৌতুহলের সীমা নেই। আব্বাকে প্রশ্নে প্রশ্নে এর তথ্য উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন -
-এটি আনতে কত পড়লো চাচা?
-কেন, আপনি আনবেন নাকি?
-শখ তো ছিলো।
-আনেন, সব তো আপনার পোষ্ট অফিসের মাধ্যমেই হয়।
আব্বা তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু বোঝালেন।  আমরা পাশে দাঁড়িয়ে সালাম ভাইয়ের অতি উৎসাহী কান্ড কারখানা দেখতে থাকলাম। 

সালাম ভাইয়ের অর্থনৈতিক অবস্থা যে কতো খারাপ তা বুঝেছিলাম তার বাডীতে গিয়ে। তার বাডীতে অবশ্য যাওয়ার কথা না আমাদের। একদিন পোষ্ট অফিসে গিয়েছিলাম চিঠির খোঁজে, তার আগে কয়েকদিন চিঠি নিয়ে আসেন নি। পোষ্ট অফিসে গিয়ে শুনলাম সালাম ভাই অসুস্থ্য । গত এক সপ্তাহ তিনি অফিসে নাই। তার অসুস্থতার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তার বাসায় যাওয়া দরকার কিন্তু জিজ্ঞেস করলে কেউ তার বাসার ঠিকানা বলতে পারলো না। শুধু কেউ একজন বললো-ভি এইড রোডের শেষ মাথার গলিতে একটা বাসায় ভাড়া থাকেন সালাম ভাই। সাথে সাইকেল ছিলো, দেরি না করে রওনা দিলাম। একটা ধারণা ছিলো, পোষ্ট অফিসে যেহেতু চাকুরি করেন তাই জিজ্ঞেস করে তার বাড়ী বের করা কঠিন হবে না।
ঘটনাও তাই, ভি এইড রোডের শেষ মাথায় এসে একটা মুদি দোকানে জিজ্ঞেস করতেই একজন দেখিয়ে দিলেন সালাম ভাইয়ের বাড়ী । 
বাড়ীর সামনে গিয়ে সাইকেলের বেল বাজাতেই আমাদের বয়সি একটি ছেলে বেরিয়ে এলো। গায়ের  রং আর লিকলিকে তালগাছ গড়নের চেহারা দেখে মনে হলো এটি সালাম ভাইয়ের ছেলে। আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য টুকটাক আলাপ করছি, এমন সময় বাড়ীর ভিতর থেকে সালাম ভাই সেই চির পরিচিত কিন্তু ক্ষীণ কন্ঠে জানতে চাইলেন -বাইরে কে?
ছেলেটি সে কথা শুনে দৌড়ে গেল বাড়ীর ভিতর। খানিক পর এসে বললো, আব্বা অসুস্থ্য , ভেতরে আসেন।
ছেলেটি বড়  করে টিনের গেটটা খুলে দিলো যাতে আমি সাইকেলটিরও ঢোকাতে পারি।

গত দু সপ্তাহ ধরে জন্ডিসে ভুগছেন সালাম ভাই, এখন ভালোর দিকে। এ দুসপ্তাহে শরীর অনেক ভেঙ্গে গেছে। চোখ দুটো আরো গর্তে ঢুকে গেছে। চোয়ালের হাড়গুলো হঠাৎ করেই বেরিয়ে পডেছে। খটখটে একটি চৌকির উপর বসে ছিলেন তিনি। শুধু একটি কাথা বিছানো সে চৌকি থেকে আমাকে দেখে নামতে গিয়েছিলেন। বুঝলাম নামতে তার কষ্ট হচ্ছে, দৌড়ে এসে তাকে ধরলাম। আমি আসাতে তিনি যে খুশি হয়েছেন তার চোখ দেখেই বোঝা গেল। পাশের একটা টেবিলের উপর দু একটা বাটি ছডিয়ে ছিটিয়ে আছে, একটা বড় বোতলে কালো জাতীয় তরল, বুঝলাম আখের রস। তা খেয়ে তিনি জন্ডিস তাড়ানোর চেষ্টা করছেন। বোতলের চারপাশে মাছি ভনভন করছে।

আমাকে দেখে তিনচারটি ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ঘরে এসে ভিড করছে। এরা কারা জিজ্ঞেস করতেই সালাম ভাই বললেন তার ছেলেমেয়ে। একজন মহিলাকে দেখলাম দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। সালাম ভাই যে বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন তা বোঝা যায়, প্রথমেই যাকে গেটে দেখেছি সেটি সালাম ভাইয়ের বড় ছেলে। দরজায় দাঁড়ানো মহিলাকে যখন পরিচয় করিয়ে দিলেন 'তোমার ভাবী' তখন আমার মনে হলো ইনি আমার ভাবী না হয়ে সালাম ভাইয়ের বড় মেয়ে হলেই মানাতো ভালো।

মোটামুটি বড় এই একটি মাত্র ঘরেই সালাম ভাইয়ের পুরো সংসার। ঘরের আরেক কোনায় আর একটি চৌকি আর একটি আলনা ছাড়া আর কোন আসবাব নেই। সালাম ভাইয়ের সংসারের দৈন্য দশা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল আর এই ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলোই বা কবে বড় হবে, সে চিন্তাও মাথার মধ্যে ঢুকে গেল। সালাম ভাইয়ের চাকুরি আর বেশিদিন আছে বলে মনে হয় না। চলে আসার সময় সালাম ভাইয়ের পুরো পরিবার গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিলো।

যেমনটি মাঝে মাঝেই যাই, সেদিনও স্কুল শেষে গেলাম পোষ্ট অফিসে। যে রুমে পোষ্টম্যানরা চিঠি বাছাই করতো, জানালা দিয়ে সে রুমটা দেখে মনে হলো কিছুক্ষণ আগে এখানে একটি অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। মাঝখানে গোল টেবিলটা যার উপর চিঠিপত্র বাছাই করা হতো সেটি পিছনের দিকে এককোনে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মাঝখানে তখনও কিছু চেয়ার ও টুল ছড়ানো ছিটানো আছে, সামনের দিকে একটি টেবিলের পিছনে দুটি হাতল ওয়ালা চেয়ার, তার উপর তোয়ালে বিছানো। বুঝতে অসুবিধা হয়না এ চেয়ার দুটোতে অনুষ্ঠানের অতিথিরা বসেছিলেন।
আমি এসেছি দেখে কেউ একজন হয়তো সালাম ভাইকে খবর দিয়েছিলেন। খবর পেয়ে সালাম ভাই পোষ্ট অফিসের ভিতর থেকে বাইরে এসে আমাকে দেখে বললেন- স-বু-জ, এ অফিসে আজ আমার শেষ দিন। ওরা আজ আমারে বিদায় দিয়ে দিলো! আমিও দেখলাম 'ও বিদায়ী বন্ধু' লেখা বাঁধাই করা একটা মানপত্র তিনি বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। বিদায় উপলক্ষে সালাম ভাই মনে হয় একটু সাজগোজ করেছেন। নতুন একটি সুতির পাজ্ঞাবি পড়েছেন , লম্বার কারনে তা হাঁটুর উপরে উঠে এসেছে। মাথায় অল্প কিছু চুল অবশিষ্ট আছে সেগুলোকে তিনি তেল দিয়ে তালুর সাথে বসিয়ে দিয়েছেন, চোখে যে গাঢ করে সুরমা দিয়েছেন তা দুর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায়।

এ সময়ে তাকে দেখে আমার চোখে মনে হয় জল চলে এলো। বিষয়টি সালাম ভাই বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি কাছে এসে আমাকে জডিয়ে ধরলেন। আমার মাথা তার বুকের খাঁচার কাছে। উপর থেকে দুফোঁটা জল পড়লো আমার কব্জিতে। এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, একটু অপেক্ষা করো, আমি ভেতর থেকে আসছি।

এ সুয়োগে আমিও গেলাম পোষ্ট অফিস কাউন্টারে। পাশ বই থেকে টাকা উঠানোর ফর্ম পুরণ করে জমা দিলাম। একাউন্টেন্ট যখন আমার হাতে টাকা গুণে গুণে দিচ্ছিলো, তখন পিছনে এসে দাডিয়েছিলেন সালাম ভাই। তার হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। বিদায় উপলক্ষে সবাইকে যে মিষ্টির প্যাকেট দেয়া হয়েছে তারই একটি প্যাকেট এনেছেন আমার জন্যে। মিষ্টির প্যাকেটটি হাতে নিয়ে বললাম- সালাম ভাই চলেন, আজ আমি আপনাকে ডাক্তার দেখিয়ে চশমা বানিয়ে দিবো।

কথা শুনে আবার আবেগ প্রবণ হয়ে পড়লেন সালাম ভাই। কাছে এসে জডিয়ে ধরে বললেন- আরে বোকা, আমার আর চশমার দরকার আছে নাকি! আজ থেকে আমাকে আর কোনকিছু পড়তে হবে না, চিঠির উপর ঠিকানা দেখতে হবে না, আর চলাফেরার যে সমস্যা সেটা আমি চালিয়ে নেবো সাবধানে। অনেক জোডাজুডি করেও তাকে রাজি করানো গেল না। শেষের দিকে তিনি আমার অভিভাবকের আসন দখল করে বললেন- এতোগুলো টাকা ওঠানো তোমার ঠিক হয় নাই, রেখে দাও, পরে কাজে লাগবে। আমি মন খারাপ করে উঠানো টাকাগুলো আবার জমা দিয়ে বাড়ী ফিরে এলাম।

গল্পের এ পর্যায়ে এসে চমক সৃষ্টির জন্য কোন দুর্ঘটনায় সালাম ভাইয়ের মৃত্য ডেকে আনা যায় কিংবা কঠিন কোন অসুখে ফেলে দিয়ে স্ত্রী ছেলেমেয়েসহ তার অসহায় অবস্থা তুলে ধরা যায়। ঘটনার ঘণঘটার কারনে তখন গল্পটিকে আষাঢ়ে গল্প মনে হতে পারে, গল্পের মান নিচের দিকে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সালাম ভাইকে নিয়ে এ যাবত যা বলা হয়েছে তার পুরোটাই সত্যি, গল্পের চরিত্র চিত্রণ বা পরিবেশ পরিস্থিতিতে একটু রং লাগানো ছাড়া বানানো কোন বিষয়ের অবতারণা করা হয় নি। তবে এখন যা হবে সেটি গল্পের মান ক্ষুন্নকারী ঘটনার চেয়েও বেশি, অবাস্তব বলেও অনেকে ভাবতে পারেন কিন্তু সালাম ভাইয়ের ক্ষেত্রে সত্যিই তা ঘটেছিলো।

চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর সালাম ভাইয়ের দৃষ্টিশক্তি আরো খারাপ হয়ে যায়। এতোদিন চাকুরির প্রয়োজনেই তিনি জোর করে চিঠির উপরের ঠিকানা, ফাইলপত্র পড়তেন। একাজ করতে গিয়ে তার চোখের ব্যায়াম হতো ফলে দৃষ্টি শক্তি খুব একটা খারাপের পর্যায়ে যায় নি। কিন্তু চাকুরি ছাড়ার পর চোখের ব্যায়াম বলতে যা বোঝায় তিনি আর তা করেন নি, করার প্রয়োজন বোধও করেন নি। ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সালাম ভাইয়ের চোখের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়, তিনি যা কিছু দেখতেন সবই ঝাপসা। এ অবস্থায় তার বাডীতে বসে থাকারও উপায় ছিলো না। পেনশনের কাগজপত্র তৈরি করতে তাকে প্রায়ই পোষ্ট অফিসে যেতে হতো, নাবালক ছেলেমেয়েদের উপর বাজারের দায়িত্ব না দিয়ে তিনি নিজেই তা করতেন। 

তার চোখের যখন এ অবস্থা , তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, পেনশনের টাকা পেলে একটা চশমা কিনবেন, এ কথাটি সালাম ভাই বলেছিলেন তার বৌকে। কিন্তু তার আগেই ঘটনা ঘটে যায়। তিনি গিয়েছিলেন বাজারে। দুহাতে ব্যাগ নিয়ে বাজারের মোড়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। তিনি মটর সাইকেলের হর্ণ শুনেছিলেন। চোখে কিছু না দেখার কারনে একবার ডানে একবার বামে করতে গিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ন্ত্রন হারিয়ে এসে পড়ে তার উপরে। তৎক্ষনাৎ তিনি সংজ্ঞা হারান। আশেপাশের যারা এ ঘটনা দেখেছে তারা মোটর সাইকেল চালকের দোষ দিবে এমন কোন যুক্তিসংগত কারন খুঁজে পায় নি। মোটর সাইকেল আরোহীকে আটকে রাখার চেয়ে তারা রিক্সায় করে সালাম ভাইকে বাড়ী পৌঁছে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।

বাড়ী যাওয়ার পথেই সালাম ভাইয়ের জ্ঞান ফেরে। শরীরের কোথাও ক্ষতের কোন চিহ্ন নেই। কিন্তু ঝিম মেরে রিক্সায় বসে থাকা সালাম ভাইয়ের মুখে কোন কথাও নেই। লোকজন এবং পরিবারের সবাই তাকে এ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো, কিন্তু সালাম ভাই আকার ইঙ্গিতে নিষেধ করেছিলেন। হয়তো খরচের কথা চিন্তা করেই।

এরপরে বাসায় ছিলেন দুদিন। সারাটা সময় তিনি ডিমে তা দেয়া মুরগির মতো চুপচাপ বিছানায় শুয়ে বসে থাকতেন। মাঝে মাঝে বুকের অসহ্য ব্যথায় কুঁকডে যেতেন। এভাবে থাকতে থাকতে অভাবী সংসারের উপর খরচের বোঝা না চাপিয়ে, অসুস্থ্য রুগীর সেবা করার হাত থেকে সকলকে রেহাই দিয়ে দুর্ঘটনার পরে তৃতীয় রাত্রে মারা গেলেন সালাম ভাই। সালাম ভাই এমন কোন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন না যে তার মৃত্যুর খবর মাইকে সারা শহর জুড়ে প্রচার করা হবে কিংবা নামাজের জানাজা কোথায় পড়ানো হবে তা শহরবাসীকে জানানো হবে। যে কারনে অনেকেই সালাম ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানতে পারে নি।

আমরাও সালাম ভাইয়ের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। বাসায় একজন চিঠি দিয়ে যায় বটে তবে তিনি সালাম ভাইয়ের মতো নাম ধরে ডাকেন না বা আমাদের বাড়ীর ভিতর থেকে বের হওয়ার অপেক্ষা করেন না। চিঠি থাকলে দরজার নীচ দিয়ে রেখে যান। পত্রমিতালীর নেশাটা তখন কমে এসেছে, পরীক্ষার চাপে লেখালেখিও বন্ধ। ফলে চিঠি পাওয়ার আগ্রহটাও নেই। কালে ভদ্রে পোষ্ট অফিসে যাই। এমনি একদিন চিঠি বাছাই ঘরে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েছি। পরিচিত একজন চিনতে পেরে সালাম ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটা দিলো। সালাম ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে হা হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। কোন কিছু না ভেবেই সাইকেল নিয়ে চলে যাই তার বাড়ীর দিকে। গেটে বেল বাজাতেই বেরিয়ে আসলেন সালাম ভাইয়ের স্ত্রী ও নাবালক কয়েকটি ছেলে মেয়ে। চিনতে পেরে ঘরের ভিতর নিয়ে গেলেন। সবকিছু শুনে নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হতে লাগলো। শেষ যেদিন পোষ্ট অফিসে সালাম ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো, সেদিন যদি জোর করে চশমাটা কিনে দিতাম তাহলে হয়তো তার এই অকাল মৃত্যু হতো না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন