বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

রিমি মুৎসুদ্দি'র গল্প : দেশদ্রোহী


পেট্রোলের কটূ গন্ধে দময়ন্তীর গা গুলিয়ে উঠছিল। তার থেকেও বেশী অস্বস্তি হচ্ছিল, যখন এস পি শিভম কাল্লুরী ঠোঁটে একটা প্লাস্টিক হাসি ঝুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো ম্যাডাম?” দময়ন্তী ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়লেও চোয়াল শক্ত করে উত্তর দেয়, “আপনারা যখন আছেন তখন অসুবিধা কি করে হবে?” কাল্লুরী একটা হাত কোমরের বেল্টে আরেকটা হাতে তার ইউনিফর্মে সরকারী আগ্নেয়াস্ত্র রাখার খাপে রেখে খুব নির্বিকারভাবেই বলে, “হ্যাঁ, ম্যাডাম, এটা আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আমরা আছি।
এই কথাটা সবসময়ে মাথায় রাখবেন। আমরাই মানে, সরকারই এখানে শেষ কথা। এখানে আর কেউ কোন কথা বলে না।” কাল্লুরী আর কিছু বলে না। তার ঠাণ্ডা চোখের দৃষ্টিতে কোদেনার থানার ওসি সুরিন্দর কর্মা বুঝতে পারে এরপর তার ডিউটি। সে দময়ন্তীর একেবারে পাশে চলে এসে বলে, “ম্যাডাম এবার যে এই জায়গা ছেড়ে আপনাদের চলে যেতে হবে। এই সব ঘর-বাড়ি এখুনি সিজ করে দেওয়া হবে। আমাদের পোস্টিং-ও থাকবে। আপনার কিছু জানার থাকলে থানায় আসুন। কথা হবে।” ইঙ্গিত স্পষ্ট। দময়ন্তী চলে আসার আগে প্রীতমকে ছবি তোলার জন্য ইশারা করে। প্রীতম ক্যামেরার শাটার অন করতে গেলে সুরিন্দার তৎক্ষণাৎ বাঁধা দেয়। “আরে এখন কি ছবি তুলছেন? আগে লাশগুলো উদ্ধার হোক। আমরাই প্রেস-কনফারেন্স ডাকব। দেশদ্রোহীদের নিকেশ করেছি। ছবি নিশ্চয়ই তুলবেন।”
দময়ন্তী জানে কিছু করার নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বলে বলীয়ানদের কাছে হার মানতেই হবে। এই ভরদুপুরে গোটা দেশ বুঝি পরম নিশ্চিন্তে ভাতঘুমের আমেজে মজে আছে। আর এই টারমেটলার জঙ্গলে আম আর তেতুঁল গাছে ঘেরা কুঁড়েঘরগুলো এখন দাউদাউ করে জ্বলছে। এরই ভেতর জ্বলছে আদিম অরণ্যের ভূমিপুত্রেরা। এরা সবাই দেশদ্রোহী, ক্রিমিন্যাল। এদের অপরাধ এরা অরণ্যের ভূমিপুত্র। এই পাহাড়, জঙ্গল ছেড়ে এদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই। অথচ এই পাহাড়, জঙ্গল তো রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি। রাষ্ট্র মনে করলেই এই সম্পত্তি বেঁচে দিতে পারে বহুজাতিক সংস্থার কাছে। আর এই বেঁচা-কেনার প্রধান বাঁধাই হল অরণ্যের একান্ত আপন এই ভূমিপুত্রেরা। তাই রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য এদের নিকেশ করা অত্যন্ত জরুরী।
দময়ন্তী সার্কিট হাউসে ফিরে গেছে। কাল এই সময়ে সুনীতা হেমব্রেম এসেছিল। সঙ্গে এনেছিল গাছের কুল। সুনীতার সঙ্গে মুনিয়া নামে একটা বছর পনেরোর মেয়ে ছিল। সুনীতা স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক। অবশ্য ছিল। এখন সুনীতা রাষ্ট্রের চোখে এক সন্দেহভাজন। সুনীতার গল্প তো শুধু সারা দেশই নয়, দেশের বাইরেও বিভিন্ন মানাবাধিকার কনফারেন্সে আলোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্রে সুনীতার ন্যায় বিচারের দাবীতে অনেক তাবড় পণ্ডিতগণ, মানাবাধিকার কর্মী গলা ফাটান। তবু সুনীতা এখনও পর্যন্ত বিচার পায় নি। সে নিজেই এখনও বিচারাধীন, জামিনে মুক্ত। সুনীতা ওর বাবার কথা বলছিল। দুবছর আগে এই পলাশের মাসেই সুনীতার বাবা খুব ভোরে গিয়েছিল মহুয়া কুড়োতে। আর ফিরল না। বুকে দুটো গুলি। একেবারে সামনে থেকে। পালাতেও পারে নি। দুদিন আগেই জোতদার অভদোশ সাউ-এর উপর হামলা হয়েছিল। পুলিশের কাছে খবর ছিল। শেষ মুহুর্তে বেঁচে যায় জোতদার। গরুর দড়িতে পাছমোড়া করে নাকি বাঁধা ছিল। থানায় এফ আই আর করে পরদিন থানার জিপে করেই গ্রামে ঢোকে জোতদার। চব্বিশ ঘণ্টা পুলিশ প্রোটেকশান। যারা হামলা করল তাদের টিকি ধরতে না পারলেও টিমাউরম, মোরপল্লিতে প্রায় ২০০ ঘর আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। সুনীতারা তবু টিকে ছিল। প্রত্যেকদিনই তো ওদের নতুন লড়াই। কখনও পুলিশ সন্দেহ করে। কখনও মাওবাদীরা। মাওবাদীদের কথায় সুনীতা হেসে বলেছিল, “জানেন দিদি আমাদের ঘরে তো পেটে ভাতই নেই, তো লেখাপড়া? তবে আমার বাবার খুব সখ ছিল আমি লেখাপড়া শিখি। তাই তো বাবা আমাকে জগদ্দলের সরকারী স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। কলেজও ওখান থেকেই করি।” একটু থেমে সে আবার বলে, “প্রথম যেদিন কয়েকটা খাঁকি পোশাকের লোকজন গ্রামে এল, আমরা ভাবলাম মিলিট্যারির লোকজন। একজন কমাণ্ড গোছের লোক মাইকে সবাইকে একজায়গায় জড়ো হতে বলে। বলে, তোদের পড়ালেখা নেই, তাই তোরা তোদের অধিকার সম্বন্ধে কিছুই জানিস না। তোদের জানতে হবে। পড়তে হবে। বসল ক্যাম্প। ক্যাম্প বলতে নিমগাছের তলায় একটা খুঁটিতে একজনের ছবি টাঙান হল। মাও সে তুং। এরপর শুরু হল ক্লাস।” বাবা বলেছিল “ঠিক হচ্ছে না ব্যাপারখান। এরপরে পুলিশ এলে এদের টিকিও ধরতে পারবে না। আমরা মারা পড়ব। আমাদের গ্রাম জ্বলবে।” “ওদের মধ্যে একজন পড়াত, শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, গেরিলা যুদ্ধ। আর বাকি পাঁচ-ছয়জন হাতে বন্দুক নিয়ে কড়া চোখে পাহারা দিত। দুটো বন্দুক সবসময়ে গ্রামবাসীদের উপরই তাক করা থাকত। বিশ্বাস করুন, বাবা কিন্তু পুলিশকে কোন খবরই দেয় নি। অভোদশ জোতদার উঁচুজাত। নীচু জাত ডোম, চাঁড়াল এঁদেরকে সহ্য করতে পারে না। দাও এদের জল বন্ধ করে। খরার সময়ে শুকিয়ে মরুক। আবার লোহার খনিতে শ্রমিকের কাজে এই কালো মানুষগুলোকেই দরকার। শালারা খেতে না পেলে কি হবে, গায়ে খুব জোর। খাটতে পারে ভুতের মত। মাইনেও বেশী দিতে হবে না। সেবার দশেরাতে মাইনেই হল না শ্রমিকদের। ওদিকে বন্দুকধারী শিক্ষকরা সমানে বোঝাচ্ছে, নিজের নায্য অধিকার না দিলে কেড়ে নাও। দশেরার ঠিক দুদিন পরেই হামলা হয় জোতদারের উপর। কয়েকজন হামলাকারী পালিয়ে গেলেও দুজন মারা যায় পুলিশের গুলিতে। তারপরই হুমকি আসে গ্রামে, যে হারামী পুলিশকে খবর দিয়েছে তার নিস্তার নেই।” সুনীতার গলা ধরে এসেছে। শুধু বাবার কথা বলতেই সুনীতার গলা ধরে আসছে। এরপর সুনীতার নিজের সাথে যা হয়েছে সেই কথা বলতে তো শুধু সুনীতার নয়, সারা দেশের গলা ধরে আসবে। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাবে। “বাবা যেমন ওদের সমর্থন করত না, সেরকমই গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, আমাদের মেয়েদের ইজ্জতের দাম না দেওয়া পুলিশকেও ঘৃণা করত। তবু বাবাকে গুলি খেয়ে মরতে হল। বাবাই নাকি সেই নিমকহারাম, হারামি। যে কি না পুলিশকে খবর দিয়েছিল, জোতদারের উপর হামলা হতে পারে।” “আর পুলিশ খনির মালিক বড়লোক জোতদারকে তো বাঁচাল। কিন্তু আমাদের উপর করুণা বা সহানুভূতির ছিটেফোঁটাও এসে পড়ল না। উল্টে গতবছর তো আমার সাথে কি হয়েছিল তা আপনি জানেন।” হ্যাঁ, জানে দময়ন্তী। শুধু সে ই নয়, গোটা বিশ্বই জানে কি হয়েছিল সুনীতার সাথে।
হেমাল আর বদ্রু এসেই তাড়া দিল সুনীতাকে। “দিদি পরব তো শুরু হয়ে গেছে। লোকজনও সব জড় হয়েছে। চলুন। এখন আপনি আর ম্যাডাম যদি গাঁয়ের লোকেদের সাথে কথা বলতে চান, তো এটাই উপযুক্ত সময়।” হেমাল, বদ্রু- এরা জগদ্দলের ছেলে। কলেজে পড়ে। আদিবাসী উন্নয়নের কাজে নিযুক্ত ‘চেতনা’ বলে একটা এনজিও-র কর্মী। ওরা চায় বসন্ত পূর্ণিমার এই রাতমেলায় জড়ো হওয়া গ্রামবাসীদের সাথে দময়ন্তী যেন কথা বলে। দময়ন্তী দিল্লি থেকে এসেছে বলেই ওদের একটু বেশী ভরসা। ওদের রোজকার জীবনযন্ত্রণার আখ্যান যেন দময়ন্তীর মাধ্যমে দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছায়। এর আগেও দিল্লি থেকে দুজন অধ্যাপক এসেছিলেন। তার একবছরের মধ্যেই ‘সালওয়া জুড়ুম’ আইন করে বন্ধ হয়ে যায়। তবে মাওবাদী সন্দেহে পুলিশের এই জুড়ুমের কারণে বেশ কয়েকটা গ্রাম ও মানুষ একেবারে নেই হয়ে তবে এই আইন বন্ধ হয়েছে।
দময়ন্তী গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলবে। তবে সে জানে না এদের আওয়াজ দিল্লির কাছে বা গোটাদেশের কাছে সে আদৌ পৌঁছে দিতে পারবে কি না? সম্প্রতি রাষ্ট্রনেতারা সংবাদ মাধ্যমকে সংযত হতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই সংযত সংবাদ প্রকাশের চাপে পড়ে সে আদৌ এই মানুষগুলোর কথা দিল্লি তথা সারা দেশে পৌঁছে দিতে পারবে কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান।
রাতমেলায় ভীড় জমেছে ভালই। যদিও জীবনে প্রতিপদে এখানে ভয়। কখনও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের, কখনও আবার রাষ্ট্র-বিরোধী সন্ত্রাসের। হাঁড়িকাঠে এদের গলা নামানোই আছে। তবু উৎসব, পরবে এরা মন খুলে আনন্দ করে। পাহাড়, অরণ্যের খুব কাছে বলেই বোধহয় এক-সমুদ্দুর দুঃখের মাঝেও এরা খুঁজে পায় আনন্দের রসদ। রুখা মাটির দেশ এই পাহাড়-জঙ্গলে জীবন বয়ে চলেছে সেই কোন আদিম কাল থেকেই। মানুষ হয়ত কখনও পরম নিশ্চিন্তে এই অরণ্যে গাছেদের ছায়ায় ঘর বেঁধেছিল। ঠিক কবে থেকে যে এখানে বসত শুরু হয়েছিল সে কথা কেউ জানে না। উৎসবে আনন্দরত মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে এইসবই ভাবছিল দময়ন্তী এতক্ষনধরে। এর মধ্যেই একথোকা আগুনরঙা পলাশ ফুল হাতে গুঁজে দিল মুনিয়া। চোখে মুখে খুশীর ঝিলিক। খোঁপায় গুজেছে পলাশের ফুল আর পরনে সস্তা জংলা শাড়ি। মুনিয়ার বয়সী বা তার থেকে আরেকটু বয়সে বড় মেয়েরা সবাই প্রায় একই ধরণের সাজে সেজেছে। এঁদের আজ দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না যে কত অসহায়তা, ভয়াবহ স্মৃতি, ঘর হারানোর, ইজ্জত হারানোর, প্রিয়জনদের হারানোর দুশ্চিন্তা নিয়ে এরা প্রতিদিন বেঁচে থাকে। গ্রামবাসীদের সাথে কথা হয় দময়ন্তীর। তাদের কথা মন দিয়ে শোনে সে। মুনিয়া আর সুনীতা সবসময়ে তার পাশেই ছিল। ফিরে যাওয়ার পথে সুনীতা বলে, “দিদি আপনি তো কাঁকের যাবেন। মুনিয়াকে একটু টারমেটলায় নামিয়ে দিয়ে যান। ওর বাবার পা ভেঙে গেছে। তাই মেলায় আসে নি। তার উপর ও আজ সারাদিনই প্রায় আমার সাথে। এখন ঘরে গিয়ে ঘরের কাজ সারবে। বাবাকে খেতে দেবে। কাল সকালে আবার মহুয়া কুড়োতে যাবে।” দময়ন্তী তৎক্ষণাৎ রাজী হয়ে যায়। টারমেটলায় মুনিয়াকে নামিয়ে দিয়ে গাড়ী কিছুটা এগোতেই ঘ্যাচাং করে ব্রেক কষে গাড়ী দাঁড় করায় বধুয়া। রায়পুর থেকে যে গাড়ী ভাড়া করে দময়ন্তী এখানে এসেছে সেই গাড়ীর ড্রাইভার বধুয়া। “কি হল বধুয়া, এখানে থামলে কেন?” “ম্যাডাম, মেয়েটাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে এলেই ভাল হত।” “কেন এরকম মনে হচ্ছে তোমার? আর ওরা কি এখানে রোজ গাড়ী চড়ে ঘরে যায়। সুনীতা তো এখানেই নামিয়ে দিতে বলল।” বধুয়া আর কিছু বলে না। সে গাড়ী স্টার্ট দেয়।
পরদিন বধুয়াই খবর দেয় দময়ন্তীকে। দময়ন্তী সকালে সবে কফির কাপে চুমুক দিয়েছে। বুধুয়া হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলে, “ম্যাডাম কাল আপনাকে বললাম না মেয়েটাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি।” উত্তেজনায় বধুয়ার সারা মুখ লাল হয়ে গেছে। কিছুই বুঝতে পারে না দময়ন্তী। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে বধুয়ার মুখের দিকে। বধুয়া বলে চলে, “অবশ্য বাড়ী পৌঁছে দিলেও কি মেয়েটা বাঁচত?” দময়ন্তীর হাত থেকে কফির কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে কোনমতে সামলে প্রায় চিৎকার করেই বলে, “কি বলছ মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। পরিষ্কার করে বল। কার কি হয়েছে? কাকে বাঁচানোর কথা বলছ?” “মুনিয়া, ম্যাডাম। মুনিয়ার কথা বলছি।” “মুনিয়া? কি বলছ?” “ হ্যাঁ, ম্যাডাম, মুনিয়াকে কাল রাত্রে একেবারে শেষ করে দিয়েছে। শেয়াল, কুকুরের মত ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে।” বধুয়ার শান্ত চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরে পড়ছে। দময়ন্তী থরথর করে কাঁপছে। কোন কথা বলতে পারছে না। শুধু চোখের সামনে ভাসছে খোঁপায় পলাশের ফুল গোঁজা, জংলা শাড়ী পরা, চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক দেওয়া মুনিয়ার মুখখানা। দময়ন্তীর হঠাৎ মনে হল, বধুয়া কি করে কাল রাত্রে আগে থেকেই আন্দাজ করেছিল মুনিয়ার কোন বিপদ হতে পারে? কেন সে গাড়ী থামিয়ে ওকে ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেছিল? বুধুয়াকে জিজ্ঞেস করে সে যে উত্তর পায় তাতে হতাশা আরো বেড়ে যায়। কাল দময়ন্তীর সাথে দেখা করতে সার্কিট হাউসে এসেছিল কোদেনার থানার ওসি সুরিন্দার কর্মা। দময়ন্তী একটু অবাক হলেও জানত এখানে পুলিশের এই ভিজিট হয়ত স্বাভাবিক। নকশাল বেল্টে পুলিশ একটু-আধটু নজর রাখে বাইরে থেকে আসা লোকজনদের উপর। সাধারণ রুটিন কিছু জিজ্ঞেসা যেমন, “কতদিন আছেন? কোথায় কোথায় ঘুরলনে?” এই আর কি। উনি চলে যেতেই সুনিতা আর মুনিয়া আসে। বধুয়া তখন বাইরেই ছিল। পুলিশের জিপের ড্রাইভার লখিন্দর ওর চেনা, দেশওয়ালী ভাই। একটিপ খইনি সবে ভাল করে ডলছে আর ওসি সাহেব এসে হাজির। ওসি অবশ্য খেয়ালই করে নি। ফোনে চাপা গলায় কথা বলতে ব্যস্ত। বধুয়া শোনে ওসি ফোনে কাকে যেন বলছে, “টারমেটলার ওই মেয়েটা, মুনিয়াও আছে সঙ্গে। বড় বার বেড়েছে আজকাল। সারাদিন লিডারের সঙ্গে ঘুরছে।” লিডার বলতে যে ওসি সাহেব সুনীতাকে বুঝিয়েছে সেটা বধুয়া বুঝতে পারে। পুলিশের অত্যাচার সহ্য করেও যে মেয়ে ঘুরে দাঁড়ায়, রাষ্ট্রকে বাধ্য করে তাঁর যন্ত্রণার কথা শুনতে সে তো লিডারই বটে। বধুয়ার সন্দেহ হয়। একটা কিছু খারাপ ঘটতে পারে বলে সে আঁচ করে। তাই দময়ন্তীকে অনুরোধ করছিল মুনিয়াকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসতে। দময়ন্তীর খুব আপশোস হয়। সে যদি তখন বধুয়ার কথা শুনত! অবশ্য তাতেই বা কিছু লাভ হত? অত্যাচার করার হলে তো ঘর থেকেও উঠিয়ে নিয়ে যেত। তবু সে আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে। প্রীতমকে ক্যামেরা নিয়ে রেডি হতে বলে দ্রুত পোশাক পরিবর্তন করে নেয় সে। এরপর গন্তব্য টারমেটলা।
পথে পড়ে পঞ্চকোট। এখনও রাতমেলা উৎসবের স্মৃতিচিহ্ন ছড়ান। শুধু উৎসবে সামিল হওয়া লোকজনই যা অনুপস্থিত। যেন মনে হচ্ছে আশেপাশেই আছে সবাই। এই এক্ষুণি ধামসা মাদলের তালে নেচে উঠবে মাথায় পলাশের ফুল গোঁজা সস্তার রঙিন শাড়ী পরা মেয়ের দল। মুখে পান গুঁজে এখুনি গতরাতের মত পঞ্চকোটের মোড়ল শিবু কালুড়ি এসে বলবে, “দিদি লিখবেন তো আমাদের কথা? আমরা তো দুদিক থেকেই কাটি। পুলিশ মারে মাবাদী বলে আর মাবাদীরা মারে পুলিশের চড় বলে। আরে আমরা কারোর নই। আমরা এই জঙ্গলের। দুবেলা পেটভরে খেতে পড়তে চাই। আমাদের ছিলামিয়াদের একটু পড়াশুনা শিখাতে চাই। যাতে আমাদের মত কুলিকামিনের জিন্দেগি না তাদের নসিব হয়।”
টারমেটলা পৌঁছাবার প্রায় চার কিলোমিটার আগেই পুলিশের গাড়ী পথ আটকে দেয়। “ওদিকে যাবেন না। গেরিলা স্কোয়াডের এক কম্যাণ্ড এইমাত্র আমাদের সাথে খণ্ডযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গাড়ী যাওয়ার অনুমতি নেই।” দময়ন্তী হাল ছাড়ে না। প্রীতমকে গাড়ী থেকে নেমে পড়তে বলে। গাড়ী যাওয়া যাবে না। পায়ে হেঁটে তো যাওয়া যায়! “ম্যাডাম, কেন ঝামেলা করছেন? এসপি সাহেব স্বয়ং আর কিছুক্ষণের মধ্যে এসে যাবেন।” দময়ন্তী আর উত্তেজনা চেপে রাখতে পারে না। “এস পি সাহেব এসে পড়লে আমার কি সমস্যা হতে পারে একটু বলবেন?” “ম্যাডাম, আমাদের উপর অর্ডার আছে এখানে কাউকে যেতে দেওয়া হবে না।” দময়ন্তী চোয়াল শক্ত করে উত্তর দেয়, “ঠিক আছে, আমি এখানেই এস পি সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছি। ওনাকেই জিজ্ঞেস করব এরকম অর্ডারের কারণ।” “ম্যাডাম, এখানে একটা ওয়ার চলছে আর আপনি এখন সরকারী কাজ নিয়ে প্রশ্ন করতে চাইছেন? বেশ! আপনার যদি মনে হয় অপেক্ষা করবেন এস পি-র জন্য তাহলে থাকুন। আমরা কিছু বলব না।” খুব নির্বিকারভাবেই কথাগুলো বলে এক জুনিয়ার সাবইন্সপেক্টর।
প্রায় দুপুরের দিকে আসে এসপি শিভম কাল্লুরি। ততক্ষণে টারমেটলায় আগুনের শিখা জ্বলছে দাউদাউ করে। বাতাসে ভাসছে পেট্রলের গন্ধ, পোড়া বারুদের গন্ধ। দময়ন্তী ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সন্ধ্যেবেলায় পুলিশ সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছে। দময়ন্তীর হঠাৎ খুব শীত করে ওঠে। ও তো জানে সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশ কি বলবে। আগে থেকেই তো তার গান গেয়ে রেখেছে ওসি সুরিন্দার। গেরিলা স্কোয়াডের কয়েকজনকে নাকি শেষ করে দিয়েছে তারা। তাহলে মুনিয়া? সে তো গেরিলা স্কোয়াডের নয়? সাধারণ একটা মেয়ে। যে হয়ত আজ সকালে মহুয়া কুড়তে জঙ্গলে যেত। কাল রাতে মেলা থেকে ফিরে সে হয়ত তার পঙ্গু বাবাকে রুটি বানিয়ে খাওয়াত। তার দিকে কেন বুনো মোষের মত তেড়ে গেল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস? না, এই প্রশ্ন সে আজ করবেই সাংবাদিক সম্মেলনে। তারপর যা হওয়ার হবে। দময়ন্তী প্রস্তুত হয়।
কতগুলো পোড়া, গুলি খাওয়া দেহ পড়ে আছে। তারই মধ্যে দময়ন্তী চিনতে পারে মুনিয়াকে। মুনিয়ার পরনে কাল ছিল জংলা রঙের শাড়ী। আজ তার পরনে জলপাই রঙা উর্দি। মুনিয়ার দেহ দেখিয়ে এস পি বলেন, “আজ ভোরের দিকে সন্ত্রাসবাদীদের সাথে আমাদের প্রবল সংঘর্ষে নিহত হয়েছে গেরিলা স্কোয়াডের এই কম্যাণ্ডার।” দময়ন্তী আর চুপ করে থাকতে পারে না। সে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা, কোন আইডেনটিটি কার্ড বা ওরকম কিছু ছিল ওনার কাছে যা দেখে আপনারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যে উনি গেরিলা স্কোয়াডের কম্যান্ডার?” স্বভাবতই প্রশ্ন শুনে উত্তরদাতারা খুশী হয় নি। তাও খুব নির্বিকার গলায় পুলিশ কর্তার উত্তর আসে, “ম্যাডাম আমরা এমনি এমনি সরকারের পয়সা খাই না। আমাদের কাছে খবর ছিল। আর এই খবর সংগ্রহ করতে আমাদের টিম খুব মেহনত করে।” “খবর? এই খবরের ভিত্তিতেই তো আপনার একজন ডাক্তারকে জেলে পুড়েছেন। এক অধ্যাপিকার নামে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বার করেছেন। আর সুনীতা হেমব্রেমকেও মাওবাদী সন্দেহে অকথ্য অত্যাচার করেছেন।” “দেখুন ম্যাডাম, দেশের স্বার্থে, সাধারণ মানুষের সুরক্ষার খাতিরে আমাদের সবসময়ে সজাগ থাকতে হয়। আর ডাক্তারই বলুন কি অধ্যাপকই বলুন কেউই বিচারের উর্দ্ধে নয়। সুনীতার কথা বলছেন? সে ঘটনাও তো এখন বিচারাধীন। এ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না।” খুব ঠাণ্ডা, হিসহিসে গলায় কথাগুলো বলে এস পি সাহেব।
সে রাতে সুনীতা সার্কিট হাউসে আসে দময়ন্তীর কাছে। খুব উত্তেজিত সে। “দিদি পালান। আমার কাছে খবর আছে আপনার নামে অ্যারেস্টওয়ারেন্ট বের হবে। আজ রাতেই আপনি গ্রেপ্তার হতে পারেন। আপনি এক্ষুণি বেরিয়ে পড়ুন। বধুয়াকে ডেকে দিয়েছি। দিদি আপনি রায়পুর হয়ে দিল্লি চলে যান। দিল্লিতে আপনি নিরাপদ। এখানে একমুহুর্তও আপনার জন্য নিরাপদ নয়।” দময়ন্তী খুব একটা অবাক হয় না। শুধু বলে, “এত ভয় পাচ্ছেন কেন সুনীতা আপনি? দেশে কি আইন বলে কিছুই নেই। ওয়ারেন্ট বার করলেই হল? আর পালিয়ে যাব? পালিয়ে কি কোথাও নিরাপত্তা পাওয়া যায়।” দ্রুত স্মার্টফোনে দময়ন্তী দিল্লিতে ডায়াল করে। সুনীতা প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ে। “দিদি ফোন রাস্তায় করে নেবেন। এখন রওনা দিন। গাড়ীতে উঠুন।” সুনীতা রীতিমত অনুরোধ করে দময়ন্তীকে। “দিদি আপনি গাড়ীতে উঠুন।” দময়ন্তীর তাড়া নেই দেখে সুনীতা ঝট করে বুকের আঁচল সরিয়ে ব্লাউজটা খুলে দেয়। দময়ন্তী শিউড়ে ওঠে! সারা বুক জুড়ে ক্ষত চিহ্ন। স্তনের বোঁটা পর্যন্ত পোড়া। শাড়ির আঁচল ঠিক করে সুনীতা আস্তে আস্তে বলে, “সিগারেটের ছ্যাঁকা, দিদি।” আপনি এই দেখেই কাঁপছেন। আমার সারা শরীরটাতেই এরকম পোড়া ঘা।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলে, “পালান দিদি। না’হলে আজ রাতেই ওরা আপনাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বানিয়ে দেবে। আপনি এস পি-র মুখের উপর কথা বলেছেন। আমাকেও বানিয়েছিল প্রথমে ওই এস পি, তারপর হায়েনাগুলোর মুখ দেখতে পারি নি। চারিদিক ঝাঁপসা হয়ে গিয়েছিল।” “দিদি, আমি হলাম জঙ্গলের মেয়ে। তাই এত কিছু সহ্য করেও এখনও বেঁচে আছি। শেষ দেখব বলে!” আগুন জ্বলে সুনীতার চোখে।
দময়ন্তী চলে যাচ্ছে। বধুয়া খুব স্পিডে গাড়ী চালাচ্ছে। প্রায় নব্বই- একশ কিমি পর্যন্ত গাড়ীর স্পিড উঠে যাচ্ছে। সরু রাস্তার একদিকে খাদ, আরেকদিকে পাহাড়। দুপাশের উঁচু টিলাগুলোকে অন্ধকারে যেন দৈত্যের মত দেখাচ্ছে। জুনিয়ার প্রীতম খুব গম্ভীর। হয়ত নার্ভাস হয়ে গেছে বেচারা। দময়ন্তীর মনে পড়ল, সুনীতা বলেছিল, “দিল্লি পৌঁছে গেলে আপনি নিরাপদ।” হয়ত ঠিকই বলেছে। দিল্লিতে দময়ন্তী নিরাপদ। সুনীতাও তো দিল্লিতেই পালিয়ে গিয়েছিল। আদিবাসীদের উপর হওয়া পুলিশি নির্যাতন বন্ধ করার আপীল করতে। কেস কোর্টে ওঠার আগেই সুনীতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাকে সেই পুলিশদের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল যাদের থেকে বাঁচতে সে দিল্লি এসেছিল।
জগদ্দলপুর-রায়পুর হাইওয়েতে গাড়ী এসে পড়েছে। প্রীতম মোবাইলে রায়পুর-দিল্লির ফ্লাইটও বুক করে ফেলেছে। ভোর প্রায় হব হব। এই সময়ে রাস্তায় একদল লোক লাল জামা, গলায় কড়ির মালা, মাথায় বাইসনের নকল শিং লাগিয়ে হাতে মাদল বাজাতে বাজাতে চলেছে। সরু রাস্তায় ওদের চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে বধুয়া আবার গাড়ীর স্পিড বাড়ায়। এই ভোরেও মানুষ উৎসবে মেতেছে। গাড়ী এগিয়ে চলেছে রায়পুরের দিকে। দময়ন্তীর কানে বাজছে একসাথে বাজান অনেকগুলো মাদলের বোল- ধিতাং তাং, ধিতাং তাং, ধিতাং তাং। এরসাথে নাকে এসে ঝাঁপটা মারছে পোড়া গন্ধ। এই গন্ধই সে পেয়েছিল টারমেটলার জঙ্গলে।    
    

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন