বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

শেখ লুৎফর-এর গল্প : ফসল

দুর্গা মাই কি, জয়...
দুর্গা মাই কি, জয়...

সমস্বরের চিৎকার আর ঢাকের দ্রিম দ্রিম শব্দ, কালীবাড়ির আখড়া থেকে নিথর বিলের উপর দিয়ে উড়ে এসে, সজলের পিঠে হুড়মুড় করে পড়ে আর তার ধাক্কায় সজলের অধৈর্য হাতের আঙুল ফুঁড়ে বৈঠার কোমরে, গতরের তাবৎ ঝাল ঢেলে দিলে, শান্ত পানির বুকে রাগী ঘূর্ণী উঠে শনশন রবে পিছিয়ে যায় এবং এক লাফে তার ছিপ ডিঙ্গিটা জামর্নি আর কলমির চালার দেড় হাত ফাঁকে সাঁ করে ঢুকে গেলে ডিঙ্গির বাতায় কচু আর কলমির ডাঁটার ঘষা লেগে ছে...ছের...শব্দ উঠলে একজোড়া জলপিপি উড়ে যায়।
চাঁদের পানসে আলোয় কলমির ফাঁকে কয়টা সাদা ডিম গোল গোল চোখে চেয়ে থাকে। যেন অবাক, অসহ্য এ উৎপাত। আর একটা তারাবাইন এই অসময়ের ত্যাক্ততায় পানির উপর চটাং করে লেজ নাচালে জলপিপির ডিম ভাজা কি বাইন মাছের ঝাল-চচ্চড়ির সোয়াদ-গন্ধের আন্ধাজে তার জিবের গোড়ায় জল উথলে ওঠে। কয় হাত যেতেই শোল কি গজারের একটা বাইশ তার নাওয়ের আগা গলুইয়ের কাছে ভেসে ওঠে। আঙুলের মতো লালচে পোনাগুলো টুপটাপ ডুবছে-ভাসছে আর পাশেই থির হয়ে পাখনা নাড়ছে মাঝারি আকারের শোল কি গজারটা। বিলের উত্তর পৈঠায় হিজল গাছটা বোবা, তার বোকাচোদা বউটার মতো একবুক হাহাকারের ঔদাস্যে দাঁড়িয়ে আছে।

বউয়ের কথায় সজলের রক্তে উজাই টান পড়ে। বিয়ের পর থেকে অভ্যেস বদ হয়ে গেছে। একলা একলা বিছানায় ঘুমটুম হারাম হয়ে যায়। চনমনে চাঁদের জোছনা এই দশমীর রাতে আকাশ থেকে ফিনকি দিয়ে পড়ছে, আর সজল কিনা বিবাগীর মতো বিছানায় বসে একা একা মহরমের পুঁথি পড়বে?

নিঃসঙ্গতার দাঁতাল দিন-রাত্রিতে এক মাস ছুঁই ছুঁই...তার বোবা বউ শ্বশুরবাড়িতে আটক। সজলের জৈবিক জোয়ার ফুলে-ফেঁপে ফুঁসে উঠলে, মুখে উঠে আসে খাবলা-খাবলা আদিম উচ্ছাস। এখন তার শূন্য ডেরায় শুধু বিলের হু হু বাতাস খুপরি দিয়ে ঢুকে চৌকাঠ পেরিয়ে বাঁশতলার শুকনো পাতা খেদিয়ে যায় আর চালের উপর নোয়ে-পড়া বাঁশে বসে একটা উক্কিলা ঘুঘুর ইনাই-বিনাই কান্দনে তার গতরে যেন আগুনের ফুলকি পড়ে। তাই বান-ভাসা গ্রামে ডিঙ্গি নিয়ে টো টো ঘুরে এই সজল, যাকে গ্রামের মানুষ সজইল্যা বলে ডাকে।

সারাদিন হ্যাবলার মত কি ঘুরে কি টাসকা মেরে বসে থাকে। মাঝে-মধ্যে ঘাড়গুঁজে মাটিতে জটিল আঁকি-বুকি করে আর যখন ভুঁস শব্দে দম ফেলে আচম্বিত দাঁড়ায় তখন পেটের খিদা চোখের সামনে জোনাক পোকা হয়ে জ্বলে-নিভে।

সেই সন্ধ্যা থেকে সজল খিচকা মন নিয়ে আখড়ার বরুন গাছের গোড়ায় বসে দুর্গার ঝলমলে রূপ, জামবাটি বুক আর কালো টানা চোখ দেখে দেখে বুকের ভেতর কিছু নখড়া বুলতার গুলতানি খেয়ে মন্দিরের সামনের ভিড় আর মন্ত্রপড়া ঠাকুরের দিকে নজর দেয়। পটকা গতরের মানুষটা বই পড়ে বেলপাতা আর ফলের থালায় পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। সামনের ভিড়ের মানুষগুলোর সবই তার চেনা জানা; এই পালপাড়া, ঐ দাসপাড়া, সাহাপাড়া আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে-- সারে-সারে ঝুলানো কলার কাঁদি আর নারকেল-পেঁপের দিকে যারা চকচকা চোখে চেয়ে আছে তারাতো সবাই শেখপাড়ার মুসমান এবং এইসব মানুষদের কালো, কোঁচকানো চামড়া আর রঙচটা পোশাকের বহরে দুর্গা-কার্তিককে দেখে তারা যে স্বর্গের দেবতা, সে বিশ্বাস সজলের বুকের চাতাল ফুঁড়ে নিশ্বাসে ঘন ঘন উঠে আসে।

জুপথুপে বিষণ্ণতা তার মনের আনাচে-কানাচে চেপে বসলে সে আরো দমে গিয়ে পুব দিকে হাঁটে, যেখানে চাটাইয়ের বেড়ার আড়ালে ভিসিপিতে হিন্দি ছবির নাচ-গানে মগ্ন জোয়ানপোলা শ' খানেক মানুষ। অভাবী মরদ, ঘরে আমসি গতরের ভাঙা-ঠেংড়া বউ-বেটি, ফিরে তাকাতেও মন চায় না, তাই বেহেস্তি মাল এই সব হুর-পরীদের বারোয়ানা উদলা গতর দেখার জন্য সেখানে বাপ-বেটায় হামলে পড়েছে।

সজলের চোখ বেড়ার ফাঁকে আটকে যায়। আকাল ভরা এই জল-কাদার সংসারে, কালো-কুৎসিত অটকা-পটকার মুল্লুকে সত্যিই দেব-দেবীর মতো কিন্তু মানুষ-- রক্ত-মাংসের চোখ জুড়ানো মানুষ তাহলে আছে!

তার বিস্ময় তাকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে জাগাল। তার চৈতন্য এই মানুষরূপের জীবনকে নিঃস্ব করে দু'পায়ের ফাঁকে মিশিয়ে দিয়ে তার কাঙাল আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ফের খামচে তুলে দেখালো; কিভাবে একজন আধা লেংটু গতরের মেয়ে কড়কড়া লোমওয়ালা বুকের আলিশান ছেলের সাথে নাচে-কুঁধে...। এই সব লাড়ে-লাপ্পা ঘষটানি দেখতে-দেখতে সজলের নাক-কান তেঁতে উঠলে সে ধুপধাপ পা ফেলে বিলের ঘাটে এসে ছিপডিঙির দড়ি খুলে জোরছে বৈঠা চালায়।

এক উজবুক আন্ধাদিশায় সজল পাগলের মতো বৈঠা চালায়। হাতের চাপের সবটুকু শক্তি খালি পেটের নাভিতে এসে জোট পাকিয়ে গিঁট দিলে সজল পেটের চিলিকমারা তীব্র ব্যাথায় কোঁ কোঁ করে হাল ছেড়ে দেয়। চলমান নাওটা পানিপোকার মতো পাক খেয়ে-খেয়ে বিলপারের করিম মৃধার বাড়ির পেছনে এসে হাঁসের মতো ভাসতে থাকে।

সে ডিঙির গলুয়ে চিত হয়ে পেটের যন্ত্রণা ভুলার জন্য আকাশ দেখে। আকাশের সহস্র তারার নীল আলোর দুতিতে হঠাতই তার মনে মৃত্যু ও কবরের ভীতি হানা দেয় আর ঠিক পর মুহূর্তেই এইসব তত্তকথা মুছে গেলে ঝলমলে জোছনার আভায় জেগে থাকা বিলপাড়ের ঝোপ-ঝাড়, মরা কাঁঠাল গাছ আর করিম মৃধার ভাঙা ঘরের চাল তার বিষণ্ণ মনে বিনিয়ে ওঠে।

নূহের বান কমলেও তার ছোবলে ছিন্ন-ভিন্ন গ্রাম অসাড় মৌতার মতো পড়ে আছে। করিম মৃধার ভাঙা ঘরের ভিতর হতে মেড়মেড়ে আলোর করুণ চাউনি আর মৃধার গলার খেড়খেড়ে খিস্তি ভেসে আসে-

-বাজার-হাট কী দ্যায়া করাম, আমি অহন মাইনষ্যেরে পুটকি মারা দিলে পাড়ি।

একটা কঠিন নীরবতা আকাশ সমান উচ্চতা আর ভার নিয়ে পিষে যায় ব্যত্যয়হীন আর শুধু মৃধার গলার খনখনে উচ্চারণগুলো বিলের চারদিকে কাঁপতে-কাঁপতে ছড়িয়ে পড়ে। সজল লাফ দিয়ে ওঠে। বুকের ভেতর থেকে হৃদপিণ্ডটা ছিটকে আসতে চায়, তার চাচা এই যমপুরীর কোন খোন্দল থেকে উঠে এসে কেয়ামতের বিত্তান্ত বয়ান করে চুপ মেরে গেলো? খানিক আগের সজলের ভাবের দুনিয়া থেকে মৃধার দুনিয়াটা কত ফারাক...।

তার হাত কাঁপে, পা কাঁপে, বুকের ডুগডুগিটা ফেটে চৌচির হতে চায় আর তক্ষুনি ফের ভেসে আসে মৃধার বউয়ের মিনমিনে গলা-

-খাওয়ানের মুরদ নাই তে এইগুলানরে কেন পয়দা করছিন, দ্যাহোকছা আমার পোলাপানগুলানের কী দশা হইছে।

মৃধার বউয়ের গলা বুঁজে আসে কিন্তু সজল যেন পরিষ্কার দেখতে পায় আঁচলচাপা দুটি অসহায় চোখ থেকে ঝরঝর করে নোনতা জল ঝড়ছে।

সজলের বুকের বখাটে আগুন নিভে গিয়ে চোখের পাতা ভিজে উঠলে সে চারপাশটা ফের ভালো করে চেয়ে দেখে; সব পোড়া, একটা খয়েরি বলয়ে খাঁ খাঁ করছে, কোথাও এক রত্তি সবুজের মমতা নেই। পানি কমে গিয়ে পচা ঘাস-মাটি, জেগে উঠা ধানি জমি, ঝোপ-ঝাড়, সারি-সারি মরা কাঁঠাল গাছের ঝাটমাথা রোদের ঝাঁজে শুকিয়ে আঙড়া হয়ে গেছে। এখন শুধু শত শত মানুষ উপাসি পেট নিয়ে হা করে ওৎ পেতে আছে ভাতের জন্য, এক মুঠ ভাত চাই...। কামলা-কিষাণ সারাদিন বিলে পড়ে মাছ ধরে দু দশ টাকা রুজির ফিকিরে আর বিলের শালুক ভেট পাড়ার ছেলেরা কবেইতো লুট করে নিয়ে গেছে। গত কয়দিন ধরেইতো সজল দেখছে, একপাল ল্যাংটো ছেলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে বিলের গভীর থেকে শালুক তুলছে আর একপাল বিলপারে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিচ্ছে;

'ডুবপাইরা হালুক খায়

আল্লারে পুটকি দ্যাহায়...'

এখন সারা বিলে একটিও মানুষ নেই, শুধু কলার ভোরা কি কোশাডিঙ্গি ঘাটে ঘাটে পড়ে যেন বিলাপ করছে আর ঐ ঝাড়-জংলা ঘেরা জোড়াতালির ডেরাগুলোর গভীর অন্ধকারে যারা মাগরেবের পরেই খালি পেটে চাটাইয়ে পড়ে ঘুমের আদলে ভুলে থাকতে চাইছে সারাদিনের উপাসের কথা, তাদের উদলা গতর ঘিরে উড়ন্ত মশার ভনভনে ঝাঁক ঘূর্ণি তুলে চারপাশের প্রকৃতির সাথে এককাট্টায় মিশে যাচ্ছে।

অসাড়, অন্তহীন নির্জীবতায় ডুবে-যাওয়া গ্রাম, মৃত জলঢোঁড়ার মতো স্পন্দনহীন পথ-রথ আর কুকুরগুলো, যারা আকালের থাপ্পড়ে ধুঁকতে-ধুঁকতে গতরের ঘা থেকে মাছি তাড়াবার মুরদটুকুও হারিয়েছে তারা কী করে নিত্যকার গমাগচ্ছায় চিৎকার দেবে--সেই জন্যই তো তারা গলি-গোপাটের কোণাকাঞ্চিতে পড়ে দু'পায়ের ফাঁকে মাথা গুঁজে একটুকরো হাড় কী এক দলা গরম মলের খাব দেখে। শুধু ঐ কালীবাড়ির আখড়ার চিতলবুকটা সলতের শেষ তেলটুকু শুষে জ্বলে উঠেছে খুব শীঘ্র নিভে যাবে বলে।

কাঠামের দেবদেবীদের সামনে ভিড় করা হিন্দু-মুসলিম মানুষগুলোর কথা সজলের মনে হতেই তার গতরটা রি রি করে ওঠে। জলজলে ধুতিপরা ঠাকুরের কোঁচকানো চামড়ায় ঝুলে থাকা অণ্ডকোষ আর আমশিমুখী ঝি-বউয়েরা এবং তাদের কুলে-কাঁখে ম্যাও-ম্যাও বিলাইয়ের ছাওয়ের মতো বাচ্চাগুলো দেখেইতো সে আখড়া থেকে পালিয়ে এসেছিল।

সজল পাগলের মতো বৈঠা মারছে; তাকে যে এখান থেকে পালাতেই হবে। বিলের পচিচম পাশে হিজলের ঝোলা ডালে আগা গলুইয়ের দড়িটা গিঁট দিয়ে সে হাঁফায়, ইচ্ছে করে আঁজলা ভরে পানি খেয়ে বুকের তিয়াস মেটায়, কিন্তু এতো শুধু পানির খাঁই নয়, তেড়ে আসা আকালের নিদারুণ হুংকার। এখনই মানুষজন সে আগুনের উলঙ্গ উত্তাপে ঘরে ঘরে সেদ্ধ হচ্ছে। মাঠের জমি, হালের বলদ, ছিক্কায়তোলা কাঁসা-পিতল সব চলে যাবে...আর কি ঘরের বউ-বেটি ঘরে থাকবে? নরকে ভাসবে গ্রামের পর গ্রাম...।

ঐ তো, তিন ক্ষেত পশ্চিমে ইয়াছিন মণ্ডলের পাঁচ কাঠার চৌকোণা জমিটা বুকে গড়গড়া ধান নিয়ে বানের পানির নিচে ডুবে আছে। দূর থেকে তার বোবা বউটার মতো বড়ো অবোধ লাগছে, ক্ষেতের জলে ভাসা বুকটা কাঁদো-কাঁদো সজলের দুঃখের দরিয়া...। ইয়াছিন মণ্ডল তো তারে এই পাঁচ কাঠার দু'ফসলা জমির ডোরে বেঁধেই বোবা মেয়েটাকে গছিয়ে দিয়েছিল। এখন বউ তার বাপের ঘরে আটক, আর ভরা ক্ষেত ধানের বুকে দুধ নিয়ে পানির নিচে হেজে-মজে কাতরাচ্ছে। সজলের পেট খালি, ঘরে ভাত নেই, বুক খালি বোবা তুলসি পাতাটা বিল সাঁতরে উধাও।

বোবা মানুষ, বুদ্ধি ভাল হলেও ক্ষুধার ধমক সহ্য করার মতো সবুর নেই। কাম নেই আলতু-ফালতু কোনো একটা কিছু করে যে দু'পয়সা রোজগার করবে, ক্ষেতের উঠতি ফসল রাতারাতি ডুবে গেলে সেই শোকে সজল হতবুদ্ধি হয়ে গুটিয়ে পড়ে। বোবা বউ ছোট চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, ছিক্কায় ঝুলানো ঘটি-বাটি নাড়ে, বারবার ঘর-বাহির করে আর ঘন ঘন পানি খায়; শেষ বৈকালে পেট চাপড়ে গাঁইগুঁই শুরু করে। সজল ইঙ্গিতে জানায় তার কী করার আছে, তাতে বউ আরও খেপে উঠে ঠেলাজাল এনে বিল আর বাজারের পথের দিকে আঙুল নাচায়। এত সব কৌশলী বুলি ঘেঁটে সজলের মাথায় রাগ চিড়িক করে ফেটে পড়লে, 'ভাগ চুতমাড়ানি আমারে তুই জাওল্যা হইবার কস' বলে সে একটা খেঁচা ধাবড়ানী মারে, তাতে বোবা বউ আরও অবুঝ হয়ে ওঠে। সজলের মাথায় রাগের ভূত আরো জোরে তাও দিলে সে, ‘দ্যাহ মাগীর হাউস কত’ বলে বউয়ের পাছায় একটা কঠিন লাথি কষলে হতবাক বউ তার দিকে ঘোরলাগা চোখে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে। সেই বোবা দৃষ্টির ভাষা কী তা আন্দাজ করার আগেই বউ তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিলপাড়ের দিকে ছুটে। আর বিলের পানি--সে তো সেই বাঘিনী, চিড়ে দু’ফালা করে ওঠে যায় বাপের ঘাটে।

সজল এখন মনে-মনে পস্তায়- 'আমি হালা মাউরা কামডা ঠিক করছি না'। মণ্ডলের বেটি ঘরে থাকলে এই মরা কার্তিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে দশ-বিশ সের চাল পেতে পাড়তো, বোবা মেয়ে মণ্ডলের পরানের আধেকখান।

মণ্ডল বড় চালাক। আওলা গেরো আরো জুত করে টানবে। সে জানে, তার মেয়ের চে' জমির কদর বেশি। সজল চোয়াল কঠিন করে বিড়ির পাছায় রোষে টোকা মারে, ত্রিং ত্রিং ঘূর্ণনে আগুনের ফুলকি-ছড়ানো লাল টুকরাটা পাঁচ হাত দূরে বিলের পানিতে পড়ে ছ্যাক করে যেন একটা চিৎকার দিয়ে ওঠে।

সজলের চোখ মণ্ডলের কলতলাপেশাবখানা বরাবরে। দুই ঘরের মধ্যের চিলতে গলিটা পাকঘর থেকে ছিটকে আসা কুপির আলোতে পাতলা পসর হয়ে আছে, কেউ এ দিকটায় আসলে-গেলে ঠার করা যায়। 'ক্যাডা জানে মাগী কোন ঘরে হুতে।' সজল মনে-মনে বিড়বিড় করে কথা বলে, কিন্তু বাড়ির কাছে ভিড়তে সাহসে কুলায় না। গত বিষুধবার দিন এশার আযানের পর সে মণ্ডলের আমতলে নাও ভিড়িয়ে বসেছিল, বউটা যদি একবার এ দিকে আসে পেশাব-ওশাব করতে তবে ইশারা দিতে সুবিধা হবে। একলা থাকার কষ্ট কি খালি সজলের একার? কিন্তু সজলের কপাল খারাপ; খুট করে একটু শব্দ হতেই মণ্ডলের ষণ্ডা কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে আসে। যেন পানিতে নেমেই সজলকে কামড়ে ধরবে আর মণ্ডলও কম যায় না, দক্ষিণের ঘর থেকে উড়ে এসে কলতলায় দাঁড়িয়ে কোদায়, 'কোন হালার পুতরে, আর যুদিন কোনো দিন হাইঞ্জার পরে পাই, তে চোর কইয়া টেটায় গাইথ্যা রাহাম, হু...কৈয়া দিলাম।'

সজলের বুকটা শির শির করে, ভয় না ভালোবাসায়? 'ছেমড়িডারে ফালাও যায় না ভুলাও যায় না, এ এক বৈয্যা ফাঁপর।' এই কথা ভাবতে-ভাবতেই সে ডিঙির আগা গলুইয়ের গিঁট খুলে খুব আস্তে করে বৈঠা পানিতে ফেলে চাপ দেয়। ঘার ঘুরিয়ে চারপাশ দেখে--নাহ কেউ নাই, আর আসমান ধবধবে সাদা। তারায় তারায় ফুলের খেতা। ক'দিন আগেও নুহের গজব ছিল, বৃষ্টি আর বৃষ্টি, ফসল গেল, গরু-ছাগল মরল, মুরগিগুলো ঘরের চালে-ডালে বসে-বসে লোলা-লেংড়া হল আর কাঁঠাল-তেঁতুল, জাত-বেজাতের সকল গাছ মরে-মরে সাফ হল। সজলের রাগটা চড়তে-চড়তে ঘাড়ের রগ দু'টো দাঁড়াশ সাপ, 'আসমানের যেন কলেরা লাগছিন গো...কলেরা...।'

সজলের খুব ইচ্ছে করে মেঘের মুখে মুতে-মুতে শোধ লয়। বোবা বউয়ের জমিতে এসে সে ডিঙি খাড়া করে, বৈঠা সোজা কুপে পানির পরিমান ঠাওরায়। দুই কি আড়াই হাত জল জমির বুকে এখনো পাষাণ হয়ে চেপে আছে। সজল গলুই থেকে একটা হাত পানিতে ডুবিয়ে ধান গাছের মাথা খোঁজে। একটা হিংস্র-করুণ আর্তনাদে তার বুকটা মুহূর্তে জ্বলে ওঠে, ইচ্ছা করে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে চিৎকার দিতে; ‘আমার ধান কৈ...ধান...।’

ধান তো নেই , পাটের আঁশের মতো কিছু একটা হাতের নাগালে আসতেই সজল মুঠি ধরে টান দেয়; তা পচা-ধূসর কিছু পাতা উঠে আসে। বুক ভরে গন্ধ টানে। এক ভোটকা-ফাজিল দুর্গন্ধে তার ভেতরটা গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে ভেঙে পড়ে আর চোখ ফেটে ঝর-ঝর ধারায় রোদন আসে। তবে কি সে তার বোবা বউটার মরা মুখ দেখলো? কাকে নিয়ে, কি নিয়ে সে বাঁচবে? আশার সোনাভরা দিন আর ভালোবাসার রাত সব...সব গেলো...এই পানি...নফরের মুত...। সজলের চোখে-বুকে এক অক্ষম-অবোধ আক্রোশ নরকের আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে।

এখন সজলের গাল-থুতনি বেয়ে চোখের জল পড়ছে। মাইনষ্যের অত কষ্ট...থু...থু...। সজলের থুতু বন্ধ হতে চায় না। এক সময় ডিঙির বাতায় বসে সে লুঙ্গিটা তুলে ধরে। চোখ থেকে আর নিচ থেকে দু’ধারায় দু’রকম জল নেমে আসছে। একটার শব্দ হয়, একটার হয় না।

সজলের পরান ভরে চিৎকার দিতে ইচ্ছা করে। যে চিকারের বিজলিতে চারপাশের গ্রামের অন্ধকার ঘরে-ঘরে পড়ে থাকা মানুষ নামের জিন্দা লাশগুলো যেন লাফিয়ে উঠে, ‘বুঝছস কোনটা কষ্টের আর কোনটা ঘিন্নার।’ কিন্তু অসার-উদ্ধেল লোকজ বিশ্বাসে ভীরু সজল তা না-করে মুহূর্তে তার ডিঙ্গির গলুইয়ে উপুর হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। ‘আল্লা ক্যান তুমি মাইনষ্যেরে অত কষ্ট দেও...তুমি কি কানা...না বোবা...অ আল্লা ক্যান তুমি এমুন কর।’

নিথর আকাশ বিলের শান্ত-পরিষ্কার পানিতে উপুর হয়ে নিস্পৃহ চোখে চেয়ে থাকে। সজলের ছায়া আর রোদনের হুহু শব্দ, দুটোই কেঁপে ওঠে কয়টা তিরতিরে ঢেউয়ের নাচন লেগে। সে চমকে চেয়ে দেখে মণ্ডলের বাড়ির থেকে কে একজন বুক পানি চিরে তার ডিঙ্গির গলুই বরাবর ছুটে আসছে। প্রথমেই তার চোখের সামনে মণ্ডলের রাগি মুখটা দপ করে ভেসে ওঠে, তরপর পেতনির কথা মনে হতেই ভয়ের একটা ঝামটা কোঁচের ফলার মতন বুকে এসে লাগে। সব শেষে সজলের মনে জাগে তার বউয়ের কথা, ‘মানুষটা কিন্তুক খুব শক্ত আন্দাজ রাখে।’

সত্যিই যখন বোবা বউ ডিঙ্গির কাছে এলো, তার হতাশায় ধসে পড়া আক্কেল, নিঃসঙ্গ নৈরাশার-খপ্পরে মেচাগার আবেগ-আহ্লাদ আর উপোসের দাপটে কোটরে বসে যাওয়া চোখের মণি লাফিয়ে ওঠে এলো,দুল পূর্ণিমার জোয়ারের মতো হুড়মুড় করে ফিরে এলো; আর বউ ওঁ ওঁ করে কাঁদলো, গোঁ গোঁ করে পানি দেখিয়ে সংকেত দিলো মনের বোল চালাচালির জন্য, সেই ফুটিফুটি ভাষার তরজমা নিয়ে সজল বউকে ঝাপটে ধরে নাওয়ের দিকে টানলো-- ব্যাকুল হয়ে চুমো খেলো, আর ঠিক তক্ষুণি বউয়ের চোখের জলে ভেজা গালের নোনতা স্বাদে সে টের পেলো মানুষটার ফাটাফুটা বুকের রোদন।

বোবা বউ ডিঙ্গিতে ওঠে এলো না। তার বদলে পানিতে ডুব দিয়ে তোলে আনলো মুঠি-মুঠি পচা ধান। নেতিয়ে পড়া নিষ্প্রাণ ধূসর ধানের গোছা দেখিয়ে অভাগি তার কাঁইকুঁই স্বরে বিষম রোদন জোড়ে দিলো। নির্মেঘ উজ্জ্বল আকাশের নিচে স্তব্ধ জলরাশির বুক বার বার চাপড়ে রাগে-দুঃখে সে ফেটে পড়লো, সজলের ডিঙির বাতা ধরে টেনে সজলকে খামচে-হিঁচড়ে অস্থির-উন্মাদ করে তুললো; যেন এত সব অঘটন আর জুলুমের জন্য সেই-ই দায়ী।

বোবা বউয়ের সেই অদ্ভুত আর্ত-হাহাকারে সজলের সব বাঁধ ভেঙ্গে যায়। সে বৈঠা ফেলে পানিতে লাফিয়ে পড়ে বউয়ের হাত দু'টো ধরে মিনতি করে- 'বউ...অ বউ...তরে সব দিমু তে ও আর কান্দিস না, এই মরা পুত লইয়া কাইন্দ্যা কি অইব ক' দ্যাহি?...তার চে' চল আমরা নয়া কৈরা ধান লাগানোর উজ্জোগ করি।'

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন