শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প : একটি গ্রামের গল্প

ছেলেবেলায় এক জ্যোতিষী আমার হাত দেখে বলেছিল, আমি রাজা হব। এক জ্যোতিষী বলেছিল, আমি সন্ন্যাস নেব। বাবার বন্ধু বিজয় কাকা বই পড়ে ইংরিজি মতে বলেছিলেন আমার পরমায়ু মেয়েদের সিঁথির মতো দীর্ঘ আর বলেছিলেন আমার বউ হবে কালো

কলকাতার আকাশে আগে রোজ ঝাঁক বেঁধে টিয়াপাখি আসত। জিতেদের মাঠে সন্ধেবেলা জোনাকি জ্বলত। পাড়ার অনেকগুলি বাড়িতে কোকিলের খাঁচা আর পায়রার ব্যোম ছিল। বসন্তকালে কেউ কেউ পেয়ারা কাঠের গুলতিতে বুলবুলি বেঁধে গুলতি হাতে ঘুরে বেড়াত। সুতোয় বাঁধা বুলবুলি কখনো কাঁধে উড়ে বসত, কখনো হাতের তেলোয়। আমি আর দাদা ঘর বন্ধ করে কাপড় ছুড়ে ছুড়ে চড়াই ধরতাম। কিন্তু চড়াই বুলবুলি নয়।

চাদিয়াল, চক্ষুয়াল, পেটকাটা, মুখপোড়া, সতরঞ্চি-- এমনি সব নাম ছিল। ঘুড়ি ওড়াতে শেখার আগেই আমার ঘুড়িধরার নেশা হয়েছিল। আমাদের ছাদ ছিল না। ছাদ বাড়িঅলার। বাড়িঅলার ছোট দুটি ছেলে আমার বয়েসী। বড়রা অনেক বড়। ওরা সব ভাই-ই ঘুড়ি ওড়াত। প্রত্যেকের লাটাই ছিল। একটা মাঞ্জার লাটাই, একটা সাদা সুতোর। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন বুড়ো বাড়িঅলাও ঘুড়ি ওড়াত। বাড়িঅলার লাটাই সারা বছর আলমারিতে তোলা থাকে। চকচকে পালিশ, হাতির দাঁতের কাজ। মন্টু কেষ্টর লাটাই বাজারে দু আনায় বিক্রি হয়। আমার লাটাই ছিল না, সুতো না। শুধু কটা ঘড়ি ছিল। আমি মন্টু কেষ্টর লাটাই ধরতাম, ধরাই দিতাম। ওরা সুন্দর প্যাঁচ খেলত, অনেক সময় ঘুড়ি কেটে তা লুটে নিয়ে আসত। কখনো আবার নিজেরাই ভোকাটা হয়ে যেত। পাছে কেউ হাপ্তা ধরে তাই আমার হাত থেকে লাটাইটা টেনে নিয়ে দ্রুত সুতো গোটাত। তবু কোনো বাড়ি থেকে ঠিক সুতো ধরে ফেলত। আমি তখন ঢিল মারাতুম। আমি কখনো হাপ্তা ধরলে মন্টু কেষ্ট কেড়ে নিত।

আমাদের পাড়ায় প্রায় ঘরে ঘরে বিশ্বকর্মা পুজো হত, আর কার্তিক পুজো। খুব ঘটা করে বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পুজো। আমাদের পাড়ার সং খুব বিখ্যাত ছিল। 

আমাদের বাড়িতে প্রতি বিষ্যুদবার হত লক্ষ্মী পুজো। পেতলের ঘটে আমের পল্লব বসিয়ে গোলা সিঁদুরে লক্ষ্মীর মূর্তি এঁকে প্রদীপ জ্বলিয়ে একটা পেতলের থালায় আস্ত পান, কুচো সুপুরি, কটা বাতাসা আর মধুপর্কের বাটিতে তেল সিঁদুর সাজিয়ে হাতে, লেখা একটা পুঁথি দেখে সুর করে পাঁচালি পড়ত পিসি, কখনো দাদা। শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম আর ঠিক সময়ে উঠে প্রসাদ খেতাম। বছরে একবার হত সরস্বতী পুজো, বই সাজিয়ে। রীতিমতো পুরুতে আসত। মা শাঁখ বাজিয়ে জোড়া ইলিশের বিয়ে দিত। আমরা খুব করে তিলে কদমা আর কুল খেতাম। তবু মনটা খুঁতখুঁত করত। মা বুঝে বলত আমাদের বংশে প্রতিমা পুজো বারণ। আর ছিল হোলি। ফুলঝুরি কি হাউইয়ের মতো রঙ ছুটত। বাতাসে ফাগের গুড়ো জ্বলত। সন্ধেবেলা রাস্তার মাঝখানে অরগ্যান সাজিয়ে বেহালা বাজিয়ে দলবেঁধে গান হত। পশ্চিমা চাকররা কাঁধে ঝাড়-লণ্ঠন নিয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকত। তারপর কবে যেন জেলেপাড়ার সং বন্ধ হয়ে গেল। 

রাত্তিরে ঘুমোতে ঘুমোতে কথা বলা আমার স্বভাব ছিল। আমি নাকি প্রায়ই ঘুমের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে হন হন করে বাইরে চলে যেতাম। জ্বর হলে বাবা ইংরিজিতে বকাবকি করত। পিসি খুব চিবিয়ে চিবিয়ে ইংরিজি পড়া তৈরি করত। আমার খুব গর্ব হত। 

আমি কখনো গাঁ দেখিনি। মার কাছে দেশের গল্প শুনতাম। মা ভালো গল্প বলতে পারে না। আমার কোনো ঠাকুমা নেই, ঘুমচোখে রূপকথা শুনিনি। তবে ঘুড়ির নেশায় রেনপাইপ বেয়ে পাঁচিল টপকাতে শিখেছিলুম। আমাদের পাড়াটায় বাড়িগুলো খুব গায়ে গায়ে। আমাদের পুব আর দক্ষিণ লাগোয়া বাড়ি দুটোর সদর দরজা ছিল সম্পূর্ণ অন্য রাস্তায়। ফলে গোটা তল্লাটে কোনো বাড়িরই যেন আব্রু ছিল না। দুপুরবেলা মেয়ে-বউরা জানালায় দাঁড়িয়ে বা ছাদে রোদ পোয়াতে পোয়াতে দূরে অন্য বাড়ির সঙ্গে চেঁচিয়ে গল্প জুড়ত। আমার মা সারাদিন কাজ করে। তার গল্প করার সঙ্গী ছিল না।

ভালুকঅলা আসত ভালুক নিয়ে। বাঁদরঅলা আসত সাহেব-মেম নিয়ে। বেদে আসত সাপের ঝাঁপি নিয়ে। বাজিকর আসত ভেল্কি দেখাতে। আর আসত মাদুলি, জড়ি-বুটি নিয়ে সন্ন্যাসী, ফকির। একজন আমার হাত দেখে বলেছিল রাজা হব। আমি চাইতাম জাদুকর হতে! বেশ ঝুলি কঁধে দেশে দেশে খেলা দেখিয়ে বেড়াব আর হঠাৎ হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠব, বাচ্চালোগ আউর একদিফে তালি। 

আমাদের একতলা ভাড়া দেওয়া হবে। রাজু এসে একটা লোককে কী সব বোঝাল। ট্রেনের কামরার মতো সরু আর লম্বা একটা ঘর। সামনে একফালি উঠোন, কয়েক হাত জমি। শ্যাওলাধরা ইট আর মরচে পড়া লোহার টুকরোয় জমিটা বোঝাই। অজস্র শামুক দেয়াল বেয়ে বেয়ে উঠে আমাদের ঘরেও চলে আসে। আর ছিল বিছে। জমিটা ফালতু পড়ে ছিল। দেয়ালের ওপাশে জিতেদের বাড়ি। ওদেরও প্রায় বিঘেখানেক জমি জঙ্গল হয়ে থাকত। একটা বড় শিউলিগাছ ছিল। শিউলিগাছের ডালপালা ঝুঁকে আমাদের একতলার সেই ইটের স্তুপের ওপর সমস্ত শরৎকাল ফুলের বৃষ্টি করত। আর ছিল কটা কলাগাছ, কোনোদিন কলা হত না। একটা ঝুমকো জবা আর একটা রজনীগন্ধার গাছ ছিল। বাদবাকি জমিটা চীনে ঘাস ও লুচিগাছে বোঝাই। লুচিগাছ নাম আমার দেওয়া। আমি গাছপালার নাম খুব কম জানতাম। কিন্তু শেষপর্যন্ত ভাড়াটে আর এল না।

আমাদের পাড়াটায় এখানে-ওখানে কিছু কিছু জমি খালি পড়েছিল, কিছু কিছু বাড়িতে ভাড়াটে ছিল না। অথচ বস্তিগুলোর রকম দেখে অবাক হাতুম। রাস্তার কলে জল ধরছে, চান করছে আর ঐটুকুটুকু ঘরে কত মানুষ। বস্তিটায় নাকি জেলেরা থাকত। বুঝলুম এইরকমই নিয়ম। ছোটলোকদের এই ভাবেই থাকতে হয়। 

একদিন জোড়াশীতলার মন্দিরে মার সঙ্গে পুজো দিতে গিয়ে পাঠাবলি দেখলুম। 

আমাদের পাড়ায় একটা ভুতুড়ে বাড়ি ছিল। জিতেদের বাড়ির পাঁচিল ছাড়িয়ে শুধু ভুতুড়ে বাড়ির ছাদটুকু দেখা যেত। একদিন একটা ঘুড়ি কেটে পড়ল। গ্রীষ্মকালের দুপুর। একটা কাক ঘাড় বেঁকিয়ে শুকনো ঠোঁট দিয়ে গঙ্গাজলের ট্যাঙ্কের ঢাকনাটা ঠুকরে ঠুকরে ফুটো করার বৃথা চেষ্টা করছিল। টিনের গায়ে নখের আঁচড়ের শব্দ ছাড়া চারিদিক নিস্তব্ধ। আমি চুপি চুপি জিতেদের মাঠে নেমে দোতলা ডিঙিয়ে ছাদের পাঁচিল টপকে সেই ভুতুড়ে বাড়িটার অসম্পূর্ণ দোতলায় এসে দাঁড়ালুম। আর সামনেই দেখলাম একটা সিঁড়ি, নিচে নেমে গেছে। হঠাৎ একটা সিঁড়ি দেখে আমার খুব ভয় করল। আমি পালিয়ে এলুম। 

আমাদের একতলায় নতুন ভাড়াটে এল। একটা বিধবা বুড়ি, চোখে চশমা। এর আগে আমি কোনো চশমাঅলা মেয়েছেলে দেখিনি। কর্তা তার ছেলে--বেশ বড় একজোড়া গোঁফ আছে আর চোখদুটো ঘুম ঘুম। তার একগলা ঘোমটা টানা বউ, দুটো ছোটছোট ছেলে। তাদের সঙ্গে এল বিশাল এক পালঙ্ক, মস্ত কাচের পাল্লা দেওয়া দেরাজ, সুন্দর সুন্দর কার্পেটের আসন, আরও টুকিটাকি হাজারো জিনিসপত্র। একটা ঘরে কিছুই ধরল না, উঠোনে ডাঁই করা রইল। এত দামিদামি জিনিস আমি বাড়িঅলাদের ঘরেও দেখিনি। 

আমাদের বাড়িঅলার ছাদে প্রায়ই খানিকটা জটপাকানো সুতো পড়ে থাকত। সুতোয় জট পাকালে মন্টু বা কেষ্ট তা খোলার চেষ্টা করত না। জটটা ছিড়ে গিট লাগিয়ে নিত। আমি একদিন বসে বসে অনেকক্ষণ ধরে সেই জট ছাড়িয়ে খানিকটা সুতো বের করলাম। সেই থেকে ফেলে দেওয়া জট দেখলেই সুতো ছাড়িয়ে নিতাম। তারপর একদিন আমার হাপ্তার মাঞ্জা কেড়ে নিতে গেলে মন্টুর সঙ্গে মারামারি হয়ে গেল। জ্যাঠাইমা বললেন, যে ধরেছে তার হাপ্তা। মন্টু বলল, আমাদের ছাদে কেন আসে? জ্যাঠাইমা বললেন, আহা আসুক না, বামুনের ছেলে। মন্ট বলল, ভিখিরি কোথাকার। আমি অনেকখানি সুতো পেয়ে গেছি বলে আর কথা কাটাকাটি করলাম না। মনে হল এইবার একটা লাটাই দরকার।

আমাদের বাড়িটা ছিল অনেকখানি ছড়ানো আর জটিল। সদরদরজা দিয়ে ঢুকলে প্যাসেজের ডাইনে-বাঁয়ে দুখানা ঘর--একটায় থাকত রাজু, অন্যটায় বিচিলি। বাঁ দিকের ঘরের সামনে যে প্যাসেজ তার শেষে একটা কাঠের সিঁড়ি--দোতলায় বাড়িঅলাদের চতুর্ভূজ আকারে ঘর ও বারান্দা, তিনতলায় ছাদ আর ঠাকুরঘর। সদরদরজা দিয়ে সোজা এগোলে খোলা আকাশের নিচে উঠোন। উঠোনের পুবদিকে উত্তর-দক্ষিণে টানা নাটমন্দির। উঠোন পেরিয়ে আবার একটা দরজা। অন্দরমহলের দরজা। তারপর সরু আর অন্ধকার গলি। আবার একটা ঘর। অন্ধকার। নাটমন্দির থেকে এ ঘরে ঢোকার চোরা দরজাটি সব সময় বন্ধ থাকে। ঘরটার সামনে আবার ছোট্ট উঠোন, আকাশ দেখা যায়। উঠোনে কল-চৌবাচ্চা। ঘরের গা ঘেঁষে সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনে বারান্দা, দোতলায় দুটি ঘর। বাড়িঅলাদের অংশের সঙ্গে এই দোতলার বারান্দার যোগ রেখেছে একটি দরজা। সেটিও বন্ধ থাকে। ঘরদুটি দিয়েই সামনের সরু ছাদে যাওয়া যায়, সেই ছাদের সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঝুলানো বারান্দা আর আমাদের দু্টো ঘর। কিন্তু আমাদের ঘরে ওঠার রাস্তা ছিল অন্য। বাঁ দিকে অন্দরমহলের উঠোন আর ডান দিকে দুটি অন্ধকার ঘর রেখে মধ্যিখানে সরু প্যাসেজ দিয়ে আবার বাঁ দিকে ঘুরে পাশে আরও একটি বন্ধ আর অন্ধকার ঘর রেখে আবার ডানদিকে ঘুরে প্রায় সুড়ঙ্গের মতো সরু ও অপ্রশস্ত গলিপথ দিয়ে যেতে যেতে বা দিকে একটা চোরা কুঠুরি রেখে সোজা গিয়ে ডান দিকে আমাদের ঘরের দরজা। সামনে একতলার ভাড়াটের জন্য নির্দিষ্ট উঠোন ও সেই একটি ঘরের দরজা, আমাদের যেটি ঘর, সেটিই আবার রাস্তা। দুটি বড় বড় জানলা ছিল। জানলার ওপাশে সেই ফালতু জমি ও ইটের স্তুপ তবু জানলা খোলা থাকত, কারণ কোনো জানলারই পাল্লা ছিল না। শুধু বৃষ্টি এলে চটের পর্দা টাঙানো হত। জানলার গায়ে বাবার চৌকি। সামনে অন্ধকার রান্নাঘর। দিনের বেলাও আলো জ্বালতে হত। আর ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় বালবটিকে দেখাত যেন কুয়াশায় ঢাকা তারা। বাবার ঘরের কোণ দিয়ে ভাঙা একটি সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়িটার বাঁকের মাথায় একটা ছোট জানলা। এই জানলা দিয়ে রান্নাঘরে একটু বাতাস আসত। সিঁড়ি দিয়ে ছাদ। ছাদ নয়, যেন বারান্দা। বাঁ দিকে দেওয়ালে প্রথম জানলাটি বাড়িঅলাদের ঘরের। তারপর দুটি দরজা--সেই দুটি ঘরের--চৌবাচ্চার পাশের সিঁড়ি দিয়ে যে ঘরে আসা যায়। তারপর ডান দিকে দু'ধাপ সিঁড়ি দিয়ে একটি ঝুলনো বারান্দা, আমাদের ঘর। এই বারান্দায় দাঁড়ালে পশ্চিমে অনেকদূর ফাঁকা, দক্ষিণেও তাই। সেই আশ্চর্য অন্ধকার আর জটিল গলিপথ দিয়ে শেষ পর্যন্ত এমন একটা বারান্দায় পৌঁছনো যাবে--তা সত্যিই ভাবা যায় না। আমাদের বাড়িটা যেন লুকোচুরি খেলার জন্য তৈরি হয়েছিল।

এক নিতাইদা ছিল। কুচকুচে কালো, টানা টানা চোখ, বাঁকড়া চুল। গলায় সোনার মাদুলি। সকালে-বিকেলে পায়রা ওড়াত--আকাশের দিকে মুখ তুলে ভুরু কুঁচকে টেনে টেনে শিস দিত। কালেভদ্রে ঘুড়িও ওড়াত। নিতাইদা থাকত তিনতলার একটা ঘরে, চাকর একতলায়। অন্য সব ঘর বন্ধ থাকত। মাঝে মাঝে গালে হাত দিয়ে নিতাইদাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। নিতাইদা, সোনাবাবু, আরও অনেকেই দেখি চাকরি করে না। বড়লোকরা চাকরি করে না। কিন্তু আমাদের বাড়িঅলাও তো বড়লোক। তবে মন্টু কেষ্টর দাদারা চাকরি করে কেন? বড়লোকেরা ব্যবসা করে। কিন্তু সাধনদেরও তো ওষুধের ব্যবসা আছে, তবু ওরা এত গরিব কেন? জেলেরা ছোটলোক, বস্তিতে থাকে। কিন্তু কমলরাও তো জেলে। ওরা কেন এমন পাকা বাড়িতে থাকে? মা বলে সবই কপাল। নিতাইদার তো কপাল ভালো, তবে গালে হাত দিয়ে কী এত ভাবে? আমার একটা লাটাই দরকার। কী করে পাই? একদিন আয়না নিয়ে আমি অনেকক্ষণ নিজের কপাল দেখলাম। 

বেলা দুটোয় জেলেবাড়ির উনুনে নতুন করে আঁচ পড়ত। বিক্রিবাটা সেরে কমলের বাবা ফিরত। সঙ্গে নিয়ে আসত বাড়তি মাছ৷ মাঝে মাঝে পঁচা মাছের গন্ধে আমাদের নাক জ্বলে যেত। খাওয়াদাওয়া সেরে কমলের বাবা বসত হিসেব কাষতে। ঠুনঠুন করে পয়সার আওয়াজ হত। কমল আর তার ভাই-বোনেরা মিলে বাপকে ঘিরে খালি পয়সা চাইত--তখন তাদের মা এসে সকলকে দুমদুম করে পিটত। চিৎকার করে কাঁদত সকলে, তবু পয়সা চাইত। হিসেব শেষ করে কমলের বাবা সকলকেই কিছু কিছু দিত। কিন্তু তার আগে রোজই তাদের মার খেতে হত। কমলের বাবা কমলের মাকে তুই তুই করে কথা বলে। আর কমলের মা চব্বিশ ঘণ্টা চেঁচায়, গাল দেয়, নিজের ছেলে পুলেকেই অভিসম্পাত করে। শুনে শুনে আমিও কয়েকটা গাল শিখে গেলাম। 

একদিন খুব মেঘ করেছিল। পিসি গুনগুন করে গান গাইছিল। সেই থেকে আকাশে মেঘ দেখলেই আমি একটা অস্ফুট গান শুনতে পাই। 

আমাদের পাড়ায় মাত্র দু-তিনটে বাড়িতে রেডিও আছে। বাড়িঅলাদের ছাদে রেডিওর এরিয়েল ছিল, তাতে কখনো ঘুড়ি আটকে যেত। পূব দিকে হাওয়া থাকলে আমার ঘুড়ি ওড়াতে অসুবিধা হত। ছেলেবেলায় পিসি প্রথমবার গ্রামোফোন শুনে নাকি ভয়ে কেঁদে ফেলেছিল। মা নাকি প্রথম ট্রামে উঠে বমি করেছিল। আকাশে এরোপ্লেন দেখে আমার কিছুই হল না। 

একতলার নতুন ভাড়াটেদের সেই বুড়ি বিধবা আমাকে বাবা বলে আবার বাবাকেও বাবা বলে। প্রায়ই মার কাছে এসে দু-আনা চারআনা ধার চায়--দামি দামি কাচের বাসন বিক্রি করতে চায়। মা পারলে পয়সা দেয়। কিন্তু বাসন রাখে না। একটা কাচের জগ দেখে পিসির খুব লোভ হয়েছিল। মা বলল, ক্ষেপেছিস! সমস্ত জিনিসে অভিশাপ আছে। বাড়িঅলারাও যদি কোনোদিন এরকম গরিব হয়ে যায়, একে একে জিনিস বেঁচতে শুরু করে--তাহলে আমি ঠিক সেই লাটাইটা কিনে নেব। হে ভগবান, ওরা যেন গরিব হয়ে যায়, তাহলে আমিও মন্টুকে ভিখিরি বলব। 

একদিন পিসির ইস্কুল থেকে চিঠি এল। পিসি খেলার মাঠে একটা সোনার হার কুড়িয়ে পেয়ে হেডমিস্ট্রেসকে জমা দেয়। এদিকে হারটা আসলে শীলাদিরই, তিনি জানতেও পারেননি কখন হারিয়েছে। চিঠি পেয়ে বাবা তো আহ্বাদে আটখানা। তক্ষুণি বেরিয়ে পড়লেন জনে জনে খবরটা দিতে। অফিসে নিয়ে গেলেন চিঠিটা। বাবার সঙ্গে যে-ই দেখা করতে আসত তাকেই গল্পটা বলতেন। আর পিসিকে ডাকতেন। পিসিকে আবার সবটা বলতে হত। বাবার ভাবে মনে হত পিসি যেন দিগ্বিজয় করেছে, আমার খুব রাগ হত। কদিন খুব চোখ খুলে ঘুরতাম, কিন্তু কিছুই কুড়িয়ে পাই না। শেষে একদিন পিসির পাথরের ব্রোচটা চুরি করলাম। মা, পিসি সকলেই খুব খোঁজাখুঁজি করল। ভেবেছিলাম কয়েকদিন পরে হঠাৎ ফেরত দেব। কিন্তু ধৈর্য থাকে না। তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিতেই পিসি ধরে ফেলল। তবু আদর করে আমার নাক টিপে দিয়েছিল। 

একদিন আমাকে বাবা তার অফিসে নিয়ে গেল। শেয়ালদার কাছে একটা ময়লাবোঝাই লরি থামিয়ে আমাকে নিয়ে বাবা তার ড্রাইভারের পাশে উঠে বসল। আমার খুব ঘেন্না হচ্ছিল। আমরা ব্রাহ্মণ, মেথরদের ছুঁতে নেই জানতাম। একবার ছুঁয়ে ফেলেছিলাম বলে মা আমাকে দিয়ে চান করিয়েছিল। আর এখন বাবা ড্রাইভারটার পাশে বসে দিব্যি তার সঙ্গে অফিসের গল্প করছে। গাড়ির ডাঁই করা ময়লার ওপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে কটা মেথর গান ধরেছিল। তাদের একজন আমার নাম জিজ্ঞেস করতে আমি মুখ ভেঙচে দিলাম। 

একদিন সদরদরজায় একটা পয়সা খুঁজে পেলাম। মা বলেছে কুড়োনো পয়সা ভিখিরিকে দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পয়সায় আমি শোনপাপড়ি খেলাম। ক্যাম্পবেল হাসপাতালের সামনে ফুটপাতের ওপর উত্তর-দক্ষিণে টানা রেললাইন ছিল। এই লাইনের গাড়ি মৌলালির মোড়ে করপোরেশনের অফিসের ভেতর দিয়ে বেলেঘাটায় পড়ত, সেখান থেকে ধাপা। এই রেললাইন ছিল করপোরেশনের। সার্কুলার রোডে ট্রাম চলত, বাস চলত, মোষের গাড়ি, রিক্সা, সাইকেল চলত, ট্যাক্সি, মোটর, ট্রাক চলত। আবার ফুটপাতের ওপর দিয়ে ট্রেনও চলত। শেয়ালদার মোড় থেকে মৌলালি পর্যন্ত রাস্তাটা ছিল যেন আলাদা এক শহর । 

আমাদের বাড়িটা একদিকে বসে যাওয়ায় মেঝেতে ফাট ধরেছিল। ম্যাপের মহানদীর মতো একটা চওড়া ফাটল ঘরের মধ্যে এঁকেবেঁকে গিয়েছিল। চুন-বালির বড় বড় চাবড়া খসে পড়ে দেয়ালগুলো মজার সব ছবিতে বোঝাই ছিল। একটা দিক খসতে খসতে হামাগুড়ি দেওয়া ছোট ছেলের আকার নিচ্ছিল। আমরা বলতুম পিসির ছেলে। একদিন পিসির ওপর রাগ করে তার ছেলের মুখে চড় মারতেই দেয়ালের অনেকখানি পলেস্তারা খসে পড়ল। পিসি বলল নদীর পাড় যেমন ভেতরে ভেতরে খেয়ে যায় তেমনই দেয়ালের ভাঙা পলেস্তারা ধার থেকে ভেতরে ভেতরে আলগা হতে থাকে। আর ইঁটের ফাঁকাগুলো ছারপোকার বাসা। একতলায় বাবার ঘর আর রান্নাঘরের দেওয়ালগুলি নোনায় ধরে ফুলে ফোঁপে থাকে--মা বলে যেন সর্বাঙ্গে বসন্তের গুটি শুকিয়ে চামড়া উঠতে আরম্ভ করেছে। খাওয়ার সময় রোজ বালি ঝরে পড়ে। আমি আর দাদা লোহার খুন্তি দিয়ে মাঝে মাঝে দেয়াল চাঁছতাম, ফলে ইট বেরিয়ে গেছিল। মা বলত, এই ঘরে থেকে থেকে আমার টিবি হবে।

যে লোকটা রানাঘাটের পান্তুয়া হেঁকে যেত, সোনাবাবুদের বুড়িমা তাকে বলত, দে বাবা, একটু কমিয়ে দে, আমারও তো দেশ রানাঘাট। কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়াঅলাকে বলত, দেশ কৃষ্ণনগর, বাখরখানঅলাকে বলত, ঢাকা। দেশের লোক শুনে ফিরিঅলারা দাম কমাত। বাবা বাজারে কেনাকাটার সময় বলত, আমি ব্রাহ্মণ। শুনে দোকানি দাম কমিয়ে দিত।

কবিরাজমশাইয়ের ওষুধের দোকানটা উঠে গেল। মা বাবার কাছে দুঃখ করছিল--এবার লোকটা না পাগল হয়ে যায়। বাবা খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে, মা রান্না ঘরে--কেউ কারোর মুখ দেখতে পেত না, কিন্তু গল্প হত। সিঁড়ির বাঁকের সেই জানলাটার কাছে বসে আমি শুনতাম। আমার দাদা আর আমি পিঠোপিঠি ছিলাম। দাদার প্রায়ই অসুখ করত, কিন্তু পরীক্ষায় ফার্স্ট হত। দাদা রোজ আমার হোমটাস্ক করে দিত। আমি খালি হাতের লেখা লিখতুম। আমাদের ইস্কুলটা ছিল বাড়ি থেকে অনেক দূরে। হাঁটতে হাঁটতে পা ধরে যেত। তখন একদিন সাহস করে ঘোড়ার গাড়ির পেছনের পা-দানিতে পেটটা চেপে ঝুঁকে পড়লাম। অনেক পরে দাদা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছল। 

পিসিদের কলেজে অফ আছে, স্কুলে সমস্ত প্রিয়েড করতে হয়। পিসিদের কলেজে স্ট্রাইক, স্কুলে সে-সব বালাই নেই। আমরা পরাধীন বলেই তো দেশের এত দুর্দশা। হেডস্যার ব্রিটিশের ধামাধারা। টিফিনের সময় চেঁচাতাম, বন্দেমাতরম্‌ পুলিশের মাথা গরম। ইনক্লাব জিন্দাবাদ। রাজবাদীদের মুক্তি চাই। 

আমাদের পাশের বাড়ির চিন্তাদি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করল। চিন্তাদির ছোট্ট একটা ভাইঝি প্রথম দেখতে পেয়ে তার মাকে বলেছিল-- দাখো দ্যাখো, পিসি কেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। তার কিছুদিন পরে কবিরাজমশাইয়ের মেয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করল। কেউ বলল, হবে না? ওরা যে খুব বন্ধু ছিল। কেউ বলল, বাবাকে মুক্তি দিয়ে গেল। মনিদির শ্রাদ্ধে আমার আর দাদার নেমতন্ন হল। বড় বড় পিঁড়ি পেতে বসে খেয়েছিলুম। আর কবিরাজমশাই একটা করে পয়সা দক্ষিণা দিয়েছিল। তখন আমার দুঃখ হল চিন্তাদির শ্রাদ্ধে কেন আমাদের নেমাতন্ন হল না? 

স্কুলে কেউ আসত জুড়িগাড়ি চেপে, কাউকে বা চাকরে পৌঁছে দিয়ে যেত। কেউ টিফিন নিয়ে আসত, ঝি-চাকরে কারোর টিফিন দিয়ে যেত। সন্দেশ, লুচি, দুধ এই সব খেয়ে মুখ মুছে তারা খেলতে আসত। কেউ কেউ পয়সা দিয়ে আলুকাবলি, ট্যাপারি আমসত্ত্ব কিনে খেত। মা কৌটোয় করে শুকনো শুকনো চিঁড়েমাখা দিত। আমার লজ্জা করত নিতে। পয়সা চাইলে মা বলত কেনা খাবার বিষ, খেতে নেই। আমি বুঝতে পারতুম সকলে ভালো বললে কী হয়, আসলে মা-বাবাও যখন যেমন তখন তেমন বলে। বাড়ির মেথর ছুলে চান করতে হয়, অথচ বাসভাড়া বাঁচাবার জন্য দিব্যি তো করপোরেশনের লরিতে চেপে অফিস যাও। কেনা খাবার বিষ, তাই পয়সা দাও না; লাটাই কেনা বিলাসিত, তাই পয়সা দাও না; বেশ, কিন্তু স্কুলের বই ? এই যে রোজ রোজ নরেন স্যারের কাছে মার খাই ? আসলে মা, তুমি আর বাবা যতই ব্রাহ্মণ হও, মন্টু ঠিকই বলেছে, আমরা ভিখিরি। 

একদিন নিতাইদা বউ নিয়ে এল। কিন্তু তারপরও বাড়ির বন্ধ ঘরগুলো বন্ধই রইল। যথানিয়ম নিতাইদা সকালে-বিকেলে পায়রা ওড়ায়, মাঝে মাঝে বারান্দায় গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন দেখি নিতাইদা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে আর ছাদে পাঁচিলের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে লাটাই ধরেছে নিতাইদার বউ। 

আমাদের সেই অন্ধকার চোরাকুঠুরিগুলো রাবিশ, পচা টিন আর বাঁশে বোঝাই ছিল। সেই ঘরগুলি যেন গুপ্তহত্যার জন্য তৈরি হয়েছিল। মানুষ ঢুকত না। ইঁদুর, ছুঁচো আর বিছে বোঝাই ছিল। 

একদিন পুলিশ এসে সব তছনছ করে দেখে গেল। বাড়িঅলাদের মুখ শুকনো, বাবার মুখ কালো। পিসি আমাকে ওদের ঘরে রেখেছিল। সেই অদ্ভুত ঘরগুলোয় পুলিশ কী খুঁজে গেল তা কোনোদিন জানিনি। 

আর তারপরেই এই বাড়িটাকে, তার আলো-অন্ধকার আর জটিল গলিগুলিকে আমি সন্দেহ করতে শিখলাম। আমাদের সেই শান্ত-স্তিমিত পাড়াটা সম্পর্কেও সন্দেহ এল। আমার শৈশবে সন্দেহ ঢুকল। 

আমার বয়েসের হিসেব জটিল। ঠিকুজিতে যে জন্মতারিখ সেটি বাড়িয়ে ছেলেবেলায় আমাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। কারণ এত অল্প বয়সে স্কুলে ভর্তি করা হয় না। তারপর ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফর্মে বয়েসটি যথেষ্ট কমিয়ে দেওয়া হল। কারণ ইতিমধ্যে যুদ্ধের জন্য আর অসুখে দুটি বছর আমি নষ্ট করেছি। ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির যোগ্যতা যাতে বজায় থাকে সেই হিসেবে বেশ কয়েকটা বছর হাতে রেখে এবার আমার বয়েস নির্দিষ্ট করা হল। পরে জানলাম, এ দেশে প্রতিটি মানুষেরই দু রকম বয়েস--একটা সত্যিকারের, একটা সাটিফিকেটের।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন