বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

পাকস্থলী

মূল গল্প : দেরেনিক দেমিরচিয়েন
ভাবানুবাদ : শাহানা আকতার মহুয়া

[দেরেনিক দেমিরচিয়েনঃ ১৮৭৭ সালে সোভিয়েত জর্জিয়ার আহালখালাকি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯০৫ সালে থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পদার্থবিদ্যা, শিক্ষাবিজ্ঞান ও সাহিত্য বিভাগে পড়াশোনা করেন। তাঁর সৃষ্টিশীল কর্ম সোভিয়েত আর্মেনিয়ার গদ্য নাটকে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।


উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্মগুলো হলো- ‘ভাসাক’, ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘মাই নেটিভ কান্ট্রি (নাটক)’, এবং ‘ভার্দানন্‌ক (উপন্যাস)’। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ ‘ভার্দানন্‌ক’ ছিল ৫ম শতকের আর্মেনিয় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি দেশপ্রেমমূলক উপন্যাস। ১৯৫৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮০ সাল থেকে তাঁর স্মরণে সোভিয়েত আর্মেনিয়ায় গদ্যসাহিত্যে অবদানের জন্য দেরেনিক দেমিরচিয়েন রাজ্য সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করে।]

বাড়ি থেকে ছোট্ট পার্ক আর পার্ক থেকে বের হয়ে বাড়ি।

এই হলো সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি তার সাম্রাজ্যের এলাকা। যখন কাঠমিস্ত্রির কাজ করতো তখন শহরের এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে সে যেতো না। বাড়িতে ফেরার পথে শনিবার সন্ধ্যায় তার রাস্তাটা বেঁকে যেতো শুঁড়িখানার দিকে। কিন্তু এখন যুদ্ধ আর দুর্ভিক্ষ অন্য সকলের মতো তাকেও পিষে ফেলেছে। তাই আর ভুলেও শুঁড়িখানার দিকে পা বাড়ায় না। এখন কাজ করতে পারে না সে, বার্ধক্য এসে বাসা বেঁধেছে শরীরে, মনে। গ্রামের ক্ষুধার্ত কুকুরটির যতখানি গুরুত্ব, তার কাজ আর গুরুত্ব বোধহয় ওই অতোখানিই। কুকুরটির মতোই সেও অন্যদের অনুকম্পা পাওয়ার জন্য ভাঙা গলায় তারস্বরে চেঁচিয়ে যায় কিন্তু কাউকে ভয়ও দেখাতে পারে না আবার নিজের অস্তিত্বকে প্রকাশও করতে পারে না।

আগে ছুতারমিস্ত্রির কাজ করতো লোকটি।

সর্বশেষ মালিকটি তার সবটুকু শক্তি নিংড়ে নিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে বাড়িতে। কিংবা বলা যায় কফিনসহ কবরে পাঠিয়ে দিয়েছে। চল্লিশ বছরের কর্মময় জীবনে কিছুই ধরে রাখতে পারেনি- না শক্তি, না অর্থ, না বন্ধু। একটি জিনিস ছাড়া সবকিছুই যেন রূপকথার পঙক্ষীরাজের মতো উড়ে চলে গেছে। পোষা ভৃত্যের মতো সারাক্ষণ তাকে ঘিরে থাকে এক অতৃপ্ত ক্ষুধা। জিহ্বায় তার অদ্ভূত স্বাদ! খেতে সে বরাবরই ভালবাসত। এখন কাজ নেই, কর্ম নেই, কিন্তু কর্মজীবী মানুষের সেই হৃষ্টপুষ্ট পাকস্থলি আজো তাকে জ্বালিয়ে মারছে।

খাবার, অনেক... অনেক খাবার তার চিন্তা-চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার সকল কথায়, কাজে, কল্পনায় শুধুই খাবার আর খাবারের ভাবনা। প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই চলে যায় খাবার রাখার আলমারিটার কাছে। আলমারি খুলে অনেকক্ষণ আনাচে-কানাচে খোঁজে। হাঁড়ি-পাতিল কিছুই বাদ যায় না। জানে যে খাবার নেই, তারপরেও টিস্যুর ভাঁজ খুলে খাবার খোঁজে। যদি পাওয়া যায়! বেশিরভাগ সময়ই মুখে দেবার মতো সামান্য খাবার পায় না। তারপরেও দিনের অনেকটা সময় পার করে দেয় খাবার খুঁজে খুঁজে। তখন অদ্ভূতভাবে তার মুখ থেকে লালা গড়িয়ে নামে, ঠোঁটদু’টো চেটে নিয়ে আবার গিয়ে বসে চেয়ারে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে বসে থাকে কিছুক্ষণ। নোনাধরা দেয়াল বা দেয়ালে লেপ্টানো পোস্টারের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা।

এভাবে বসে থাকতে থাকতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যেতো সে। কল্পনা করত দৃশ্যের পর দৃশ্য শুধুই খাবার আর খাবার... আহ! টার্কির মোটা মোটা রান, বাদাম আর মশলা দিয়ে কষানো আস্ত ট্রাউট, ক্যাভিয়ার স্যান্ডউইচ আর ভেড়ার মাংশের নানা স্বাদের খাবার ভেসে উঠত তার কল্পনায়। তার সামনে থরে থরে সাজানো খাবার, এমনকি খাবারের সুঘ্রাণ এসে ধাক্কা দেয় তার নাকে। স্পষ্ট দেখতে পায় পাতলা করে কাটা ধবধবে সাদা রুটির সাথের রসালো মাংশের রোস্ট। একটা ঢোক গিলে সে। মুখে দেয়া মাত্রই জেনে গলে যাচ্ছে! আহ! মশলা দেয়া খাসির মাংশ, তার সাথে ফিনফিনে রুটির টুকরা!

ঠোঁট বেয়ে লালা গড়িয়ে নামতেই কেটে যায় ঘুমের রেশ। মতো যেন জেগে ওঠে নেকড়ে বাঘ। জেগে উঠে চকচকে চোখে খুঁজতো ঘরের প্রতিটি জায়গা। লালসাভরা এক ক্ষুধা যেন সবসময় তার পেটের ভেতরে ঘুরতে থাকে। মাঝে মাঝে পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে লাফ দেয় সে। তার পর উদ্ভ্রান্তের মতো এলোমেলো পা ফেলে দেয়াল ধরে ধরে বাইরে বেরিয়ে আসে।

তার বউ তার কোনো আচরণেই আর তেমন চমকায় না। মিস্ত্রি লোকটি কখনো লাফালাফি করে, খেয়াল খুশি মতো বাইরে যায় আবার যখন ইচ্ছে ফিরে আসে। এসব দেখতে দেখতে বউটির আর কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। তার এই আচরণ, এই কার্যকলাপগুলো যেন হাজার বছর ধরে চলে আসছে।

মাঝে মাঝে খুব একঘেয়ে লাগে বউটির। শরতকালে একটানা বৃষ্টি হলে যেমন একঘেয়ে লাগে- তেমনি।

ক্ষুধার্ত পশুর মতো স্ত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য আর কি করা যায়? দূর্ভাগা স্বামী তার ঘুরে ফিরে তাই এরকম অস্বাভাবিক আচরণ করে। লোকটি বারান্দায় উঠে যায়, শুকোতে দেওয়া কালো আলুগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে। একটার ওপর আরেকটা আলু সাজায়, কখনো হাত ঝাঁকিয়ে সেগুলো পরীক্ষা করে, কোনোটা জিহ্বায় ছুঁইয়ে আলগোছে নামিয়ে রাখে, আবার লাঠি হাতে বাইরে বের হয়ে যায়। যাবেই বা কোথায়? বড়জোর মোড় পর্যন্ত!

মাঝে মাঝে অলসভাবে ঘুরে বেড়ায় শহরে। বাজারে ঢুকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তরমুজ, বাঙ্গি, শশা; ঘুরে ঘুরে দুধের দোকানে যায়, দোকানিকে এটা সেটার দাম জিজ্ঞেস করে, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করেঃ জানালা দিয়ে মাংশের দোকানের কেনাবেচা দেখে নিষ্পলক চোখে, চর্বিওলা মাংশের টুকরোগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। কখনো কখনো পার্কের কোনায় হেলান দিয়ে বা লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে কাছে পিঠের খাবারের দোকানের দিকে চেয়ে থাকে।

পৃথিবীতে এতো প্রাচুর্য, থরে থরে সাজানো এতো খাবার, কিন্তু দাম বড্ড বেশি!

এই যে এতো এতো খাদ্য, এরমধ্যে কি তার জন্য একমুঠো শস্য, একগ্রাস খাবার, কয়েকটা আঙুর, একফালি তরমুজ, সুস্বাদু একটু চিজ কিছুই নেই!

পৃথিবীটা তার কাছে একটা স্বপন, বহুদূরের নিষ্ঠুর স্বপ্নের মতো মনে হয়। এতো জিনিসের ছড়াছড়ি চারিদিকে কিন্তু তারজন্য দুষ্প্রাপ্য সব, ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আচ্ছা, এর শেষ কোথায়? এই সামান্য চাওয়া কি তার একবারের জন্যও পূরণ হবে না? এই অতৃপ্ত ক্ষুধা কি আজীবন থেকেই যাবে? এ জনমে কি কোনোদিন সে মনের সাধ মিটিয়ে খেতে পারবে না?

পৃথিবীর কাছে সে তো মরে গেছে ইতোমধ্যেই। মৃত মানুষের খাবার প্রয়োজন নেই, কিন্তু এখনো তো তার দিব্যি ক্ষিদে পায়। এখনো সে ঠাণ্ডা তরমুজের স্বাদ বুঝতে পারে, ভেড়ার মাংশে একটু চাপ দিয়েই আঁচ করতে পারে সেটা কতটুকু নরোম হবে। হয়তো এ কারণেই এখনো বেঁচে আছে!

আচ্ছা, পৃথিবীটা কেন তৈরি হয়েছে? কাদের জন্য সৃষ্টি হয়েছে? না খেতে পাওয়ার তীব্র বেদনা নিয়ে, অতৃপ্তি নিয়েই কী তাকে মরে যেতে হবে…?

একা একা কথা বিড়বিড় করতে করতে সে বাসায় ফেরে।

বউ শুনতে পাচ্ছিল তার বিড়বিড়ানি। কিন্তু কিছু বলে না, এমনকি চোখ তুলে তাকায়ও না। আচ্ছন্ন মানুষের মতো লোকটি বারবার ঘরে ঢোকে, সিঁড়িতে লাঠি দিয়ে বাড়ি দিতে দিতে। দেখতে দেখতে ব্যাপারগুলো বউটির গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল তাই খুব একটা গ্রাহ্য করে না।

কোনো মানুষ, প্রাণী বা বস্তু যেন লোকটির দৃষ্টিতে আটকায় না, তার চক্ষের সামনে একটি ছবিই কেবল ঘুরেফিরে আসে- খাবার, রাশি রাশি খাবার! ঘরে ঢুকে সে অভ্যাস মতো নিজের জায়গায় বসে, চারপাশে চোখ বুলায়- নাহ্‌, এক চিলতে নতুনত্ব নেই কোথাও। সেই একই ঘর, একই খাবার। উফ্‌! পৃথিবীটা যেন থেমে আছে এক জায়গায়, একই বৃত্তে।

তার বউ সেদিন দরজার পাশে বসে মোজা বুনছিল। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে খুব জরুরি ভঙ্গিতে কথা বলে লোকটা – ‘পার্কের দিকে গিয়েছিলাম বুঝলে। ওখানে বেশ রসালো, বড় বড় টমেটো বিক্রি হচ্ছে। ভিনিগার দিয়ে খাওয়ার জন্য কিছু টমেটো কিনতে চাইছিলাম কিন্তু পরতা হলো না। দাম খুব বেশি। অত টাকা তো নেই!’

হতাশায় ঠোঁটের কাছে গড়িয়ে আসা লালা গিলে ফেলল সে। আহা! লোকটিকে মরুভূমিতে পথ হারানো ছন্নছাড়া এক মানুষের মতো লাগছে। দিশেহারা হয়ে কেবল হাঁটছে আর হাঁটছে!

ঘর জুড়ে অদ্ভূত নীরবতা দলা পাকিয়ে ওঠে। বউটি কথা বলে না। কি-ই বা বলার আছে! তার নিজেরই তো অনেক সমস্যা। ঘরদোর সামলে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যেতে হয়। একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসেবে সামান্য কিছু টাকার জন্য অন্যের ঘর পরিস্কার করা, সেলাই করা, কাপড় ধোয়া এ সব করতে তার বেশ কষ্ট হয়। মাস শেষে যে কয়টা টাকা পায় তা দিয়ে কোনো রকমে রুটি কেনার ব্যবস্থা করা যায় যার বেশিরভাগ চলে যায় তার স্বামীর পেটে। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে মহিলাটি দিনশেষে দুই পাউন্ড রুটির সংস্থান করতে পারে। এতো কষ্টের পরেও তার কোনো অভিযোগ ছিল না। কারো সাথে এসব নিয়ে কথাও বলতো না।

বউ কাজে বেরিয়ে গেলে সে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। কখনো কখনো বউটি খাবার ঘর থেকে চা আর সীম আনতে গেলেই সে হায়েনার মতো উঠে দাঁড়াত। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ময়লা হাতে থাবড়া দিয়ে তুলে নিত রুটি, নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুঁকে বর্বরের মতো রুটিগুলো গিলতে শুরু করত। ধীরে সুস্থে চিবিয়ে খাওয়ার ধৈর্য নেই। মুখভর্তি খাবার কেবল গলার দিকে ঠেলে দেওয়া... খাবার ঘর থেকে ফিরে এসে বউটি এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। এই প্রথম নিজেকে তার একটা পশুর রক্ষক বলে মনে হয়। এ রকম আচরণ একমাত্র পশুদের পক্ষেই করা সম্ভব। নিজের পোড়া কপালের জন্য যে অনুতাপ হয় না, তা নয়, তারপরেও দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়ে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করত।

রাতের খাবার শেষ হয় নিঃশব্দে এবং আনন্দহীনভাবে। রুটিটুকু কোনো রকমে গিলে মিস্ত্রি কথা বলতে শুরু করে-

‘ গত বছর এই সময় আমাদের বস্তাভরা পেঁয়াজ ছিল, তাই না? আচ্ছা, তুমি কি পরে খাওয়ার জন্য সীমের তরকারি খানিকটা তুলে রেখেছ?’

প্লেট সরিয়ে রাখে বউটি- ‘ কতটুকু ছিল যে সরিয়ে রাখব?’

পরেরদিনও সেই একই দৃশ্য...

তারপরেও ঋতু বদল হয়, শরৎ আসে গুরুত্ব আর প্রত্যাশা নিয়ে

লোকটি বারান্দার রেলিং ধরে ঝুঁকে খোলা উঠান আর ওপাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। উল্টোদিকের বাড়ির দোকানদার কাঠবোঝাই একটা গাড়ি থেকে কাঠ নামাচ্ছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে লোকটি কিছুক্ষণ সেই দৃশ্য দেখে। একজন বৃদ্ধ চোখেমুখে গভীর প্রাণশক্তির ভাব নিয়ে তাকিয়ে আছে। একটা ষাঁড় দাঁড়িয়ে আছে আর তার সঙ্গী মাটিতে শুয়ে অলসভাবে জাবর কাটছে। ঘাস-গাছপালার অদ্ভূত একটা গন্ধ এসে ঝাপটা দেয় লোকটার নাকে।

দিনটি খুব উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত। ডিমের কুসুমের মতো হলদে রোদ উঠেছে। লোকটা এসব দেখতে দেখতে ক্ষুধায় কাতর হয়ে উঠছিল। ভাবছিল সেই দিনগুলোর কথা যখন শীতের আগেই ঘরে এনে রাখত পুরো মওসুমের জন্য নানারকম খাবার, সেই মিষ্টি শৈশবের কথা। আহা! সেই দিনগুলো তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না!

কাঠ চিরতে চিরতে ঘেমে ওঠে লোকটা। প্রায় ঘন্টাখানেক পরে থামে। ব্যাগ খুলে বাড়ি থেকে আনা একটা লাল আটার রুটি বের করে খায়। চর্মসার হাত দিয়ে ছোট ছোট করে ছিঁড়ে মুখে ফেলে দ্রুত চিবোয়। খাওয়া দেখতে দেখতে মিস্ত্রি লোকটিও কল্পনায় খাওয়া শুরু করে। কাঠ চেরাই করা লোকর খাওয়া শেষ হয়ে যেতে হতাশ হয়ে বেচারা এবার ষাঁড়ের জাবর কাটার দিকে নজর দেয়। যত যাই হোক না কেন, লোকটির সমস্ত ভাবনা, কল্পনা এসে মিশে যেতো খাবারে। আর এই যে চিবিয়ে খাওয়া- এটা তার খাওয়ার ভাবনাকে ভীষণভাবে জাগিয়ে তোলে। সমস্ত চেতনা জুড়ে খাওয়া আর খাওয়া… প্রতিটি শব্দ, নড়চড়া সবকিছুতেই কোনো না কোনোভাবে সে খাদ্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়।

শুয়ে থাকা ষাঁড়টির দিকে তার চোখ। মনে হচ্ছিল সে যেন ষাঁড়ের মসৃণ ঊরু থেকে চামড়া খুলে মাংশগুলোকে ছোট ছোট টুকরা করে কেটে পাতিলে রান্না করে খাচ্ছে। সবটুকু মাংশ শেষ না হওয়া অবধি কল্পনায় সে খেতেই থাকে। একসময় তার মুখ ফেনায় ভরে ওঠে, অস্থির রাগে কাঁপতে থাকে, মুখ থেকে বের হয়ে আসতে থাকে লালার ধারা। সেই মুহূর্তে সত্যিই তাকে পশুর মতো দেখায়, উত্তেজিত পশু যার ক্ষুধার্ত একটা পাকস্থলী ছাড়া আর কিছু নেই।

গাড়ি থেকে সবগুলো কাঠ নামানো শেষ না পর্যন্ত সে ওখানেই বসে থাকল। খালি গরুর গাড়িটি এক সময় ফিরে চলল। যতদূর চোখ যায় চেয়ে রইল সে। বাতাসে হিমহিম ভাব। ঠাণ্ডায় মিস্ত্রি একটু একটু কাঁপছিল। ভেতরে গিয়ে তাই পুরনো কোটটা জড়িয়ে নিল গায়ে।

কিছুদিন বাদে লোকটি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। একেবারে মৃতপ্রায় দশা। বউটি যেন মনেপ্রাণে এটাই চাইছিল। নিজেকে প্রস্তুত করছিল যে কোনো পরিস্থিতির জন্য। শেষ কর্তব্য পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তুলছিল মানসিকভাবে।

অসুস্থ মিস্ত্রির একদিন খুব ইচ্ছে হলো স্যুপ খাবার। মৃত্যুর আগে নাকি মানুষের অনেক কিছু প্রবলভাবে খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তাকে দামী এই খাবার দিয়ে খুশি করার মতো সামর্থ্য তো এই পরিবারের নেই। স্যুপের বদলে তার বউ পাঁচটা চেরি ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে তাকে খেতে দিল।

অসুস্থ লোকটি আবারো এক বাটি স্যুপ খেতে চাইল। সারাটা সকাল শুধু একই কথা, একই মিনতি।

রাতের খাবারের সময় একটা শুকনো রুটি। রুটিটুকু খাবার চেষ্টা করেও গলা দিয়ে নামাতে পারল না সে। সন্ধ্যায় পাশের বাসার মহিলাটি দেখল মিস্ত্রি বউয়ের মন খুব খারাপ। বারবার জিজ্ঞেস করল কেন তার মনটা এতো খারাপ। মহিলা এমনিতে খুব দয়ালু। তাড়াতাড়ি সে তার ছেলেটাকে খামারে পাঠাল দই আনতে। পাওয়া গেল না। পরদিন সকালে পাওয়া যাবে।

রাতে মিস্ত্রির অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। প্রবল জ্বরের ঘোরে সে প্রলাপ বকে। এই প্রথম এমনকি জ্বরের ঘোরেও খাবারের কথা মুখে আনল না সে। আচমকা বউকে বলে, ‘আমি না থাকলে তোমার কি হবে?’ কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকে বউটি।

তারপর অস্ফুটে জিজ্ঞেস করে, ‘ তুমি কি খাবে এখন?’

বউটি ভাবছিল লোকটি বোধহয় স্যুপের জন্য অপেক্ষা করছে- ‘একটু দাঁড়াও। এখনি তোমাকে স্যুপ দেবো’।

মৃত্যু যন্ত্রণায় যেন ছটফট করে লোকটি- ‘আচ্ছা, আমি মারা গেলে তুমি কি খাবে?’

মহিলা বিষন্ন গলায় জবাব দেয়- ‘ কি জানি! কিভাবে বলব তখন কি হবে?’

পাশের বাসার মহিলাটি একবাটি স্যুপ এনে নামিয়ে রাখে টেবিলে।

বউটি বলে- দেখো, তোমার জন্য স্যুপ এনেছে। একটু খাও, ভাল লাগবে।

জ্বরে কাতর লোকটা চোখ মেলে তাকায়, ‘আমার জন্য স্যুপ এনেছে!’

বউটি চামচে স্যুপ তুলে তার মুখে ধরে। লোকটি ঠোঁট ফাঁক করল কিন্তু খেতে পারল না। মুখে তার একফোটা স্বাদ নেই!

এই প্রথম খাবারের কোনো স্বাদ পেলো না। মনে হলো পৃথিবীটা যেন বদলে গেছে ; কেননা তার মুখের স্বাদ হারিয়ে গেছে! যে স্বাদ তাকে এতোদিন অশেষ আনন্দ দিয়েছে, আজ সে স্বাদ না থাকাটা তার জন্য বিরাট শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খেতে পারল না সে। তা দেখে বউটির মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বলল- ‘ঠিক আছে, পরে খেয়ো।

একবার স্যুপের বাটির দিকে আর একবার অসুস্থ লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বাটিটা তুলে রাখার জন্য উঠে দাঁড়াল সে।

আলমারি খুলতে গিয়ে বউটির বুকের ভেতরটা কষ্টে দুমড়ে যেতে থাকে। কতবার এই আলমারির কপাট সে খুলেছে, বন্ধ করেছে, কতবার ভালমন্দ খাবার এখানে রেখেছে, কত সুস্বাদু, ভাল ভাল খাবার বের করে বন্ধুদের খাইয়েছে। তার স্বামী কতবার খাবারের খোঁজে এই আলমারি খুলেছে, বন্ধ করেছে।

বাটিটা তখনো ভেতরে রাখতেই পারেনি, প্রতিবেশি মহিলাটি ফিসফিস করে কিছু বলতে সে ঘুরে তাকাল।


লোকটি মারা যাচ্ছে। ইশারা করে কি যেন বলতে চাইছিল।

এলোমলো কিছু শব্দ বেরিয়ে এলো তার গলা চিরে। যেন বলল , ‘এটাই আমার মৃত্যুর পথ। এই পথ ধরে চলে যাওয়াই ভাল’।

নিঃশব্দে মারা গেল লোকটি।

ঘর জুড়ে অসহ্য নীরবতা।

আর কি? এই কি সব ছিল?

বউটি আরো কিছু ঘটবে বলে যেন অপেক্ষা করছিল। কিছুই ঘটল না। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তার ক্ষুধাক্লিষ্ট মৃত স্বামী ঘাড় কাত করে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে, আর অন্যদিকে কপাটখোলা খাবার রাখার আলমারিটাও মৃত স্বামীর খোলা চোখের মতো নিষ্পলক চেয়ে আছে তার দিকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন